দেবযান (উপন্যাস) – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেয়ার করুনঃ

১৫.

পৃথিবীর হিসেবে দীর্ঘ দু বছর কেটে গেল।

 

সেদিন পুষ্প ও যতীন বসে কথা বলচে বুড়োশিবতলার ঘাটে, এমন সময় পুষ্প হঠাৎ চীকার করে বল্লে–এই! থামোথামো–খবরদার–

 

পরক্ষণেই সে ব্যাকুল, উদ্বিগ্ন মুখে বহুদূর আকাশের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বল্লে–যতীনদা, যতীনদা–

 

যতীন বিস্মিত সুরে বল্লে–কি হোল? পুষ্প বল্লে–কিছু না। যতীন নাছোড়বান্দা, সে বার বার বলতে লাগলো–কি হোল বল না পুস্প? বলবে না?

 

অবশেষে পুষ্প বল্লে–আশা বৌদিকে খুন করতে যাচ্চে তার সেই উপপতি নেত্য

 

–সে কি!

 

–ঐ যে দেখতে পাচ্ছ না?

 

যতীন ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে বলে–চলো চলো ছুটে যাই সামলাই গিয়ে– আমি তো কোনো দিকে কিছু দেখচি নে–ওঠো।

 

বিস্মিত যতীন পুষ্পের দিকে চেয়ে দেখলে যে তার যাবার কোন। ব্যস্ততা নেই। সে চুপ করে বসেই রইল, কিছুক্ষণ পরে পুষ্পের বিশাল আয়ত চোখ দুটি বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।

 

যতীন বল্লে–কি হয়েছে, চলো চলো–

 

–গিয়ে কি হবে। এ যাত্রা রক্ষা হোল গিয়ে–

 

–বেঁচে গিয়েছে?

 

–আপাতত বটে। আহা, কি দুঃখ আশা বৌদির!

 

–আমি সেখানে যাবো পুষ্প। চলো দেখা যাক–

 

–না।

 

–তোমার ওই সব কথা আমার ভাল লাগে না পুস্প, সত্যি বলছি। আমি আলবৎ যাবো সেখানে। আমার মন কেমন হচ্চে বল তো?

 

–সেজন্যেই তোমার আরও যাওয়া উচিত নয়। দেখে কষ্ট পাবে খুব।

 

-চলো পুষ্প, তোমার পায়ে পড়ি, আচ্ছা তুমি বোঝ সব, অথচ মাঝে মাঝে–

 

অগত্যা পুষ্প ওকে নিয়ে কলকাতায় আশার বাসায় এসে উপস্থিত হোল। তখন যতীন বুঝতে পারলে কেন পুষ্প এখানে তাকে আনতে চায় নি। নেত্য আজকাল মদ খায়, মাতাল অবস্থায় এসে দিন-দুপুরে সে আশাকে এমন মার দিয়েছে যে, সে ঘরের মেঝেতে পড়ে ভয়ার্ল্ড চোখে দুর্দান্ত মাতালটার দিকে চেয়ে আছে। দরজার চৌকাঠের এপারে একখানা নেপালী কুরি পড়ে, সম্ভবত নেত্যর হাত থেকে ঠিকরে পড়ে থাকবে। ওদের দোরের বাইরে আশপাশের ঘরের ভাড়াটেরা জড়ো হয়ে উঁকি মেরে মজা দেখচে। নেত্য মত্ত অবস্থায় টলচে ও হাত নেড়ে নেড়ে জোর গলায় আস্ফালন করছে–ওকে আমি আজ খুন করে ফেলবো–আচ্ছা পাল মশায়, আপনি বিচার করুন, ওকে কে খেতে দিচ্চে, পরতে দিচ্চে? ও দেশে না খেয়ে মরছিল কিনা ওকে জিজ্ঞেস করুন না? আমি মশাই হক কথা হক কাজ বড় ভালবাসি। আমি আনলাম ওকে এখানে, খাওয়াই পরাই, অথচ সেই শম্ভু ব্যাটা এসে তলায় তলায় ফুৰ্তি মারে। কত দিন পই পই করে বারণ করিচি-করি নি? তেমন পুরুষ বাপে নেত্যনারাণের জন্ম দেয় নি–আজ তোকে খুন। করে ফাঁসি যাবো, সেও থোড়াই কেয়ার করে এই শৰ্ম্মা। এত বড় তোর বদমাইসি! কম করেছি আমি তোর জন্যে? তোর নিজের বিয়ে করা ভাতার কোনো দিন তোকে খেতে দেয়নি, আর আমি কিনা.. দিয়েচে কোনো দিন সেই যতীন?

 

এই সময় আশা আধ-বসা অবস্থায় উঠে ঝাঁঝের সঙ্গে বল্লে–খবরদার! তিনি স্বগে গিয়েছেন, তাঁর নামে কিছু বোলো না–

 

নেত্য বিদ্রুপের সুরে বল্লে–ওরে আমার স্বামী-সোহাগী সতী রে! মারো মুখে ঝাঁটা, বলতে লজ্জাও করে না? আমি বলচি, না তুই বলতিস্ সেই যনেটা বেঁচে থাকতে? আবার স্বামী-সোহাগ দেখাতে এসেচেন, মরণ নেই? ভারি স্বামী ছিল মুরোদের, সব জানি, বিয়ে করে একখানা কাপড় কিনে দেবার, এক মুঠো অন্ন দেবার ক্ষমতা হয় নি–

 

আশা আবার উঠে বল্লে–আবার ওই কথা! তিনি মরে স্বগগে গিয়েছেন, তাঁর নামে কেন বলবে তুমি?

 

নেত্য হঠাৎ তেড়ে এসে আশার কাঁধে এক লাথি মেরে বল্লে– স্বামীর সোহাগ উথলে উঠলো বদমায়েশ মাগীর, যে বেরিয়ে এসেছে তার মুখে আবার–গলায় দড়ি দিগে যা–

 

আশার চেহারা আগের চেয়ে খুব খারাপ হয়ে গিয়েচে, গায়ের রঙেও আগের মত জলুস নেই, লাথি খেয়ে সে কিন্তু এবার ঠেলে

 

উঠলো। বল্লে–তাই দেবো, গলায় দড়ি দিয়ে তোমায় পুলিশের হাতে যদি তুলে না দিই–

 

-চুপ–পুলিশ তোর বাবা হয়!

 

–আবার মুখে ওই সব কথা?

 

এইবার একটি প্রৌঢ়া স্ত্রীলোক এগিয়ে ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়ালো। বল্লে–এসব আপনাদের কি কাণ্ড? আপনার না ভদ্র লোক? আশপাশের বাড়ীতে গেরস্তর ঝি-বউ সব রয়েছে, এখানে মদ খেয়ে চেঁচামেচি চলবে না। হ্যাংগামা করতে হয়, ন্যারা করতে হয়, সরকারী রাস্তা পড়ে রয়েছে। আমার বাড়ী ওসব করলে পুলিশে খবর দিতে হবে।

 

পালমশায় এবার বোধ হয় সাহস পেয়ে এগিয়ে এসে বল্লেন– আমিও তাই বন্ধু। বলি এখানে ওসব কোরোনি–তা মাতালের সামনে। এগোতে কি সাহস হয়!

 

প্রৌঢ়া স্ত্রীলোকটি আশাকে ধরে ঘরের বাইরে আনতে আনতে বল্লে–মাতালের সামনে তক্‌কো কত্তে আছে, ছিঃ মা–দেখচো না ওর এখন কি ঘটে জ্ঞান আছে? এসো আমার ঘরে

 

আশা চলে যায় দেখে নেত্য জড়িত কণ্ঠে বাজখাঁই আওয়াজে বল্লে– এই, কোথাও যাবিনি বলে দিচ্চি–হাড় ভাঙবো মেরে–খবরদার! এই। আমি এখন চা আর ডিম ভাজা খাবো–করে না দিয়ে যদি নড়বি– নিয়ে যেও না মাসী–

 

প্রৌঢ়া স্ত্রীলোকটি যেতে যেতে বল্লে–আচ্ছা, চা করে ডিম ভেজে আমার ঘর থেকে পাঠিয়ে দিচ্চি বাবা–আপনি একটু শান্ত হয়ে শুয়ে থাকুন–

 

পালমশায় উপস্থিত লোকজনদের দিকে চেয়ে বল্লে–চলো সব। চলো, কি দেখতে এসেচো সব? দুটো হাত পা বেরিয়েচে কারো, না ঠাকুর উঠেচে? বনু তখন ওখানে যেওনি, যে বড় কে বাপের ব্যাটা।

 

শেষের কথা ক’টি পৌরুষগর্বের উচ্চারণ করবার সময় তিনি নেত্যনারায়ণদের ঘর থেকে বেশ একটু দূরে বারান্দার প্রায় ওপাশে চলে গিয়েচেন যদিও, তবুও চলতে চলতে একবার পেছন ফিরে দেখে নিলেন, দুর্দান্ত মাতালটা তাঁর কথা শুনলো কিনা।

 

যতীন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বল্লে এতদূর নেমেচে ওর অবস্থা। এ। আমি ভাবিনি–

 

পুষ্প বল্লে–ভাবা উচিত ছিল, এ সব জিনিসের এই কিন্তু পরিণাম এখান থেকে চলো যাই–

 

যতীন চুপ করে বসে ছিল, আশার দুর্দশা তার মনে গভীর রেখাপাত করেছে। সে দুঃখিত ভাবে বল্লে–তুমি কেবলই এসে চলে যেতে চাও, কিন্তু আমি কোথায় গিয়ে শান্তি পাবো পুষ্প? আমার কর্ত্তব্য পালন করিনি বলেই আজ ওর এই দুর্দশা। আমি যদি স্বামীর কর্তব্য পালন করতাম, যদি আশার জন্যে তেমন টাকাকড়ি রেখে যেতে পারতাম, তাহোলে–

 

–তোমার ভুল এখনো গেল না।

 

–কেন, ঠিক কথা বলচি কি না? ভুলটা কোথায়?

 

পুষ্প মৃদু হেসে ওর পাশে এসে বল্লে–তোমাকে এত ভাল ভাল জায়গায় নিয়ে গেলাম, তোমার বুদ্ধিটা যেমন স্কুল তেমনই রইল–

 

-কেন?

 

-আশা বৌদি নিজের কৰ্ম্মফলে এখনও অনেকদিন এই রকম ভুগবে। তুমি ওর কৰ্ম্মের বন্ধন কাটাতে পারো সাধ্যি কি? টাকা রেখে যেতে, টাকা সুদু চলে যেত। বড় লোকের ছেলেদের তো অনেক টাকা দিয়ে বাপ-মা মরে যায়–তারা উচ্ছন্ন যায় কেন?

 

–আমি এখানে থাকবো পুষ্প। ওকে ফেলে যেতে পারবো না এ ভাবে–

 

–তুমি কেন, দরকার হোলে আমিও থাকবো। এখানে থাকতে আমার রীতিমত কষ্ট হয়–তবুও আমি তোমার জন্যে, যদি আশা বৌদির এতটুকুও উপকার করতে পারতাম তবে এখানে থাকতে কিছু আপত্তি করতাম না। কিন্তু তুমি এখনও অনেক জিনিস বোঝে নি। এসব নিষ্ফল চেষ্টা। করুণাদেবীর মুখে শুনেচি করুণার পাত্র মেলানো। বড় দুর্ঘট। নয়তো করুণাদেবীর মত শক্তিশালিনী দেবী আশা বৌদিকে এখান থেকে উদ্ধার করতে পারেন না? এক্ষুনি পারেন–কিন্তু তাঁরা জানেন, তা হয় না। জীব নিজের চেষ্টায় উন্নতি করবে, বাঁশ দিয়ে ঠেলে উঁচু করে দিলে জীব উন্নতি করে না! নয়তো ভগবান এক পলকে সব পাপী উদ্ধার করতে পারতেন। তাঁর উদ্দেশ্য বুঝে কাজ করতে হয়। সে তুমি আমি বুঝিনে, কিন্তু করুণাদেবী, প্রেমদেবীর মত দেবদেবীরা অনেকখানি বোঝেন–তাই তাঁরা অপাত্রে–

 

–আমি না বুঝতে পারি, কিন্তু তুমি ঠিক বোঝো। তোমার দেখবার ক্ষমতা আমার চেয়ে অনেক বেশি। তবুও তোমার সঙ্গে এখানে ওখানে গিয়ে আমার অনেক উন্নতি হয়েচে আগেকার চেয়ে–এখন বুঝিয়ে বল্লে বুঝি। তোমার সেই সন্ন্যাসীর মতে এখন বোধ হয় আমার মুকুলিত চেতন–নয়তো বুঝিয়ে বল্লেও বুঝতাম না, মনে সংশয়। জাগতো, অবিশ্বাস জন্মাতো, তা হোলে সে সব তত্ত্ব আমার কোনো কাজে লাগতো না।

 

এই সময় নেত্যনারাণ ডাকতে লাগলো চেঁচিয়ে–ও আশা, শোনো এদিকে–এই আশা

 

প্রৌঢ়া বাড়ীওয়ালী বারান্দায় বার হয়ে বল্লে–একটু চা খাচ্চে, আপনাকেও পাঠিয়ে দিচ্ছি তৈরী হোলে। আশা এখন যেতে পারবে না।

 

নেত্য গরম মেজাজে বল্লে–কেন যেতে পারবে না–শুনতে পাই কি? ও আমার মেয়েমানুষ, আমি যখন ডাকবো, আলবৎ আসবে–ওর বাবা আসবে–

 

এই কথাটা যতীনের বুকে যেন গরম শূলের মত বিঁধলো। আশা তার স্ত্রী, বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে যার সঙ্গে সে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়েছে–সেই আশা অপরের ‘মেয়েমানুষ? নেত্যর হুকুমে তাকে চলতে হবে? যতীনের মাথা যেন ঘুরে উঠলো। এক মুহূর্তে সমস্ত দুনিয়া বিস্বাদ, মিথ্যে, জোলো হয়ে দাঁড়ালো-মস্ত একটা ফাঁকি, মস্ত একটা ধাপ্পাবাজির মধ্যে পড়ে গিয়েছে সে। পুষ্প-টুপ, সন্নিসি-টিন্নিসি সব এই মস্ত জুয়োচুরির অন্তর্গত ব্যাপার। নইলে অগ্নিসাক্ষী করে, হোম করে, বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে যাকে সে সহধৰ্ম্মিণী করেছিল–

 

কিংবা এই হয়তো নরক!

 

সে হয়তো নরক ভোগ করচে-স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য করেনি, জোর করে তাকে শ্বশুরবাড়ী থেকে এনে কাছে রেখে সংশোধনের চেষ্টা করে নি, ক্লীবের মত নিশ্চেষ্ট হয়ে ছিল, সেও তমোগুণ। তার জন্যেই এই দারুণ নরক তাকে স্বচক্ষে দেখতে হচ্চে, কে যেন টেনে নিয়ে আসচে এখানে, এই শোচনীয় দৃশ্য দেখতে কে যেন তাকে বাধ্য করচে, নিয়তির মত নিষ্ঠুর সে আকর্ষণ, রেহাই দেবে না তাকে।

 

পুষ্প বল্লে–চলো যতীনদা, আর এখানে থেকে কষ্ট পেয়ো না

 

যতীন দুঃখ মিশ্রিত হতাশার সুরে বল্লে–তুমি অতি করুণাময়ী। তুমি জানো যে এ আমার কৰ্ম্মফলের ভোগ, এ নরক। তুমি দয়া করে তাই কেবল এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইচ, আমি সব বুঝতে পেরেচি এবার। কিন্তু পুষ্প দয়াময়ী, আমার সাধ্যি কি, আমি যাই? চুম্বক যেমন লোহাকে টানে, আশার ভাগ্য ও আমার কর্মফল। পরস্পরকে তেমনি টানচে। টেনে আনচে কোথায় তোমাদের সেই তৃতীয় স্তর থেকে আমার সে টানে আসতেই হবে এবং আমি কোথাও যেতেও পারবো না।

 

পুষ্প দৃঢ়স্বরে বল্লে–তুমি দুৰ্বল হয়ে হাল ছেড়ে বসে থেকো না, সেও কি পুরুষের কাজ, বীরের কাজ? তা ছাড়া তোমাকে এই বন্ধন। থেকে বাঁচাবো আমি। নইলে তুমি বুঝতে পারছো না কি বিপদ তোমার সামনে।

 

কিন্তু যতীন কিছুতেই না যেতে চাইতে পুষ্প কিছুক্ষণের জন্যে পৃথিবীতে থেকে চলে গেল, বল্লে–পৃথিবীর ভোরের দিকে সে আবার ফিরে আসবে। কিন্তু রাত দুটোর পর নেত্য মদ্যপানের অবসাদে ঘুমিয়ে পড়াতে যতীন ভাবলে এবার সে স্বস্থানে ফিরতে পারে। আশা বাড়ীওয়ালীর ঘরেই ঘুমুচ্চে, সুতরাং এখন আর কোনো ভয় নেই, উদ্বেগ নেই। যেন ভয় উদ্বেগ থাকলেই সে ভয়ানক কিছু সাহায্য করতে পারতো!

 

পৃথিবী ছেড়ে বাইরের আকাশের তলায় এসে সে দেখলে শূন্যপথের সাধারণ চলাচলের মার্গগুলি একেবারে জনশূন্য। কেউ কোথাও নেই। যতীন একটু বিস্মিত হয়ে গেল। পৃথিবীর লোক না দেখতে পাক, কিন্তু অসীম ব্যোমের নানা স্থান দিয়ে বিশেষত ভূপৃষ্ঠ থেকে একশো দেড়শো গজের ওপর থেকেই মেঘপদবীর সমান্তরালে বা তদূদ্ধের বহ পথ সীমা-সংখ্যাহীন অনন্তের দিকে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছে। এই সব পথ কোনো বাঁধাধরা সুরকি সিমেন্টের তৈরী রাস্তা নয়–আত্মিক জীব, দেব-দেবী, উচ্চ জীবগণের গমনাগমন দ্বারা সুনির্দিষ্ট একটা অদৃশ্য জ্যোতি রেখা মাত্র।

 

সাধারণত বিশ্বের এই রাজমার্গগুলিতে আত্মিক পুরুষেরা সর্বদা যাতায়াত করেন, কিন্তু আজ সেখানে কেউ নেই–আরও ওপরে এসে যে স্থান ধূসরবর্ণ আত্মাদিগের অধিষ্ঠানভূমি, সেও জনহীন।

 

যতীন বুঝতে পারলে না, এরকম ব্যাপারের কারণ কি। আজ এত বছর সে এসেচে আত্মিকলোকের তৃতীয় স্তরে–কিন্তু এমন অবস্থা সে দেখেনি কখন। তাঁর মনে যেন কেমন ভয়ের সঞ্চার হোল। অথচ কিসের ভয় সে নিজেই জানে না। যে একবার মরেচে, সে আর মরবে না, তবে ভয়টা কিসের?

 

হঠাৎ যতীন দেখলে একটি লোক যেন আতঙ্কে চারিদিকে চাইতে চাইতে ঝড়ের বেগে উড়ে দ্বিতীয় স্তরের আত্মিক লোক থেকে আরো ঊর্ধ্বলোকের দিকে পালাচ্চে। পৃথিবী হোলে বলা চলতো লোকটা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাচ্চে। ব্যাপার কি? এর নিশ্চয় কোনো গুরুতর কারণ আছে।

 

যতীন তাঁকে কিছু বলতে গেল, কিন্তু তাঁর পূর্বেই লোকটা অন্তর্হিত হোল–মনে হোল পলায়মান ব্যক্তি যেন হাতের ইঙ্গিতে তাকে কি বল্লে–কি বিষয়ে সাবধান করতে গেল।

 

লোকটি অদৃশ্য হবার কিছু পরেই যতীনের মনে হোল কী এক ভীষণ টানে তাকে নীচের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অতি ভীষণ সে টানের বেগ, তিমির-প্রসারক যেন কোন্ বিশাল চৌম্বক শক্তি জগব্রহ্মাণ্ড চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তাঁর জাল বিস্তার করেছে–যতীনের সামনে, পাশে, দূরে, চারদিকে ঝড়ের মত কোথা থেকে সেই ভীষণ শক্তির লীলা এক মুহূর্তে ব্যাপ্ত হয়ে গেল। যতীন যেন ভীম আবর্তে তলাতল পাতালের

 

অভিমুখে কোথায় চলেচে..তার জ্ঞান লোপ পেয়ে আসচে…কেবল। এইটুকু সে লক্ষ্য করলে, শুধু সে নয়, ঝড়ের মুখে তার মত বহু জীবাত্মা কুটোর মত কোথায় চলেছে বিষম ঘূর্ণিপাকের টানে!…তারপর একটা আর্ত চীৎকার স্বর, এক কি বহু সম্মিলিত কণ্ঠের আর্তনাদ, যতীন ঠিক বুঝতে পারছে না, তার সংজ্ঞা নেই, অতিপ্রাকৃত কী এক বিষম শক্তির আমোঘ আকর্ষণ তাকে খেলার পতুলে পরিণত করেছে।

 

ভয়ানক অন্ধকার তার চারিদিকে, এই কি তলাতল পাতাল? পৃথিবী কোথায়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, চন্দ্র সূৰ্য্য কোথায়, পুষ্প কোথায়? করুণাদেবী কোথায়, হতভাগিনী আশা কোথায়–সব লুপ্ত, একেবারে! কোন্ রসাতলে সে চলেচে দুর্লঙ্ঘ্য আকর্ষণে।

 

অনেকক্ষণ…অনেক যুগ যেন কেটে গিয়েছে…জ্ঞান নেই যতীনের। অন্ধকার ছাড়া আর কোনদিকে কিছু নেই। বহুদিন সে কী এক গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিল। সব অন্ধকার…বিস্মৃতি…

 

পুষ্পের ডাকে তার চৈতন্য হোল। পুষ্প তাকে ডাকচে, ও যতীনদা, যতীনদা, বেরিয়ে এসো।

 

পুষ্প ও আর একজন তাকে প্রাণপণে ডাক দিচ্চে, যেন কতদূর থেকে…

 

যতীন বলে উঠলো–অ্যাঁ!

 

–শীগগির চলে এসো–ওঁ কৃষ্ণ, ওঁ কৃষ্ণ নাম উচ্চারণ করো–ওঁ কৃষ্ণ, ওঁ কৃষ্ণ, ওঁ কৃষ্ণ–

 

পুষ্প, পুষ্প ডাকচে!

 

যতীনের জ্ঞান একটু একটু ফিরে এসেচে–এ কোন্ স্থান।

 

কে যেন ওর হাত ধরলে এসে। পুষ্পের কণ্ঠস্বর ওর কানে গেল আবার। পুষ্প যেন কাকে বলচে–এবার যতীনদা বেঁচে গেল। তবে এখনও ঠিক জ্ঞান হয়নি–

 

আবার আত্মিকলোকের নির্মল বায়ুস্তরে ওর নিশ্বাসপ্রশ্বাস সহজ ও আনন্দময় হয়ে আসছে। যতীন জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখলে, সামনে। পুষ্প ও পুষ্পের মা। সে বিস্ময়ে ওদের দিকে চেয়ে বল্লে–কি হয়েছিল। বল তো? এ কি কাণ্ড! এমন তো কখনো–

 

তারপর সে চারিদিকে চেয়ে দেখে আরও অবাক হয়ে গেল। সে পৃথিবীর এক গরীব গৃহস্থের পুরোনো কোঠাঘরের মধ্যে। পৃথিবীতে রাত্রিকাল, সম্ভবত গভীর রাত্রি। বর্ষাকাল, বাইরে ঘোর অন্ধকার, টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে বাড়ীর পেছনের বাঁশবনে। ঘরের এক কোণে কিছু পেতল কাঁসার বাসন একটা জলচৌকির ওপরে, একটা পুরোনো তক্তপোশ, দুতিনটি বস্তা–একটার ওপর আর একটা সাজানো-সম্ভবত ধান। ঘরের মেঝের একপাশে একটা জলের বালতি, ওদের ঠিক সামনে মেঝের ওপর মলিন কাঁথা পাতা একটা বিছানার একপাশে ছোট ছোট বালিশ পাতা–আর একটা ছোট বিছানা, কিন্তু সে ছোট বিছানাটা খালি। আর বিছানার সামনে মেঝের ওপরেই মলিন শাড়ী পরনে একটি মেয়ে বসে অঝোরে কাঁদচে, মেয়েটির কোলে একটি মৃত শিশু, সম্ভবত ছ’সাত মাসের। ঘরের দরজার কাছে একটা পুরোনো হ্যারিকেন লন্ঠনে বোধ হয় লাল তেল জ্বলচে, কারণ আলোর চেয়ে ধোঁয়া বেশি হয়ে লণ্ঠনের কাঁচের একটা দিক কালো করে ফেলেচে। ঘরের মধ্যে আরও দুতিনটি মেয়ে ও পুরুষমানুষ সবাই ক্রন্দনরতা মেয়েটিকে ঘিরে নিঃশব্দে বসে।

 

মেয়েটি কাঁদছে আর বিলাপ করচেও আমার ধনমণি, ও আমার সোনা, হাসো, দেয়ালা করো, আমার মানিক, চোখ চাও–আমার কোল খালি করে পালিও না আমার সোনা–কোথায় যাবা আমায় ফেলে?

 

যতীন বিস্ময়ের দৃষ্টিতে পুষ্পের ও পুষ্পের মার দিকে চেয়ে বল্লে–এ সব কি ব্যাপার! এরা কারা? আমি কোথায়?

 

মেয়েটি একমনে বিলাপ করেই চলেচে কোলের মৃত শিশুর দিকে চোখ রেখে।

 

–কাল থেকে তুমি একবারও মাইএ মুখ দ্যাওনি যে বাবা আমার! মাই খাবা? মায়ের মাইএ মুখ দেবা না, ও মানিক আমার? আর মুখ দেবা না? চোখ চাও দিনি–

 

মেয়েটির আকুল ক্রন্দনে যতীনের মনের মধ্যে এক অদ্ভুত ধরনের চঞ্চলতা দেখা দিল, পরের কান্না শুনে এমন কখনো তার হয়নি সম্পূর্ণ অননুভূত কোন্ অনুভূতিতে ওর চোখে জল এসে পড়লো।

 

পুষ্প বল্লে–চলে এস যতীন দা, চলো সব বলছি। তুমি পুনর্জন্মের টানে পড়ে পৃথিবীতে জন্মেছিলে আজ ছ’সাত মাস। ওই তোমার মা। আজ আবার দেহ থেকে মুক্তি পেলে। ওই মৃত শিশুই তুমি কি বিপদেই ফেলেছিলে আমাদের।

 

যতীন অবাক হয়ে বল্লে–পুনর্জন্মের টান! সে কি! আমি এই বাড়ীতে–

 

–এই ঘরেই জন্মেছিলে। এরা ব্রাহ্মণ, গ্রামের নাম কোলা বলরামপুর, জেলা যশোর। ভগবানের কাছে বহু ডাক ডেকে আর করুণাদেবীর দয়ায় আজ উদ্ধার পেলে–নতুবা দেহ ধরে এই সব অজ পাড়াগাঁয়ে এমন বহুঁকাল কাটাতে হোত–পুনর্জন্মের ঠ্যালা বুঝতে পারতে। বার বার পৃথিবীতে যাওয়া-আসার কুফল এখন বুঝতে পারচো তো? কতবার না বারণ করেছি?

 

যতীনের মন তখন কিন্তু পুষ্পের ওসব আধ্যাত্মিক তিরস্কারের দিকে ছিল না। তার সামনে বসে এই তার পৃথিবীর মা, গরীব ঘরের মা, তারই বিয়োগব্যথায় আকুলা, অশ্রুমুখী। গত ছ’মাসের শৈশবস্মৃতি কোনো দাগই কাটেনি তাঁর শিশু-মস্তিষ্কে। কিন্তু কত বিনিদ্র রজনী যাপনের মৌন ইতিহাস ওই দরিদ্রা জননীর তরুণ মুখে! তারই মা, তারই নবজন্মের দুঃখিনী জননী, যাঁর বত্রিশ নাড়ী ছিঁড়ে ছ’মাস পূৰ্ব্বে এই দরিদ্র গৃহে কত আশা আনন্দের ঢেউ তুলে একদিন সে পুনরায় ধরণীর মাটিতে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। কি অদ্ভুত মোহ, কি আশ্চর্য্য মায়ার বাঁধন, মনে হচ্চে স্বর্গ চাইনে, করুণাদেবীকে চাইনে, পুষ্পকে চাইনে, আশাকে চাইনে, আধ্যাত্মিক উন্নতি- টুন্নতি চাইনে–এই পৃথিবীর মাটিতে পৃথিবীর এই মায়ের কোলে সুখদুঃখে সে আবার মানুষ হয়! এই টিপ টিপ বৃষ্টিধারা, এই বর্ষার রাত্রিটি, এই গরীব মায়ের তারই জন্যে এ আকুল বুকফাটা বিলাপ–এ সব জীবনস্বপ্নের কোন্ গভীর রহস্যময় অঙ্ক অভিনয়ের দৃশ্যপট! ভগবান হিরণ্যগর্ভের অধিষ্ঠিত স্বপ্ন।

 

ওর মনে পড়ল যাত্রায় শোনা গানের দুটো লাইন–

 

এ নাটকের এ অঙ্কে পেয়েছি স্থান তোর অঙ্কে,

হয়তো যাবো পর অঙ্কে পর অঙ্কে পুত্র সেজে।

 

ওদের মধ্যে একজন প্রৌঢ়া বল্লে–আর কেঁদো না বৌ, যা হবার হয়ে গেল, এখন উঠে বুক বাঁধো–মনে করো ও তোমার ছেলে নয়– ভারত করতে যদি ও আসতো তা হোলে কোলজোড়া হয়ে থাকতো, তা ভারত করতে তো আসে নি–কেঁদো না–

 

একজন আধবুড়ো গোছের লোক বল্লে–বিষ্টি মাথায় এখন আর কোথায় যাবো–সকালের আর বেশি দেরি নেই, সাধন আর হরিচরণকে নিয়ে আমি যাবো এখন

 

প্রৌঢ়া বল্লে–বিষ্টিরও বাপু কামাই নেই–সেই যে আরম্ভ করেচে বিকেলবেলা, আর সারারাত

 

কথা বলতে বলতে কাক কোকিল ডেকে রাত ফর্সা হয়ে গেল। পুষ্পের বার বার আহ্বানেও যতীন সেখান থেকে নড়তে পারলে না। পুত্রহারা জননীর আকুল কান্না, ও আছাড়ি-বিছাড়ির মধ্যে সেই আধ বুড়ো লোকটি আর দুজন ছোঁকরা মৃত শিশুদেহ নিয়ে বৃষ্টিধারা মাথায় বাঁশবনের পথে চললো। যতীন, পুষ্প ও পুষ্পের মা গেল ওদের সঙ্গে। বাড়ী থেকে দু রশি আন্দাজ দূরে ছোট্ট একটা নদী, কচুরিপানার দামে আধ-বোজা; ওরা শাবল দিয়ে গর্ত খুঁড়ে মৃতদেহটা নদীর ধারে পুঁতে ফেললে। তখনও ভাল করে দিনের আলো ফোটেনি, বৃষ্টিধারায় চারিধার ঝাঁপসা। পথে-ঘাটে লোকজন নেই কোথাও–বর্ষাকালের ধারামুখর প্রভাতকাল।

 

১৬.

পুষ্প যতীনকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীর বৃষ্টিধারামুখর ঝাঁপসা আকাশের ঊর্ধ্বে এক সু-উচ্চ পৰ্ব্বতচূড়ায় এসে বসলো। পুষ্পের মা বল্লে, আমি যাই মা পুষ্প, বসো তোমরা।

 

নিম্নে পৃথিবীর চারিদিকে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎগর্ভ মেঘপুঞ্জ থেকে বিদ্যুৎ খেলচে, দিক্‌চক্রাবালে সুনীল আকাশে সূর্যোদয় হচ্চে, অনেক দূর পর্যন্ত আকাশ রাঙা। ওরা যেন পার্থিব বাসনা কামনার বহু ঊর্ধের কোনো নিৰ্ম্মল দেবলোক থেকে পৃথিবীর দিকে চেয়ে আছে। বাংলা দেশের উত্তরে এ বোধ হয় হিমালয় পৰ্ব্বতের চূড়া। দূরে নিকটে তুষাররাশি সূর্যালোকে ঝকমক করচে। যতীনের মনে হচ্ছিল এই সবই মায়া, ভেলকিবাজি, ভগবানের ভেলকিবাজি। মৃত্যুর অসত্যতা সে ভাল ভাবে বুঝেচে। মৃত্যু বলে তাহোলে কোনো জিনিস নেই; এই তো সে যশোর জেলারই কোলা-বলরামপুর গ্রামে মরে গেল শেষ রাত্রে, অথচ এখানে সে পৰ্ব্বতশিখরে বাহালতবিয়তে সমাসীন। মরণ নেই, বিচ্ছেদ নেই, দুঃখ নেই, আমরা অমর–জীবনমরণের সঙ্গে, সুখদুঃখের সঙ্গে–সনাতন, নিত্য, অনশ্বর আমাদের এ লীলাখেলা।…

 

পুষ্প যতীনের মনের ভাব বুঝতে পারলে। হাজার হোক, যতীনদা পুরুষমানুষ, ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিল, জিনিসগুলো চট করে ধরতে পারে। পেটে একেবারে বিদ্যে না থাকলে অন্ধকার ঘোচে? সে গম্ভীর মুখে বল্লে, এবার বেঁচে গেলে বটে, কিন্তু বার বার আশা বৌদির কাছে যাতায়াতের ফলে তোমার এই বিপদ। অনেকবার তোমায় সাবধান। করেছিলাম, শোনো নি। পুনর্জন্মের আবর্ত মাঝে মাঝে আত্মিক স্তরে ঝড়ের মত এসে পৌঁছয়, কোথা থেকে আসে তা জানিনে, ক’টা ব্যাপারই বা বুঝি জগতের! সেই সময় যে কেউ সামনে পড়ে, তাকে নিয়ে এসে পৃথিবীতে ফেলে ঘুরিয়ে। ও থেকে রেহাই নেই। তাই এসে জন্মেছিলে পৃথিবীতে–

 

–আমার মনে আছে সে ভীষণ টানের কথা–জ্ঞান ছিল না আমার।

 

–তোমার উচিত হয়নি আশাদের বাসায় অতক্ষণ থাকা। ও একটা ঝড়ের মত, ভূমিকম্পের মত বিপৰ্যয়; তবে তৃতীয় স্তরের নীচের অঞ্চলেই ও আবর্তের সৃষ্টি, চতুর্থ স্তরের আত্মারা তত বিপদগ্রস্ত হন। না ওতে–যদিও পালিয়ে যান সকলেই; ও একটা অন্ধশক্তি–ওকে বিশ্বাস নেই। কোথায় ঘুরিয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলে পুনর্জন্ম ঘটাবে। পৃথিবীতে। অনেকেই পৃথিবীতে জন্ম নিতে চায় না, সকলেই ওটাকে ভয় করে।

 

–তুমি আমাকে কোনদিন এই ব্যাপারটার কথা বলো নি তো?

 

–ভূমিকম্পের কথা পৃথিবীতে সবাইকে সবাই বলে বেড়ায়? হয়তো জীবনেই ঘটলো না, নয় তো এসে সব ওলটপালট করে দিয়ে গেল– এও তেমনি। পৃথিবীর বাসনা কামনা আসক্তি যখন মনের মধ্যে বেশি। হয় বা যখন তৃতীয় স্তরের নীচেকার আত্মিক লোকে থাকে–তখনই। ওই আবর্ত বড় বিপজ্জনক। সেইজন্যেই তোমায় বার বার বারণ করতাম। একা আর তোমাকে বেরুতে দেবো না–

 

–তুমি জানতে পারলে কখন?

 

–তখুনি। আমি তখন জপে বসেচি–

 

লজ্জায় পুষ্প নিজেকে হঠাৎ সামলে নিলে, সে জপ-ধ্যান করে লুকিয়ে, যতীনদার সামনে সে মস্ত বড় কোনো যোগিনী সাজতে চায় না।

 

–হ্যাঁ, হ্যাঁ–তারপর?

 

-তারপর তখুনি বুঝলুম, তুমি মাতৃগর্ভে ঢুকে গিয়েচ। সঙ্গে সঙ্গে তোমার তো সব বিস্মৃতি এসে গেল, আমি মরি ছুটোছুটি করে। ছুটি করুণাদেবীর কাছে, আমার গুরুদেবের কাছে ছুটি। করুণাদেবী বল্লেন, মার মনে দুঃখ দিয়ে তোমাকে বাঁচাতে পারবেন না–

 

যতীন হেসে বল্লে–পৃথিবীতে মরে গেলুম, আর তোমাদের এখানকার ভাষায় বেঁচে গেলুম, এ বেশ মজার কথা বলচো কিন্তু পুষ্প। আরও দুবার এর আগে এমনি বলেচ ‘বেঁচে গেলে যতীনদা’–আরে, মরেই তো গিয়েচি আজ সকালে পৃথিবীতে?

 

পুষ্প হেসে বল্লে–তারপর শোনো। করুণাদেবী মাকে কাঁদাতে পারবেন না–গুরুদেব বল্লেন–তোমাকে মাতৃগর্ভে দশমাস দশদিন থাকতে হবে–তারপর ভূমিষ্ঠ হতে হবে, তবে তিনি চেষ্টা করবেন–

 

–কি চেষ্টা করবেন–শিশুহত্যার?

 

–তোমার অজ্ঞান অন্ধকার কাটেনি দেখচি এখনও–

 

–না, আমার মনে খটকা লেগেছে। পুষ্প, আমায় তোমাদের ভাষায়–বাঁচিয়ে খুব ভাল করে, কিন্তু ওই মেয়েটির কান্না–আমার মায়ের ওই কান্না

 

যতীনের চোখে জল এসে পড়লো।

 

পুষ্প হেসে বল্লে–চলো গুরুদেবের কাছে নিয়ে যাই–এতদিন তোমায় বলিনি তাঁর কথা–তোমার মন আজ ভাল না, চলো আমার। সঙ্গে–

 

–সে কতদূর?

 

–পঞ্চম স্বর্গের দ্বিতীয় স্তরে–তোমাকে আবরণ দিয়ে শক্তি দিয়ে নিয়ে যাবো, নইলে তোমার জ্ঞান থাকবে না অত ওপরে। কিছু দেখতেই পাবে না–

 

যতীন খানিকক্ষণ কি ভাবলে, তারপর বল্লে–বোসো পুষ্প, দেখে আসি মা কি করচেন–

 

পুষ্প ধমক দিয়ে বল্লে–কে মা? কিসের মা? বৈষ্ণবী মায়ায় ভুলো। না। অনন্ত পথে কত মা, কত বাবা, কত ছেলে, কত স্ত্রী। প্রত্যেকেই অ-বিনাশী আত্মা, প্রত্যেকেই লীলা করচে। চলো–

 

–না পুষ্প, আমার সত্যিই এখনো তোমার মত জ্ঞান জন্মায় নি। মনে। এখনো মায়া-দয়া মন থেকে একেবারে বিসর্জন দিতে পারিনি। তোমাদের ব্রহ্মজ্ঞান নিয়ে তোমরা থাকো–আমি ওর মধ্যে নেই, সত্যি বলছি। আমাকে যেতেই হবে মাকে দেখতে। আজ সকালে মার সেই বুকফাটা কান্না আমারই জন্যে, সে আমি ছেলে হয়ে কি করে ভুলি?

 

পুষ্প মৃদু হেসে একটু ধীরভাবে বল্লে–উঃ, কি বাঁধন, তাই দেখচি! মায়ার শক্তি আছে বটে! এড়ানো বল্লেই কি এড়ানো যায়? মানুষকে নিয়ে পৃথিবীর লীলা তা হোলে হয় কি করে!

 

পরে সে হঠাৎ সুস্বরে গেয়ে উঠলো দুটো মাত্র কলি–

 

‘এ বাঁধন বিধির সৃজন, মানব কি তায় খুলতে পারে?

কারাগার ভাঙতে কি পারো, ও যে মায়ার পাঁচিল আছে ঘিরে!’

 

যতীন ব্যঙ্গের সুরে বল্লে–থাক, থাক্‌, ব্রহ্মবিদ্যে এখন তুলে রেখে। দাও, ওসব, সইবে না ধাতে।

 

পুষ্প হেসে বল্লে–কেমন গলা, যতীনদা?

 

–চমৎকার!

 

–তা এখন মার কাছে না গিয়ে এর পরে যেও।

 

–আমি একবার দেখে আসি, বোসো।

 

আবার সেই কোলা-বলরামপুর গ্রাম। বেলা দুপুর। বৃষ্টি থেমেচে, কিন্তু আকাশ মেঘ-মেদুর। সজল বর্ষার বাতাস বইছে, সারারাত্রি বর্ষণের ফলে পথে-ঘাটে জল দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টিসিক্ত লতাঝোঁপের। পত্রপুঞ্জ থেকে টুপটাপ বৃষ্টির জল ঝরে পড়চে এখনও।

 

রান্নাঘরের দাওয়ায় মেয়েটি খেতে বসেচে। কলাইয়ের দাল, মোচা হেঁচকি আর কাঁচকলা ভাজা। সকালবেলার সেই প্রৌঢ়াও পাশে বসে খাচ্চে। সে খেতে খেতে বল্লে–একটু ডাল দেবো বৌ?

 

–না, আমি আর কিছু খাবো না মাসী। যা খেয়েচি সকালবেলা, পেট ভরে গিয়েছে–

 

–ছিঃ, অমন কথা বলতে নেই বৌ, আবার কোলজোড়া ছেলে পাবে, হাতের নোয়া সিঁথের সিঁদুর বজায় থাক।

 

মেয়েটি ভাত খাওয়া ছেড়ে হাত তুলে বল্লে–কি মুখ চোখের ছিরি, মাসীও যে বাঁচবে না সে আমি জানি–আমার কপালে কি অমন ছেলে বাঁচে। সেবার কিসে কামড়ালো রাত্তিরে, ছেলে ককিয়ে কেঁদে উঠলো, আমি তাড়াতাড়ি টেমি জ্বেলে দেখি ছেলের কাঁথার তলায় এতবড় কাঁকড়া বিছে! সেই রাত্তিরে কাঁটানটের শেকড় বেটে, জলপড়া এনে নাপিতবাড়ী থেকে দিই। আহা, আশ্বিন মাসে একবার এমন কাশি হোল যে বাছা দম আটকে বুঝি যায়–কি যে বল্লে শিব ডাক্তার, হুপিং কাশি না কি–যে ক’দিন ছিল, কষ্টই পেয়ে গিয়েছে বাছা আমার!

 

প্রৌঢ়া বল্লে–কেঁদো না বৌ, ছিঃ–ভাতের থালা সামনে কাঁদতে নেই দুপুর বেলা। অলক্ষণ।

 

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বল্লে–আর আমার লক্ষণ অলক্ষণ সব হয়ে গিয়েচে মাসী–এখন তোমরা বলো আমিও তার সঙ্গে চলে গিয়ে হাড় জুড়ই। আমি কি করে খোকার মুখ না দেখে থাকবো, ও মাসী!

 

মেয়েটি এবার ডুকরে কেঁদে উঠলো ডাল ভাত মাখা হাত তুলে হাঁটুর ওপর রেখে।

 

ছিঃ বৌ, ওকি! খাও, খাও, আরে অমন করে না। তুমি তো অবুঝ নও, আবার হবে, এই-স্ত্রী মানুষ, ভাবনা কি? কোল জুড়ে আবার পাবে–

 

যতীনকে নিয়ে টেনে বার করাই কঠিন সেখান থেকে। পুষ্প অনেক কষ্টে তাকে কোলাবলরামপুরের বাঁড়য্যে-বাড়ী থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এল বুড়োশিবতলায়।

 

বল্লে–খুব মন কেমন করচে মার জন্যে?

 

–সত্যিই, এত কষ্ট দিয়ে এসে অপরের মনে, আমার কোনো সুখ হবে না এ স্বর্গে। এ যেন পানসে হয়ে গিয়েচে। জগতে যখন এত কষ্ট–তখন আমি সুখে থেকে কি করবো পুষ্প। পৃথিবীই আমার ভাল, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সেখানে জমি চাষ করি, স্ত্রীপুত্রকে খাওয়াই, মাকে খাওয়াই। দেখলে না মায়ের খাওয়া গেল? আমি সেই মায়াবাদী সন্নিসিকে পেলে একবার জিজ্ঞেস করি, সবাই যদি সমাধি লাভ করে। ব্রহ্মে লয় পাবে, তবে জগৎসংসার চলবে কাঁদের নিয়ে? সব নিয়েই। তো সংসার। চাষা যদি লাঙল না চষবে, তাঁতি কাপড় না বুনবে, মজুর যদি তোমার আমার হয়ে না খাটবে–তবে একদিন সংসার চলে কেমন চলুক তো? তুমি তো বলচো সব মিথ্যে, সব ভুল

 

–এ কথার উত্তর আমি তোমায় এখুনি দিতে পারি, কিন্তু তুমি বিশ্বাস করবে না আমার মুখ থেকে শুনলে। তাই এর জবাব দিলাম না।

 

–জবাবে দরকারও নেই। তুমি কেন আমাকে নিয়ে এলে পৃথিবী থেকে?–কেন নিয়ে এলুম! শুনবে তবে? আমি আনিনি। তোমার অদৃষ্ট তোমাকে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়েছিল, অদৃষ্টই আবার এনেচে। পৃথিবীতে পুনর্জন্মের সময় তোমার আসেনি–দৈবদুর্বিপাকে পুনর্জন্মের টানে জন্মাতে বাধ্য হয়েছিলে। ও একটা দুর্ঘটনা–যেমন ভূমিকম্প। ও থেকে তোমার কৰ্ম্মফল তোমাকে মুক্ত করে আনতো। এনেচে। আমি কে? আমি সাহায্য করেছি মাত্র। পুনর্জন্মের জন্যে অত ভেবো না–ও যখন হবে, তখন কেউ রুখতে পারবে না।

 

–আমার ভাল লাগে না…পৃথিবীতে এত কষ্ট! এখানে নির্ঞ্ঝাটে কোন্ প্রাণে..ওদিকে আশা, এদিকে আমার মা

 

–পৃথিবীর মানুষ তুমি এখন আর নও এই কথাটা ভুলে যাচ্চ। পৃথিবীর মানুষ যখন ছিলে, তখন যে কথা বলছো তা বল্লে মানাতো। বিধাতার নিয়মই এই, পৃথিবীর জীবন থেকে এখানে আসতে হয়। সকলের জন্যে কষ্ট করবো বল্লেই তোমার শুনচে কে? নিয়মের অধীনে তোমাকে চলতে হবে। ভগবান তোমার আমার চেয়ে ভাল বোঝেন। তাঁর আইন মেনে নিতেই হবে। কেন এরকম হোল, এর জবাব তিনিই দিতে পারেন। আমার সেই গুরুদেবের কাছে যাবে? তিনি তোমায় বোঝাতে পারবেন।

 

-না, আমার গুরু-টুরুতে দরকার নেই পুষ্প, তুমি ক্ষ্যামা দাও– ঢের হয়েছে। আমার বড় ইচ্ছে সেই মায়াবাদী সমাধিবাজ সন্নিসিটার। সঙ্গে–

 

–মহাপুরুষদের সম্পর্কে তোমার মুখের ভাষাগুলো একটু ভদ্র করো যতীনদা–

 

এমন সময় বুড়োশিবতলার ঘাটে এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটলো।

 

হঠাৎ দুজনেই আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলো, পশ্চিম দিকের আকাশ যেন প্রজ্বলন্ত উল্কার মত কোন আলোতে আলোকিত হয়ে উঠেচে বহুদূর পৰ্য্যন্ত। আরও একটু পরে ওরা দেখতে পেলে, বহুদিন আগেকার দেখা সেই পথিক দেবতা শূন্যপথে চলেচেন। মনে হোল যেন তিনি। ওদের দিকেই আসছেন, সেই রকম একটা নীল আলো ওদের সাগঞ্জ কেওটার ঘাট অবধি এসে পড়লো, কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর পথ গেল। বদলে। তিনি আরও দূরের কোন গ্রহলোকের দিকে যাত্রা করলেন। যতীন প্রথমটা চিনতে পারেনি। বল্লে, উনি কে পুষ্প?

 

–চিনতে পারলে না যতীনদা? উনি সেই পথিক দেবতা, এককল্প পূৰ্ব্ব থেকে যাত্রা করেচেন এই বিশ্বের শেষ দেখবেন বলে কিন্তু এখনও এর একাংশও দেখে উঠতে পারেননি–কত নীহারিকা, কত নক্ষত্রলোক, কত গ্রহলোক তিনি ঘুরেচেন, এমন কত লক্ষ লক্ষ পৃথিবী–তবু এর কোন হদিস তিনি পাননি। মনে নেই, সেই এখানে ক্লান্ত হয়ে এসে পড়েছিলেন? পৃথিবী শুনে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সেটা আবার কোন্ গ্রহ! সূৰ্য্য কোন্টা চিনতে পারেননি।

 

-হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে।

 

পুষ্প একটু প্রচ্ছন্ন তিরস্কারের সুরে বল্লে, তাই তো বলচি যতীনদা, এই সামান্য সৌরজগতের এই ক্ষুদ্র গ্রহ পৃথিবীর মায়া তুমি কাটাতে পারচো না, অথচ দেখ তুমি যে লোকে এসেচো সেখানে একটু সাধনা করলেই তুমি অমনি কত লক্ষ লক্ষ সৌরজগৎ, তার কোটি কোটি গ্রহের জীবনযাত্রা দেখতে পাবে! কত দেখবার আছে, কত জানবার আছে যতীনদা, সে সব তোমার দেখতে জানতে ইচ্ছে করে না?

 

যতীন তখনই কোন জবাব দিতে পারলে না, কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। তারপর সহসা উত্তেজিত সুরে বল্লে–আমি সব দেখব, বুঝবো পুষ্প। আমার চোখ উনি অনেকখানি যেন খুলে দিয়ে গেলেন। চলো করুণাদেবীর কাছে–

 

–এখুনি?

 

–এতটুকু দেরি নয়।

 

আবার সেই উচ্চ আত্মিকলোকের বায়ুস্তর, চক্ষের নিমেষে পুষ্পের সাহায্যে যতীন শত শত যোজন, যোজনের পর যোজন পার হয়ে চললো। করুণাদেবীর আশ্রম সেই ক্ষুদ্র গ্রহটিতে ওরা পৌঁছে দেখলে কেউ কোথাও নেই। সেই কুসুমিত উপবন, সেই প্রাচীন বৃক্ষতল যেখানে রাজরাজেশ্বরীর মত রূপসী দেবী সেদিন এলিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন, আজ সে স্থান জনশূন্য।

 

যতীন হতাশার সুরে বল্লে–তাই তো! এ যে দেখচি–

 

–জগৎ-সংসারের কাজে সর্বদা ঘুরচেন, কি জানি কোথায় গিয়েছেন–

 

–কিন্তু কি সুন্দর দেশ এটা! আমার ইচ্ছে করে এখানেই থাকি। বুড়োশিবতলার ঘাট এমন করে নেওয়া যায় না?

 

–অনেক বেশি শক্তি দরকার এমন দেশ গড়তে, আমার তা নেই যতীনদা। এদেশ শুধু বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য নিয়ে সুন্দর হয় নি, মনের ওপর এর প্রভাব বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই। আমরা যেন অনেক উঁচু জীব হয়ে গিয়েছি; শ্রান্তি নেই, ক্লান্তি নেই, দেহ-মন কত উঁচু ধরনের হয়ে গিয়েছে।

 

এমন সময় একটি বিস্ময়কর আবির্ভাবের মত করুণাদেবী হঠাৎ যেন জ্যোতিঃপদ্মের মত ফুটে উঠলেন সেই বনস্থলীর প্রান্তে। স্নেহ ও প্রসন্নতা দেবীর বিশাল চক্ষু দুটির ঘন নীল তারকায়। হেসে বল্লেন– আমি তোমাদের দেখে এক জায়গা থেকে ফিরে এলাম–

 

পুষ্প লজ্জিত ও অপ্রতিভের সুরে বল্লে–আপনার কাজে বাধা দিলাম দেবী?

 

করুণাদেবী হেসে বল্লেন–না। আমিও ইচ্ছে করেছিলাম তোমরা আজ এখানে আসবে–বসো, এসো এই গাছের তলায়।

 

যতীন ও পুষ্প গাছের তলায় ওঁর পাশে বসে পথিক দেবতার অদ্ভুত আবির্ভাবের ব্যাপার বল্লে। করুণাদেবী সব শুনে বল্লেন–ভগবান বা ব্রহ্মের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী কোনো নাস্তিক দেবতা, তবে মহাশক্তিধর বটে। আমার জানা নেই।

 

যতীন বল্লে–এত যিনি দেখে বেড়াচ্ছেন তিনি নাস্তিক?

 

–ওঁরা অন্য বিবর্তনের প্রাণী।

 

–পৃথিবীর নয়?

 

-না, অন্য কল্পের। সে শুনবে এখন। চলো, যেখানকার কাজ ফেলে এখানে এসেছি, সেখানে তোমাদের নিয়ে যাই।

 

দুজনেই চোখ বোজ। যতীনের জ্ঞান যাতে থাকে, তার ব্যবস্থা। করতে হবে, নয়তো সে উচ্চস্তরে গিয়েও কিছু দেখতে পাবে না, বুঝতে পারবে না। এক মুহূর্তে ওরা অনুভব করলে খুব অদ্ভুত এক জায়গায় এসেচে। ওরা এক নিমিষে যেন বিরাট আত্মা হয়ে গিয়েছে, বাধাবন্ধনহীন সবসংস্কারমুক্ত দেবাত্মা। দেশ ও কাল উপন্যাসের কাহিনী যেন,–এই ছিল কোথায়, এই এল কোথায়। দেশ অতিক্রম করতে হোল না, কালের ব্যবধান অনুভূত হোল কই?

 

সেও এক বিচিত্র দেশ। বাতাসে যেন নব প্রস্ফুটিতা মৃণালিনীর সুগন্ধ। এক বিশাল সুনীল সমুদ্রের ঢেউ তটশিলায় এসে আছড়ে পড়চে; সমুদ্রের মাঝে মাঝে ম্যাজেন্টা রঙের, ধূসর কৃষ্ণ রঙের ছোট বড় পাহাড় ইতস্তত ছড়িয়ে। সমুদ্রের তীরে একটি অরণ্য-বৃক্ষের তলে এক রূপবান জ্যোতির্ময় তরুণ দেবতা বসে একমনে চিন্তা করছেন।

 

যতীন এমন দৃশ্য কখনো দেখেনি, এমন অপূৰ্ব্ব রূপবান। মহাজ্যোতিষ্মন দেবমূৰ্ত্তি। সে শ্রদ্ধায় বিস্ময়ে অবাক হয়ে চেয়ে রইল।

 

পুষ্প তাঁকে দেখে কিন্তু অবাক হয়ে গেল অন্য কারণে। এঁকে সে অনেক বছর আগে দেখেছিল, যেদিন সে যতীনকে পঞ্চমস্তরে নিয়ে যেতে যেতে তার সংজ্ঞাহীন দেহ দ্বারা বিপদগ্রস্ত হয়েছিল। সেই তরুণ দেবতা, যিনি সেদিন শৈলশিখরে বসেছিলেন।

 

দেবতা করুণাদেবীর দিকে চেয়ে বল্লেন–এরা কে?

 

পুষ্প বল্লে–দেব, আপনি আমাকে দেখেচেন এর আগে–সেই একদিন–

 

করুণাদেবী বল্লেন–এদের কথা তোমাকে বলেছিলাম। এর নাম পুষ্প, ওর নাম যতীন, তোমার পৃথিবীরই নাম বাপু–

 

দেবতা প্রসন্ন দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে বল্লেন–ও, বুঝেচি।

 

পরে যতীনের দিকে চেয়ে বল্লেন–কিন্তু একে নিয়ে এসে ভাল করলে না। এর এখনো অনেক দেরি। পার্থিব তৃষ্ণা এর এখনও যায়নি। এত উঁচু স্বর্গে একে আনলে এর ফল হবে এই, আগামী জন্মে এর স্মৃতি ওকে কষ্ট দেবে–কোন কিছুতে মন বসাতে পারবে না। তুমি তো জানো, তৃতীয়স্তরের কোনো লোককে এখানে আনা সেই ব্যক্তির পক্ষেই ক্ষতিকর।

 

করুণাদেবী ঝগড়া করার সুরে বল্লেন–বেশ করেচি, যাও। তুমি ওর সব স্মৃতি মুছে নিও, নয়তো আমি দেবো। দেখাতে নিয়ে আসিনি। শুধু, ওর অনেক প্রশ্ন আছে, জানতে ইচ্ছে হয়েছে।

 

যতীন ভাবছিল তার কি মহাপুণ্য ছিল, আজই এমন দুটি জ্যোতির্ময় দেবতার দর্শনলাভের সৌভাগ্য তার ঘটলো! কি অদ্ভুত রূপ!

 

সে বিনীত সুরে বল্লে–যদি দেখার সৌভাগ্যই ঘটলো, তবে দেবতা, আমায় এমন করে দিন, যাতে এখানে বার বার আসতে পারি বা আপনার দেখা পেতে পারি তার ব্যবস্থা করে দিন।

 

তরুণ দেবতা করুণাদেবীর দিকে চেয়ে হেসে বল্লেন–ওই দেখলে তো কি বলচে? এদের অজ্ঞানতা ঘুচতে অনেক বিলম্ব।

 

পুষ্প হাত জোড় করে বল্লে–আপনি ওঁকে দয়া করে ক্ষমা করুন। উনি নতুন এ স্তরে এসেছেন, এখানকার কিছুই জানেন না।

 

যতীন অপ্রতিভ না হয়ে বল্লে–আপনি দয়া করলেই সব হবে। কিছুক্ষণ আগে আমাদের ওদিকে একজন কে এসেছিলেন, তাঁর কথা

 

যা শুনলাম তাতে আমি অবাক হয়ে গিয়েছি। আমার সব জানবার ইচ্ছে হয়েছে, তিনি কত গ্রহনক্ষত্র বেড়িয়ে এসেছেন–আমায় এর আগে বলেছিলেন সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন–

 

দেবতা বল্লেন–কে?

 

করুণাদেবী বল্লেন–পথিক কেউ হবে। দেশে দেশে বেড়িয়ে বেড়ানোই তাঁর কাজ বলে মনে হোল। নাস্তিক দেবতা।

 

তরুণ দেবতা একটুখানি চুপ করে থেকে বল্লেন–নাস্তিক কি? মনে হয় না। ওদের উপাসনাই ওই। বিশ্বে-ব্রহ্মাণ্ডে এমন অনেক

 

আবিষ্কারক আছে, এদের শক্তি যথেষ্ট, তেজ অসীম। তাদের মধ্যে কেউ হবে। আচ্ছা, তোমরা আমার সঙ্গে চলো আর একটা জায়গা দেখিয়ে আনি–

 

যতীন বল্লে–দেবতা, আপনার কথা আমি ওই মেয়েটির মুখে আগে শুনেছি। তবে আপনাকে দেখবার সৌভাগ্য হয় নি আমার।

 

–না, কি করে দেখবে। পুষ্প আর তুমি এক স্তরের লোক নও

 

পুষ্প বল্লে–উনি এক বিপদে পড়েছিলেন–চুম্বকের ঢেউএ পড়ে পৃথিবীতে গিয়ে জন্ম নিয়েছিলেন–সবে এসেছেন সেখান থেকে।

 

দেবতা ধীরভাবে বল্লেন–তা সম্পূর্ণ সম্ভব। খুব সাবধানে চলাফেরা কোরো। ওই যে পথিক দেবতার কথা বলছিলে, ওঁরা এ কল্পের জীব নন। পূৰ্ব্ব কল্পে ওঁদের দেবত্বপ্রাপ্তি হয়েচে মুক্ত আত্মা হয়ে বহু ঊর্ধ্বে উঠে বহু তেজ সঞ্চয় করেছেন, কিন্তু ওঁরাও পুনর্জন্মের আকর্ষণকে ভয় করে চলেন। তবে এই লোকটির এখনও অনেক জন্ম বাকি একে পৃথিবীতে জন্মাতে হবে অনেকবার।

 

যতীন বার বার ওই এক কথা শুনে একটু বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। সে বিরক্তি না চাপতে পেরে বলে উঠলো–দেব, তার জন্যে আমি দুঃখিত নই। পৃথিবীতে জন্ম নিলে কষ্টটা কি?

 

–আমি জানি। যে জানে সে ও বিশ্বের সব কিছু এবং বিশ্বদেব। একবস্তু এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই–তার পক্ষে পৃথিবী বা স্বর্গ সমান হয়ে গিয়েছে। যে জানে পৃথিবীর সব কিছুই তিনি, তার কাছে পৃথিবী ও স্বর্গ এক সুরে বাঁধা মোহন সঙ্গীতে। তোমাদের জ্ঞানী লোকেরা তাই তোমাদের শ্রীকৃষ্ণকে বংশীধারী কল্পনা করেছেন। কিন্তু এ চোখে পৃথিবীর সবাই দেখে কি? সাধারণ মানুষ কৰ্ম্ম অনুসারে প্রথম তিন স্তরে গতাগতি করে, ম’রে ভূলোক থেকে ভুবর্লোকে আসে, সেখানে থেকে উন্নতি করে স্বর্গলোকে আসে–আবার সেখান থেকে জন্মায় পৃথিবীতে, আবার মরে, আবার জন্মায়, আবার মরে। এ’কে বলে মানব-আবৰ্ত্ত। চাকার মত ঘুরচে এই আবর্ত-চলো, একটা ব্যাপার তোমায় দেখাই, পৃথিবীতেই চলো, সেখানে তোমরা সহজ ও স্বচ্ছন্দ অবস্থায় থাকবে। চলো তোমাদের দেশেই নিয়ে যাই

 

মহাশূন্যের পথহীন পথে করুণাদেবী ওদের নিয়ে আগে আগে চল্লেন। দূরে একটা কি বিশাল গ্রহ নিরন্ধ্র অন্ধকার সমুদ্রে পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরচে। হু-হুঁ করে নেমে এল–একটু পরে পৃথিবীর এক তুষারাবৃত পর্বতশিখর ডিঙিয়ে ওরা এক নদীর ওপরকার শূন্যে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল।

 

দেবতা পিছনে পিছনেই আসছিলেন। বল্লেন–এটা চিনতে পারচো কী নদী?

 

যতীন বল্লেনা দেব, ঘোর অন্ধকার পৃথিবীতে কিছু দেখতে পাচ্চিনে–এখন বোধ হয় রাতদুপুর।

 

করুণাদেবী হেসে বল্লেন–এত বড় নদী বাংলাদেশে ক’টা আছে। আন্দাজ করে বলো।

 

–আজ্ঞে, হয় গঙ্গা, নয় পদ্মা।

 

–ওই রকমই, এটা গঙ্গা।

 

দেবতা হেসে বল্লেন–তুমিও ঠিক ভাল বলতে পারলে না, গঙ্গা তো বটে। মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গা–

 

যতীন বিস্ময়ের সুরে বল্লে–আপনি বাংলাদেশের সব খবর জানেন দেখচি।

 

করুণাদেবী মৃদু সস্নেহ হাস্যে ওকে নেপথ্যে বল্লেন–ও রকম বোলো না। উনি কে তা তোমরা জানো না। পরে বলবো।

 

একটা ছোট্ট খাল। একটা আমবাগান। মুর্শিদাবাদ জেলা, সুতরাং বনবাগান বেশি নেই, মস্ত বড় মাঠ একদিকে, একদিকে ছোট্ট একটি গ্রাম। যতীন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলো সেই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেই গ্রামের ঘরের আনাচে-কানাচে অনেকগুলি নিম্নস্তরের ধূসর ও মেটে সিঁদুরের রঙের আত্মা ঘুরে বেড়াচ্চে–কেউ এ-বাড়ী, কেউ ও-বাড়ী। তারা যদি মানুষ হোতো তবে আনাচে-কানাচে এদের এমনতর গতিবিধি দেখে সন্দেহ হোত এরা নিশ্চয়ই চোর বা ডাকাত।

 

যতীন অবাক হয়ে বল্লে–তাই তো, এরা কি করচে এখানে?

 

পুষ্প হাসিমুখে বল্লে–আমি বুঝতে পেরেছি অনেকটা, যদি তাই হয়, যা ভেবেচি

 

যতীন বল্লে–কি পুষ্প?

 

তরুণ দেবতা বল্লেন–পুষ্প বুঝেচে। ওরা পৃথিবীতে জন্ম নেবার জন্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতি রাত্রেই এমনি লোকের বাড়ীর আশে পাশে ঘোরে। কিন্তু ভিড় বেশি–সবাই সুবিধে পায় না। তৃষ্ণাই পুনর্জন্ম গ্রহণ করায়। ভুবর্লোকে ওদের ভাল লাগছে না, সেখানে পৃথিবীর স্থল বাসনা কামনার পরিতৃপ্তি হয় না–সুতরাং ওরা চাইচে আবার দেহ ধরতে। কিন্তু তার প্রার্থী অনেক। ওদেরই মত। সুতরাং জন্ম নিতে চাইলেও জন্ম নেওয়া হয় না। উচ্চতর আত্মারা বংশ দেখে, পিতামাতা দেখে জন্ম নেওয়ার সময়ে। এদের সে সব নেই, যে কোন বংশ, জাত, কুল হোলেই হোল। দেহ ধারণ নিয়ে কথা।

 

যতীন বল্লে–দেব, এরা কতদিন ধরে এমন ঘোরে?

 

–পৃথিবীর হিসেবে কেউ কেউ দশ বছর পর্যন্ত ঘোরে। এই এক যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা–এই অবস্থাকে প্রেতত্ব বলে তোমরা। কারো স্বাধীন। কাজে আমরা কোনো বাঁধা দিই না–জীব যখন নিজের ভ্ৰম বুঝবে তখন সে নিবৃত্ত হবে। যতদিন তৃষ্ণা, ততদিন তাকে বাধা দিয়ে ফল হবে না। সে ভুবর্লোকে ঘোর অসুখী অবস্থায় থাকবে–তার চেয়ে, যাও বাপু, পৃথিবীতেই গিয়ে সুখী হও। চলো, এখানে কষ্ট হচ্চে–আর নয়–

 

ওরা যেখানে এসে বসলো, সেটা একটা পর্বতশিখর, বড় চমৎকার পাইন এবং দেওদার গাছের নির্জন অরণ্যানী। গাছের ডালে ডালে অগণিত পরগাছার রঙ-বেরঙের ফুল। পায়ের নীচে পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে আছে, গভীর রাত্রি। আকাশের মাঝখানে চওড়া জ্বলজ্বলে ছায়াপথ, অসংখ্য ঝঝকে তারকারাজি। ব্রহ্মান্ডের বিরাটত্বের সঙ্কেত!

 

তরুণ দেবতা বল্লেন–এই হোল হিমালয়। বাংলাদেশের ওপরেই– ওই দ্যাখো দূরে একটা নদী নেমেচে পাহাড় থেকে

 

যতীন বল্লে–তা হলে বোধ হয় তিস্তা

 

–তুমি দেখলে তো মানুষের অবস্থা?

 

–আশ্চৰ্য্য লাগলো, এমন হয় তা জানতাম না, দেব। আপনি যাকে মানব-অবৰ্ত্ত বল্লেন, ওর উচ্চতর অবস্থা কি?

 

–উচ্চতর সাধনা মানুষকে দেবযান-পথে উচ্চতর লোকে নিয়ে যায়। স্বঃ জনঃ, মহঃ, তপঃ ও সত্যলোক বলেচেন ভারতবর্ষের জ্ঞানী লোকেরা। এত কল্পকাল সেখানে থাকে উচ্চতর জীবাত্মা।

 

–কল্প কি?

 

–প্রত্যেকবার সৃষ্টির পরে প্রলয়, প্রলয়ের পরে আবার সৃষ্টি। এই কালব্যাপ্তির নাম কল্প। কল্পান্তে উচ্চতর জীবাত্মারও পতন হয়। তবে সত্যলোকেরও দূরপারে ব্রহ্মাণ্ডের বহিঃস্থিত যে ব্রহ্মলোক, সেখানে যাঁরা যান ভগবানের সঙ্গে তাঁরা এক হয়ে যান। মানবআবর্তে তাঁরা আর ফিরে আসেন না।

 

–এরই নাম মুক্তি?

 

–একেই ভারতবর্ষের ঋষিরা মুক্তি বলেচেন। চলো তোমাকে একটি ভারতবর্ষের প্রাচীন কবির কাছে নিয়ে যাবো। উপনিষদ বলে দার্শনিক কবিতা ভারতবর্ষের, তিনিও তার একজন রচয়িতা। ভ্রাম্যমান কবি, সব সময় পাহাড়ে সমুদ্রতীরে বনানীর নির্জনতায় কাল কাটান। পৃথিবীর মধ্যে এই হিমালয় এবং আরও অনেক উচ্চতর পর্বতের বনে। বৃক্ষলতায় প্রায়ই মাঝে মাঝে রূপের ধ্যানে মগ্ন থাকেন। আর মিশর। দেশের এক উচ্চ আত্মার সঙ্গে পরিচয় করাবো।

 

–তা হোলে তো, দেব, পৃথিবীর আসক্তি তাঁর এখনও যায়নি? অর্থাৎ আমি উপনিষদের সেই কবির কথা বলচি–

 

–তার আসক্তি বিশুদ্ধ সৌন্দর্য্যের ধ্যান। কোনো পার্থিব তৃষ্ণা নয়। তাই জনলোকের অধিবাসী, নিজের আনন্দের জন্যে নেমে আসেন। পৃথিবীতে। তাঁর আগমনে পৃথিবীর অনেক উপকার। বহু লেখক ও কবিকে অদৃশ্যভাবে প্রেরণা দান করেন, সেই জন্যেই তিনি পৃথিবীতে আসতে ভালবাসেন। পৃথিবীর হিসেবে বলতে গেলে বহু শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে এ কাজ তিনি করেছেন–তাঁর কাজই ওই। আমার সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট বন্ধুত্ব। আমার নিজের কাজে তিনি যথেষ্ট সাহায্য করেন। আমায়।

 

এবার পুষ্প বিনীতভাবে বল্লে–দেব, একদিন আমাদের কুটিরে পদার্পণ করবেন দয়া করে? আপনার বন্ধু সেই তাঁকেও নিয়ে? পরে দেবীকে দেখিয়ে বল্লে–ইনিও যাবেন আমায় বলেচেন দয়া করে।

 

তরুণ দেবতা বল্লেন–যাবো।

 

পুষ্প তাঁর পাদস্পর্শ করে প্রণাম করে বল্লে–আমাদের ওপর আপনার এ করুণার জন্য ধন্যবাদ।

 

যতীন বল্লে–প্রভু, আমার সঙ্গে এক মায়াবাদী সন্ন্যাসীর দেখা হয়েছিল, তিনি তাঁর নিজের শক্তি আমার মধ্যে সঞ্চারিত করে আমায় নির্বিকল্প সমাধিলাভ করিয়েছিলেন, সে এক অপূৰ্ব্ব অনুভূতি। সে কথা আমি এখনও ভুলিনি–

 

–তিনি কোনো যোগী সাধক হবেন। ব্রহ্মে লীন হওয়ার আস্বাদ ইচ্ছামত ভোগ করেন–মুক্ত পুরুষ। তাঁর ইচ্ছামত কায়াব্যুহ রচনা করে যে কোনো দেহে অনুপ্রবেশ করতে পারেন। সমস্ত ঐশ্বৰ্য্য ওদের সংকল্প মাত্রেই উপস্থিত হয়–

 

–প্রভু, ভারতবর্ষ ছাড়া অন্য কোনো দেশে এই ব্যাপারের চর্চা ছিল?

 

–নিশ্চয়ই। যে কোনো দেশে যে কোনো সৎ, ঈশ্বরে ভক্তিমান। লোক মানব-আবৰ্ত্তকে জয় করতে পারেন। বিশ্বের যিনি কৰ্ত্তা, তিনি কোনো বিশেষ দেশ বা বিশেষ জাতিকে কৃপা করেন না।

 

–আচ্ছা আমাদের দেশে যাঁরা বলেন, ভগবানের নাম জপ করলে মুক্তি যেমন ধরুন বৈষ্ণব সম্প্রদায়, তাঁদের মত কি সত্য?

 

-ভক্তি দ্বারা তাঁরা ভগবানে আতস্থ হয়ে দেবযান প্রাপ্ত হন। জীব মাত্রেই ব্রহ্মের অংশ জানবে। উপাধি ও নামরূপ ত্যাগ করে পরব্রহ্মে লীন হওয়ার নামই মুক্তি। বিভিন্ন পথ, বিভিন্ন মত। কিন্তু জ্ঞানী লোক ধ্যানদৃষ্টি দ্বারা সেই একই সত্যকে উপলব্ধি করচেন বহু প্রাচীন যুগ থেকে। শুধু এ কল্প নয়, পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব কল্পের তাই হয়েছিল। পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব কল্পের মুক্ত পুরুষেরা এ কল্পে পৃথিবীতে দেহ ধরে তাঁদের পূর্ব জীবনের সাধনলব্ধ জ্ঞান প্রচার করতে নামেন। তাঁরাই তোমাদের শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, শঙ্কর, চৈতন্য, বাল্মীকি, কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ইত্যাদি

 

এ পর্যন্ত বলেই তিনি চুপ করে গেলেন। হঠাৎ পূৰ্ব্বদিগন্তে অরুণ সূর্যোদয় দূরদূরান্তরের তুষারাবৃত্ত শৈলশিখর অনুরঞ্জিত করে অপূৰ্ব্ব মহিমায় স্বপ্রকাশিত হোল এক মুহূর্তে। পলকে পলকে শিখর থেকে শিখরান্তরে বর্ণসমুদ্রের বিভিন্ন রঙের ঢেউ গেল ছড়িয়ে। সকলে অবাক হয়ে চেয়ে রইল সে মহিমময় সৌন্দর্য্যের দিকে।

 

করুণাদেবী বলে উঠলেন সাগ্রহে–চলো মানস-সরোবরে–চলো, চলো–

 

তখনি ঠিক পটপরিবর্তনের মত একটা ব্যাপার ঘটে গেল। এই ছিল অরুণরাগে রঞ্জিত শৈলশিখর ও অরণ্যানী, তখনি যতীন ও পুষ্প বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলে তাদের সামনে কোনো বিশাল জলাশয়ের নীল জলরাশি বিস্তৃত।

 

অপরকূলে তুষারাবৃত শৈলচুড়া, সবে প্রভাত হয়েছে কিন্তু সেই তুষারময় মেরুবৎ প্রদেশে কোনো বিহঙ্গকাকলী নেই কোনোদিকে। সমগ্র পাৰ্ব্বত্যহ্রদের গম্ভীর সৌন্দর্য্য যতীন ও পুষ্পকে মুগ্ধ করলে।

 

করুণাদেবী বল্লেন–ওই দূরে রাবণহূদ, সামনে এটা মানস-সরোবর।

 

তরুণদেবতা বল্লেন–সামনের ওই পাহাড়ের চূড়া গুরলা মান্ধাতা আর ওই দূরে কৈলাসপুষ্পের মনে পড়ে গেল কৈলাস পর্বতে অনেক সিদ্ধ মহাপুরুষ লোকচক্ষুর অগোচরে বাস করেন–ওঁদের কাউকে দেখবার ইচ্ছা অনেকদিন থেকেই আছে তার। করুণাদেবীর কাছে। সেকথা তুলতেই তিনি তরুণদেবতাকে পুষ্পের বাসনা জানালেন।

 

তিনি বল্লেন–একজন জীবন্মুক্ত সাধু ওখানে আছেন, আমি দু একবার তাঁকে সাহায্য করেছিলাম কোনো কাজে। তবে তিনি আমাকে দেখেননি–চলো নিয়ে যাই।

 

কৈলাসপৰ্ব্বত ও সম্মুখবর্তী গুরলা মান্ধাতা চূড়ার মধ্যে বরফের বিশাল ক্ষেত্র–যতীন কখনো গ্লেসিয়ার বা তুষার প্রবাহ দেখেনি, ওর। মনে কথাটা উঠলো, যা সামনে দেখচে, সেটাই বোধ হয় গ্লেসিয়ার। তরুণদেবতা ওর মনের ভাব বুঝে বল্লেন–তুমি যা ভাবছো তা এ নয়। চলো এখান থেকে তোমায় শতপন্থ বরফস্রোত দেখিয়ে আনবো।

 

ওরা কৈলাস পর্বতে গিয়ে দেখলে কৈলাস একটি সম্পূর্ণ আলাদা। পৰ্ব্বত, তার তুষারমণ্ডিত পিনাকসদৃশ শিখরের নিম্নভাগে অনেকগুলি গুহ। সাধু যোগীদের আবাস। একটি গুহায় একজন শীর্ণকায় সাধুকে দেখিয়ে দেবতা বল্লেন–এঁর কথা বলছিলাম। উনি এখন স্থূলদেহের স্থলচক্ষে আমাদের দেখতে পাবেন না–নিৰ্ব্বিকল্প সমাধিস্থ অবস্থায় ইনি ব্রহ্মের সঙ্গে এক হয়ে যান, তখন আমাদেরও অনেক ওপরে চলে যান উনি। তবে স্থূল দেহে ওঁরা সাধারণ মানুষের সমান।

 

যতীন বল্লে–আচ্ছা, এরা একা আছেন কেন?

 

–নির্জনতা আত্মার উন্নতির একটি প্রধান উপায়। নিম্নজগতের কোনো প্রভাব এই উত্তুঙ্গ জনহীন পৰ্ব্বতচূড়ায় এঁদের দেহমন স্পর্শ করে না। নির্জনতায় এঁরা শক্তি অর্জন করেন ব্রহ্মজ্যোতিঃ এঁদের মনে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে এ অবস্থায়।

 

–আমি এর সঙ্গে দু-একটা কথা বলতে পারি?

 

–কি করে? তুমি স্থূল দেহ ত্যাগ করেচ, উনি এখন দেহে অবস্থান করচেন। তা সম্ভব নয়।

 

–আচ্ছা, ওই যে একজন তিব্বতী লোক মানস-সরোবরের ধারে বেড়াচ্ছিল তখন, ওরা কি অবস্থায় আছে? ওদের মুক্তি বা উন্নতি

 

দেবতা হেসে বল্লেন–ওদের থাক্‌ আলাদা। নিম্নস্তরের চৈতন্য নিয়ে জন্মেচে–সঙ্কুচিত চেতন। ওরা মরবে, অমনি অল্পদিন পরেই আবার দেহ নিয়ে পৃথিবীতে জন্মাবে, কারণ ভুবর্লোকে ওদের চৈতন্য মোটেই থাকে না। যদিও থাকে, খুব কম। দেহ না নিলে উপায় হয় না–সুতরাং দীর্ঘ সময় ধরে ওদের প্রায় স্থূলদেহেই বর্তমান থাকতে হয়–পৃথিবীর কামনা বাসনার ঊর্ধ্বে ওদের উঠতে অনেক দেরি। সভ্য সমাজেয় এমন অনেক আছে–খুনী, দস্যু, অলস, চোর, পরপীড়ক ইত্যাদি।

 

করুণাদেবী হেসে দেবতার দিকে বক্রদৃষ্টিতে চেয়ে বল্লেন–এ তুমি খুব ভালই জানো কারণ তোমার হাতের কাজ এটা, কে কতদিন ভুবর্লোকে বাস করবে কি নতুন জন্ম নেবে। উঃ, দু-একটা ব্যাপার এমন নিষ্ঠুর আর করুণ হয়ে ওঠে তখন আমি অনুরোধ করতে বাধ্য হই–

 

তরুণদেবতা হাসলেন মাত্র–সে হাসির মধ্যে অসীম দয়া, অনন্ত জ্ঞান ও গভীর শক্তির আভাস।

 

পুষ্প চুপি চুপি দেবীকে জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা, উনি কে? এই অদ্ভুত দেবতা?

 

–উনি?

 

পরে হেসে দেবতার দিকে চেয়ে বল্লেন–এইবার ওদের বলি?

 

বলেই চুপ করে গেলেন।

 

পুষ্প বিস্ময়ের সঙ্গে বল্লে–আমাদের সঙ্গে এমন ভাবে মিশচেন! এত বড় উনি! অথচ

 

দেবতা এবার হেসে এগিয়ে এসে বল্লেন–মানুষ কি কীট? তোমরাও তিনি। তোমাদের ঋষিরাই বলেচেন–কিঞ্চাইং ন তু ত্বাং ভৃত্যবৎ যাচে, যোহসৌ আদিত্যমণ্ডলস্থো ব্যাহৃতাবয়বঃ পুরুষঃ সোহহং ভবামি–আমি ভৃত্যভাবে তোমার সাক্ষাৎকার যাচঞা করচিনে–সবিতৃমণ্ডলে যে ওঙ্কারময় পুরুষ, আমিই সেই। তুমি আমি ভিন্ন কোথায়? ছোট ভাবো কেন, তাই তো ছোট হয়ে থাকো। বড় হও, বীৰ্য্যবান হও। সচেতন হয়ে যদি তোমরা আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও দাঁড়াও বিদ্রোহের পথে সেও ভাল। তার দ্বারা শক্তি অর্জন করবে। যে দুৰ্বল, তার দ্বারা কি কাজ হবে? যে শক্তিমান, অথচ বিদ্রোহী–তাকে ঠিক পথে নিয়ে আসতে আমরা জানি।

 

যতীন কৌতূহলের সঙ্গে বল্লে–এই যে যুদ্ধ, জাতিতে জাতিতে রক্তারক্তি,… এও কি আপনার ইচ্ছার অনুযায়ী?

 

-তুমি বুঝতে পারলে না। প্রত্যেক ঘটনা মানুষকে উন্নতির পথে। নিয়ে যায়। যুদ্ধ জাতিতে জাতিতে সংঘর্ষ–এর দ্বারা জাতি শক্তিমান হয়। কি হয় যুদ্ধে? মানুষ মারা যায়। মানুষের আরামের ব্যাঘাত ঘটে। এই তো? কিন্তু মৃত্যুর অসত্যতা এতদিনে তুমি নিশ্চয় বুঝেছ। আরামের। অত্যন্ত সুযোগ মানুষকে অলস, পশুবৎ করে তোলে। আমার পৃথিবী কতকগুলি আরামপ্রিয়, রোমন্থনকারী, নিজের অবস্থায় মহাপরিতুষ্ট গোরুর দলে ভ’রে তুলতে আমি চাইনে। শক্তিমান হয়ে উঠুক সব। কে কাকে মারচে? সব মিথ্যে। দুদিনের আরাম কিসের? অনন্ত বিশ্ব তোমাদের পায়ের তলায়। সংকল্পাদেব ততেঃ, যা যখন ভাববে, মুক্ত পুরুষে তাই তখন পায়। পৃথিবীর স্কুল বাসনা কামনাকে জয় করো আরামের ইচ্ছা মন থেকে তাড়াও। নয়তো ঘুমিয়ে পড়বে।

 

করুণাদেবী বল্লেন–এদের বৃহস্পতি গ্রহের দুই উপগ্রহে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দাও না?

 

–দেখাবো। সেদুটো ধীরগামী জগৎ, যারা পৃথিবীতে সুবিধেমত উন্নতি করতে পারছে না, আমরা তাদের ওই সব মন্থরগতি জগতে পাঠিয়ে দিই জন্ম নিতে। সেখানে গেলে আশ্চর্য ব্যাপার দেখবে।

 

করুণাদেবী বল্লেন–ওদের এখুনি নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিই–

 

আবার মানস-সরোবর ও হিমালয় ওদের পায়ের তলায় দেখতে দেখতে মিলিয়ে গেল। আবার অসীম ব্যোম–অন্ধকারে ডুবে পৃথিবী দিগন্তহীন আকাশে অদৃশ্য হোল। আকাশের অদ্ভুত দৃশ্য, দিনমানে।

 

সব দিক নক্ষত্রযুক্ত।

 

তারপরে নক্ষত্রজ্যোৎস্নায় প্লাবিত আকাশপথে এক বিশাল মহাগ্রহ ওদের দিকে যেন দ্রুত ছুটে আসছে। করুণাদেবী বল্লেন–বৃহস্পতি!

 

কিন্তু বৃহস্পতি খুব বড় মশালের আলোর মত ওদের দক্ষিণে দূরে। পড়ে রইল। ওরা অন্য একটি ক্ষুদ্র পৃথিবীর খুব নিকটে এসে তার। বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়লো।

 

যতীন বল্লে–কিসে যেন পড়েছিলুম, পৃথিবী ছাড়া সোলার সিস্টেমের অন্য কোনো কিছুতে মানুষ নেই!

 

গ্রহদেব বল্লে–সে সব কথা এখন থাক্। এই পৃথিবীটা দেখে নাও আগে–

 

পৃথিবীর মত অবিকল সে স্থান, খুব বেশি ফুল, ছোট বড় নদী। বসন্তের হাওয়া বইছে, বিহঙ্গের সুস্বর সর্বত্র, নিৰ্ম্মল জলাশয়। গ্রহটির একদিকে রাত্রির অন্ধকার, অন্যদিকে দিবসের আলো। যে অংশে ওরা গেল সেখানে মানুষের কর্মব্যস্ততা নেই, নিশ্চিত মনে সকলে। নিজের নিজের বাড়ীতে বসে আছে। গৃহস্থাপত্য অতি সুন্দর, সব রকম শিল্পকলার অদ্ভুত উন্নতি হয়েচে সেখানে, দেখেই মনে হোল, সর্বত্র সঙ্গীত, বাদ্য, নৃত্য। অত্যন্ত সুন্দরী মেয়েরা বনে উপবনে ভ্রমণ করে বেড়াচ্চে পরম নিশ্চিন্ত মনে, যেন তাদের হাতে অতি সুদীর্ঘ অবকাশ, যেন সারা দিনমান শুধু কমলের বনে অলস পদচারণ জীবনের সব মুহূর্তগুলি ভরে দেবে অমৃতে। শান্ত ও অপরূপ সৌন্দর্য্যের রূপায়তন সে পৃথিবীর সুশ্যামল শম্পাস্তৃত প্রান্তরে, ফুলফোঁটা বনে ঝোপে, গন্ধে ভরা কুঞ্জতলে। বৃহস্পতির আলো পড়ে যে অংশে রাত্রির অন্ধকার, সে অংশের শোভাও চমৎকার–তবে সমগ্র পৃথিবীটি একটি নিশ্চিন্ত, নিরুপদ্রব শান্তির গভীরতায়, ব্যস্ততাহীন জীবনমুহূর্তগুলির পুঞ্জীভূত ভারে যেন ঘুমিয়ে আছে, এলিয়ে আছে, কিসের অলীক স্বপ্নে দিনরাত্রি বিভোর।

 

করুণাদেবী বল্লেন–এই দেখ যে পৃথিবীর কথা তোমায় বলেছিলাম।

 

–স্লো–মানে ধীরগামী পৃথিবী?

 

–করুণাদেবী হেসে ফেলতেই যতীন অপ্রতিভ হয়ে বল্লে–না, ইংরিজিটা আপনি হয়তো জানেন কি না–মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল–ও ভাষা কি আপনারা–মানে ম্লেচ্ছ ভাষা–

 

গ্রহদেব বল্লেন–তুমি এখনও বুঝলে না। আমাদের কেনো ভাষা নেই, যখন যে পৃথিবীতে, যে মানুষের সঙ্গে কথা কই–তাদের ভাষাই আমাদের ভাষা। পৃথিবীতে প্রচলিত যে কোন ভাষাই হোক–তা। আমাদের আপন। ইটালী দেশের কোনো লোকের সঙ্গে কথা বলবার সময় তাদের ভাষাতেই বলবো

 

–আপনাদের মধ্যে কথাবর্তা তাহোলে কি ভাষায়–কেন, বাংলাতেই তো আপনাদের মধ্যে বলছিলেন?

 

করুণাদেবী বল্লেন–মুখ দিয়ে কথা বলার দরকার হয় না কোনো স্বর্গেই–চতুর্থস্তরের ওপরে কোথাও। মনের মধ্যে পরস্পরের কথা ফুটে ওঠে–আরও ওপরে স্বর্গে রঙীন আলোর বিদ্যুৎশিখার মত আলোর ভাষার আদানপ্রদানে কথাবার্তা চলে। আমাদের ভাষা তোমাদের মত “কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো” তা হয় না। মরমেই আগে পশে–কান শুনতেই পায় না–শোনবার দরকার হয়। না। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হচ্চে বলেই আমরা মুখের ভাষা ব্যবহার করি।

 

পুষ্প বল্লে–এই পৃথিবী কিন্তু আমার বেশ লাগচে। একটু বেড়ানো গেলে মন্দ কি?

 

বৈশ্রবণ বল্লেন–বেশ তো, ভাল করেই দেখতে পারো।

 

এক হ্রদে কতগুলি সুসজ্জিতা নরনারী নৌকাতে প্রমোদবিহার করছিল। দেবতা সেখানে গিয়ে বল্লেন–ক’বছর এরা এমনিধারা জল-বিহার করচে জানো? তোমাদের পৃথিবীর মাপে তিনটি বছর। তাড়াতাড়ি নেই কিছু এদের।

 

যতীন সবসময়ে বল্লে–তিনটি বছর!

 

–ঐ যে বল্লাম ধীরে সুস্থে এখানে সব হয়। নৌকাতে জলবিহার। চলছে তো চলছেই। ওদের গিয়ে বল যদি, বিস্মিত হবে।

 

যতীনের মনে পড়ে গেল বাল্যে কলেজের ক্লাসে পড়া টেনিসনের কবিতার সেই মৃণালভোজীর দেশ বা Land of Lotus-eaters!… সেখানেও সব লোক–

 

পরে কার সঙ্গে কথা বলতে যাচ্চে ভেবে সে লজ্জায় চুপ করে গেল।

 

দেবতা বল্লেন–চলো আরও দেখবে।

 

এক পাহাড়ের শ্যাম সামুতে বনপুষ্পবিকশিত নির্জন অঞ্চলে সে দেশের কবিকুলের মজলিস বসেচে। সেখানে সুদীর্ঘসময়-ব্যাপী গোধূলিতে তারা আরামে কাব্য আলোচনা করচে, পরস্পর পরস্পরকে আবৃতি করে শোনাচ্চে নৈসর্গিক শোভা, বনপুষ্পের লাবণ্য সম্বন্ধে নানা কবিতা। নারীপ্রেম নিয়ে কত সঙ্গীত রচনা করে বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে অতি সুকুমার মাধুর্য্যের সঙ্গে ললিত স্বরে গাইচেযেন জীবন অনন্ত, সময় অনন্ত। সে সঙ্গীতের ঘুমপাড়ানি মাধুৰ্য্য সত্যিই চোখে ঘুম নিয়ে আসে শুনে যতীনের সত্যিই মনে হচ্ছিল দিগন্তের পাণ্ডুর শোভা শৈলসানুতটে যে শান্তি ও শ্রী বিস্তার করছে তাতে সব ভুলিয়ে দেয়, জীবনের যুদ্ধ অবাস্তব কাহিনী–জীবন শুধু এমন নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব গোধূলি দিয়ে ভরা–আর কোথাও ছুটোছুটি করে কি হবে, এখানেই ঘুমিয়ে পড়া যাক দিব্যি।

 

যতীন বল্লে–আমাদের পৃথিবীতেও এরকম নেই কি দেব?

 

–আছে, সে অন্য রকম। এরা এদেশের বসন্তকালের ব্যেপে এরকম উৎসব চালাচ্চে–এদের বসন্তের স্থায়িত্ব কত জানো? ন’বছর। পৃথিবীর হিসেবে।

 

যতীন হাঁ করে অবাক হয়ে চেয়ে রইল দেবতার মুখের দিকে।

 

করুণাদেবী ওর বিস্ময় দেখে কৌতুক অনুভব করলেন। বল্লেন– নইলে তোমার ভাষায় স্লো ওয়ার্ল্ড হবে কি করে?

 

ও আরও অবাক হয়ে বল্লে–বা রে, আপনি যে ইংরিজি–

 

–সব ভাষাতেই কথা বলতে পারি, আমরা, বল্লাম যে। ভাষা কিছুই নয় আমাদের কাছে। তারপর শোনো, এদের বছর কতদিনে জানো? পৃথিবীর ষাট বছরে এদের দেশের এক বছর। ঐ দেখ বৃহস্পতি গ্রহ ঘুরচে কত আস্তে আস্তে। সূর্য থেকে যে গ্রহ যত দূরে, তাঁর আবৰ্ত্তণ তত স্লো। আবার এই উপগ্রহের একটা নিজস্ব আবৰ্ত্তন আছে নিজের কক্ষে–সব মিলিয়ে দীর্ঘ দিন, দীর্ঘ রাত্রি, দীর্ঘ পথ, দীর্ঘ বছর এখানে। মানুষও ধীর গতিতে চলে, বহু সময় নিয়ে কাজ করে, বহু সময় নিয়ে আমোদ করে, বদলায় অনেক সময় নিয়ে। পৃথিবীর মত তাড়াহুড়ো নেই, ব্যস্ততা নেই।

 

–এদের আয়ু?

 

–তিনশো বছর প্রায়, তোমার পৃথিবীর হিসেবে। ধীরগামী আত্মা, পৃথিবীর পঞ্চাশ-ষাট বছর বয়সে যারা উন্নতি করতে পারবে না, কিছু বুঝতে পারবে না–এখানে পুনর্জন্ম গ্রহণ করিয়ে দেওয়া হয়। এখানে তারা যাতে ঘুমিয়ে না পড়ে তার ব্যবস্থা আছে।

 

–কি রকম ব্যবস্থা বড় জানতে ইচ্ছে হচ্চে–

 

দেবতা হেসে বল্লেন–রুদ্র ব্যবস্থা কিছু নেই, পৃথিবীতে যেমন আছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ, ব্যাধি, মহামারী, বিপ্লব, দুর্ভিক্ষ। এখানকার মানুষেরা একটু অলস, একটু ধীর-বুদ্ধি–এদের ওপর দয়া করতে হয় অনেকখানি। সবই তাঁর ব্যবস্থা (এখানে গ্রহদেবের মুখশ্রী শ্রদ্ধায়, সম্বমে, ভক্তিতে কোমল হয়ে এল), তিনি তাঁর অসীম করুণায় এ ব্যবস্থা করেছেন আমরা তাঁর নিয়োজিত ভৃত্য মাত্র। এ কি দেখছো। এর চেয়েও ধীরগামী জগৎ আছে, তবে এ সৌরমণ্ডলে নয়। তিনিই এই সব অলস জড়বুদ্ধি জীবের জগতে উচ্চস্তরের দেবদূত পাঠিয়ে দেন, তাঁরা দেহধারণ করে আসেন এদের শিক্ষা দিতে। তাঁরাই এ সকল পৃথিবীর শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, শ্রীচৈতন্য, শঙ্কর, ব্যাস, দ্বৈপায়ন–সবাইকে তাঁর লীলাসহচর না করে নিলে তাঁর সুখ নেই। তাঁর অপার অনন্ত করুণার কথা তোমরা কি জানো? কেবল দুঃখ হয় মানুষে তাঁকে আগাগোড়া ভুল বুঝছে। কে তাঁকে জানে বা জানবার চেষ্টা করে? মানুষ যদি এক পা এগিয়ে যায়, তিনি তিন পা এগিয়ে আসেন মানুষের দিকে। অথচ সবাই নিজেকে নিয়ে উন্মত্ত, পৃথিবীর সুখ নিয়ে দিশাহারা–তিনি। উদাসীন, কেউ তাঁকে চায় না দেখে অপেক্ষা করে করে দোর থেকে চলে যান। কেউ গ্রাহ্য করে না। জগৎজোড়া বনফুলের মালা তাঁর গলায়—অথচ–

 

পুষ্পের চোখে জল এসে গেল গ্রহদেবের অপূৰ্ব্ব কণ্ঠস্বরে। সে হাত জোড় করে বল্লে–প্রভু, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

 

গ্রহদেব তখনও আত্মস্থ বিভোর অবস্থায় বলেই চলেচেন আগের কথার জের টেনে–

 

–দেখ, তোমরা পৃথিবীর ছেলেমেয়ে। আমি তোমাদের ভালবাসি, কারণ তোমাদের জন্মজন্মান্তর নিজের হাতে গড়ে তুলেচি। তাঁর জ্যোতির্বাতায়ন অসীম শূন্যে ভোলা রয়েছে, আশ্চর্যের বিষয় সেদিকে কেউ চায় না। সবাই অন্ধ। নরক থেকে বাঁচাতে চাই, কিন্তু পারিনে। অন্ধের মত ছুটে যায় সেদিকে। ওঁকে দেখ–উনি সত্যলোকেরও উদ্ধর্তন স্তরের দেবী, কিন্তু নিজের সুখ চান না। পৃথিবীর ছেলেমেয়েদের দুঃখে প্রাণ কাঁদে বলে কোনো উৰ্দ্ধ লোকেই থাকতে পারেন না। উনি সৌরমণ্ডলের সমস্ত জগতের মা। তোমরা কি আমাদের দেখা পেতে? আমাদের দেখার মত চোখ পেয়েচ শুধু ওঁর কৃপায়। নইলে ওর নিজের স্তরে উনি জনঃ, মহঃ তপঃ লোকের জীবের অদৃশ্য। এখানে কোনো লোকের অধিবাসী তাদের উদ্ধা লোকের অধিবাসীকে দেখতে পায় না–দেখা সম্ভব নয়। ওই মেয়েটিকে ভালবাসেন বলে আজ তোমাদের এই সব সৌভাগ্য। উনি আমারও ঊর্ধ্ব লোকের দেবী, দয়া করে আমায়–

 

করুণাদেবী সলজ্জ সুরে বল্লেন–পুষ্প, শোনো তবে–উনি কে জানো? উনি গ্রহদেব বৈশ্রবণ। তোমাদের পৃথিবীর সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়ের কর্তা। যুগযুগান্তর থেকে তাঁর নির্দেশমত উনি তোমাদের পৃথিবী পরিচালনা করছেন। পূৰ্ব্ব কল্পের দেবতা উনি। তারও পূৰ্ব্ব কল্পে উনি দেবযান-পথে জন্মমৃত্যুর আবৰ্ত্ত অতিক্রম করেন–বহুদূর পথের যাত্রী উনি। ওঁর স্বরূপে ওঁকে সত্যলোকের জীবেরাও দেখতে পায় না–চোখ ঝলসে যায় ওঁর তেজে। দয়া করে তোমাদের দৃষ্টির উপযুক্ত কায়া ধারণ করে দেখা দিলেন তাই দেখতে পাচ্চ।

 

সম্ভমে, বিস্ময়ে, ভয়ে ও ভক্তিতে ক্ষুদ্র পৃথিবীর ছেলে-মেয়ে পুষ্প ও যতীন একেবারে নির্বাক হয়ে রইল। পুষ্প কি প্রশ্ন করতে চেয়েছিল। তা ভুলেই গিয়েছিল, এই সময় মনে আসতে সে আবার হাতজোড় করে বল্লে–প্রভু, আমাদের জন্মান্তরে কত সৌভাগ্য ছিল যে আপনাদের সাক্ষাৎ…একটা প্রশ্ন আমার আছে–

 

বৈশ্রবণ বল্লেন–আমাকে ধন্যবাদ দিও না পুষ্প। কৃতজ্ঞতা জানাও সেই মহামহেশ্বর, বিশ্বব্রহ্মান্ডের অধিদেবতা যিনি, তাঁকে। আমরা তাঁর ভৃত্যদের নির্দেশে চলি–তাঁর দাসানুদাস। এই অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ড তাঁর ইঙ্গিতে চলে–অথচ কে জানে তাঁকে? তোমাদের পৃথিবীর জ্ঞানী লোকেরা জানতেন–তাই বলে গিয়েচেন–অস্য ব্রহ্মাণ্ডস্য সমস্ততঃ স্থিতান্যেতাদৃশান্যনন্তকোটিব্রহ্মাণ্ডানি সাবরণানি জ্বলন্তি–এই ব্রহ্মাণ্ডের আশেপাশে এই রকম অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ড আবরণের সহিত প্রজ্বলন্ত অবস্থায় অবস্থিত। সে সব ব্রহ্মাণ্ড আমিও দেখিনি। তুমি যে। পথিকদেবতার সাক্ষাৎ পেয়েছিলে, তাঁর মত বিরাট দুর্ধর্ষ আত্মারা তাঁর কৃপায় বহু সৌরমণ্ডল, বহু নীহারিকা, নক্ষত্রজগৎ অতিক্রম করে এই অনন্ত বিশ্বে ঘুরে বেড়াবার অধিকার ও শক্তি পেয়েছেন। বিগত কল্পে আর একজন এমন দেবদূতকে আমি জানতাম–তিনি পৃথিবীর এক আবৰ্তকাল অর্থাৎ প্রায় বাইশ হাজার বছর ধরে বিদ্যুতের অপেক্ষাও দ্রুতগতিতে পরিভ্রমণ করেও শুধু আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ডটার কূলকিনারা পান নি। তা ছাড়াও তো অনন্তকোটিব্রহ্মাণ্ডানি সাবরণানি জ্বলন্তি– কোথায় তার ঠিকানা, কোথায় তার কূলকিনারা, কোথায় তাদের সীমা! এখন ভাবো, এই সমুদয় বিশ্ব যাঁর ইঙ্গিতে চলেচে-পৃথিবীর ছেলেদের খেলবার ক্রীড়নকের মত বন্ বন্ করে ঘুরচে–তাঁকে কে জানতো যদি তিনি নিজের দয়ায় কৃপা করে

 

পুষ্প অনেকক্ষণ থেকে যে প্রশ্ন করতে চাইছিল, এবার তার সুযোগ পেয়ে মরীয়ার সুরে বল্লে–প্রভু, আমিও ঐ প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম আপনি অন্তর্যামী, বুঝতে পেরেই তার উত্তর দিলেন। আমিও জানতে চাইছিলুম ভগবানকে আপনি কি দেখেছেন? দয়া করে আমার এই কৌতূহল–

 

করুণাদেবী এবার উত্তর দিলেন, কারণ গ্রহদেব তখন আপন ভাবে বিভোর। বিশ্বের ভগবানের কথা মনে ওঠাতে অন্য প্রশ্নের দিকে তাঁর মন ছিল না, যদি মন নামক অতি ক্ষুদ্র মানুষী ইন্দ্রিয় তাঁর মত বিরাট দেবতাতে আরোপ করা চলে। বল্লেন–না পুষ্প, উনি দেখেন নি। আমিও দেখি নি। অথচ তাঁকে অনুভব করেছি। তিনি কোথায় নেই? বিশ্বের প্রতি বাষ্পকণায়, জ্যোতিঃকণায়, পৃথিবীসমূহের প্রতি তৃণে প্রতি ধূলিকণায় তিনি। তিনি আছেন তাই আমরা আছি, তোমরা আছ, বিশ্ব আছে। তিনি সকলেরই। তুমি চাও, তোমার–আমি চাই, আমার।

 

গ্রহদেব বল্লেন–পুষ্প, বুদ্ধি দিয়ে তাঁকে বুঝতে যেও না। পারা যায় না। সে ইন্দ্রিয় তোমাদের নেই–তবে শুধু তাঁকে ভালবাসা দ্বারা মন। ও বুদ্ধিকে অতিক্রম করে এমন ভূমি লাভ করা যায় যে-ভূমি থেকে তাঁকে অনুভব করা যায়। নয়তো যার সে ক্ষমতা নেই–সেও যদি আকুল হয়ে ডাকে–তার মন ও বুদ্ধির গম্য হয়ে নিজেকে খুব ছোট করে সে ভক্তকে তিনি দেখা দেন। পৃথিবীতে কত লোক ইষ্টরূপে। তাঁকে ভজনা করে। ঘোটর কাছে ছোট হয়ে দেখা দেন তিনি–কত কৃপা তাঁর। কিন্তু যে রূপ তাঁর নিজের–সে রূপে তাঁকে কে দেখতে পায়–

 

–প্রভু, কেউ কি পায় না?

 

ব্রহ্মলোকের বহু ঊর্ধ্বে তাঁর নিজের লোক! দেখি নি, তবে জ্ঞান। দ্বারা অনুভব করতে পারি। সেখানে হাজার হাজার কল্পের পূৰ্ব্বেকার মুক্ত আত্মারা আছেন–কখনও দেখিনি তাঁদের। তাঁরা মহাশক্তিধর, বিশ্বের সৃষ্টি স্থিতি লয় করবার ক্ষমতা রাখেন। তাঁরাই তাঁকে স্বরূপে। হয়তো দেখেন। কিন্তু মানুষের রূপে দেখতে চাও, তুমিও পাবে। ভক্তি করে চাও। অত বড়ও কেউ নেই, আবার অত ছোটও কেউ নেই।

 

যতীন বল্লে–প্রভু, এই পৃথিবীর মানুষে ভগবানকে জানে?

 

সব পৃথিবীর অবস্থাই সমান। সত্য জানতে চায় ক’জন? এখানে তো দেখচো, ইন্দ্রিয় সুখ নিয়ে সবাই মত্ত। সেই বিরাট মহাশক্তির ধারণা করা এদের পক্ষে সহজ নয়। অবশ্য এরা পৃথিবীর জীবের চেয়ে অধিকতর জড়বুদ্ধিসম্পন্ন। বহুঁকাল, যুগ-যুগান্ত কেটে যাবে এদের সমস্ত জড়তা, মনের মালিন্য দূর করে সে ধারণা উদ্বুদ্ধ করতে। কিন্তু বিশ্বের ভগবানের অসীম ধৈৰ্য্য। কাউকে তিনি অবহেলা করেন। না। তবে অনেক দেরি হয়ে যাবে। যারা নিরলস আত্মা, আধ্যাত্মিক জ্যোতি যাদের মধ্যে জ্বলচে স্বয়ম্প্রভ মহিমায়, তারা এক জন্মেই ঘুম। ভেঙে চেয়ে দেখে। যেমন বলেছিলেন তোমাদের গ্রহের এক প্রাচীন। কবি–বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্ আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ আমি অন্ধকারের ওপারের সেই আদিত্যবর্ণ মহান্ পুরষকে জেনেচি– ওগো শোনো সবাই শোন–শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ। কত আনন্দ! আনন্দের ভাগ সবাইকে না দিলে যেন চলচে না। কিন্তু ভাবো, ক’জন সেজন্যে ব্যগ্র? আদিত্যবর্ণ পুরুষকে না জানলেও তাদের জন্মের পর জন্ম, যুগের পর যুগ, এমন কি কল্পের পর কল্প পরম আরামে অন্ধের মত কেটে যাচ্চে চির-অন্ধকারে! তাঁর ওপারে কি আছে কে সন্ধান রাখে?

 

যতীনের মনে একটা প্রশ্ন জাগলো। প্রশ্নটা সে করলে–তাঁদের মত অসীম শক্তিধর দেবতা কৃপা করলে তো একদিনে সব উদ্ধার হয়! সত্যের প্রচার করে দিলেই তো হয়।

 

দেবতার মুখে অনুকম্পার হাসি ফুটে উঠলো। বল্লেন–তা কি হয়? যে পৃথিবী যে সত্যের জন্যে প্রস্তুত নয়, যে মানুষকে যে কথা বল্লে সে বুঝবে না–সেখানে সে সত্য প্রচার করা হয় না–সে মানুষকে সে কথা জোর করে শোনানো হয় না। স্বাতীনক্ষত্রের জল ঝিনুকে পড়লে মুক্তা হয়–কিন্তু ধূলোয় পড়লে ভগবান মহাজ্ঞানী। যা হয় না, তা তিনি করেন না।

 

পুষ্প বল্লে–তবে মানুষের মুক্তি কেমন করে হবে?

 

–মানুষ যখন স্বেচ্ছায় এগিয়ে যাবে। তাঁর প্রতি উন্মুখ যে মন, সে। মনের সকল ভ্রান্তি তিনি ঘুচিয়ে দিয়ে সত্যের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেন।

 

–দেব, সহজ কথায় বলুন আমরা কি করবো? আমাদের কি কৰ্ত্তব্য?

 

-ত্বমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি–তাঁকে জেনেই মৃত্যুকে অতিক্রম করতে হবে।

 

–কি ভাবে প্রভু? মৃত্যুকে অতিক্রম করা মানে কি?

 

–সাধারণ মানুষে মরচে, আবার জন্মাচ্চে, আবার মরচে। একে বলে মানব-আবৰ্ত্ত। এ’কে জয় করাই মৃত্যুকে অতিক্রম করা। তাঁকে না জানলে কিছুতেই এ আবৰ্ত্ত এড়ানো যায় না। নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে আয়নায়–আর দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।

 

–পথ বলে দিন দেবতা–আমরা শরণাগত।

 

গ্রহদেব গম্ভীর মুখে বল্লেন–তাঁকে ডাকো, তাঁর কাছে আলো ভিক্ষা চাও। তাঁর কাছে প্রার্থনা কর সৰ্ব্বদা। পরকে ভালোবাসো। যেখানে প্রেম, ভক্তি, স্নেহ, ক্ষমা–সেখানে তিনি। তিনিই তাঁকে বুঝবার শক্তি দেবেন। তাঁর জন্যে যে সৰ্ব্বত্যাগী, তাকে হাত ধরে তিনিই নিয়ে যান। পরের জন্যে যে সৰ্ব্বত্যাগী, তাকে হাত ধরে তিনিই নিয়ে যান।

 

–এই মানুষের ধর্ম।

 

–এর চেয়ে বড় ধর্ম নেই পৃথিবীর মানুষের। যারা নিরলস হয়ে তাঁকে ডাকে, ভালবাসে–পরের সেবা করে, এক অমানব পুরুষ তাদের হাত ধরে দেবযান পথে জন্মমৃত্যুর দুস্তর অকূল মহাসমুদ্র পার করে নিয়ে যান। ভগবান নিজেই সেই অমানব পুরুষ, অপার করুণায় যিনি নিজেই এগিয়ে এসে হাত ধরেন অসহায়ের, শরণাগতের। পৃথিবীর সৃষ্টির আদিকালের বাণী এ। কারণ যা সত্য, তা চিরযুগেই সত্য-এই একই বার্তা যুগে যুগে পৃথিবীতে প্রচার করা হয়েছে, দূতের পর দূত এসেচে, ‘অন্ধ জাগো!’ না–কিবা রাত্রি কিবা দিন! চোখ আছে, কেউ দেখে না; কান আছে কেউ শোনে না!

 

ওরা সে পৃথিবীর একটি সুরম্য হ্রদ-মত জলাশয়ের ধারে বসেচে। যতীন চেয়ে চেয়ে দেখছিল, ওদের দক্ষিণে-পৃথিবীর দেবদারুজাতীয়

 

বৃক্ষের মত এক প্রকার ঘন সবুজ বৃক্ষের সারি, কিন্তু তাতে থাবা দোপাটির মত রঙীন ফুল এত ফুটেছে যে, বড় বড় শাখা প্রশাখা নিৰ্ম্মল স্ফটিকের মত জলরাশির কূলে কূলে নুয়ে পড়েছে। বেলা উত্তীর্ণ হয়েছে, নীলকৃষ্ণ দিগন্তরেখার দিকে চেয়ে হঠাৎ সে দেখলে বিশালকায় এক দশমী কি একাদশীর চন্দ্র উদয় হচ্চে! অত বড় চন্দ্র। আকাশের এক দিক জুড়ে আলোয় আলো করে তুলেচে সারা দিক্‌চক্রবাল।

 

সে অবাক হয়ে বল্লেও কি রকম চাঁদের মত ওটা–অত বড়–

 

করুণাদেবী হেসে বল্লেন–বৃহস্পতি! ওর জ্যোৎস্না পড়বে এখনি। পৃথিবীর জ্যোৎস্নার চেয়ে অনেক বেশি জ্যোৎস্না আর অদ্ভুত শোভা। আর একটা ব্যাপার, তোমাদের পৃথিবীর মত অমাবস্যা এখানে নেই, উপগ্রহের ক্ষুদ্র দেহ অতবড় বৃহস্পতি গ্রহকে ঢাকতে পারে না, সুতরাং সপ্তমী থেকে পূর্ণিমা পৰ্য্যন্ত কলা হয়–কিন্তু দ’বৎসর ধরে শুক্লা রাত্রি চলে।

 

সে মুগ্ধ হয়ে গেল এই সুদূরতর পৃথিবীর অদ্ভুত জ্যোৎস্নাময় রজনীর শোভায়। হ্রদের ওদিকে জলজ ঘাসের আড়ালে তরুদলের ভ্রষ্ট কুসুমরাশি পদদলিত করে একদল পরমা রূপসী নারী জলে নামলো স্নান করতে। কে জানতো আবার এমন সব স্থান আছে, সেখানেও মানুষ আছে। ভগবানের যে কথা গ্রহদেব কিছু আগে বলছিলেন, তাতে তার মন ভরে আছে। যে আদিত্যবর্ণ পুরুষের মানস থেকে এই সব পৃথিবী, এই জ্যোৎস্না, পাহাড় পৰ্ব্বত, বেণু-বীণার ঝঙ্কারের মত সুস্বরা ওই সুন্দরীদের উৎপত্তি, তাঁতেই লয় কল্লান্তে, সৃষ্টি আর প্রলয়। যাঁর নিশ্বাস আর প্রশ্বাস–তিনি কোথায়? কে তাঁকে জানে? কি ভাবে তাঁকে জানা যায়? কে দেখিয়ে দেবে তাঁকে?

 

হঠাৎ চমক ভেঙে সে দেখলে তারা তিনজনে মাত্র আছে। গ্রহদেব বৈশ্রবণ কখন অন্তর্হিত হয়েছেন। করুণাদেবী বল্লেন–উনি এ সব পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না।

 

পুষ্প বল্লে–আমাদের বড় সৌভাগ্য যে, ও’র দেখা পেয়েচি–অবিশ্যি আপনার দয়ায়।

 

ফেরবার পথে আকাশে উঠে পুষ্পকে দেবী দেখালেন, পৃথিবীটার চারিদিকে আকাশে কুয়াসার মত, মেঘের মত পিঙ্গল প্রভার আবেষ্টিত করে রেখেছে কি সব। বল্লেন–পৃথিবীর তাবৎ অধিবাসীদের বাসনা কামনা মেঘের মত জমা হয়েচে ও বায়ুমণ্ডলে। ওদের কাছে অদৃশ্য, যেমন আমরা ওদের কাছে অদৃশ্য। তোমাদের পৃথিবীতেও আছে এই রকম–এর চেয়েও বেশি। এই সব ঠেলে আমাদের যাতায়াত বড় কষ্টকর–তোমাদের পৃথিবীর শহরগুলোতে তো আরও বেশি। টাকার নেশা, সুরার নেশা, রূপের নেশা-ওর আকাশ ধূসর বাষ্পে ছেয়ে রেখেচে–তাতে বিষ আছে, আমাদের পক্ষে সে ঠেলে যাওয়া কত

 

যতীন বিরক্তির সুরে বল্লে–সব তাতেই তোমার ঠাট্টা। আমার ব্যথা আমিই জানি।

 

–বেশ ভালই। যাও, গিয়ে দেখে শুনে এসো, মায়ের বাছা–আহা!

 

–তুমিও চলো। পথে নানা বিপদ, চুম্বকের ঢেউ–ঢেউ কখন কি রকম হবে, ওসব আমি বুঝতে পারিনে। শেষকালে আবার কোথায় গিয়ে ঠেলে উঠবো জন্ম নিয়ে, বিশ্বাস কিছুর নেই। তার চেয়ে চলো সঙ্গে।

 

কোলা বলরামপুর গ্রামে ঝাঁ ঝাঁ করচে শরতের দ্বিপ্রহর। নিবিড় বাঁশবনে ঘুঘু ডাকচে উদাস-মধ্যহ্নবেলায়, বনে বনে তিৎপল্লার হলুদ ফুল ফুটেছে। যতীন অনেকদিন পরে বাংলার শরতের এ সুপরিচিত দৃশ্যগুলি দেখলে। বাঁশঝাড়ে সোনার সড়কির মত নতুন বাঁশের চারা ঠেলে উঠেছে, বনসিমতলায় বেগুনি ফুল ফুটে ঝোঁপের মাথা আলো করচে-বর্ষার শেষে জল মরে যাচ্চে ডোবায়, পুকুরে নদীতে-তীরের টাটকা কাদায় সাদা বক গেঁড়ি গুগলি খুঁজে বেড়াচ্ছে, জলের ধারেই কাশফুলের ঝাড় থেকে হাওয়ায় কাশফুলের সাদা তুলোর মত পাপড়ি উড়চে।

 

যতীন বল্লে–কি চমৎকার, পুষ্প! বাংলার সব পাড়াগাঁয়েই এমন। মন খারাপ হয়ে গেল। এর সঙ্গে জীবনের কত স্মৃতি জড়ানো! ছেলেবেলায় এমনি শরতে পূজোর ছুটিতে স্কুল-বোডিং থেকে বাড়ী আসতুম…দ্যাখো দ্যাখো এই গেরস্তর বাড়ীটিতে কি শিউলি ফুলটা তলায় পড়ে রয়েছে! আহা!

 

পুষ্প বল্লে–দুপুরের রোদে এখনও শুকোয় নি-ঘন ছায়া কিনা!

 

যতীন স্বপ্নলস চোখে বল্লে–কতকাল পরে যেন নিজের মাটির ঘরটিতে ফিরে এলুম পুষ্প। এমনি স্নিগ্ধ, এমনি আপন। চলো–

 

ঘরের মধ্যে বিছানা পাতা–তাতে যতীনের সেই তরুণী মা আধময়লা লেপকাঁথা গায়ে শুয়ে ম্যালেরিয়ায় ভুগচে। শুধু এখানে নয়, পাশের বাড়ীতেও তাই-জানালার কাছে ছোট তক্তপোশে আর একটি বৌ। শুয়ে জ্বরে এপাশ-ওপাশ করচে, তার পাশে দুটি ছোট ছোট ছেলে– জ্বরে ধুকচে তারাও। রান্নাঘরে একটি বৃদ্ধা কলাই-এর ডালে সম্বরা দিয়েছেন, তারই সুগন্ধ জ্বরাক্রান্ত বাড়ীর বাতাসে। পাশের বাড়ীর বৌটি চিঁচিঁ করে বলচে–একটু জল দিয়ে যাও পিসিমা।

 

বৃদ্ধা বলচে–একা মানুষ কতদিকে যাবো, ক’টা হাত পা? কাল। গিয়েচে একাদশী, আর এই খাটুনি। একটু সবুর করো। গোরু দুটো সেই কোন্ সকালে বেঁধে দিয়ে এসেচি নদীর ধারের বাড়ায়, একটু জল দেখিয়ে আসবার সময় পাইনি এত বেলা হোল।

 

যতীন এসে ওর নতুন মায়ের বিছানার পাশে দাঁড়ালো। একটু আগে ওর মা ওর কথা মনে করে কেঁদেছে জ্বরের ঘোরে। এই তো গত বর্ষায় ও মায়ের কোল ছেড়ে গিয়েছে, সে স্মৃতি ওর মায়ের মনে এখনও অতি স্পষ্ট। চোখের জল গড়িয়ে পড়েছে বালিশের গায়ে। মাতৃহৃদয়ের নিঃশব্দ ব্যথার অভিব্যক্তি। যতীন বুঝলে, মায়ের এই চোখের জল, বুকের চাপা কান্নাই তাকে আজ সপ্তমস্বর্গের পার থেকে টেনে এনেছে এখানে। মাতৃশক্তির আকর্ষণ অদম্য, কেউ তাকে তুচ্ছ করতে পারে না, হোলই বা মাটির ঘরের দুদিনের মা। সব মা-ই তো দুদিনের।

 

পুষ্প বল্লে–যা ভাবচো তা নয় যতীনদা। মায়া বলে উড়িয়ে দিতে চেও না পৃথিবীকে, পৃথিবীর স্নেহ-ভালবাসাকে। তোমার সাধ্যি কি এই মাতৃশক্তিতে অবহেলা কর। নিজের নিজের জায়গায় কারো শক্তি কম নয়।

 

যতীন কৃত্রিম রাগের সুরে বল্লেওঃ এখন যদি সেই সমাধিবাজ সন্নিসিটাকে পেতাম–বুঝিয়ে দিতাম তাকে–

 

–মহাপুরুষদের নামে অমন বোলো না, ছিঃ! তিনি যে ভূমিতে উঠে জগৎকে মায়া দেখেছেন, তোমার সে জ্ঞান কোথায়? যে অবস্থা যার, তাই তার কাছে সত্যি আর সহজ। তোমার কাছে এই সত্যি। বদ্ধ জীব তুমি।

 

–তাহোলেই পুস্প, জগৎটা কি কতকটা ভেল্কির মত লাগছে না? বদ্ধ জীব বলে গালাগালি তো দিচ্চ–

 

–আবার তোমার বোঝবার ভুল। যাক, ও সব বড় বড় কথা। তিনি যখন বোঝাবেন তখন বুঝো। এখন তোমার মায়ের সেবা করো– আমি যাই পাশের বাড়ীর বৌটির কাছে–জ্বরের ঘোরে বমি করচে এই শোনো–আহা!

 

–তার ওপর বাড়ীতে তো দেখেচি এক খান্ডার পিসশাশুড়ী ছাড়া মুখে জল দেবার কেউ নেই–

 

যতীন বসে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঘরের চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো। অতি দরিদ্রের ঘরকন্না, ময়লা কাঁথা, ছেঁড়া মাদুর আর মাটির হাঁড়িকুঁড়ির গেরস্থালি। খানিক আগে পাশের ঘরের মেজেতে কে পান্তাভাত খেয়ে এঁটো থালা-বাসন ফেলে রেখেছে–একটা বেড়ালছানা থালার আশেপাশে ঘুরছে। হয়তো তার মা জ্বর আসবার আগে পান্তাভাত ক’টা খেয়ে থাকবেন, গরীবের ঘরে জ্বরের উপযুক্ত পথ্য জোটে নি। কেন তাকে পুষ্প নিয়ে গেল এখান থেকে? এই ঘরে মায়ের কোলটি জুড়ে সে বেশ থাকতো। তারপর একদিন সুখদুঃখে বড় হয়ে উঠতো, ভাল চাকুরী করে এই দরিদ্রের ঘরণী মায়ের সেবা করতো। ভাঙা বাড়ী সারাতো, মাকে ভালো ভালো শাড়ী, কানের দুল, হাতের বালা চুড়ি কিনে দিতো, ম্যালেরিয়ার সময় এখান থেকে নিয়ে যেতে দেওঘর মধুপুরে। ওইখানে সজনেতলায় বড় রান্নাঘর তৈরি করে দিত, সানাই বাজনার মধ্যে একদিন বিয়ে করে বৌ এনে মায়ের বুকে সুখের ঢেউ তুলতো, নানা দিক দিয়ে মায়ের শত সাধ পূর্ণ করতো। আজ এই যে অসহায় অশিক্ষিতা পল্লীবধূ জ্বরের ঘোরে তাকেই স্মরণ করে কিছুক্ষণ আগেও কেঁদেচে–কি অপূৰ্ব্ব! স্নেহের অমৃতেই ওর বুকে জমা রয়েছে তার জন্যে। এর জন্যে তার মন। পিপাসিত–কি হোল তার স্বর্গে গিয়ে? স্বর্গ তো পালাচ্ছিল না।

 

এই সময় ডাকপিওন বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে বল্লে– মনিঅর্ডার আছে।

 

বাড়ীতে আর কেউ নেই, যতীনের মা ধড়মড় করে উঠে বল্লেও শৈল, শৈল–কোথায় গেলি? মাগো, আমায় সবাই মিলে খেলে। কেউ যদি বাড়ী থাকবে–ও শৈল–

 

রোগিণীর আহ্বানে কোথা থেকে আট দশ বৎসরের একটি বালক ছুটতে ছুটতে এসে বল্লে–কি কাকীমা–কি হয়েছে?

 

–আমার মাথামুন্ডু হয়েচে। দুপুর বেলা বেরোয় কোথায় সব, বাড়ীতে কেউ নেই–মনিঅর্ডার এসেছে, নে পিওনের কাছ থেকে; আমার এমন জ্বর হয়েছে যে মাথা তুলতে, পারচিনে–শৈল কোথায়?

 

–দিদি তাস খেলচে পাঁচুদের বাড়ী—

 

বালক মনিঅর্ডারের ফৰ্ম্ম খানা হাতে নিয়ে আবার ঘরে ঢুকলো! ওর কাকীমা বল্লে–ক’টাকা?

 

বালক ঘাড় নেড়ে বল্লে–সে জানে না। বাইরে থেকে পিওন চেঁচিয়ে বল্লে–সাত টাকা মা ঠাকরুণ–সইটা করে দেন–

 

পিওন ফর্ম সই করিয়ে টাকা দিয়ে চলে গেল। বালক টাকা নিয়ে এসে রোগিণীর হাতে দিতে রোগিণী তিন চার বার গুনে গুনে বালিশের পাশে রেখে দিলে। যে ভাবে বৌটি আদরে যত্নে সতর্কতার সঙ্গে টাকা কয়টি বার বার গুনলে তাতেই যতীনের মনে হোল এই দরিদ্র সংসারে গৃহলক্ষ্মীর কাছে ওই সাতটি টাকা সাতটি মোহর। সে যদি বড় হয়ে মায়ের হাতে থলিভর্তি টাকা এনে দিতে পারতো! আজি সত্যিই তার মনে হোল, পুষ্প তাকে যতই টানুক, উচ্চ স্বর্গের উপযুক্ত নয় সে। মাটির পৃথিবী তাকে স্নেহময়ী মায়ের মত আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় শত বন্ধনে, তার মনে অনুভূতি জাগায় এই সংসারের ছোটখাটো সুখদুঃখ, আশাহত অসহায় নরনারীর ব্যথা। তার এই মাকে একলা ফেলে আশালতাকে নিষ্ঠুর ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে সে কোন্ স্বর্গে গিয়ে সুখ পাবে?

 

যতীনের অদৃশ্য উপস্থিতি ও স্পর্শহীন স্পর্শ ওর মাকে কথঞ্চিৎ সুস্থ করে তুললে। পুষ্প এসে বল্লে–তোমার মাকে ছবি দেখাবো যতীনদা? যেন এক অদৃশ্য দেবতা ও’র ছেলের মত এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্চে–মিষ্টি কথা বলচে দেখাবো?

 

–পাশের বাড়ীর বৌটি কেমন?

 

–ঘুম পাড়িয়ে এলুম। মাথা ধরেছিল, সারিয়ে দিয়ে এলুম।

 

-–খাণ্ডার পিসশাশুড়ী কি করছে? বুড়িটা?

 

পুষ্প হেসে বল্লে–পিসশাশুড়ীর অত দোষ দিও না। বৌটির চরিত্র ভাল না।

 

যতীনের মনে পড়লো আশালতার কথা–সে একটু তিক্তস্বরে বল্লে–মেয়েমানুষ কিনা, তাই অপর মেয়েমানুষের চরিত্রের দিকটাতে আগে নজর পড়ে। কই আমাদের তো পড়ে না? দেখেই বুঝে ফেল্লে?

 

পুষ্প বল্লে–তা নয়, ওর মনে সব কথা লেখা রয়েছে আমি পড়ে এলুম। ও চিন্তা করচে ওর একজন প্রণয়ীকে, নাম তার হরিপদ, এই দুপুরে নদীর ঘাটে গিয়ে তার সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করার কথা ছিল, জ্বর এসেচে ঠেসে দুপুরের আগেই।

 

–যেতে পারেননি বলে ভাবছেন বুঝি? আহা!

 

–হঠাৎ অত শ্রদ্ধাসম্পন্ন হয়ে উঠলে যে ওর ওপর? অত দরদই বা এল কোথা থেকে? জানো, যতীনদা–আমার একটা ব্যাপার হয়েছে আজকাল, লোকের কাছে কিছুক্ষণ বসলে, বা থাকলে আমি তার মনের চিন্তা সব বুঝতে পারি। ওবৌটির পাশে গিয়ে বসে দেখি ও শুধু কে হরিপদ, তার কথাই ভাবছে। যাক গে, তোমার মা কেমন?

 

–এখন একটু ভালো। মায়ের মনিঅর্ডার এসেচে সাত টাকা কোথা থেকে। দেখতে যদি মায়ের আনন্দ! পুষ্প, কেন আমাকে নিয়ে গেলে? এ দরিদ্র সংসারের উপকার করতে পারতাম বেঁচে থাকলে। আমি হয়তো চাকরী করে–

 

–আমি নিয়ে যাই সাধ্যি কি আমার? যিনি দীনদুনিয়ার মালিক তাঁর ইচ্ছে না থাকলে

 

-তুমি কি দীনদুনিয়ার মালিকের সঙ্গে পরামর্শ করে এ কাজ করেছিলে পুষ্প?

 

এই সময় যতীনের মা বিছানা থেকে উঠে বাইরের রোয়াকে রোদ্দুরে গিয়ে বসলেন। ম্যালেরিয়া-রোগীর ভাল লাগে রোদ্দুরে বসতে। দুটি প্রতিবেশিনী এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে গল্প করতে লাগলো যতীনের মায়ের সঙ্গে। একজন বলচে-জ্বরটা কখন এল আজ বৌ?

 

–দুটো ভাত খেয়ে উঠেচি, থালা তুলিনি–অমনি সে কি ভূতোনন্দি জ্বর। কিন্তু এখন যেন ভালো মনে হচ্চে। হঠাৎ জ্বরটা আজ যেন কমে গেল।

 

–হ্যাঁরে, আজ নাকি টাকা এসেচে তোর? ক’টাকা এল?

 

-হ্যাঁ দিদি, সাত টাকা।

 

–বাঁচা গেল! ক’দিন তো একরম না খেয়ে ছিলি? বঠাকুর টাকা পাঠাতে অত দেরি করেন কেন? সামনে পূজো–অত দেরি করেই যখন পাঠালেন তখন আরও কিছু–

 

কোথায় পাবে দিদি যে পাঠাবে। এই তো সেদিন বাড়ী থেকে গেল। পনেরো টাকা তো মোটে মাইনে–মনিব যে উপাঁজুরে লোক, দু-এক টাকা আগাম চাইলে তো দেবে না। ওরও তো শরীর ভাল না সবই জানো। সেবার সেই বড় অসুখের পরে আর শরীর ভাল সারলো না। ওই মানুষকে একা পাঠিয়ে যে কত অশান্তিতে ঘরে থাকি তার ওপর আমার খোকা যাওয়ার পর উনি একেবারে–

 

যতীনের মা নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলেন। প্রতিবেশিনীরা সান্ত্বনার কথা বলতে লাগলো। একজন বল্লে–যাও বৌ, রোদ্দুরে বোসো না, বমি হবে। ঘরে শোওগে। কি করবে বলো, সবই অদেষ্ট।

 

যতীনের মা চোখের জলে ভেজা সুরে বল্লেন–তোমরা আশীর্বাদ করো দিদি, উনি ভালো থাকুন। ওই সাত টাকাই আমার সাত মোহর। পূজোর সময় আসতে পারবেন না বলে লিখেছেন কুপনে–সেই কি কম কষ্ট আমার। পোড়ারমুখো মনিব মহালে পাঠাবে খাজনা আদায় করতে–ছুটি পাবেন না

 

পুষ্প হঠাৎ বলে উঠলো–আমি বলচি তিনি বাড়ী আসবেন, আসবেন!

 

যতীন অবাক হয়ে পুষ্পের দিকে চেয়ে রইল। পুষ্পের মুখে এক অদ্ভুত জ্যোতি ফুটে উঠেচে, ওর কণ্ঠস্বর যেন দৈববাণীর মত শক্তিমান ও অমোঘ।…

 

কথা শেষ করে যখন পুষ্প ওর দিকে চাইলে তখন পুষ্পের চোখে জল।

 

যতীন বল্লে–কি হোল তোমার, পুষ্প?

 

পুষ্প তখনও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। বল্লে–সতীলক্ষ্মী উনিজয় হোক ওঁর। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করো মাকে।

 

তারপর দুজনে আরও অনেকক্ষণ সেখানে রইল। যতীনের মায়ের জ্বর ছেড়ে যায় নি, তিনি আবার শয্যায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন, কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে তিনি জ্বর কমবার সঙ্গে সঙ্গে নির্জীবভাবে ঘুমিয়ে পড়লেন।

 

যতীন বল্লে–ভালো কথা, মাকে এবার সেই ছবিটি দেখাও না? যেন এক দেববালক ওঁর মাথার শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্চে–এই অবস্থার স্বপ্ন বেশ স্পষ্ট হবে।

 

পুষ্প বল্লে–না। কি জানো যতীনদা, ভেবে দেখেচি তারপর। ওসব ছবি যে দেখে, সে সংসার করতে পারে না। মন চঞ্চল হয়ে যায়। পৃথিবীর মন একরকম, ভুবর্লোকের মন আলাদা। এর সঙ্গে ওকে জড়াতে নেই। ওসব দর্শন হয় কাঁদের, যারা আধ্যাত্মিক জীবন শুরু করবে। সংসারী লোকদের অমন ছবি দেখাতে নেই। আমি দেখাতে পারি, তোমার মা জেগে উঠে কাঁদবেন, উদাস হয়ে থাকবেন দিনকতক, সংসারের কিছু ভাল লাগবে না। প্রতিদিনের সাংসারিক জীবনে মন দিতে পারবেন না। কি দরকার সুস্থ শরীর ব্যস্ত করে।

 

যতীন আগ্রহের সুরে বল্লে–নয়তো মাকে একবার ঘুমের মধ্যে। ভুবর্লোকে নিয়ে যাই না কেন? বেড়িয়ে দেখে আসুন।

 

–উনি এখনও তার উপযুক্ত হন নি। কিছু বুঝতে পারবেন না, হয়তো ওঁর সূক্ষ্ম শরীর অজ্ঞান হয়ে পড়বে সেখানে। সব এক আজগুবি স্বপ্ন বলে ভাববেন। বৃথা পরিশ্রম। চলো যাই, বেলা গেল।

 

নিকটেই এক ঝোপে তিৎপল্লার হলুদ ফুলে রঙীন প্রজাপতির ঝাঁক উড়তে দেখে ওরা সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। পুষ্প বল্লে–কি সুন্দর, না? শুয়োপোকা থেকে কেমন চমৎকার রঙীন জীব তৈরী হয়েছে। দ্যাখো। শুয়োপোকা মরে যায়, গুটি কেটে প্রজাপতি উড়ে বেরোয়! মাটিতে কত আস্তে চলে শুয়োপোকা–আর কেমন দ্যাখো প্রজাপতি নীল আকাশের তলায় ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্চে। শুয়োপোকা কল্পনা। করতে পারে মরবার পরে সে প্রজাপতি হবে?

 

যতীন হেসে বল্লে–মানুষ কল্পনা করতে পারে মৃত্যুর পর সে বিশ্বের নীল আকাশের তলায় বিদ্যুদগতিতে উড়ে বেড়াতে পারবে? শুয়োপোকার মন অন্ধ, মানুষও তেমনি অন্ধ।

 

প্রদোষালোকে ম্লানায়মান ধরণী গতির বেগে ওদের পায়ের নীচে কোথায় অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে গেল। সেই ধরণীর এক প্রান্তে যতীনের দরিদ্রা জননী গভীর ঘুমে অচেতন রইলেন জানতেও পারলেন না তাঁর ভাঙা ঘরে এ অদ্ভুত আত্মিক আবির্ভাবের রহস্য।

 

সেদিন পুষ্পই প্রথম তাঁকে দেখলে। সেদিন ওরা বুড়োশিবতলার ঘাটে ফিরে আসছিল পৃথিবী থেকে–ফেরবার পথে একটা ক্ষুদ্র পাহাড়ের ওপর বসেচেহঠাৎ আকাশের বিদুৎলেখার মত উজ্জ্বল জ্যোতি দর্শন। করে পুষ্প বল্লে–দ্যাখো দ্যাখো–কোন্ দেবতা আসচেন! যতীনও দেখতে পেলে। একটা বিশাল উল্কা যেন আগুনের অক্ষরে শূন্যের গাঁয়ে তার বার্তা ঘোষণা করচে।…

 

চক্ষের পলকে সেই পথিক দেবতা কায়া ধারণ করে ওদের সামনে আবির্ভূত হোলেন। পুষ্প ও যতীন উভয়েই চিনলে–যে দেবতা একবার মহাশূন্যে পথ হারিয়ে ওদের কুটির-প্রাঙ্গণে বিভ্রান্ত অবস্থায় এসে পড়েছিলেন, সেই ভ্রাম্যমাণ আবিষ্কারক দেবতা।

 

দেবতা বল্লেন–তোমাদের কথা স্মরণ রেখেচি। আবার দেখা করবো। বলেছিলাম, মনে আছে কন্যা?

 

পুষ্প ও যতীন দেবতার পাদবন্দনা করলে। পুষ্প বল্লে–দেব, আপনি ভ্রমণের গল্প করুন–

 

যতীন বল্লে–একটা কথা, দেব। আমাদের পৃথিবীর পন্ডিতরা অনুমান করচেন আমাদের এই সৌরজগতের বাইরে অন্য কোনো নক্ষত্রে কোনো গ্রহ নেই! একথা কি সত্য?

 

দেবতা হেসে বল্লেন–ভুল কথা। বিশ্বের এই অঞ্চলেই বিভিন্ন নক্ষত্রে লক্ষ লক্ষ গ্রহ বৰ্তমান। বহু শ্রেণীর জীব তাতে বাস করছে। তোমাদের পৃথিবী যতটুকু এর চেয়ে অনেক বৃহত্তর ও সুন্দরতর গ্রহ বিশ্বের এই অঞ্চলে বহু নক্ষত্রে বর্তমান।

 

–যতীন বল্লে–দেব, বিশ্বের এই অঞ্চল বলে আপনি কতটুকু জিনিসের কথা বলছেন?

 

–বিদ্যুতের বেগে যদি যাও, তবে এক কোটি বৎসর লাগবে তোমাদের এই নক্ষত্রমণ্ডল পার হতে। এ রকম লক্ষ লক্ষ নাক্ষত্রিক বিশ্ব ছড়ানো রয়েছে চারিধারে। আমি বিশ্বের এ অঞ্চল বলতে তোমাদের ছায়াপথের নিকটবর্তী অঞ্চলের কথা বলছি।

 

পুষ্প বল্লে–আমাদের একবার নিয়ে যাবেন বলেছিলেন ওই সব দূর দেশে?

 

চক্ষু মুদ্রিত কর। গতির প্রচন্ড তেজ তোমরা সহ্য করতে অভ্যস্ত নও–জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। দুজনেই চক্ষু মুদ্রিত করো–প্রস্তুত হও– মধ্যপথের কোনো নক্ষত্র বা গ্রহলোক তোমাদের দৃষ্টিগোচর হবে না।

 

গতির কোনো অনুভূতিই ওদের হোল না, চক্ষের পলক ফেলতে যত বিলম্ব হয়, ততটুকুও বোধ হয়নি–পথিক দেবতা বল্লেন–চোখ চেয়ে দেখতে পারো

 

পুষ্প ও যতীন সম্মুখের দৃশ্য দেখে চমকে উঠলো। তারা এ কোথায়। এসেচে–এক বিরাট অগ্নিমণ্ডল তাদের সামনে–সে অগ্নিমণ্ডলের মধ্যে বহুলক্ষ বিশালকায় কটাহে যেন লক্ষ কোটি মণ ধাতু বিগলিত হচ্চে একসঙ্গে–লক্ষ লক্ষ মাইল উর্ধ্বে উঠেচে রক্তবর্ণ স্বয়ম্প্রভ বাষ্পশিখা রক্ত আগুনের শিখার মত। বাল্যকালে জলস্তম্ভের ছবি দেখেছিল যতীন পৃথিবীর পাঠশালার কোন পুস্তকে–এখন ওর চোখের সামনে ধারণার অতীত বিশালকায় অগ্নি ও প্রজ্বলন্ত বাস্পের খাড়া সোজা উঁচু স্তম্ভ চক্ষের নিমিষে উঠে যাচ্ছে যেন দশ হাজার মাইল; যেদিকে চাওয়া যায় দাউ দাউ করচে শুধু আগুন–অথচ পৃথিবীর আগুনের মত নয় ঠিক জলন্ত বাষ্পরাশি হয়তো। অগ্নিমণ্ডলের চারিদিকে শুভ্র ও রক্ত আগুনের ছটা–গ্রহণ যোগে দৃশ্যমান সূর্যের চারিপাশে দৃষ্ট সৌরকিরীটের (Co rona) মত। কোন্ রুদ্র ভৈরবের প্রচণ্ড আবির্ভাব এ! এখানে না আছে নারী, না আছে শিশু, না আছে বনকুসুমের শোভা, না আছে জীবের জীবনস্বরূপ বারি। কিন্তু এই রুদ্রের বামমুখ প্রত্যক্ষভাবে দেখবার সুযোগ ঘটে না কারো–এ ভয়ঙ্কর মূর্তিকে দেখতে পেয়ে অন্তরাত্মা যেমন থর থর কেঁপে উঠলো ওদের, তেমনি ওদের মনে হোল, এই অদ্ভুত ভয়ঙ্করের আবির্ভাবের ও অস্তিত্বের সামনে তাদের সকল ক্ষুদ্রত্ব ও সংকীর্ণতা এখানকার বাস্পমণ্ডলের কটাহে বিগলিত বহু লৌহ, তাম্র, নিকেল, এলুমিনিয়ম, কোবাল্ট, প্রস্তর, স্বর্ণ, রৌপ্যের মতই দ্রবীভূত হয়ে নয় শুধু, বাষ্পীভূত হয়ে যায়–যেমন যাচ্ছ ঐ সব ধাতু নিমেষে তাদের দৃষ্টির সম্মুখে।

 

দেবতা বল্লেন–এ একটা নক্ষত্র। কিন্তু কর্মচারী বা বিদ্যুৎচারী না। হোলে তোমরা এর বিরাটত্ব কিছুই বুঝতে পারবে না। তোমাদের জড়জগতের অবস্থানকালের কোনো মাপকাঠি ব্যবহার করে এ নক্ষত্রের সীমা পাবে না। চেষ্টা করো–চলো–

 

পুষ্প ও যতীন যে বেগে যেতে ইচ্ছা করলে, তাকে পৃথিবীতে রেলগাড়ীর বেগ বলা যেতে পারে। দেবতা গতির বেগ কমিয়ে ওদের সঙ্গে চলেছেন। ওরা সবেগে যেন উড়ে চলেচে একটা অগ্নির মহাসমুদ্রের ওপর দিয়ে ও একটা জলন্ত অগ্নিকুন্ডের অগ্নিশিখার মধ্যে দিয়ে–ওদের চারিপাশে ঘিরে অগ্নি দেবতার রক্তচক্ষু। বহুক্ষণ ওরা গেল, পৃথিবীর হিসেবে দশ বারো ঘণ্টা। ওদেরও ক্লান্তি নেই, যাত্রাপথেরও শেষ নেই–মহা অগ্নিসমুদ্রেরও কূলকিনারা নেই।

 

দেবতা বল্লেন–তোমরা যদি জড় বস্তুর উপাদানে তৈরি হতে এই জ্বলন্ত নক্ষত্রের বহুদূর থেকে তোমাদের দেহ জ্বলে পুড়ে বাষ্প হয়ে উড়ে যেতো–আকর্ষণের বলে সে বাষ্পটুকু এই বৃহত্তর বাষ্পমণ্ডলে প্রজ্বলন্ত অবস্থায় প্রবেশ করে মিশিয়ে যেতো।

 

পুষ্প বল্লে–আর সহ্য করতে পারবো না–আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে চলুন দেব দয়া করে।

 

দেবতা প্রসন্ন হেসে বল্লেন–বিশাল বিশ্বের রূপ সবাই সহ্য করতে পারে না, দেখতে চায়ও না। শক্তিমতী হও। ভগবান তাকেই এসব দেখান, যে তাঁর বিশ্বের বিরাটত্ব দেখে ভয় খাবে না। আমি সুদীর্ঘ জন্ম-জন্মান্তর ধরে এ সাধনা করেছিলাম–তারপর জড় জগৎ থেকে এসে বহুঁকাল ধরে শুধু বিশ্বভ্রমণ করে বেড়াচ্চি। এই আমার সাধনা এতে আমি সিদ্ধিলাভ করেছি। কিন্তু আমিই দিশাহারা হয়ে যাই সময় সময়। তোমরা কী দেখেচ, এক কণিকাও নয়।

 

পুষ্প বল্লে–আর কী দেখাবেন বলুন দেব, এ আগুনের দৃশ্য আমার আর সহ্য হচ্চে না–

 

–তোমাকে এর চেয়েও বৃহত্তর নক্ষত্রের অগ্নিমণ্ডলে নিয়ে যাবো, চলো। শক্তিমতী হও। এবার চোখ চেয়ে চলো। তোমাকে চোখ তখন মুদ্রিত করতে বলেছিলাম কেন জানো? তোমাদের জড়জগতের অতি নিম্নস্তর অতিক্রম করতে হবে আসবার পথে। সে অতি কুশ্রী স্তর। তোমরা দেখলে ভয় পেতে–তাই দেখাই নি।

 

যতীন আগ্রহের সুরে বল্লেনরক? সে দেখতে বড় ইচ্ছে, দেব! দয়া করে

 

দেবতা গম্ভীর স্বরে বল্লেন–প্রত্যেক জড় জগতের অমনি নিম্নতর আত্মিক স্তর আছে। জড় জগতের অপুষ্ট আত্মা ওখানে আসে। পৃথিবীর নরক তবুও ভালো, কারণ গ্রহ হিসাবে পৃথিবীর জীবদের আধ্যাত্মিক প্রগতি অনেক বেশি! তোমাদের দেখে তা মনে হচ্চে। এমন গ্রহ তোমাদের দেখাতে পারি যেখানকার জীবের চৈতন্য নিম্নস্তরের। তোমাদের পৃথিবীতে এমন শ্রেণীর জীব নেই।

 

ওরা অনন্তব্যোমের যে অংশ দিয়ে যাচ্ছিল, যতীন তার চারিদিকে চেয়ে কোনো পরিচিত নক্ষত্রমণ্ডল দেখতে পেলে না–সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ, ধ্রুবনক্ষত্র, এমন কি বৃশ্চিক পৰ্য্যন্ত না! অসীম বিশ্বের কোন সুন্দর অংশে তারা এসে পড়েছে যেখান থেকে সপ্তর্ষিমণ্ডল বা বৃশ্চিক কিংবা ক্যাসিওপিয়া দেখা যায় না? প্রশ্নটা সে পথপ্রদর্শক দেবতাকে করলে।

 

দেবতা হেসে বল্লেন–আমি তোমাদের ওসব নক্ষত্র চিনি না। তোমাদের জড়জগৎ থেকে চিরকাল দেখে আসচো বলে ওগুলো পৃথিবীর জীবের কাছে সুপরিচিত। বিশ্বের পথিক আমি, আমার কাছে ও-রকম লক্ষকোটি ধ্রুব আর সপ্তর্ষি অগণ্য জ্যোতির্লোকের ভিড়ে মিশিয়ে গিয়েছে।

 

পুষ্প অনেকক্ষণ থেকে লক্ষ্য করছিল আকাশের ওপরদিকে বকের পালকের মত বহুদূরব্যাপী রঙীন মেঘরাশি এক জায়গায় স্থির ছবির মত দৃশ্যমান।

 

পুষ্প কৌতূহলী হয়ে বল্লে–ওই মেঘের মত কী ওগুলো দেব?

 

–আমি জানি কিন্তু কখনো দেখিনি। ওগুলো বহু উচ্চস্তরের জীবলোক।

 

–জড়দেহধারী জীব?

 

–না। তোমরা যাকে বলবে আত্মিক লোক–

 

–অনেক উঁচু স্তরের আত্মা?

 

–খুব উঁচু।

 

যতীন ওদের কথা শুনছিল–সাগ্রহে বল্লে, একটা প্রশ্ন করবো যদি কিছু মনে না করেন স্যার–আই মিন্–মানে, দেব।

 

পুষ্প ভ্রূকুটি করে বল্লে–তোমার এখনও পৃথিবীর সংস্কার গেল না। যতীনদা?

 

দেবতা ওদের মনোবৃত্তি অনেক সময় ঠিক বুঝতে পারেন না; বাগ, অশ্রদ্ধা, হিংসা প্রভৃতি মনোভাবের বহু ঊর্ধ্বের তাঁরা। তিনি অনেক পরিমাণে সরল বালকের মত। পুষ্প লক্ষ্য করচে–করুণাদেবীও অনেক সময় বারো বৎসরের পার্থিব বালিকার মত কথা বলেন, ব্যবহার করেন। উচ্চতর দেবচরিত্রের এদিকটা আজকাল বেশি করে ওদের দুজনেরই চোখে পড়ছে।

 

যতীন আরও বিনয়ের সঙ্গে বল্লে–একটা প্রশ্ন ছিল–আপনি ওখানে যান নি কেন?

 

দেবতা বল্লেন–ওর উত্তর খুব সোজা। ওসব লোক আমার নিকট অদৃশ্য।

 

পুষ্প ও যতীন দুজনেই বিস্ময়ে স্তব্ধ। পুষ্প বল্লে–আপনার কাছেও অদৃশ্য? দেব, ঠিক বুঝতে পারলাম না।

 

এইবার সামনে বহুদূর থেকে ওরা দেখতে পেলে সারা আকাশ। জুড়ে একটা বিশাল অগ্নিক্ষেত্র ওদের দিকে যেন ছুটে আসছে। ঘোর শুভ্রবর্ণ মহাপ্রজ্বলন্ত বাষ্পপরিবেশ, মাঝে মাঝে তা থেকে সহস্র সহস্র যোজনব্যাপী বাম্পাগ্নি বহু ঊর্ধ্বে উঠে মহারুদ্রের মত সৰ্ব্বধ্বংসকারী। প্রলয়ের হুঙ্কার ছাড়চে। সে দৃশ্য দেখে পুষ্পের চেতনা লোপ পাবার মত হোল।

 

যতীন সেই কালাগ্নির ভৈরব দৃশ্যের দিকে পেছন ফিরে ধল্লে– ভীষণ ব্যাপার, আমাদের পক্ষে এ দৃশ্য না দেখাই ভালো। ভয় করে

 

দেবতা হেসে বল্লেন–শুধু বিশ্বদেবের মোহনমূৰ্ত্তিই দেখবে, তাঁর করাল, রুদ্র রূপ দেখলে ভয় পাব কেন? ধ্বংসদেবের বিষাণ-ধ্বনি শোনাবো তোমাদের। আত্মার দুর্বলতা দূর কর।

 

–কিন্তু আপনার শিষ্যা যে অচেতন হয়ে পড়েচে! ও মেয়েমানুষ, ওকে ও রূপ আর নাই বা দেখালেন প্রভু?

 

সেই বিরাট কালাগ্নিবেষ্টিত মহাদেশ তখন ওদের অদূরে। যতীনের দেখে মনে হোল একটা প্রজ্বলন্ত বিশ্বপৃথিবী তাঁর সামনে। অল্প পরেই দেবতার অদ্ভুত শক্তিবলে ওরা দুজনেই সেই বিরাট অগ্নিমণ্ডলের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালো। ওদের চারিধারে শুধু শুভ্র জ্বলন্ত হিলিয়াম ও ক্যালসিয়াম বাষ্পরাশি মহাবেগে ঘূর্ণমান, কোথাও রাঙা শিখা নেই–শুধুই শ্বেতশুভ্র-আবার বহুদূর অগ্নিময় দিগন্তে ললকে রাঙা হাইড্রোজেন শিখা অজগরের মত ফুঁসে গর্জে তেড়ে উঠেচে চক্ষের পলকে লক্ষ লক্ষ মাইল। ধ্বংসদেবের বিষাণ-ধ্বনির মত ভৈরব হুঙ্কার সে কালাগ্নিমণ্ডলের চারিদিক থেকে একসঙ্গে অনবরত শোনা যাচ্চে। একটা গোটা ব্রহ্মাণ্ড যেন দাউ দাউ করে জ্বলচে! অতি ভীষণ, রৌদ্ররূপে প্রকৃতির।

 

ভয়ে, বিস্ময়ে যতীন আড়ষ্ট হয়ে চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখলে। রৌরব নরকের বর্ণনা সে কিসে যেন পড়েছিল তার পৃথিবীর বাল্যজীবনে। এই কি সেই রৌরব নরক? কোন্ দেবতার তাণ্ডবনৃত্যের পদচিহ্ন এর প্রতি অগ্নিশিখাঁটির গায়ে আঁকা, উদ্ধত ও ভয়াবহ মৃত্যুদহন এর কালাগ্নিপরিবেশের প্রতি অণু প্রতি পরমাণুর মর্মস্থলে?

 

দেবতা বল্লেন–ভয় পেয়ো না। এই থেকেই সৃষ্টি দাঁড়িয়ে দেখ।

 

শুধু অন্ধবেগে ধাবমান অণুপরমাণুপুঞ্জের সংঘর্ষে উৎপন্ন এই বিশাল অগ্নিময় মহাদেশ চারিদিক থেকে ওদের ঘিরেচে–এর শেষ কোথায়? অতি নীলাভ শুভ্র অগ্নিগর্ভ বাষ্পপুঞ্জ, বহ্নিমান ব্রহ্মাণ্ড ধরার মানুষ সহ্য করতে পারে না। যতীন অনুভব করলে সেও উম্মাদ হয়ে যাবে এ দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখলে। মনে পড়লো গ্রহদেবের সেদিনকার কথা, সেই অদ্ভুত সত্য কথা–অস্য ব্রহ্মাণ্ড সমন্ততঃ স্থিতান্যেতাদৃশান্যনন্ত কোটিব্রহ্মাণ্ডানি সাবরণানি জ্বলন্তি–পৃথিবীর প্রাচীন দিনের জ্ঞানীরা যে বাণী উচ্চারণ করে গিয়েছিলেন তপস্যা দ্বারা সত্যকে অনুভব করে।

 

হঠাৎ পথিক দেবতা যেন ভাগাবেগে সমাধিস্থ হয়ে নিস্পন্দ হয়ে গেলেন ক্ষণকালের জন্যে। সুন্দর চক্ষুদুটি মুদ্রিত করে সেই অগ্নিশিখার মধ্যে তিনি স্থির প্রশান্ত বদনে দাঁড়িয়ে আপন অস্ফুট স্বরে বলতে লাগলেন–হে অনল, হে সৰ্বেশ্বর, হে পরাবরস্বরূপ, কারণে তুমি বর্তমান কার্যেও তুমি বর্তমান, তুমিই ধন্য ধ্বংসের মধ্যে তোমার সৃষ্টি সার্থক হোক। জয় হোক তোমার!

 

ওদের দিকে ফিরে বল্লেন–চলো। কন্যা এখনও অচেতন? এই নক্ষত্রের অগ্নিমণ্ডল ছাড়িয়ে গেলেই জ্ঞান ফিরে পাবে।

 

যতীন সশ্রদ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে ছিল দেবতার সেই ধ্যানপ্রশান্ত গভীর রূপের দিকে। অদ্ভুত এ মূর্তি। সাক্ষাৎ সবিতৃমণ্ডল-মধ্যবর্তী জ্যোতির্ময় নারায়ণ যেন তাঁর সম্মুখে। সে মুখে অনায়াস করুণা ও গভীর মৈত্রীর চিহ্ন ব্রহ্মান্ডের জরামরণচক্রে বদ্ধ জীবকূলকে যেন অভয় দান করচে। কে বলেছিল এঁকে নাস্তিক?

 

দেবতা বল্লেন–জানো, প্রত্যেক গ্রহ বা নক্ষত্র, প্রত্যেক জড় বা বাষ্পপিণ্ড যা আকাশে ছড়ানো আছে–তোমাদের সূর্য নামক সেই ক্ষুদ্র নক্ষত্রও এর মধ্যে প্রত্যেকটি এক এক চুম্বক। এরা। পরস্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করচে। সমস্ত ব্যোম ব্যেপে এই বিরাট চৌম্বক ক্ষেত্রে কোনো জড়দেহধারী জীবের সাধ্য নেই এই বিশাল চৌম্বকক্ষেত্রের আকর্ষণশক্তিকে জয় করে স্বেচ্ছায় অগ্রসর হয়।

 

যতীন বল্লে–দেব, আমাদের সূৰ্য্যও বড় চুম্বক?

 

–তোমাদের পৃথিবীও। সূৰ্য্যে তো বটেই। প্রত্যেক নক্ষত্রও।

 

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওরা বহুদূর চলে এল নক্ষরটা থেকে–ওদের মাথার ওপরে বহুদূরে সেটি একটি বিশাল বহ্নিগোলকের মত জ্বলচে তখনও।

 

হঠাৎ যতীনের মনে পড়লো সেই পূৰ্ব্বের কথাটি।

 

সে বল্লে–দেব, আপনি তখন বলেছিলেন ওই সব মেঘের মত দেখা যাচ্চে যা, ওগুলো আপনার কাছেও অদৃশ্য জীবলোক?

 

দেবতা বল্লেন–জীবলোক বলিনি–স্থূলদেহধারী জীব নেই ওতে। আত্মিকলোক বলেছি।

 

পুষ্পের এবার জ্ঞান হয়েছে। সে বিস্ময়ের সঙ্গে ওদের দিকে চেয়ে। চোখ খুলে বল্লে–এ কোথায় চলেছি?

 

যতীন হেসে বল্লে–তার চেয়ে কোথা থেকে আসচি বল্লে প্রশ্নটা সুষ্ঠু হোতো। আমরা আসছি বহুদূরের নক্ষত্রলোক দেখে।

 

–আমি কোথায় ছিলাম?

 

–অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে।

 

পুষ্পের এবার জ্ঞান সম্পূর্ণ ফিরে এল। সে বল্লে–মনে পড়েছে এবার। দূর থেকে যা দেখেছি, তাই যথেষ্ট! উনি দেবতা–তা বলে। আমরা সামান্য মানুষ–ও সহ্য করতে পারা কি–

 

যতীন প্রতিবাদ করে বল্লে–আমরা এখনও সামান্য মানুষ? এতকাল স্থূলদেহ ছেড়ে এসে এখনও সামান্য মানুষ?

 

পথিক দেবতা হেসে বল্লেন–তোমার পূৰ্ব্ব প্রশ্নের উত্তর আর এ প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গেই দিচ্চি শোনো। ওই যে সব মেঘের মত দেখা যাচ্চে বহুদূরে, ওগুলো বহু উচ্চস্তরের আত্মিক লোক। ওতে যাঁরা বাস করেন তাঁরা এবং তাঁদের বাসভূমি দুই-ই আমার কাছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য। অথচ আমি কতকাল ধরে শুধু ভ্রমণ করেই বেড়াচ্চি–কত যুগ যুগ এসেচি আত্মিক লোকে–আর তোমরা দুদিন এসেই

 

যতীন বিস্ময়ে কেমন হয়ে গেল–এই মহান্ দেবতা–ইনিও ছোট? তাহোলে তারা কোথায় আছে? কীটস্য কীট-তাই বুঝি অত অহংকার? কিন্তু কি বিশাল, অনন্ত এ ব্ৰহ্মাণ্ড–কত অসংখ্য জীবলোক, আত্মিক লোক, অনাদি, অনন্ত সময় ব্যেপে কি অনন্ত বিবর্তন! তাদের সবারই ওপর সেই বিশ্বনিয়ন্তা। সত্যিই ভগবানের নাগাল কে পাবে? তিনি। কোথায় আর তারা কোথায়!

 

যতীন বল্লে–আপনি শুধু ঘুরে ঘুরে বেড়ান কেন, দেব?

 

–কেন বলো তো?

 

–আজি আপনাকে যে চোখে দেখলাম–অনুগ্রহ করে কিছু মনে করবেন না স্যার–মানে–মানে–

 

পুষ্পের ভ্রূকুটি ওকে নির্বাক করে দিলে।

 

দেবতা নিজেই বোধ হয় ওর মন বুঝে জবাব দিলেন।

 

–এই ভ্রমণই আমার উপাসনা। কত সৌন্দর্য দেখেচি, কত ভয়ানক রূপ দেখেচি তাঁর–যেমন তোমরা আজ দেখলে। এও কিছু নয়–এর চেয়ে অতি ভীষণ রূপ আছে সৃষ্টির। সে সব সহ্য করতে পারবে না। তোমরা। আমি এর মধ্যেই তাঁকে দেখি।

 

যতীনের চেয়ে পুষ্পের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা বেশি, সে বল্লে–প্রভু, আপনি তাঁকে দেখেছেন?

 

ওরা একটা অপরিচিত গ্রহের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, আকাশপথ থেকে তার বিচিত্র ধরনের গাছপালা, পাহাড়-পর্বত সব দেখা যাচ্ছিল। গ্রহে তখন রাত্রি গভীর। লোকালয় বড় কম তাতে, কেবলই ভীষণ। অরণ্যানীসমাচ্ছন্ন শৈলমালা ও উপত্যকা। ওর একটা সাথী উপগ্রহ থেকে নীল জ্যোৎস্না পড়ে সে সব এমন একটা সৌন্দর্য্যে ভূষিত করেচেপৃথিবীতে কেন, এ পর্যন্ত স্বর্গলোকেও সে রকমটা দেখেনি ওরা। অপার্থিব তো বটেই, অদৈবও বটে। বনে বনে নীল জ্যোৎস্না– মুগ্ধ হয়ে গেল ওরা সে গ্রহের গভীর রাত্রির নীলজ্যোৎস্নাস্নাত গভীর। উঙ্গে শৈলারণ্যের রূপে।

 

দেবতা বল্লেন–কি দেখছো? এ একটা জীবজগৎ। খুব উঁচু স্তরের জীব এতে বাস করে। চলো, এর বনের মধ্যে বসি। তোমাদের পরিচিত স্থল জগৎ থেকে বহু জন্মের পর যখন লোকের মন তাঁর দিকে যায়, তখন তারা এখানে পুনর্জন্ম গ্রহণ করে। শুধু তোমাদের পৃথিবী থেকে নয়–ওই ধরনের আরও অনেক নিম্নস্তরের স্থূল জগৎ থেকে। আত্মার সেই বিশেষ অবস্থা না হোলে এই সব গ্রহে আসা। চলে না। এখানে কর্মবন্ধন কম। ভগবানে যারা আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের মন বুঝে অন্তর্যামী বিশ্ব-দেবতা এখানে–এবং আরও এর মত বহু গ্রহ আছে, সেই সব লোকে–জন্মগ্রহণ নির্দেশ করেন। দেখচো না এখানে জীবের বসতি কম। ভিড় নেই। জীবনের যুদ্ধ সরল ও সহজ। সব রকম ভ্ৰম, কুসংস্কার অজ্ঞানতার বাঁধন যারা কাটিয়েছে, তারাই এখানে আসে শেষ জন্মের জন্যে। আর স্থূল শরীর গ্রহণ করতে হয় না তাদের এখানকার মৃত্যুর পর।

 

–তাহোলে পৃথিবীর লোকে পুনর্জন্ম গ্রহণ করে শুধু যে পৃথিবীতেই ফিরে আসবে তা নয়?

 

–পৃথিবীর সঙ্গে আমার পরিচয় কম–তবুও আমি জানি, কোনো জীবাত্মা পুনর্জন্মের সময় সে যে-স্থলজগৎ থেকে এসেছিল, সেখানেই জন্মাবে–তার কি মানে আছে! অবস্থা অনুসারে জীবের গতাগতি নির্দিষ্ট হয়। যেখানে পাঠালে যে উন্নতি করতে পারবে, তাকে সেখানেই পাঠানো হয়। অনন্ত উন্নতিতে জীবাত্মার অধিকার তিনিই দিয়েছেন, যিনি এই বিশ্ব রচনা করেছেন। কে বুঝবে তাঁর করুণা ও মৈত্রী! খুব উচ্চ অবস্থার আত্মা না হোলে বোঝা যায় না!

 

ছায়াশীতল শিলাতট ঘন বনশ্রেণীতে ঘেরা। ওরা এসে সেখানে বসেচে। যতীন আর পুষ্প চেয়ে চেয়ে দেখলে এসব গাছপালা তাদের চেনা নেই, পৃথিবীতে এত বড়, এত অদ্ভুত চমকার তরুশ্রেণীর সমাবেশ কোথায়? উগ্র লোভ এখানকার বন নষ্ট করেনি, ব্যবসাতে টাকা উপার্জনের জন্যে। বনকুসুমের সুগন্ধ, ঝর্ণার কলধ্বনি, পক্ষী-কূজন, অব্যাহত শান্তি ও পবিত্রতা–সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন তপোবনের মত মনে হচ্চে। উনি যা বলচেন সে হিসেবে দেখলে সমগ্র গ্রহটাই তাহোলে একটা সুবিশাল পোবন। পুষ্প সময় বুঝে আগের প্রশ্নটি এখানে আবার করলে। বল্লে–আপনি তাঁকে দেখেচেন প্রভু?

 

পথিক দেবতার মুখ সহসা সম্ভমে ও ভক্তিতে কোমল হয়ে এল। তিনি বালকের মত সরল স্বরে বল্লেন–না!

 

–আপনিও দেখেন নি তাঁকে!

 

পুষ্পের স্বরে বিস্ময় ফুটে উঠেছে।

 

–আমি তাঁর রূপ দেখেচি তাঁর বিশ্ব-সৃষ্টির মধ্যে। তাঁকে চোখে দেখা যায় আমি জানি। কিন্তু আমি তপস্যা করিনি তাঁকে সে ভাবে পেতে। আমি ভবঘুরে, তাঁকে দেখে বেড়াতে চাই তাঁরই সৃষ্ট লোক লোকান্তরে। ভ্রাম্যমাণ আত্মা হয়েই আমার আনন্দ। তাই অনেকে আমাকে নাস্তিক বলে।

 

যতীনের হঠাৎ মনে পড়লো করুণাদেবীর কথা। তিনিও তাই বলেছিলেন।

 

পুষ্প বলে–প্রভু, এই গ্রহে স্ত্রীলোক আছে?

 

–কেন থাকবে না? নারী বিশ্বে শক্তির অংশ। এসো–দেখবে। গ্রহে এ অংশটা রাত্রি। অন্য অংশে দিনমান–এদের ঘর সংসার দেখাবো খুব শান্ত জীবন-যাত্রা এদের। বহু প্রবৃত্তি ও বাসনার সঙ্গে, বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে সংগ্রাম করে জয়ী হয়ে অভিজ্ঞ হয়ে এ জন্মে পূৰ্ব্বজন্মের জ্ঞান ও সংযমের প্রভাবে এরা সমাহিত ও আত্মস্থ হয়েছে।

 

–এদের সমাজ কেমন? ইচ্ছে করে প্রভু–জানি–

 

–এই গ্রহের কথা আমি ঠিক জানি না–তবে বিশ্বের এই অঞ্চলে এ রকম বহু গ্রহ আছে। সব উচ্চস্তরের জীবজগৎ। জীবে জীবে যুদ্ধ। রক্তপাত নেই এই সব গ্রহে। অত্যন্ত পরার্থপর এখানকার মানুষ। পরের জন্যে প্রাণ দেবে। অনেক জাতি নেই, ভেদবুদ্ধি অত্যন্ত কম। সহজে খাদ্য মেলে স্থল-দেহ ধারণের উপযুক্ত। আয়ু দীর্ঘ নয় কিন্তু, অল্প সময়ের মধ্যে বেশি কাজ করতে হয়–কাজেই আলস্যের স্থান। নেই। আসার বস্তুতে লোভ নেই–যেমন অত্যন্ত খাদ্য সঞ্চয়, বড় আবাসবাটী, উজ্জ্বল পরিচ্ছদ–মান, যশ-অহঙ্কার, অভিমান।

 

যতীন বল্লে–কিন্তু নারী রয়েছে যে প্রভু, ওরা থাকলেই

 

পুষ্প ভ্রূকুটি করে বল্লে–কি রকম যতীনদা?

 

দেবতা হেসে পিতার ন্যায় সস্নেহে পুষ্পের পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করে। বল্লেন–কন্যার মনে আঘাত দিও না–ও ঠিক বলেচে। ওরা থাকলেই হয় না গোলমাল। বাসনা থেকে পাপ, গোলমাল। এখানকার জীব বাসনা ক্ষয় করে এসেচে বহু জন্ম ধরে। এদের নিম্নস্তরের বাসনা জাগে না তীব্রভাবে। উচ্চজ্ঞানের, শিল্পের, সংগীতের সাধনা বা ভগবৎসাধনা নিয়ে এরা থাকে। ভগবানের জ্ঞান বা প্রত্যক্ষদর্শন এদের অনেকের হয়েছে। সুতরাং যে সব জিনিস জীবনে স্বপ্নের মত অস্থায়ী তাদের। অসারত্ব এরা বুঝেছে। অত্যন্ত সাধু, নিস্পৃহ, সরল উচ্চস্তরের জীবন। এখানকার মানে, এই সব গ্রহের।

 

যতীন বল্লে–বাঃ, চমৎকার জীবন তো এখানকার–ইচ্ছে হয় জন্ম। নিই–

 

দেবতা ওর দিকে চেয়ে বল্লেন–তোমাকে এখানে একদিন তো জন্ম। নিতেই হবে। কারণ এই স্বর্গলোক, যেখানে তোমরা আছ, এও মায়ার অধীন। হয়তো বহুঁকাল এখানে থাকবে, স্তর থেকে স্তরান্তরে যাবে কিন্তু স্বর্গও দুদিনের। ব্রহ্মচক্রে জন্ম-মৃত্যু আবর্তিত হচ্চে, মানুষ আবার জন্মাবে, আবার মরবে, আবার জন্মাবে–যতদিন বাসনার শেষ না হয়, অসত্য থেকে সত্যে, মৃত্যু থেকে অমৃতে, অন্ধকার থেকে জ্যোতিতে না যায়। ভগবানকে জানলে, জীব নিজেকে জানতে পারবে–তখন ছুটি। স্থূল দেহে জন্ম সাধারণত এই সব গ্রহে হয়–এখানে আত্মদর্শনের ও সাধনার সুযোগ ও সময় অনেক বেশি। দয়া করে বিশ্বের অধিদেবতা জ্ঞানী ও মুমূক্ষু জীবদের পুনর্জন্ম গ্রহণ করান।

 

–দেব, আপনি ঘুরে ঘুরে বেড়ান কেন? আপনি এত উচ্চ

 

–ঐ রজনীর তারালোকের ব্যাপ্তির মধ্যে, বনপুষ্পের সুবাস ও এই সব অদ্ভুত গ্রহের বনানীর নির্জনতা ও বনবিহঙ্গের কূজনের মধ্যে, বিশ্বের রহস্যের মধ্যে আমি তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকবার প্রার্থনা জানিয়েছিলাম মনে মনে। তিনি অসীম করুণায় সে প্রার্থনা মঞ্জুর। করেচেন। নইলে সাধ্য কি এই অগণ্য লোকালোকে ভ্রমণ করি? এ শক্তি তো সকলের হয় না। আমি দেখচি এভাবে তাঁর লীলা-সৌন্দর্য্য দেখে বেড়ানোর বাসনা করো নেই, এ নেশা আর কারো দেখিনি, কেবল বহুঁকাল আগে আর একটি আত্মার সঙ্গে দেখা হয়েছিল–দুটি নক্ষত্রের বিরাট সংঘর্ষের দৃশ্য দেখেছিলাম দুজনে–তা থেকে তৃতীয় একটি নূতন প্রজ্বলন্ত তারকার সৃষ্টি হোল। ওঃ সে সব দৃশ্য তোমাদের শক্তি নেই সহ্য করো। আমাকে তিনি ভ্রমণের শক্তি দিয়েছেন, সুপর্ণের মত বিরাট পাখা দিয়েছেন লোকে লোকান্তরে উড়তে–এই আমার তাঁকে উপাসনা। জয় হোক তাঁর।

 

পুষ্প হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো, দেখাদেখি যতীনও। এই মনোরম জগতের নৈশসৌন্দর্য্যের মধ্যে উচ্চস্তরের এই পথিক দেবতার বাণী স্বয়ং ভগবানের প্রতিনিধির বাণী বলে মনে হোল হঠাৎ ওদের মনে। সুপষ্ট সত্য বাণী–চন্দ্রমা অস্তমিত হোলে, বাদ্য শান্ত হোলে, পৃথিবীর ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যর আশ্রমে যেমন একদিন বাণী উচ্চারিত হয়েছিল। পুষ্প মাথা নীচু করে বল্লে–আশীৰ্বাদ করুন দেব

 

ওর অশ্রুপ্লাবিত চোখ দুটির দৃষ্টি নতুন গ্রহের মৃত্তিকার দিকে আবদ্ধ রইল।

 

দেবতা বলেন–আশীৰ্বাদ করচি কন্যা, তুমি আমার অপেক্ষা অনেক উচ্চস্তরের দেবআত্মার সাক্ষাৎ পাবে। আমি ভবঘুরে মাত্র। সত্যিকার জ্ঞানীর দর্শন পাবে। তবে তোমার ভাগ্যে এখনও অনেক সংগ্রাম আছে। কিন্তু তুমি বিশ্বদেবের করুণা লাভ করবে। আমি যাদের পাদস্পর্শ করার যোগ্য নই, এমন আত্মার দর্শন পেয়ে ধন্য হবে।

 

এমন সময় রাত্রি প্রভাত হয়ে এল সেখানকার বনে-বনানীতে। আকাশের নক্ষত্ররাজি ম্লান হয়ে এল–সাথী তারার নীল জ্যোৎস্না মিলিয়ে অস্পষ্ট হয়ে এল। পক্ষী-কূজন জেগে উঠলো বনভূমির বুকে।

 

পুষ্প ভাবছিল, কোনো এক সুদুর জন্মান্তরে এই গ্রহলোকে যদি সে জন্ম নেয়, সাথী তারার নীল জ্যোৎস্নায় এরই শৈলারণ্যে, উপত্যকায়, গিরিসানু দেশে, শান্ত উপত্যকায় সে হাত-ধরাধরি করে বেড়াবে যতীনদার সঙ্গে–দুজনে মিলে ভগবানের উপাসনা করবে সারা জীবন এই তপোবনসম গ্রহলোকের পবিত্র আশ্রয়ে, কোনো গিরিনিঝরিণীর কূলে কুটীর বেঁধে। জগতের বিশাল পথে ঘুরতে ঘুরতে কবে এখানে। এসে হয়তো পড়তে হবে, তা কেউ জানে কি? মহাপুরুষের আশীর্বাদ বৃথা যাবে না।

 

দেবতা বল্লেন–চলো, এখুনি লোকে জেগে উঠবে। এরা আমাদের হয়তো দেখতে পাবে–এদের ক্ষমতা বেশি। তোমাদের তো নিশ্চয় দেখতে পাবে। সরে পড়ি তার আগে।

 

ওদের বুড়োশিবতলার ঘাটে পৌঁছে দিয়ে পথিক দেবতা পুষ্পের চোখের জলের মধ্যে অদৃশ্য হোলেন। তার অনুনয় ও অনুরোধের উত্তরে বলে গেলেন, সময়ে আবার দর্শন দেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *