ষোল
বৌদিদি ক্রমে সেরে উঠলেন। কিছুদিন পরে আমার হঠাৎ একদিন একটু জ্বর হ’ল। ক্রমে জ্বর বেঁকে দাঁড়াল, আমি অজ্ঞান অচৈতন্য হয়ে পড়লাম। দিনের পর দিন যায় জ্বর ছাড়ে না। একুশ দিন কেটে গেল। দিনের রাতের জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি যেন, কখন রাত কখন দিন বুঝতে পারি নে সব সময়। মাঝে মাঝে চোখ মেলে দেখি বাইরের রোদ একটু একটু ঘরে এসেছে, তখন বুঝি এটা দিন। বিছানার ওপাশটা ক্রমশ হয়ে গেল বহুদূরের দেশ, আফ্রিকা কি জাপান, ওখানে পৌঁছনো আমার শরীর ও মনের শক্তির বাইরে। অধিকাংশ সময়ই ঘোর-ঘোর ভাবে কাটে–সে অবস্থায় যেন কত দেশ বেড়াই, কত জায়গায় যাই। যখন যাই তখন যেন আর আমার অসুখ থাকে না, সম্পূর্ণ সুস্থ, আনন্দে মন ভরে ওঠে, রোগশয্যা স্বপ্ন বলে মনে হয়। ছেলেবেলাকার সব জায়গাগুলেতে আবার গেলাম যেন, আটঘর বাড়িও বাদ গেল না। হঠাৎ ঘোর কেটে যায়, দেখি কুলদা ডাক্তার বুকে নল বসিয়ে পরীক্ষা করছে।
একবার মনে হ’ল দুপুর ঝাঁঝাঁ করছে, আমি দ্বারবাসিনীতে যাচ্ছি খুকীকে কোলে নিয়ে। দুর্গাপুরের ডাঙা পার হয়ে গেলাম, আবার সেই কাঁদোড় নদী, সেই তালবান, রাঙা মাটির পথ। মালতী বড় ঘরের দাওয়ায় বসে কি কাজ করছে। উদ্ধবদাস আমায় দেখে চিনলে, কাছে এসে বললে–বাবু যে–কি মনে করে এতদিন পরে? আপনার কোলে কে? মালতী কাজ ফেলে মুখ তুলে দেখতে গেল উদ্ধবদাস কার সঙ্গে কথাবার্তা কইছে। তারপর আমায় চিনতে পেরে অবাক ও আড়ষ্ট হয়ে সেইখানেই বসে রইল। আমি এগিয়ে দাওয়ার ধারে গিয়ে বললাম–তুমি কি ভাববে জানিনে মালতী, কিন্তু আমি বড় বিপদে পড়েই এসেছি। এই ছোট খুকী আমার দাদার মেয়ে, এর মা সম্প্রতি মারা গিয়েছে। একে বাঁচিয়ে রাখবার কোন ব্যবস্থা আমার মাথায় আসে নি। আর আমার কেউ নেই– একমাত্র তোমার কথাই মনে হল, তাই একে নিয়ে তোমার কাছে এসেছি। একে নাও, এর সব ভার আজ থেকে তোমার ওপর। তুমি ছাড়া আর কারও হাতে একে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারব না।
মালতী তাড়াতাড়ি খুকীকে আমার কোল থেকে তুলে নিলে। তার পর আমার রুক্ষ চুল ও উদভ্রান্ত চেহারার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। পরক্ষণেই সে দাওয়া থেকে নেমে এসে বললে–আপনি আসুন, উঠে এসে বসুন।
আখড়ায় আর যেন কেউ নেই। উদ্ধবদাসকেও আর দেখলাম না। শুধু মালতী আর আমি। ও ঠিক সেই রকমই আছে–সেই হাসি, সেই মুখ, সেই ঘাড় বাঁকিয়ে কথা বলার ভঙ্গি। হেসে বললে–তারপর?
আমি বললাম–তারপর আর কি? এই এলাম।
—এতদিন কোথায় ছিলেন?
—নানা দেশে। তারপর দাদা মারা গেলেন, আমার ওপরে ওদের সংসারের ভার।
—উঃ, কি নিষ্ঠুর আপনি! তারপর সে বললে–আপনি বসুন, খুকীর সম্বন্ধে একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে। একবার নীরদা-দিদিকে ডাকি।
আমি বললাম–আমি কিন্তু এখনই যাব মালতী। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ফেলে রেখে এসেছি পরের বাড়িতে। আমাকে যেতেই হবে।
মালতী আশ্চর্য হয়ে বললে–আজই?
আমি বললাম–আমার কাজ আমি শেষ করেছি, এখন তুমি যা করবে কর খুকীকে নিয়ে। আমি থেকে কি করব? আমি যাই।
মালতী স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বলল–আমায় নিয়ে যান তবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম–সে কি মালতী? তুমি যাবে আমার সঙ্গে? তোমার এই আখড়া?
মালতীর সঙ্গে যেদিন ছাড়াছাড়ি হয়েছিল, সেদিনটি যেমন ও চোখ নামিয়ে কথা বলেছিল–ঠিক তেমনই ভঙ্গিতে চোখ মাটির দিকে রেখে স্পষ্ট ও দৃঢ় সুরে বললে– আপনি আমায় নিয়ে চলুন সঙ্গে যেখানে আপনি যাবেন। এবার আপনাকে একলা যেতে দেব না।
একচল্লিশ দিনে জ্বর ছেড়ে গেল। সেরে উঠলে বৌদিদি একদিন বললেন–জ্বরের ঘোরে মালতী মালতী বলে ডাকতে কাকে, মালতী কে ঠাকুরপো?
আমি বললাম–ও একটি মেয়ে। বাদ দাও ও-কথা। রোজ বলতাম? কত দিন বলেছি?
এই অসুখ-বিসুখে মাসীমার দেওয়া সেই একশো টাকা তো গেলই, বৌদির গায়ের সামান্য যা দু-একখানা গহনা ছিল তা-ও গেল। নতুন চাকুরিটাও সঙ্গে সঙ্গে গেল।
এখান থেকে তিন ক্রোশ দূরে কামালপুর বলে একটা গ্রাম আছে। নিতান্ত পাড়াগাঁ এবং জঙ্গলে ভরা। সেখানকার দু-একজন জানাশোনা ভদ্রলোকের পরামর্শে সেখানে একটা পাঠশালা খুললাম। বৌদিদিদের আপাতত কালীগঞ্জে রেখে আমি চলে গেলাম কামালপুরে। একটা বাড়ির বাইরের ঘরে বাসা নিলাম–বাড়ির মালিক চাকুরির স্থানে থাকেন, বাড়িটাতে অনেকদিন কেউ ছিল না। বাড়ির পিছনে একটা আম-কাঁঠালের বাগান।
পাঠশালায় অনেক ছেলে জুটল–কতকগুলি ছোট মেয়েও এল। যা আয় হয়, সংসার একরকমে চলে যায়।
সময় বড় মনের দাগ মুছে দেবার মন্ত্র জানে। আবার নতুন মন, নতুন উৎসাহ পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে জীবনের একটা নতুন অধ্যায় কি রকমে শুরু হ’ল তাই এখানে বলব।
পাঠশালা খুলবার পরে প্রায় দু-বছর কেটে গিয়েছে। ভাদ্র মাস। বেশ শরতের রোদ ফুটেছে। বর্ষার মেঘ আকাশে আর দেখা যায় না। একদিন আমি পাঠশালায় গিয়েছি, একটা ছোট মেয়ে বলছে–মাস্টার মশায়, পেনো হিরণদিদির হাত আঁচড়ে কামড়ে নিয়েছে, ওই দেখুন ওর হাতে রক্ত পড়ছে।
যে মেয়েটির হাত আঁচড়ে নিয়েছে তার নাম হিরণ্ময়ী, বয়স হবে বছর চৌদ্দ, পাঠশালার কাছেই ওদের বাড়ি–কিন্তু মেয়েটি আমার পাঠশালায় ভর্তি হয়েছে বেশী দিন নয়। ওর বাবার নাম কালীনাথ গাঙ্গুলী, তিনি কোথাকার আবাদের নায়েব, সেইখানেই থাকেন, বাড়িতে খুব কমই আসেন।
আমি লক্ষ্য করেছি এই মেয়েটি সকলের চেয়ে সজীব, বুদ্ধিমতী, অত্যন্ত চঞ্চলা। সকলের চেয়ে সে বয়সে বড়, সকলের চেয়ে সভ্য ও শৌখীন। কিন্তু তার একটা দোষ, কেমন একটু উদ্ধত স্বভাবের মেয়ে।
একদিন কি একটা অঙ্ক ওকে দিলাম, সবাইকে দিলাম। ওর অঙ্কটা ভুল গেল। বললাম–তুমি অঙ্কটা ভুল করলে হিরণ?
অঙ্কটা ভুল গিয়েছে শুনে বোধ হয় ওর রাগ হল–আর দেখেছি সব সময়, অপর কারোর সামনে বকুনি খেলে ক্ষেপে ওঠে। খুব সম্ভব সেই জন্যই ও রাগের সুরে বললে–কোথায় ভুল? কিসের ভুল বলে দিন না?
আমি বললাম–কাছে এস, অতদূর থেকে কি দেখিয়ে দেওয়া যায়?
আমি দেখে আসছি যে কদিন ও এসেছে, আমার কাছ থেকে দূরে বসে।
ও উদ্ধতভাবে বললে–কেন, ওখান থেকেই বলুন না? আপনার কাছে কেন যাব?
আমার মনে হ’ল ও বড় মেয়ে বলে আমার কাছে আসতে বোধ হয় সঙ্কোচ অনুভব করে। কিন্তু তার জন্যে ওরকম উদ্ধত সুর কেন? বললাম–কাছে এসে আঁক দেখে নিতে দোষ আছে কিছু?
ও বললে–সে-সব কথার কি দরকার আছে? আপনি দিন অঙ্ক ওখান থেকেই বুঝিয়ে।
রাগে ও বিরক্তিতে আমার মন ভরে উঠল। আচ্ছা মেয়ে তো? মাস্টারদের সঙ্গে কথাবার্তার এই কি ধরন? আর আমায় যখন এত অবিশ্বাস তখন আমার স্কুলে না এলেই তো হয়? সেদিন আমি ওর সঙ্গে আর কোন কথাই বললাম না। পরদিনও তাই, স্কুলে এল, নিজে বসে বসে কি লিখলে বই দেখে, একটা কথাও কইলাম না। ছুটির কিছু আগে আমায় বললে–আমার ইংরেজিটা একবার ধরুন না?
আমি ওর পড়াটা নিয়ে তারপর শান্তভাবে বললাম–হিরণ, তোমার বাড়িতে বলো, আমি তোমাকে পড়াতে পারব না। অন্য ব্যবস্থা করতে বলো কাল থেকে।
হিরন্ময়ীর মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল, বললে–কেন?
আমি বললাম–না–তুমি বড় মেয়ে, এখানে তোমার সুবিধে হবে না।
ও বললে–রাগ করেছেন নাকি? কি করেছি আমি?
আমি বললাম–কাল তোমার ও-কথাটা কি আমায় বলা উচিত হয়েছে, হিরণ? কি বলে তুমি বললে, আপনার কাছে কেন যাব?…ওখান থেকেই বলুন না? তুমি আমার কাছে তবে পড়তে এসেছ কেন?
হিরন্ময়ী হেসে বললে–এই! তা কি এমন বলেছি আমি? তা যখন আপনি বলছেন দোষ হয়েছে বলাতে, তখন দোষ নিশ্চয়ই হয়েছে।
–কেন তুমি বললে ওরকম? তোমার দুঃখিত হওয়া উচিত ওকথা বলার জন্যে, তা জান?
হিরণয়ী বললে–হাঁ, হয়েছি। হল তো? এখন নিন।
তারপর যখন ওর অঙ্ক দেখছি, তখন হঠাৎ আমার মুখের দিকে কেমন একটা বুঝতে না পারার দৃষ্টিতে চেয়ে বললে–উঃ, আপনার এত রাগ?…আগে তো কখনও রাগ দেখি নি এরকম?…তখনও সে আমার মুখের দিকে সেইরকম দৃষ্টিতে চেয়ে কি যেন বুঝবার চেষ্টা করছে। ওর রকম-সকম দেখে আমি হাসি চাপতে পারলাম না–সঙ্গে সঙ্গে সেই মুহূর্তে হিরন্ময়ীকে নতুন চোখে দেখলাম। দেখলাম হিরন্ময়ী অত্যন্ত লাবণ্যময়ী, ওর চোখ দুটি অত্যন্ত ডাগর, টানা-টানা জোড়া ভুরু দুটি কালো সরু রেখার মত, কপালের গড়ন ভারী সুন্দর, চাঁচা, ছোট, অর্ধচন্দ্রাকৃতি। মাথায় একরাশ ঘন কালো চুল।
ও তখনও আমার দিকে সেই ভাবেই চেয়ে আছে। এক মিনিটের ব্যাপারও নয় সবটা মিলে।
পরদিন থেকে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, হিরন্ময়ী আমার কাছ থেকে তত দূরে আর বসে না–আর না ডাকলেও কাছে এসে দাঁড়ায়।
একদিন আমায় বললে–জানেন মাস্টার মশায়, আমার সব দল এরা–আমায় এরা ভয় করে।
অবাক হয়ে বললুম–কারা?
হাত দিয়ে পাঠশালার সব ছাত্রছাত্রীদের দেখিয়ে দিয়ে বললে-–এরা। আমার কথা না শুনে কেউ চলতে পারে না।
–ভয় করে কেন?
—এমনি করে। আমি যা বলব ওদের শুনতেই হবে।
পাঠশালার সকলেরই ওপর সে হুকুম ও প্রভুত্ব চালায়। এটা এতদিন আমার চোখে পড়ে নি–সেদিন থেকে সেটা লক্ষ্য করলাম। তবে পেনো যে সেদিন ওর হাত আঁচড়ে দিয়েছিল সে আলাদা কথা। দেশের রাজার বিরুদ্ধেও তো তাঁর প্রজারা বিদ্রোহী হয়।
রোজ রাত্রে বাসায় এসে সন্ধ্যাবেলা পরোটা গড়ি। দু-একদিন পরে সন্ধ্যাবেলা ময়দা মাখছি একা রান্নাঘরে বসে, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার বেশী নয়, একটা হ্যারিকেন-লণ্ঠন জ্বলছে ঘরে। কার পায়ের শব্দে মুখ তুলে দেখি ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে হিরন্ময়ী। শশব্যস্তে উঠে বিস্মিত মুখে বললাম–হিরণ! এস, এস, কি মনে করে?
হিরন্ময়ীর একটা স্বভাব গোড়া থেকে লক্ষ্য করেছি, কখনই প্রশ্নের ঠিক জবাবটি দেবে না। আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে বললে–ময়দা মাখেন বুঝি নিজে রোজ? এই বুঝি ময়দা মাখা হচ্ছে?
আমি বিপন্ন হয়ে পড়লুম–চোদ্দ বছরের মেয়েকে পাড়াগাঁয়ে বড়ই বলে। আমার কাছে এ রকম অবস্থায় আসাটা কি ঠিক হল ওর? এসব জায়গার গতিক আমি জানি তো।
বললাম–তুমি যাও হিরণ, পড় গে।
হিরন্ময়ী হেসে বললে–তাড়িয়ে দিচ্ছেন কেন? আমি যাব না–এই বসলাম।
বেজায় একগুঁয়ে মেয়ে, আমি তো জানি ওকে। বললে–একটা অঙ্ক কষে দেবেন? না-থাক, একটা গল্প বলুন না!…ও, আপনি বুঝি ময়দা মাখবেন এখন! সরুন, সরুন দিকি। আমি মেখে বেলে দিচ্ছি। কি হবে–রুটি, না লুচি?..আপনি এই পিঁড়িটাতে বসে শুধু গল্প করুন।
সেই থেকে হিরন্ময়ীর রোজ সন্ধ্যাবেলা আমাকে সাহায্য করতে আসা চাই-ই। মৃদু প্রদীপের আলোতে হাসি-হাসি মুখে সে তার খাতাখানা খুলে নামে অঙ্ক কষে–কাজে কিন্তু সে আমার রুটি-পরোটা তৈরী করে দেয়। কিছুতেই আমার বারণ শোনে না–ওর সঙ্গে পারব না বলে আমিও কিছু আর বলিনে। ওর মায়ের বারণও শোনে না, একদিন কথাটা আমার কানে গেল।
শুনলাম একদিন মাকে বলছে ওদের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে–কেন, যাই তাই কি? আমি অঙ্ক কষতে যাই। বেশ করি–যাও।
হিরন্ময়ীকে বললাম–শোন হিরণ, আমার এখানে সন্ধ্যাবেলা আর এস না, যখন তোমার মা বকেন। মার কথাটা অন্তত তোমার মানা উচিত। বুঝলে?
পরদিন হিরন্ময়ী সত্যিই আর এল না। আমার সন্ধ্যাটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। ওর না আসাতে, সেদিন প্রথম লক্ষ্য করলাম। সাত-আট দিন কেটে গেল–হিরন্ময়ী পাঠশালাতে রোজই আসে। তাকে জিজ্ঞাসা করি না অবিশ্যি কেন সে সন্ধ্যাবেলা আসে না।
একদিন সে পাঠশালাতেও এল না। দু-তিন দিন পরে জিজ্ঞেস করে জানলাম সে মামার বাড়ি গিয়েছে তার মায়ের সঙ্গে।
দেখে আশ্চর্য হলাম যে আমার পাঠশালা আর সে পাঠশালা নেই–আমার সন্ধ্যাও আর কাটে না। হিরণের বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে ওর মামার বাড়ি থেকে, মেয়ে দেখাতে নিয়ে গিয়েছে–বরপক্ষ ওখানে মেয়েকে আশীর্বাদ করবে।
মানুষের মন কি অদ্ভুত ধরনের বিচিত্র! হঠাৎ কথাটা শুনেই মনে হল ও গাঁয়ের পাঠশালা উঠিয়ে দেব, অন্যত্র চেষ্টা দেখতে হবে। কেন, যখন প্রথম পাঠশালা খুলেছিলাম এ গাঁয়ে, তখন তো হিরণের অপেক্ষায় এখানে আসি নি, তবে সে থাকলো বা গেল– আমার তাতে কি আসে যায়?
মাসখানেক কেটে গিয়েছে। আমি কলের মত কাজ করে যাই, একদিন সামান্য একটু বাদলা মত হয়েছে–পাঠশালার ছুটি দিয়ে সকাল-সকাল রান্না সেরে নেব বলে রান্নাঘরে ঢুকেছি, বেলা তখনও আছে। এমন সময় দোরের কাছে দেখি হিরন্ময়ী এসে হাসি-হাসি মুখে দাঁড়িয়েছে। আমি বিস্ময়মিশ্রিত খুশীর সুরে বলে উঠলাম–এস, এস হিরণ,-কখন এলে তুমি? বসো।
হিরন্ময়ী বললে–কেমন আছেন আপনি? তারপর সে এগিয়ে এসে সলজ্জ আড়ষ্টতার সঙ্গে ঝপ করে আমার পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করে আবার সোজা হয়ে দোরের কাছে দাঁড়ালো।
আমি এত খুশী হয়েছি তখন, ওকে কি বলবো ভেবে পাইনে যেন। বললাম–বসো হিরণ, দাঁড়িয়ে কেন?
হিরণ্ময়ী বোধ হয় একটু সঙ্কোচের সঙ্গেই এসেছিল, আমি ওর আসাটা কি চোখে দেখি–এ নিয়ে। আমার কথা শুনে হাজার হোক নিতান্ত ছেলেমানুষ তো–ও যেন ভরসা পেল। ঘরের মধ্যে ঢুকে একটা পিঁড়ি পেতে বসল। আমার মুখের দিকে চেয়ে বললে–কি সেই শিখিয়ে দিলেন, ‘নয় পরিত্যাগ-প্রণালী’ না কি? সব ভুলে গিয়েছি–হি হি–
দেখলাম ওর বিয়ে হয় নি।–ওকে আর কোন কথা বলি নি অবিশ্যি তা নিয়ে। দেনা পাওনার ব্যাপার নিয়ে সে-সম্বন্ধ ভেঙে গিয়েছে–দু-চার দিন পরে অপরের মুখে শুনলাম। আবার হিরন্ময়ী আমার পাঠশালাতে নিত্য আসে যায়–সন্ধ্যাবেলাতেও রোজ আসে–ঝড় হোক বৃষ্টি হোক, তার সন্ধ্যায় আসা কামাই যাবে না। কেন তার মা এবার তাকে বকেন না–সেকথা আমি জানি নে–তবে বকেন না যে, এটা আমি জানি।
বরং একদিন হিরন্ময়ী বললে–আজ আলো জ্বেলে একটা বই পড়ছি, মা বললে আজ যে তুই তোর মাস্টারের কাছে গেলিনে বড়? তাই এলুম মাস্টার মশায়।
আমি বললাম–তা বেশ তো, গল্পের বই পড়লেই পারতে। মা না বলে দিলে তো আজ আসতে না?
কথাটা বলতে গিয়ে নিজের অলক্ষিতে একটা অভিমানের সুর বার হয়ে গেল– হিরন্ময়ী সেটা বুঝতে পেরেছে অমনি। এমন বুদ্ধিমতী মেয়ে এইটুকু বয়সে! বললে– নিন, আর রাগ করে না। ভেবে দেখুন, আপনি না আমায় এখানে এলে তাড়িয়ে দিতেন আগে আগে?
দুঃখিত ভাবে বললাম–ছিঃ ও-কথা বলো না হিরণ, তাড়িয়ে আবার তোমায় দিয়েছি কবে? ও-কথাতে আমার মনে কষ্ট দেওয়া হয়।
হিরন্ময়ী মুখে কাপড় দিয়ে খিল খিল করে উচ্ছ্বসিত ছেলেমানুষি হাসির বন্যা এনে দিলে। ঘাড় দুলিয়ে দুলিয়ে বলতে লাগল–না–না দেন নি? বটে? একদিন–সেই– তাড়ালেন না! আজ আবার বলা হচ্ছে—-। পরে আমার সুরের নকল করতে চেষ্টা করে—‘ওতে আমার মনে কষ্ট দেওয়া হয়’–কি মানুষ আপনি!—হি-হি-হি-হি–
আমি মুগ্ধদৃষ্টিতে ওর হাসিতে উদ্ভাসিত সুকুমার লাবণ্যভরা মুখের দিকে চেয়ে রইলাম–চোখ আর ফেরাতে পারি নে–কি অপূর্ব হাসি! কি অপূর্ব চোখমুখের শ্রী!
যখন চোখ নামিয়ে নিলাম তখন সে আমার বেলুনটা তুলে নিয়ে রুটি বেলতে বসে গিয়েছে। সেদিন ও যখন চলে যায়, ঝোঁকের মাথায় অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই ওকে আবার বললাম–এ রকম আর এস না, হিরণ! না, সত্যি বলছি তুমি আর এস না।
মনকে খুব দৃঢ় করে নিয়ে কথাটা বলে ফেলেই ওর মুখের দিকে চেয়ে আমার বুকের মধ্যে যেন একটা তীক্ষ্ণ তীর খচ করে বিঁধলো। দেখলাম ও বুঝতে পারে নি আমি কেন একথা বলছি–কি বোধ হয় দোষ করে ফেলেছে ভেবে ওর মুখ বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে উদ্বেগ ও ভয়ে।
আমার মুখের দিকে একটুখানি চেয়ে রইল–যদি মুখের ভাবে কারণ কিছু বুঝতে পারে। না বুঝতে পেরে যাবার সময় দেখলাম শুষ্ক বিবর্ণ মুখে বললে–আমায় তাড়িয়ে দিলেন তো, এই দেখুন–তাড়ালেন কি না।
দুঃখে আমার বুক ফেটে যেতে লাগল। নিমগাছটার তলা দিয়ে ও ওই যাচ্ছে, এখনও বেশী দূর যায় নি, ডেকে দুটো মিষ্টি কথা বলব? ছেলেমানুষকে একটু সান্ত্বনা দেব?
ডাকলুম শেষটা না পেরে।–শোনো ও হিরণ-শোনো–
ও দাঁড়াল না–শুনেও শুনল না। হন হন করে হেঁটে বাড়ি চলে গেল। পরদিন খুব সকালে উঠে বারান্দাতে বসে ব্রাউনিঙের A Soul’s Tragedy পড়ছি–হিরণ এসে দাঁড়িয়ে বললে–কি খাচ্ছেন?
–এস এস হিরণ। কাল তোমাকে ডাকলাম রাত্রে, এলে না কেন? তুমি বড় একগুঁয়ে মেয়ে–একবার শোনা উচিত ছিল না কি বলছি?
মুখরা বালিকা এবার নিজমূর্তি ধরলে। বললে–আমি কি কুকুর নাকি, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবেন, আবার তু করে ডাকলেই ছুটে আসব? আপনি বুঝি মনে ভাবেন আমার শরীরে ঘেন্না নেই, অপমান নেই–না? আমি বলতে এলাম সকালবেলা যে আপনার পাঠশালায় আমি পড়তে আসব না।—মা অনেক দিন আগেই বারণ করেছিল–তবুও আসতাম, তাদের কথা না শুনে। কিন্তু যখন আপনি কুকুর-শেয়ালের মত দূর করে তাড়িয়ে—
ওর চোখে জল ছাপিয়ে এসেছে–অথচ কি তেজ ও দৰ্পের সঙ্গে কথাগুলো সে বললে! আমি বাধা দিয়ে বললাম–আমায় ভুল বুঝো না, ছিঃ হিরণ–আচ্ছা, চেঁচিও না বেশী, কেউ শুনলে কি ভাববে। আমরা কথা শোন–রাগ করে না ছিঃ!
হিরণ দাঁড়াল না এক মুহূর্তও। অতটুকু মেয়ের রাগ দেখে যেমন কৌতুক হল, মনে তেমনই অত্যন্ত কষ্টও হল। কেন মিথ্যে ওর মনে কষ্ট দিয়েছি কাল? আহা, বেচারী বড় দুঃখ ও আঘাত পেয়েছে। আমার জ্ঞান আর হবে কবে? ছেলেমানুষকে ও-কথাটা ওভাবে বলা আমার আদৌ উচিত হয় নি।
মন অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেল–ভাবলাম, এ গ্রামের পাঠশালা তুলে দিয়ে অন্যত্র যাবই। এদিকে হিরন্ময়ীও আর আমার পাঠশালাতে আসে না। মাসের বাকি আটটা দিন পড়িয়ে নিয়ে পাঠশালা তুলে দেব ঠিক করে ফেললাম। সবাইকে বলেও রাখলাম কথাটা। আগে থেকে যাতে সবাই অন্য ব্যবস্থা করে নিতে পারে।
যাবার দু-দিন আগে জিনিসপত্র গোছাচ্ছি–হঠাৎ হিরণয়ী নিঃশব্দে ঘরের মধ্যে এসে কখন দাঁড়িয়েছে। মুখ তুলে ওর দিকে চাইতেই হেসে ফেললে। বললে–আপনি নাকি চলে যাবেন এখান থেকে?
আমি বললাম–যাবই তো। তার পর, এত দিন পরে কি মনে করে?
হিরন্ময়ী তার অভ্যাসমত আমার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে বললে–কবে যাবেন?
—বুধবার বিকেলে গাড়ি ঠিক করা আছে, চাকদাতে গিয়ে উঠবো।
হিরন্ময়ী একবার ঘরের চারিধারে চেয়ে দেখল। বললে–আপনার সে বড় বাক্সটা কই?
–সেটা কানুর বাবার কাছে বিক্রী করে দিয়েছি। অত বড় বাক্স কি হবে? তা ছাড়া সঙ্গে টেনে টেনে নিয়ে বেড়ানোও মুশকিল।
হঠাৎ হিরন্ময়ী ঝপ ক’রে মেঝেতে বসে পড়ল–কর্তৃত্ব ও আত্মপ্রত্যয়ের সুরে বললে–না, আপনি যেতে পারবেন না। দেখি দিকি কেমন যান?
আমার হাসি পেল ওর রকম দেখে। খুব আনন্দও হল–একটা অদ্ভুত ধরনের আনন্দ হল। বললাম–তোমার তাতে কি, আমি যাই আর না-যাই? তুমি তো আর এতদিন উঁকি মেরেও দেখতে আস নি হিরণ, তুমি আমার পাঠশালা পর্যন্ত যাওয়া ছেড়েছ।
–ইস! তাই বৈ কি?
—তুমি ভেবে দেখ তাই কি না। উড়িয়ে দিলে চলবে না হিরণ, আমি যাবই ঠিক করেছি, তুমি আমায় আটকাতে পারবে না। কারুর জন্যে কারুর আটকায় না–এ তুমি নিজেই আমায় একদিন বলেছিলে।
হিরন্ময়ী বালিকাসুলভ হাসিতে ঘর ভরিয়ে ফেলে বললে–ওই! কথা যদি একবার শুরু করে দিলেন তো কি আর আপনার মুখের বিরাম আছে? কারুর জন্যে কারুর আটকায় না, হেন না তেন না–মাগো–কথার ঝুড়ি একেবারে!।
–সে যাই হোক, আমি যাবই।
—কখখনো না। উঃ, বললেই হল যাব!
আমি চুপ করে রইলাম–ছেলেমানুষের সঙ্গে তর্ক করে আর লাভ কি?
দেখি যে বিকেলে পাঠশালায় হিরন্ময়ী বইখাতা নিয়ে হাজির হয়েছে। সে এসে সব ছেলেমেয়েকে বলে দিলে আমার পাঠশালা উঠবে না, আমি কোথাও যাব না, সবাই যেন ঠিকমত আসে। এমন সুরে বললে যে সে যেন আমার দণ্ডমুণ্ডের মালিক। বললে–এই হাঁদু, মাস্টার মশায় তোমায় বলেছিলেন না ধারাপাত আনতে–কেন আন নি ধারাপাত? এই সোমবারের হাট থেকে আনতে বলে দেবে। বুঝলে?
হাঁদু বোকার মত দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে বললে–মাস্টারমশাই যে সোমবারে চলে যাবেন এখান থেকে?
হিরন্ময়ী তাকে এক তাড়া দিয়ে বললে–কে বলেছে চলে যাবেন? মেরে হাড় ভেঙে দেব ছোঁড়ার! যা যা বলছি তা শোন। বাঁদর কোথাকার–
আমি বললাম–কেন ওকে মিথ্যে বকছ হিরণ, ছেলেমানুষকে–ওর দোষ কি, আমি যাবই, কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না।
হিরন্ময়ী ঝঙ্কার দিয়ে বললে–আচ্ছা আচ্ছা হবে। যাবেন তো যাবেন।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা অনেকদিন পরে ও রান্নাঘরে এসে ঢুকল। বললে–গুড়ের ভাঁড়টা কই!
–সেটা তিনকড়িদের দিয়ে দিইছি। দু-দিনের মত খানিকটা গুড় ওই বাটিতে রেখেছি–দুটো দিন ওতেই চলে যাবে।
হিরন্ময়ী অন্য দিনের মত বসল না দাঁড়িয়ে রইল। একবার বাইরে যাবার সময় ও সরে দরজার কপাটের আর দেওয়ালের মধ্যের যে জায়গাটুকু, সেখানটাতে দেখি জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলতে গেলাম–ওখানে না, ওখানে না,–কাপড়ে কালিটালি লেগে যাবে কি না–বার হয়ে এস–
ওর মুখের দিকে চেয়ে দেখি ওর ডাগর চোখ দুটি জলে ভরে টল টল করছে।
হিরন্ময়ীর চোখে জল! অবাক, এ দৃশ্য তো কখনও দেখি নি! ও জল-ভরা ধরা-গলায় বললে–আপনি বলুন, যাবেন না মাস্টার মশায়। আমি তখন পাঠশালায় বলতে পারলাম না ওদের সামনে। ওরা হাসবে তাহলে। আর কেউ নয়–আর সবাই আমায় ভয় করে, কেবল ওই মন্টুটা বড় দুষ্টু!
তারপর আমার দিকে চোখের জল আর হাসি মিশানো এক অপূর্ব দৃষ্টিতে চেয়ে বললে–যাবেন না, কেমন?
হিরন্ময়ী এই প্রথম দুর্বলতা প্রকাশ করলে–এর আগে কখনও দেখি নি। ছেলেমানুষ, ও কথা তো তেমন জানে না, কিন্তু ওর ডাগর সজল চোখের মিনতিপূর্ণ দৃষ্টি ওর ভাষার দৈন্য ঘুচিয়ে দিয়ে এমন কিছু প্রকাশ করলে–এক জাহাজ কথাতে তা প্রকাশ করা যেত না।
আমার মনে অনুতাপ হল–কেন ওকে মিথ্যে কাঁদালাম সন্ধ্যাবেলাটিতে?
জীবনের এই-সব মুহূর্তেই না মানুষে ভগবানকে প্রত্যক্ষ করে? ব্রাউনিঙের ‘পলিন’ কবিতার সেই সর্বহারা লোকটির মত আমার মনও ভরে উঠল— I believe in God and Truth and Love!…
ওর হাতটি ধরে দরজার কপাটের ফাঁক থেকে বার করে এনে আস্তে আস্তে পিঁড়ির ওপর বসিয়ে দিয়ে বললাম–ওখানে সন্ধ্যাবেলা দাঁড়াতে নেই। বিছেটিছে বেরুতে পারে-এখানে বোস। রুটিগুলো বেলে দাও দিকি, লক্ষ্মী মেয়ে। আমি যাব না–বলছ তুমি যখন, তখন আর যাব না। চোখের জল ফেলতে আছে অবেলায়? ছিঃ–
তার পরই রুটি তৈরি করতে বসে যে হিরন্ময়ী সেই হিরন্ময়ী–সেই মুখরা বালিকা, যে সকল কথা এমন কর্তৃত্বের সুরে বলে যেন ওর কথা না মেনে চললে ও ভয়ঙ্কর একটা কিছু শাস্তির ব্যবস্থা করবে, সেটা আবার খুব কৌতুকপ্রদ এবং ভেবে দেখলে করুণ বলেই মনে হয়, যখন বুঝতে পারা যাচ্ছে যে মুখের বুলিটুকু ছাড়া ওর হুকুমের পেছনে ওর কোন জোর খাটাবার নেই–নিতান্ত অসহায় ও নিরুপায়।
প্রেম আসে এই সব সামান্য তুচ্ছ খুঁটিনাটি সূত্র ধরে। বড় বড় ঘটনাকে এড়ানো সহজ, কিন্তু এই সব ছোট জিনিস প্রাণে গেঁথে থাকে–ফলুই মাছের সরু চুল-চুল কাঁটার মত। গায়ের জোরে সে কাঁটা তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে গেলে, বিপদের সম্ভাবনা বাড়ে বৈ কমে না।
পুরুষমানুষ প্রেমের ব্যাপারে আত্মরক্ষা করে চলতে পারে না যেটা অনেক সময়ে মেয়েরা পারে। যেখানে যা হবার নয়, পাবার নয়, সেখানেও তারা বোকার মত ধরা দিয়ে বসে থাকে–এবং নাকাল তার জন্যে যথেষ্ট হয়। কিন্তু পুরুষমানুষই আবার বেগতিক বুঝলে যত সত্বর হাবুডুবু খেতে খেতেও সাঁতরে তীরের কাছে আসতে পারে–মেয়েরা গভীর জলে একবার গিয়ে পড়লে অত সহজে নিজেদের সামলে নিতে পারে না।
তবুও আমি হিরন্ময়ীকে দূরে রাখবার চেষ্টাই করলাম।
একদিন দুপুরের পরে হিরন্ময়ীদের বাড়িতে পুলিস এসেছে শুনলাম। পুলিশ কিসের? একে ওকে জিজ্ঞেস করি কেউ সঠিক উত্তর দেয় না অথচ মনে হ’ল ব্যাপারটা সবাই জানে। এগিয়ে গেলুম–ওদের বাড়ির সামনের তেঁতুলতলায় বড় দারোগা চেয়ার পেতে ব’সে–পাড়ার লোকদের সাক্ষ্য নেওয়া চলেছে। দেখলাম গ্রামে ওদের মিত্র বড় কেউ নেই। আমি আগেও যে একথা না জানতাম এমন নয়–তবে পাড়াগাঁয়ের কানাঘুষোতে কান দিই নি।
বিকেলের দিকে হিরন্ময়ীর মা আর বিধবা দিদিকে থানায় ধরে নিয়ে গেল। কাছারির মুহুরী সাতকড়ি মুখুয্যে আমার কাছেই দাঁড়িয়েছিল। সে বলতে–ও মেয়েটার তত দোষ দিই নে–মা-ই যত নষ্টের গুরুমশাই। ওই তো ওকে শিখিয়েছে। নইলে মেয়েটার সাধ্যি কি,–কিন্তু মাগী কি ডাকাত! মেয়েটার প্রাণের আশঙ্কা করলি নে একবারও?
ব্যাপারটা বুঝতে আমার দেরি হল না। সাতকড়ি আরও বলল–কালীনাথ গাঙ্গুলী কি গ্রাম ত্যাগ করেছে সাধে? এইজন্যেই সে বাড়িমুখো হয় না, ওদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখে না।
এত কথা আমি কিন্তু জানতাম না–এই নতুন শুনলাম। আমি মুশকিলে পড়ে গেলাম–আমি এখন কি করি? হিরন্ময়ীর মা আর দিদি দোষী কি দোষী নয়–সে বিচারের ভার আছে অন্য বিচারকের ওপর–সাতকড়ি মুখুয্যের ওপর নয়। কিন্তু এদের মোকদ্দমা উঠলে উকীল নিযুক্ত কে ক’রে, এদের স্বার্থ বা কে দেখে, এদের জন্যে পয়সা খরচই বা কে করে?
এদিকে আর এক মুশকিল। ওর মা আর দিদিকে যখন ধরে নিয়ে গেল, হিরন্ময়ী তখন ওদের বাড়ির সামনে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে। সামনে অন্ধকার রাত, সেরাত্রে সে একাই বা বাড়িতে থাকে কেমন করে, বাড়িতে আর যখন কেউই নেই–অথচ সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ তাকে নিজের বাড়িতে ডাকলে না। সন্ধ্যার সময় ও-পাড়ার কৈলাস মজুমদারের স্ত্রী এসে ওকে ও-অবস্থায় দেখে বললেন–ওমা, এ মেয়েটা এখানে একা দাঁড়িয়ে আছে যে! ছেলেমানুষ, বাড়িতে একা থাকবেই বা কি করে? ওর মা দিদি কি করেছে জানি নে– কিন্তু ওকে আমি চিনি। ও পাগলী, আনন্দময়ী। এস ত মা হিরণ, তোমাদের হারিকেনটা বাড়ির ভিতর থেকে নিয়ে ঘরে চাবি দিয়ে এস। ওকে জায়গা দিলে যদি জাত না থাকে–তবে না থাকল তেমন জাত!
মজুমদার-গিন্নী যদি কোন কথা না বলে নিঃশব্দে হিরন্ময়ীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতেন তবে হয়ত কোনই গোলযোগ বাধতো না–কিন্তু শেষের কথাটি বলে ফেলে তিনি নিতান্ত নির্বোধের মত কাজ করে বসলেন। কাছেই গ্রামের সমাজপতি আচার্যি-মশায়ের বাড়ি। তাদের সঙ্গে বাধলো তুমুল ঝগড়া। শশধর আচার্যের স্ত্রী অনেকক্ষণ নিজের মনে একতরফা গেয়ে যাবার পর উপসংহারে বললেন–ও বড় ভাল মেয়ে–না? মুখ খুললেই অনেক কথা বেরিয়ে পড়বে। সব জানি, সব বুঝি। চুপ করে থাকি মুখ বুজে–বলি মাথার ওপর একজন আছেন, তিনিই দেখবেন সব–আমি কেন বলতে যাই?
মজুমদার-গিন্নী বললেন–যা কর ন-বৌ, আবার এ মেয়েটার নামে কেন যা তা বলছ? সেটাই কি ভগবান সইবেন?
আচার্যি-মশায়ের স্ত্রী বারুদের মত জ্বলে উঠলেন–আরও দ্বিগুণ চেঁচিয়ে বললেন–ধর্ম দেখিও না বলে দিচ্ছি, ভাল হবে না। ওই রয়েছে মুখুয্যেরা, ভটচায্যিরা, জিজ্ঞেস কর গিয়ে। ওই মেয়ে ওই পাঠশালার মাস্টার-ছোকরার কাছে রাত বারোটা অবধি কাটিয়ে আসে–রোজ তিনশ তিরিশ দিন। সারারাত্তিরও থাকে এক এক দিন। বলুক ও মেয়েই বলুক, সত্যি না মিথ্যে। ভেবেছিলুম কিছু বলব না–মরুক গে, যার আঁস্তাকুড়, সেই গিয়ে ঘাঁটুক, না বলে পারলাম না। কে ও মেয়েকে ঘরে জায়গা দিয়ে কালকে আবার একটা হাঙ্গামা বাধাতে যাবে?
আমি এতক্ষণ চুপ করে ছিলুম, কথা বলি নি–কোন পুরুষমানুষ উপস্থিত ছিল না বলে। চেঁচামেচি শুনে আচার্য-মশায়, সাতকড়ি ও সনাতন রায় ঘটনাস্থলে এসে দাঁড়াতেই আমি এগিয়ে গিয়ে বললুম–আপনারা আমার মায়ের মত–আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ, হিরণকে এ ঝগড়ার মধ্যে মিথ্যে আনবেন না। ও আমার ছাত্রী, ছেলেমানুষ, আমার কাছে যায় সন্ধ্যেবেলা গল্প শুনতে–কোনোদিন পড়েও। রাত নটা বাজতেই চলে আসে। একটা নিষ্পাপ নিরপরাধ মেয়ের নাম এ-সবের সঙ্গে না জড়ানোই ভাল। মা আপনি ওকে বাড়িতে নিয়ে যান।
এতে ফল হ’ল উলটো। ঝগড়া না থেমে বরং বেড়ে উঠল। মজুমদার মশায়ের দুই ছেলে ও ছোট ভাই এসে মজুমদার-গিন্নীকে বকাবকি করতে লাগল–তিনি কেন ওপাড়া থেকে এসে এই-সব ছেঁড়া ল্যাটার মধ্যে নিজেকে জড়াতে যান? এ বয়সেও তাঁর জ্ঞান যদি না হয় তবে আর কবে হবে…তিনি চলে আসুন বাড়ি। এ-পাড়ার ব্যবস্থা এ-পাড়ার লোকে বুঝবে, তিনি কেন মাথাব্যথা করতে যান ইত্যাদি।
যাকে নিয়ে এত গোলমাল, সে ভয়ে ও লজ্জায় কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েই আছে ওদের বাড়ির সদর দরজায়। ওর চোখে একটা দিশেহারা ভাব, লজ্জার চেয়ে চোখের চাউনিতে ভয়ের চিহ্নই বেশী। ওর সেই কথাটা মনে পড়ল–জানেন মাস্টার মশায়, আমায় সবাই ভয় করে, সবাই মানে এ পাড়ায়–আমার সঙ্গে লাগতে এলে দেখিয়ে দেব না মজা?
বেচারী মুখরা হিরন্ময়ী!
শেষ পর্যন্ত কৈলাস মজুমদারের স্ত্রী ওকে না নিয়েই চলে গেলেন। তাঁর দেওর ও ছেলেরা একরকম জোর করেই তাঁকে সরিয়ে নিয়ে গেল।
আমি তখন এগিয়ে গিয়ে বললুম–হিরণ, তুমি কিছু ভেবো না। আমি এতক্ষণ দেখছিলাম এরা কি করে। যে ভয়ে তোমাকে ডাকতে পারি নি, সে ভয় আমার কেটে গিয়েছে। তুমি একটু একলা থাক–আমি কাওরাপাড়া থেকে মোহিনী কাওরাণীকে ডেকে আনছি। সে তোমার ঘরের বারান্দাতে শোবে রাত্রে। তাহলে তোমার রাত্রে একা থাকবার সমস্যা মিটে গেল। আর এক কথা–তুমি রান্না চড়িয়ে দাও চাল-ডাল সব আছে তো?
কাওড়াপাড়া থেকে ফিরে আসতে আধ ঘণ্টার বেশী লাগল। মোহিনী বুড়ীকে চার আনা পয়সা দিয়ে রাত্রে হিরণদের বাড়িতে শোবার জন্য রাজী করিয়ে এলুম। ফিরে এসে দেখি দালানের চৌকাঠে বসে হিরন্ময়ী হাপুস নয়নে কাঁদছে। অনেক করে বোঝালুম। বড় কষ্ট হল ওকে এ অবস্থায় দেখে। বললে–মার আর দিদির কি হবে মাস্টার মশায়? আপনি কালই বাবাকে একটা চিঠি লিখে দিন। ওদের ফাঁসি হবে না তো?
হেসে সান্ত্বনা দিলাম। বললাম- রাঁধ হিরণ। খাওয়াদাওয়া কর। কিছু ভেবো না– আমি কাল রাণাঘাট যাব। ভাল উকীল দিয়ে জামিনে খালাস করে নিয়ে আসবার চেষ্টা করব, ভয় কি?
হিরণ কিছুতেই রাঁধতে চায় না–শেষে বললে–আপনিও এখানে খাবেন কিন্তু। ঠিক তো?
ও রাঁধছে ব’সে, আমাকে রান্নাঘরেই বসে থাকতে হল–ও যেতে দেয় না, ছেলেমানুষ, ভয় করে। কেবল জিজ্ঞেস করে, মা আর দিদির কি হবে!
রান্না হয়ে গেল, ঠাঁই করে আমায় ভাত বেড়ে দিল। এদিকে হিরণ বড় অগোছালো, কুটনো-বাটনা, এঁটো-কাঁটা, ভাতের ফেন, আনাজের খোসাতে রান্নাঘর এমন নোংরা করে তুলেছে! ভাত বাড়তে গিয়ে উনুনের পাড়ে আঁচল লুটিয়ে পড়েছে–নিতান্ত আনাড়ি।
বললাম–দিনমানে কোনরকমে একা থেকো। আমি সন্ধ্যের আগেই রাণাঘাট থেকে ফিরবো। রেঁধে খেও কিন্তু। না হলে বড় রাগ করব।
মোহিনী কাওরাণী এল রাত ন’টার পরে। তার পরে আমি আমার বাসায় চলে এলুম। পরদিন রাণাঘাটে গিয়ে দেখি কেস ওঠে নি আদালতে। উকীল ঠিক করে তার সঙ্গে জামিনের কথাবার্তা বলে এলুম। ফিরবার সময় হিরন্ময়ীর জন্যে দু-একটা জিনিস কিনে নিলুম ওকে একটু আনন্দ দেবার জন্যে। ফিরে দেখি ও ব’সে ব’সে আবার কাঁদছে কালকের মত। সারাদিন বোধ হয় রাঁধে নি, কিছু খায় নি। স্নানও করে নি, দু-এক গাছা রুক্ষ চুল মুখের আশেপাশে উড়ছে। মহা বিপদে পড়ে গেলুম ওকে নিয়ে। কি করি এখন? ওর বাবাকে আজ রাণাঘাটে পৌঁছেই টেলিগ্রাম করেছি, যদি তা পেয়ে থাকেন, তবে কাল তিনি এসে পৌঁছলেও তো বাঁচি। নইলে হিরন্ময়ীকে ভাবছি কালীগঞ্জে বৌদিদির কাছে রেখে আসব। কারণ, এসে শুনলুম মোহিনী বুড়ী ব’লে গিয়েছে সে রাত্রে এখানে আর শুতে আসতে পারবে না।
ও আমায় দেখেই ছুটে এসে বললে–মাকে দিদিকে দেখে এলেন মাস্টারমশাই? তারা কেমন আছে? খালাস পেলে না?
আমি ওদের নিজে দেখতে যাই নি, উকীলের মুখে হিরন্ময়ীর সংবাদ পাঠিয়ে বলেছিলুম হিরন্ময়ীর জন্যে যেন তারা কিছু না ভাবে। বললাম সেকথা।
তার পর হিরন্ময়ী আমাকে বালতি ক’রে জল তুলে দিলে স্নানের জন্যে–ঘরে প্রদীপ জ্বেলে উনুন ধরিয়ে চায়ের জল চড়ালে। রাণাঘাট থেকে ওর জন্যে কিছু খাবার এনেছিলুম, তার বেশী অর্ধেক আমায় রেকাবিতে ক’রে চায়ের সঙ্গে জোর করে খাওয়ালে–তার পর রান্না চাপিয়ে দিলে। ওর মনে সুখ নেই, কেমন যেন মুষড়ে পড়েছে, ছেলেমানুষ, নইলে ওর মত হাস্যময়ী আনন্দময়ী চঞ্চলা মেয়ে এতক্ষণ কত কথা বলত, হাসি-খুশীতে ঘর ভরিয়ে তুলত।
একবার জিজ্ঞেস করলে–রাণাঘাটে নাকি সার্কাস এসেছে সবাই বলে? দেখেছেন আপনি? এত দুঃখের মধ্যেও ওর ছেলেমানুষি মন সার্কাসের সম্বন্ধে কৌতূহলী না হয়ে পারে নি ভেবে আমার হাসি পেল।
এ রাত্রে মোহিনী বুড়ী এল না–আমি ওকে ঘরের মধ্যে রেখে বাইরের বারান্দাতে শুয়ে রইলাম। বারান্দায় বিছানা পাতছি, ও আবার এত সরলা, নিষ্কলুষ–আমায় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে, আপনি বাইরে শোবেন কেন?
কোন নীতিবাদের সঙ্কোচ এনে ফেলে ওর নিষ্পাপ মনে দাগ দিতে আমার বাধল। বললাম–দেখছ না কি রকম গরম আজ? বাইরে শোওয়াই আমার অভ্যেস, তা ছাড়া–
সারারাত দু-জনে গল্প করে কাটালুম। ও ঘর থেকে কথা বলে, আমি বারান্দা থেকে তার উত্তর দিই।–বাবা বোধ হয় কাল আসবেন, না? মা, দিদি কবে আসবে? সার্কাসওয়ালা কোথায় তাঁবু ফেলেছে? কলকাতায় কখনও যাই নি–একবার যাবার ইচ্ছে আচ্ছে। কলকাতার থিয়েটার দেখতে কেমন? চৌধুরীরা বোধ হয় মোহিনী বুড়ীকে বারণ করে দিয়েছে এখানে আসতে। আমার শীত করছে কিনা। রাত বেশী, ঠাণ্ডা পড়েছে, গায়ে দেবার একটা মোটা চাদর দেবো? আরব্য-উপন্যাসের মত গল্প আর নেই। আচ্ছা, অঙ্ক কতদূর শেখা যায়? বিদ্যার শেষ নেই–না? এম-এ পাস করে আরও পড়া যায়, পড়বার আছে?
ওর বাবা এলেন পরদিন সকাল দশটার সময়। তাঁর মুখে শুনলুম পুলিস থেকে তাঁকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে শীঘ্র বাড়ি এসে মেয়ের ভার নিতে। তিনি অত্যন্ত বদমেজাজী লোক, দু-একটা কথা শুনেই বুঝতে দেরি হ’ল না। আমার ওপর আদৌ তিনি প্রসন্ন হতে পারলেন না–তাঁর মেয়ের তত্বাবধান করার জন্যে একটা ধন্যবাদ দেওয়া তো দূরের কথা, সেটাকেই তিনি আমার একটা অপরাধ বলে গণ্য করে নিলেন এবং যে মুখুয্যে ও চৌধুরীরা পরশু সন্ধ্যেবেলা হিরন্ময়ীকে বাড়িতে জায়গা দিতে চায় নি, তাদেরই বাড়িতে খোশামোদ করে তাদের সঙ্গে এ বিপদে পরামর্শ চাইতে গেলেন।
আরও একটা ব্যাপার দেখলুম, তিনি হিরন্ময়ীকে আদৌ দেখতে পারে না। আমার সামনেই তো তাকে তাড়না, তর্জন-গর্জন যথেষ্ট করলেন এ নিয়ে যে সে রাত্রে চৌধুরী গিন্নীর পায়ে পড়ে কেন অনুরোধ করে নি তাকে জায়গা দেবার জন্যে। কারণ, তারা দেখলুম লাগিয়েছে যে তাদের কি আর ইচ্ছে ছিল না ওকে জায়গা দেবার? ও মেয়ের তা ইচ্ছে নয়। হিরণের অপরাধ সে মুখ ফুটে কারও কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে নি। এ ওরা কেউ বুঝল না যে হিরণের বয়সের মেয়েরা মুখে কোন নাটুকে-ধরনের কথা বলে আশ্রয় চাইতে পারে না পরের কাছে–বিশেষ করে হিরন্ময়ীর মত একটু তেজী মেয়েরা।
আমি হিরন্ময়ীর ভার থেকে মুক্ত হয়ে কালীগঞ্জে চলে এলুম পরদিনই সকালেই। শুনেচিলুম হিরন্ময়ীর মা ও দিদি রাণাঘাট থেকে প্রমাণাভাবে খালাস পেয়ে এসেছেন।
কালীগঞ্জে এসে বসলুম বটে, কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলুম, মনের কি অদ্ভুত পরিবর্তন হয়েছে। হিরণ্ময়ীর সেই শুকনো মুখখানা কেবলই মনে পড়ে, সেদিন সন্ধ্যার সময় ওর যে মুখ দেখেছিলাম, যেদিন ওর মাকে আর দিদিকে থানায় নিয়ে গেল। হিরণ্ময়ীর ব্যথা,…হিরণ্ময়ীর দুঃখ,…ওই রকম বাড়িতে, ওই গাঁয়ের আবহাওয়ায় হিরন্ময়ীর মত মেয়ে শুকিয়ে ঝরে পড়বে। কে-ই বা দেখবে, বুঝবে ওকে? একদিন মালতীর সম্বন্ধেও ঠিক এই কথাই ভাবতুম। কত ভেবেছি। এখন বুঝি কি দুর্জয় অভিমান করেই চলে এসেছিলাম ওর কাছ থেকে কিছুতেই সে অভিমান ভাঙলো না। তার পর দাদা মারা গেলেন, দাদার সংসার পড়ল ঘাড়ে, নইলে হয়ত আবার এতদিনে ফিরে যেতাম। কিন্তু বৌদিদিদের নিয়ে তো দ্বারবাসিনীর আখড়াতে গিয়ে উঠতে পারি নে? একসময় যার ভাবনায় কত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছিলে বটেশ্বরনাথ পাহাড়ে, সেই মালতী এখন আমার মনে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে–হয়ে এসেছে। আর তো তাকে চোখে দেখলুম না? ক্রমে তাই দূরে গিয়ে পড়ল। কি করব, মনের ওপর জোর নেই–নইলে আমি কি বুঝতে পারি নে কত বড় ট্র্যাজেডি এটা মানুষের জীবনের? শ্রীরামপুরের ছোট-বৌঠাকরুণ আজ কোথায়? কে বলবে কেন এমন হয়!
