ব্যাকরণ রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
তিন
মুরারিবাবুকে শের আলি চেনে। উনি এখানে ‘পাগলাবাবু’ নামে সুপরিচিত। কিন্তু ওঁর বাড়ি পর্যন্ত জিপ যাবে না। ঘিঞ্জি গলির পর ধ্বংসস্তূপ আর জঙ্গলে-ঢাকা এলাকা। সেখানে কিছু পুরোনো একতলা বাড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার একটাতে মুরারিবাবু থাকেন। শের আলির কাছে জানা গেল, সেও ওঁর নিজের বাড়ি নয়। শিবের ত্রিশূলের আঘাতে যাঁর রহস্যময় মৃত্যু ঘটেছে, সেই নকুলেশ্বর ঠাকুরের বাড়ি। একটা ঘরে মুরারিবাবুকে থাকতে দিয়েছিলেন।
শের আলি বাজারের রাস্তায় জিপ রেখে আমাদের নিয়ে গেল। ডাক শুনে একজন আমার বয়সি যুবক বেরোল। মাথা ন্যাড়া দেখে বুঝলুম, নকুলবাবুর শ্রাদ্ধশান্তি চুকে গেছে। মফস্বলের খবর কলকাতার কাগজের হাতে পৌঁছতে দেরি হয়। সম্প্রতি বলে যে ঘটনা ছাপা হয়, তা হয়তো ঘটে গেছে এক-দু’সপ্তাহ আগে। মুরারিবাবুও এমন অস্পষ্টভাষী মানুষ, ওঁর কথা শুনে মনে হচ্ছিল, সদ্য ঘটনাটি ঘটেছে।
যুবকটি অবাক চোখে আমাদের দেখছিল। শের আলি বলল, “কর্নিলসাব, ইয়ে ঠাকুরমেশার ভাই আছে। আপলোগ বাতচিত কিজিয়ে। ম্যায় গাড়িকা পাশ ইন্তেজার করুঙ্গা!”
সে চলে গেলে যুবকটি বলল, “আপনারা কোত্থেকে আসছেন স্যার?”
কর্নেল বললেন, “কলকাতা থেকে। মুরারিবাবুর সঙ্গে একটু দরকার আছে।”
যুবকটি খাপ্পা হয়ে গেল হঠাৎ।”মুরারিদাকে নিয়ে পারা যায় না! ওঁর মাথায় কী করে যে ঢুকে গেছে, সোনার মোহর-ভরা ঘড়া পোঁতা আছে কর্তাবাবার ভিটেয়! স্যার, আপনারা বুঝতে পারেননি মুরারিদার মাথায় ছিট আছে?”
কর্নেল অমায়িক হেসে বললেন, “তোমার নাম কী ভাই?”
“বীরেশ্বর…” বলেই সে চেঁচিয়ে উঠল, “অ্যাই মুরারিদা, ওখানে কী করছ? দেখছেন পাগলের কারবার?” সে তেড়ে গেল।
একটু তফাতে একটা ঝাকড়া গাছ। তার উঁচু ডালে ঠ্যাং ঝুলিয়ে বসে মুরারিবাবু উলটোদিকে ঘুরে কী যেন দেখছিলেন। মুখ ঘুরিয়েই আমাদের দেখতে পেলেন। সঙ্গে-সঙ্গে সেই বিদঘুঁটে খাক হেসে হনুমানের মতো চমৎকার নেমে এলেন, পরনে পাঞ্জাবি-ধুতি এবং ধুতির কেঁচা পকেটে গোঁজা! গাছটার তলায় জুতো রাখা ছিল। পা গলিয়ে পরে সহাস্যে এগিয়ে এলেন নমস্কার করতে-করতে। “এসে গেছেন! নকুলদা বলেছিল, আমার কিছু হলেই খবর দিবি। ঠিকানাও নিজের হাতে লিখে দিয়েছিল। কিন্তু যাব কী করে? যেতে দিলে তো? সাত দিন স্যার, সাত-সাতটা দিন বন্দী!… এই বিরুটাকে অ্যারেস্ট করা উচিত। আমাকে সাত দিন আটকে রেখেছিল। …এও স্যার তিনের খেলা। তিন সাতে একুশ..দুইয়ের পিঠে এক একুশ… এবার দেখুন, দুই প্লাস এক ইজ ইকোয়াল টু থ্রি-অ্যাই বিরু! অমন করে তাকাবিনে! ইনি কে জানিস?”
বিরু রাগতে গিয়ে একটু হেসে ফেলল। “কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারছেন তো আপনারা?”
মুরারিবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, “শাট আপ! তুই সেদিনকার হাফপেন্টুল-পরা ছেলে। তুই কী বুঝিস? আসুন স্যার, আমার ডেরায় আসুন।”
বিরু বলল, “মুরারিদার কোনো কথা আপনারা বিশ্বাস করবেন না স্যার! ওঁর পাল্লায় পড়েই দাদা মার্ডার হয়ে গেল। সোনার মোহর-ভরা ঘড়ার লোভে না পড়বে, না মার্ডার হবে।”
সদর-দরজা খুলে থান-পরা এক মহিলা উঁকি দিচ্ছিলেন। বললেন, “ঠাকুরপো, জিজ্ঞেস করো তো উনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নাকি?”
চমকে উঠেছিলুম। কর্নেল টুপি খুলে বিলিতিভাবে মাথা একটু নামিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, ম্যাডাম। আমিই।”
সেই মুহূর্তে একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল, কর্নেল টুপি খুলতেই টাক ঝকমকিয়ে উঠেছিল এবং সেই টাকে একটা ছোট্ট ঢিল এসে পড়ল। কর্নেল টাকে হাত দিয়ে দ্রুত ঘুরলেন। উলটো দিকে একটি একতলা বাড়ির ছাদে বছর দশ-বারো বছরের একটি ছেলে জিভ দেখিয়ে ভো-কাট্টা হয়ে গেল।
বিরু চেঁচিয়ে বলল, “দাঁড়া, মজা দেখাচ্ছি।”
মুরারিবাবু দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “বাপের আশকারা পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করেছে। মারব এক থাপ্পড়!… এসো এবার ‘ঘুড়ি আঁটকে গেছে জ্যাঠাকমশাই, পেঁড়ে দিন’ বলতে।… তিন তিরেক্তে নয়, নয়-নয়ে একাশি দেখিয়ে দেব।”
নেপথ্যে আওয়াজ এল, “ব্যা-ব্যা-অ্যাঁ!”
অমনি কর্নেল ফিক করে হেসে বললেন, “ব্যা-করণ!”
মুরারিবাবু বাড়িটার চারপাশে ছুটোছুটি শুরু করলেন। দুর্বোধ্য কীসব কথাবার্তা। বিরুর বউদি গম্ভীরমুখে বললেন, “ছেড়ে দিন। আপনারা ভেতরে আসুন। ঠাকুরপো, ওঁদের নিয়ে এসো।”
ভেতরে একটুকরো উঠোন। কুয়োতলা। উঁচু বারান্দা। একটা ঘর খুলে দিলেন বিরুর বউদি। বিরু বলল, “বসুন স্যার! দাদার ঘর। বাইরে বসার ঘরটা মুরারিদাকে থাকতে দিয়ে গেছে দাদা।”
ঘরের ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেলুম। কর্নেলের মুখেও বিস্ময় ফুটে উঠল। ঘরভর্তি পুরোনো বই-পত্রপত্রিকা, তাক এবং আলমারিতে বিচিত্র গড়নের সব পুতুল, পাথরের টুকরোয় খোদাই-করা আঁকিবুকি। কর্নেল বললেন, “এ তো দেখছি প্রত্নশালা! বিরু, তোমার দাদা কী করতেন?”
বিরু বলল, “দাদার ওই এক বাতিক ছিল স্যার! কোত্থেকে সব কুড়িয়ে এনে জড়ো করতেন। স্কুলে মাস্টারি করতেন। মাস্টারি ছেড়ে বাতিক আরও বেড়ে গিয়েছিল। সারাদিন জঙ্গলে ঢিবিতে ঘুরে বেড়াতেন টোটো করে। আর রাজ্যের যত উদ্ভুট্টে জিনিস কুড়িয়ে আনতেন।”
কর্নেল ঘুরে-ঘুরে সব দেখছিলেন। মুখে বিস্ময় আর তারিফের ছাপ। বিড়বিড় করছিলেন আপনমনে।”..শিলালিপি! …দাঁতের জীবাশ্ম! …বুদ্ধমূর্তি, নাকি শিব… আশ্চর্য! বড় আশ্চর্য! এমন ব্যক্তিগত সংগ্রহ কোথাও দেখিনি! …মাই গুডনেস! এ তো কুষান মুদ্রা! …ব্রোঞ্জের যক্ষিনী…তাম্রশাসন…”।
বাইরে থেকে ডাক এল, “ঠাকুরপো!”
বিরু চলে গেল। কর্নেল বললেন, “জয়ন্ত! বুঝতে পারছ কিছু?”
বললুম, “হ্যাঁ, আপনার মতোই কুড়ুনে স্বভাবের লোক ছিলেন। তবে আপনি আবার রহস্যভেদীও। আর এই নকুলবাবু রহস্যভেদী ছিলেন না, এই যা।”
“না জয়ন্ত! রহস্যভেদ করতে গিয়েই প্রাণে মারা পড়েছেন ভদ্রলোক।”
“সোনার মোহর-ভরা ঘড়ার রহস্য।”
“উঁহু। ব্যাকরণ রহস্য।” বলে কর্নেল এতক্ষণে চেয়ারে বসলেন।
এইসময় মুরারিবাবু হন্তদন্ত এসে ঢুকলেন। তক্তাপোশে পাতা বিছানায় ধপাস করে বসে বললেন, “পালিয়ে গেল বাঁদরটা! বিষ্ণুবাবুর ঘরে এই এক অবতার। তিন তিরেক্কে দেখিয়ে ছেড়ে দিতুম।”
কর্নেল একটু হেসে বললেন, “ছেলেটি বেশ।”
“বেশ? বিচ্ছু! বাঁদর!” মুরারিবাবু বললেন। “গাছে-গাছে ঘোরে। দালানের মাথায়-মাথায় ছোটে। দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যায়, স্যার!…” বলে খ্যাক করলেন। “তবে আমারই ট্রেনিং, বুঝলেন? একদিন ঘুড়ি আটকে গেছে গাছের ডগায়, করুণ মুখে তাকিয়ে আছে। আমাকে দেখে কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল, জ্যাঠাকমশাই, আপনি তো গাছে চড়তে পারেন, দিন না ঘুড়িটা পেড়ে। ….পেড়ে দিলুম। তারপর ট্রেনিং দিতে শুরু করলুম। …একদিন স্যার নকুলদা বলল, মুরারি, তুমি তো বেশ গাছে চড়তে পারো দেখেছি। বললুম, হুঁ, পারি। বলে কী, তোমাদের দেউড়ির মাথায় চড়তে পারবে? …না স্যার! কড়িদার সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে লড়ে হেরে গেছি। কড়িদা এখানে নেই তো কী হয়েছে? চক্ষুলজ্জা বলে কথা। ..নকুলদা স্যার, বড্ড গোঁয়ার। বিষ্ণুবাবুর ছেলে ওই যে দেখলেন, … বিচ্ছু, বাঁদর…”
কর্নেল বললেন, “ছাগলও বলতে পারেন। কেমন ব্যা-অ্যা ডেকে ভেংচি কাটল!”
মুরারিবাবু কান করলেন না। “ওর ডাকনাম আবার বিট্টু…বি-টু-টু…এও তিন! তিন তিরেক্তে নয়, নয়ে-নয়ে একাশি!”
“আপনি কি নিউমারোলজিস্ট, মুরারিবাবু?”
“আজ্ঞে। একটু-আধটু চৰ্চা করি আর কি!” মুরারিবাবুর ট্রেন চলতে থাকল। “নকুলদা বিট্টুকে ঘুড়ির লোভ দেখিয়ে চড়াল। বাস্! দেউড়ির মাথায় চড়াল। …বাপ নিজের মাথায় চড়িয়েছে, নকুলদা এককাঠি সরেস। দেউড়ির মাথায় চড়াল। তারপর থেকে রোজ দেখি দেউড়ির মাথায়… শাসালুম, থাম। কড়িদা আসছে! জিভ দেখায় আর ব্যা করে। ইউ আর রাইট। পূর্বজন্মে ছাগলই ছিল।”
“আপনার এই কড়িদাটি কে?”
“তিনকড়িদা। আমার জ্ঞাতি। মহাভারত কি মিথ্যা, বলুন আপনি? কুরুক্ষেত্র কি মিথ্যা? তবে এখন যুদ্ধ কাগজে-কলমে, উকিলে-ব্যারিস্টারে…জজের সামনে। বেধে গেল লড়াই।”
“তিনকড়িবাবু থাকেন কোথায়?”
“শুনেছি জাহাজে চাকরি করে। কঁহা-হা মুল্লুক ঘোরে। সমুদ্রে মহাসাগরে। বলবেন, তা হলে মামলা কে লড়ল? …মামলা লড়ে ব্যারিস্টার। ওর ভগ্নীপতি ব্যারিস্টার। …হারিয়ে দিলে! সবই তিন তিরেক্কের খেলা সার!” মুরারিবাবু পকেট থেকে নোটবই বের করে একটা পাতা খুলে দেখালেন। “এই দেখুন! হিসেব কষে রেখেছি। আপনিই খুঁজে বের করতে পারবেন নকুলদাকে কে মারল, শিব না মানুষ? নামের ব্যাঞ্জনবর্ণগুলোই লক্ষ করুন স্যার।”
উঁকি মেরে দেখলুম, লেখা আছে :
ক+র+ন+ল+ন+ল+দ+র+স+র+ক+র=১২
১+২=৩
ন+ক+ল+শ+ব+র+ঠ+ক+র=৯
৩x৩=৯
৯/৩ = ৩
কর্নেল নোটবই ফেরত দিয়ে বললেন, “নকুলেশ্বর ঠাকুরকে এলাকায় ঠাকুরমশাই বলত কেন, মুরারিবাবু? নিছক পদবির জন্য?”
“পদবি এল কোত্থেকে?” মুরারিবাবু বললেন, “নকুলদা’র ঠাকুর্দা পর্যন্ত শিবমন্দিরের সেবাইত ছিলেন। আমার ঠাকুর্দা জমিদার আর নকুলদা’র ঠাকুর্দা জমিদারবাড়ির মন্দিরের পুজো-আচ্চা করতেন। সেই থেকেই তো এই সম্পর্ক। ঠাকুরমশাই ডাকতে-ডাকতে ঠাকুর হয়ে গেল। ঠাকু-র…তিন! নাম্বারের খেলা। অঙ্ক! অঙ্কে অঙ্কে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলছে। এক থেকে তিন…ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর…তিন থেকে তেত্তিরিশ কোটি। খালি তিনের লীলা!…তিন তিরেক্কে নয়, নয়-নয়ে একাশি!…ছাগলটা দেউড়ির মাথায় চড়েছিল, স্যার! বলল, “একাশি!..তিন দিন।” বলে মুরারি তিনটে আঙুল তুললেন।
কান ঝালাপালা! এতক্ষণে বিরুর বউদি ট্রে হাতে ঢুকলেন। কর্নেল বললেন, “এ কি! আমরা সদ্য ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়েছি।”
ভদ্রমহিলা বললেন, “একটু মিষ্টিমুখ না করলে চলে? কত ভাগ্যে আপনি এসেছেন। উনি প্রায় বলতেন, কর্নেলসায়েবকে চিঠি লিখতে হবে। উনি ছাড়া এর জট…না, না। আপনি অন্তত একটা সন্দেশ খান।” বলে বিরুর বউদি আমার দিকে তাকালেন। “তুমি, বলছি ভাই, কিছু মনে কোরো না। তুমি আমার ঠাকুরপোর বয়সি। খাও! এখানকার মিষ্টি খাঁটি ছানার। তোমাদের কলকাতার মতো সয়াবিনের ছানা নয়।”
মুরারিবাবু উসখুস করছিলেন। বললেন, “আমার এই বউদি, স্যার সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা! যেমন রূপ, তেমনি গুণ।” বলে কর্নেলের প্লেট থেকে দুটো প্রকাণ্ড সন্দেশ তুলে মুখে পুরলেন।
বিরুর বউদি বললেন, “আহা, ওই তো তোমার প্লেট! তোমাকে নিয়ে পারা যায় না!”
মুরারিবাবু প্লেট গুনলেন। “এক…দুই…তিন!…অ! আমি ভাবলুম…যাকগে! খেয়ে যখন ফেলেইছি…কর্নেলস্যারের যা বয়স, মিষ্টি খাওয়া উচিত না।” উনি নিজের প্লেটটা হাতিয়ে নিলেন এবং খাওয়ার দিকে মন দিলেন।
বিরুর বউদি আস্তে বললেন, “যেদিন রাতে উনি মারা যান, সেদিনই বেশ কয়েকবার আমাকে বলছিলেন, কর্নেলসায়েবকে চিঠি লেখা হচ্ছে না। অ্যাড্রেসটা জোগাড় করেছি। নোটবইতে লেখা আছে। যদি আমি কোনো বিপদে পড়ি তো ওঁকে খবর দিও। পরদিন তো যা মনের অবস্থা, চিঠি লিখব কী! পরের দিন লিখে বিট্টুকে দিয়ে ডাকে পাঠালাম। প্রত্যেকদিন ভাবি, আজই আসবেন। এ-এই করে করে…”
মুরারিবাবু শুনছিলেন। বললেন, “আমাকে তোমরা পর ভাবো। নকুলদা ভাগ্যিস আমাকে বলে রেখেছিল। ..হুঁ হুঁ, কী ভাবছ? এই শৰ্মাই গতকাল কলকাতা গিয়ে ওঁকে টেনে এনেছে। …ওই বিরুটা! বিরুটা আমাকে ঘরে তালা আটকে সাতদিন…সাতটা দিন বন্দী করে রাখল। তারপর আর এ-ঘরে ঢুকতে পাইনি যে নকুলদার নোটবই থেকে ঠিকানা নেব। …শেষে পরশুদিন নোটবইটা বিট্টুকে দিয়ে হাতিয়ে…এই দ্যাখো!” বলে পকেট থেকে সেই নোটবইটা বের করলেন।
বিরুর বউদি সেটা ছিনিয়ে নিয়ে কর্নেলকে দিলেন। “দেখছ কাণ্ড? তাই খুঁজে পাচ্ছি না কাল থেকে। বেরোও! বেরোও বলছি ঘর থেকে! পাগলামির একটা সীমা থাকা উচিত।”
মুরারিবাবু বললেন, “উপকার করলে এই হয় সংসারে। ঠিক আছে। তিন কাপ চা দেখছি। অঙ্ক কষলেই এক কাপ আমার। খেয়েই বেরোচ্ছি। আর তোমাদের ত্রিসীমানায় আসব না।”
“হুঁ, গাছে চড়ে বসে থাকোগে!” বিরুর বউদি বললেন, “ওদিকে উনি মার্ডার হয়েছেন, এদিকে একে নিয়ে ঝামেলা। সামলানো কঠিন। শেষে বুদ্ধি করে বিরু আটকে রাখল ঘরে।…ঠাকুরপো! শোনো তো!”
বিরু বারান্দা থেকে বলল, “কী?”
“বিট্টুকে ডেকে নিয়ে এসো তো। ঘুড়ির লোভ দেখিও, আমার নাম করে। তা হলে আসবে।” মুরারিবাবু কেত-কোঁত করে চা গিলে বললেন, “বিরুর কম্ম নয়। আমি যাচ্ছি।”
উনি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। বিরুর বউদি বললেন, “ঠাকুরপো, তুমি যাও। মুরারি ঢিল খেয়ে রক্তারক্তি হবে।”
কর্নেল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “অবশ্য আজকাল ডাকে চিঠি যেতে খুব দেরি হচ্ছে। তাই হয়তো আপনার…তুমিই বলছি বরং… জয়ন্তকে যেভাবে তুমি বলেছ!” কর্নেল প্রায় অট্টহাস্য করলেন।
বিরুর বউদি বললেন, “না, না। আপনি আমার বাবার বয়সি। তুমিই বলুন।”
“তোমার নাম কী মা?”
“রমলা।”
“তোমার স্বামী আমার কথা কবে থেকে বলতে শুরু করেন, মনে আছে?”
রমলা একটু ভেবে বললেন, “আজ ৯ এপ্রিল। উনি মার্ডার হন ২৮ মার্চ।..হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ১৭ মার্চ রাতে, তখন প্রায় দশটা বাজে, বাড়ি ফিরলেন। কেমন যেন চেহারা…খুব ভয় পেলে যেমন দেখায় মানুষকে। …তো এমনিতে খুব কম কথা বলতেন। জিজ্ঞেস করলুম, কী হয়েছে? বললেন, কিছু না। শরীরটা ভালো না। সেই রাতে হঠাৎ বললেন, একটা ধাঁধায় পড়েছি। কর্নেলসায়েবকে চিঠি লিখব। তারপর আপনার পরিচয় দিলেন। কিন্তু ধাঁধাটা কী, কিছুতেই বললেন না। শুধু বললেন, আমার নোটবইতে টুকে রেখেছি। তুমি বুঝবে না।”
কর্নেল নোটবইটার পাতা ওলটাতে থাকলেন। “হুঁ, ওঁর ডেডবডি কোথায় পাওয়া যায়?”
“ওই অলুক্ষুনে দেউড়ির নীচে।”
“কে দেখেছিল?”
“মুরারি। জ্যোৎস্না ছিল সে-রাতে। রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরছেন না দেখে মুরারি আর বিরুকে পাঠালুম। বিরু গিয়েছিল বাজারের ওদিকে লাইব্রেরিতে। ওখানে রোজই যেতেন।”
“মুরারিবাবু দেউড়ির দিকে গিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ। …দেখে এসে…একে আধপাগলা মানুষ, আরও পাগল হয়ে গেলেন। কান্নাকাটি, আবোলতাবোল কথা, ঢিল ছোঁড়াছুড়ি, যাকে সামনে পান মারতে যান, ভাঙচুর…দু’দিকে দুই বিপদ তখন।”
“আচ্ছা রমলা, তোমাকে নকুলবাবু তিন-শিংওয়ালা ছাগলের কথা বলেছিলেন?”
রমলা চমকে উঠলেন। একটু পরে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলেছিলেন মনে পড়ছে। সবাইকে জিজ্ঞেস করতেন, কেউ কখনও তিন-শিঙে পাঁঠা দেখেছে নাকি? এটা উনি মার্ডার হওয়ার ক’দিন আগের কথা। শুধু মুরারি বলল, দেখেছে। ও তো পাগল! ওর কথা! উনি আমল দেননি।”
“তুমি তিনকড়িবাবুকে চেনো?”
“একটু-আধটু চিনি। জাহাজে চাকরি করেন। বার-দুই এসেছিলেন। মুরারির জ্ঞাতি-ভাই। ওর সঙ্গে মামলা লড়ে মুরারির এই অবস্থা। তবে মামলা চলছিল তিন পুরুষ ধরে।”
“একটা দেউড়ি নিয়ে?”
রমলা অনিচ্ছায় হাসলেন। “তাই তো শুনেছি। আসলে জেদের লড়াই।”
“তিনকড়িবাবুর এখানে আর কোনো আত্মীয় আছেন?”
“আছে। করালীবাবু। এখন বাজারের ওখানে বাড়ি করেছে। ব্যাবসা করে খুব পয়সা কামাচ্ছে। তিনকড়িবাবুর কাকার ছেলে।”
“তিনকড়িবাবু কি বেঁটে, মোটাসোটা, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স?”
“বয়স জানি না। বার-দুই বিরুর দাদার কাছে এসেছিলেন। হ্যাঁ, বেঁটে। মোটাসোটা মানুষ। আপনি চেনেন ওঁকে?”
কর্নেল জবাব দিলেন না সে-কথার। বললেন, “নোটবইটাতে মুরারিবাবু খুব হাত লাগিয়েছেন, এটাই সমস্যা। এটা আমি রাখছি, রমলা!”
“রাখুন। আপনি..” রমলা ধরা গলায় বললেন, “একটা নিরীহ সাদাসিধে মানুষকে কে অমন করে মারল, কেন মারল, খুঁজে বের করুন।”
“আপনার ঠাকুরপো কী করে?”
রমলা আস্তে বললেন, “ভাইটাকে মানুষ করতে পারেননি স্কুলটিচার হয়েও। স্কুল ফাইনালে দু’বার ফেল করে এতদিনে একটা চাকরি জুটিয়েছে। ব্যারেজে হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার স্টেশন আছে। সেখানকার সিকিউরিটি গার্ড। আসলে দাদা-ভাই দুজনেই একটু গোঁয়ার, জানেন? দাদা তো কার সঙ্গে ঝগড়া করে স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভাই কবে না একই পথ ধরে। আমার হয়েছে জ্বালা!”
“তা হলে নকুলবাবু রিটায়ার করেননি?”
“না। ভেতরে-ভেতরে খুব রাগী আর জেদি মানুষ ছিলেন। আত্মসম্মানবোধ ছিল ভীষণ। তবে বাইরে থেকে বোঝা যেত না। খুব ভদ্র আর…”
“নিরীহ বলছিলেন?”
রমলা জোর দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। একটা পোকা মারতে হাত কাঁপত। তবে রাগ হলে মুখের ওপর স্পষ্ট কথা বলে দিতেন। এ জন্যই রূপগঞ্জে ওঁকে কেউ পছন্দ করত না। আর ওই এক স্বভাবতর্ক! পণ্ডিতি তর্ক।”
কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, “শুনলুম, লোকে বলছে, শিবমন্দিরের ত্রিশূলে রক্তের দাগ ছিল। বডিতে তিনটে ক্ষত ছিল। তোমার কী ধারণা?”
রমলা ঠোঁট কামড়ে ধরে বললেন, “উনি নাস্তিক মানুষ ছিলেন। সেজন্য ওসব রটানো হয়েছে। আর ত্রিশূলে রক্তের দাগ? মিথ্যা। সিঁদুর মাখিয়ে দিয়েছে কেউ।”
“পুলিশ কী বলছে?”
“পুলিশ ত্রিশূলের লাল দাগ তুলোয় মাখিয়ে টেস্ট করতে পাঠিয়েছে। রোজ থানায় গিয়ে খোঁজ নিই। বলে, এখনও কলকাতা থেকে রিপোর্ট আসেনি।”
কর্নেল উঠলেন। “চলি। আমি আছি ইরিগেশন বাংলোয়। দরকার হলে বিরুকে দিয়ে খবর পাঠিও।”
রমলা ব্যস্তভাবে বললেন, “বিট্টুকে খুঁজতে গেল ওরা। চিঠিটা ডাকে দিয়েছিল কি না…”
“থাক। ও-নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই।”….
ঘিঞ্জি গলি দিয়ে বাজারে পৌঁছে দু’জনে থমকে দাঁড়ালুম। শের আলি এবং তার জিপটা নেই। সামনে একটা চায়ের দোকান থেকে একটি ছেলে এসে বলল, “শের আলি বোলা, উও দেখিয়ে সাব! মহিলার সিংকা গ্যারিজ..উহা চলা যাইয়ে। উও দেখিয়ে শের আলি খাড়া হ্যায়!”
বললুম, “হঠাৎ গ্যারেজে কেন?”
কর্নেল কিছু বললেন না। হনহন করে এগিয়ে চললেন। রাস্তায় প্রচণ্ড ভিড়। বাঙালি-বিহারি চেনা কঠিন। দুই রাজ্যের সীমানাবর্তী শহরে এই এক জগাখিচুড়ি।
শের আলি দৌড়ে এল। মুখ উত্তেজনায় লাল। “হারামিলোগোকা খাসিয়ত এইসা হো গেয়া, কর্নিলসাব! দো চাক্কা ফাসা দিয়া, ঔর কারবুরেটর জ্যাম কর দিয়া! চাকু চালায় ইঞ্জিনকি অন্দর! তার উরভি কাট দিয়া। কম-সে-কম তিন-চার ঘণ্টে লাগেগি! ম্যায় কা কুঁরু? দেখনে সে তো কলিজা ফাসা দেতা।”
কর্নেল একটু হাসলেন। “ঠিক আছে। তুমি এখানেই অপেক্ষা করো। আমরা আর একটু ঘুরে আসি।”
একটা সাইকেল-রিকশা দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন, “শিউজিকো পুরানা মন্দির দর্শন করে ভাই! চলো!”
রিকশায় বসে বললুম, “ব্যাপারটা রহস্যময়!”
“হ্যাঁ। ব্যাকরণ রহস্যের অবস্থা জমজমাট হয়ে উঠল।” কর্নেল বললেন। “তবে এখন আমার ভাবনা আর মুরারিবাবুর জন্য হচ্ছে না। হচ্ছে হালদারমশাইয়ের জন্যে!”
সঙ্গে-সঙ্গে হালদারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। বললুম, “সত্যিই কি মুরারিবাবুকে উনি ফলো করে এতদূর এসেছেন? বিশ্বাস হয় না।”
কর্নেল পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। বললেন, “ভোর ছ’টায় মর্নিং ওয়াকে বেরনোর সময় গেটের বাইরে একটা কাটাগাছে এটা আঁটা ছিল, চোখে পড়ার মতো জায়গায়। তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলুম।”
চিরকুটে লাল ডটপেনে লেখা আছে :
পাতিঘুঘু বলিদান
বুড়োঘুঘু সাবধান
বললুম, “সর্বনাশ! হালদারমশাই তা হলে অলরেডি…”
কর্নেল আমার হাত থেকে চিরকুটটা ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, “কলকাতা থেকে রূপগঞ্জ থানায় ট্রাঙ্ককলে অলরেডি জানানো হয়েছে। গতকাল এখানে উনি পৌঁছনোর আগেই পুলিশ সতর্ক থাকার কথা। স্বয়ং ডাইরেক্টর জেনারেল অব পুলিশের নির্দেশ। তবু কিছু বলা যায় না।”
শেষ বাক্যটি শুনে বুকটা ধড়াস করে উঠল।
