দম্পতি (উপন্যাস) – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেয়ার করুনঃ

দুই

মাসখানেক কাটিয়া গেল।

একদিন গদিতে গদাধর উপস্থিত আছেন, ভড়মশায় জিজ্ঞাসা করিলেন–ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাজ তো সব বিলি হয়ে গেল বাবু, আজ আমার শালার কাছে খবর পেয়েচি! আপনার কিছু হয়েচে?

হয়েচে, তবে খুব বেশি নয়। হাজার দুই টাকার কাজ পাওয়া গিয়েচে।

–যা হয় তবু কিছু আসবে-এখন।

গদাধর অন্যমনস্কভাবে বলিলেন–তা তো বটেই।

ইতিপূর্বেই তিনি মনে মনে হিসাব করিয়া দেখিয়াছেন–এ কাজে তাঁহার বিশেষ কোনো লাভ হইবে না। পাঁচশত টাকা ঘুষ দিয়াও নির্মল ইহার বেশি কাজ যোগাড় করিতে পারে নাই—সে যত বলিয়াছিল, তাহার অর্ধেক কাজও পাওয়া যায় নাই।

নির্মল নিজেও সেজন্য খুব লজ্জিত। কথাটা অবশ্য গদাধর কাহাকেও বলেন নাই–নির্মল বন্ধুলোক, সে যদি চেষ্টা করিয়াও কাজ না পাইয়া থাকে তবে তাহার আর দোষ কি?

কিন্তু চতুর ভড় মহাশয় একদিন কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করিলেন–বাবু, একটা কথা বলবো ভাবচি। যদি কিছু মনে না করেন তো বলি।

–হ্যাঁ হ্যাঁ, কি বলুন?

–নির্মলবাবুকে কি কিছু টাকা দিয়েছিলেন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাজের জন্যে?

–না, কে বললে?

–আমি এমনি জিগ্যেস করচি বাবু। তাহলে কথাটা সত্যি নয়! যাক্, তবে আর ওকথার দরকার নেই।

গদাধর চাহেন না, ইহা লইয়া নির্মলকে কেহ কিছু বলে। এ কথা শুনিলে অনেকে অনেক রকম কথা বলিবে, তিনি জানেন– সুতরাং এ-বিষয়ে কোন উচ্চবাচ্য না করিয়া তিনি অন্য কথা পাড়িলেন। ভড় মহাশয়ও নিজের হিসাবের খাতায় মনোনিবেশ করিলেন।

গদাধর অভাবগ্রস্ত লোক হইলে হয়তো এ-সব কথায় তাঁহার খটকা লাগিত। কিন্তু ঈশ্বরইচ্ছায় এই পল্লীগ্রামে বসিয়া তাঁহার মাসে চার-পাঁচশো টাকা আয়। পল্লীগ্রামের পক্ষে এ আয় কম নয়। সংসারে খরচও এমন কিছু বেশি নয়–কিছু দান-ধ্যানও আছে, টাকার যে মূল্য অপরে দিয়া থাকে, গদাধরের কাছে টাকার হয়তো তত মূল্য নাই।

অনঙ্গ একদিন বলিল–আচ্ছা, এবার আমাদের বাসন্তীপূজাটা করলে হয় না?

গদাধর বলিলেন–তোমার ইচ্ছা হয় তো করি।

–আমার কেন, তোমার ইচ্ছে নেই?

–পূজা-আচ্চা বিষয়ে তুমি যা বলো। আমি একটু অন্যরকম, জানোই তো।

–পুজো হোক আর কাঙালী-ভোজন করানো যাক্, কি বলো?

–তাতে আমার অমত নেই।

–ভালো কারিগর এনে ঠাকুর গড়াও…কেষ্টনগরের কারিগর আনালে কেমন হয়?

-তুমি যা বলো! বলেচি তো, ও-বিষয়ে আমি কোনো কথা বলবো না।

গদাধর জানেন, স্ত্রীর ঝোঁক আছে এদিকে। লোককে খাওয়াইতে-মাখাইতে সে ভালোবাসে। এ পর্যন্ত তাঁহাদের বাড়ী অতিথি আসিয়া ফেরে নাই–যত বেলাতেই আসুক না কেন। অনঙ্গ অনেক সময় মুখের ভাত অতিথিকে খাওয়াইয়া, মুড়ি খাইয়া একবেলা কাটাইয়াছে। কারণ অত বেলায় কে আবার রান্নার হাঙ্গামা করে? এ-সব বিষয়ে গদাধর কোন কথা বলিতেন না–স্ত্রী যা করে করুক।

অনেকদিন আগের কথা।

অনঙ্গ তখন ছেলেমানুষ–সবে নববধূরূপে এ-বাড়িতে পা দিয়াছে। একদিন কোথা হইতে দুটি ভিক্ষুক আসিয়া অন্ন প্রার্থনা করিল। বেলা তখন দুই প্রহর উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। গদাধরের মা বলিয়া পাঠাইলেন, এমন অসময়ে এখানে কিছু হইবে না।

অনঙ্গ শাশুড়ীকে বলিল–মা, একটা কথা বলবো?

–কি বৌমা?

–আমার ভাত এখনও রয়েচে। মাথাটা বড় ধরেচে, আমি আর এবেলা খাবো না ভাবচি, ওই ভাত ওদেরকেই দিয়ে দিন না!

বধূর এ-কথায় শাশুড়ী কিন্তু বিরক্ত হইলেন। বলিলেন,–ও আবার কি কথা বৌমা? মুখের ভাত ধরে দিতে হবে, কোন জগন্নাথ-ক্ষেত্তরের পাণ্ডা আমার এসেচেন? রঙ্গ দেখে আর বাঁচিনে। এবেলা না খাও, ওবেলা খাবে–ঢেকে রাখো, মিটে গেল।

কিন্তু অনঙ্গ পুনরায় বিনীতভাবে বলিল–তা হোক মা, আপনার পায়ে পড়ি, ওদের দিয়ে দিই। আমার খিদে নেই সত্যি।

শাশুড়ী অগত্যা বন্ধুর কথামত কার্য করিলেন।

গদাধর অনঙ্গকে এ-সব বিষয়ে কখনো বাধা দেন নাই, তবে অতিরিক্ত উৎসাহও কখনো দেন নাই–তাহাও ঠিক। নিজে তিনি ব্যবসায়ী লোক, অর্থাগম ছাড়া অন্য কিছু বড় বোঝেন না। আগে পড়াশুনার বাতিক ছিল, কারণ গদিয়ান ব্যবসাদার হইলেও তিনি গোয়াড়ি কলেজ হইতে আই.এ.পাশ করিয়াছিলেন। সম্প্রতি টাকা উপার্জনের নেশায় জীবনের অন্য সব বাতিক ধামাচাপা পড়িয়াছে।

অনঙ্গ নিজেও বড়-ঘরের মেয়ে। তাহার পিতা নফরচন্দ্র মিত্র একসময়ে রাধানগর পরগণার মধ্যে বড় তালুকদার ছিলেন। ভূসিমালের ব্যবসা করিয়াও বিস্তর পয়সা রোজগার করিয়াছিলেন– কিন্তু শেষের দিকে বড় ছেলেটি উচ্ছৃঙ্খল-প্রকৃতির হইয়া নানারকম বদখেয়ালে টাকা নষ্ট করিতে থাকে, বৃদ্ধও মনের দুঃখে শয্যাগত হইয়া পড়েন। ক্রমে একদিকের অঙ্গ পক্ষাঘাতে অবশ হইয়া যায়। গত বৎসর তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে।

অনঙ্গ তাহার এই দাদাকে খুব ভালোবাসিত। নানারকমে তাহাকে সৎপথে ফিরাইবার চেষ্টা করিয়াও শেষ পর্যন্ত কিছুই হইল না–তাই সে এখন মনের দুঃখে বাপেরবাড়ি যাওয়া বন্ধ করিয়াছে। তাহার দাদাও ভগ্নীপতির গৃহে কালে-ভদ্রে পদার্পণ করে।

গদাধর বোঝেন ব্যবসা, পয়সা উড়াইবার মানুষ তিনি নহেন। কোনোপ্রকার শৌখিনতাও নাই তাঁহার। এমন কি, হাতে পয়সা থাকা সত্ত্বেও বাড়ি-ঘর কেন সারাইতেছেন না–ইহা লইয়া ঘরে পরে বিস্তর অনুযোগ সহ্য করিয়াও তিনি অটল। তাঁর নিজের মত এই যে, চলিয়া যখন যাইতেছে, তখন এই অজ পাড়াগাঁয়ে ঘর বাড়ির পিছনে কতগুলা টাকা ব্যয় করিয়া লাভ নাই!

একদিন তাঁহার এক আত্মীয় কী কার্যোপলক্ষে তাঁহার বাড়ি আসিয়াছিল। বাড়ি-ঘর দেখিয়া বলিল–গদাধর, বাড়ি-ঘর এমন অবস্থায় রেখেছো কেন?

–কেন বলো তো?

-জানালা নেই-চট টাঙিয়ে রেখেচো, দেওয়াল পড়ে গিয়েচে, দরমার বেড়া–তোমার মত অবস্থার লোক কি এরকম করে?

–তুমি কি বলো?

-ভালো করে বাড়ি করো, পুজোর দালান দাও, বৈঠকখানা ভালো করে করো–তবে তো জমিদারের বাড়ি মানাবে।

-হ্যাঁঃ, পাগল তুমি! কতকগুলো টাকা এখানে পুঁতে রাখি।

–তা বাস করতে গেলে করতে হয় বইকি। এতে লোকে বলে কি!

–যা বলে বলুকগে। তুমিই ভেবে দ্যাখো না ভাই, এই বাজারে কতকগুলো টাকা খরচ করে এখানে ওসব ধুমধামের কি দরকার আছে?

–এই বাড়িতে চিরকাল বাস করবে। পৈতৃক-বাড়ি ভালো করে তৈরি করো–দশজনের মধ্যে একজন হয়ে বাস করো।

–এখানে আর বড় বাড়ি করে কি হবে? চলে তো যাচ্চে–সে টাকা ব্যবসায়ে ফেললে কাজ দেবে। ইট গেড়ে টাকা খরচ করা আমার ইচ্ছে নয়।

তবে গদাধরের একটা শৌখিনতা আছে এক বিষয়ে। পায়রা পুষিতে তিনি খুব ভালোবাসেন। ছাদে বাঁশ চিরিয়া পায়রার জায়গা করিয়া রাখিয়াছেন–নোটন পায়রা, ঝোটন পায়রা, তিলে খেড়ি, গিরেরাজ–সাদা, রাঙা, সবুজ সব রংয়ের পায়রার দিনরাত ডানার ঝাপট, উড়ন্ত পালকের রাশি ও অবিশ্রান্ত বকবকম শব্দে গদাধরের ভাঙা অট্টালিকার কার্নিশ, থামের মাথা ও ছাদ জমাইয়া রাখিয়াছে।

তাঁহার বিশ্বাস পায়রা যেখানে, লক্ষ্মী সেখানে বাঁধা।

পায়রার শখে বছরে কিছু টাকা খরচ হইয়াও যায়। পায়রার প্রধান দালাল নির্মল–সে কলিকাতা হইতে ভালো পায়রার সন্ধান মাঝে মাঝে আনিয়া টাকা লইয়া গিয়া কিনিয়া আনে। অনঙ্গ এজন্য নির্মলের উপর সন্তুষ্ট নয়। সে পায়রার কিছু বোঝে না, ভাবে নির্মল ফাঁকি দিয়া স্বামীর নিকট হইতে টাকা আদায় করে।

দুপুরের দিকে অনঙ্গ স্বামীর কাছে বসিয়া বলিল–তুমি আজকাল আমার সঙ্গে কথাও বলো না…

–কে বলেচে বলিনে?

–দেখতেই পাচ্চি। কাছে বসলে বিরক্ত হও।

–ওটা বাজে কথা। আসল কথাটা বলো কি–মতলবটা কি?

–আমাকে পঞ্চাশটি টাকা দাও।

–অনেকক্ষণ বুঝেছি, এইরকম একটা কিছু হবে।

–দেবে?

–কি হবে শুনি?

–তা বলবো না।

গদাধর হাসিয়া স্ত্রীর মুখের কাছে হাত নাড়িয়া বলিলেন–তবে যদি আমিও বলি, দেবো না?

অনঙ্গ ডান হাতে ঘুষি পাকাইয়া তক্তপোশের উপর কিল মারিয়া বলিল–আলবৎ দিতে হবে!

–কখন দরকার?

–আজই। এক জায়গায় পাঠাবো।

গদাধর বিস্ময়ের সুরে বলিলেন–পাঠাবে? কোথায় পাঠাবে?

অনঙ্গ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অপেক্ষাকৃত গম্ভীর ও বিমর্ষ ভাবে বলিল–দাদার কাছে।

গদাধর আর কোনো কথা কহিলেন না। শুধু বলিলেন-আচ্ছা, গদিতে গিয়ে পাঠিয়ে দেবো-এখন।

তাঁহার এই বড় শালাটি মানুষ নয়, টাকা ওড়াইতে ওস্তাদ। বাপের অতবড় বিষয়টা নষ্ট করিয়া ফেলিল এই করিয়া। ছোট বোনের কাছে মাঝে মাঝে হয়তো অভাব জানায়–স্নেহময়ী অনঙ্গ মাঝে মাঝে কিছু দেয় দাদাকে–ইহা লইয়া গদাধর বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করিতে চান না।

কিন্তু একদিন এমন একটি ব্যাপার ঘটিল, যাহা গদাধর কখনো কল্পনা করেন নাই! বৈকালের দিকে ঘুম হইতে উঠিয়া তিনি গদির দিকে যাইতেছেন, এমন সময়ে একখানি গরুরগাড়ি তাঁহার বাড়ির দিকে যাইতে দেখিয়া পিছনে ফিরিয়া সেখানার দিকে চাহিয়া রহিলেন। গাড়ি তাঁর বাড়ির সামনে থামিল। দূর হইতে তিনি বেশ দেখিতে পাইলেন–একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রীলোক গাড়ি হইতে নামিল–পুরুষটিকে তাঁহার বড় শালা বলিয়া বোধ হইল, কিন্তু স্ত্রীলোকটি কে? বড় শালা তো বিপত্নীক আজ বছর দুই…ও-বয়সের অন্য কোনো মেয়েও তো শ্বশুরবাড়িতে নাই!

গদাধর একবার ভাবিলেন, বাড়িতে গিয়া দেখিবেন নাকি? পরক্ষণেই মুখ ফিরাইয়া গদির দিকে চলিলেন। দরকার নাই ওসব হাঙ্গামার মধ্যে এখন যাওয়ার। গদিতে গিয়াই লোক দিয়া পঞ্চাশটি টাকা স্ত্রীর নিকট পাঠাইয়া দিলেন।

গদির কাজ শেষ হইতে রাত হইয়া গেল। গদাধর বাড়ি ফিরিবার পথে ভাবিলেন, যদি শালাটি বাড়িতে থাকে, তবে তো মুশকিল! বড় শালাটি তাঁহার মধ্যে মধ্যে আসে বটে, কিন্তু গদাধরের সঙ্গে তার তত সদ্ভাব নাই। থাকিলেও আতিথ্যের খাতিরে কথাবার্তা বলিতে হইবে–কিন্তু তিনি সেটা অপ্রীতিকর কর্তব্য বলিয়া মনে করেন। তার চেয়ে নির্মলের বাড়ি বেড়াইয়া একটু রাত করিয়া ফেরা ভালো।

নির্মল বলিল–কি ভাই, বড় ভাগ্যি যে আমার বাড়ি তুমি এসেছো!

–একটু দাবা খেলবে?

–খেলো। চা খাবে?

–নিশ্চয়ই। চা খাবো না কি-রকম?

নির্মলের অবস্থা ভালো নয়। পাঁচিল ঘেরা উঠানের তিনদিকে তিনখানি খড়ের ঘর, একখানি ছোট রান্নাঘর–পিছনদিকে পাতকুয়া ও গোয়াল। ঘরের আসবাবপত্রের অবস্থা হীন, তক্তপোশের উপর ময়লা কাঁথাপাতা বিছানা। এতখানি রাত হইয়া গিয়াছে, এখনও বিছানা কেহ পাট করিয়া পাতে নাই–সকালবেলার দিকে যে লেপখানা উল্টাইয়া ফেলিয়া বিছানা ছাড়িয়া লোক উঠিয়া গিয়াছে– সেখানা এত রাত পর্যন্ত সেই একই অবস্থায় পড়িয়া। ইহাতে আরও মনে হয়, বাড়ির মেয়েরা, বিশেষ গৃহকর্ত্রী অগোছালো।

গদাধরকে সেই তক্তপোশেরই একপাশে বসিতে হইল।

নির্মল বলিল–ওহে, একটা কথা শুনেচো? মঙ্গলগঞ্জের কুঠী বাড়ি বিক্রি হচ্চে।

–কোথায় শুনলে?

–রাধানগর থেকে লোক গিয়েছিল আজ কোর্টের কাজে সেখানে কার মুখে শুনেচে।

–বেচবে কে?

–মালিকের ছেলে স্বয়ং। কিনে রাখো না বাড়িখানা!

–হ্যাঁ, আমি অত বড় বাড়ী কিনে কি করবো? তার ওপর পুরানো বাড়ি। একবার ভাঙতে শুরু হলে, সারাতে পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যাবে! লোক নেই, জন নেই নির্জন জায়গায় বাড়ি, ভূতের ভয়ে দিনমানেই গা ছমছম করবে।

-আরে, না না–নদীর ওপর অমন খোলা আলোবাতাসওয়ালা চমৎকার জায়গা। কিনে রাখো–সস্তায় হবে, আমার লোক আছে।

–কি রকম?

মালিকের ছেলের সঙ্গে আমার মামাতো-ভাই শচীনের খুব আলাপ। তাকে দিয়ে ধরতে পারি।

–কত টাকায় হতে পারে মনে হয়?

–তা এখন কি করে বলবো? তুমি যদি বলো, তবে জিগ্যেস করি।

এই সময় নির্মলের স্ত্রী সুধা চা ও বাটিতে তেল-মাখা মুড়ি লইয়া আসিল। গদাধর বললেন–এই যে সুধা বৌঠাকরুণ, আজকাল। আমাদের বাড়ির দিকে যাও-টাও না তো?

সুধা একসময়ে হয়তো দেখিতে মন্দ ছিল না–বর্তমানে সংসারের অনটনে ও খাটাখাটুনিতে, তার উপর বৎসরে সন্তান প্রসবের ফলে যৌবনের লাবণ্য ঝরিয়া গিয়া দেহের গড়ন পাকসিটে ও মুখশ্রী প্রৌঢ়ার মত দেখিতে হইয়াছে–যদিও সুধার বয়স এই ত্রিশ। সুধা হাসিয়া বলিল–কখন যাই বলুন? সংসারের কাজ নিয়ে সকাল থেকে সন্দে পর্যন্ত নিঃশ্বাস ফেলতে পারিনে। শাশুড়ী মরে গিয়ে অবধি দেখবার লোক নেই আর কেউ। আপনার বন্ধুটি তো উঁকি মেরে দেখেন না, সংসারের কেউ বাঁচলো না মরলো! এত রাত হয়ে গেল–এখনও রান্না চড়াতে পারি নি, বিছানা গোছ করতে পারিনি! আপনি এই বিছানাতেই বসেচেন–আমার কেমন লজ্জা করচে।

-না না, তাতে কি, বেশ আছি।

-মুড়ি এনেচি, কিন্তু আপনার জন্যে নয়–ওঁর জন্যে। আপনি কি তেলমাখা মুড়ি খাবেন?

–কেন খাবো না? আমি কি নবাব খানজা খাঁ এলাম নাকি? বৌ-ঠাকরুণ দেখছি হাসালে!

–তা নয়, একদিন মুড়ি খাইয়ে শরীর খারাপ করিয়ে দিলে, অনঙ্গ-দি আমায় বকে রসাতল করবে।

গদাধর হাসিয়া বলিলেন–দোহাই বৌ-ঠাকরুণ, তাকে আর যাই বলো বলবে–কিন্তু এই চা খাওয়ানোর কথাটা যেন কখনো তার কানে না যায়, দেখো! তাহলে তোমারও একদিন–আমারও একদিন!

আরো ঘণ্টাখানেক দাবা খেলিবার পরে গদাধর বাড়ি ফিরিলেন। বাড়ির চারিধারে বাঁশবনের অন্ধকারে ভালো পথ দেখা যায় না। বাড়ি ঢুকিবার পথে সেই গরুরগাড়িখানা দেখিতে পাইলেন না।

ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া দেখিলেন, অনঙ্গ বসিয়া বসিয়া সেলাই করিতেছে–ঘরে কেহ নাই। গদাধর বলিলেন–রান্না হয়ে গিয়েচে?

অনঙ্গ মুখ তুলিয়া বলিল–এসো। এত রাত?

–নির্মলের বাড়ি দাবা খেলতে গিয়েছিলুম।

–হাত-মুখ ধোবার জল আছে বাইরে, দোরটা বন্ধ করে দাও–বড্ড শীত।

গদাধর আড়চোখে চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন–তাঁহার অনাহূত অতিথির চিহ্নও নাই কোনো দিকে। তবে কি চলিয়া গেল? কিংবা বোধহয় পাশের ঘরে শুইয়া পড়িয়াছে! কিন্তু বস্ত্র পরিবর্তনের অছিলায় পাশের ঘরে গিয়া, সেখানেও কাহাকে দেখিলেন না।

অনঙ্গ ডাকিল–খাবে এসো।

গদাধর এ-সন্দ ও-সন্দ করিতে করিতে খাইয়া গেলেন। নিজ হইতে তিনি কোনো কথা তুলিলেন না বা অনঙ্গও কিছু বলিল না। আহারাদি শেষ করিয়া গদাধর শুইয়া ভাবিতে লাগিলেন, ব্যাপারখানা কি? বড় শালা কাহাকে লইয়া বাড়িতে আসিল…সে গেলই বা কোথায়…তাহার আসিবার উদ্দেশ্যই বা কি…অনঙ্গ কিছু বলে না কেন?

সে রাত্রি এমনি কাটিয়া গেল।

পরদিন গদাধর চা খাইতে বসিয়াছেন সকালে, অনঙ্গ সামনে বসিয়া নিম্নকণ্ঠে বলিল–ওগো, একটা কাজ করে ফেলেচি– বকবে না বলো!

-কি?

–আগে বলো, বকবে না?

–তা কখনো হয়? যদি মানুষ খুন করে থাকো, তবে বকবো না কি-রকম?

–সে-সব নয়। কাল দাদা এসেছিল, তার একশো টাকার নাকি বড় দরকার। তোমাকে লুকিয়ে দিতে হবে। আমি তোমাকে লুকিয়ে কখনো কোনো কাজ করেচি কি? এ-টাকাটা আমি দিয়েছি কিন্তু।

–খুব অন্যায় কাজ করেচো। এ-টাকা সেই পঞ্চাশ টাকা বাদে?

–হ্যাঁ-না–হ্যাঁ, তা বাদেই।

গদাধর আশ্চর্য হইয়া গেলেন। পঞ্চাশ টাকা তিনি স্বেচ্ছায় দিয়ে গেলেন, ইহাই যথেষ্ট। আবার তাহা বাদে আরও একশো টাকা লোকটা ঠকাইয়া আদায় করিয়া লইয়া গেল? তিনি গরুরগাড়ি হইতে শালাকে নামিতে দেখিয়া তখনই ফিরিয়া আসিলে পারিতেন–তাহা হইলে এই একশো টাকা আক্কেল-সেলামি দিতে হইত না! বলিলেন–সে গুণ্ডাটা একা ছিল?

–ও আবার কি ধরণের কথা দাদার ওপর? অমন বলতে নেই, ছিঃ! হোক, আমার দাদা, তোমার গুরুজন। আমাদের আছে, আত্মীয়-স্বজনের বিপদে-আপদে হাত পেতে যদি কেউ চায়, দিতে দোষ নেই। দাদার সম্বন্ধে অমন বলতে আছে? তার বুঝ সে বুঝবে–আমরা ছোট হতে যাই কেন?

গদাধর আরও রাগিয়া বলিলেন–টাকা আমার গুণ্ডাবদমাইশদের মধ্যে বিলিয়ে দেবার জন্যে হয় নি তো? কেন বলবো না, একশোবার বলবো। এ কেমন অত্যাচার শুনি? আছে বলেই ভগ্নিপতির কাছ থেকে তার সিন্দুক ভেঙে টাকা নিয়ে যাবে?

–সিন্দুক ভেঙে তো নেয় নি–কেন মিছে চেঁচামেচি করচো!

–আমি এসব পছন্দ করি নে। সকাজে টাকা ব্যয় করতে পারা যায়–তা ব’লে এই সব জুয়োচোর আর গুণ্ডাকে…।

–আবার ওই সব কথা দাদাকে? ছি, অমন বলতে নেই! গেল গেল, তবু তো লোকের কাছে ছোট হলাম না।

–এ আবার কেমন বড় হওয়া? তোমাকে মেয়েমানুষ পেয়ে ঠকিয়ে নিয়ে গেল টাকাটা! আমি থাকলে…

–যাক্, আর কোনো খারাপ কথা মুখ দিয়ে বার কোরো না! হাজার হোক, আমার দাদা…

–একা ছিল?

-কেন?

-বলো না।

–সে কথা বললে আরও রাগ করবে। সঙ্গে কে একজন মাগী ছিল, আমি তাকে চিনিনে। আমার মনে হলো, ভালো নয়। আমি তাকে ঘরে-দোরে ঢুকতে দিই নি। অমন ধরণের মেয়েমানুষ দেখলে আমার গা ঘিনঘিন করে। সে বাইরে বসেছিল, ভদ্রতার খাতিরে চা আর খাবার পাঠিয়ে দিলাম–বাইরে বসে খেলে।

–কোত্থেকে তাকে জোটালে তোমার দাদা?

–কি করে জানবো? তবে আমার মনে হলো, টাকাটা ওই মাগীকেই দিতে হবে দাদার। ভাবে তাই মনে হলো। দাদা দেনদার, মাগী পাওনাদার–দাদার মুখ দেখে মনে হলো, টাকা না দিলে তাকে অপমান হতে হবে।

–ওসব ঢং অনেক দেখেচি। ছি ছি, আমার বাড়িতে এই সব কাণ্ড। আর তুমি কি না…

–লক্ষ্মীটি, রাগ কোরো না। আমার কি দোষ, বলো? আমি কি ওদের ডেকে আনতে গিয়েছি? আমি তাই দেখে দাদাকে এখানে থাকতে খেতে পর্যন্ত অনুরোধ করি নি। টাকা পেয়ে চলে গেল, আমি মুখে একবারও বলি নি যে রাতটা থাকো। আমার গা কেমন করছিল, সত্যি বলচি, মাগীটাকে দেখে!

–যাক্, খুব হয়েচে। আর কোনোদিন যেন তোমার ওই দাদাটিকে…

–আচ্ছা সে হবে। তুমি কিন্তু কোনো খারাপ কথা মুখ দিয়ে বার কোরো না, পায়ে পড়ি–চুপ করে থাকো।

গদাধর আর কিছু না বলিয়া চুপ করিয়া গেলেন।

এক সপ্তাহের মধ্যে মঙ্গলগঞ্জের কুঠী সম্বন্ধে নির্মল কয়েকবার তাগাদা করাতে একদিন তিনি নৌকাযোগে কুঠীবাড়ি দেখিতে গেলেন–সঙ্গে রহিল নির্মল। নৌকাপথে দুই ঘণ্টার মধ্যে তাঁহারা কুঠীবাড়ির ঘাটে গিয়া পৌঁছিলেন। সে-কালের আমলের বড় নীলকুঠীঘাট হইতে উঠিয়া দু’ধারে ঝাউগাছের সারি, মস্ত বাঁধানো চাতাল–বাঁ-ধারে সারি সারি আস্তাবল ও চাকরবাকরদের ঘর। খুব বড় বড় দরজা-জানলা। ঘর-দোরের অন্ত নাই–ঘোড়াদৌড়ের মাঠের মত সুবিস্তীর্ণ ছাদে উঠিলে অনেকদূর পর্যন্ত নদী, গ্রাম সব নজরে পড়ে।

দেখিয়া-শুনিয়া গদাধর বলিলেন–জায়গা খুব চমৎকার বইকি!

–দেখলে তো?

–সে-বিষয়ে কোনো ভুল নেই যে, পাঁচ হাজারের পক্ষে বাড়ি খুব সস্তা।

–এর দরজা-জানলা যা আছে, তারই দাম আজকালকার বাজারে দেড় হাজার টাকার ওপর–তা ছাড়া কড়িবরগা, লোহার থাম, এসব ধ’রে…

–সবই বুঝলুম, কিন্তু এখানে কোনো গ্রাম নেই নিকটে, হাট নেই, বাজার নেই–এখানে বাস করবে কে? এত ঘর-দোর যে গোলকধাঁধার মত ঢুকলে সহজে বেরুনো যায় না–এখানে কি আমাদের মত ছোট গেরস্ত বাস করতে পারে? দাসদাসী চাই, দারোয়ান সইস চাই, চারিদিকে জমজমাট চাই, তবে এখানে বাস করা চলে। নীলকুঠীর সাহেবদের চলেছে–তা বলে কি আমার চলে, না তোমার চলে?

নির্মল যেন কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ণ হইয়া বলিল–তাহলে নেবে না?

–তুমিই বুঝে দেখ না। নিয়ে আমার সুবিধে নেই। ভাড়াও চলবে না এখানে।

–তবু একটা সম্পত্তি হয়ে থাকতো!

–নামেই সম্পত্তি। যে সম্পত্তি থেকে কিছু আসবার সম্পর্ক নেই, সে আবার সম্পত্তি–রেখে দাও তুমি।

কুঠীবাড়ি হইতে ফিরিবার পথে নির্মল এমন একটা কথা বলিল, যাহা গদাধরের খুব ভালো লাগিল। অনেক বাজে কথার মধ্যে নির্মল এবার এই একটা কাজের কথা বলিয়াছে বটে!

গদাধরের কি একটা কথার উত্তরে নির্মল বলিল–ব্যবসা তাহলে কলকাতায় উঠিয়ে নিয়ে চলো, সেখানে বাড়ি করো– ভাড়া হবে, থাকাও চলবে।

কোন সময়ে কি কথায় কি হয়, কিছু বলা যায় না। নির্মল হয়তো কথাটা বিদ্রূপের ছলেই বলিল; কিন্তু গদাধরের প্রাণে লাগিল কথাটা। গদাধর নির্মলের দিকে চাহিয়া রহিলেন। তাঁহার মনে হইল, মঙ্গলগঞ্জের কুঠীবাড়ি একগাদা টাকা দিয়া কিনিতে আসিবার পূর্বে তাঁহার এ-কথা বোঝা উচিত ছিল যে, এখানে টাকা ঢালা আর টাকা জলে ফেলা সমান। কিন্তু কলকাতায় অনায়াসেই বাড়িও করা যায়…ব্যবস্যা ফাঁদা যায়। এখানে এই ম্যালেরিয়া জ্বরে বারোমাস কষ্ট পাওয়া–একটা আমোদ নেই, দুটো কথা বলবার লোক নেই…তার চেয়ে কলকাতায় যাওয়া ভালো। সেখানে ব্যবসা ফাঁদলে দু’পয়সা সত্যিকার রোজগার। হয়।

নির্মল বলিল–তাহলে কুঠীবাড়ি ছেড়ে দিলে তো?

–হ্যাঁ, এ একেবারে নিশ্চয়।

সারাপথ নির্মল ক্ষুণ্ণমনে ফিরিল।

বাড়ি ফিরিলে অনঙ্গ আগ্রহের সুরে বলিল–হ্যাঁগো, হলো? কি রকম দেখলে কুঠীবাড়ি?

–বাড়ি খুব ভালো। তবে সে কিনে কোনো লাভ নেই। মস্ত বাড়ি, কাছে লোক নেই, জন নেই। আর সে অনেক ঘর-দোর, আমরা এই ক’টি প্রাণী সে-বাড়িতে টিম টিম্‌ করবো–লোক লশকর, চাকর-বাকর নিয়ে যদি সেখানে বাস করা যায়, তবেই থাকা চলে।

অনঙ্গ বলিল–সেখানে বাস করবার জন্যই ও-বাড়ি কিনছিলে নাকি? তা কি করে হয়? এখানে সব ছেড়ে কোথায় মঙ্গলগঞ্জে বাস করতে যাবো? এমন বুদ্ধি না হলে কি আর ব্যবসাদার? আমি ভেবেচি, কুঠীবাড়ি সস্তায় কিনে রাখবে! তা ভালোই হয়েচে, তোমার যখন মত হয় নি, দরকার নেই।

গদাধর ভাবিয়া-চিন্তিয়া কথা বলেন। হঠাৎ কোনো কাজ করা তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ নয়। রাত্রে তিনি স্ত্রীকে কলিকাতায় যাওয়ার কথাটা বলিলেন।

অনঙ্গ বিস্ময়ের সুরে বলিল–কলকাতায় যাবে। এসব ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় সুবিধে হবে?

–কেন হবে না? ব্যবসা সেখানে ভালো জমবে।

–বাসও করবে সেখানে?

–এখানে বাড়িসুদ্দ ম্যালেরিয়ায় ভুগে মরচি, বছরে তিন-চার মাস সবাই ভুগে মরি। ছেলেদের লেখাপড়া শেখা, মানুষের মত মানুষ হবার সুবিধা, আমার মনে হয় সেই ভালো। কাল আমি কলকাতায় ওদের আড়তে চিঠি লিখি, তারপর দু’এক দিনের মধ্যে নিজে গিয়ে একবার দেখে আসি।

–যা ভালো বোঝো করো। কিন্তু আমার কি মনে হয় জানো?

–কি?

–এ গ্রামের বাস ছেড়ে আমাদের কোথাও যাওয়া ঠিক হবে। না। বাপ-পিতেমোর আমলের বাস এখানে…।

–বাপ-পিতেমোর ভিটে আঁকড়ে থাকলে চলবে না তো, সবদিকে সুবিধে দেখতে হবে। এখানে টাকা থাকলেও, খাটাবার সুবিধে নেই। ছেলেরা বড় হলে ওদের লেখাপড়া শেখানো তাছাড়া অন্যরকম অসুবিধেও আছে। আমার মনে লেগেছে নির্মলের কথাটা, সেই প্রথমে এ কথা তোলে।

–নির্মল-ঠাকুরপোর সব কথা শুনো না–এ আমি তোমায় অনেকদিন বলে দিয়েচি। বড্ড ওর পরামর্শে তুমি চলো!

-কই আর শুনলুম, তাহলে তো ওর কথায় কুঠীবাড়িই কিনে ফেলতুম। মিথ্যে অপবাদ দিও না বলচি।

অনঙ্গ হাসিয়া ফেলিল।

বছর কাটিয়া গিয়া বৈশাখ মাস পড়িল।

বছরের শেষে পাট ও তিসির দরুণ হিসাব করিয়া দেখা গেল যে, প্রায় নিট ছ’হাজার টাকা লাভ দাঁড়াইয়াছে। ভড় মহাশয় হিসাব করিয়া মনিবকে লাভের অঙ্কটা বলিয়া দিলেন। আড়তে একদিন কর্মচারীদের বিরাট ভোজের ব্যবস্থা হইল।

অনঙ্গ বলিল–একদিন গ্রামের বিধবাদের ভালো করে খাওয়ানো আমার ইচ্ছে–কি বলো?

গদাধর খুশী হইয়া বলিলেন–ভালোই তো। দাও না খাইয়ে। কি কি লাগবে, বলো?

সে কার্য বেশ সুচারুরূপেই নিষ্পন্ন হইল। ব্রাহ্মণ-বিধবা যাঁরা, তাঁরা গদাধরের বাড়িতে খাইবেন না–অন্যত্র তাঁহাদের জন্য জিনিসপত্র দেওয়া হইল–তাঁহারা রাঁধিয়া-বাড়িয়া খাইবেন। বাকী সকলের জন্য অনঙ্গ নিজের বাড়িতেই ব্যবস্থা করিল।

সেই রাত্রেই গদাধর স্ত্রীকে বলিলেন–সব ঠিক করে ফেলি, বলো–তুমি কথা দাও!

অনঙ্গ বিস্ময়ের সুরে বলিল–কি ঠিক করবে? কি কথা?

–এখান থেকে কলকাতায় গিয়ে আড়ত খুলি। দ্যাখো, এবারকার লাভের অঙ্ক দেখে আমার মনে হচ্চে, এই আমাদের ঠিক সময়! সামনে আমাদের ভালো দিন আসচে। পাড়াগাঁয়ে পড়ে থাকলে ছোট হয়ে থাকতে হবে। কলকাতায় যেতেই হবে।

–আচ্ছা, এ পরামর্শ কে দিলে বলো তো সত্যি করে?

–অবিশ্যি নির্মল বলচিল, তাছাড়া আমারও ইচ্ছে।

–তুমি যা ভালো বোঝো করবে, এতে আমার বলবার কিছু নেই–কিন্তু গাঁ ছেড়ে, ভিটে ছেড়ে চলে যাবে, তাই বলচিলুম! এই দ্যাখো না কেন, আজ সব এ-পাড়ার ও-পাড়ার বিধবারা এখানে খেলেন, কি খুশীই সব হলেন খেয়ে! ধরো ওই মান্তীর মা, খেতে পায় না–স্বামী গিয়ে পর্যন্ত দুর্দশার একশেষ। তার পাতে গরম গরম লুচি দিয়ে আমার যেন মনে হলো, এমন আনন্দ তুমি আমায় হাজার থিয়েটার-যাত্রা দেখালেও পেতুম না! আহা, কি খুশী হলো খেয়ে! দেখে যেন চোখে জল আসে! এদের ছেড়ে যাবো–কোথায় যাবো, সেখানে গিয়ে কিভাবে থাকবো, তাই কেবল ভাবচি!

গদাধর হাসিয়া বলিলেন–নতুন কাজ করতে গেলে সাহস করতে হয় মনে, নইলে কি হয়? এতে ভাবনার কিছু নেই। আমি একটা ছোটখাটো বাড়ির সন্ধান পেয়েছি, বায়না করে ফেলি তুমি কি বলো?

–যা তোমার মনে হয়। যদি বোঝো, তাতে সুবিধে হবে, তাই করো।

পরদিন নির্মলকে কলকাতায় গিয়া বাড়ি বায়না করানোর জন্য গদাধর পাঠাইয়া দিলেন এবং বৈশাখ মাসের শেষে এখান হইতে কলিকাতায় যাওয়ার সব ঠিকঠাক হইয়া গেল।

ভড় মহাশয় একদিন বলিলেন–বাবু, একটা কথা বলবো?

–কি বলুন?

–আমার এতদিনের চাকরিটা গেল?

–কেন, গেল কি-রকম?

–এখানে আড়ত রাখবেন না তো?

–তা ঠিক বলা যায় না। কিন্তু আপনি তো কলকাতায় যাবেন!

–ঐখানে আমায় মাপ করতে হবে বাবু। কলকাতায় গিয়ে আমি থাকতে পারবো না। অভ্যেসই নেই বাবু–মাঝে মাঝে আপনার কাজে বেলঘাটা-আড়তে যাই–চলে আসতে পারলে। যেন বাঁচি।

–কেন বলুন তো ভড়মশায়?

–ওখানে বড় শব্দ দিন-রাত। আমার জন্মে অভ্যেস নেই বাবু, অত শব্দের মধ্যে থাকা। আমরা পাড়াগেঁয়ে মানুষ, ওখানে থাকা কি আমাদের পোষায়? আমার বেয়াদবি মাপ করবেন বাবু, সে আমার দ্বারা হবে না।

নির্মল আসিয়া একদিন বলিল, ওহে, তাহ’লে দু’খানা লরি করে মালপত্র ক্রমশ পাঠাই কলকাতায়?

গদাধর বলিলেন–কিন্তু তোমার বৌ-ঠাকরুণ বলছেন, এখানে কিছু জিনিস থাক। এবাড়ির বাস একেবারে উঠিয়ে দিচ্ছিনে তো আর– মাঝে মাঝে আসবো-যাবো…

–সে তো রাখতেই হবে। তবে সামান্য কিছু রাখো এখানে। জিনিসপত্র এখানে থাকলে দেখবার লোকের অভাবে নষ্ট হবে বই তো নয়!

–তাই বলচিল তোমার বৌ-ঠাকরুণ। এখানেও পৈতৃক বাড়ি বজায় রাখা আমারও মত। শুভদিন দেখিয়া সকলে কলিকাতায় রওনা হইলেন। নির্মল সঙ্গে গেল। ঠিক হইল, ভড় মশায় আপাততঃ কয়েক মাসের জন্য কলিকাতার আড়তে থাকিয়া কাজকর্ম গুছাইয়া বন্দোবস্ত করিয়া দিয়া আসিবেন–তবে উপস্থিত নয়, মাসখানেক পরে আড়তের কাজ অল্প একটু চালু হইলে তার পর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *