আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৯)

আজ ৯ অক্টোবর, সোমবার। কাল রাতে কালীচরণ সেনের পার্টি থেকে গেস্ট হাউসে ফিরতে ফিরতে বারোটা বেজে গিয়েছিল। পানীয় সরবরাহের ব্যবস্থায় গৃহকর্তার কোনও কার্পণ্য না থাকলে দুচার পাত্র পেটে পড়বার পরেই এ-সব পার্টিতে অনেকের আচরণ ও কথাবার্তার ধরন অল্পবিস্তর পাল্টে যায়। তবে কাল রাত্তিরে তেমন-কিছু উল্টো-পাল্টা ব্যাপার আমার চোখে পড়েনি। এক ওই সঞ্জীব মালহোত্রা ছাড়া। অত্যধিক মদ্যপানের ফলে ভদ্রলোক কিছুটা বে-এক্তার হয়ে পড়েছিলেন, তাই সবাই যখন সেন-দম্পতির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসবার উপক্রম করছেন, তখনও তিনি তাঁর জায়গা ছেড়ে চলে আসতে চাইছিলেন না। এমনকি, বাইরে এসেও ক্রমাগত হাত-পা ছুড়ে বলছিলেন যে, যেখানে আছেন, সেখানেই তিনি থাকবেন। শেষ পর্যন্ত বিস্তর ঠেলেঠুলে তাঁকে তাঁর গাড়িতে তুলে দিতে হয়।

 

এই ঠেলেঠুলে গাড়িতে তুলে দেবার ব্যাপারে তাঁর স্ত্রীর ভূমিকাটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। আশা মালহোত্রা অবশ্য প্রথম দিকে একটু নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দূরে দাঁড়িয়ে সব নিরীক্ষণ করে যাচ্ছিলেন, আর সঞ্জীবের হাত-পা ছোড়া দেখে মাঝে-মাঝেই বলছিলেন, ‘আরে ছিয়া ছিয়া!’ তারপর, স্বামী-দেবতাটি যে কারও কথাই কানে নিচ্ছেন না, বরং গাড়ির দরজা থেকে বারেবারেই ছিটকে বেরিয়ে আসছেন, এটা দেখে শেষপর্যন্ত তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি। হাতের আধ-খাওয়া সিগারেটটা মাটিতে ফেলে দিয়ে, সেটাকে পায়ে পিষে, গলার দোপাট্টাটিকে কোমরে বেঁধে নিয়ে একেবারে হঠাৎই তিনি সামনে এসে সঞ্জীব মালহোত্রার শার্টের কলার চেপে ধরে অতি কঠিন গলায় বলেন, ‘বহোত হো গিয়া! আব তং ছোড় কর ঘর চলো। নেহি তো ম্যায় সাফ-সাফ সব বাতা দুঙ্গি।’

 

কথাটার মধ্যে কী ইঙ্গিত ছিল কে জানে। তবে এর পরে আর সঞ্জীব কোনও গণ্ডগোল করলেন না। সুড়সুড় করে গাড়ির মধ্যে উঠে পড়লেন।

 

আর সদানন্দবাবু? ডিনারের পরে সবাই যখন ফের ড্রয়িং রুমে এসে বসেছি, আর এ-কথা সে-কথার পরে আলোচনাটা যখন ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের দিকে মোড় নিয়েছে, ভদ্রলোক তখন বায়না ধরে বসলেন, ‘ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সংগীত ভেসে আসে’ গানটা তিনি গেয়ে শোনাবেন। তাতে মনে হয়, তিনিও তখন খুব-একটা স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন না। আমার ও ভাদুড়িমশাইয়ের মতো স্রেফ এক-এক গেলাশ কোক খেয়েই সম্ভবত তিনি ক্ষান্ত থাকেননি, খিদে বাড়াবার অছিলায় হয়তো ফাঁকতালে দু-এক পাত্র উত্তেজক পানীয় তিনিও সেবন করে থাকবেন।

 

কথাটা আজ সকালে তাঁকে বলেছিলুমও। তাতে তিনি এমন অর্থময় হাস্য করলেন যে, তাতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু এক্ষুনি আর সেই প্রসঙ্গে ঢুকছি না, এখন বরং অন্য দু-একটা কথা সেরে নেওয়া যাক।

 

আজ একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি। ঘুম থেকে যখন উঠি, তার অনেক আগেই ভাদুড়িমশাইয়ের জগিং ও সদানন্দবাবুর মর্নিং ওয়াকের পর্ব শেষ হয়ে গেছে। বেড়-টি ও স্নানের পর্বও তাঁরা আগেভাগেই চুকিয়ে রেখেছিলেন। ফলে, আমাকে জাগিয়ে দিয়েই তাঁরা এমন তাড়া লাগাতে লাগলেন যে, আমি আর বেড-টি খাবার ফুরসতই পেলুম না, চটপট দাড়ি কামিয়ে স্নান সেরে ওঁদের সঙ্গে ডাইনিং হলে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিতে হল। তারপর দোতলায় উঠে সামনের এই বারান্দায় এসে বসেছি।

 

নদীটা এখান থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। জলের উপরে রোদ্দুরে পড়ায় মন হচ্ছে যেন রোদ্দুর নয়, রাশি রাশি অভ্রের কুচি ওখানে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা বলতে তিনি হেসে বললেন, “কবিত্ব রাখুন! খবর আছে।”

 

বললুম, “কীসের খবর? নতুন কিছু হল?”

 

“তেমন কিছু না। প্রথম খবর, মিসেস আশা মালহোত্রা আজ সকাল সাড়ে ছ’টায় ফোন করেছিলেন। আপনার সঙ্গে তিনি কথা বলতে চান।”

 

“আমার সঙ্গে কথা বলতে চান তো আমার ঘরে ফোন করলেই তো পারতেন।”

 

“আঃ, সবটা না-শুনেই কিছু বলবেন না তো,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ফোনটা আপনার ঘরেই এসেছিল। কিন্তু আপনি তখন কুম্ভকর্ণের মতন ঘুমোচ্ছিলেন তো, তাই ক্রমাগত রিং হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও শুনতে পাননি।”

 

“অ্যাঁ?”

 

“হ্যাঁ। সদানন্দবাবু তখন ঘরে ছিলেন না, আর আমিও তখন জগিং সেরে সদ্য ফিরেছি। ফোন বেজে যাচ্ছে, অথচ আপনি সাড়া দিচ্ছেন না দেখে অগত্যা আমাকেই আপনার ঘরে ঢুকে কলটা রিসিভ করতে হয়।”

 

সত্যিই কি আমার ঘুম এত গাঢ়? কথাটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছিল না। সন্দেহ হচ্ছিল যে ভাদুড়িমশাই আমাকে বোকা বানাবার তালে আছেন। আসলে নিশ্চয় কেউ ফোন-টোন করেনি। করলে আমি ঠিকই শুনতে পেতুম।

 

সেটা বললুমও। তাতে সদানন্দবাবু বললেন, “আপনাকে নিয়ে এই হয়েচে মুশকিল। সত্যি কতাটাও বিশ্বেস করতে চান না। কদ্দিন বলিচি যে, মশাই, ভোরবেলায় ঘুম থেকে উটে আমার সঙ্গে একটু মর্নিং ওয়াক করুন, তাতে শরীরে জোর পাবেন, মাতাটাও পরিষ্কার হয়ে যাবে। তা নয়, আপনি শুদু পড়ে-পড়ে ঘুমোচ্চেন! তার ফল কী হল? না একজন লেডি আপনাকে একটা জরুরি কতা কইতে চাইলেন, কিন্তু এমন আপনার ঘুম যে, ফোনের শব্দটা আপনি শুনতেই পেলেন না। ছিঃ।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, “সত্যি উনি ফোন করেছিলেন?”

 

“তা করেছিলেন বই কী!”

 

“কী বললেন ভদ্রমহিলা?”

 

“আপনার ঘুম ভাঙেনি শুনে বললেন যে, আপনাকে ওঁর বাংলোয় নিয়ে যাবার জন্যে দশটা নাগাদ উনি গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। আপনার সঙ্গে ওঁর নাকি কী জরুরি কথাবার্তা আছে।”

 

“জরুরি কথাবার্তা না ঘোড়ার ডিম!” কিচেন থেকে ইতিমধ্যে আবার এক পট চা আমাদের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টি-পট থেকে একটা পেয়ালায় খানিকটা লিকার ঢেলে নিয়ে তাতে ধীরেসুস্থে চুমুক দিয়ে বললুম, “গাড়ি পাঠালেই যে যেতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। আমি যাচ্ছি না।”

 

“তার মানে?”

 

“মানে অতি পরিষ্কার। প্রবলেমটা এদের, সুতরাং এরাই সেটা সল্ভ করুক। আমাকে নিয়ে টানাটানি করছে কেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হয়েছে একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

 

“কেন, আপনি কিছু জানেন না?”

 

“না।”

 

“এরা যে এদের ফাংশানে একটা নাটক নামাচ্ছে সেটা মনে আছে তো?”

 

“তা কেন থাকবে না? কালীচরণ সেনমশাই তো তাঁর চিঠিতেই সেটা জানিয়েছিলেন। ডি.এল. রায়ের চন্দ্রগুপ্ত।”

 

“রাইট। তো এই নাটক নিয়ে এখন ঘোর গণ্ডগোল বেধে গেছে। ঠিক হয়েছিল যে, মিসেস দাশ…মানে সুরেশ দাশের দাশের বউ তাতে ছায়ার ভূমিকায় নামবেন আর মিসেস সেন নামবেন হেলেনের ভূমিকায়। কিন্তু মিসেস দাশ হঠাৎ খুন হয়ে গেলেন তো…”

 

“তাতে কী হল?”

 

“এই হল যে, কাস্ট পাল্টে গেল। এখন ঠিক হয়েছে যে, হেলেনের ভূমিকায় না-নেমে মিসেস সেনই ছায়ার পার্টটা করবেন।…আপনি এ-সব কিছুই শোনেননি?”

 

“না। আপনি কার কাছে শুনলেন?”

 

“মিসেস মালহোত্রার কাছে। তো যা বলছিলুম। মিসেস সেন তো ছায়ার রোলটা করবেন। তা হলে যেটা তাঁর করবার কথা ছিল সেই হেলেনের ভূমিকায় কাকে নামানো হবে?”

 

“মিসেস মালহোত্রাকে?”

 

“রাইট এগেন।” হেসে বললুম, “একেবারে বিনা নোটিসে তাঁকে হেলেনের ভূমিকায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে একে তো তিনি বাংলা জানেন আমি যা হিন্দি জানি তার চেয়েও কম, তার উপরে আবার তাঁর কোনও ধারণাই নেই যে, হোয়ট দ্য হোল থিং ইজ অ্যাবাউট।”

 

“মাই গড।” ভাদুড়িমশাই বলললন, “পরশু দিনই তো নাটক। এর মধ্যে উনি পার্ট মুখস্থ করারই বা সময় পাচ্ছেন কোথায়?”

 

“পাচ্ছেন না।”

 

সদানন্দবাবু এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি। স্রেফ চুপ করে আমাদের কথাবার্তা শুনে যাচ্ছিলেন। এবারে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “সব্বোনাশ। যে লোক সাঁতার শেকেনি, এ তো তাকে ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দেবার ব্যাপার হল, মশাই।”

 

বললুম, “তার ফল যা হবার, তা-ই হবে। স্রেফ ডুবে মরবে।”

 

ভাদুড়িমশাই তাঁর চায়ের পেয়ালায় লিকার ঢেলে নিয়ে তাতে দুধ আর চিনি মেশাতে-মেশাতে বললেন, “বুঝলুম। তা আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছে কেন? আপনি গিয়ে কী করবেন?”

 

“আমি? ভদ্রমহিলা তো বাংলা পড়তে পারেন না, তাই উনি চান যে, আমি গিয়ে ওঁর পার্টটা ওঁকে পড়ে শোনাব। সেইসঙ্গে নাটকটা যে কী নিয়ে তাও যেহেতু ওঁর জানা নেই, তাই চন্দ্রগুপ্তের কাহিনিটা ওঁকে বুঝিয়ে বলতে হবে।”

 

“কিন্তু আপনি যাবেন না, কেমন?”

 

“গিয়ে লাভ কী। কাল রাত্তিরেই আমি ওঁকে বলেছি যে, পার্টটা যেন আর কাউকে দিয়ে উনি পড়িয়ে নেন। তারপর প্রম্পটার ভরসা। …আরে দূর-দূর, এদের যত্ত সব পাগলামি, বাংলাই যাঁর ভাল করে জানা নেই, তাঁকে কিনা এরা পপুলার একটা বাংলা নাটকের ওইরকম ইম্পর্ট্যান্ট একটা ফিমেল-রোলে নামিয়ে দিচ্ছে। কোনও মানে হয়? লোকে তো ছ্যাছ্যা করবে।”

 

“আহা-হা,” সদানন্দবাবু একগাল হেসে বললেন, “এত উত্তেজিত হচ্চেন কেন? উনি ভাঙা-ভাঙা বাংলা বলতে পারেন তো, তা হলে আর ভাবনা কী?”

 

“তাতে কী হবে?”

 

“তাতেই কেল্লা ফতে হবে।”

 

সদানন্দবাবুর কথা শুনে ভাদুড়িমশাই দেখলুম ঠোঁট টিপে হাসছেন। কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারলুম না। বললুম, “হাসছেন কেন? এতে হাসির কী আছে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ধরতে পারেননি?”

 

“না।”

 

“সদানন্দবাবুকে জিজ্ঞেস করুন।”

 

সদানন্দবাবুর দিকে তাকাতে তিনি একগাল হেসে বললেন, “আহা-হা, এ তো খুবই সিম্পল ব্যাপার, ধরতে না-পারার কী আচে? বলি ও মশাই, শচীন সেনগুপ্তের সিরাজদৌল্লা নাটক দেকেচেন?”

 

“দেখিনি, তবে ওর রেকর্ড বেরিয়েছিল তো, সেটা শুনেছি। ওই যাতে নির্মলেন্দু লাহিড়ি, সরযূবালা, এঁরা সব অভিনয় করেছিলেন।”

 

“বাস বাস, ওতেই হবে। তো সেখেনে কর্নেল ওয়াটস বলে এক ব্যাটা সায়েরের ক্যারেক্টার আচে না?”

 

“তা তো আছেই,” আমি বললুম, “মুরশিদাবাদের দরবারে সে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এজেন্ট। তবে নবাবের কাছে তার ফন্দিটা ফাঁস হয়ে গেসল।”

 

“বাঃ বাঃ, সবই তো আপনার মনে আচে দেকচি। তো ফন্দি ফাঁস হবার পরে নবাবকে সে কী বলেছিল, সেটা মনে আচে তো?”

 

“কী বলেছিল?”

 

“বলেছিল, “হামার কাম হামি করিয়েছে, এখোন হাপনার কাম হাপনি কোরেন।’ তো মশাই, আপনি-আমি যে-রকমের বাংলা বলি, এটা কি সেই রকমের বাংলা হল?”

 

বললুম, “দূর মশাই, এটা বাংলাই নয়।”

 

“তা বলবেন না, তা বলবেন না,” সদানন্দবাবু বললেন, “ এ হল সায়েবি বাংলা। মানে সায়েরা যেভাবে বাংলা বলে আর কি। তো আপনি ভূমেন রায়ের অ্যাকটিং দেকেচেন?”

 

“ভূমেন রায়? ওই যিনি ‘কেদার রায়’ নাটকে কার্ভালোর ভূমিকায় নেমেছিলেন?”

 

“শুধু নামেননি, নেমে একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছিলেন। তো কার্ভালোও তো সায়েব?”

 

“সাহেব, তবে ওয়াটসের মতো ইংরেজ নয়, পোর্তুগিজ।”

 

“তা হোক, তবে সায়েব তো বটে! আর তাই তার ডায়ালোগগুলোকে সায়েবি ভাঙা-ভাঙা বাংলায় ভূমেন রায় এমন কায়দা করে অডিয়েন্সের দিকে থ্রো করতে লাগলেন যে, হাততালির চোটে হল একেবারে ফেটে যাবার জোগাড়। এ আমার স্বচক্ষে দেকা।”

 

সদানন্দবাবুর ‘স্বচক্ষে দেকা’র ব্যাপারটাকে সব সময়েই আমি একটু সন্দেহের চোখে দেখি বটে, কিন্তু এটা নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন তুললুম না। তার কারণ, ‘কেদার রায়’ নাটকে কার্ভালোর ভূমিকায় ভূমেন রায়ের অ্যাকটিংয়ের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এর আগেও আমি অনেকের কাছে শুনেছি। বললুম, “একটু ঝেড়ে কাসুন তো। আপনি কি বলতে চান যে, কার্ভালোর ভূমিকায় ভূমেন রায় যা করেছিলেন, হেলেনের ভূমিকায় নেমে আশা মালহোত্রাও তা-ই করবে? অর্থাৎ আমি না-বলে হামি আর তুমি না-বলে টুমি বলবে?”

 

“আহা-হা, সে-কতা হচ্চে না,” সদানন্দবাবু বললেন, “ভূমেন রায়কে ফলো করবার দরকার কী, তিনি তাঁর মতন করে সায়েবি বাংলা বলেছিলেন, আর উনি বলবেন ওঁর মতন করে।”

 

“অর্থাৎ ডি. এল. রায়ের নাটকে হেলেনের মুখে যে-রকমের বাংলা বসানো হয়েছে, সে-রকমের পিওর বাংলা উনি বলবেন না?” ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, “কী মশাই, আপনি কী বলেন?”

 

ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ চুপ করে আমাদের কথা শুনে যাচ্ছিলেন আর মিটিমিটি হাসছিলেন। এবারে একটা সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “তা সদানন্দবাবু তো কিছু খারাপ কথা বলেননি। আশা মালহোত্রা পঞ্জাবের মেয়ে, কালই তার মুখে এটা শুনলুম। তা সে যদি পঞ্জাবি স্টাইলে বাংলা ডায়ালোগ বলে তো ক্ষতি কী।”

 

“পঞ্জাবি স্টাইলে বাংলা?”

 

“সব ব্যাপারেই অত অবাক হয়ে যাবেন না তো।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যজিৎ রায়ের ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর কথা ভাবুন। সেখানে মগনলাল মেঘরাজ রাজস্থানী স্টাইলে বাংলা বলেনি? আর তা ছাড়া ডোঞ্চু ফরগেট ওয়ান থিং, হেলেন তো আসলে গ্রিক, সে হচ্ছে সেলুকাসের মেয়ে, আর সেলুকাস হচ্ছেন আলেকজান্ডারের সেনাপতি। তো ফোর্থ সেঞ্চুরি বিসিতে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে ওই পঞ্জাবের পথেই ইন্ডিয়ায় এসে ঢুকেছিলেন। আর তাই হেলেনের ভূমিকায় আশা মালহোত্রা যদি পঞ্জাবি হিন্দির মিশেল দিয়ে বাংলা বলে তো বলুক না, দ্যাট উড বি দ্য মোস্ট ন্যাচারাল থিং টু ডু।”

 

ভাদুড়িমশাই এ-সব কথা ঠাট্টা করে বলছেন কি না, বুঝতে পারছিলুম না। বললুম, “এটা আপনি সত্যি-সত্যি বিশ্বাস করেন?”

 

শুনে, হোহো করে হেসে উঠলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর হঠাৎই একেবারে গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “আমি কী বিশ্বাস করি না-করি সেটা তো কথা নয়, কথা হচ্ছে লোকে কী বিশ্বাস করে। আর তা ছাড়া, এই ইলেভেনথ আওয়ারে আশা মালহোত্রাকে আপন যদি ডিসকারেজ করেন তো উনি হয়তো স্টেজে নামতে রাজি হবেন না, আর এরা তার ফলে ঘোর বিপদে পড়ে যাবে। সে এক কেলোর কীর্তি হবে, মশাই। সো ফর হেভেন’স সেক ডোন্ট ডিসকারেজ হার। ওঁর বাড়িতে যান, নাটকের কাহিনিটা ওঁকে বুঝিয়ে বলুন, ওঁর ডায়ালোগগুলো ওঁকে পড়ে শোনান, ওঁকে উৎসাহ দিন।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “বলেন তো আমিও আপনার সঙ্গে যেতে পারি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ওঁকে সঙ্গে নিন। অ্যাকটিংয়ের ব্যাপারটা উনি আমাদের দুজনের চাইতে অনেক ভাল বোঝেন।”

 

“তা বুজি বই কী।” অমায়িক হেসে সদানন্দবাবু বললেন, “আমাদের আপিসের রিক্রিয়েশন ক্লাবের ফাংশানেই তো দু-দুবার ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে নেবেচি। একবার কাত্যায়নের ভূমিকায়, একবার মুরার।”

 

“সে কী!” অবাক হয়ে বললুম, “মুরার ভূমিকায় কী করে নামলেন? ওটা তো ফিমেল পাৰ্ট!”

 

“তাতে কী হল,” সদানন্দবাবু বললেন, “আমাদের সময়ে তো আর এখনকার মতো বাইরে থেকে অ্যাকট্রেস ধরে আনবার রেওয়াজ ছিল না, দরকার হলে ব্যাটাছেলেদেরই গোঁফ কামিয়ে ফিমেল পার্ট করতে হত।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে তো কথাই নেই, ওঁকে সঙ্গে নিন কিরণবাবু।”

 

ঢোক গিলে বললুম, “ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন, তখন যাব।”

 

সদানন্দবাবু ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু আপনি তো দুটো খবরের কতা বলছিলেন। আশা মালহোত্রা যে কিরণবাবুকে ফোন করেচেন আর দশটার সময় যে উনি গাড়ি পাটিয়ে দেবেন, এ তো এক নম্বর খবর হল। দু’নম্বর খবরটা কী?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি যে পলাশডাঙায় এসেছি, কাল রাত্তিরেই এখানকার থানা সেটা জেনে যায়। থানা থেকে সাবডিভিশনাল পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে সেটা জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল নিশ্চয়। আশা মালহোত্রার ফোনটা আসার মিনিট দশ পনরোর মধ্যেই আর-একটা ফোন আসে। এস. ডি. পি. ও.-র ফোন। ভদ্রলোকের নাম শেখর ঘোষাল। ইয়াং আই. পি. এস. অফিসার। তিনিও ওই দশটা নাগাদই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন।”

 

বললুম, “কেন?”

 

“বললেন যে, এখানে কাল যে মার্ডারটা হয়েছে, সেই ব্যাপারে কথা বলতে চান।”

 

হাত উলটে বললুম, “তার মানে আমাদের ছুটির বারোটা বেজে গেল।”

 

ভাদুড়িমশাই ম্লান হাসলেন। “ওই যে বলেছি না ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, তা-ই হল আর কি।…কিন্তু না, আপনারা তৈরি হয়ে নিন, দশটা বাজতে চলল, এক্ষুনি আপনাদের গাড়ি এসে যাবে। ওখানকার কাজ সেরে একটা-দেড়টার মধ্যেই ফিরে আসবেন কিন্তু। এখানেই লাঞ্চ করে নেব।”

 

আশা মালহোত্রার গাড়ি ঠিক দশটাতেই এসে গেল। তাতে উঠে গেস্ট হাউসের গেট দিয়ে বেরোবার সময় দেখতে পেলুম আর-একটা গাড়ি গেস্ট হাউসের দিকে আসছে। পুলিশের গাড়ি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *