ব্যাকরণ রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

ছয়

বেরিয়ে গিয়ে দেখি, গেটের ওধারে একটা এক্কা ঘোড়াগাড়ি থেকে লাফ দিয়ে সবে নেমেছেন হালদারমশাই। মাধবলাল ঘোড়ার গাড়িকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। গাড়িটা চলে গেল। হালদারমশাই বললেন, “কর্নেলস্যারের লগে রাস্তায় দ্যাখা হইল।”

 

মুরারিবাবু হালদারমশাইকে দেখে অভ্যাসমতো খ্যাক করলেন। বললেন, “তখন তাড়াহুড়োর মধ্যে…আর কর্নেলসায়েব গাছে চড়ালেন…মশাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়নি। আপনাকে কেন তিনকড়িদা গর্তে ঢুকিয়ে বলি দিতে চাইছিল বলুন তো?”

 

বারান্দায় বসে প্রাইভেট ডিটেকটিভ একটু চটে গিয়ে বললেন, “আপনি আমাকে কলকাতায় কর্নেলস্যারের ঘরে দেখেছেন। এখন বলছেন, পরিচয় হয়নি। আপনার জন্যই আমার আজ…”

 

ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বললুম, “সন্ধিবিচ্ছেদ হয়ে যেত ব্যাকরণমতে।”

 

হালদারমশাই অনিচ্ছায় হাসলেন। “হ্যাঁ, ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হতে বসেছিল।”

 

জিভ চুকচুক করে দুঃখ দেখিয়ে মুরারিবাবু বললেন, “আহা রে! তিনকড়িদাটা মহা ধড়িবাজ। তিন-তিরেক্কে নয়, নয় নয়ে একাশির খেলা আর কি!”

 

“একাশি!” গোয়েন্দাপ্রবর নড়ে বসলেন। বেতের চেয়ার মচমচ করে উঠল। “আমাকে যারা বন্দী করে বলি দিতে যাচ্ছিল, তারাও একাশি বলেছিল। ব্যাপারটা কী?” বলে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন মুরারিবাবুর দিকে।

 

মুরারিবাবু কিছু বলার আগে তাঁকে ঝটপট হালদারমশাইয়ের পরিচয় দিলুম। শোনার পর মুরারিবাবু খুব খুশি হয়ে বললেন, “তা হলে আর চিন্তা নেই। ডিটেকটিভ ডিটেকটিভে ছয়লাপ। যাবে কোথায়? নকুলদা, খুনের কিনারা হবে। সোনার মোহরভর্তি ঘড়াও বেরোবে। তিনপুরুষে তিন-তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশির মামলা। সবরকম কোঅপারেশন পাবেন স্যার!”

 

মাধবলালকে চা করতে বললুম। হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “জয়ন্তবাবুর লগে দুইখান কথা আছে।” তারপর আমার হাত ধরে ঘরে ঢুকে ফিসফিস করলেন, “সঙ্গে রিভলভার আছে। আর ভয় নেই। কর্নেলস্যার নিজের লাইনে চলুন, আমরা বলি নিজের লাইনে। কী কন?”

 

বললুম, “কর্নেল কলকাতা গেলেন। কাল দুপুরের মধ্যে ফিরবেন।”

 

“অ্যাঁ!” বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন হালদারমশাই। চোখের পাপড়ি কাঁপতে থাকল।

 

“হ্যাঁ। আমাকে বলে গেছেন কোথাও যেন না বেরোই।”

 

“এটা কি একটা কথা হইল? আপনে পোলাপান নাকি? ছাড়েন তো!” কিটব্যাগ টেবিলে রেখে হালদারমশাই ভেতর থেকে রিভলভার আর গুলি বের করলেন। ছ’টা গুলি খোপে ঢুকিয়ে অস্ত্রটা ঢোলা প্যান্টের পকেটে রাখলেন। তারপর নস্যির কৌটো বের করে বললেন, “এই নস্যির জন্য লাঞ্চের নেমন্তন্ন খেতে আসতে পারিনি। যাকগে, এখন তো কর্নেলস্যারের খাটেই তা হলে আমার শোয়ার জায়গা হবে।”

 

মুরাবিবাবু আপনমনে তিন-তিরেকে করতে করতে নীচের লনে ফুল দেখে বেড়াচ্ছেন আর সম্ভবত ফুলেদের ভূত-ভবিষ্যৎ গণনা করছেন। মাধবলাল নজর রেখেছিল। কিচেন থেকে হাঁক ছাড়ল, “এ বাবুমোশা! ফুলউলসে হাত মাতৃ লাগাইয়ে।”

 

মুরারিবাবু চটে গিয়ে বললেন, “ক্যা ফুল দেখাতা হ্যায় তুম?…হুঁ! মা-ধ-ব-লা-ল! পঞ্চব্যঞ্জন হ্যায়। স্রিফ পাঁ-চ। সমঝতা? তিনোসে নেহি আতা! তিন ঔর দো–ব্যস! তিন কাটা যায়েগা, দো রহেগা!” বলে বুড়ো আঙুল নেড়ে দিলেন। “অঙ্কের বাইরে পড়ে গেছ, সমঝা?”

 

হাসি চেপে বললুম, “তা হলে আমাদের ডিটেকটিভদ্রলোকের নামের হিসেবটা করে দিন মুরারিবাবু। সংখ্যাতত্ত্ব অনুসারে…।

 

বাধা দিয়ে মুরারিবাবু বললেন, “পুরো নাম?”

 

হালদারমশাই খুব আগ্রহ দেখিয়ে বললেন, “নিউমারোলজি? আপনি জানেন? তাই বলুন! আমার নাম কৃতান্তকুমার হালদার।”

 

চা আসতে-আসতে হিসেব কষে ফেললেন মুরারিবাবু। “একাদশ ব্যঞ্জন। …হুঁ, একটু গণ্ডগুলে নম্বর। সেইজন্যই খাঁড়ার ঘা প্রায় এসে পড়েছিল! …আরে তাই তো! এগারোকে তিনগুণ করলে তে-তিরিশ। দু-দুটো তিন পাশাপাশি। আপনাকে মারে কে? সেই তো! আপনাকে পাঁঠাবাঁধা করে বেঁধে গর্তে ফেলে খাঁড়ায় শান দিতে গিয়ে দেরি হতই। হয়েছে।”

 

বলে ফুঁ দিয়ে সশব্দে চা টানলেন। মাধবলালকে ডেকে বললুম, “ডরো মাত্ মাধবলাল! হাম হিসাব কার দেতা। তিন পাঁচ পরোহ। এক পাঁচ। এক ঔর পাঁচ ছে। ইসমে দো তিন হ্যায়!”

 

মুরারিবাবু মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চাপা খ্যাক করলেন। মাধবলাল চলে গেলে ফিসফিস করে বললেন, “ভয় দেখাচ্ছিলুম। বুঝলেন না? তিন নেই কোথায়? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তিনের খেলা। তিন তিরেক্তে নয়, নয় নয়ে একাশি।”

 

বুঝলুম চা পেয়ে খুশি হয়েছেন খুব। রিয়ে-তারিয়ে চা শেষ করে ফের বললেন, “চলুন ডিটেকটিভমশাই!”

 

হালদারমশাই উৎসাহে উঠে দাঁড়ালেন। আমাকেও টেনে ওঠালেন। সাহস দিয়ে বললেন, “সঙ্গে উইন্ আছে। চলে আসুন! কর্নেলসারেরে দেখাইয়া দিমু…এমন চান্স আর পাইবেন না। কাইল আইয়া দেখবেন…” বলে ভুরু নাচিয়ে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, কী ঘটবে।

 

মুরারিবাবুরও প্রচণ্ড তাড়া। শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়েই বেরোলাম বাংলো থেকে। হালদারমশাই মন্দ বলেননি। কর্নেল ফেরার আগেই রহস্যভেদ এবং খুনে-লোকগুলোকে পাকড়াও করিয়ে দিয়ে তাক লাগানোর চান্স ছাড়া ঠিক নয়।…

 

এবার মুরারিবাবু আমাদের গাইড। হাইওয়ের ওধারে উঁচু জঙ্গুলে ঢিবিতে উঠে হালদারমশাই বললেন, “আগে সেই দেউড়ি!”

 

মুরারিবাবুর পেছন-পেছন ঘন জঙ্গল আর ধ্বংসস্তূপের ভেতর হাঁটছিলুম। এখনই জায়গাটা আবছা আঁধারে ভরে গেছে। এবেলা বাতাস বন্ধ। গুমোট গরম। নিঝুম বন আর ধ্বংসাবশেষে ঝিঁঝিপোকা আর পাখির ডাককে মনে হচ্ছে স্তব্ধতারই একটা আলাদা স্বাদ। নিজের পায়ের শব্দে নিজেই চমকে উঠছি। কিছুক্ষণ পরে খোলা একটা জায়গায় পৌঁছলুম। এবার সামনে সেই ভাঙা তোরণ দেখতে পেলুম।

 

হালদারমশাই বললেন, “কোথায় বডি পড়ে ছিল, দেখিয়ে দিন।”

 

মুরারিবাবু দেউড়ির ওধারে গিয়ে পাঁচিলের নীচে একটা জায়গা দেখালেন। “এইখানে উপুড় হয়ে পড়েছিল নকুলদা।” একটু তফাতে গিয়ে ওপরে আঙুল তুলে বললেন, “আর ওইখানে তিন-শিঙে ছাগলটা..”।

 

কথা শেষ না হতেই দেউড়ির ওপরে তিন-শিঙে সেই কালো ছাগলের মুণ্ডু ঝোঁপ ফুড়ে বেরোল এবং অদ্ভুত গলায় বলে উঠল, “এ-কাশি!”

 

সঙ্গে-সঙ্গে মুরারিবাবু তখনকার মতোই দিশেহারা হয়ে মন্দিরের দিকে ঘুরেছিলেন। কিন্তু তখনই হালদারমশাই “তবে রে” বলে রিভলভার বের করে ঢিসুম আওয়াজে গুলি ছুড়লেন। একঝাক টিয়া চাঁচাতে-চাচাতে পালিয়ে গেল। ছাগলের মুণ্ডুটা ততক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেছে।

 

হালদারমশাই রিভলভার তাক করে আবার কিম্ভুত প্রাণীটিকে খুঁজছেন, সেই সময় হইহই করে একদঙ্গল লোক আর কল্যাণবাবু দু’জন বন্দুকধারী সেপাইসহ এসে পড়লেন। মুরারিবাবুও তাদের সঙ্গে আছেন। কল্যাণবাবু আমার দিকে না-তাকিয়ে সোজা হালদারমশাইকে চার্জ করলেন, “আর য়ু মিঃ কে. কে. হালদার, দা প্রাইভেট ডিটেকটিভ?”

 

হালদারমশাই সগৌরবে এবং সহাস্যে বললেন, “ইয়েস, আই অ্যাম!”

 

“ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। কাম উইথ মি।”

 

“হোয়াই?” বলে হালদারমশাই পকেট থেকে তাঁর আইডেনটিটি কার্ড বের করলেন। কিন্তু কল্যাণবাবুর ইশারায় সাদা পোশাকের পুলিশ এবং বন্দুকধারী সেপাইরা তাকে ঘিরে ধরল। কল্যাণবাবু বললেন, “গিভ মি ইওর আর্মস, প্লিজ!”

 

বোবা হয়ে গেলেন হালদারমশাই। রিভলভারটি কল্যাণবাবুর হাতে সঁপে দিয়ে ফোঁস করে একটি শ্বাস ছাড়লেন।

 

আমি বললুম, “এ কী হচ্ছে কল্যাণবাবু? কর্নেল তো আর…”

 

আমাকে থামিয়ে রূপগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসার গম্ভীর মুখে বললেন, “আই অ্যাম অন ডিউটি মিঃ চৌধুরী! প্লিজ ডোন্ট ইন্টারভেন।”

 

হালদারমশাই ব্যহবেষ্টিত হয়ে গোমড়ামুখে চলে গেলেন। ভিড়টা সরে গেলে মুরারিবাবু ফিসফিস করে বললেন, “কিছু বুঝতে পারলুম না! তিন-তিরেক্কে হয়ে গেল কেন বলুন তো? আমি তো শুধু তিন-শিঙে…” বলে বুকে ও কপালে হাত ঠেকালেন। “শিব! শিব! বাবা গো!” বিড়বিড় করে এই মন্ত্র জপতে জপতে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন।

 

জিজ্ঞেস করলুম, “আমরা যাচ্ছি কোথায়?”

 

“আমার ডেরায়।” ভয়ার্ত মুখে মুরারিবাবু বললেন। “আসলে কী জানেন? ওই ডিটেকটিভদ্রলোকের পাশাপাশি দুটো তিন বড্ড গণ্ডগুলে নম্বর। শেষ পর্যন্ত বেঁচে যাবেন। তবে বেশ ভোগাবে। চলুন, বউদির সঙ্গে গল্প করতে-করতে তেলেভাজা খাব। আর তো কিছু করার নেই।”

 

শটকার্টে নিয়ে যাচ্ছিলেন মুরারিবাবু। এবার একটা করে একলা পোডোভাঙা বাড়ি আর ঝোঁপঝাড়, কিছু উঁচু গাছ। হানাবাড়ি মনে হচ্ছিল কোনো-কোনো বাড়িকে। হঠাৎ কোত্থেকে ব্যা-অ্যা-অ্যা ডাক ভেসে এল। মুরারিবাবু পালাতে যাচ্ছেন, ওঁকে পেছন থেকে ধরে ফেললুম। মুরারিবাবু হাঁসফাস করে বললেন, “পা চালিয়ে চলুন। এসব বাড়ি হানাবাড়ি। লোকজন নেই।”

 

বাঁ দিকে তাকাতেই একটা বাড়ির পেছনে সেই ছেলেটি, বিট্টুকে দেখতে পেলুম। বুঝলুম ব্যা-ডাক কে ডেকেছে। কিন্তু সাহস আছে তো বিট্টুর! এই হানাবাড়ি এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে একা।

 

বললুম, “মুরারিবাবু, ওই দেখুন ব্যাকরণ রহস্য!”

 

মুরারিবাবু দেখামাত্র চাঁচালেন।”পাজি, বাঁদর, ভূত, সবসময় খালি…এবার এসো ‘জ্যাঠাকমশাই, দিন না ঘুড়িটা পেঁড়ে’ বলে কাঁদতে।”

 

বিট্টু জিভ দেখিয়ে উধাও হয়ে গেল।

 

মুরারিবাবু শাসালেন। “বিষ্ণুদাকে বলে তিন-তিরেক্কে করে দিচ্ছি, থামো!”…

 

বিরুর বউদি মুরারিবাবুর সাড়া পেয়ে সদর দরজা খুললেন। আমাকে দেখে মিষ্টি হেসে বললেন, “এসো জয়ন্ত ঠাকুরপো! কর্নেলসায়েব এসেছিলেন সওয়া চারটে নাগাদ। বলে গেলেন, কলকাতা থেকে কাল ফিরবেন। বিরুকে পাঠিয়ে তোমার খোঁজ নিতে বললেন! এসো, ভেতরে এসো।”

 

মুরারিবাবু বললেন, “আমার গেস্ট। আমার ঘরে বসাই, বউদি! গরম-গরম তেলেভাজা খাওয়াব বলে নিয়ে এলুম।”

 

রমলাবউদি চোখ পাকিয়ে বললেন, “তোমার ঘরের যা ছিরি করে রেখেছ! থাক্। এ-ঘরে এসো জয়ন্ত!”

 

কোনো-কোনো মানুষ থাকেন, মনে হয় কতদিনের চেনা। এক মুহূর্তে আপনার জন হয়ে ওঠেন। আসলে এটা পরকে আপন করে নেওয়ার স্বভাব। রমলাবউদি সেইরকম মানুষ। নকুলবাবুর জাদুঘরে আমাদের বসিয়ে তেলেভাজা করতে গেলেন। বিরুর নাইট ডিউটি। একটু আগেই বেরিয়ে গেছে। মুরারিবাবু খ্যাক করে হেসে বললেন, “ডিটেকটিভবাবুকে অ্যারেস্ট করল কেন বলুন তো? গুলি ছোঁড়ার জন্য তিন-তিরেক্তে হয়ে গেলেন? তা যাই বলুন, গুলি ছোঁড়াটা উচিত কাজ হয়নি। বাবার সাক্ষাৎ-অবতার। আমার বড় ভয় করছে, জানেন?”

 

কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। ভয় আমারও করছে। সেচ-বাংলোয় ফেরা এবং একা রাত কাটানো–তিনকড়িচন্দ্রের ষণ্ডা লোকদুটো নয়, বারবার সেই খঙ্গধারী সন্ন্যাসী লোকটার চেহারাই মনে ভেসে উঠছিল। শেষে ভাবলুম, থানায় গিয়ে ওসি ভদ্রলোককে বলে পুলিশ-জিপে পৌঁছে দিতে বলব। কল্যাণবাবু খচে আছেন, তার কারণ বোঝা যাচ্ছে। জিপের টায়ার ফঁসানোতে আগুন হয়ে ঘুরছিলেন। মন্দির থেকে নীচের রাস্তা পর্যন্ত নিশ্চয় কাঁদ পাতা ছিল। মাঝখান থেকে রাগটা গিয়ে পড়েছে হালদারমশাইয়ের ওপর।

 

মুরারিবাবু সমানে তিন-তিরেক্কে কষে চলেছেন। ঘরের ভেতর আঁধার হয়ে আসছে। রমলাবউদি বারান্দার বাতি জ্বালিয়ে একথালা তেলেভাজা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বললেন, “এই তিন-তিরেক্কেওয়ালা! আলো জ্বালতে পারোনি?”

 

সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন নিজেই। মুরারিবাবু নড়ে বসে বললেন, “একাশির ধাক্কা! মাথা ভেভো করছে।” তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন তেলেভাজার ওপর। সংখ্যাতত্ত্ববিদ–কাজেই ঝটপট গুনে ফেললেন। “উরেব্বাস! তিন-তিরেক্কে নয়!”

 

রমলাবউদি ভেংচি কেটে বললেন, “মুখেরটা গুনেছ? তিন-তিরেক্কে নয় তো করছ। খাও ভাই! চা নিয়ে আসছি। তারপর গল্প করব।”

 

গরম তেলেভাজা মন্দ নয়। কিন্তু মনে দুর্ভাবনা। ওসি ভদ্রলোক যদি বাইরে গিয়ে থাকেন দৈবাৎ? নাঃ, ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। শিগগির কেটে পড়াই ভালো। মাধবলালকে সাহসী লোক বলেই মনে হয়েছে। বরং পাশের এয়ারকন্ডিশন্ড ঘরটা খুলে দিতে বলব। জানালা বন্ধ করেও আরামে ঘুমনো যাবে।…

 

রমলাবউদি চা নিয়ে এলেন। বললেন, “কর্নেলসায়েবকে চিঠির ব্যাপারটা বলেছি। তোমাকে বলি। বিট্টু চিঠি ডাকে দিতে গিয়েছিল। পোস্টাফিসে একটা লোক ওর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে নেয়। বলে, আমি ফেলে দিচ্ছি! পপাস্টবক্সটা দেওয়ালে ফোকরের মতো তৈরি। একটু উঁচুতে মুখটা। চিঠি ফেললে ঘরের ভেতর গিয়ে জমবে। তো বিট্টু চিঠিটা ওর হাতে দিয়েই চলে আসে। অত বুদ্ধি কি ওর আছে?”

 

বললুম, “বোঝা যাচ্ছে একটা দল এর পেছনে আছে।”

 

“তিনকড়িবাবুর কীর্তি শুনলুম কর্নেলসায়েবের কাছে। পইপই করে বলে গেছেন, তাকে যেন পাত্তা না দিই। যদি এসে গণ্ডগোল করে পুলিশে খবর দিতেও বলে গেছেন।”

 

বলে রমলাবউদি জানলার দিকে ঝুঁকে গেলেন। “কে রে? কে ওখানে? দাঁড়া তো, দেখাচ্ছি মজা!”

 

রমলাবউদি ছুটে বেরিয়ে গেলেন। জানলায় উঁকি মেরে কিছু দেখতে পেলুম না। মুরারিবাবু বললেন, “তিন-তিরেক্তে খেলা! ছেড়ে দিন! বউদির দিনদুপুরে ভূত দেখা অভ্যেস আছে। নামেই তিন-ব্যঞ্জন কিনা! র+ম+ল।”

 

ভদ্রমহিলার সাহস আছে! জানলা দিয়ে দেখলুম, টর্চ আর একটা মস্ত কাটারি হাতে পেছনের পোড়ো জমিটায় চক্কর দিচ্ছেন। আমি এভাবে বসে থাকা উচিত মনে করলুম না। বেরিয়ে গিয়ে উঠোনে নেমেছি উনি ফিরে এলেন। বললেন, “কে যেন দাঁড়িয়ে ছিল জানলার ওধারে। ঠাকুরপোকে বলব, ছাদের চারদিকে বাল্ব লাগাতে।”

 

একটু ইতস্তত করে বললুম, “আমাকে বাংলোয় ফিরতে হবে, বউদি! ওদিকে যেতে নাকি সন্ধ্যার পর রিকশা বা ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যায় না।”

 

রমলাবউদি বললেন, “হ্যাঁ, চড়াই রাস্তা। তার ওপর বিরুর দাদা মার্ডার হওয়ার পর ওদিকের রাস্তায় কেউ পারতপক্ষে যেতে চায় না। এ তো ভাই তোমাদের কলকাতা শহর নয়। নামেই টাউন। মানুষজনের মনে রাজ্যের কুসংস্কার।”

 

একটু হেসে বললুম, “কুসংস্কার কলকাতাতেও কম নেই। তো, চনি বউদি!”

 

“মুরারিঠাকুরপোর সবসময় পাগলামি করতে লজ্জা হয় না?” রমলাবউদি তেড়ে গেলেন। “তখন তো আমার গেস্ট বলে খুব জাঁক দেখাচ্ছিলে! গেস্টকে পৌঁছে দিতে হবে না?”

 

তাড়া খেয়ে মুরারিবাবু বেরোলেন। মুখে অনিচ্ছার ভাব। চুপচাপ হাঁটতে থাকলেন। আমরা এবার বাজারের দিকে চলেছি। একটু পরে মুরারিবাবু বললেন, “আমি, কিন্তু, বুঝলেন বাংলো অবধি যাচ্ছি না। কেন জানেন? বউদিকে গার্ড দিতে হবে। জানলার পেছনের লোকটা…একাশি! তিন-তিরেক্কে করে দিলেই হল। মেয়েরা একা না বোকা। বুঝলেন না?”

 

“বুঝলুম।” হাসবার চেষ্টা করে বললুম, “অন্তত একটা এক্কাগাড়ি কোথায় পাব, দেখিয়ে দিন বরং।”

 

“পেয়ে যাবেন। ওই তো রাস্তা। কত লোক, কত গাড়িঘোড়া। ভয়টা কীসের?” বলে মুরারিবাবু বাঁই করে ঘুরে হনহন করে গলিপথে নিপাত্তা হয়ে গেলেন। সম্ভবত তিন-তিরেক্কে নয়–এই নয়টা ‘না’-অর্থব্যঞ্জক। অর্থাৎ স্রেফ না হয়ে যাওয়া। নঞর্থক হওয়া মানেই সন্ধিবিচ্ছেদ। ধড় এবং মুণ্ডু পৃথক হয়ে যাওয়া। সোজা কথায় খতম। তখন শিবের চেলা হয়ে ঘোরো। প্রেতাত্মা বা ভূত হয়ে যাও। সর্বনাশ!

 

গলিটা যেখানে বড় রাস্তায় পৌঁছেছে, সেখানে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে একাগাড়িই খুঁজছিলুম। কারণ সাইকেল-রিকশা চড়াই ঠেলে ওদিকে যাবে না শুনেছি। ইতিমধ্যে রূপগঞ্জের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কিত মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে গেছে। আসলে এই জনপদটা কোনো যুগে নদীর তীরে একটা পাহাড়ের মাথা সমতল করে গড়ে উঠেছিল। তাই পশ্চিম ঘরে যে হাইওয়েটা নদীর সমান্তরালে বিহারের দিকে দক্ষিণে এগিয়ে গেছে, সেটা টানা চড়াই। ব্যারেজের মোড়ে পৌঁছলে আর চড়াই ভাঙতে তত হবে না। ব্রিজের ওপরটা স্বভাবত সমতন। তারপর সেচ-বাংলো পর্যন্ত যেটুকু চড়াই, সেটুকু সামান্যই।

 

“সার ইখানে উড়িয়ে আছে বটেক!”

 

শুনেই তাকিয়ে দেখি, সেই সাইকেল-রিকশাওয়ালা। রিকশার ব্রেক কষে সদ্য সামনে থেমেছে। মুখে মধুর হাসি। বললুম, “এই যে ভাই, তুমি শের আলিকে চেনো?”

 

শের আলির কথা ওকে দেখামাত্র মনে পড়েছিল। ও এই রোগা পাকাটি শরীর অমন চড়াই। রাস্তায় রিকশা তুলতে পারবে না, জানা কথা। কাজেই যদি শের আলির কাছে পৌঁছে দেয়, একটা জিপের আশা আছে। রিকশাওয়ালা বলল, “শের আলি? হ্যাঁ সার, চিনি বটেক।”

 

“ওর বাড়ি নিয়ে চলো তো।” বলে রিকশায় উঠলুম। রিকশাওয়ালা বলল, “সে তো সার দূর বটেক। রেলের লাইন পেরিয়ে পাঁচ-ছ’ মাইল। ইরিগেশং কুয়াটার বটেক…”

 

“অত দুরে?”

 

“হাঁ সার, উদিকে ড্যাম আছে বটেক। তার উত্তুর সাইডে বটেক।”

 

আরও ভাবনায় পড়া গেল দেখছি। অতদূরে গিয়ে যদি শুনি শের আলি নেই? তার স্যারের মেয়ের অসুখ। যদি সেই ভেবে কর্নেল তাকে বলে থাকেন, জিপের দরকার নেই, এবং কলকাতা যাওয়ার মুখে সেটা বলাই স্বাভাবিক, তা হলে তার স্যার অর্থাৎ ডি. ই. কামালসায়েব কোথাকার মিশনারি হাসপাতালে অসুস্থ মেয়েকে দেখতে যাওয়ার জন্য এবার নিজের জিপই ব্যবহার করবেন। এই অনিশ্চয়তার ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়। ইরিগেশন কোয়ার্টার থেকে ফিরতে মোট দশ-বারো মাইল–তার মানে, আরও রাত হয়ে যাওয়া।

 

চুপ করে আছি দেখে রিকশাওয়ালা বলল, “ভাড়া লিয়ে ভাবছেন বটেক!” সে খুব হাসতে লাগল। “বুঢ়াসাহেবের লোক বটেক আপনি। ক্যানে উ ভাবনা গো? চলেন, লিয়ে যাই। যা দিবেন, লিব বটেক।”

 

খুলে বলাই উচিত মনে করলুম।”দ্যাখো ভাই, যাব আমি ইরিগেশন বাংলোয়। চেনো তো?”

 

“চিনি বটেক। ড্যামের দক্ষিণে।” রিকশাওয়ালা উৎসাহ দেখিয়ে বলল। “তা হলে শের আলির কথা ক্যানে?”

 

“তুমি যেতে পারবে ইরিগেশন বাংলোয়?” চরম কথাটি বললুম এবার।

 

“হাঁ-আ। ঠেইলতে…ঠেইলতে…ঠেইলতে পচে দিব বটেক।” রিকশাওয়ালা বলল। “ই মানিককে দেখে সার ভাবছেন কী বটেক? রেকশায় জম্মো, রেকশায় মরণ হবেক–ই মালিক সিটাই জানে বটেক। চহেন, চল্‌হেন!” সে প্যাডেলে পায়ের চাপ দিল। চ-এর সঙ্গে একটি হ-বর্ণ উচ্চারণ তার জোরটা জানিয়ে দিল।

 

কিছুটা এগিয়ে বাঁয়ে মোড় নিতেই সুনসান নিরিবিলি এলাকা। আলো নেই। তারপর হাইওয়ে এবং ক্রমশ চড়াই। ডান দিকে খাপচা-খাপচা ঝুপসি জঙ্গল। তার ওদিকে অনেকটা দূরে ড্যাম। চড়াইয়ের মাথার দিকটায় যেখানে ব্যারেজ শুরু, সেখানেই আলো জুগজুগ করছে।

 

মানিক রিকশাওয়ালাকে অবশেষে নামতেই হল। এতক্ষণে বাতাস উঠেছে এবং আমরা এগোচ্ছি দক্ষিণে, ফলে সামনে বাতাসের ধাক্কা। বললুম, “ওহে মানিক, বরং আমি হেঁটে যাই।”

 

সে খুব অবাক হয়ে গেল। “কী ভাবছেন বটেক? পারবে না মানিক?”

 

“না, না।” একটু হেসে বললুম, “ব্রিজে গিয়ে চাপব। আসলে কী জানো? একলা এই রাস্তায় যেতে একটু কেমন-কেমন লাগে। একজন সঙ্গী চেয়েছিলুম। তুমি আমার সঙ্গী বটেক।”

 

এতে খুশি হল না, রিকশাচালকের আঁতে ঘা লাগল। একজন খাঁটি পরিশ্রমী মানুষ সে। বলল, “বুলেছি পঁহুছে দিবেক, তো দিবেক বটেক।”

 

গোঁ ধরে সে হ্যাঁন্ডেল ধরে টেনে নিয়ে চলল। বিচ্ছিরিরকমের চড়াই। বাঁ দিকে প্রাচীন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ, ডান দিকে জঙ্গল। জঙ্গলের আড়ালে কিছুটা দূরে মাঝে-মাঝে ড্যামের

 

জলে তারার আলোর ঝিকিমিকি, ঝিকিমিকি গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। বাতাসে ঢেউ উঠেছে জলে।

 

হঠাৎ দপ করে রিকশার সামনেকার বাতি নিভে গেল। মানিক হাঁসাস করে বলল, “নিভাক! ই মানিকের সার, আলো-আঁধার এক বটেক।”

 

কিন্তু এটাই আশ্চর্য, এটা হাইওয়ে। অথচ কোনো মোটরগাড়ি এখনও দেখলুম না। ভাবলুম, এটা নেহাত একটা চান্সের ব্যাপার। ঠিক এ সময়টাতে কোনো গাড়ি এখানে এসে পৌঁছচ্ছে না, কিন্তু যে-কোনো সময় দেখা যাবে কোনো ট্রাক বা বাস। হঠাৎ মানিক বলল, “কে বটেক?”

 

অন্ধকারে দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়েছে ততক্ষণে। রিকশার সামনে কয়েকটা কালো মূর্তি। একজন হুঙ্কার দিয়ে বলল, “একাশি।”

 

অমনি রিকশা থেকে লাফিয়ে নীচে পড়লুম। পালিয়ে যেতুম, না একহাত লড়তুম, জানি না। রাস্তায় নামতেই আমাকে তারা জাপটে ধরল। ধরেই মুখে টেপ সেঁটে দিল। মানিক চেঁচিয়ে উঠেছিল। তারপরই সে অদ্ভুত নাকিস্বরে গোঁ-গোঁ করতে লাগল। বুঝলুম, তার মুখেও টেপ পড়ে গেছে।

 

হালদারমশাইয়ের অবস্থাই হল। লোকগুলোর গায়ে সাঙ্ঘাতিক জোর। লড়তে গেলেই আরও বিপদ বাধবে। কী আর করা যাবে? পিঠমোড়া করে বেঁধে কাঁধে তুলল যখন, তখন ঠ্যাং ছুড়লুম না। সন্ধিবিচ্ছেদের জন্য তৈরি হয়ে গেছি। এরা হালদারমশাই বেহাত হয়ে ঠকেছে, অতএব এবার আর দেরি করবে না। প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে সেই সন্ন্যাসী লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করছিলুম,

 

যার হাতে খাঁড়া ছিল। কিন্তু কী যাচ্ছেতাই অন্ধকার। উঁচু ঢিবির ওপর জঙ্গলের ভেতর অন্ধকার একেবারে গাঢ় কালি। অদ্ভুতভাবে মনে একটা কথা ভেসে এল। মুণ্ডু আর ধড় আলাদা হলে রক্ত প্রচুর বেরোবে। কিন্তু রক্তগুলোও লাল দেখাবে না। কালোই দেখাবে।

 

একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে ওরা থামল। ভারিক্কি গলায় একজন বলল, “কথা আদায় কর! সত্যি কথা না বেরোলে বলিদান।”

 

অন্য একজন বলল, “কাশী তো হাজতে। বলিদানের খাঁড়াটাও পুলিশের হাতে গচ্চা গেল। বলি, দেবেটা কে?”

 

“কাশীটা একটা গাধা!” গলাটা সেই তিনকড়িচন্দ্রেরই মনে হল। “যাকগে, টেপ খুলে কথা আদায় কর। বুড়োঘুঘুটার সঙ্গী যখন, তখন সব জানে। কতদূর এগিয়েছে, ঠিকঠাক জানা দরকার।”

 

একজন আমার মুখের টেপ এক ঝটকায় খুলে দিল। চামড়া, গোঁফসুষ্ঠু উপড়ে গেল যেন। যন্ত্রণায় “উঁহুহু” করে উঠলাম। তারপর পিঠে ছুঁচলো কিছু ঠেকল। একজন বলল, “টু করলেই উলটো দিক থেকে হার্ট ছেদা হয়ে যাবে। সাবধান!”

 

একজন আমার কাধ ধরে ঠেলে বসিয়ে দিল ঘাসের ওপর। এতক্ষণে কানে আবছা ভেসে এল ঢাকের শব্দ। তা হলে মন্দিরটার কাছাকাছি কোথাও আছি। সামনের লোকটার হাতে ছড়ি দেখতে পেলুম। ঠিকই চিনেছি তা হলে। বললুম, “ডঃ সিংহ নাকি?”

 

ছড়ির খোঁচা খেলুম পেটে। “শাট আপ! ন্যাকামি হচ্ছে? ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দ্যাখোনি?”

 

“দেখতে পাচ্ছি তিনকড়িবাবু!”

 

“মোটকু, কথা আদায় কর।” তিনকড়িচন্দ্র একটু তফাতে বসল। “দেরি করিসনে!”

 

পিঠে ছুরির ডগার চাপ পড়ল। বললুম, “বলছি, বলছি।”

 

“বলো!” উদাস গলায় তিনকড়িচন্দ্র বলল। “বলো কদ্দূর এগিয়েছে বুড়োঘুঘু?” বললুম, “অনেকদূর! কলকাতা অবধি।”

 

“তার মানে?”

 

“কর্নেল কলকাতা গেছেন। একটা ভাঙা শিলালিপির পাঠোদ্ধার করতে।”

 

“তার মানে? তার মানে?”

 

“নকুলবাবুর নোটবইতে ওই শিলালিপির নকল আঁকা আছে। ওতেই নাকি সোনার মোহরভর্তি ঘড়ার কথা আছে।”

 

“শাট আপ!” তিনকড়িচন্দ্র ধমক দিল। “মোহর-টোহর বোগাস! আমি জানতে চাইছি একাশিদেবের কথা!”

 

অবাক হয়ে বললুম, “সবসময় একাশি-একাশি শুনেছি! একাশিদেবের কথা তো শুনিনি।”

 

“সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না।” তিনকড়িচন্দ্র শাসাল। “নোলো ব্যাটাচ্ছেলেকে ত্রিশূলে গেঁথেছি। তোমাকে…তোমাকে…”তিনকড়িচন্দ্র আমার জন্য সাঙ্ঘাতিক মৃত্যু খুঁজতে-খুঁজতে বলল, “হু, তোমার গা পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে কাটব। বলো, কোথায় একাশিদেব লুকনো আছে?”

 

“কী আশ্চর্য! আমি জানলে তো বলে দিতুম। শিলালিপির ভেতর তার খোঁজ আছে হয়তো। কর্নেল সেজন্যই তো কলকাতা গেছেন। পাঠোদ্ধার করে তবে না জানা যাবে।”

 

আমার কথায় তিনকড়িচন্দ্র একটু ভাবনায় পড়ে গেল হয়তো। বলল, “ওকে। মোটকু, ওকে কাশীর ঘরে…না, কাশীর ঘরে পুলিশ আসার চান্স আছে। স্তূপের ভেতর গর্তটা ভালো জায়গা ছিল। বুড়ো চিনে ফেলেছে। এক কাজ কর।”

 

পেছনে মোটকু বলল, “বস্তায় ভরে টিকটিকিবাবুর মতো…”

 

“নাঃ! পুলিশ বস্তা দেখলেই সার্চ করছে দেখে এলুম।” তিনকড়িচন্দ্র উঠল। “একে বরং ডোম্বলবাবুদের পোড়োবাড়িতে নিয়ে চল। ঠ্যাং দুটোও বেঁধে মুখে ফের টেপ সেঁটে ফেলে রাখবি। তালা ভেঙে নতুন তালা এঁটে দিবি ঘরটাতে। বুড়োঘুঘু ফিরলে উড়ো চিঠিতে জানিয়ে দেব, মাল দাও, মাল নাও! গিভ অ্যান্ড টেক। ব্যস!”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *