পঞ্চম পরিচ্ছেদ
ডাইনিং হলে যতক্ষণ ছিলুম, সদানন্দবাবু একেবারে নিঃশব্দে খেয়ে গিয়েছেন, একটাও কথা বলেননি। কিন্তু সেখান থেকে ঘরে ফিরে আসার পরে আর কৌতূহলটা চেপে রাখতে পারলেন না, সাবিত্রী মিত্রের উপরে হামলার ব্যাপারে মেজর গুপ্তের চেম্বারে বসে যে কথা হল, তাতে ভাদুড়িমশাইয়ের সন্দেহটা যে সরাসরি তাঁর স্বামী মাধব মিত্রের উপরে গিয়ে পড়েছে, আমার মতো তিনিও সেটা স্পষ্ট আঁচ করে থাকবেন, শুধু অজানা একটা শব্দ নিয়ে সম্ভবত একটু ধাঁধায় ছিলেন, তাই ঘরে ঢুকবার পরমুহূর্তেই দরজার ছিটকিনিটা তুলে দিয়ে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ব্লুবেয়ার্ড ব্যাপারটা কী মশাই?”
উত্তর না-দিয়ে প্রশ্ন করলুম, “কথাটা আগে শোনেননি?”
সদানন্দবাবু বললেন, “অফ কোর্স শুনিচি। কৌশিক ওদের কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাটে বসে সেদিন বলেছিল। কিন্তু ওর মানেটা কী, ভাদুড়িমশাই সেটা বলবার আগেই মাধব মিত্তির এসে গেলেন। ফলে কথাটাও তখনকার মতো চাপা পড়ে গেল, মানেটাও জানা হল না। তা আজ আবার কথাটা উঠল কেন? ওটা কী?”
বললুম, “কী নয়, কে। ব্লুবেয়ার্ড এক ফরাসি জমিদার। বয়েস যা-ই হোক, চেহারা একেবার রূপকথার রাজপুত্তুরের মতন, এদিকে আবার কথাবার্তাও দারুণ মিষ্টি, ফলে কাণ্ডটা যে কী হত, সে তো বুঝতেই পারছেন।”
“না, বুঝতে পারচি না। কী হত?”
“বাঃ, এটাও বুঝতে পারলেন না? মেয়েরা সব পটাপট তার প্রেমে পড়ে যেত। কিন্তু তার ফল মোটেই ভাল হত না।
“কেন, এতে খারাপ হবে কেন?”
“হবে না?” হেসে বললুম, “সদানন্দবাবু, জীবনটা তো আর রূপকথা নয়, তাই ‘অতঃপর তারা সুখে দিন কাটাতে লাগল’, সব গল্পের শেষটা মোটেই এমন হয় না। আসলে, দেখতে যতই সুন্দর হোক আর কথাবার্তা যতই মিষ্টি হোক, ভিতরে-ভিতরে লোকটা ছিল একেবারে হাড়ে বজ্জাত টাইপের। লোকটা বিয়ে করত হবু বউয়ের সম্পত্তির লোভে, আর বিয়ের পরেই সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়ে বউটাকে মেরে ফেলত।”
“বলেন কী!” সদানন্দবাবু একেবারে আঁতকে উঠলেন।
বললুম, “ঠিকই বলছি। তা পাপ কি কখনও চাপা থাকে? মানে কিছুদিনের জন্যে থাকে হয়তো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর থাকে না। একদিন-না-একদিন পাপী ঠিকই ধরা পড়ে যায়।”
“এই যেমন মাধব মিত্তির আমাদের ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে এবারে ধরা পড়তে চলেচেন। কী মশাই, ঠিক বলিনি?”
হেসে বললুম, “সেটা আর আমার মুখে শুনতে চাইছেন কেন, ভাদুড়িমশাইয়ের কাছ থেকেই জেনে নেবেন।”
“তাঁর কাচে আর জানতে পারচি কোতায়?” সদানন্দবাবু ঠোঁট টিপে হেসে বললেন, “তিনি তো তাঁর ঘরের দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে চিন্তাভাবনা করচেন। খুব সম্ভব একটা প্ল্যান আঁটচেন, মাধব মিত্তিরকে যাতে একেবারে হাতে-নাতে ধরে ফেলা যায়। ওই যাকে ইংরিজিতে ‘কট রেডহ্যান্ডেড’ বলে আর কী। পুলিশকে বোধহয় খবর-টবর দিয়ে একেবারে তৈরি থাকতে বলচেন, তাই না?”
“সে কি ওঁকে জিজ্ঞেস না করে বলা যায়?”
“ঠিক আচে, বলবেন না। এখন তা হলে ওই ব্লুবেয়ার্ডের কথাটাই বলুন দিকি। ব্লুবেয়ার্ড ধরা পড়ল?”
“ধরা পড়ল, ফাঁসিও হল।”
“উপযুক্ত শাস্তি হয়েচে। যেমন কর্ম, তেমনি ফল। তা এই ফাঁসির খবর কাগজে বেরিয়েছিল?”
“তা কী করে জানব।” হেসে বললুম, “ফ্রান্সে তখন খবরের কাগজ বলে কিছু ছিল কি না, তা-ই তো জানি না।”
“তার মানে? এটা কবেকার ব্যাপার?”
“ফাঁসির কথা বলছেন তো? ওটা হয়েছিল ১৪৪০ সালে। তারপরে তো সাড়ে পাঁচশো বছর কেটে গেল। তবে হ্যাঁ, লোকে যে আজও রুবেয়ার্ডের কথা ভুলে যায়নি, তার কারণ, লোকটাকে নিয়ে সেই সময়ে আর তার পরেও বিস্তর ছড়া লেখা হয়েছিল। শুধু ফ্রান্সে নয়, ছড়া লেখার ধুম পড়ে গিয়েছিল ইউরোপের অন্য-সব দেশেও। তাতে কেউ বলছেন, ব্লুবেয়ার্ডের একটা জমিদারি ছিল বটে, কিন্তু আসলে সে ছিল ডাকাত। আবার কেউ বলছেন, চেহারাটা মানুষের হলে কী হয়, লোকটা ছিল রাক্ষস, কচি-কচি মেয়েদের ধরে গপ করে গিলে ফেলত। ইংল্যান্ডেও এই রকমের একটা ছড়া রয়েছে, সেটা শুনিয়ে দুষ্টু ছেলেদের ঘুম পাড়ানো হয়। সেও ব্লুবেয়ার্ডকে নিয়ে লেখা।”
সদানন্দবাবু একেবারে হাঁ করে আমার কথা শুনছিলেন। আমি চুপ করতে বললেন, “ছেলেবেলায় আমার এক দূর-সম্পর্কের পিসি আমাকে হরিমতী রাক্ষুসির গল্প বলে ঘুম পাড়াতেন। তা এও তো দেখছি সেই রকমের নররাক্ষস। বাপ রে বাপ, ধরত আর গিলে ফেলত! কী ভয়ংকর ব্যাপার!”
হেসে বললুম, “দূর মশাই, ও-সব রাক্ষস-টাক্কস স্রেফ গাঁজাখুরি কথা। মানুষ কখনও রাক্ষস হয় নাকি? না না, ব্লুবেয়ার্ড রাক্ষস-টাক্কস ছিল না, তবে বউগুলোকে মেরে ফেলত ঠিকই। চার্লি চ্যাপলিনের বই ‘মঁসিয়ে ভেদু” দেখেছেন?”
“তা দেকিচি।”
“তা হলে জেনে রাখুন, মঁসিয়ে ভের্দুর চরিত্রটা স্রেফ চ্যাপলিনের কল্পনা থেকে গজায়নি। তবে হ্যাঁ, গরিব ভের্দু যে বড়লোকের বিধবাদের বিয়ে করে তারপর তাদের মেরে ফেলবার প্ল্যান এঁটেছিলেন, সেটা স্রেফ নিজের সংসারটাকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে। ব্লুবেয়ার্ডের মতো নিষ্ঠুর কিংবা নির্বিবেক তিনি ছিলেন না।”
“ব্লুবেয়ার্ড নামটা কোত্থেকে হল মশাই?”
“লোকটার দাড়ি থেকে।” হেসে বললুম, “দাড়িটা ছিল নীলচে রঙের। তার থেকে ওই নাম।” শুনে কিছুক্ষণ থম মেরে রইলেন সদানন্দবাবু। তারপর বললেন, “মাধব মিত্তিরের দাড়ির রং যে কী রকম, তা তো বোঝবার জো নেই, চুলে যেমন কলপ লাগায়, দাড়িও তেমন পরিষ্কার করে কামানো। তা হাজতে পুরলে তো আর দাড়ি কামাবার সুযোগ পাবে না, তখন নির্ঘাত নীল দাড়ি গজিয়ে যাবে, কী বলেন?”
এর আর কী উত্তর দেব। বললুম, “দশটা বাজতে চলল, এবারে শুয়ে পড়ুন। কাল সকালে বরং এই নিয়ে আবার আলোচনা করা যাবে।”
২
সকাল-সকাল শুয়ে পড়েছিলুম বটে, কিন্তু সাতটার আগে ঘুম ভাঙেনি। না আমার, না সদানন্দবাবুর। মুসৌরির রাস্তায় একলা বেরিয়ে প্রথম দিনেই সদানন্দবাবুর যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটা খুব মধুর নয়। সম্ভবত সেইজন্যেই আজ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও উনি মর্নিং ওয়াক করতে বেরোননি। অভ্যাসমতন শেষ রাত্তিরে ওঁর ঘুম একবার ভেঙেছিল হয়তো, কিন্তু তারপরেই আবার কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
ভদ্রলোক অবশ্য ভাঙেন তবু মচকান না। তাই ‘কী মশাই, আপনি তো আর্লি রাইজার, তা হলে এত ঘুমোচ্ছেন কেন,’ এই প্রশ্ন করতে উত্তর দিলেন, “কালপ্রিট যখন ধরা পড়েছে, তখন আমাদের কলকাতায় ফিরতেও নিশ্চয় দেরি হবে না, তাই ভাবছিলুম যে, মর্নিং ওয়াক না-করে বরং শেষ দু-একটা দিন একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক।”
মুখ-হাত ধুয়ে পাশের ঘরে ফোন করতে ভাদুড়িমশাই জানালেন, তাঁর ব্রেকফাস্ট খাওয়া হয়ে গেছে।
“আমরা তা হলে কী করব?”
“কী আর করবেন, ডাইনিং হল-এ গিয়ে আপনারাও আপনাদের ব্রেকফাস্ট খেয়ে নিন। আর হ্যাঁ, রুম-সার্ভিসে ডায়াল করে কাউকে পাচ্ছি না, তাই এক কাজ করুন, আপনারা তো ডাইনিং হল-এ যাচ্ছেনই, ওখানে গিয়ে ওদের বলে দিন যে, আমার ঘরে যেন তাড়াতাড়ি এক পট চা পাঠিয়ে দেয়। ফর টু।”
“দুজনের জন্যে কেন?”
“এক ভদ্রলোক এসেছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলছি।”
“তা হলে কি ব্রেকফাস্ট খেয়ে আপনার ঘরে যাওয়া আমাদের পক্ষে ঠিক হবে?”
“কিচ্ছু বেঠিক হবে না।” ভাদুড়িমশাই হাসলেন। “নটা নাগাদ আমার ঘরে চলে আসুন। আমাদের কথা তার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।”
ন’টা নয়, আরও আধ ঘন্টা সময় দিয়ে, সাড়ে ন’টা নাগাদ ভাদুড়িমশাইয়ের ঘরে গিয়ে ঢুকলুম। যাঁর সঙ্গে তাঁর কথা হচ্ছিল, তখনও তিনি চলে যাননি। ভদ্রলোকের পরনে হালকা ছাই রঙের ট্রাউজার্স আর নেভি-ব্লু ঢোলা সোয়েটার। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। নাকের নীচে আজকাল যে-রকমের গোঁফ রাখবার ফ্যাশন আবার ফিরে এসেছে, সেই হ্যান্ডল-বার গোঁফ। বয়স মনে হল বছর পঁয়ত্রিশের বেশি হবে না। আমরা গিয়ে ঘরে ঢুকতে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ভাদুড়িমশাইকে বললেন, “বাড়ির ফোন-নাম্বারটাও দিয়ে গেলুম। আপিসে যদি না পান তো বাড়িতে ডাকবেন।”
“ডাকলেই চলে আসবেন তো?”
“অফ কোর্স। আসাই তো আমার কাজ। তবে কিনা আগে যা বলেছি, তা আবারও বলছি, মিঃ ভাদুড়ি। আমার ধারণা, আপনি যা ভাবছেন, তা ঠিক নয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক না হলে তো আমিই সবচেয়ে খুশি হব। যা-ই হোক, লেট আস ওয়েট অ্যান্ড সি।”
ভদ্রলোক বিদায় নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর এক মুহূর্তও দেরি না করে সদানন্দবাবু বললেন, “ইনি আবার কে? এখানে এর আগে দেকিচি বলে তো মনে পড়চে না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সঞ্জীব চতুর্বেদী।”
“বেড়াতে এসে এই হোটেলে উঠেছেন?”
আমি বললুম, “দূর মশাই, ভদ্রলোক যা বললেন, তা কি আপনি শোনেননি নাকি?”
“কী বললেন?”
“বললেন যে, ভাদুড়িমশাই যদি আপিসে না পান তো বাড়িতে ফোন করলে ওঁকে পাওয়া যাবে। তার মানে উনি লোক্যাল ম্যান, ওঁর বাড়িও এখানে, আপিসও এখানে।”
“অ।” সদানন্দবাবু বললেন, “তা ওর সঙ্গে কি আগে থাকতেই ভাদুড়িমশাইয়ের পরিচয় ছিল, নাকি সেটা এখানে এসে হয়েচে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখানে এসে হয়েছে। ভোরবেলায় জগিং করতে বেরিয়েছিলুম তো, তখন আলাপ হল। উনিও জগিং করতে বেরিয়েছিলেন।
“এই পোশাকে উনি জগিং করতে বেরিয়েছিলেন?” প্রশ্নটা সদানন্দবাবুর।
“আরে না মশাই,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “জগিং শেষ হবার পর এক কাপ কফি খাওয়াবার জন্যে জোর করে ওঁর বাংলোয় ধরে নিয়ে গেসলেন। সেখানে পোশাক পালটে ওঁরই গাড়িতে করে আমাকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে গেলেন।”
বললুম, “বয়েস তো খুবই কম। কী করেন উনি?”
“চাকরি করেন। বদলির চাকরি। বছর দুয়েক হল এখানে রয়েছেন, আরও বছরখানেক থাকবেন হয়তো, তারপরেই নাকি ট্রান্সফার।”
সদানন্দবাবু বললেন, “কাল রাত্তিরে তো দুটো ফোন আসবার কথা ছিল আপনার। ওই মানে যার জন্যে আপনি খেতে পর্যন্ত গেলেন না। তা ফোন দুটো এসেছিল?”
“এসেছিল।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু ও-সব কথা বাদ দিয়ে এখন এই দুটো জিনিস একবার দেখুন দেখি।”
সুটকেস খুলে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ বার করলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর সেই ব্যাগ থেকে খুব সাবধানে দুটো পাথরের টুকরো বার করে সেন্টার টেবিলের উপরে রেখে বললেন, “চিনতে পারেন?”
বললুম, “না।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আমি বলব?”
“বলুন।”
“মুঠিয়ার মন্দিরের পাশে যে পাথরের টুকরোগুলো পড়ে ছিল, তার থেকে দুটো টুকরো তুলে আপনাকে পকেটে পুরতে দেখেছিলুম। মনে হচ্চে, এই দুটোই সেই দুটো।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “শাবাশ। পাহারাদারকে ফাঁকি দিলেও আপনার চোখকে দেখছি ফাঁকি দেওয়া যায়নি। নিন, এখন পাথর দুটোকে উলটে দেখুন ওতে কী খোদাই করা রয়েছে।”
উলটে দেখলুম, নাগরী হরফে একটায় খোদাই করা রয়েছে ‘লপ’ আর অন্যটায় ১৮১৬। সদানন্দবাবু হিন্দি পড়তে পারেন না, নাগরী লিপি তিনি চিনতে পারেননি। বললেন, “এগুলো আবার কী?”
ভাদুড়িমশাই ব্যাপারটা তাঁকে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, “এর থেকে কিছু আন্দাজ করতে পারছেন আপনারা?”
বললুম, “আঠারো শো ষোলো যে খ্রিস্টাব্দ, সে তো বোঝাই যাচ্ছে। খুব সম্ভব ওই বছরেই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘লপ’-এর ব্যাপারটা অবশ্য ধরতে পারছি না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আঠারো শো ষোলোর ব্যাপারটাও ঠিক ধরতে পারেননি। ওটা যদি খ্রিস্টাব্দ হয়, আর ওই বছরে যদি মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তা হলে এই ১৯৯৪ সালে ওর বয়েস দাঁড়াচ্ছে এক শো আটাত্তর বছর। না না, নিজের চোখে দেখে এলুম তো, ও-মন্দির অত পুরনো হতে পারে না।”
“তা হলে?”
“আমার ধারণা ওটা খ্রিস্টাব্দ নয়, শকাব্দ।”
“তাতে কোনও সুবিধে হচ্ছে?”
“হচ্ছে বই কী।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “শকাব্দের সঙ্গে খ্রিস্টাব্দের ফারাক মোটামুটি ঊনআশি বছরের। দ্যাট মিনস ১৮১৬ শকাব্দ হচ্ছে ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ। আর সেটাই যদি ওই মন্দিরের প্রতিষ্ঠার বছর হয়, তা হলে যিনি ওটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁর নামটাও আমরা আন্দাজ করে নিতে পারি।”
ব্যাপারটা ধাঁধার মতন লাগছিল। বললুম, “কে ওটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?”
“কেন, লপ।”
কিছুই বোধগম্য হল না। বললুম, “প্লিজ ভাদুড়িমশাই, আপনার এই ক্রিপটিক ল্যাঙ্গুয়েজ ছেড়ে ব্যাপারটা একটু গোদা বাংলায় বুঝিয়ে বলবেন?”
“বলছি।” একগাল হেসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “লপ আসলে পুরো একটা শব্দ নয়, পুরো শব্দের একটা অংশমাত্র। পাথরের ফলকে পুরো শব্দটাই খোদাই করা ছিল। কিন্তু সেই ফলকটা মন্দিরের গা থেকে খসে পড়ে ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে যায়। পড়ে আছে শুধু ‘লপ’ লেখা টুকরোটা।”
“কিন্তু আরও কিছু টুকরো তো ওখানে ছিল।”
“তা ছিল। কিন্তু তাতে দেখলুম লতাপাতা খোদাই করা। অর্থাৎ লেখার চারপাশ ঘিরে তো বর্ডার থাকে, ওগুলো সেই বর্ডারের টুকরো।”
“বাদবাকি হরফের টুকরোগুলো তা হলে গেল কোথায়?”
“জানি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওই পাহারাদারই সম্ভবত গাছ থেকে আম কি পেয়ারা পাড়বার জন্যে ঢিল-পাটকেল হিসেবে সেগুলো ব্যবহার করে থাকবে। কিন্তু না, তাতে কোনও ক্ষতি হয়নি। ওই ‘লপ’ থেকেই পুরো শব্দটা আমি আন্দাজ করে নিতে পেরেছি।”
“শব্দটা কী?” প্রশ্নটা সদানন্দবাবুর।
“একটা নাম। যাঁর নাম, তিনি ১৮৯৫ সনে ওই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”
বললুম, “কে তিনি?”
‘কুলপতি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিরণবাবু, নামটা শুনে কি আপনার আর-একটা মন্দিরের কথা মনে পড়ছে না?”
“মহেশপুরের শিবমন্দির?”
“রাইট।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটার খবর সদানন্দবাবুর চোখেই প্রথম পড়েছিল। তা ছাড়া, ওই মন্দির আর বাগান যার কাছে বিক্রি করা হয়েছে, তার নামও যে ওঙ্কারমহল আগরওয়াল, এটাও ওঁর নজর এড়ায়নি। কিন্তু কিরণবাবু, মুঠিয়ার মন্দির আর মহেশপুরের মন্দিরের মধ্যে মিল তো তাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না, মিল আরও একটা রয়েছে। কলকাতা থেকে ফোন করে কৌশিক আপনাকে জানিয়েও দিয়েছে সেই মিলের কথা। বলুন সেটা কী।”
ফোনে কৌশিকের সঙ্গে যে কথা হয়েছিল, সেটা একেবারে বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে পড়ে গেল আমার। বললুম, “আরে, তাই তো! মহেশপুরের মন্দির যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁর নামও তো কুলপতি। তার মানে…’
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “দুটো মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা একই মানুষ। এবং সেই মানুষটি হচ্ছেন সাবিত্রী মিত্রের প্রপিতামহ, গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার। শুধু তফাতটা হচ্ছে এই যে, মহেশপুরে তাঁকে সবাই কুলপতি মল্লিক বলে চিনত, আর এদিককার লোকেরা জানত কুলপতি মালিক বলে। দুটো আসলে একই উপাধি।”
বললুম, “কিন্তু মহেশপুরের বাগানটা যে লোকটি বিক্রি করেছে, সেই অশোক মল্লিক তা হলে কে?”
“মিসেস মিত্রের দাদা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সুরপতি মালিকের মৃত্যুর পরে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর তাবৎ সম্পত্তির যে ইনভেন্টরি হয়, পরে যে তার বাইরেও দুটো প্রপার্টির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে সেটা মনে আছে তো?”
“তা আছে।”
“দুটো প্রপার্টি মানে দুটো বাগান। তার প্রথমটা হচ্ছে ওই মহেশপুরের বাগান, যার স্বত্ব মিসেস মিত্র তাঁর দাদার সপক্ষে ছেড়ে দেন। ফলে ওটা বেচে দিতে অশোক মল্লিকের কোনও অসুবিধে হয়নি। এখন মুঠিয়ার বাগানটা যদি পেয়ে যায়, তো ওটাও সে বেচে দেবে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “ওটার স্বত্বও তো মিসেস মিত্র তাঁর দাদার সপক্ষে ছেড়ে দিতে চান। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না। মাধব মিত্তির বাধা দিচ্ছেন।”
“বাধা দিয়ে ভালই করেছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাট দেন মাধব মিত্তির ইজ আ ড্যাম লায়ার। বলে কিনা ওটা ওর ঠাকুর্দার সম্পত্তি। মন্দিরটা ওর ঠাকুর্দা বানিয়েছিল। ব্যাটা ঘোর মিথ্যুক।”
“শুধু কি মিথ্যুক?” সদানন্দবাবু বললেন, “একে মিথ্যুক, তায় একটা ব্লুবেয়ার্ড!”
৩
টেলিফোন তুলে আর-এক রাউন্ড চায়ের অর্ডার দিলেন ভাদুড়িমশাই। এবারে আর রুম-সার্ভিস থেকে সাড়া পেতে দেরি হল না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ট্রে-র উপরে চায়ের সরঞ্জাম সাজিয়ে উর্দি-পরা বেয়ারা এসে ঘরে ঢুকল। ভাদুড়িমশাই পটের উপর থেকে টি-কোজি সরিয়ে পেয়ালায় লিকার ঢেলে নিয়ে তাতে দুধ আর চিনি মিশিয়ে চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে বললেন, “এ-হোটেলের এই একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার দেখছি যে, দুধটা এরা কিছুতেই গরম করে দেবে না, ফলে দুধ মেশালেই চা’টা একটু ঠান্ডা মেরে যায়। …আপনারা?”
সদানন্দবাবু বললেন, “একটু আগেই তো একবার খেলুম। তা আপনি যখন বলচেন, তখন না হয় আর-একবার খাব। আমি অবশ্য শুধু লিকার খাই, দুধ-চিনি মেশাই না।”
দুটো পেয়ালায় লিকার ঢালা হল। একটা পেয়ালা সদানন্দবাবু তুলে নিলেন, একটা আমি। ভাদুড়িমশাই আয়েশ করে তাঁর চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললেন, “আঃ। আজ দেখছি বেশ জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছে। এদিকে ফেব্রুয়ারিও তো শেষ হতে চলল। আজ কত তারিখ খেয়াল আছে?”
সদানন্দবাবু বললেন, “ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি। তার মানে এ-মাসের আর মাত্তর দুটো দিন বাকি।”
“তা হোক, দু’দিনই যথেষ্ট।”
ভাদুড়িমশাই এমনভাবে কথাটা বললেন যে, মনে হল আর ভাবনার কিছু নেই। বললুম, “দু’দিনের মধ্যেই কাজটা গুটিয়ে ফেলতে পারবেন?”
“পারতেই হবে। তা ছাড়া উপায়ই বা কী। ভদ্রমহিলাকে পাহারা দেবার জন্যে তো আর অনন্তকাল আমি এখানে বসে থাকতে পারব না। যা বুঝবার তা তো বুঝেই গেছি, এখন এই দুটো দিন অবস্থাটা ধীরেসুস্থে ওয়াচ করব। তারপর চলে যাবার আগে মিসেস মিত্রকে ফাইনালি বলে যাব যে, পরের বিপদটা কোন দিক থেকে আসতে পারে, আর সেই বিপদ থেকে বাঁচবার জন্যে ঠিক কীভাবে তাঁর সতর্ক থাকা চাই। আর হ্যাঁ, মুঠিয়ার ওই বাগানের ব্যাপারেও আসল কথাটা তাঁকে জানিয়ে যেতে হবে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “বড্ড জেদি মহিলা। আপনি এত করে ওঁকে বললেন যে, অন্তত কিছুদিনের জন্যে হলেও এখান থেকে ওঁর অন্য কোথাও গিয়ে থাকা উচিত, কিন্তু কথাটা তো উনি কানেই তুললেন না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে আর কী করা যাবে। উনি যদি বোকামি করেন, তো তার ফলও ভুগবেন উনিই। কিন্তু আর নয়, সাড়ে দশটা বাজে, আপনারা এবার ঘরে গিয়ে স্নান সেরে নিন। ইচ্ছে করলে একটু গড়িয়েও নিতে পারেন। খেতে যাবার সময় আমি আপনাদের ডেকে নেব অখন।”
আমরা উঠতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু সেই মুহূর্তেই টেলিফোন বেজে উঠল। ইঙ্গিতে আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বলে ভাদুড়িমশাই হাত বাড়িয়ে ক্রেডল থেকে রিসিভারটা তুলে নিয়ে বললেন, “হ্যালো…অ্যাঁ, সে কী…এটা কখন হল… ঠিক আছে, ওঁকে শুইয়ে রাখুন, আমি এখুনি যাচ্ছি।”
রিসিভারটা নামিয়ে রেখেই ঘুরে দাঁড়ালেন ভাদুড়িমশাই। কী হয়েছে, সেটা জানবার জন্যে আমি আর সদানন্দবাবু একইসঙ্গে মুখ খুলতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু ডান হাতের তর্জনীটাকে ঠোটের সামনে তুলে ধরে তিনি বললেন, “এখন কোনও কথা নয়, জাস্ট গো টু ইয়োর রুম অ্যান্ড গেট রেডি অ্যাজ সুন অ্যাজ ইউ ক্যান। এক্ষুনি আমাদের দেরাদুন যেতে হচ্ছে। পথে সব বলব। যান।” বলেই আবার রিসিভারটা তুলে নিলেন তিনি।
ঘরে গিয়ে পোশাক পালটে বেরিয়ে আসতে আমাদের পাঁচ মিনিটও লাগল না! ভাদুড়িমশাই তৈরি হয়েই ছিলেন। হোটেল থেকে বেরিয়ে গান্ধী-চকের কাছ থেকে যখন ট্যাক্সিতে উঠলুম, তখন ঠিক পৌনে এগারোটা বাজে।
ট্যাক্সি যখন মুসৌরি মিউনিসিপ্যাল এরিয়া ছাড়িয়েছে, তখন একটা মস্ত বড় নিশ্বাস ফেলে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক এটা না হলেও মোটামুটি এই রকমেরই একটা-কিছু যে হবে, তা আমি জানতুম। কিন্তু উনি তো ওঁর জিদ ধরেই বসে রইলেন।”
বললুম, “কী হয়েছে?”
“মিসেস মিত্র ইনজিওর্ড।”
শুনে অবাক হলুম না। কেন না, আমিও ঠিক এই আশঙ্কাই করছিলুম। বললুম, “এটা কোথায় হল?”
“ওঁর নিজেরই বাড়িতে।”
“ঘটনাটা ঘটল কখন?”
“ফোন আসবার মিনিট দশেক আগে। এই ধরুন সওয়া দশটা কি দশটা কুড়ি নাগাদ। বাথরুমে স্নান করতে ঢুকেছিলেন, হঠাৎ পড়ে গিয়ে মাথায় চোট লাগে। মাথার পিছন দিকটা শুনলুম অনেকখানি কেটে গেছে।”
“ফোনটা কে করেছিলেন?”
“মিঃ মিত্র। ভদ্রলোকের গলা শুনে মনে হল, খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছেন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “নার্ভাস না ঘোড়ার ডিম! একটা বউকে মেরেছে, এখন এটাকেও মেরে ফেলবে!”
ভাদুড়িমশাই বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন, “ও হ্যাঁ, মাধব মিত্র যে তাঁর প্রথম স্ত্রীকে বিষ খাইয়ে মেরেছিলেন, এইরকম একটা রটনার কথা আমরা সাবিত্রী মিত্রের কাছে শুনেছি বটে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “যা রটে, তার কিচু বটে। ব্যাটা একটা নররাক্ষস!”
আমি বললুম, “কিন্তু এটা কেমন হল? ভদ্রলোক আগে তো ডাক্তারকে ফোন করবেন। তা না-করে আপনাকে ফোন করলেন কেন?”
“না, না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনারা যা ভাবছেন, তা নয়। উনি আগে ডাক্তারকেই ফোন করেছেন। ডঃ দেশপাণ্ডে ওঁর বাড়ির খুব কাছেই থাকেন। আগে তাঁকে কল দিয়ে তারপর উনি আমাকে ফোন করেন।”
“মেজর গুপ্তকে কল দিলেন না কেন?”
“কারণটা বোধহয় এই যে, বিষ্টু এই সময়ে তার চেম্বারে থাকে। সেটা ওঁদের বাড়ির খুব কাছে নয় বলেই হয়তো ডাকেননি। এটা তো ঠিক যে, চেম্বার থেকে আসতে বিষ্টুর কিছুটা সময় লেগে যেত।”
সদানন্দবাবু বললেন, “সে আপনি যা-ই বলুন, মেজর গুপ্ত ওঁদের ফ্যামিলি-ফ্রেন্ড তো বটেন, তার উপর আবার মিসেস মিত্র ওঁরই পেশেন্ট, ওঁকে না-জানানোটা ঠিক হয়নি। ব্যাপারটা আমার তো খুবই ফিশি লাগচে, মশাই।”
শুনে, ভাদুড়িমশাই ড্রাইভারের পাশের আসন থেকে মুখ ফিরিয়ে একবার সদানন্দবাবুর দিকে তাকালেন। সামান্য হাসলেনও। কিন্তু কিছু বললেন না।
আমি বললুম, “মিসেস মিত্র কীভাবে পড়ে গেলেন, সেটা বললেন উনি? মানে পিছন থেকে কেউ ধাক্কা-টাক্কা মেরেছিল?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কই, তেমন কিছু তো মিঃ মিত্র বললেন না।
সদানন্দবাবু বললেন, “তা হলে?”
“পড়ে যাবার কারণ তো অনেক কিছুই হওয়া সম্ভব।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিরণবাবু, আপনি শুধু ধাক্কা দেবার কথাই বা ভাবছেন কেন? অন্য কোনও কারণেও তো এটা ঘটে থাকতে পারে।”
বললুম, “যেমন?”
“যেমন ধরুন পা হড়কে গিয়েছিল হয়তো। তা ছাড়া, উনি যে ব্লাড প্রেশারের রুগি, তাও তো আমরা জানি। তা প্রেশারের রুগিরা কি অনেক সময় মাথা ঘুরে গিয়ে পড়ে যায় না?”
“তা পড়ে ঠিকই।” আমি বললুম, “কিন্তু ওঁর কেসটা তো একটু আলাদা। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার ওঁর উপরে হামলা হয়ে গেছে। হামলাই বলছি, তার কারণ, অ্যাকসিডেন্ট যে এত ফ্রিকোয়েন্টলি ঘটে না, সে তো আপনার না জানবার কথা নয়। ইন ফ্যাক্ট, আপনিই ওঁকে সেটা বুঝিয়ে দিয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন। সত্যি বলতে কী, খবরটা শোনার পর আমারও তাই মনে হচ্ছে যে, এটাও একটা ফাউলপ্পে না-হয়ে যায় না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী জানি, হয়তো আপনার কথাই ঠিক। যা-ই হোক, ঠিক কী যে ঘটেছিল, সে তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারছি।”
একটা কথা স্বীকার করব। ব্যাপারটা নিয়ে যতই ভাবছিলুম ততই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল আমার। মাত্রই তো দুটো দিনের পরিচয়,অথচ এরই মধ্যে মিসেস মিত্রকে যেটুকু চিনেছি, আমাদের সহানুভূতি আকর্ষণের পক্ষে সেইটুকুই যথেষ্ট। ভদ্রমহিলা জেদি, কিন্তু তার জন্যে তাঁকে মূল্য নেহাত কম দিতে হয়নি। ভদ্রমহিলা কারও দয়া কি দানের প্রত্যাশী নন; যা-কিছু করেছেন, সেটা আপন শক্তি আর বুদ্ধির জোরে করেছেন, কিন্তু তার বিনিময়ে কী পেলেন তিনি? বলতে গেলে কিছুই না। যার জন্যে ঘর ছেড়েছিলেন, যৌবনের উন্মাদনা কেটে যাবার পরে দেখলেন, সেও নেহাতই মাকাল ফল ছাড়া আর কিছুই নয়। সে এখন তাঁর মৃত্যুর প্রতীক্ষায় রয়েছে। মিসেস মিত্র মারা যাবার সঙ্গে-সঙ্গেই তাঁর তাবৎ সম্পত্তি তার হাতের মুঠোয় এসে যাবে। না, এই ভদ্রমহিলার বন্ধু বলতে আজ আর কেউ নেই। এক মেজর গুপ্ত ছাড়া। কিন্তু ঘরের মধ্যেই যাঁর শত্রু, মেজর গুপ্তই বা তাঁর জন্যে কী করতে পারেন?
“ও মশাই, একটা ব্যাপার দেখেচেন?”
সদানন্দবাবুর কথায় আমার চিন্তার সূত্রটা ছিঁড়ে গেল। বললুম, “কী দেখব?”
“একটা জিপগাড়ি সেই মুসৌরি থেকে আমাদের সামনে সামনে চলেছে।”
“তাতে কী হল?”
“ওটা মশাই কোনও সরকারি বড়কর্তার জিপ না-হয়ে যায় না।”
“কী করে বুঝলেন?”
“ভেরি সিম্পল।” সদানন্দবাবু বললেন, “যেখানেই রাস্তা একটু চওড়া সেখানেই দেখচি পাহাড়ের গায়ে একেবার সেঁটে গিয়ে অন্য সব গাড়ি ওটার পথ ছেড়ে দিচ্চে। তা ছাড়া, একটু আগে একজন কনস্টেবলও দেখলুম গাড়িটা যাবার সময় একেবারে টান হয়ে দাঁড়িয়ে একটা স্যালুট ঠুকে দিল।”
একটু নজর করেই বুঝতে পারলুম যে, সদানন্দবাবু ভুল বলেননি। ওটা পুলিশের জিপই বটে। তাতে একটা সুবিধেও হল। এমনিতে তো পাহাড় পেরিয়ে নীচে নামতে তা প্রায় ঘন্টা দুয়েকের মতো সময় লাগে, কিন্তু সামনের ওই গাড়িটা থেকে মাঝে-মাঝেই হুটার বাজতে থাকায় রাস্তা সারাক্ষণই ফাঁকা পাওয়া যাই।, তাই এ-যাত্রায় দেড় ঘন্টার বেশি লাগল না। নীচে নেমে আরও বেশ-খানিকটা পথ ওই গাড়ির পিছনে যাওয়া যেত নিশ্চয়, কিন্তু যে মোড়ের মাথায় তাঁর চেম্বার আর নার্সিং হোম, সেখানে দেখলুম মেজর গুপ্ত দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হল, কারও জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। ভাদুড়িমশাইয়ের নির্দেশে ট্যাক্সি-ড্রাইভার গাড়ি থামাতেই মেজর গুপ্ত আমাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে বললেন, “শুনেছেন তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মিসেস মিত্রের কথা বলছ?”
“হ্যাঁ।” মেজর গুপ্ত বললেন, “কী আশ্চর্য ব্যাপার দেখুন। আমি ওদের বাড়ির ডাক্তার, অথচ আমাকে কিচ্ছু জানায়নি। মাত্তর মিনিট পাঁচেক আগে আমি খবর পেলুম। এদিকে আবার ব্রেকটা গণ্ডগোল করছিল বলে আমার গাড়িটা তার খানিক আগে কারখানায় পাঠিয়েছি, তাই একটা ট্যাক্সির জন্যে দাঁড়িয়ে ছিলুম। তা আপনারা ওখানেই যাচ্ছেন তো?”
“হ্যাঁ। তুমিও যদি যেতে চাও তো উঠে পড়ো।”
মেজর গুপ্ত পিছনের সিটে উঠে পড়লেন। ট্যাক্সি আবার চলতে শুরু করল।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তোমাকে পেয়ে গিয়ে খুব ভাল হল বিষ্টু। মাথায় লেগেছে, বেশ খানিকটা কেটেও গেছে নাকি। ইনজুরিটা খুব সিরিয়াস নয় তো?”
“পেশেন্টকে দেখলে সেটা বলতে পারব।”
“যা-ই হোক, উনি তো তোমারই পেশেন্ট, তাই তোমার ওপিনিয়নটাই সবচেয়ে জরুরি।”
মেজর গুপ্ত ম্লান হেসে বললেন, “সে তো আপনি বলছেন! যাঁর বোঝা উচিত ছিল, সেই মিঃ মিত্ৰ তো একটা খবর পর্যন্ত দেননি।”
“সে কী, খবরটা তুমি তা হলে মাধব মিত্তিরের কাছ থেকে পাওনি? খবরটা তা হলে তোমাকে দিল কে?”
“ডঃ দেশপাণ্ডে।” মেজর গুপ্ত বললেন, “ওঁকেই কল দেওয়া হয়েছিল।”
আর কোনও কথা হল না। গাড়ি গিয়ে মিত্র-লজের সামনে পৌঁছতেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “ব্যাস, হিঁয়াই রোকো ভাই।”
ট্যাক্সির টাকা মিটিয়ে, উপরন্তু দুখানি দশ টাকার নোট বখশিশ করে, গেট খুলে আমরা ভিতরে ঢুকলুম।
৪
বাড়িতে ঢুকেই মাধব মিত্রের দেখা পাওয়া গেল। সামনের বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে বসে তিনি ড্রাইভার বির্জপ্রসাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কথা বলতে-বলতেই হঠাৎ আমাদের দিকে চোখ পড়ে যাওয়ায় বারান্দা থেকে দু’ধাপ সিঁড়ি নেমে এসে বললেন, “আসুন, আসুন।” তারপর মেজর গুপ্তের দিকে তাকিয়ে একটু কুণ্ঠিত গলায়, “আপনাকে খবর দিতে পারিনি, কিছু মনে করবেন না। আসলে, ডঃ দেশপাণ্ডে তো পাশেই থাকেন, তাই তাঁকেই ডেকে পাঠিয়েছিলম।”
মেজর গুপ্ত বললেন, “সেটা ঠিকই করেছেন। কিন্তু কেমন আছেন উনি?”
“মাথার ইনজুরিটা তেমন ডিপ নয়, তবে ডান হাতের কব্জিতে খুব ব্যথা। পড়ে যাবার সময় গোটা শরীরের ভারটা সম্ভবত ওই ডান হাতের উপরেই পড়েছিল।”
“ডঃ দেশপাণ্ডে কী বললেন?”
“উনি বললেন ফ্র্যাকচার বলে মনে হচ্ছে না, একটু চুন-হলুদ লাগিয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। সেটা একবার লাগানোও হয়েছে।”
“ব্যথা কমাবার জন্যে কোনও ওষুধ দিয়েছেন?”
“একটা পেন-কিলার ট্যাবলেট দিয়েছেন। বলেছেন, এতে ব্যথাটা কমে যাবে, একটু ঘুমও হবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “একবার দেখা যায়?”
“তা কেন যাবে না?” মাধব মিত্র বললেন, “ওঁরই কথায় তো ফোন করলুম আপনাকে। যান, ভিতরে গিয়ে দেখে আসুন।”
আমরা ড্রয়িং রুমের ভিতরে দিয়ে শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকলুম।
মিসেস মিত্র ঘুমুচ্ছিলেন না। তবে এমন শূন্য চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন যে, মনে হল, আচমকা এই কাণ্ডটা ঘটে যাওয়ায় মনের দিক থেকে একটা প্রচণ্ড রকমের ঝাঁকুনি খেয়েছেন। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। ভদ্রমহিলার মুখখানা এমনিতেই পাণ্ডুর। আজ যেন আরও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। আমরা গিয়ে ঘরে ঢুকতে সিলিং থেকে আস্তে-আস্তে চোখ ফিরিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন। বিষণ্ণ হাসলেন। কিছু বললেন না।
মেজর গুপ্ত ওঁর টেম্পারেচার নিলেন, স্টেথোস্কোপ বসিয়ে বুক-পিঠ পরীক্ষা করলেন, প্রেশার মাপলেন। তারপর বললেন, “ডান হাতের কব্জি দেখছি ফুলে রয়েছে। একটা এক্স-রে করানো দরকার।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দরকার হলে করাতে হবে। ধারে-কাছে এক্স-রে করাবার কোনও ব্যবস্থা আছে?”
মাধব মিত্র বললেন, “ধারে-কাছে বলতে মাইল দেড়েকের মধ্যে একটা ক্লিনিক আছে। কিন্তু বারোটার পরে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। বিকেলের আগে তো সেটা খুলবে না।”
মেজর গুপ্ত বললেন, “ক্লিনিকে যাবার দরকার নেই, ওঁকে আমার নার্সিং হোমে নিয়ে চলুন। শুধু এক্স-রে কেন, সেখানে ইউ আর গেটিং অল কাইন্ডস অভ মেডিক্যাল হেলপ। একটা ই-সি-জি-ও করে নেওয়া যাবে।”
মাধব মিত্র বললেন, “কিন্তু ডঃ দেশপাণ্ডেকে তো একবার জানানো দরকার। একটু ওয়েট করলে হত না?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, আর দেরি করা ঠিক হবে না। ডঃ দেশপাণ্ডে তো আর বাচ্চা ছেলে নন, বিষ্টু কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না বলেই যে মিসেস মিত্রকে ওর নার্সিং হোমে নিয়ে যাচ্ছে, না-জানালেও তিনি সেটা ঠিকই বুঝতে পারবেন।”
“কিন্তু উনি আমার প্রতিবেশী, বলতে গেলে একেবারে নেক্সট-ডোর নেবার। তা ছাড়া, ব্যাপারটা তো উনিই দেখছিলেন। ওঁকে কিছু না-জানিয়ে…”
মাধব মিত্র তবুও ইতস্তত করছেন দেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, আপনারা বেরিয়ে পড়ুন দেখি, ডঃ দেশপাণ্ডেকে যা বলবার আমিই ফোন করে বলে দেবখন।…আর হ্যাঁ, আপনারা তো অ্যাম্বাসাডরটা নিয়ে যাচ্ছেন, মারুতির চাবিটা আমাকে দিয়ে যান, আমি একটু বাদে যাচ্ছি।”
এক-টুকরো কাগজে ডঃ দেশপাণ্ডের ফোন নাম্বারটা লিখে সেটা ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন মাধব মিত্র। মারুতির চাবির রিংটাও দিলেন। বললেন, “ডঃ দেশপাণ্ডেকে একটু বুঝিয়ে বলবেন, কেমন?”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে মিসেস মিত্রকে নিয়ে নার্সিং হোমের দিকে রওনা হলেন ওঁরা।
অ্যাম্বাসাডর গাড়িটা গেট পেরিয়ে রাস্তায় পড়বামাত্র সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “অ্যাটাচড বাথরুমটা থেকে চট করে একবার ঘুরে এসে বলুন তো ওটার মেঝেতে শ্যাওলা-ট্যাওলা জমে আছে কি না।”
সদানন্দবাবু গিয়ে বাথরুমে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গেই ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল ঘুরিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যালো…ডঃ দেশপাণ্ডে?…আমার নাম চারু ভাদুড়ি…মিসেস মিত্রের কাছে আমার কথা শুনেছেন?…বাঃ তা হলে তো ভালই হল…একটা কথা জিজ্ঞেস করছি, মিসেস মিত্রর খবরটা কি আপনি আজ মেজর গুপ্তকে জানিয়েছিলেন?…হ্যাঁ, উনি এখন ভালই আছেন। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।”
বাথরুম থেকে ঘুরে এসে সদানন্দবাবু বললেন, “না মশাই, শ্যাওলা-ট্যাওলা নেই। মেঝে একদম ঝকঝকে পরিষ্কার।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ! তারপর ফের ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল ঘুরিয়ে বললেন, “কোড নাম্বার ফাইভ জিরো ডাবল এইট। রিপিট ফাইভ জিরো ডাবল এইট। … রাইট…দিস ইজ ভাদুড়ি ফ্রম সি.বি. ইনভেস্টিগেশানস। প্লিজ ডু মি অ্যানাদার ফেভার। মেজর গুপ্তের চেম্বার আর নার্সিং হোম কোথায় জানেন তো?…বাঃ, তা হলে এক্ষুনি ওখানে চলে যান। গিয়ে ওঁকে কথাবার্তা বলে একটু এনগেজ করে রাখুন। …কীভাবে? যা-হোক কিছু একটা কারণ দেখান। বলুন যে, আপনার ঘাড়ে একটা নিউরালজিক পেন হচ্ছে, আপনি ঘুমুতে পারছেন না। কিংবা আপনার ভাইয়ের অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করাতে হবে, তাই ওঁর সঙ্গে কনসালট করতে এসেছেন। মোট কথা, যেমন করেই হোক, যতক্ষণ পারেন ওঁকে এনগেজ করে রাখুন। দরকার হলে হল্লা জুড়ে দিন, চিৎকার করুন, শাসান, কিন্তু হাল ছাড়বেন না।…আমি?…ও হ্যাঁ, আমি একটু বাদেই যাচ্ছি। কিন্তু আমি ওখানে পৌঁছবার পরেও আপনার কাজ শেষ হচ্ছে না; যতক্ষণ না পুলিশ ওখানে যাচ্ছে, ততক্ষণ আপনি চালিয়ে যাবেন।”
রিসিভার নামিয়ে রেখে নিজেও একবার বাথরুমে ঢুকলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর মিনিট খানেক বাদে বেরিয়ে এসে বললেন, “মেঝেটা পরিষ্কার ঠিকই, কিন্তু একটু জল ফেলে হাত বুলিয়ে দেখলুম হাতটা হড়কে যাচ্ছে। তার মানে মেঝেতে কেউ সাবান-গোলা জল ফেলেছিল। বাথরুমে বাথ-টাব রয়েছে। জামাকাপড় কাচবার জায়গাও ওটা নয়। মেঝেতে তা হলে সাবান-গোলা জল এল কোত্থেকে?…কিন্তু না, আর দেরি করা ঠিক হবে না। চলুন, বেরিয়ে পড়া যাক।”
সদানন্দবাবু বললেন, “এ নিশ্চয়ই ব্লুবেয়ার্ডের কাণ্ড। মিসেস মিত্রকে আছাড় খাইয়ে মারার ফন্দি করেছিল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ফন্দিটা খাটল না, ধরা পড়ে গেল।…ওহো, আর-একটা ফোন করতে হবে। এটা করেই বেরিয়ে পড়ব।”
রিসিভার তুলে আবার ডায়াল ঘোরালেন ভাদুড়িমশাই। ওদিক থেকে সাড়া মিলতে বললেন, “আমি ভাদুড়ি কথা বলছি…হ্যাঁ, যে-জায়গাটার কথা বলেছিলুম, যত তাড়াতাড়ি পারেন, আপনার বন্ধুকে নিয়ে সেখানে চলে যান। রাস্তার ধারে গাড়ি রেখে ওয়েট করবেন, যতক্ষণ না আমি কিছু বলছি, ততক্ষণ ভিতরে ঢুকবেন না।…আমি কখন যাব? তা ধরুন মিনিট পঁচিশের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছি।”
চৌকিদারকে ডেকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “দুর্গা কোথায়?”
“তাঁকে তো আজ সকাল থেকেই দেখছি না।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাড়িতে তো তোমার মালিকও নেই, মালকিনও নেই। তুমি একটু নজর রেখো। আমরা বেরিয়ে যাচ্ছি।”
মারুতিটা বির্জপ্রসাদই তার মনিবের নির্দেশে গ্যারাজ থেকে বার করে রেখেছিল। সেটা নিয়ে আমরা রওনা হলুম।
নার্সিং হোমের কাছে পৌঁছে দেখলুম, তার সামনে একটা ছোটখাটো ভিড় জমে গেছে। চেম্বারের ভিতর থেকে একটা উত্তেজিত ক্রুদ্ধ কন্ঠস্বর ভেসে আসছিল। গাড়িটা পার্ক করে কৌতূহলী লোকজনদের ঠেলেঠুলে ভিতরে ঢুকে বুঝলুম যে, সেটা মেজর গুপ্তের গলা।
“আমি কি আপনার চাকর নাকি মশাই যে, আপনি বললেই অমনি এখানকার রুগিদের ফেলে আমাকে আপনার বাড়ি যেতে হবে? এ কি মগের মুল্লুক?”
কথাগুলো যাকে বলা, জিনস আর ঝোলা-কোট পরা সেই যুবকটির বয়েস মনে হল বছর পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না। চুল আঁচড়ায়নি, মুখ-ভর্তি খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, কোটের জিপার খোলা, নীচে শার্টও নেই, গেঞ্জিও নেই, বুকের উপরে একটা লকেটওয়ালা চেন ঝুলছে। টেবিলের উপরে দমাস করে একটা ঘুসি বসিয়ে দিয়ে সে বলল, “মগের মুল্লুক কি না, সেটা কি এখুনি আপনাকে সমঝে দিব? নাকি আমার দাদিকে আপনি একবার দেখতে যাবেন? যদি না যান…
“তো কী হবে?” মেজর গুপ্ত বললেন, “আপনি মারবেন আমাকে? ইউ স্কাউন্ডেল! আমি তোমাকে…” কথার মাঝখানেই আমাদের দেখতে পেয়ে, “এই যে, আপনারা এসে গেছেন। চলুন, উপরে গিয়ে সব বলছি।”
মেজর গুপ্ত তাঁর চেয়ার ছেড়ে উঠবার উপক্রম করতেই ছেলেটি তাঁর সামনে এসে শার্টের কলার চেপে ধরে বলল, “এ ডক্টর, কোথায় যাচ্ছ? আগে আমার দাদিকে দেখবে চলো।”
ছেলেটিকে বাধা দেবার কোনও চেষ্টাই ভাদুড়িমশাই করলেন না। আমাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললেন, “ফলো মি।” ভাদুড়িমশাইয়ের পিছনে-পিছনে আমরা দোতলায় উঠে এলুম।
দোতলাটা শান্ত। চেম্বারটা একে একতলায়, তায় রাস্তার ধারে। সেখানকার হট্টগোল এখানে এসে পৌঁছচ্ছে না। ল্যান্ডিংয়ের সামনে কোলাপসিবল গেট। সেটা পেরোলে ডানদিকে ‘রিসেপশন’ লেখা বোর্ডের সামনে একটা টেবিল। টেবিলের ওদিকে চেয়ারে বসে যিনি একটা বাঁধানো মোটা খাতার উপরে চোখ বুলোচ্ছেন, তাঁকে চিনতে অসুবিধা হল না। সেই নার্স, প্রথম দিনই মেজর গুপ্তের চেম্বারে যাঁকে দেখেছিলুম। ভদ্রমহিলাও আমাদের চিনতে পেরে হেসে বললেন, “মিসেস মিত্রের খোঁজ করতে এসেছেন তো? ভাল আছেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মিঃ মিত্রকে যে দেখছি না?”
“তাঁকে একটা ওষুধ কিনতে পাঠানো হয়েছে। আমাদের স্টকে নেই।”
“মিসেস মিত্রের সঙ্গে একবার দেখা করতে পারি?”
ভদ্রমহিলা হেসে বললেন, “এখন ভিজিটিং আওয়ার নয়। তবে আপনারা তো মেজর গুপ্তের বন্ধু, আপনাদের কী করে আটকাব? যান, দেখে আসুন। দু’নম্বর কেবিনে আছেন। শুধু একটা অনুরোধ করি, পেশেন্টদের অনেকেই এখন ঘুমোচ্ছেন, দয়া করে কোনও শব্দ করবেন না।”
বাইরের খোলা ঘরে পেশেন্টদের অনেকেই সত্যি ঘুমিয়ে আছে। তাই তাদের বেডের পাশ দিয়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে আমরা দু’নম্বর কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। কেবিনের সামনে পর্দা ফেলা। কিন্তু পর্দাটার সবটা টানা নেই বলে ভিতরের দৃশ্যেরও খানিকটা দেখা যায়। যা দেখলুম, তাতে মনে হল, সত্যিই একটু অসময়ে এসেছি। মিসেস মিত্রের বেডের পাশে তাঁরই দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন নার্স। সম্ভবত ওঁকে ওষুধ খাওয়াবেন।
না, ওষুধ খাওয়াবেন না, ইঞ্জেকশন দেবেন। এটা বুঝলুম বেডের পাশের টুলে রাখা একটা হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ দেখে। নার্সটি আমাদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন, ফলে তাঁর মুখ দেখতে পাচ্ছি না। পরপর যে কাজগুলি তিনি করছেন, শুধু তা-ই দেখছি। মিসেস মিত্রের বাঁ হাতের কনুইয়ের একটু উপরে তিনি সরু একটা রবারের নল খুব আঁট করে জড়িয়ে তাতে একটা গিঁট দিলেন। এক টুকরো তুলোর উপরে ফোটা কয়েক স্পিরিট ঢাললেন। কনুইয়ের চামড়ায় তুলোর টুকরোটাকে বার কয়েক ঘষে সেটা নীচের একটা গামলার মধ্যে ফেলে দিলেন। হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জটাকে রবারের ক্যাপ পরানো একটা শিশির মধ্যে ঢুকিয়ে তার ভিতরকার তরল ওষুধ টেনে নিলেন খানিকটা। খুবই আবছাভাবে আমার মনে পড়ল যে, এর পরেও যেন একটা কিছু করবার থাকে। কিন্তু ইনি সেটা করলেন না। মৃদু গলায় মিসেস মিত্রকে বললেন, “হাত খুব শক্ত করে মুঠো করুন।” তারপর শিরাটা দেখে নিয়ে সিরিঞ্জের ছুঁচ সেখানে লাগাবামাত্র…
লাফিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকেই নার্সের হাত থেকে এক ঝটকায় হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জটা কেড়ে নিলেন ভাদুড়িমশাই। একই সঙ্গে চাপা কিন্তু ভয়ঙ্কর রকমের কঠিন গলায় বললেন, “ছিঃ, ঊর্মিলা!”
নার্সটি একেবারে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। মাত্র এক মুহূর্তের জন্যে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন তিনি। পরক্ষণেই দু’হাতে মুখ ঢেকে কেবিন থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু তার আগেই তাঁর মুখ আমরা দেখতে পেয়েছিলুম। ফলে চিনতে পারাও শক্ত হয়নি। সদানন্দবাবু বললেন, “আরে ইনি তো নির্মলা সিনহা। মানে আমাদের ভ্যালি ভিউ হোটেলের সেই রিসেপশনিস্ট!”
হকচকিয়ে গিয়েছিলেন মিসেস মিত্রও। বললেন, “এ কী কাণ্ড! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কী ব্যাপার বলুন তো?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ব্যাপার আর কী, আপনার কিসসু হয়নি। বাড়ি চলুন, তারপর সব বুঝিয়ে বলা যাবে। আমরা কেবিনের বাইরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি। আপনি পোশাক পালটে চটপট তৈরি হয়ে নিন।”
তৈরি হতে তিন মিনিটও লাগল না। মিসেস মিত্রকে নিয়ে আমরা দোতলা থেকে একতলায় নেমে এলুম। নামবার সময় চোখে পড়ল যে, সেই নার্সটি তাঁর চেয়ারে একেবারে হতভম্ব হয়ে বসে আছেন আর মিসেস সিনহা খুবই উত্তেজিতভাবে তাঁকে কিছু একটা বোঝাবার চেষ্টা করছেন। সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতেই ভাদুড়িমশাই তাঁদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “গোলমাল করবেন না, রুগিরা ঘুমোচ্ছে!”
নীচে নামতেই যে হট্টগোলটা কানে এল, তাতে বুঝলুম, চেম্বারের সেই ধুন্ধুমার ঝগড়া এখনও থামেনি। চেম্বারের পাশ দিয়ে যে সরাসরি উপরে যাবার একটা আলাদা গলি রয়েছে, যেমন আমার তেমন ভাদুড়িমশাইয়েরও সেটা চোখে পড়ে থাকবে। ফলে নীচে নেমে, তিনি আর চেম্বারে ঢুকলেন না, গলি দিয়ে একেবারে বড় রাস্তায় চলে এলেন। উল্টো দিকে একটু দূরে একটা জিপ পার্ক করা রয়েছে দেখলুম। ভাদুড়িমশাই ইঙ্গিত করতেই সেই জিপ থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে যিনি এদিকে চলে এলেন, দেখবামাত্র চিনতে পারলুম যে, তিনি সঞ্জীব চতুর্বেদী। আজ সকালে মুসৌরির হোটেলে ভাদুড়িমশাইয়ের ঘরে বসে এঁকেই আমরা গল্প করতে দেখেছি।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেরাদুনে আপনার যে বন্ধুটি আছেন, তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন তো?”
সঞ্জীব চতুর্বেদী বললেন, “অফ কোর্স। সে জিপে বসে আছে। কী করতে হবে বলুন।”
“মেজর গুপ্ত আর নির্মলা সিনহাকে অ্যারেস্ট করতে হবে।”
“নির্মলা সিনহা আবার কে?”
“একজন নার্স। তাকে দোতলার নার্সিং হোমেই পাওয়া যাবে।”
“আমরা মেজর গুপ্তের নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বার করে এনেছি। কিন্তু নির্মলা সিনহার নামে তো কোনও ওয়ারেন্ট নেই।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “নির্মলাকে আপাতত তা হলে ওয়াচে রাখুন। মেজর গুপ্তকে অবশ্য তাঁর চেম্বারেই পেয়ে যাবেন।”
“জানি।” সঞ্জীব চতুবের্দী বললেন, “রাস্তার একটা লোকের কাছে শুনলাম, চেম্বারে বসে একটা হিপি-মার্কা ছোকরার সঙ্গে খুব ঝগড়াঝাঁটি করছেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর যা-ই করুন, ওই হিপি-মার্কা ছোকরাটিকে ধরবেন না। ও আমারই লোক।”
কথাটা শুনে সঞ্জীব চতুর্বেদী অবাক হয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকাতে তিনি বললেন, “বিশ্বাস হচ্ছে না? ঠিক আছে, সন্ধের দিকে মিত্র-লজে আসুন, তখন সব বুঝিয়ে বলব।”
সঞ্জীব চতুর্বেদী তাঁর বন্ধুকে ডেকে আনবার জন্য জিপের দিকে পা বাড়ালেন। আমরা গিয়ে মারুতিতে উঠলুম। মিসেস মিত্র এতক্ষণ একটিও কথা বলেননি। অবাক হয়ে সব দেখে যাচ্ছিলেন। গাড়ি চলতে শুরু করার পর তাঁর মুখে প্রথম কথা ফুটল। বললেন, “আমার স্বামীকে তো দেখছি না। তিনি কোথায়?”
গিয়ার পালটে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার জন্যে মেজর গুপ্ত ওঁকে একটা ওষুধ কিনে আনতে বলেছেন। সম্ভবত এমন ওষুধ, যা কিনা বিস্তর ছুঁড়েও পাওয়া যাবে না। যা-ই হোক, নার্সিং হোমে ফিরে এসে উনি তো সবই বুঝতে পারবেন, তখন বাড়িতে চলে আসবেন নিশ্চয়।”
৫
মাধব মিত্র বিকেল চারটে নাগাদ বাড়ি ফিরেছিলেন। তার আগে গোটা দেরাদুন ছুঁড়েও যে ওষুধটা পাওয়া গেল না, এই কথাটা জানাবার জন্যে মেজর গুপ্তের নার্সিং হোমে গিয়ে শুনেছিলেন যে, পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে গেছে। তারপর নার্সের কাছে খবর পেলেন যে, তাঁর স্ত্রীও সেখানে নেই। তখন বাড়িতে ফিরে মিসেস মিত্র ও আমরা যে সেখানে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি, এইটে দেখে তিনি হতবাক। খানিক বাদে বাকশক্তি ফিরে পেয়ে আমাকে প্রশ্ন করেন, “ব্যাপার কী মশাই, আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু বুঝিয়ে বলবেন?” তাতে আমি বলি যে, প্রশ্ন শুধু তাঁর একার নয়, আমাদেরও। বুঝিয়ে বলতে সম্ভবত একমাত্র ভাদুড়িমশাই-ই পারেন, কিন্তু “মুশকিলটা কী হয়েছে, জানেন? উনি বলছেন যে, জনে-জনে আলাদা করে বুঝিয়ে বলতে পারবেন না, তার চেয়ে বরং সঞ্জীব চতুর্বেদী আর তাঁর বন্ধু গোপাল শর্মা তো সন্ধের দিকে এখানে আসবেন, তখন একসঙ্গে সবাইকে বুঝিয়ে বলা যাবে। ও হ্যাঁ, ডঃ দেশপাণ্ডেও তখন উপস্থিত থাকবেন।”
শুনে মাধব মিত্র আর কথা বাড়াননি। স্ত্রীর দিকে খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, “তুমি…তুমি ভাল আছ তো?”
তাতে সাবিত্রী মিত্র বলেছিলেন, “কাজের মেয়ে পালিয়ে গেলে বাড়ির গিন্নি যতটা ভাল থাকে, ততটাই ভাল আছি।”
“তার মানে দুর্গা পালিয়েছে? …তা হলে চা করল কে? তোমার তো কব্জি ভাঙা।”
সদানন্দবাবু পট থেকে কাপে চা ঢেলে তাতে দুধ-চিনি মিশিয়ে কাপটা মিঃ মিত্রের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “কেন, আমি তো আছি। আমিই চা করলুম। সন্ধের সময় তো মিটিং বসবে, তখন আবার করব।”
তা সন্ধের সেই মিটিং এবারে শুরু হয়েছে। সবাই এসে গেছেন। এমনকি; কপালে চন্দনের ফোঁটা লাগানো মরাঠি ব্রাহ্মণ ডঃ দেশপাণ্ডেও। এসেই বললেন, “দূর দূর, এক্স-রে না হাতি। সামান্য একটু মচকে গেছে মাত্র। ফুলোটা তো ইতিমধ্যে কমে গেছে দেখছি। আর দু-একবার লাগান, একদম মিলিয়ে যাবে। আরে মশাই, চুন-হলুদের কোনও তুলনা হয়?”
গোপাল শর্মা লোকাল থানার ও.সি.। তিনি বললেন, “মিঃ ভাদুড়ি, তাড়াতাড়ি আমাকে থানায় ফিরতে হবে। তার আগে কয়েকটা কথা জেনে নিতে চাই। আমার প্রথম প্রশ্ন, মেজর গুপ্ত যে মিসেস মিত্রকে মারতে চান, এমন কথা আপনার মনে হল কেন? ওঁর মোটিভটা কী? একটা কিছু মোটিভ তো থাকতে হবে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মোটিভ আর কিছুই নয়, অর্থলোভ। বিষ্টু একটা চোখ-ধাঁধানো নার্সিং হোম করতে চেয়েছিল। এ-কথা তার মুখেই আমরা শুনেছি। কিন্তু তার জন্যে যে বিরাট অঙ্কের টাকা দরকার, সেটা সে জোগাড় করে উঠতে পারছিল না।”
গোপাল শর্মা বললেন, “কিন্তু মিসেস মিত্রকে মারলেই বা সে-টাকা পাওয়া যাবে কেন? উনি মরলে ওঁর প্রপার্টি তো ওঁর স্বামী পাবেন।”
“আইনত তা-ই তো পাবার কথা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু মিসেস মিত্র যদি একটা ইচ্ছাপত্ৰ মানে উইল করে আর-কাউকে সেই প্রপার্টি দিয়ে যান, তা হলে?”
“সেটা অবশ্য আলাদা কথা। কিন্তু তেমন কোনও উইল কি মিসেস মিত্র করেছেন?”
ভাদুড়িমশাই সাবিত্রী দেবীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার ধারণা, করেছেন। নইলে কেন বিষ্টু আপনাকে মারবার ব্যবস্থা করবে? কোনও অর্থই তো হয় না। কী মিসেস মিত্র, আপনি কি এমন কোনও উইল করেননি, যাতে বলা হয়েছে যে, আপনি মারা গেলে আপনার প্রপার্টি আর নগদ টাকাকড়ির পুরোটা কিংবা বেশির ভাগটা মেজর গুপ্ত পাবেন? করেননি?”
মিসেস মিত্র মৃদু গলায় বললেন, “করেছি।”
মাধব মিত্র বললেন, “সে কী, আমি তো এর কিছুই জানি না।”
চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকালেন মিসেস মিত্র। তারপর একই রকমের মৃদু গলায় বললেন, “জানাইনি, তাই জানো না। উইলটা গত অক্টোবর মাসে মেজর গুপ্তের চেম্বারে তাঁর সামনে বসেই আমি করেছিলাম। কেন করেছিলাম, তাও বলি। আমার এই প্রপার্টি আর টাকাকড়ি নিয়ে আমি যে কিছু কম ভেবেছি, এমন মনে কোরো না। ভেবে-ভেবে কোনও কূলকিনারা পাইনি। সত্যিই তো, আমার স্বাস্থ্য ভাল নয়, আমি হার্টের রুগি, যে-কোনও দিন একটা ম্যাসিভ হার্ট-অ্যাটাক হয়ে আমার মৃত্যু ঘটতে পারে, তা হলে এই যে এত সব আমি করেছি, এ-সব আমি কাকে দিয়ে যাব? তোমাকে? সম্পত্তি বাড়ানো তো দূরের কথা, কী করে সেটা রাখতে হয়, তাও তুমি জানো না। আজেবাজে কোম্পনির শেয়ার কিনে, দু’দিনে তুমি এ-সব উড়িয়ে দেবে। তা হলে?”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন মিসেস মিত্র। তারপর বললেন, “একটা ছেলে কি মেয়ে থাকলে তাকে দেওয়া যেত। কিন্তু তাও আমাদের নেই। ফলে আমি দান করে দেবার কথা ভাবছিলুম। এমন-কোনও কাজে দান করব, যাতে পাঁচজনের উপকার হয়। আর ঠিক সেই সময়েই মেজর গুপ্ত একদিন দুঃখ করে আমাকে বলেন যে, তিনি এমন একটা নার্সিং হোম করার কথা ভাবছেন, যাতে সব রকমের পরীক্ষা আর চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু নেহাতই টাকার অভাবে তিনি কাজে হাত দিতে পারছেন না। বাস, ওইটুকু বলারই দরকার ছিল। তার পরদিনই ওঁর নার্সিং হোমে আমার উকিলকে ডাকিয়ে এনে আমি উইল করে ফেলি।”
সঞ্জীব চতুর্বেদী মুসৌরির পুলিশ-অফিসার। বললেন, “দ্যাট এক্সপ্লেনস ইট। মোটিভ তো পাওয়া গেল। কিন্তু মিঃ ভাদুড়ি, খুনটা উনি কীভাবে করতে যাচ্ছিলেন, সেটাও বলুন।”
“নিজের হাতে নয়,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিষ্ণু ওখানকার নার্স মিসেস নির্মলা সিনহার হাত দিয়ে ওটা করাতে যাচ্ছিল। অ্যান্ড দ্যাট অলসো থ্রু আ ভেরি ক্লেভার মেথড।”
“মেথডটা কী?”
পাশের টেবিলে রাখা একটা ব্রাউন পেপারের মোড়ক থেকে একটা ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ বার করে ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন, এই সিরিঞ্জের তলার অর্ধেকটা ভর্তি রয়েছে তরল একটা ওষুধ দিয়ে। উপরের অর্ধেকটা ফাঁপা দেখাচ্ছে তো? কিন্তু তাই বলে ফাঁপা নয়, ওখানে বাতাস রয়েছে।”
আমি বললুম, “তাই তো, এইজন্যেই তখন আমার মনে হয়েছিল যে, ইঞ্জেকশন দেবার আগে যা-যা করা দরকার, নার্স সেটা করল না, একটা-কোনও কাজ বাদ পড়ল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “রাইট। ইঞ্জেকশন দেবার আগে সিরিঞ্জ থেকে ওই বাতাসটা বার করে দেওয়া দরকার। অথচ পাকা নার্স হয়েও মিসেস সিনহা সেটা করলেন না। বাতাস-সুদ্ধু তিনি ইনট্রাভেনাস ইঞ্জেকশন দিতে যাচ্ছিলেন। দিতে পারলে তার ফল কী হত, ডঃ দেশপাণ্ডের কাছে সেটা জেনে নিন।”
ডঃ দেশপাণ্ডে বললেন, “রক্তবাহী শিরার মধ্যে এয়ার-বাব্ল ঢুকে গেলে আর দেখতে হত না। তার ফল হত মারাত্মক। রোগী মারা যেতে পারত।”
গোপাল শর্মা বললেন, “সবই বুঝতে পারছি মিঃ ভাদুড়ি। কিন্তু কেসটা কীভাবে সাজাব, আমি সেটাই ভাবছি তো। সিরিঞ্জ থেকে এয়ার বাল বার না করেই যে নার্স ইঞ্জেকশন দিতে যাচ্ছিল, এটা প্রমাণ করা কিন্তু শক্ত হবে।”
আমি বললুম, “কিন্তু এটা যদি প্রমাণ করা না যায়, তা হলে শুধু মিসেস সিনহা কেন, মেজর গুপ্তও তো জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। হত্যার ষড়যন্ত্রের চার্জ তাঁর বিরুদ্ধেও টিকছে না।”
“বিষ্টর বিরুদ্ধে চার্জ শুধু এই একটা হবে কেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অভিযোগের ফিরিস্তি আরও লম্বা হবে।”
গোপাল শর্মা বললেন, “আর কী অভিযোগ হতে পারে?”
ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিরণবাবু, ২৪ তারিখে দেরাদুন থেকে মুসৌরিতে ফিরে যাবার পর বিকেলবেলায় রাস্তার ধারের একটা দোকান থেকে দুটো ফোন করেছিলুম, মনে পড়ে?”
বললুম, “পড়ে বই কী। একটা ফোন দেরাদুনে করেছিলেন, তবে অন্যটা কোথায় সেটা বলেননি।”
“অন্যটা শ্রীনগরে করেছিলুম। কেন করেছিলুম জানেন?”
“না তো।”
“করেছিলুম বিষ্টুর দেওয়া দুটো খবর সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্যে। বিষ্টুর প্রথম স্ত্রী আলমোড়ায় স্টোভ ফেটে মারা যায়। আর দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যায় শ্রীনগরের হাসপাতালে। এই যে খবর, এটা ব্যাঙ্গালোরে আমরা বিষ্টুর কাছে জেনেছি। ইন ফ্যাক্ট, এ দুটো ঘটনা কোন বছরের, তাও আমাদের জানা আছে। কিন্তু ২৫ তারিখেই রাত বারোটা নাগাদ আমাদের এজেন্টরা রিং ব্যাক করে আমাকে কী জানাল ভাবতে পারবেন?”
সঞ্জীব চতুর্বেদী বললেন, “কী জানালেন তাঁরা?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আলমোড়ায় আমাদের এজেন্ট নেই। ফলে সেখানকার খবর পেতে হয় থু আওয়ার দেরাদুন-এজেন্ট। তা দেরাদুনের এজেন্ট আলমোড়া থেকে খবর নিয়ে জানালেন যে, ওই সময়ে ওখানে ডঃ বি. গুপ্ত বলে এক ভদ্রলোক ছিলেন অবশ্যই, তবে তাঁর স্ত্রী স্টোভ ফেটে মারা যাননি। ওখানকার নার্সিং হোমে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসাব ফুড পয়জনিংয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। বুঝুন ব্যাপার।”
গোপাল শর্মা বললেন, “আর শ্রীনগরের এজেন্ট কী খবর দিলেন?”
“সে তো আরও মারাত্মক কথা বলল। ওই বছরে ওই সময়ে শ্রীনগরের কোনও হাসপাতাল কি নার্সিং হোমে নাকি মিসেস গুপ্ত নামে কোনও পেশেন্ট আদৌ ভর্তিই হয়নি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “ওরেব্বাবা, এ কী সব্বোনেশে কাণ্ড!”
গোপাল শর্মা আর-কোনও প্রশ্ন করলেন না। দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ ভাদুড়ি। যা বলেছেন, তা-ই যথেষ্ট। এবারে আমাদের চ্যানেলে যেটুকু যা খবর নেবার, সেটা আমরা নিচ্ছি। যদি দেখি যে, আপনার কথাই ঠিক, অর্থাৎ ওঁর দুই স্ত্রীর একজনেরও ডেথ ন্যাচারাল নয় কিংবা ডিউ টু অ্যাক্সিডেন্ট ঘটেনি, অন্তত আমাদের তরফে একটা ওয়াটারটাইট কেস দাঁড় করাতে তা হলে একটুও অসুবিধে হবে না।”
সঞ্জীব চতুর্বেদীও চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। বললেন, “উঠতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু না-উঠে উপায়ও তো নেই, আমাকে আবার মুসৌরি ফিরতে হবে। শুধু যাবার আগে একটা প্রশ্ন করি। মেজর গুপ্ত যে মিসেস মিত্রকে খুন করতে চাইছেন, এই সন্দেহ আপনার প্রথম কখন হল?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সন্দেহ একটা গোড়ার থেকে ছিলই। বেছে-বেছে কেউ যখন বড়লোকের একমাত্র সন্তানকে বিয়ে করে, তার বউ পটাপট মরে গেলেই আমার সন্দেহ হয়। আই স্টার্ট স্মেলিং আ র্যাট। ভাবি যে, ডালমে কুছ কালা হ্যায়। সন্দেহটা পাকা হয় দেরাদুন আর শ্রীনগরের এজেন্টের কাছ থেকে খবর পাবার পরে। তার উপরে আবার বিষ্টুর সঙ্গে কাল কথা বলবার সময় যখন দেখলুম যে, মিসেস মিত্রের উপরে এই যে সব হামলা হচ্ছিল, এ ব্যাপারে আমার নজরটাকে ও কায়দা করে মাধব মিত্রের দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে, তখন তো ব্যাপারটা একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেল। বুঝলুম যে, ওই কালপ্রিট।”
“হামলাগুলো উনি কাকে দিয়ে করাচ্ছিলেন?”
“স্কুটারের ধাক্কা দুটো কাকে দিয়ে খাইয়েছিলেন, বলতে পারব না। আর ওই স্কাইলাইট ভেঙে ঢুকবার ঘটনাটা হয়তো বার্গলারিরই ব্যাপার। তবে সুইচের তার নেকেড করে রাখা আর বাথরুমের মেঝেয় সাবান-গোলা জল রেখে আসা, এ দুটো কাজ যে দুর্গাকে দিয়ে করানো হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু দুর্গা তো পালিয়েছে। তাকে ধরবার ব্যবস্থা করুন। তাকে যদি রাজসাক্ষী হিসেবে দাঁড় করাতে পারেন, তো আপনাদের চোদ্দো আনা সমস্যা সে-ই মিটিয়ে দিতে পারবে।”
গোপাল শর্মা বললেন, “সে ধরা পড়বে, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
সঞ্জীব চৰ্তবেদীকে সঙ্গে নিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে, তিনি জিপে উঠে পড়লেন। হেডলাইট জ্বেলে কম্পাউন্ড থেকে জিপটা বেরিয়ে গেল।
ডঃ দেশপাণ্ডে বিদায় নিলেন তার মিনিট পাঁচেক বাদে। নৈষ্ঠিক ধর্মপ্রাণ মানুষ। নিত্য দু’বেলা গণেশ পূজা করেন। বললেন, “সারা দিন বিস্তর ময়লা ঘেঁটেছি, এখন বাড়ি ফিরে স্নান করে পুজোয় বসব।”
তিনি চলে যাবার পরে, হঠাৎই অত্যন্ত তীব্র চোখে মাধব মিত্রের দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এতক্ষণ বাইরের লোক ছিল, তাই কিছু বলিনি। কিন্তু এবারে তো আপনাকে গোটাকয় অপ্রিয় কথা না-বলে কোনও উপায় নেই।”
দেখলুম, ভাদুড়িমশায়ের কথা বলবার ভঙ্গি দেখেই মাধব মিত্র নিমেষে কেমন যেন গুটিয়ে গিয়েছেন। স্খলিত গলায় বললেন, “বলুন।”
“মেজর গুপ্তের উপরে আপনার রাগ থাকাটা যে অস্বাভাবিক নয়, তা আমি বুঝি। আপনার ধারণা, আপনাদের দাম্পত্য জীবনে ওই লোকটি একটা কুগ্রহ হয়ে ঢুকেছিল। উইলের কথাটা আপনি জানতেন না ঠিকই, কিন্তু আপনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, মিসেস মিত্রকে ও আপনার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তা-ই না?”
কথাটার সরাসরি উত্তর না দিয়ে মাধব মিত্র বললেন, “আমি কি ভুল ভেবেছিলুম?”
“এ-কথার নির্ভুল উত্তর মিসেস মিত্রই আপনাকে দিতে পারবেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে আমি ওঁকে যতটুকু বুঝেছি, তাতে বলতে পারি যে, উনি কখনও দূরে সরে যাননি, যাবেনও না। আপনাকে উনি পছন্দ করুন আর না-ই করুন, আপনাকেই উনি আঁকড়ে ধরে থাকবেন। কেন থাকবেন জানেন? না-থাকলে যেহেতু এটা প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, আপনাকে বিয়ে করাটা ওঁর ঘোর বোকামি হয়েছিল। লোকে বলবে যে, উনি হেরে গেলেন। কিন্তু উনি ভীষণ জেদি মহিলা, অমন কথা বলবার কোনও সুযোগই উনি কাউকে দেবেন না। ওঁর জেদই ওঁর পথ আটকে দাঁড়াবে।”
মাধব মিত্র একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আমি ভুল করেছিলুম।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, ওটা বোধহয় মিসেস মিত্র ক্ষমা করে দিতে পারবেন। কিন্তু বিষ্টুর উপরে যতই রাগ থাক আপনার, লোক চিনতে আপনার ভুল হয় কেন?…না না, একটিও কথা বলবেন না, বিষ্টু ভেবে আপনি যে দুটো গুণ্ডা লাগিয়ে প্রথম দিনই আমাদের এই নিরীহ বন্ধু সদানন্দবাবুকে পেটাবার ব্যবস্থা করেছিলেন, সেটা কি আমি বুঝতে পারিনি? ভুলটা নিশ্চয় ওঁর মাঙ্কি ক্যাপের জন্যে হয়েছিল, তা-ই না?”
মিসেস মিত্র বললেন, “ছিছি, এই কাণ্ড তুমি করেছ? এ তো ভাবাই যায় না!”
মাধব মিত্রের মাথাটা একেবারে বুকের উপরে ঝুলে পড়েছিল। সেই অবস্থাতেই বললেন, “ভারী অন্যায় হয়ে গেছে। আমি…আমি ক্ষমা চাইছি।”
সদানন্দবাবু বিব্রত বোধ করছিলেন। বললেন, “তাতে কী হয়েছে, তাতে কী হয়েছে, অমন একটু-আধটু ভুল তো হয়েই থাকে। কী বলব মশাই, শ্বশুরবাড়িতে মাঝরাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে চোর ভেবে আমি তো একবার আমার এক পিসশাশুড়িকেই পেছন থেকে জাপটে ধরেছিলুম। তিনি নাকি তাঁর জর্দার কৌটোর খোঁজ করতে আমাদের শোবার ঘরে এসে ঢুকেছিলেন। ছ্যাছ্যা, সে ভারী লজ্জার ব্যাপার হয়েছিল, মশাই।…আরে না না, আমি কিচ্ছু মনে করিনি।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সদানন্দবাবুও আপনাকে ক্ষমা করে দিলেন। আমি কিন্তু ক্ষমা করতে পারছি না। কেন পারছি না, তাও বলি। আপনি বড্ড মিথ্যে কথা বলেন। কলকাতায় আমার বোনের বাড়িতে বসে প্রথম যখন আপনার সঙ্গে কথা হয়, তখন আপনি দু’দুটো মিথ্যে কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে একটার কথা আমি এঁদের বলেছি, এবারে অন্যটার কথা বলছি। মশাই, কলকাতায় তো আপনি গণেশ অ্যাভিনিউয়ের ক্যালকাটা হোটেলে উঠেছিলেন। সেটা হল রাস্তার দক্ষিণ ফুটপাথে। তা সেখান থেকে আলিপুরে যাবার জন্যে আপনাকে রাস্তা পেরিয়ে উত্তর দিকের ফুটপাথে যেতে হবে কেন? যাবেন তো সাউথে, তার জন্যে ট্যাক্সি ধরতে হলে ওই দক্ষিণ ফুটপাথ থেকেই আপনাকে ধরতে হবে। সুতরাং রাস্তা পার হবার কথাটা সম্ভবত মিথ্যে। কী, ভুল বলছি?”
মাধব মিত্র মাথা নিচু করে বসে ছিলেন, সেইভাবেই বসে রইলেন। কিছু বললেন না। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাকে কেউ ধাক্কাও মারেনি, উপর থেকে আপনাকে তাক করে কেউ ফুলের টবও ফেলেনি। সবই মিথ্যে কথা। আসলে ওইসব কথা বলে আমাকে আপনি এখানে নিয়ে আসতে চাইছিলেন। কিন্তু তার জন্যে গুচ্ছের মিথ্যে কথা বলবার তো কোনও দরকার ছিল না।”
এতক্ষণে মুখ তুললেন মাধব মিত্র। বললেন, “সতিই দরকার ছিল না। তবু যে মিথ্যেকথা বলে আপনাকে এখানে নিয়ে আসতে চাইছিলুম, তার কারণ তো আপনার না-বুঝবার কথা নয়। আমি জানতুম যে, এখানে এলেই আপনি আসল ব্যাপারটা আঁচ করতে পারবেন, বুঝতে পারবেন যে, বিপদ আমার নয়, আমার স্ত্রীর। আর সেই বিপদটা যে কোন দিক থেকে আসছে, সেটা ধরে ফেলাও আপনার পক্ষে শক্ত হবে না।”
“কিন্তু মুঠিয়ার মন্দিরটা যে আপনার ঠাকুর্দা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এই মিথ্যেটা আপনি বলেছিলেন কেন?”
মিসেস মিত্র বললেন, “তা-ই বলেছিলেন নাকি?”
“হ্যাঁ।”
“ওটা কিন্তু খুব একটা মিথ্যেকথা বলেনি।” সাবিত্রী মিত্র মৃদু হেসে বললেন, “দিল্লিতে আমরা তো একই পাড়ার বাসিন্দা ছিলুম। শুনেছি, আমার গ্রেট গ্র্যান্ডফাদারকে আমার শ্বশুর ডাকতেন জ্যাঠামশাই বলে। লতায়-পাতায় একটা সম্পর্কও ছিল শুনেছি। ফলে, এদের জেনারেশনে তাঁকে ওই ঠাকুর্দা বলাটাই চালু হয়ে যায়। এরা তাঁকে ছেলেবেলায় দেখেছে তো।”
শুনে আমরা হো-হো করে হাসলুম কিছুক্ষণ। ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা আমার ভেবে দেখা উচিত ছিল। মিঃ মিত্র, আই অ্যাপোলোজাইস।”
মিসেস মিত্র বললেন, “ক্ষমা চেয়ে ওকে আর লজ্জা দেবেন না, মিঃ ভাদুড়ি। বরং বলুন, এই প্রপার্টিগুলো আমরা কাকে দিয়ে যাব। একটা-কিছু পরামর্শ দিন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রপার্টি আপনার, টাকাকড়ি আপনার। সুতরাং আপনার যাকে দিতে ইচ্ছে হয়, তাকেই আপনি দেবেন। শুধু একটা কথা, যার ফেভারেই ইচ্ছাপত্র বা উইল করুন, এমনকি তাকেও সেটা জানতে দেবেন না। দিলে কী হয়, তা তো নিজের চোখেই দেখলেন। অক্টোবরে উইল করলেন, আর নভেম্বর থেকেই শুরু হল হামলা।”
আমি বললুম, “একটা কথা এখনও বুঝতে পারছি না। শুনেছি, মেজর গুপ্তের পরামর্শেই মিঃ মিত্র ব্যাঙ্গালোরে টেলিফোন করে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তা মেজর গুপ্ত অমন পরামর্শ দিতে গেলেন কেন?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বিষ্ণু ওটাই মস্ত বড় ভুল করেছিল। সম্ভবত ধরেই নিয়েছিল যে, ওর দাদা যখন আমার বন্ধু, তখন অপরাধীর খোঁজে নেমে ওর কথাটা আমি ভাববই না। ভুল করেছিল। মস্ত ভুল।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর মিসেস মিত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মুঠিয়ার বাগানে আপনাকে যে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করতে বলেছিলুম, সেটা করেছেন?”
“সময় পেলুম কোথায়, এবারে করব।”
“তাড়াতাড়ি করে ফেলুন। কথাটা এইজন্যে বলছি যে, ওখানকার মন্দিরের ঘন্টাটা কাঁসা কিংবা পেতলের নয়। কিরণবাবু ওটা একবার বাজিয়েছিলেন। শুনে আমি চমকে উঠেছিলুম। আমার ধারণা ওটা আরও প্রেশাস কোনও মেটাল দিয়ে তৈরি। সোনার হতে পারে।”
মিসেস মিত্র বললেন, “বলেন কী!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার ধারণা, আমি ঠিকই বলছি। এখন আপনি কী করবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। …কিন্তু আর নয়, আমার কাজ তো শেষ, এবারে উঠতে হবে। আর যদি দেরি করি তো মুসৌরি যাবার ট্যাক্সি পাব না। কলকাতাতেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফেরা দরকার। মিঃ মিত্র, দেরাদুন এক্সপ্রেসে তিনটে বার্থের রিজার্ভেশনের দায়িত্ব আপনার। ওটার ব্যবস্থাও এবারে চটপট করে ফেলুন।”
মাধব মিত্র ইতিমধ্যে তাঁর ব্যক্তিত্ব আবার ফিরে পেয়েছেন। বললেন, “ফেরাটা কোনও ব্যাপার নয়। বিজুই আপনাদের মুসৌরিতে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু ফিরতে দিচ্ছে কে? না না, আজ আপনারা মুসৌরিতে ফিরছেন না। আমাদের এখানে ঘরের অভাব নেই। রাতটা অতএব এখানেই থাকছেন। দুর্গা পালিয়েছে বলে খাওয়ার অসুবিধে হবে ভাবছেন তো? কিচ্ছু অসুবিধে হবে না। বিকেলবেলায় এখানকার হোটেলে আমি অর্ডার দিয়ে রেখেছি। একটু বাদেই বিজুকে সেখানে পাঠিয়ে খাবার আনিয়ে নেব।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে তো ল্যাঠা চুকেই গেল। কিন্তু কাল থেকে আপনাদের রান্নাবান্নার ব্যবস্থা কী হবে? দুর্গা নেই, কুক আসছে না, ইনিও তো অসুস্থ।”
সাবিত্রী মিত্র বললেন, “আমাকে নিয়ে ভাববেন না, কাল সকালের মধ্যেই আমি ঠিক হয়ে যাব। তবে কিনা, আমি একটা অন্য কথা ভাবছি, কাল ভোরে ঘুম থেকে উঠে সবাই মিলে মুসৌরি চলে গেলেই তো হয়। নিজেদের একটা হোটেল যখন রয়েছে, তখন আর আমি রেঁধে মরি কেন? দিন-তিনেক ওখানে সবাই মিলে বেশ আনন্দ করে থাকা যাবে। অবশ্য মিঃ ভাদুড়ি যদি আর ক’টা দিন থাকতে রাজি হন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “থাকতেই হবে। নইলে আমি কেম্টি ফল্সটা দেখব কখন? তা ছাড়া হরিদ্বার, হৃষীকেশ, লছমনঝুলা, এ-সব তো দেখা হয়নি!”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তা হলে তো থাকতেই হচ্ছে।”
কেটি ফলস দেখে ফিরবার পথে সদানন্দবাবু যে প্রশ্নটা করেন, সেটা আমার অনেক আগেই করা উচিত ছিল। “আচ্ছা ভাদুড়িমশাই, নার্সের হাত থেকে হাইপোডোর্মিক সিবিঞ্জটা কেড়ে নিয়ে আপনি বলেছিলেন, ‘ছিঃ ঊর্মিলা!’ কিন্তু উনি তো নির্মলা সিনহা। ওঁকে আপনি উর্মিলা বললেন কেন?”
“বাঃ, ও তো ঊর্মিলাই। ব্যাঙ্গালোরের সেই মেয়েটি, যার সঙ্গে বিষ্টুর বিয়ের কথা হয়েছিল। বিষ্টুরই আপত্তিতে বিয়েটা অবশ্য হয়নি।”
“তা হলে উনি এখানে এসে জুটলেন কী করে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার ধারণা, বিয়ে না করুক, বিষ্টুই ওকে লোভ দেখিয়ে এখানে টেনে এনে নিজের কাজের সঙ্গী করে নিয়েছে। কিংবা কে জানে, গোপনে হয়তো বিয়েও করে থাকতে পারে।”
“কিন্তু ওঁর পদবি তো সিনহা।”
ভাদুড়িমশাই হাসলেন। তারপর বিষণ্ণ গলায় বললেন, “যেমন নাম পালটেছে, চেহারাও অনেকটা পালটেছে, তেমন ওটাও হয়তো ছদ্ম-পদবি। যা-ই হোক, আমার কাজ আমি করেছি, এবারে পুলিশের কাজ পুলিশ করুক।”
রচনাকাল : ১৪০১
