ফাগুয়ারা ভিলা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
তিন
হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে দুটি শাখা আছে। দায়ভাগা আর মিতাক্ষরা। উত্তর ভারতের অধিকাংশই মিতাক্ষরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মিতাক্ষরা আইনে পুত্রসন্তান জন্ম নেবার সঙ্গে সঙ্গেই পৈতৃক সম্পত্তিতে তার অধিকার জন্মে যায়। আর দায়ভাগাতে তেমনটি হয় না। যেমন বাঙালিদের। বাঙালি বাবারা ছেলেদের যেমন ত্যাজ্যপুত্র করতে পারেন এবং অনেক সময়ে করেন, তা মিতাক্ষরাতে হয়। তবে ওই অধিকার জন্মায় শুধুমাত্র বাবা যে পৈতৃক সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন তারই উপরে।বাবার স্বোপার্জিত সম্পত্তিতে ছেলের কোনও অধিকার জন্মায় না। বাবা দিয়ে গেলে অন্য কথা, না দিয়ে গেলে, কিছুই করণীয় নেই। বাবা রামকৃষ্ণ মিশনে বা অন্য কোনও ভাল সেবা প্রতিষ্ঠানে তার নিজস্ব রোজগার দানও করে দিয়ে যেতে পারেন।
ঋজুদা এই অবধি বলে থামল।
তিতির বলল, তাহলে ভীষ্মনারায়ণের পৈতৃক সম্পত্তিতে বিজিতনারায়ণের এমনিতেই হক ছিল। তাহলে, ছেলে সে যতই চালিয়াত ও খরচে হোক, বাবার বিরুদ্ধে তার অনুযোগ থাকার তো কথা নয়।
ঋজুদা কাল বিকেলেই ফিরেছে কলকাতা থেকে। আমরা বিকেলে হাঁটতে ‘বেরিয়েছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে ওইসব আলোচনা হচ্ছিল।
ঋজুদা বলল, অনুযোগ থাকতে পারে। বাবার অবর্তমানে সে এ সম্পত্তি পাবেই কিন্তু বাবা কতদিন বাঁচবেন তা তো জানা নেই। বাবা তো নব্বই বছরও বাঁচতে পারেন। ততদিনে পালিত পুত্র বিজিতনারায়ণের বয়স হয়তো হয়ে যাবে সত্তরের কাছাকাছি। অতদিন অপেক্ষা করার ধৈর্য তার হয়তো ছিল না। তোদের প্রজন্মের কারওরই অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই। রমাপদ চৌধুরীর একটা উপন্যাস ছিল না? ‘এখনই’–যাকে বলে right now’–তোরা সকলেই right now-তে বিশ্বাসী। তা ছাড়া ভীষ্মনারায়ণ অধ্যয়নশীল মানুষ ছিলেন। বই আর কলম ছাড়া তাঁর অন্য কোনও খরচ ছিল না নেশাও ছিল না। খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবি পরতেন, নিরামিষ খেতেন, রায়পুরের বিদগ্ধ মহলে তার বিশেষ সম্মান ও প্রতিপত্তি ছিল। চিন ও জাপান সম্বন্ধে তিনি বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। অনেকবার গেছেনও ওই দুদেশে। জাপানি ও চিনা পণ্ডিতেরা তার পাণ্ডিত্যকে সম্মান করতেন। তার। কয়েকটি বই ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পঠিত হয়। পলিটিকাল সায়ন্স-এর সেইসব বই থেকেও তার প্রচুর আয় ছিল–হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট হিসেবে মাইনেও কম পেতেন না। তিনি যে বিজিতনারায়ণকে যথেষ্ট টাকা দিতেন না এমনও নয়–যদিও তাঁর জীবনযাত্রা এবং বিজিতনারায়ণের জীবনযাত্রাতে বিস্তরই তফাত ছিল। তার কাছে যা যথেষ্ট’ তা হয়তো বিজিতের কাছে যথেষ্ট ছিল না।
কী পড়ে বিজিতনারায়ণ পুণেতে?
ম্যাসকম।
ভটকাই বলল, মানে?
আমি বললাম, মাস কম্যুনিকেশান।
ও পড়ে কী হয়?
অ্যাডভার্টিজমেন্ট লাইনে যাওয়া যায়–টিভিতে, রেডিওতে, ভাল চাকরি পাওয়া যায়। নিজেও কোম্পানি করতে পারে। আজকাল স্পেশালাইজেশনের যুগ।
অ।
ভটকাই বলল।
ঋজুদা বলল, খোঁজ নিয়ে জানলাম যে, বিজিতনারায়ণ ব্রান্ডেড জামাকাপড় ছাড়া পরে না। স্কচ হুইস্কি ছাড়া খায় না।
ব্রান্ডেড মানে?
ভটকাই আবার বলল।
ওকে বুঝিয়ে দে রুদ্র।
ব্রান্ডেড মানে নামকরা ব্রান্ডের জামাকাপড়। যেমন নাইকে, ওয়েস্টসাইড, উইকএন্ডার আরও কত কী। একটা ঢোলা হাফ-প্যান্টের দাম হাজার টাকা যেমন ঢোলা হাফ-প্যান্ট আগেকার দিনের কনস্টেবলরা পরত–খাকি কাপড়ের।
আমি বললাম, লজ্জা তো কত সস্তাতেই নিবারণ করা যায় কিন্তু এখন লজ্জাস্থান গোপন করার চেয়ে তো বিভিন্নভাবে প্রকাশ করাটাই সপ্রতিভতার উৎকর্ষ বলে মনে হয়। প্রয়োজন নয়, এখন কায়দাটাই আসল।
যা বলেছ।
তিতির বলল।
তারপর বলল, আর সেই কায়দার জন্যে গুণাগার কী পরিমাণ গুনতে হয়! পশ্চিমি বড়লোকদের দেশে ওরা করে বা পরে, ঠিক আছে। ওদের রোজগার আমাদের চেয়ে কত বেশি! যে দেশে সব মানুষে দুবেলা খেতে পায় না, একজোড়া ধুতি-জামা পরতে পায় না সারাবছর, সেই দেশে এইসব চালিয়াতির কী মানে হয় আমার মাথাতে আসে না।
আমি বললাম, বলেছ ঠিকই। এইসব চালিয়াতিতে যারা শামিল হয় এদেশে তারা জনগণের কত জন? শতকরা এক ভাগও কি হবে?
তাও হবে না। মানে, এক ভাগও হবে না তারা। অথচ মিডিয়াগুলো এদের জন্যেই সবকিছু করে সাধারণ মানুষের জন্যে কিছুমাত্রও নয়। লজ্জাকর!
ঋজুদা বলল। ওসব গ্লোবালাইজেশনের কুফল। গ্লোবালাইজেশনের সুফল যে একেবারেই নেই তা বলব না। তবে যা দেখছি, তাতে মনে হয়, কুফলই বেশি। কিন্তু এ প্রসঙ্গ থাক। আমরা বিজিতনারায়ণের প্রসঙ্গ থেকে অনেকই সরে এলাম।
হ্যাঁ। আমি বললাম।
তারপর বললাম, আমাদের বিবেচনার বিষয় ছিল, চটজলদি বড়লোক হবার জন্যে বিজিতনারায়ণ কি তার পালক বাবাকে খুন করতে পারে?
সেইটাই হচ্ছে প্রশ্ন।
ভটকাই বলল, ভীষ্মনারায়ণকে খুন করে আর কার লাভ হতে পারত?
সেটাও প্রশ্ন। ভেরি পার্টিনেন্ট প্রশ্ন।
তিতির বলল, যে খুনি সে কি নিজে হাতে খুন করেছে না কারওকে দিয়ে খুন করিয়েছে সেটাও একটা প্রশ্ন।
এ দিকটা নিয়ে আমি ভেবেছি।
ঋজুদা বলল। তারপরে বলল, এই পরিবারে শুধুমাত্র কন্দর্পর ভাই শার্দুল ছাড়া আর কেউ বন্দুক রাইফেল চালাতেই জানে না। সে তো আমরা বুঝেই গেছি। নইলে মৌলবিকে দিয়ে মোরগা মারতে পাঠায় মিশিরজি গুলি বন্দুক দিয়ে!
সে তো মৌলবি তোদের বলেছিল। আসলে কে পাঠায় তার খোঁজ করেছিস কি?
ঋজুদা বলল।
আমরা মাথা চুলকে বললাম, না তো।
মোরগ খেয়ে তো হজম করে দিলি। আর এই খবরটাই নিলি না। মৌলবি যা বলল তাই বিশ্বাস করে ফেললি। যুক্তি দিয়ে বিচার না করে কোনও কিছুকে বিশ্বাস করাটাই গোয়েন্দার ধর্ম নয়।
ঋজুদা বিরক্ত গলাতে বলল।
তারপরে বলল, আজই খোঁজটা নে। এই ফাগুয়ারা ভিলাতে গুলিবন্দুক কার জিম্মাতে থাকে? কী কী রাইফেল বন্দুক আছে এখানে? কার্তুজ বা অ্যামুনিশানই বা কী আছে? কে সেই অ্যামুনিশান ইস্যু করে?
তিতির বলল, ভীষ্মনারায়ণকে যেদিন খুন করা হয় সেদিন শার্দুলনারায়ণ কি এখানে ছিলেন?
হ্যাঁ। ঋজুদা বলল, খোঁজ নিয়েছি। ছিলেন। কিন্তু এও জেনেছি যে শার্দুলনারায়ণ এবং তাঁর স্ত্রী দিয়া ভীষ্মনারায়ণের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিলেন এই পরিবারে। দিয়া গোয়ালিয়রে একটি কলেজের লেকচারার হিন্দি পড়ায়। হিন্দিতে কবিতা লেখে। বলতে গেলে, ভীষ্মনারায়ণই ছিলেন দিয়ার মেন্টর, আদর্শ, ফিলসফার।
সে জন্যেই হয়তো শার্লের রাগ থাকতে পারত ভীষ্মনারায়ণের উপরে।
ঋজুদা বলল, নট আনলাইকলি। কিন্তু মনে হয় না। আমি ভাল করে খোঁজ নিয়েছি শার্দুল পুরো পরিবারে তার দেবতুল্য দাদা ভীষ্মনারায়ণকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসত ও শ্রদ্ধা করত। দিয়া ভীষ্মনারায়ণের কন্যাসমা–তার সঙ্গে স্ত্রী-হারা হলেও ভীষ্মনারায়ণের অন্য কোনও সম্পর্কর কথা অভাবনীয়। রাজরাজেন্দর শুক্ল পরিবারের সকলের এবং পরিবারের বাইরেও যত লোকের সঙ্গে আমি রায়পুরে কথা বলেছি সকলেই এক বাক্যে এ কথা বলেছেন।
তুমি একদিনেই এত তথ্য জোগাড় করলে কী করে! আর তা রায়পুরেই বা পেলে কী করে?
আমি অবাক গলাতে বললাম।
রায়পুরেই তো বাবু রাজরাজেন্দর শুক্লর পৈতৃক নিবাস ছিল। সেখানেই তো ব্যবসা করে তিনি এত টাকা রোজগার করেন। এত অল্প সময়ে কী করে এত জানলাম সেই প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারি যে আমার যোগাযোগ ছিল রায়পুরে। এবং গড ইজ কাইন্ড টু মি–একট্রিমলি কাইন্ড ইনডিড।
তিতির বলল, কী রকম?
বিদ্যাচরণ শুক্লর নাম শুনেছিস তো? ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সময়ে যাঁর নাম শ্রদ্ধা হয়তো অশ্রদ্ধার সঙ্গেও ঘরে ঘরে উচ্চারিত হত! এই বিদ্যাচরণ শুক্লর ছেলের সঙ্গে কার বিয়ে হয়েছে জানিস?
কার?
আমাদের বাংলার মহিষাদলের রাজপরিবারের মেয়ের। শক্তিপ্ৰসাদ গর্গকে মনে নেই, রাইফেল ক্লাবে আসতেন? সেই শক্তিদারই দাদার মেয়ের সঙ্গে।
বাঙালির মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন বিদ্যাচরণজির ছেলে?
কেন?
তিতির বলল।
কেন করবেন না। অপরূপ সুন্দরী, প্রায় মাখন দিয়ে তৈরি বাঙালি রাজার মেয়ের সৌন্দর্য মধ্যপ্রদেশের রাজসদৃশ ক্ষমতাবানের অপছন্দ হবার তো কিছু ছিল না।
ও। তাই বলো।
তিতির বলল।
রায়পুরে নেমেই সটান আমি ওদের বাড়ি গিয়ে উঠি। ওরাও তো শুক্লই যদিও রাজরাজেন্দ্রর শুক্লর সঙ্গে কোনও আত্মীয়তা ছিল না ওঁদের। ওখানেই সারাদিন থেকে চৰ্য্য চোষ্য লেহ্য পেয় করে খেয়ে ওদেরই গাড়ি করে রাতে বেরিয়ে একেবারে সোজা নাগপুর এয়ারপোর্ট গিয়ে পৌঁছলাম। ভোর ভোর। শীতের দিন, তখনও অন্ধকার ছিল।
সত্যি! তোমার ব্যাপারই আলাদা।
ভটকাই বলল।
তিতির বলল, মরুভূমি বা সমুদ্রর মধ্যেও হয়তো তোমার এরকমই কানেকশানস বেরিয়ে যাবে।
আমি কে? সবই উপরওয়ালার দয়া।
আজকাল দেখি ঋজুদা প্রায়ই উপরওয়ালার কথা বলে। আর চলে-যাওয়া বন-জঙ্গলের বন্ধুদের কথা, গোপাল সেন, সুব্রত চ্যাটার্জি, নাজিম সাহেব, এই সব। বুড়ো হচ্ছে বোধহয়।
ভাবলাম আমি।
তিতির বলল, ফরেনসিক রিপোর্ট কী বলছে? কলকাতাতে খোঁজ নিয়েছ। নিশ্চয়ই ভটচার্যি সাহেবের কাছে।
ফাস্ট হ্যান্ড রিপোর্ট নয়। জানতে হবে বিনোদ ঠাকরের কাছ থেকে। রাঁচি থেকে। এখন ঝাড়খণ্ডর রাজধানী তো রাঁচি। ভটচার্যি সাহেব বিকেলে রাঁচির সঙ্গে কথা বলে জানাল, কোনও লাইট-বোর রাইফেল দিয়ে মারা হয়েছে ভীষ্মনারায়ণ শুক্লকে। এগজাক্ট বোরটা পরে জানা যাবে। তবে পুরো খবরের জন্যে আমি রাঁচির বড় উকিল বীরু রায়কে ফোন করেছি। বীরুদার দাদা রাঁচি হাইকোর্টের জজও ছিলেন। বীরু খবর নিয়ে এলে মোবাইলে জানাবে। চমৎকার মানুষ বীরু। আমার বন্ধু।
তারপর ঋজুদা বলল, দোতলার বারান্দাতে ভীষ্মনারায়ণ বিকেলে রোদে ইজিচেয়ারে বসে বই পড়ছিলেন। পাদুটি ছিল গদি বসানো মোড়ার ওপরে। ডানদিকে ছিল একটা তেপায়া। তাতে চায়ের পট, পেয়ালা-পিরিচ-দুধের পট, চামচ। কিছুক্ষণ আগেই চা খেয়েছিলেন। টি-কোজিতে মোড়া চায়ের পটও ছিল। তাতে চা গরম ছিল। হয়তো আরেক কাপ নেবেন!
গুলিটা কোথায় লেগেছিল? বুকে?
না। একেবারে কপালে। দু-চোখের মাঝে। প্রথম গুলিটা। তারও পর আরও দুটি গুলি করে আততায়ী। একটি বুকের বাঁদিকে, অন্যটি গলাতে। যে মেরেছে তার হাত আর্মির স্নাইপারদের মতো ভাল। তা ছাড়া, বাড়ির কেউই গুলির আওয়াজ পায়নি। দেওয়ালির আগের দিন। জঙ্গলের মধ্যের গাঁয়ের ছেলেরা ধানি পটকা ও আছাড়ি পটকাও ফাটাচ্ছিল মাঝেমধ্যে। আওয়াজ হয়ে থাকলেও দূরাগত সে আওয়াজকে পটকার আওয়াজ বলেই ধরে নিয়েছে সকলে। গুলিগুলো কাছ থেকে আদৌ করা হয়নি। দোতলার খোলা বারান্দা যথেষ্ট উঁচু। সেখানে বসে থাকা মানুষকে মারতে হলে যথেষ্ট উঁচু থেকেই মারতে হবে এবং সেরকমই মারা হয়েছে এবং গুলির শব্দ যখন বাড়ির লোকেরা তেমন পাননি কাছ থেকে তখন ধরেই নিতে হবে যে গুলিটা বেশ দূর থেকেই করা হয়েছে। এখন ঠিক কোথা থেকে যে করা হয়েছে তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। মাটিতে দাঁড়িয়ে মস্ত চওড়া দোতলার বারান্দার পেছন দিকে বসে-থাকা ভীষ্মনারায়ণকে মারা অসম্ভবই ছিল।
ভটকাই হঠাৎ বিজ্ঞর মতো বলল, কিন্তু মোটিভ। খুনের মোটিভ কী এবং কে খুন করেছে সেটা তো বের করতে হবে।
নিশ্চয়ই!
ঋজুদা হেসে ফেলে বলল, ঠিক সেই কম্মো করতেই তো কন্দর্প আমাদের অনুরোধ করেছেন। তা ছাড়া, শুধু খুনি নিজেই নয়, সে যদি অন্য কারও নির্দেশে খুন করে থাকে তবে সে কার নির্দেশে খুন করেছে, সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। মানে abetment-এর চার্জ কাদের উপরে আসতে পারে সেটাও দেখতে হবে।
তা ঠিক।
আমি বললাম।
তিতির হঠাৎ বলল, ভাল কথা মনে পড়ে গেল। তিনদিন হয়ে গেল, আমরা যে নদীর বালিতে অদ্ভুত একটা জানোয়ারের পায়ের দাগ দেখলাম এবং হাতির পুরীষের মতো পুরীষ জায়গাতে জায়গাতে, তা তো ঋজুদাকে রিপোর্ট করলে না ভটকাই।
ভটকাই অপরাধীর মুখে বলল, সময় পেলাম কই? তোরা সবসময়েই এত কিচিরমিচির করছিস, যেন পাখি নয়তো বাঁদর, দুটো সিরিয়াস কথা বলতে পারি, একটু কনসেনট্রেট করতে পারি তার সুযোগ কোথায় পাচ্ছি।
আমি বললাম, নে। ঢের হয়েছে। এবারে বল।
কী বলবে?
ঋজুদা উৎসুক হয়ে বলল।
ভটকাই বলল, সেদিন ফাগুয়ারা ভিলাতে বিকেলে জঙ্গল থেকে হেঁটে ফেরার সময়ে পথ দিয়ে না ফিরে আমরা নদীর বুক ধরে ফিরেছিলাম। যাতে এ বনে কী জন্তু-জানোয়ার আছে তার একটা হদিশ পাওয়া যায়। দিনমানে না হলেও রাতের বেলা তো তারা ওই নদীর বুক ধরে যাওয়া-আসা করেই।
শুধু নদীর বুক ধরে কেন সামনের বড় কাঁচা রাস্তা দিয়েও যাওয়া-আসা করে। সন্ধের পরে এ বাড়ির ত্রিসীমানাতেও তো কোনও মানুষজন আসে না। পুরো এলাকাটাই তখন বন্যপ্রাণীদের দখলে চলে যায়।
তারপর বলল, বল কী দেখলি?
বালিতে শম্বরের পায়ের দাগ দেখলাম, কোটরা হরিণ, চিতল হরিণ, শজারু বলেই বলল, শজারুকে হিন্দিতে কী যেন বলে?
তিতির বলল, সাহিল।
হ্যাঁ সাহিল। তারপর সাপের যাওয়ার দাগ, নানা পাখির পায়ের দাগ। কিন্তু একটা জন্তুর পায়ের দাগ দেখলাম তেমন দাগ আজ অবধি কোনও জঙ্গলেই দেখিনি।
কোনও জঙ্গলে মানে?
মানে, ভারতের বা আফ্রিকার।
ঋজুদা চিন্তিত ভটকাইকে দেখে হেসে ফেলল।
ভটকাই তাড়াতাড়িতে বলল, মনে কোরো না আমি একাই দেখিনি। তিতির এবং রুদ্র তোমার দুই ভাস্টলি এক্সপিরিয়েন্সড ওয়ার্ল্ড-ট্র্যাভেলড সাগরেদরাও দেখেনি।
ঋজুদা এতক্ষণে হয়তো ভাবছিল আমরা, ভটকাই ওর সঙ্গে মজা করছি। বলল, সত্যি নাকি রে?
সত্যি!
আমি আর তিতির সমস্বরে বললাম।
দাগটা কীরকম। পাগ-মার্ক না হুফ-মার্ক?
হুফ মার্ক। তিতির বলল। হুফ মার্ক যে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই।
গ্রামের গোরু-মোষের পায়ের দাগ দেখে থাকবি নিশ্চয়ই।
তাহলে কি আমরা চিনতে পারতাম না?
নয় বলছিস?
তারপর একটু ভেবে বলল, তাহলে সম্ভবত নীলগাই-এর পায়ের দাগ দেখেছিস।
আমি বললাম, নীলগাইয়ের পায়ের দাগও আমাদের চেনা।
হুমম-ম-ম।
ঋজুদা বলল। তারপর বলল, দাঁড়া এক ফিল পাইপ খেয়ে নিই। বুদ্ধি ঘুলিয়ে দিলি তোরা।
তারপরই বলল, হাতির পুরীষ না কীসের কথা বললি তোরা। কিন্তু হাতি তো এ অঞ্চলে নেই।
একটাও নেই?
না, একটাও নেই। তবে কয়েকবছর বাদে বাদে পানুয়ানা ব্লাড় থেকে কোনও হাতি দলছুট হয়ে রোগ’ হয়ে চলে আসে। তারা রে-রে-রে করে রীতিমতো জানান দিয়েই আসে। বাড়ি-ঘর গাই-বয়েল ভেঙে, আছড়ে মেরে তাণ্ডব নৃত্য করতে করতে যায়। এ অঞ্চলে হাতি এসেছে অথচ স্থানীয় মানুষ খোঁজ রাখে না এমনটি হতেই পারে না।
তাহলে কীসের পুরীষ?
তাই তো ভাবছি।
তারপরেই বলল, আচ্ছা, কাল সকালে এক কাপ করে চা খেয়েই বেরিয়ে পড়ব তোদের সঙ্গে। ব্যাপারটা ইনভেস্টিগেট করতে হচ্ছে। সময় তো আর বেশি নেই। আমায় পনেরো তারিখে ব্যাঙ্গালোরে যেতেই হবে। এই রহস্যের উন্মোচন পনেরো তারিখের মধ্যেই করতে হবে যে করে হোক।
আর যদি না করা যায়?
তাহলে হবে না। মানে আমাদের দ্বারা হবে না। অন্য কেউ করবেন হয়তো পরে। সংসারে সব অঘটনের রহস্য উদঘাটনই যে আমাদেরই করতে হবে তারই বা কী মানে আছে? তা ছাড়া আমাদের চেয়ে বিদ্বান বুদ্ধিমান মানুষ তো কম নেই এই ভারতভূমে। আমরাই কি একমাত্র তালেবর?
সেটা ঠিক। কিন্তু কখনও তো তুমি হারোনি।
একবার না-হয় হার স্বীকার করেই দেখা যাক। Failures are the pillars of success. বুঝেছ ভটকাইচন্দ্র।
তারপরই বলল, এবারের খাদ্য পানীয় সম্বন্ধে ভটকাই-এর একেবারেই ইন্টারেস্ট দেখা যাচ্ছে না। কী ব্যাপার বল তো রুদ্র। ওর শরীরটরির খারাপ নাকি?
করে মরি তোমাদেরই জন্যে আর তোমরাই আমাকে লাফিং স্টক করো। তাই এবারে ইচ্ছা করেই ওদিকে যাচ্ছি না। ওদিকে না গেলেও মিশিরজি, কিচেন ম্যানেজার মি. শর্মা এবং অন্যেরা মিলে বন্দোবস্তের কোনও ত্রুটি রাখেননি। তবে তারাই আমাকে একটু কনসাল্ট করেছিলেন লাঞ্চ-এর পরে। কী করে লোকে বুঝে যায় কে জানে!
ভালই তো, আমরা তো তোমাকে চিনলাম না। যারা চিনলে ভাল তারাই তো চিনেছেন। তিতির বলল।
তাই? ভটকাই বলল উজ্জ্বল মুখে।
ঋজুদা হাসি হাসি মুখে ভটকাইয়ের দিকে চেয়ে বলল, রাতে কী হচ্ছে?
যা ঠান্ডা পড়েছে, রাতের মেনুটাই আসল।
এখনই কী ঠান্ডা! পরে ঠান্ডা বাড়বে।
তিতির বলল, তুমি জানলে কী করে।
ছেলেবেলা থেকে সেই জেঠুমনির সঙ্গে যখন বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম তখন থেকেই জেনে আসছি। জানুয়ারি মাসের ২৩ থেকে ৩১ পূর্ব ভারতের বনে পাহাড়ে বৃষ্টি হবেই আর তার সঙ্গে নামবে কনকনে ঠান্ডা। বৃষ্টি মানে, মুষলধারের বৃষ্টি নয়। তা হলেও সামান্যক্ষণের জন্যে হবে। তারপরই একটা উথাল-পাথাল হাওয়া বইতে থাকবে ফুল পাতা আর বনগন্ধ উড়িয়ে নিয়ে আর সঙ্গে ফিসফিসে বৃষ্টি। ঠান্ডা পড়বে তখন, যাকে বলে ঠান্ডা।
তারপরই বলল, সে যাই হোক, ভটকাই কী বলে শোনা যাক আজকের রাতের মেনুর কথা।
ভটকাই গলাটা খাঁকরে নিয়ে বলল, মুলিংগাটানি স্যুপ। তবে তিতির ভালবাসে না বলে তিতিরের জন্যে চিকেন ব্ৰথ।
তারপর?
তারপর ছাতুর লিট্টি, বেগুনভাত্তা সঙ্গে কঁচালঙ্কা, কঁচা পেঁয়াজ, টোমাটো কুচি। সঙ্গে ময়ুরের কাবাব
কীসের কাবাব?
চমকে উঠে ঋজুদা বলল।
ময়ুরের।
তুই জেলে যাবি এবং আমাদেরও পাঠাবি?
ভারতবর্ষ এক বিচিত্র দেশ ঋজুদা। এই এককালীন রাজ-এস্টেটের মধ্যে মানুষ মারলেও যেমন জেল হয় না, ময়ূর মারলেও হয় না। ‘ইয়ে সব হামারা রাজ হ্যায়। মহান ভারতের ভিতরে এখনও এরকম অনেক ইন্ডিপেন্ডেট স্টেট বেঁচে আছে। কয়লা রাষ্ট্রায়ত্ত হলে কী হয়, খোঁজ নিয়ে দেখো এখনও অনেক জায়গাতে বে-আইনি খাদান চালু আছে, বিশেষ করে ওপেন কাস্ট মাইন। বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান, জগজন মানিবে বিস্ময়।
ঋজুদা ভটকাইয়ের রসিকতাতে মোটেই গলল না। বলল, ময়ূর মারল কে?
তারপরই আমার দিকে ফিরে বলল, তুই তোর পিস্তল ওকে দিয়েছিলি? আমি সজোরে মাথা নাড়িয়ে বললাম, মাথা খারাপ।
তবে?
তবে আমি কী করে জানব?
ভটকাই বলল, সবই খাবার টেবিল-এ বসে মিশিরজি আর শর্মাজির কাছে শুনো। বিনা কারণে আমাকে দুষছ কেন? তবে হ্যাঁ। যখন ময়ূরের মাংসর কথা শর্মাজি বললেন দুপুরে, আমি মানা করিনি কারণ ঋজুদা তার টাগরার সঙ্গে জিভ লাগিয়ে কতবার বলেছে, আহা! বেস্ট হোয়াইট মিট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। তখন আমার জিভে জল এসেছে বারবার। তা ছাড়া অন্যায়টা তো আমি করছি না। ওঁরা কারওকে দিয়ে করাচ্ছেন হয়তো। হয়তো সেই মৌলবিই হবেন। তা সে সব ওদের ব্যাপার।
তারপর বলল, যাই হোক ঋজুদা, কথা দিচ্ছি, এই ফার্স্ট আর এই লাস্ট। এর পরে এ জীবনে এই অন্যায় কর্ম আর করব না। নিজে মারার কথা তো ওঠেই না অন্যে মারলেও তাকে জেলে দেব। মাংস ফেলে দেব।
ঋজুদার মুড অফ হয়ে গেছিল। বারবারই মাথা নাড়ছিল আর বলছিল, ন্যাশনাল বার্ড! কী অন্যায়।
তারপরে বলল, আরে আমরা কি আজ খেয়েছি? তখন তো ন্যাশনাল বার্ড ছিল না। আমি তখন হাফ-প্যান্ট পরতাম। রুদ্র আর তিতিরও তো খায়নি। কই? ওদের তো তোর মতো লোভও হয়নি খাবার!
ভটকাই মুখ নিচু করে কাধ শ্রাগ করে বলল, ওরা ভাল, আমি খারাপ।
তিতির ওই সিরিয়াস পরিবেশের মধ্যেও হঠাৎ খুক করে হেসে উঠল। এবং হাসি সাংঘাতিক ছোঁয়াচে। তিতির হাসতেই আমরাও হেসে ফেললাম, মায় ঋজুদা পর্যন্ত।
