ভুতুড়ে ফুটবল (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৩)

রবিবার রাত দশটা নাগাদ কৃপানাথ দত্তের ফোন আসতে ভাদুড়িমশাই তাকে জানিয়ে দেন যে, আমরা মোট তিনজন তার ওখানে যাচ্ছি। শুক্রবার সকাল আটটা নাগাদই যে আমরা গাড়িতে করে শক্তিগড়ে পৌঁছচ্ছি, তাও তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়। তাতে তিনি বলেন যে, শক্তিগড়ে ঢুকে খানিকটা এগোলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের বাঁ দিকে হেম ঘোষের মিষ্টির দোকানে ভূনাথ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে।

 

তা আজ ১১ এপ্রিল শুক্রবার সকালে শক্তিগড়ে ঢুকে দেখলুম যে, ভূতনাথ সত্যিই আমাদের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে আটটা নয়, পোঁছতে পৌঁছতে পৌনে ন’টা বেজে যায়। কৃপানাথ দত্তদের বাড়ি অবশ্য ঠিক শক্তিগড়ে নয়; মুখে তারা শক্তিগড়ের কথাই বলেন বটে, কিন্তু বাড়িটা আসলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ছেড়ে খানিকটা ভিতরে ঢুকে এমন একটা এলাকায়, যেখানে পাকা বাড়ি গোটাকয় আছে ঠিকই, কিন্তু কাঁচা বাড়ির সংখ্যা সেই তুলনায় অনেক বেশি। রাস্তাটা অবশ্য কঁচা নয়, পিচের না-হলেও খোয়া-পেটানো।

 

দত্তদের বাড়িটা যে অনেক কালের, চেহারা দেখলেই সেটা বোঝা যায়। দোতলা বাড়ি; সদর আর অন্দর দুটো মহলই মস্ত মাপের; প্রচুর ঘর, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে তার কোনওটাই নেহাত ছোট নয়; সেকালের বাড়ি বলে সিলিং রীতিমতো উঁচু, জানলা দরজাও বড় বড়, ফলে ঘরগুলিতে গুমোট কিংবা দম-আটকা ভাবের সৃষ্টি হয়নি। চুন সুরকির গাঁথনির মোটা দেওয়াল বলে ঘরগুলো বেশ ঠাণ্ডাও বটে। এখানে এসে পৌঁছবার সঙ্গে-সঙ্গেই যে এত সব ব্যাপার খেয়াল করেছিলুম, তা নয়। সবই আস্তে-আস্তে দেখি, আর যতই দেখি, ততই বুঝতে পারি যে, কৃপানাথ দত্ত কেন কষ্ট করে এখান থেকে রোজ বর্ধমানে যান, কেন বর্ধমান শহরেই স্থায়ীভাবে তিনি থেকে যান না। আসলে এই ধরনের বাড়ির মধ্যে এমন একটা মায়ার ভাব থাকে, মানুষ যাতে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যায়।

 

আসার পথে মগরায় খানিকক্ষণের জন্যে দাঁড়াতে হয়েছিল। রাস্তার ধারের একটা দোকানে তখন চা-বিস্কুট খেয়ে নিয়েছি। এখানে এসে হাতমুখ ধুয়ে ফের জলখাবার খেতে হল। বাড়ির পাশে মস্ত দিঘি। অনেক কাল বাদে সাঁতরে চান করা হল সবাই মিলে। তারপর মধ্যাহ্নভোজ সেরে ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়েও নিয়েছি। ঘুম থেকে উঠেছি তিনটে নাগাদ। তারপর খেলা দেখতে গিয়েছিলুম। সুলতানপুর স্পোটিং আর পোড়াবাজার ইলেভেনের সেমিফাইনাল খেলা। তাতে সুলতানপুরকে পাঁচ গোলে হারিয়ে পোড়াবাজার একেবারে ড্যাং ড্যাং করে ফাইনালে উঠে গেল। অন্য দিকের সেমিফাইনালে পলাশডাঙা ফুটবল ক্লাবকে একেবারে শেষ মিনিটে একটা গোল দিয়ে শক্তিগড় ব্রাদার্স ফাইনালে উঠেছে। কাল শনিবার খেলা নেই। পরশু রবিবার ফাইনাল।

 

মফস্বলের গ্রামে-গঞ্জে এইসব টুর্নামেন্ট নেহাত কম উন্মাদনা জাগায় না। যেখানে খেলা, সেখানকার স্থানীয় লোক তো বটেই, তার আশপাশের সব এলাকা থেকেও প্রচুর লোক খেলা দেখতে আসে। শুনলুম খেলার মাঠে নোজই বেশ ভিড় হয়। আজও যে হয়েছিল, সে তো স্বচক্ষেই দেখলুম। সুলতানপুর স্পোটিং যে খুব দুর্বল দল, তা নয়, এই নক-আউট টুর্নামেন্টের ট্রোফি গত বছর তারাই পেয়েছিল। কিন্তু এবারে যে সেমিফাইনালে তাদের গোহার হারতে হল, তার একটা কারণ যদি হয় রেফারির দু’ দুটো ভুল সিদ্ধান্ত, তত অন্য কারণ পোড়াবাজার টিমের ফরোয়ার্ড লাইনের দুর্ধর্ষ দুই খেলোয়াড়, বিপক্ষের ডিফেন্সকে যারা ভেঙেচুরে একেবারে তছনছ করে দিচ্ছিল।

 

রাত্তিরে তাই নিয়ে কথা হচ্ছিল। খাওয়ার পাট একটু আগে মিটেছে; সদর বাড়ির দোতলায় পাশাপাশি দুটো ঘরে আমাদের রাত্রিবাসের ব্যবস্থা হয়েছে; বিছানা পাতা, মশারি খাটানো, ভূতনাথের তদারকিতে সমস্ত কাজ সমাধা হয়েছে, এখন গিয়ে শুয়ে পড়লেই হয়। কিন্তু শুয়ে পড়ার ইচ্ছে কারও আছে বলে মনে হল না। আপাতত আমরা বারান্দার উপরে গোল হয়ে বসে গল্প করছি। দিব্যি ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে, সামনে পুকুর, তার জলের উপরে কোত্থেকে যেন আলো এসে পড়েছে, সব মিলিয়ে এমন একটা পরিবেশ, যাতে জেগে থাকতেই ভাল লাগে।

 

কৃপানাথ দত্ত বললেন, “বুঝলে হে চারু, বিশ্বনাথের নামে এই টুর্নামেন্ট চালু করেছি নাইন্টিটুতে, অথচ এর মধ্যে একবারও আমরা ট্রোফিটা ঘরে তুলতে পারিনি। এদিকে

 

আবার এবার নিয়ে পরপর তিন বার আমরা ফাইনালিস্ট। গত দু’ বছর অল্পের জন্যে ট্রোফি ফশকে যায়। এবারে কী হবে কে জানে।”

 

ভাদুড়িমশাই তালুতে জিভ ঠেকিয়ে চুকচুক করে আক্ষেপ প্রকাশ করে বললেন, “এবারেও বোধহয় ফসকে যাবে।”

 

“একথা কেন বলছ?”

 

“বলছি পোড়াবাজার টিমের ফরোয়ার্ড লাইনের খেলা দেখে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “বিশেষ করে ও-দুটো ছোঁড়ার তো কোনও তুলনাই হয় না। ওরে বাপ রে বাপ, ওদের দেকে তা আমার লক্ষ্মীনারায়ণ আর মুর্গেশের কম্বিনেশনের কতা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আর কিকের জোর যা দেকলুম, একেবারে পাগলির মতো।”

 

“লক্ষ্মীনারায়ণ-মুর্গেশের খেলা আমি দেখিনি,”ভাদুড়িমশাই বললেন, “পাগলিরও না, তবে সোমানা-আপ্পারাওয়ের খেলা তো দেখেছি। না হে কৃপানাথ, আজ ওরা যা খেলল, পরশু যদি তার অর্ধেকও খেলতে পারে তো তোমার… মানে শক্তিগড়ের নো চান্স।”

 

কৃপানাথ দত্ত একেই মুষড়ে ছিলেন, ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে আরও নেতিয়ে পড়লেন। সেই অবস্থাতেও, সম্ভবত নিজেই নিজেকে একটু সাহস জোগাবার জন্যে, মজ্জমান ব্যক্তি যে-ভাবে হাতের সামনে যা-কিছু পায়, তা-ই আঁকড়ে ধরে, সেইভাবে বললেন, “অবিশ্যি আমাদের টিমও মোটেই ফ্যালন নয়। ভুতোর… মানে বিশ্বনাথের ছেলের খেলা তো তুমি দ্যাখোনি, দেখলে বুঝতে পারতে যে, ওই রকমের বডি-ফিটনেস আর স্টামিনা না-ই থাক, স্রেফ ট্যালেন্ট আর ফুটবল-সেন্সের কথা যদি ওঠে, তো ভুতো ওদের চেয়ে একটুও পিছিয়ে নেই, বরং দু’কদম এগিয়ে আছে। কিন্তু মুশকিল কী জানো, পাওয়ার-টেনিসের মতো এ হল পাওয়ার-ফুটবলের যুগ। যার যত মাল-পাওয়ার, খেলার মাঠে তার তত দাপট।… নাঃ, ওই মা-ম্যান দুটোই পোড়াবাজারকে জিতিয়ে দেবে, এবারেও আমরা পারলুম না!”

 

বললুম, “এত হতাশ হচ্ছেন কেন? আজ ভাল খেলেছে বলেই যে পরশুও ওরা ভাল খেলবে, তার তো কোনও মানে নেই। আমাদের কলকাতা ময়দানের নামজাদা সব ফুটবলারদের দেখছেন তো, পরপর দুদিন ওরা কেউ ভাল খেলে না। আজ যদি বাঘের মতো খেলল, তো কাল হয়তো খেলবে শেয়ালের মতো। না না, আপনি এত দমে যাবেন না তো।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভূতোবাবুর কথা বলছিলে। ওর খেলা তো দেখিনি। ওদের সেমিফাইনালের খেলা কবে ছিল?”

 

“গত সোমবার। সেদিন একসট্রা টাইম খেলানো হয়েছিল। তাও খেলাটা ড্র থেকে যায়। ফলে পরও… মানে বুধবার আবার খেলতে হয়। সেদিনও ড্র হতে যাচ্ছিল, কিন্তু একসট্রা টাইমের তিন মিনিটের মাথায় ভূতো কী বলব, অলমোস্ট আনবিলিভেবলি– একটা গোল করে বসে। সেই গোল্ডেন গোলেই আমরা জিতে যাই।”

 

“গোলটাকে অবিশ্বাস্য বলছ কেন?”

 

“এইজন্যে বলছি যে, মাঠের যে-হাফে আমরা খেলছিলুম, সেখান থেকেই একটা গ্রু পাস ধরে নিয়ে বিপক্ষের পরপর পাঁচজনকে কাটিয়ে বল নিয়ে ভূতো ওদের বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়ে, তারপর যেন ডান পায়ে শট নিতে যাচ্ছে, এইভাবে বাঁ দিকে ঝুঁকে পড়ে সেই অবস্থাতেই বাঁ পায়ে শট নেয়। গোলকিপারের কিছু করার ছিল না, কেননা, ভুতোর ওই বাঁ দিকে ঝোকা দেখেই সে কমিটেড হয়ে গিয়েছিল।”

 

বললুম, “গত ওয়র্লড কাপে আফ্রিকার একজন ফুটবলারকে এগেস্ট দ্য রান অব দ্য প্লে ওইভাবে একটা গোল করতে দেখেছি। সেও একেবারে একার চেষ্টায় গোল করা।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রাইট। গোলটা টিভিতে আমিও দেখেছিলুম। ইন ফ্যাক্ট দ্যাট। ওয়াজ অ্যাডজাজড টু বি দ্য বেস্ট গোল অভ দ্য টুর্নামেন্ট।… কিন্তু সে-কথা থাক। ভুতোর কথা হচ্ছিল। ওর খেলা আমি দেখিনি, তবে ওর মতো বয়েসে ওর বাপ কেমন খেলত, তা তো জানি। বিশ্বনাথের ফুটবল-ট্যালেন্টের অর্ধেকও যদি ভূতোবাবু পেয়ে থাকে, তো বলব, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তোমাদের হারতে হবে না, ইট ওন্ট বি আ ওয়ন সাইডেড অ্যাফেয়ার।”

 

কৃপানাথ বললেন, “আমি তো সেই ভরসাতেই রয়েছি, তবে বাইরে যে সেটা প্রকাশ করব, এমন সাহস পাচ্ছি না। তা ছাড়া এদিকে আবার আর-একটা ঝাট বেধেছে।”

 

“কিসের ঝঞ্ঝাট?”

 

“ঝঞ্ঝাট আমাদের ভুতোর মা অর্থাৎ ছোট বউমাকে নিয়ে।”

 

“এর মধ্যে আবার তিনি কী করে আসছেন?”

 

“আসছেন ভুতোর জন্যে।” কৃপানাথ একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “কে যেন তার কানে তুলে দিয়েছে যে, পোড়াবাজার টিমে দুটো জল্লাদ-মার্কা ছেলে আছে, ভুতো যদি খেলতে নামে তো তার ঠ্যাং না ভেঙে তারা ছাড়বে না।”

 

“তাই কী হয়েছে?”

 

“এই হয়েছে যে, বউমা কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছেন। তার ইচ্ছে নয় যে, ফাইনাল খেলায় ভূতোকে আমরা মাঠে নামাই।”

 

একটুক্ষণ থেমে রইলেন কৃপানাথ। তারপর বললেন, “আসলে ব্যাপারটা কী হয়েছে জানো, খেলার মাঠে বিশ্বনাথ একবার মাথায় খুব চোট পেয়েছিল, মাঠ থেকে সরাসরি ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। মারাত্মক ইনজুরি, কনকাশন হয়েছিল, বাঁচবার আশা ছিল না।”

 

“এটা কবেকার ব্যাপার?”

 

“বিশ্বনাথের বিয়ের পরের বছরের।” কৃপানাথ বললেন, “তারপরে আর বিশ্বনাথ মাঠে নামেনি। বউমারও সেই থেকে ফুটবলের ব্যাপারে একটা আতঙ্ক জন্মে গেছে। ছেলে ফুটবল খেলছে, এমনিতেই এটা তার পছন্দ নয়। তার উপরে যেই শুনেছেন যে, ভূতের ঠ্যাং ভাঙার জন্যে পোড়াবাজার টিম একেবারে তৈরি হয়ে রয়েছে, ব্যস, আর কথা নেই, সঙ্গে-সঙ্গে কান্না জুড়ে দিয়েছেন তিনি।”

 

সদানন্দবাবু অনেকক্ষণ কোনও কথা বলেননি। কিন্তু এবারে আর মুখ না-খুলে পারলেন না। বললেন, “বাঙালির যে কিছু হয় না, স্রেফ এইজন্যেই হয় না। আরে বাবা, কেল্লার গোরার বুটজুতোর লাথি খেয়ে ছেলের পা ভাঙতে পারে, অভিলাষ ঘোষের মা কি তা জানতেন না? নাকি দুখিরামবাবু জানতেন না যে, কিংকং-মার্কা সায়েবের কাঁচ থেকে বল কাড়তে গিয়ে তার ভাইপো ছোনে মজুমদারের মাথা ফাটতে পারে? কিন্তু অভিলাষ ঘোষের মা কি তার জন্যে কখনও কান্নাকাটি করেছেন, নাকি দুখিরামবাবু তার আদরের ভাইপোকে ঘরের মধ্যে আটকে রেকেচেন?… না না, ভূতনাথের মা’কে সবাই গিয়ে বলতে হবে যে, এটা কোনও কাজের কতা নয়, ভূতনাথকে খেলতে দিতে হবে প্রমাণ করতে হবে যে, বাঙালি লড়তেও ভয় পায় না, মরতেও ভয় পায় না। বাঙালি যদি আজ মরার ভয়ে লড়তে না চায়, বাঙালি যদি আজ লড়ার ভয়ে…”

 

“আরে দূর মশাই, সদানন্দবাবুকে বাধা দিয়ে আমি বললুম, “অত বাঙালি-বাঙালি করছেন কেন? পোড়াবাজার টিমের ছেলেগুলো কি বাঙালি নয়? তবে হ্যাঁ, ওদের বডি ফিটনেস যে তারিফ করার মতো, সেটা বলতেই হবে। ইন ফ্যাক্ট, আজকের খেলায় সুলতানপুর টিমের সঙ্গে ওটাই ওদের একটা মস্ত তফাত গড়ে দিয়েছিল।

 

“পরশুও দেবে!” কৃপানাথ বললেন, “তবে সুলতানপুরের মতো পাঁচ গোলে না হেরে যাই। ওইরকম গোহার হারলে আর মুখ দেখানো যাবে না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখুনি হারের কথা উঠছে কেন? ভুতোবা খেলবে তো?”

 

“তা খেলবে। ছোট-বউমাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আমি রাজি করাতে পারব। কিন্তু একা ভুতেই বা কী করবে। ও দুটো ষণ্ডাকে একা সামলানো ওর কম নয়।”

 

“ও কেন সামলাবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওদের পিছনে আর-দু’জনকে লাগিয়ে রাখো, ভুতোবাবু যাতে নিজের খেলাটা খেলতে পারে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “সেই সঙ্গে রেফারিকেও একটু টিপে দিন না!”

 

কৃপানাথ বললেন, “তার মানে?”

 

“মানে আর কী, সবই তো বোজেন, এই বাজারে সব জায়গাতেই যা হচ্ছে আর কী..আরে মশাই, খেলা শুরু হবার আগে রেফারিকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে…”

 

“আরে ছি ছি,” কৃপানাথ দাঁতে জিভ কেটে, দু হাতের বুড়ো আঙুল দুই কানের লতিতে ছুঁইয়ে বললেন, “ঘুষ দেবার কথা বলছেন তো? আরে রাম রাম, ও-সব চিন্তাকে মাথায় ঠাই দেবেন না মশাই!”

 

“কেন,” সদানন্দবাবু বললেন, “পরশুর খেলায় কি ধর্মপুর যুধিষ্ঠির এসে রেফারি হচ্চে নাকি?”

 

শুনে আমরা হাসলুম বটে, কিন্তু কৃপানাথ হাসলেন না। বললেন, “সরকারি ইঞ্জিনিয়ার মাখন শিকদারকে যদি চিনতেন তো এমন কথা আপনি বলতেন না বোসমশাই।”

 

“তার মানে?”

 

“মানে আর কিছুই নয়, পরশুর খেলা নডাক্ট করছে মাখন শিকদার, যার অনেস্টি একেবারে আনকোয়েশ্চেনেবল। যুধিষ্ঠির তো তাও একবার কায়দা করে একটা ডিজনেস্ট কাজ করেছিলেন…এই হত ইতি গজর কথাটা বলছি আর কি, কিন্তু মাখন শিকদার বোধহয় তাও কখনও করেনি।”

 

“বটে?”

 

“আজ্ঞে হ্যাঁ। বিশ্বেস না হয় তো যতীন ঘোষকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।”

 

“যতীন ঘোষ আবার কে?”

 

“একজন ঠিকেদার।” কৃপানাথ বললেন, “ঘুষ দিয়ে একটা ব্রিজ মেরামতির টেন্ডার বাগাবার তালে ছিল। তাও যে সত্যি-সত্যি ঘুষ দিয়েছিল, তা নয়, স্রেফ হাত কচলাতে কচলাতে মাখন শিকদারকে বলেছিল যে, কাজটা যদি পায় তা হলে শিকদার-মশাইয়ের বেকার শালাটিকে সে…। বাস, আর কিছু বলার দরকার হয়নি, ওই যে ইঙ্গিতটুকু করেছিল, ওরই জন্যে যতীন ঘোষ ব্ল্যাক লিস্টেড হয়ে যায়। গত দু বছরে লোকটা একটাও সরকারি কাজ পায়নি।… না না, ওকে কিছু বলতে গেলে হিতে বিপরীত হবে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এমনিতেও ও-সব নোংরামির মধ্যে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করি। লোকটি পাস-করা রেফারি তো?”

 

“অফ কোর্স।” কৃপানাথ বললেন, “তা নইলে ওকে দায়িত্ব দেব কেন?”

 

“ভাল কথা। কিন্তু শুধু পাসকরা রেফারি হলেই তো হয় না, ধাঁচটা কেমন?”

 

“তার মানে?”

 

“মানে জবরদস্ত লোক কি না।” ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “মানে… আরও পরিষ্কার করে বলছি… বেশ শক্ত হাতে খেলাটা কনডাক্ট করতে পারবে কি না।

 

“তা পারবে।” কৃপানাথ বললেন, “এর আগে কোয়ার্টার ফাইনালের একটা ম্যাচ কনডাক্ট করেছিল। একটা গোল নিয়ে হাঙ্গামা বাধার উপক্রম হয়েছিল সেদিন। গোলটা যারা খেয়েছিল, তাদের একজন স্টপার এগিয়ে এসে রেফারির ডিসিশান নিয়ে আপত্তি জানাতেই মাখন শিকদার তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে দেয়।… না না, বেশ কড়া লোক।”

 

“ভাল কথা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন একটু ঘরে চলল, তোমার সঙ্গে আর দু একটা কথা সেরে নেওয়া দরকার।”

 

“এঁরা?” কৃপানাথ বললেন, “এঁরা কি এখানেই থাকবেন?”

 

“হ্যাঁ হ্যাঁ, এমন চমৎকার বাতাস এঁরা কোথায় পাবেন। বারান্দায় বসে এঁরা যেমন গল্প করছেন করুন, সেই ফাঁকে আমরাও আমাদের পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করে নিই।”

 

কৃপানাথকে সঙ্গে নিয়ে ভাদুড়মশাই বারান্দা থেকে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। তবে তার উদ্দেশ্য যে শুধুই স্মৃতি রোমন্থন, তা আমার মনে হল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *