ফাগুয়ারা ভিলা (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

দুই

ফাগুয়ারা ভিলার কিচেনে একজন গ্র্যাজুয়েট কিচেন ম্যানেজার আছেন। মি. শর্মা। সাসারাম-এ বাড়ি। সকালের ব্রেকফাস্ট খাওয়ার সময়েই আমাদের মিস্টার ভটকাই তাঁর সঙ্গে দোস্তি করে নিয়েছে। মি. শর্মা গ্র্যাজুয়েট কারণ ফাগুয়ারা ভিলাতে নাকি কলকাতা থেকে সাহেবসুবো অতিথিরাও আসেন। তাঁদের সঙ্গে ইংরেজিও বলতে হয়। মি. শর্মা ইংরেজিটা ভালই বলতে পারেন। বলতে বলতেই উন্নতি হয়েছে বোধহয়। আমাদের সঙ্গেও বলেছিলেন, ঋজুদার ধমক খেয়ে হিন্দিতেই বলছেন।

সাহেবি রান্নার প্রয়োজন হলে গোয়ানিজ কুক ম্যাথুজ রান্না করেন। দিশি ও নিরামিষ-এর জন্যে আছেন পাঁড়েজি। মুসলমানি রান্না ম্যাথুজই শিখে নিয়েছে সব। বেঁধে দেয়। চাইনিজও রাঁধে।

***

আমরা তিনজন আমার ঘরে কম্বলের তলাতে আরামে বসে গল্প করছিলাম। ফায়ার প্লেস-এ আগুন জ্বেলে দিয়েছে। প্রথমে একটু ধুয়ো হয়েছিল। এখন নেই। ঠান্ডাটা জব্বর পড়েছে। ঋজুদা বলেছে, একটু পরেই আসছে আমার ঘরে আলোচনা আছে।

ভটকাই বলল, আজ রাতে সষুকা সাগ, মাক্কিকা রোটি, আঁওলার আচার আর ঝুমরি তিলাইয়া থেকে আনা কালাকাঁদ।

আর মৌলবি সাহেবের মুরগি?

তিতির বলল।

আমিই মানা করে দিলাম। কাল লাঞ্চে চিকেন বিরিয়ানি, রাইতা আর সালাদ করতে বলেছি। আর রাবড়ি।

রাবড়ি?

তিতির বলল।

ইয়েস রাবড়ি। আমি আনাবার বন্দোবস্ত করেছি। তোর নাম করে বলেছি যে মেমসাহেবের ভীষণ কনস্টিপেশন। রাবড়ি রোজ চাই-ই। সঙ্গে আমরাও খাব।

এত অসভ্য না।

তিতির বলল।

এমন সময়ে ঋজুদা হাতে একটা scroll মতো নিয়ে ঢুকল। গোল করে পাকানো কাগজটা। কোনও দলিলের মতো দেখতে।

ঋজুদা আমাদের সকলের উৎসুক চোখে চেয়ে বলল, এটা কেয়ারটেকার মিশিরজির কাছ থেকে জোগাড় করেছি। জিনিসটা অরিজিনাল। কাল ব্রেকফাস্টের পর ভটকাই এটা ঝুমরি তিলাইয়া অথবা কোডারমাতে নিয়ে গিয়ে চার কপি জেরক্স করে আনবি। আমাদের প্রত্যেকের কাছেই একটি করে কপি থাকা দরকার-ফর রেডি রেফারেন্স।

এটা, মানে, এই জিনিসটা কী?

আমি বললাম।

জনমপত্রী। তবে ঠিক জনমপত্রী নয়–এটিকে বলা উচিত বংশলতিকা। আমি মাত্র দুপুরুষের এনেছি। বলেই, কার্পেটের মধ্যিখানে পাতা মস্ত সেন্টার টেবিলটার উপরে সেটাকে মেলে ধরে বলল, তোরা সবাই এগিয়ে আয়।

এইরকম পরিবারে রোজি নামটা কেমন বেমানান, না?

আমি বললাম।

ঋজুদা কিছু না বলে আমার চোখে তাকাল একটুক্ষণ। মনে হল, আই মেড আ পয়েন্ট।

ভটকাই বলল, কেন অমিতাভ, ধর্মেন্দ্র, হেমা, নাম হলে মেয়েদের, স্ত্রীর নাম রোজি হতে দোষ কী?

মনে হয় পঞ্চান্ন মতো।

ওঁর সবচেয়ে ছোট ভাইয়ের বয়স?

দ্যাখ না, নামের পাশেই লেখা আছে।

ওঃ। পঁয়ত্রিশ।

তার মানে তো বড়র সঙ্গে ছোটর কুড়ি বছরের তফাত।

আর সেজর?

মেজ ভীষ্মনারায়ণ–ডিসিজড। মেট আ ভায়োলেন্ট ডেথ। পঞ্চাশ বছর আগে।

হুঁ।

ঋজুদা বলল।

তারপরে বলল, কন্দর্পনারায়ণবাবুর সঙ্গে কথা হল অনেকক্ষণ ধরে। ওঁদের পরিবারের সকলকে একসঙ্গে এখানে পাওয়া যাবে না। কেউ আলাদা আসবেন সামনের উইকএন্ডেকারও কাছে আমায় যেতে হবে।

মানে, পর্বতের যেতে হবে মহম্মদের কাছে।

তিতির বলল।

সেইরকমই। কিন্তু কন্দর্পনারায়ণবাবুদের পারিবারিক রহস্য উদঘাটনের জন্যে তো আমি এখানে মৌরসিপাট্টা গেড়ে থাকতে পারব না। আমাকে এবং তোদেরও সবাইকে ফিরে যেতে হবে কলকাতাতে যার যার কাজে।

তারপর বলল, তোরা এখানে খাদা, বেড়িয়ে বেড়া, রিল্যাক্স কর। আমি একটু কলকাতা যাব কালই।

সে কী! কেন?

কী? কেন? এসব জিজ্ঞেস করবিনা। কলকাতাতে পৌঁছে কাল রাতেই রায়পুর রওয়ানা হয়ে যাব। ভীষ্মনারায়ণবাবু সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর করতে হবে।

তারপর? ফিরবে কবে?

কাজ শেষ করে রায়পুর থেকে গাড়িতে চলে যাব নাগপুর। নাগপুর থেকে খুব ভোরে কলকাতার ফ্লাইট আছে। যাতেই ফিরি, ট্রেনে কিংবা প্লেনে, কলকাতা ফিরে সেদিনই ভেস্টিবুল ধরে কোডারমাতে নামব এসে–হোপফুলি যদি নাগপুর থেকে ফ্লাইটটা সময়মতো ছাড়ে কুয়াশার জন্যে প্রায় রোজই ডিলেড হয় ফ্লাইট বছরের এই সময়ে।

তারপরে বলল, কলকাতাতে সময়ে পৌঁছলে তোর মোবাইলে ফোন করে দেব রুদ্র। তোরা গাড়ি নিয়ে আসিস কোডারমা স্টেশনে। তবে ড্রাইভার রেখে যাবি। নিজেরাই চালিয়ে আসিস। কে কার চর কে জানে। এখানের সকলকে বলবি। কাজে আমাকে কলকাতা যেতে হয়েছে।

তারপর বলল, তোরা এখানে এনজয় কর। তাই করতেই তো আসা। বিপদের তো কিছু দেখছি না আমি। তবুও সবসময়ে চোখ কান খোলা রাখবি। আমার অ্যাসেসমেন্ট ভুলও হতে পারে। আমি তো আর ভগবান নই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *