দম্পতি (উপন্যাস) – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
তিন
লালবিহারী সা রোডে ছোট্ট দোতলা বাড়ি। চারখানা ঘর, এ-বাদে রান্নাঘর ও ভাঁড়ার ঘর আছে।
গদাধর স্ত্রীকে বলিলেন–বাড়ি কেমন হয়েচে?
–ভালোই তো। কত টাকায় হলো?
-সাড়ে দশ হাজার টাকা। বন্ধক ছিল–খালাস করতে আরও দু’হাজার লেগেছে।
–এত টাকা বাড়ির পেছনে এখন খরচ না করলেই পারতে।
–কিন্তু কলকাতায় বাড়ি…একটা সম্পত্তি হয়ে রইলো, তা ভুলে যেও না।
–আমি মেয়েমানুষ কি বুঝি, বলো? তুমি যা বোঝো, তাই ভালো।
গদাধরের আড়তের কাজও এখনো ভালো চলে নাই।
ভড় মহাশয় পুরানো লোক, তিনি একদিন বলিলেন–এখানে কাজ দাঁড়াবে ভালো বাবু।
ভড় মহাশয়কে গদাধর বিশ্বাস করিতেন খুব বেশি, তাঁর কথার উপর নির্ভর করিতেছে অনেকখানি। উৎফুল্ল হইয়া বলিলেন– দাঁড়াবে বলে আপনার মনে হয় ভড়মশায়?
–আমার কথাটা ধরেই রাখুন বাবু–চুল পাকিয়ে ফেললাম এই কাজ করে। মুখপাতেই জিনিস বোঝা যায়, মুখপাত দেখা দিয়েচে ভালো।
–আপনি বললে অনেকটা ভরসা পাই।
–আমি আপনাকে বাজে-কথা বলবো না বাবু।
কলিকাতায় আসিয়া অনঙ্গ খুব আনন্দে দিনকতক কালীঘাট ইত্যাদি দেখিয়া কাটাইল। দক্ষিণেশ্বরে দু’দিন মন্দির দর্শন ও গঙ্গাস্নান করিল–দূর-সম্পর্কের কে এক পিসতুতো ভাই ছিল এখানে, তাহার বাসা খুঁজিয়া বাহির করিয়া, তাহার স্ত্রীর সঙ্গে কি একটা পাতাইয়া আসিল। বৌবাজারের দোকান হইতে আসবাবপত্র আনাইয়া মনের মত করিয়া ঘর সাজাইল।
ছেলে দুটিকে কাছের এক স্কুলে ভর্তি করিয়া দেওয়া হইল; বাড়িতে পড়ানোর মাস্টার রাখা–এক কথায় ভালো করিয়াই এখানে সংসার পাতিয়া বসা হইল।
একদিন নির্মল আসিয়া আড়তে দেখা করিল। প্রায় মাসখানেক দেখাই হয় নাই তার সঙ্গে। গদাধর খুশী হইয়া বলিলেন–আরে এসো নির্মল। দেশ থেকে এলে এখন? খবর ভালো?
–হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে দেখা হয় নি অনেকদিন, তাই এলাম একবার।
-খুব ভালো করেচো। যাও, বাড়িতে যাও–তোমার বৌ ঠাকরুণ আছেন, গিয়ে ততক্ষণ চা-টা খাওগে, আমি আসছি।
নির্মল নীচু গলায় বলিল–কিন্তু তোমার কাছে এসেছিলাম আর-এক কাজে। আমার কিছু টাকার বড় প্রয়োজন ভাই।
–কেন, হঠাৎ টাকার কি প্রয়োজন হলো?
–বাকি খাজনার দায়ে পৈতৃক জমি বিক্রি হতে বসেচে দেখাবো এখন সব তোমায়।
–কত টাকা?
শ’তিনেক।
–কবে চাই?
–আজই দাও। তোমাকে হ্যাণ্ডনোট দেবো তার বদলে।
–কিছুই দিতে হবে না তোমায়। যখন সুবিধে হবে দিয়ে দিও।
নির্মল যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিল। করিবারই কথা। সে দিনটা গদাধরের বাড়িতে থাকিয়া আহারাদি করিয়া সন্ধ্যাবেলা
বলিল–চলো গদাই, তোমাকে বায়োস্কোপ দেখিয়ে আনি।
গদাধর বিশেষ শৌখিন-প্রকৃতির লোক নহেন। এতদিন কলিকাতায় আসিয়াছেন বটে, কিন্তু এখনও এক দিনের জন্য কোনো আমোদ-প্রমোদের দিকে যান নাই–নিজের আড়তে কাজকর্ম লইয়াই ব্যস্ত থাকেন। নির্মলের পীড়াপীড়িতে সেদিন সন্ধ্যাবেলাটা বায়োস্কোপ দেখিতে গেলেন। প্রতিদান বলিয়া একটা বাংলা ছবি…গদাধরের মন্দ লাগিল না। অনেকদিন তিনি থিয়েটার বা বায়োস্কোপ দেখেন নাই, বাংলা ছবি এমন চমৎকার হইয়া উঠিয়াছে, তাহার সন্ধানই তিনি রাখেন না।
বায়োস্কোপ হইতে বাহির হইয়া নির্মল বলিল–চা খাবে?
–তা মন্দ হয় না।
–চলো, কাছেই আমার এক বন্ধুর বাড়ি, তোমায় আলাপ করিয়ে দিই।
মিনিট-পাঁচেক-রাস্তা-দূরে একটা গলির মোড়ে বেশ বড় একখানা বাড়ির সামনে গিয়া নির্মল বলিল–দাঁড়াও, আমি আসছি।
কিছুক্ষণ পরে একটি সুপুরুষ যুবকের সঙ্গে নির্মল ফিরিয়া আসিল। হাসিয়া বলিল–এই যে, আলাপ করিয়ে দিই, এরই নাম গদাধর বসু, বাড়ি
গদাধর অবাক হইয়া চাহিয়া বলিলেন–আরে শচীন যে! তুমি এখানে?
–এসো ভাই এসো।…নির্মল আমাকে বললে, কে এসেচে দ্যাখো। তুমি যে দয়া করে এসেচো…আমি ভাবলুম না-জানি কে? তা তুমি–সত্যি?
–এটা কাদের বাড়ি?
–আরে এসোই না! অনেকদিন দেখাশুনা নেই–সব কথা শুনি।
সম্পর্কে শচীন তাঁহার জ্যাঠতুতো ভাই–অর্থাৎ বড়-তরফের সত্যনারায়ণ বসুর বড় ছেলে–আর-বারে ‘কুসুম-বামনীর দ’র ভাগবাঁটোয়ারার সময় ইহারই উদ্দেশে শ্লেষ করিয়া কথা বলিয়াছিলেন গদাধর। শচীন বকিয়া গিয়াছে, এ-কথা গ্রামের সকলেই জানিত–তবে গদাধর শুনিয়াছিলেন, আজকাল সে ভালো হইয়াছে–কলিকাতায় থাকিয়া কি চাকুরি করে।
গদাধর বলিলেন–নির্মলের সঙ্গে তোমার দেখাশুনো হয় নাকি?
শচীন হাসিয়া বলিল–কেন হবে না? তুমি তো আর দেশের লোকের খোঁজ নাও না–শুনলুম বাড়ি করেচ কলকাতায়..
–হ্যাঁ, সে আবার বাড়ি। কোনো রকমে ওই মাথা গোঁজবার জায়গা…
–বৌদিদিকে এনেচো নাকি?
–অনেকদিন।
–আমাদের তো আর যেতে বললে না একদিন! সন্ধানই কি রাখো…
-আমি কি করে সন্ধান রাখি, বলো? নির্মল নিয়ে এলো তাই তোমাকে চক্ষে দেখলুম এই এতকাল পরে। তুমি তো গ্রামছাড়া আজ তিন বছরের ওপর।
শচীনের সঙ্গে গদাধর বাড়ির মধ্যে ঢুকিলেন। বাহিরের ঘর পার হইয়া ছোট একটি হলঘর। হলঘরের চারিপাশে কামরা– সামনে দোতলায় উঠিবার সিঁড়ি। একটা বড় ক্লকঘড়ি হলের একপাশে টিকটিক করিতেছে, কাঠের টবে বড় বড় পামগাছ। শচীন উহাদের লইয়া দোতলার সিঁড়িতে উঠিতে উঠিতে ডাক দিল–ও শোভা, কাদের নিয়ে এলুম দেখ! শচীনের ডাকে একটি মেয়ে ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া সিঁড়ির মুখে দাঁড়াইল, তার পরনে সাদাসিদে কালোপাড় ধুতি, অগোছালো চুলের রাশ পিঠের উপরে পড়িয়াছে মুখে-চোখে মৃদু কৌতূহল। মুখে সে কোনো কথা বলিল না। ত্রিশের বেশি বয়স কোনোমতেই নয়–খুব রোগা নয়, দোহারা গড়ন–রং খুব ফর্সা।
শচীন বলিল–বলো তো শোভারাণী, কে এসেচে?
মেয়েটি বলিল–কি করে জানবো?
আশ্চর্য এই যে, মেয়েটি কাহাকেও অভ্যর্থনাসূচক একটা কথা বলিল না বটে, তবু তাহাকে অভদ্র বলিয়া মনে হইল না গদাধরের। এমন মুখশ্রী কোথায় যেন দেখিয়াছেন! দেখিয়া ভাবিয়াছিলেন, বেশ চমৎকার মুখ! কিন্তু কোথায় দেখিয়াছিলেন কিছুতেই মনে করিতে পারিলেন না।
সকলে উপরে উঠিলেন। বারান্দায় বেতের চেয়ার খানকতক গোল করিয়া পাতা–মাঝখানে একটা বেতের টেবিল। সেখানে শচীন তাঁহাদের বসাইয়া মেয়েটির দিকে চাহিয়া বলিল–ইনি শ্ৰীযুক্ত গদাধরচন্দ্র বসু, আমার খুড়তুতো ভাই–আমাদের বয়স একই, দু-এক মাসের ছোট-বড়। মার্চেন্ট। গাঁয়ে পাশাপাশি বাড়ি।
গদাধর অবাক হইয়া গিয়াছিলেন। নির্মল ও শচীন এ কোথায় তাঁহাকে আনিল? শচীনের কোনো আত্মীয়ের বাড়ি হইবে হয়তো! মেয়েটি কে? গৃহস্থ-বাড়ির মেয়ে কি সকলের সামনে এভাবে ডাক দিলে বাহির হইয়া আসে? তিনি নিজের গ্রামে তো দেখেন নাই–তবে কলিকাতার ব্যাপারই আলাদা।
শচীন বলিল–পরিচয় করিয়ে দিই এঁর সঙ্গে–ইনি প্রখ্যাতনামা ‘স্টার’–শোভারাণী মিত্র–নাম শোনো নি?
নির্মল বলিল–এইমাত্র দেখে এলে, প্রতিদান ফিল্ম–সেই ফিল্মের কমলা!
গদাধর এতক্ষণ পরে বুঝিলেন। সেইজন্যই তাঁহার মনে হইতেছিল, মেয়েটির মুখ বড় পরিচিত–কোথায় যেন দেখিয়াছেন! মেয়েটি ‘ফিল্ম-স্টার’ শোভারাণী মিত্র—‘প্রতিদান’ ফিল্মে যে কমলা সাজিয়াছে! গদাধর ব্যবসায়ী মানুষ, ফিল্ম-স্টারদের নামের সঙ্গে তাঁর খুব পরিচয় নাই, তবে এবার কলিকাতায় আসিয়া অবধি বাড়ির দেওয়ালে পাঁচিলে যত্রতত্র প্রতিদান ছবির বিজ্ঞাপন এবং সেই সঙ্গে বড় বড় অক্ষরে শোভারাণী মিত্রের নাম গদাধর দেখিয়াছেন বটে।
গদাধর একটু সঙ্কুচিত হইয়া পড়িলেন–তাঁহারা গেঁয়ো লোক, ফিল্ম-স্টারদের সঙ্গে কথা বলিবার কি উপযুক্ত! নির্মলের কাণ্ড দেখ, তাঁহাকে কোথায় লইয়া আসিল!
সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহল হইল খুব। ফিল্ম-স্টাররা কিভাবে কথা বলে, কেমন চলে, কি খায়, কি করে সাধারণ লোকে ইহার কিছুই জানে না। তাঁহার সৌভাগ্য বলিতে হইবে যে, তিনি সে সুযোগ পাইয়াছেন। গিয়া অনঙ্গকে গল্প করিবার একটা জিনিস পাইলেন বটে। অনঙ্গ শুনিয়া অবাক হইয়া যাইবে।
মেয়েটি এবার বেতের টেবিলের ওপারে দাঁড়াইয়া হাতজোড় করিয়া নমস্কার করিল–কোনো কথা বলিল না।
নির্মল বলিল–বসুন মিস্ মিত্র।
মেয়েটি উদাসীন ভাবে বলিল–হ্যাঁ, বসি। আপনাদের বন্ধু চা খান তো? ও রসি…রসি!
গদাধর বলিতে গেলেন, তিনি এখন আর চা খাইবেন না–কিন্তু সঙ্কোচে পড়িয়া কথা বলিতে পারিলেন না। মেয়েটির আহ্বানে একটি ছোকরা চাকর আসিয়া সামনে দাঁড়াইল। মেয়েটি বলিল– ওরে রসি, চা–এক, দুই তিন পেয়ালা!
হাসিয়া নির্মল বলিল,-কেন, চার পেয়ালা নয় কেন?
মেয়েটি বলিল–আমি একবারের বেশি চা খাইনে তো। আমার হয়ে গিয়েচে বিকেলে।
কর্তৃত্বের এমন দৃঢ় গাম্ভীর্যের সুরে কথা বাহির হইয়া আসিল মেয়েটির মুখ হইতে যে, তাহার প্রতিবাদে আর কোনো কথা বলা চলে না। অল্পক্ষণ পরেই মেয়েটি ঘরের মধ্যে চলিয়া গেল এবং নিজের হাতে দু’খানি প্লেটে কেক, বিস্কুট, কমলালেবু ও সন্দেশ আনিয়া বেতের গোল টেবিলটিতে রাখিয়া বলিল–একটু খেয়ে নিন।
শচীন বলিল–আমার?
মেয়েটির মুখে হাসি কম, আধ-গম্ভীর মুখেই বলিল–দু-বার হয়ে গিয়েচে, আর হবে না।
নির্মল বলিল–এই আমরা ভাগ করে নিচ্চি…এসো শচীন।
নির্মলের দিকে চাহিয়া মেয়েটি বলিল–না, ভাগ করতে হবে না, আপনারা খেয়ে নিন–চা আনি।
গদাধর ভাবিলেন, এ-ধরণের মেয়ে তিনি কখনো দেখেন নাই। বিনয়ে গলিয়া পড়ে না, অথচ কেমন ভদ্রতা ও কর্তব্যজ্ঞান। কিন্তু শচীনের উপর এতটা আধিপত্য কেন? বোধহয় অনেক দিনের আলাপ–বন্ধুত্বে পরিণত হইয়াছে। সেক্ষেত্রে এরকম হওয়া সম্ভব, স্বাভাবিক বটে।
সেই ছোকরা চাকরটি চা আনিয়া দিল–ট্রে’র উপর বসানো। তিনটি পেয়ালা মেয়েটি নিজের হাতে ট্রে হইতে উঠাইয়া পেয়ালাগুলি টেবিলে সাজাইয়া দিল–আগে গদাধরের সামনে, তারপরে নির্মলের ও সবশেষে শচীনের সামনে।
গদাধরকে বলিল–চিনিটা দেখুন তো? আমি দু’চামচ করে দিতে বলি সব পেয়ালায়–যদি কেউ বেশি খান, আবার দেওয়া ভালো।
গদাধর মুখ তুলিয়া দেখিলেন, মেয়েটির ডাগর চোখের পূর্ণ দৃষ্টি তাঁহার মুখের উপর। কি সুন্দর মুখশ্রী, অপূর্ব লাবণ্যভরা ভঙ্গি ঠোঁটের নীচের অংশে! গদাধরের সারা দেহ নিজের অজ্ঞাতে শিহরিয়া উঠিল। নামজাদা অভিনেত্রী শোভারাণী মিত্র…তাঁহাকে– গদাধর বসুকে সম্বোধন করিয়া কথা বলিতেছে, বিশ্বাস করা শক্ত।
গদাধর তখনই চোখ নামাইয়া লইলেন। বেশীক্ষণ মেয়েটির মুখের দিকে চাহিতে পারিলেন না। ছবিতে এইমাত্র যাহাকে দেখিয়া আসিলেন–সেই নির্যাতিতা মহীয়সী বধূ কমলা রক্তমাংসের জীবন্ত দেহ লইয়া, তাহার অপূর্ব মুখশ্রী লইয়া সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিতেছে…তাঁহাকেই…গদাধর বসুকে! বলিতেছে–আপনার চায়ে কি চিনি কম হয়েচে?
এমন ঘটনা কিছুক্ষণ পূর্বেও তিনি কল্পনা করিতে পারিতেন না।
অথচ চিনি আদৌ ঠিক ছিল না। চিনির অভাবে চা তেতো বিস্বাদ। চায়ে চার চামচের কম চিনি তিনি কখনো খান না বাড়িতে। ইহা লইয়া অনঙ্গ তাঁহাকে কত ক্ষেপাইত—“তোমার তো চা খাওয়া নয়, চিনির শরবৎ খাওয়া! চিনির রসে কাপের সঙ্গে ডিসের সঙ্গে এঁটে জড়িয়ে যাবে, তবে হবে তোমার ঠিকমত চিনি!”
কিন্তু এ তো আর অনঙ্গ নয়, এখানে সমীহ করিয়া চলিতে হইবে বৈ কি!
শচীন বলিল–তোমরা এদিকে গিয়েছিলে কোথায়?
হাসিয়া নির্মল বলিল–আমরা এইমাত্তর প্রতিদান দেখে ফিরলুম।
–কেমন লাগলো?
–বেশ লেগেচে, বিশেষ করে এঁর পার্ট–ওঃ!
মেয়েটি গদাধরের দিকে চাহিয়া সরাসরিভাবে জিজ্ঞাসা করিল– আপনার কেমন লাগলো?
গদাধর সঙ্কুচিত ও অভিভূত হইয়া পড়িলেন। এমন ধরণের সুন্দরী শিক্ষিতা মহিলার সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য ঘটা দূরের কথা–এর আগে এমন মহিলা তিনি চক্ষেও দেখেন নাই। শিক্ষিতা নিশ্চয়, কারণ ওই ছবির মধ্যে এঁর মুখে যে সব বড় বড় কথা আছে, যেমন সব গান ইনি গাহিয়াছেন, যেমন ইঁহার চমৎকার। উচ্চারণের ভঙ্গি, কথা বলিবার কায়দা, হাত-পা নাড়ার ধরণ ইত্যাদি দেখা গিয়াছে–শিক্ষিত না হইলে অমনটি করা যায় না। গদাধর পল্লীগ্রামে বাস করেন বটে, কিন্তু মানুষ চেনেন।
তিনি বলিলেন–খুব ভালো লেগেছে। ওই যে নির্মল বললে, আপনার পার্ট–ওরকম আর দেখিনি।
–কোন্ জায়গাটা আপনার সব চেয়ে ভালো লেগেছে বলুন তো? দেখি–আপনারা বাইরে থেকে আসেন, আপনাদের মনে আমাদের অভিনয়ের এফেক্টটা কেমন হয়, সেটা জানা খুব দরকার আমাদের।
শচীন অভিমানের সুরে বলিল–কেন, আমরা বানের জলে ভেসে এসেছি নাকি? আমাদের মতের কোনো দাম….
–সেজন্যে নয়। আপনারা সর্বদা দেখছেন আর এঁরা গ্রামে থাকেন, আজ এসেচেন–কাল চলে যাবেন। এঁদের মতের দাম অন্যরকম।
গদাধর আরও লজ্জিত ও সঙ্কুচিত হইয়া উত্তর দিলেন–আজ্ঞে না না, আমাদের আবার মত! তবে আমার খুব ভালো লেগেচে, যখন আপনাকে–মানে কমলাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো–আপনার সেই গানখানা গাছতলার পুকুরপাড়ে স্বামীর ঘরের দিকে চোখ রেখে–ওঃ, সেই সময় চোখের জল রাখা যায় না! আরও বিশেষ করে ওই জায়গাটা ভালো লাগে–ওইখানটাতেই আপনার পরনের শাড়ী…আপনার চোখের ভঙ্গি…কেমন একটা অসহায় ভাব…সব মিলিয়ে মনে হয়, সত্যিই পাড়াগাঁয়ের শাশুড়ীর অত্যাচারে ঘরছাড়া হয়েচে, এমন একটি বৌকে চোখের সামনে দেখচি। বায়োস্কোপে দেখছি, মনে থাকে না। ওখানে আপনি নিজেকে একেবারে হারিয়ে ফেলেছেন।
শচীন উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল, ইয়ার্কির সুরে বলিল–বারে আমাদের গদাই, তোমার মধ্যে এত ছিল, তা তো জানিনে– একেবারে ‘আনন্দ বাজার’-এর ‘ফিল-ক্রিটিক’ হয়ে উঠলে যে বাবা!
মেয়েটি একমনে আগ্রহের সঙ্গে গদাধরের কথা শুনিতেছিল– শচীনের দিকে গম্ভীর মুখে চাহিয়া ধমক দেওয়ার ভঙ্গিতে বলিল– কি ও? উনি প্রাণ থেকে কথা বলছেন…আমি বুঝেচি উনি কি বলছেন। আপনার মত হালকা মেজাজের লোক কি সবাই?
মুখ ম্লান করিয়া শচীন আগেকার সুরের জের টানিয়া বলিল– বেশ বেশ, ভালো হলেই ভালো–আমার কোনো কথা বলবার দরকার কি? বলে যাও হে…
গদাধর সঙ্কুচিতভাবে বসিয়া রহিলেন, কোনো কথা বলিলেন না।
মেয়েটি আবার গদাধরের দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল–হ্যাঁ। বলুন, কি বলছিলেন…
গদাধর বিনীত ও লজ্জিত হাস্যে বলিলেন–আজ্ঞে, ওই আমাদের মত লোকের আর বেশি কি বলবার আছে বলুন! তবে শেষ-দিকটাতে, যেখানে কমলা কাশীর ঘাটে আবার স্বামীর দেখা পেলো, ও জায়গাটা আরও বিশেষ করে ভালো লেগেছে।
–আর ওই যে কি বললেন…
–মানে কমলার পরনের কাপড় ঠিক একেবারে পাড়াগাঁয়ের ওই ধরণের গেরস্ত-ঘরের উপযুক্ত–বাহুল্য নেই এতটুকু!
আনন্দে ও গর্বের সুরে হাত নাড়িয়া মেয়েটি বলিয়া উঠিল– দেখুন, ওই কাপড় আমি জোর করে ম্যানেজারকে বলে আমদানি করি স্টুডিওতে। আমি বলি, স্বামী তো ছেড়ে দিয়েচে, বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েচে–এমন ধরণের পাড়াগাঁয়ের মেয়ের পরনে জমকালো রঙীন ব্লাউজ বা শাড়ী থাকলে ছবি ঝুলে যাবে। এজন্যে আমায় দস্তুরমত ফাইট করতে হয়েচে, জানেন শচীনবাবু? আর দেখুন, ইনি পাড়াগাঁ থেকে আসছেন–ইনি যতটা জানেন এ সম্বন্ধে…
সায় দিবার সুরে নির্মল বলিল–তা তো বটেই।
শচীন বলিল–যাক্, ওসব নিয়ে তর্কের দরকার নেই। শোভা, একটা গান শুনিয়ে দাও ওকে।
গদাধর পূর্ববৎ বিনীতভাবেই বলিল–তা যদি উনি দয়া করে শুনিয়ে দেন…।
মেয়েটি কিন্তু এতটুকু ভদ্রতা না রাখিয়াই তাচ্ছিল্যের সুরে বলিল–হ্যাঁ, যখন-তখন গান করলেই কি হয়? শচীনবাবু যেন দিন দিন কি হয়ে উঠছেন!
গদাধর নির্বোধ নন, তিনি লক্ষ্য করিলেন, শচীন মেয়েটির এ কথার উপর আর কোনো কথা বলতে সাহস করিল না, যেন একটু দমিয়া গেল। এবার কি মনে করিয়া গদাধর সাহস দেখাইলেন। তিনি ব্যবসাদার মানুষ, পড়তি-বাজারে চড়াদামের মাল বায়না করিয়া অনেকবার লাভ করিয়াছেন–তিনি জানেন, জীবনে অনেক সময় দুঃসাহসের জয় হয়। সুতরাং তিনি আগেকার নিতান্ত বিনয়ের ভাব ত্যাগ করিয়া অপেক্ষাকৃত দৃঢ় অনুরোধের সুরে বলিলেন–আপনি হয়তো মেজাজ ভালো হলে গান গাইবেন, কিন্তু আমি আর তা শুনতে পাবো না। শচীনের কথা এবারটা রাখুন দয়া করে–একটা গান শুনিয়ে দিন।
পাকা ও অভিজ্ঞ ব্যবসাদার গদাধর ভুল চাল চালেন নাই। মেয়েটি আগেকার চেয়ে নরম ও সদয় সুরে বলিল–আপনি শুনতে চান সত্যি? শুনুন তবে…
ঘরের একপাশে বড় টেবিল-হারমোনিয়ম। মেয়েটি টুলে বসিয়া ডালা খুলিয়া, পিছনদিকে ফিরিয়া হাসিমুখে বলিল–কি শুনবেন? হিন্দি, না ফিল্মের গান?
গদাধর কৃতার্থ হইয়া বলিলেন–কমলার সেই গানখানা করুন দয়া করে, সেই যখন বাড়ি ছেড়ে…
মেয়েটি একমনে গানটি গাহিল। গানের মধ্যে আকাশ, বেদনাভরা বীণাধ্বনি, রুদ্র, জ্যোৎস্না, পথ-চলা প্রভৃতি অনেক সুমিষ্ট কথা ছিল এবং আরও অনেক ধোঁয়া-ধোঁয়া ধরণের শব্দ যার অর্থ পাটের আড়তদার গদাধর ঠিকমত অনুধাবন করিতে পারিলেন না। তবু তিনি তন্ময় হইয়া গানটি শুনিলেন। ইহা কি করিয়া সম্ভব হইল–এইমাত্র ছায়াছবিতে যে নির্যাতিতা বধূটিকে দেখিয়া আসিলেন, সে মেয়েটিই রক্তমাংসের দেহে তাঁহার সম্মুখে বসিয়া গান গাহিতেছে!
গান শেষ হইলে গদাধর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন– চমৎকার! চমৎকার!
নির্মল বলিল–বাস্তবিক যাকে বলে ফার্স্ট ক্লাস!
শচীন কোনো কথা বলিল না।
মেয়েটি হারমোনিয়মের ডালা সশন্দে বন্ধ করিয়া উঠিয়া আসিল, কিন্তু গান সম্বন্ধে একটি কথা বলিল না। তাহার মুখের ভাব দেখিয়া মনে হইল, সে ভালো করিয়াই জানে, সে যাহা গাহিবে, তাহা ভালো হইবেই–এ বিষয়ে কতকগুলি সঙ্গীত সম্বন্ধে অজ্ঞ, অর্বাচীন ব্যক্তির মত জিজ্ঞাসা করিয়া মিথ্যা বিনয় প্রকাশ করিতে সে চায় না।
গদাধর হঠাৎ দেখিলেন, কথাবার্তার মধ্যে কখন রাত্রি হইয়া ঘরে ইলেকট্রিক আলো জ্বলিয়া উঠিয়াছে–তিনি এতক্ষণ খেয়াল করেন নাই।
এইবার যাওয়া উচিত–আর কতক্ষণ এখানে থাকিবেন? মেয়েটি কিছু মনে করিতে পারে, কিন্তু বিদায় লইবার উদ্যোগ করিতেই শচীন বলিল–আহা বসো না হে, একসঙ্গে যাবো– আমিও তো এখানে থাকবো না!
গদাধর বলিলেন–না, আমার থাকলে চলবে না, অনেক কাজ বাকী। রাত হয়ে যাচ্চে।
নির্মলও বলিল–আর একটু থাকো। আমিও যাবো।
উহাদের বসাইয়া রাখিয়া মেয়েটি পাশের ঘরে চলিয়া গেল এবং কিছুক্ষণ পরে ফিকে চাঁপা রংয়ের জর্জেট পরিয়া, মুখে হালকাভাবে পাউডারের ছোপ দিয়া, উঁচু গোড়ালির জুতো পায়ে ঘরে ঢুকিয়া সকলের দিকে চাহিয়া বলিল–এবার চলুন সবাই বেরুনো যাক।
শচীন বিস্ময়ের সুরে বলিয়া উঠিল–কোথায় যাবে আবার, সেজেগুজে এলে হঠাৎ?
–সব কথা কি আপনাকে বলতে হবে?
–না, তবু জিগ্যেস করচি। দোষ আছে কিছু?
–স্টুডিওতে পার্টি আছে সাড়ে-আটটায়।
–তুমি এখন সেই টালিগঞ্জে যাবে, এই রাত্রে?
–যাবো।
অগত্যা সকলে উঠিল। শচীনের মুখ দেখিয়া বেশ মনে হইল, সে নিতান্ত অনিচ্ছার সহিত এ-স্থান ত্যাগ করিতেছে। মেয়েটি আগে আগে, আর সকলে পিছনে চলিল। বারান্দায় যাইবার বা সিঁড়ি দিয়া নামিবার পথে মেয়েটি কাহারও সহিত একটি কথা বলিল না–রমণীর মত গর্বে কাঠের সিঁড়ির উপর জুতার উঁচু গোড়ালির খটখট শব্দ করিতে করিতে চঞ্চলা হরিণীর মত ক্ষিপ্রপদে নামিয়া গেল–কেবল অতি মদু সুমিষ্ট একটি সুবাস বারান্দা ও সিঁড়ির বাতাসে মিশিয়া তাহার গমনপথ নির্দেশ করিল মাত্র।
গদাধর বাড়ি ফিরিয়া সে-রাত্রে হিসাবের খাতা দেখিলেন প্রায় রাত বারোটা পর্যন্ত। কিন্তু অনঙ্গ যখন কাজকর্ম শেষ করিয়া ঘরে ঢুকিল, তখন কি জানি কেন, শোভারাণী মিত্র ফিল্ম-স্টারের যে গল্পটা জমাইয়া বলিবেন ভাবিয়াছিলেন–সেটা কিছুতেই জিহ্বাগ্রে আনিতে পারিলেন না।
এই কথাটা গদাধর পর-জীবনে অনেকবার ভাবিয়াছিলেন। যে গল্প অনঙ্গর কাছে করিবার জন্য কতক্ষণ হইতে তাঁহার মন আকুলি-বিকুলি করিতেছিল–এতবড় মুখরোচক ও জমকালো ধরণের একটা গল্প,–অথচ কেন সেদিন সে-কথা স্ত্রীর কাছে বলিতে পারিলেন না?
কি ছিল ইহার মধ্যে?
সেদিন হয়তো কিছুই ছিল না, কিংবা হয়তো ছিল! গদাধর ভালো বুঝিতে পারিলেন না।
অনঙ্গ বলিল–আজ কি শোবে, না খাতাপত্র নিয়ে বসে থাকবে? রাত ক’টা খেয়াল আছে?
গদাধর হঠাৎ অনঙ্গর দিকে পূর্ণ-দৃষ্টিতে চাহিলেন। অনঙ্গও মেয়েমানুষ–দেখিতেও মন্দ নয়, কিন্তু কি ঠকাই ঠকিয়াছেন এতদিন! সত্যিকার মেয়ে বলিতে যা বোঝায়, তা তিনি এতদিন দেখেন নাই। আজই অন্যত্র তাহা দেখিয়া আসিলেন এইমাত্র!
বলিলেন–এই যাই।
–আজ তো খেলেও না কিছু শরীর ভালো আছে তো?
অনঙ্গ সুকণ্ঠী নয়। গলার স্বর আরও মোলায়েম হইলেও ক্ষতি ছিল না। মেয়েদের কণ্ঠস্বর মিষ্টি হইলেই ভালো মানায়–কিন্তু সব জিনিসের মধ্যেই আসল আছে, আবার মেকি আছে!
মশারি খুঁজিতে খুঁজিতে অনঙ্গ বলিল–আজ কোথাও গিয়েছিলে নাকি? রাত করে ফিরলে যে?
–হ্যাঁ, ওই বায়োস্কোপ দেখে এলুম কিনা।
অনঙ্গ অভিমানের সুরে বলিল–তা যাবে বৈকি। আমায় নিয়ে গেলে না তো–কি দেখলে?
–একটা বাংলা ছবি…সে আর একদিন দেখো।
অনঙ্গ আবদারের সুরে বলিল–কি ছবি, বলো না? বলো না গো গল্পটা!
সেই পুরানো অনঙ্গ। বহুদিনের সুপরিচিত সেই আবদারের সুর। কতবার কত গল্প এই স্ত্রীর সঙ্গে…রাত একটা-দুইটা পর্যন্ত জাগিয়া থাকা গল্প করিতে করিতে। কিন্তু গদাধর বিস্ময়ের সহিত লক্ষ্য করিলেন, আজ অনঙ্গর সঙ্গে গল্পগুজব করিবার উৎসাহ যেন তিনি নিজের মধ্যে খুঁজিয়া পাইতেছেন না!
খাতাপত্র মুড়িয়া ঈষৎ নীরস কণ্ঠে গদাধর বলিলেন–কি এমন গল্প! বাজে!
–হোক বাজে, কি দেখলে..বলো না..লক্ষ্মীটি?
–বড় খাটুনি গিয়েচে আজ, কথা বলতে পারচি নে।
অনঙ্গ ঠোঁট ফুলাইয়া বলিল–তা পারবে কেন? খাতাপত্র ঘাঁটবার সময় খাটুনি হয় না!..লক্ষ্মীটি বলো না, কি দেখলে?
–কাল সকালে শুনলে তো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। সত্যি বড্ড ঘুম পাচ্ছে।
অনঙ্গ রাগ করিল বটে, সঙ্গে সঙ্গে বিস্মিতও হইল। স্বামীর এমন ব্যবহার যে ঠিক নতুন, তাহা নহে। ঝগড়াও কতবার হইয়া গিয়াছে দু-জনের মধ্যে–কিন্তু সে ঝগড়ার মধ্যে সত্যিকার ঔদাসীন্য বা তিক্ততা ছিল না। আজ গদাধর ঝগড়ার কথা কিছু বলিতেছেন না–খুব সাধারণ কথাই, অথচ তার নারীচিত্ত যেন বুঝিল, ওই সামান্য সাধারণ অতি তুচ্ছ প্রত্যাখানের পিছনে অনেকখানি ঔদাসীন্য এবং তিক্ততা বিদ্যমান।
অনঙ্গ চুপ করিয়া শুইয়া পড়িল।
গদাধর কিন্তু শুইয়া শুইয়া ফিল্ম-অভিনেত্রী শোভারাণীর ভাবনা ভাবিতেছিলেন, এ কথা বলিলে তাঁহার উপর ঘোর অবিচার করা হইবে। সত্যিই তিনি এক-আধবার ছাড়া তার কথা ভাবেন নাই। মেয়েদের কথা বেশিক্ষণ ধরিয়া ভাবিবার মত মন গদাধরের নয়। তিনি ভাবিতেছিলেন অন্য কথা।
তিনি ভাবিতেছিলেন-জীবনটা তাঁর বৃথায় গেল! মেকি লইয়া কাটাইলেন, আসল নারী কি বস্তু, তাহা কোনো দিন চিনিলেন না! আর একটি ছবি অন্ধকারে আধ-ঘুমের মধ্যেও বারবার তাঁর চোখের সম্মুখে ভাসিয়া উঠিতেছিল…
নির্যাতিত সুন্দরী বধূ কমলা শ্বশুরবাড়ি হইতে বিতাড়িতা হইয়া থরথর-কম্পিত-দেহে পুকুরপাড়ে একদৃষ্টে স্বামীর ঘরের জানালার দিকে চাহিয়া আছে।…
