দুই
কর্নেল আতশ কাঁচে বিজ্ঞাপনের ছবি আর সেই ফোটোটা আরও কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর এদিনের আরও কয়েকটা ইংরেজি ও বাংলা খবরের কাগজ খুলে বিজ্ঞাপনগুলো দেখার পর বললেন, — নাঃ! পীতাম্বর রায় শুধু তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় দীপুর ছবিসহ বিজ্ঞাপনটা দিয়েছেন।
বললুম, –কিন্তু শুধু একটা কাগজে কেন? নিখোঁজ দীপুর জন্য যিনি দশ হাজার টাকা পুরস্কার দিতে চান, তাঁর পক্ষে অন্য কাগজেও বিজ্ঞাপন দেওয়া উচিত ছিল। … অন্তত একটা ইংরেজি কাগজেও বিজ্ঞাপন দেওয়া উচিত ছিল না কি?
কর্নেল সায় দিলেন, — অবশ্যই ছিল।
বলে তিনি একটু হাসলেন, –এমন হতে পারে, পীতাম্বর রায় ধরেই নিয়েছেন, বহুলপ্রচারিত এবং জনপ্রিয় একটা বাংলা কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়াই যথেষ্ট।
–আমার আরও একটা ব্যাপারে অবাক লাগছে কর্নেল!
–বলো!
–রায়গড়েও নিশ্চয়ই দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা যায়।
–যাওয়া স্বাভাবিক। তবে এদিনের কাগজ সেখানে পৌঁছুতে বিকেল হয়ে যাওয়া কথা।
–না আমি বলতে চাইছি, দীপুর বাবা আর তার বন্ধু কৃষ্ণকান্তবাবু কলকাতা আসার পথে কি খবরের কাগজ পড়েনি? বিশেষ করে দৈনিক সত্যসেবকের মতো জনপ্রিয় কাগজ!
–পড়েননি। অথবা পড়লেও বিজ্ঞাপনটা তাদের চোখ এড়িয়ে গেছে। তা না হলে কথাটা তাঁর বলতেন।
–আমার ধারণা, রায়গড়ে পৌঁছে ওঁরা সেখানকার কারও কাছে বিজ্ঞাপনের ব্যাপারটা জানতে পারবেন। কারও না কারও চোখে বিজ্ঞাপনটা পড়তে বাধ্য।
–হ্যাঁ। তুমি ঠিকই বলেছ।
বলে কর্নেল কাগজ থেকে বিজ্ঞাপনটা কেটে নিলেন এবং উলটো পিঠে পত্রিকার নাম ও তারিখ লাল ডটপেনে লিখে রাখলেন। তারপর টেবিলের নিচে ড্রয়ার থেকে একটা বড় খাম বের করে বিজ্ঞাপন, ফোটো এবং দীপুর বাবার দিয়ে যাওয়া সেই চিঠি দুটো তাতে ভরে রাখলেন।
সেই সময় আমার মাথায় একটা প্রশ্ন জাগল। বললুম, — আচ্ছা কনেল, এই বিজ্ঞাপনদাতা পীতাম্বর রায় দীপুর বাবা কুমুদবাবুর কোনও আত্মীয় নন তো? হয়তো কুমুদবাবুর কাছে কোনও সুত্রে খবর পেয়ে তিনি বিজ্ঞাপনটা দিয়েছেন!
কর্নেল খামটা টেবিলের ড্রয়ারে ঢোকাচ্ছিলেন। বললেন, –কিন্তু পীতাম্বর রায় বিজ্ঞাপনে দীপুকে দীপককুমার রায় করেছেন। এদিকে কুমুদবাবুর ছেলে দীপুর নাম সুদীপ্ত ভট্টাচার্য বা সুদীপ্তকুমার ভট্টাচার্য।
বললুম,–ধরা যাক, পীতাম্বর রায় কুমুদবাবুর আত্মীয় নন। হিতৈষী বন্ধু। সুদীপ্ত শুনতে দীপক শুনেছিলেন।
কর্নেল হাসলেন, — সাবধান জয়ন্ত! তুমি একটা গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছ। বরং আর এক পেয়ালা কফি খেয়ে ঘিলু চাঙ্গা করো!
বলে তিনি হাঁক দিলেন, –ষষ্ঠী! কফি।
একটু পরে ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল। কফি খেতে-খেতে বললাম, হালদারমশাই এতক্ষণে নিশ্চয়ই গোবরা এলাকায় গিয়ে পীতাম্বর রায়কে খুঁজে বের করে ফেলেছেন। দেখা যাক, তিনি কোন খবর আনেন।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। এতক্ষণে তুমি গোলকধাঁধা থেকে বেরুতে পেরেছ।
–তার মানে, হালদারমশাই দীপুর অন্তর্ধানরহস্য একা-একা ফাঁস করে ফেলবেন বলছেন? আপনাকে নাক গলাতে হবে না?
কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে চুপচাপ চুরুট টানতে থাকলেন।
সেই সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল চোখ না খুলে বললেন, — ফোন ধরো জয়ন্ত!
হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে সাড়া দিতেই প্রাইভেট ডিটেকটিভের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, –কর্নেলস্যার!
দ্রুত বললুম, — বলুন হালদারমশাই!
–জয়ন্তবাবু নাকি? কর্নেলস্যার কী করছেন?
–ধ্যানে বসেছেন। আপনি কোত্থেকে ফোন করছেন? অমন হাঁসস করেই বা কথা বলছেন কেন?
কর্নেল আমার হাত থেকে রিসিভার ছিনিয়ে নিয়ে বললেন,–বলুন হালদারমশাই!… হ্যাঁ।… তারপর?… বলেন কী?… আপনি বরং আমার এখানে চলে আসুন।… ঠিক বলেছেন। রাখছি।
বললুম,–কী ব্যাপার?
কর্নেল একটু হেসে বললেন,–হালদারমশাইয়ের সঙ্গে তোমার রসিকতা করার বদঅভ্যাস আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রসিকতা সঙ্গত নয়। বিশেষ করে উনি যখন রীতিমতো মল্লযুদ্ধ করে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে আমাকে টেলিফোন করছেন।
চমকে উঠেছিলুম। বললুম,–মল্লযুদ্ধ মানে?
–হালদারমশাইয়ের মুখে সে-সব কথা শুনে পাবে।
একটু বিব্রত হয়ে বললুম,–কিন্তু আমি তা কেমন করে জানব? তাছাড়া আমি ওঁর সঙ্গে কিন্তু রসিকতা করিনি।
–তোমার কণ্ঠস্বরে রসিকতার আভাস ছিল।
–সরি!
কর্নেল হেসে উঠলেন। তারপর বললেন,–না, না। সরি বলার মতো কিছু করোনি তুমি। তবে তৈরি থাকো। হালদারমশাই তোমার জন্য আর-একটা গোলকধাঁধা নিয়ে আসছেন।
গোয়েন্দাপ্রবর এলেন প্রায় মিনিট কুড়ি পরে। চোখে-মুখে উত্তেজনার ছাপ। ডানহাতের বুড়ো আঙুলে ব্যান্ডেজ বাঁধা। সোফায় ধপাস করে বসে বললেন,–ফায়ার আমর্স লইয়া যাই নাই। ভুল করছিলাম।
কর্নেল বললেন,–আগে কফি খান। তারপর ওসব কথা। ষষ্ঠী! হালদারমশাইয়ের জন্য কফি নিয়ে আয়।
এবার লক্ষ করলুম, হালদারমশাইয়ের সোয়েটারে জায়গায়-জায়গায় কালচে ছোপ। প্যান্টের নিচের দিকটা ভিজে গেছে। আঙুলে ব্যান্ডেজ। তার মানে, কারও সঙ্গে মল্লযুদ্ধটা বেশ জোরালো হয়ে গেছে।
একটু পরে ষষ্ঠীচরণ কফি রেখে হালদারমশাইয়ের দিকে আড়চোখে তাকাতে-তাকাতে চলে গেল। হালদারমশাই যথারীতি ফুঁ দিয়ে কফি পান করতে থাকলেন।
তারপর হঠাৎ খি-খি করে হেসে উঠলেন তিনি। বললেন, কী কাণ্ড! ঘুঘু দ্যাখছে, ফান্দ দ্যাখে নাই। ড্রেনে অরে ফ্যালাইয়া দুই পাঁও দিয়ে রগড়াইছি!
কর্নেল বললেন,–আগে কফি খেয়ে নিন হালদারমশাই!
গোয়েন্দামশাই এবার তারিয়ে-তারিয়ে কফি পান করতে থাকলেন। কফি শেষ হলে তিনি অভ্যাসমত একটিপ নস্যি নিলেন, তারপর যা বললেন, তা সংক্ষেপে এই :
ঘোষপাড়া লেন একটা ঘিঞ্জি গলি। দুধারে খোলা নর্দমা। গলিটা শেষ হয়েছে একটা কারখানার দেওয়ালে। ৮/১/সি নম্বরে একটা মান্ধাতা আমলের দোতলা বাড়ি। বাড়িটার দোতলায় একটা মেস আছে। মেসের তিনটে ঘরে যারা থাকে, তাদের নানারকমের পেশা। কেউ বেসরকারি অফিসের কর্মী, কেউ ড্রাইভার, কেউ খবরের কাগজের হকার। বাঙালি-অবাঙালি দুই-ই আছে। আজ রবিবারে মেসের বাসিন্দারা কে-কোথায় বেরিয়েছে। দোতলার ছাদে একটা টিনের শেডটাকা ঘরে রান্না হয়। হালদারমশাই মেসের ম্যানেজার আদিনাথ ধাড়ার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে এ সব খবর পান।
তো তিনি গেছেন পীতাম্বর রায়ের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু পীতাম্বরবাবু প্রতি শনিবার বিকেলে অফিস থেকে সোজা দেশের বাড়িতে চলে যান! সোমবার সেখান থেকে ফিরে অফিসে যান। তারপর মেসে ফেরেন সন্ধ্যাবেলায়। কোনও-কোনও দিন রাত নটাও বেজে যায়। পীতাম্বরবাবু যে ঘরে থাকেন, সেই ঘরে থাকে জনৈক রমেশ শর্মা। রমেশ কোনও ব্যবসায়ীর গাড়ির ড্রাইভার।
কথায়-কথায় হালদারমশাই পীতাম্বরবাবুর দেশের বাড়ির ঠিকানা জানতে চান। ম্যানেজার আদিনাথবাবু মেসের রেজিস্টার খুলে ঠিকানাটা লিখে দেন। তারপর হালদারমশাইয়ের চোখে পড়ে, আদিনাথবাবুর টেবিলে আজকের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা পড়ে আছে।
খবরের কাগজটা পড়ার ছলে হালদারমশাই আদিনাথবাবুকে বিজ্ঞাপনটা দেখিয়ে দিয়ে বলেন, –এ কী! পীতাম্বরবাবুর ছেলে নিখোঁজ নাকি? বিজ্ঞাপনটা দেখে আদিনাথবাবু খুব অবাক হয়ে যান। কারণ পীতাম্বরবাবু এমন একটা ঘটনার কথা তাকে জানাননি!
দুজনে যখন কথা বলছিলেন, তখন বারান্দায় কেউ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। আদিনাথবাবু টের পেয়ে তাকে ডেকে বলেন,–কী গোবিন্দ? ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছ? এখানে এসো।
কথাটা বলে আদিনাথবাবু হালদারমশাইকে ইশারায় জানিয়ে দেন, এই ছোকরা এ পাড়ার এক মস্তান। গোবিন্দ ঘরে না ঢুকে এবং কোনও কথা না বলে চলে যায়। তখন আদিনাথবাবু হালদারমশাইকে বলেন, আপনার বন্ধু পীতাম্বরবাবুর সঙ্গে এই গুণ্ডামাস্তানটার খুব ভাব। পীতাম্বরবাবুকে সতর্ক করে দিয়েছিলুম। কিন্তু কথা কানে নেননি। পীতাম্বরবাবু আপনার বন্ধু বটে, কিন্তু খুলেই বলছি, ওঁর হাবভাব আমার মোটেও পছন্দ হয় না। আমার ধারণা, পীতাম্বরবাবুর ছেলে বা ছোটভাই–যেই হোক, তার নিখোঁজ হওয়ার জন্য উনি নিজেই দায়ী।
বিচক্ষণ হালদারমশাই আর কথা না বাড়িয়ে মেসের ফোন নম্বর জেনে নিয়ে চলে আসেন। তারপর নির্জন গলিতে সেই গোবিন্দের মুখোমুখি পড়ে তার সঙ্গে পীতাম্বরবাবুর কথা তুলে ভাব জমাতে চেষ্টা করেন। তখনই ঘটে যায় অঘটন। হঠাৎ গোবিন্দ প্যান্টের পকেট থেকে একটা চাকু বের করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হালদারমশাই প্রাক্তন পুলিশ অফিসার। এমন অবস্থায় পুলিশজীবনে বহুবার পড়েছেন। তিনি গোবিন্দের পায়ে জোরে লাথি মারেন। গোবিন্দ নোংরা ড্রেনে পড়ে যায়। তারপর হালদারমশাই তার চাকুটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং দৈবাৎ তার বুড়ো আঙুলের নিচে একটু কেটে যায়। তবে চাকুটা তিনি করায়ত্ত করেছিলেন।
ততক্ষণে একজন-দুজন করে লোক জড়ো হয়েছিল গলিতে। তারা একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ঘটনাটা দেখছিল। কেউ এগিয়ে আসেনি। হালদারমশাই চলে আসার আগে গোবিন্দের মুখে জুতোসুদ্ধ চাপ দিয়ে ড্রেনের নোংরা জল আর আবর্জনায় অন্তত দুমিনিট ডুবিয়ে রেখে হনহন করে চলে আসেন। আর পিছু ফেরেননি।
সদর রাস্তায় একটা ফার্মেসিতে ব্যান্ডেজ কিনে গোয়েন্দাপ্রবর ফার্স্ট এডের ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকে তিনি কর্নেলকে ফোন করেছিলেন।
হালদারমশাই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্প্রিংয়ের চাকুটি দেখালেন। বাঁটের কাছে একটু চাপ দিতেই প্রায় চার ইঞ্চি ফলা বেরিয়ে এল। দেখেই আঁতকে উঠলুম।
কর্নেল চুপচাপ শুনছিলেন। এতক্ষণে বললেন,–পীতাম্বর রায়ের দেশের বাড়ির ঠিকানাটা এবার দিন হালদারমশাই! ঠিকানাটা সম্ভবত বর্ধমান জেলার রায়গড়।
হালদারমশাই প্যান্টের পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজটা বের করতে গিয়ে চমকে উঠলেন। তাঁর চোখদুটো গুলিগুলি হয়ে উঠল। উত্তেজনায় গোঁফের ডগা তিরতির করে কাঁপতে থাকল। তিনি বলে উঠলেন, আপনি ক্যামনে জানলেন?
কর্নেল কাগজটা নিয়ে বললেন,–নিছক অনুমান।
গোয়েন্দাপ্রবর আর-এক টিপ নস্যি নিয়ে বললেন, কী কাণ্ড!
বললুম,–এই কাণ্ডের পিছনে একটা বড়ো কাণ্ড আছে হালদারমশাই!
হালদারমশাই আমার দিকে সেইরকম গুলিগুলি চোখে তাকিয়ে বললেন,–কন কী?
কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন,–জয়ন্ত আপনাকে নিয়ে রসিকতা করছে। ওর কথায় কান দেবেন না। আপনার কাজ আপনি করে যান।
তা করব।–হালদারমশাই গম্ভীর হয়ে বললেন, পীতাম্বরবাবু অমন আনসোশ্যাল হারামজাদারে ক্যান বহাল করছেন, এই রহস্য জানা দরকার। আমি পীতাম্বরবাবুর লগে দেখা করতে গিছলাম। গোবিন্দ ক্যান শুধু এইজন্যই আমারে স্ট্যাব করার চেষ্টা করল? আমার বুদ্ধিসুদ্ধি এক্কেরে ব্যাবাক তালগোল পাকাইয়া গেছে।
–প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে আপনার তো লাইসেন্স আছে। দরকার মনে করলে আপনি পুলিশের সাহায্য নিতে পারবেন।
হালদারমশাই একটু হেসে বললেন,–পুলিশের সাহায্য আমার লাগবে না কর্নেলস্যার! আমার প্ল্যান কী, তা আপনারে জানাইয়া দিই।
–হ্যাঁ। আমাকে না জানিয়ে কিছু করবেন না যেন।
কখনও করছি কি? বলে হালদারমশাই সোয়েটারের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট্ট নোটবই বের করলেন। তারপর বললেন,–পীতাম্বরবাবুর মেসের ফোন নম্বর লইছি। কাল সোমবার রাত্রে ওনারে ফোন করব। তারপর ওনারে বলব, নিখোঁজ দীপককুমার রায়ের খোঁজ আমি পাইছি। আপনি শিগগির সাক্ষাৎ করুন। আমি ওনারে গণেশ অ্যাভেনিউয়ে আমার প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিতেই আইতে বলব।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে বললেন,–তার মানে, আপনি যে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ, তা পীতাম্বরবাবুকে জানাবেন?
–হঃ!
–বাঃ! আপনার প্ল্যানটা চমৎকার। এ ধরনের কেসে প্রাইভেট ডিটেকটিভের নাক গলানো তো স্বাভাবিক।
বললুম,–পীতাম্বরবাবু আপনার কাছে যাবেন বলে মনে হয় না!
হালদারমশাই হাসলেন,–না আইতে চাইলে অরে থ্রেটন করব। পুলিশের ভয় দেখাব।
কর্নেল বললেন, আপনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে মক্কেলের ফোটো তুলে রাখেন। তাই না? আমার দরকার পীতাম্বর রায়ের একটা ছবি।
গোয়েন্দাবর আশ্বাস দিলেন,–পীতাম্বর রায়ের ছবি আপনি পাইবেন কর্নেলস্যার! যে ভাবেই হোক, অরে মিট করব। ছবিও তুলব।
–ওঁদের মেসের ফোন নাম্বারটা আমাকে দিন।
হালদারমশাই নোটবই থেকে নাম্বারটা কর্নেলকে দিলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, বর্ধমান জেলার রায়গড়ের নাম কইলেন তখন। ব্যাপারটার এটুকখানি হিন্ট দিন কর্নেলস্যার!
কর্নেল চুরুটে কয়েকটা টান দিয়ে সেটা অ্যাশট্রেতে ঘরে নেভালেন। তারপর বললেন, আপাতত আপনাকে শুধু এটুকু জানিয়ে রাখছি, রায়গড়ে আমি বার-দুয়েক গিয়েছিলুম। প্রথমবার গিয়েছিলুম প্রায় পাঁচবছর আগে। ওখানে একটা প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ আছে। আর আছে একটা গভীর জঙ্গল। তো আমি গিয়েছিলুম আমার এক বন্ধু ডঃ দেবব্রত চট্টরাজের সঙ্গে। ডঃ চট্টরাজ কেন্দ্রীয় পুরাতত্ত্ববিভাগের একজন কর্মকর্তা। দুর্গের ধ্বংসাবশেষ খোঁড়াখুঁড়ি করে তার একটা টিম প্রাচীন ইতিহাস উদ্ধারের চেষ্টা করছিল। আপনি তো জানেন, এ বিষয়ে আমারও কিছু বাতিক আছে। যাই হোক, সেখানে গিয়ে আলাপ হয়েছিল কৃষ্ণকান্ত অধিকারী নামে একজন বড়ো ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তার হেড অফিস আসানসোলে। রায়গড়ে তাঁর পৈতৃক বাড়ি। রায়গড়ের জঙ্গলে তার সঙ্গে অনেক ঘোরঘুরি করেছিলুম। মিঃ অধিকারী তরুণ বয়সে দক্ষ শিকারি ছিলেন। তার সঙ্গে ঘুরে বিরল প্রজাতির কিছু পাখির ছবি তুলেছিলুম। পরের বছর মিঃ অধিকারী কলকাতায় নিজের কাজে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এবার আসল কথাটা বলি। ওই জঙ্গলটার নাম হাড়মটটিয়ার জঙ্গল। কারণ রাতবিরেতে ওই জঙ্গলে হাড়-মট-মট করে কোনও অদ্ভুত জন্তু অথবা ভূতপ্রেত নাকি ঘুরে বেড়ায়। এই রহস্য ফাঁস করার উদ্দেশ্যেই আমি মিঃ অধিকারীর সঙ্গে আবার রায়গড়ে গিয়েছিলুম।
হালদারমশাই কান খাড়া করে শুনছিলেন। বললেন,–হাড়মটমটির শব্দ শুনছিলেন নাকি?
কর্নেল হাসলেন,–গিয়েছিলুম মার্চ মাসে। তখন রাতবিরেতে জোরে বাতাস বয়। অনেক অদ্ভুত শব্দ শুনেছিলুম, তা ঠিক। তবে হাড়মটমটিয়ার রহস্য রহস্যই থেকে গেছে।
–পীতাম্বর রায়ের বাড়ি রায়গড়ে–আপনিই কইলেন। অরে চেনেন?
নাঃ। তবে নামটা যেন শুনেছিলুম।-বলে কর্নেল আমার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টে তাকালেন।
বুঝলুম, আমি যেন এখনই ব্যাপারটা হালদারমশাইয়ের কাছে ফঁস না করি। আমি একটা পত্রিকা পড়ার ভান করলুম।
হালদারমশাই বললেন, আমি এবার যাই কর্নেলস্যার! যেভাবে হোক, পীতাম্বর রায়েরে মিট করব। আর ছবি তুলব।
–কিন্তু এবার একটু সতর্ক থাকবেন যেন!
–হঃ। লাইসেন্সড রিভলভার আছে। সাথে রাখুম।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ সবেগে বেরিয়ে গেলেন। তারপর বললুম,–ব্যাকগ্রাউন্ডটা আপনি হালদারমশাইকে জানালেন না কেন?
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–জানালে উনি এখনই রায়গড়ে ছুটে যেতেন। আপাতত আমি পীতাম্বর রায়ের ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে চাই। কেন সে অমন বিজ্ঞাপন দিল, তা আমার জানা দরকার।
এইসময় আমার মাথায় একটা প্রশ্ন জেগে উঠল। বললুম,–আচ্ছা কর্নেল! আপনি রায়গড়ে একটা প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে প্রাচীন ইতিহাস উদ্ধারের কথা বললেন। দীপুর অন্তর্ধানরহস্যের সঙ্গে সেখানকার কোনও দামি প্রত্নদ্রব্যের সম্পর্ক নেই তো?
কর্নেল আমাকে চমকে দিয়ে বললেন,–আছে। সম্ভবত সেটাই বত্রিশের ধাঁধা।
