(৬)
গেস্ট হাউসটা যে সদ্য বানানো হয়েছে, মিঃ সেন তা আমাদের বলে না দিলেও আমরা ঠিকই বুঝতে পারতুম। নতুন বাড়িতে তার্পিন তেল, থিনার, রং, বার্নিস ইত্যাদির একটা গন্ধ পাওয়া যায়, এই বাড়ি থেকে সেটা এখনও মিলিয়ে যায়নি। বাড়িটা খুব বড় নয়, তবে জায়গা অনেকখানি, বাগান তো আছেই, সেইসঙ্গে একটা লনও আছে। গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে প্রথমেই যা আমার মনে হয়েছিল, সেটা এই যে, ভাদুড়িমশাই যদি এখানকার খুনের ব্যাপারটায় খুব বেশি না জড়িয়ে পড়েন, তবে দুটো-তিনটে দিন এই গেস্ট হাউসে নেহাত মন্দ কাটবে না।
বরং খুব ভাল কাটবে। কথাটা এইজন্যে বলছি যে, এই রকমের চমৎকার একটি বাড়ি কেন, পাহাড় কিংবা জঙ্গল-টঙ্গলেরও দরকার করে না, স্রেফ হাওড়া স্টেশন থেকে টিকিট কেটে একবার রেলগাড়িতে উঠে পড়লেই হল, লোক্যাল ট্রেন না-হয়ে সেটা যদি একটু দূরপাল্লার গাড়ি হয় তো কথাই নেই, সঙ্গে-সঙ্গে যেন মস্ত একটা মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায়। শুধু ধুলো আর ধোঁয়া নয়, দৈনন্দিন রুটিন থেকেও মুক্তি। কিন্তু মুশকিল হয়েছে ভাদুড়িমশাইকে নিয়ে। নিজেই তো বললেন যে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। তার মানে, এখানেও এই খুনের ব্যাপারে তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না, জড়িয়ে যাবেন নির্ঘাত। আর তা হলেই তো মজা মাটি, আউটিংয়ের বারোটা বেজে গেল।
গেটের সামনে দরোয়ান ছাড়াও, উর্দি-পরা জনা তিন-চার লোক দাঁড়িয়ে ছিল। কম্পাউন্ডে ঢুকে গাড়িবারান্দার নীচে জিপটাকে দাঁড় করাতেই তারা ছুটে এল। মিঃ সেন তাদের একজনকে বললেন, “এঁদের সামানগুলোকে উপরে তুলে দাও।” লোকটির পিছন পিছন উঠতে-উঠতে লক্ষ করলুম যে, সিঁড়ির একদিকে রয়েছে সাজানো-গোছানো বেশ বড়সড় একটি ড্রয়িং রুম। আর অন্যদিকের ঘরটি যে ডাইনিং হল, ডিমের আকৃতির মস্ত একটা টেবিল ও সেই টেবিল ঘিরে সাজানো হাই-ব্যাক চেয়ারগুলো দেখে সেটা আন্দাজ করে নেওয়া গেল।
দোতলায় মোট চারটে ঘর। সামনে চওড়া বারান্দা। সেখানে, প্রতিটি ঘরের দরজার পাশে দেওয়াল ঘেঁষে দুটি করে আর্ম-চেয়ার। বৃষ্টির ছাট আর রোদ্দুরের ঝাঁঝ আটকাবার জন্যে বারান্দার রেলিংয়ের দিকটায় উপরের সিলিং থেকে ঘন বুনটের সরু কাঠির চিক ঝোলানোর ব্যবস্থাও রয়েছে দেখলুম। তবে এখন যেহেতু রোদ্দুরও নেই, বৃষ্টিও নেই, চিকগুলি তাই গুটিয়ে রাখা হয়েছে। বারান্দার মাঝখানে বেশ বড়সড় একটা গ্লাস-টপ টেবিল। তাতে হালকা নীল রঙের চিনামাটির বৌলের মধ্যে একগুচ্ছ সাদা ফুল।
দোতলায় উঠে অবধি দিব্যি লাগছিল। সিঁড়ির ধারের দেওয়ালে কিছু ল্যান্ডস্কেপের প্রিন্ট ইতিমধ্যে চোখে পড়েছে। বারান্দার দেওয়ালেও এমন গুটিকয় ছবি টাঙানো রয়েছে যা দেখবামাত্র মন ভাল হয়ে যায়।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “হীরাচাঁদ দুগারের ছবি। খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখুন মশাই, এমন ডিটেলসের কাজ আর কারও ছবিতে পাবেন না।”
বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে আবছামতো একটা নদীও দেখা যায়। কালীচরণ সেনমশাই সুরেশচন্দ্রের হাত দিয়ে যে-চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তাতে যেমন জঙ্গল ও পাহাড়, তেমনি একটা নদীরও উল্লেখ ছিল। সম্ভবত এটাই সেই নদী। জঙ্গল তো স্টেশন থেকে আসার পথেই একটা দেখা হয়েছে। শুধু পাহাড়টাই এখনও চোখে পড়েনি।
মিঃ সেনকে সে-কথা জানাতে তিনি বললেন, “এ দিক থেকে নয়, ওটা আপনাদের ঘরের জানলা থেকে দেখা যাবে।…নিন, প্যাসেঞ্জার ট্রেনে এসেছেন, ধকল নেহাত কম হয়নি, এবারে যে-যার ঘরে ঢুকে স্নান-টান করে একটু সুস্থ হয়ে নিন, আমি বলে দিয়ে যাচ্ছি, নীচ থেকে ওরা চা পাঠিয়ে দেবে।” ভদ্রলোক চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু যেতে-যেতেই সিঁড়ির মুখ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “ডিনার কিন্তু এখানে নয়, আমার বাংলোয়। সাড়ে ন’টা নাগাদ আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি আবার কেন ঝঞ্ঝাট করতে গেলেন, এখানেই তো খেয়ে নিতে পারতুম।”
মিঃ সেন হেসে বললেন, “কোনও ঝঞ্ঝাট তো করছি না, স্রেফ ডালভাতের ব্যবস্থা করেছি।” ভদ্রলোক একতলায় নেমে গেলেন।
গেস্ট হাউসে, যা বুঝতে পারছি, আমরা ছাড়া আর কোনও অতিথি এখন নেই। চারটে ঘরই খালি পড়ে রয়েছে। তার মধ্যে তিনটে ঘর আমরা নিয়ে নিতে পারি। কিন্তু তা আর নেওয়া হল না। সদানন্দবাবু যেহেতু একা রাত কাটাতে রাজি নন, তাই পূর্ব-দক্ষিণ দু’দিক খোলা ঘরটা ভাদুড়িমশাইকে ছেড়ে দিয়ে আমরা তার পাশের ঘরটায় ঢুকে পড়লুম।
প্রতিটি ঘরের সঙ্গেই অ্যাটাচড বাথ। সেখানে তেল সাবান শ্যাম্পু ও নানা সাইজের খান তিন-চার তোয়ালের সঙ্গে নতুন-কেনা একজোড়া করে টুথব্রাশ ও এক টিউব টুথপেস্টও বেশ যত্ন করে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। সদানন্দবাবু মুখহাত ধুয়ে নিলেন, কিন্তু ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে স্নান করলেন না। আমি স্নান করে জামাকাপড় পালটে নিলুম। তারপর বারান্দায় এসে দেখি ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যেই সেখানে এসে গেছেন। সোফায় বসে চুপচাপ কিছু ভাবছিলেন হয়তো, আমাদের দেখে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “এখানে চা দিতে এসেছিল, কিন্তু আমি বললুম, নীচে গিয়ে খাব। চলুন ডাইনিং হলে যাওয়া যাক।”
চায়ের সঙ্গে কিছু স্যান্ডুইচ আর বিস্কুটও সাজিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু একটু বাদেই তো কালীচরণ সেনের বাড়িতে খেতে যাব, তাই আমরা আর সেগুলি দাঁতে কাটলুম না। সদানন্দবাবু চা’ও খেতে চাইছিলেন না। কিন্তু একটু গড়িমসি করে তারপর পট থেকে পেয়ালায় চা ঢালতে ঢালতে বললেন, “নাঃ, খেয়েই নেওয়া যাক, মাথাটা বড্ড ধরে রয়েচে, পথে তো চা একদম খাওয়াই হয়নি।”
চা খেয়ে আমরা উপরে উঠে এলুম।
বারান্দায় বসে সামনে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। চাঁদটা মাঝখানে ফের হালকা একটা মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছিল বলে নদীর ব্যাপারটা আন্দাজে বুঝে নিয়েছিলুম। এখন আবার মেঘ সরে গেছে, সেইসঙ্গে বেড়ে গেছে পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার জোর, নদীটিকে তাই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। দেখতে দেখতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম, ভাদুড়িমশাইয়ের কথায় আমার চমক ভাঙল। “কী মনে হচ্ছে?”
প্রশ্নটা সম্ভবত আমাকেই করে থাকবেন, কিন্তু উত্তর দিলেন সদানন্দবাবু। “এর ভেতরে আর মনে হওয়া-হয়ির কী আচে, পারফেক্ট জেন্টলম্যান।”
বললুম, “কার কথা বলছেন?”
“কেন, মিঃ সেনের কতা। বন্দোবস্ত একেবারে পরিপাটি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওঁর নামটা কিন্তু কালীচরণ।”
“তা হোক না,” সদানন্দবাবু বললেন, “সব কালীচরণকেই যে মোম্বাসার কালীচরণের মতো হতে হবে, এমন তো কোনও কতা নেই। ওই নামে কত ভাল লোকও তো রয়েছে।”
“তা বটে।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এই যেমন রেভারেন্ড কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। একে আমাদের ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির প্রথম বাঙালি রেজিস্ট্রার, তায় বিরাট অরেটর…বাগ্মী হিসেবে নাকি দারুণ খ্যাতি ছিল। তার উপরে আবার ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট। তা ছাড়া আমাদের জেনারেল কালু ঘোষও তো রয়েছেন।
সদানন্দবাবু হাঁ করে সব শুনছিলেন। এবারে হাঁ বন্ধ করে আমতা-আমতা করে বললেন, “এই শেষের জনকে তো ঠিক চিনতে পারলুম না। ইনি আবার কে?”
“কলকাতার ছেলে। তবে এখনকার নয়, এইট্টিথ্ সেঞ্চুরির লোক। ব্রিটিশ আর্মিতে নাম লিখিয়ে থার্ড মারাঠা ওয়ারে লড়ে গেসলেন। আর লড়েওছিলেন খুব অদ্ভুতভাবে।”
“কী রকম?”
“ভরতপুরের ফোর্ট সিজ করার সময় যিনি ছিলেন ইংরেজদের জেনারেল, তিনি হঠাৎ মারা যান। তা কালু ঘোষ তখন কী করলেন জানেন?”
“কী করলেন?”
“অতিশয় তুখোড় লোক তো, তাই যেই বুঝলেন যে, এটা জানাজানি হয়ে গেলে ব্রিটিশ আর্মির সেপাইরা সবাই বড্ড দমে যাবে, অমনি আর বাক্যব্যয় না করে মরা জেনারেলের পোশাকটা নিজেই পরে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কেউ কিছু বুঝতেই পারল না, কেল্লা ফতে হয়ে গেল।”
আমি বললুম, “যাঃ, যত সব গালগপ্পো!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মোটেই না। ইংরেজরা অবশ্য ব্যাপারটা ঠিক ধরে ফেলতে পেরেছিল। তা মামুলি একজন সেপাই হয়ে গোরা জেনারেলের পোশাক পরা তো মস্ত অপরাধ। তার জন্যে তারা কালু ঘোষকে যে শাস্তি দেয়নি, তাও নয়। তবে কিনা সেটা নাম-কা-ওয়াস্তে শাস্তি, যুদ্ধটা যে আসলে কালু ঘোষই জিতিয়ে দিয়েছেন, সেটাও তো তারা জানত, তাই পুরস্কারও দিয়েছিল দুহাত ভরে। বাস্, সেই থেকে তাঁর নাম হয়ে গেল জেনারেল কালু ঘোষ।”
সদানন্দবাবু বললেন, “বলেন কী মশাই!”
“ঠিকই বলছি, বিশ্বাস না হয় তো বাংলা কোনও বায়োগ্রাফিক্যাল ডিকশনারি দেখে নেবেন।…আর হ্যাঁ, একটা কথা বলা হয়নি, এই কালু ঘোষেরও পোশাকি নাম কিন্তু কালীচরণ।”
শুনে একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন সদানন্দবাবু। তারপর বললেন, “আমাদের এই কালীচরণ সেনও কিন্তু কম যান না। জেনারেল না হতে পারেন, এমন কী, সুরেশ বিশ্বেসের মতন কর্নেলও হয়তো নন। কিন্তু এরই মধ্যে একটা সায়েব-কোম্পানির বড়কর্তা হয়ে গেলেন। দেখবেন, এনারও নাম একদিন ওই যে বায়ো না কী যেন বলছিলেন…”
“বায়োগ্রাফিক্যাল ডিকশনারি।”
“হ্যাঁ, এনারও নাম একদিন ওতে ছেপে বেরুবে।”
কথাটা আর এগোল না, একজন বেয়ারা এসে আমাদের জানিয়ে দিল যে, সেন সাহেব গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমরা তৈরি হয়েই ছিলুম। নীচে নেমে দেখলুম পোর্টিকোর নীচে একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভার দরজা খুলে দিল। আমরা ভিতরে ঢুকে পড়লুম। মিঃ সেনের বাংলোটা এই গেস্ট হাউস থেকে বিশেষ দূরে নয়। পৌঁছতে পাঁচ মিনিটও লাগল না।
বাংলোর বারান্দায় আলো জ্বলছিল। গেট খোলার ও গাড়ি ঢোকার শব্দ পেয়ে ভিতর থেকে মিঃ সেন এক ভদ্রমহিলাকে সঙ্গে করে বেরিয়ে এলেন। তারপর বারান্দা থেকে নীচে নেমে বললেন, “আসুন, আমার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।…বন্দনা, ইনিই মিঃ ভাদুড়ি, এঁর কথা তুমি আগেও আমার কাছে শুনেছ। আর এঁরা হলেন মিঃ কিরণ চাটুজ্যে আর মিঃ সদানন্দ বসু।”
শ্রীমতী বন্দনা সেন মৃদু হেসে হাত তুলে আমাদের নমস্কার করে বললেন, “ভিতরে আসুন, সবাই আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন।”
কালীচরণ সেনমশাই যে আরও কয়েকজনকে ডিনারে ডেকেছেন, আগে সেটা আন্দাজ করিনি। ড্রয়িংরুমে বসে তাঁরা গল্প করছিলেন, আমরা গিয়ে ভিতরে ঢুকতে সবাই উঠে দাঁড়ালেন। মিঃ সেন বললেন, “বন্দনা, তোমার গেস্টদের সঙ্গে এঁদের পরিচয় করিয়ে দাও।”
শুনে, লাল রঙের শার্ট-পরা কুচকুচে কালো চুলের এক ভদ্রলোক একগাল হেসে বললেন, “মিসেস সেনকে আর কষ্ট করতে হবে না, ও কাজটা বরং আমিই করে দিচ্ছি। আমার নাম গোকুলচন্দ্র ঘোষ, পেশায় ডাক্তার, আমি এখানকার মেডিক্যাল সেন্টারের চার্জে আছি, তবে কিনা এই পলাশডাঙা জায়গাটার জল-হাওয়া এতই ভাল যে, ভুলভাল ওষুধ দিয়ে রুগি মারার সুযোগ বিশেষ পাচ্ছি না। আর হ্যাঁ, আপনাদের ডাইনে ওই যে মহিলাটি আপাতত চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু বাড়িতে যাঁর ভয়ে আমাকে তটস্থ থাকতে হয়, উনি হচ্ছেন আমার বেটার হাফ সুলেখা। ওঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এখানকার ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ার মিঃ সঞ্জীব মালহোত্রা আর তাঁর স্ত্রী মিসেস আশা মালহোত্রা।… বাকি রইলেন আমার বাঁ দিকের এই ভদ্রলোক। ইনি হচ্ছেন মিঃ সুবীর নন্দী, আমাদের চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার। এলিজিবল ব্যাচেলর, কিন্তু এখনও বিয়ে করেননি, আর সম্ভবত সেইজন্যেই ইনি সংসারী মানুষদের জ্বালাযন্ত্রণা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। সেটা বুঝলে মনে হয় আমাদের বিল-টিলগুলো আটকে না-রেখে চটপট পাশ করে দিতেন। কী মিঃ নন্দী, ভুল বললুম?”
গোকুল ঘোষের কথা বলবার ভঙ্গি দেখে সবাই হাসছিলেন, আর সেই সঙ্গে চলছিল নমস্কার বিনিময়ের পালা। তারই মধ্যে লক্ষ করলুম যে, একমাত্র মিসেস মালহোত্রার মুখে হাসি নেই, দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটিও একটু যেন আড়ষ্ট।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ কী, আপনারা দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন।”
সবাই বসে পড়লুম। ট্রের উপরে পানীয়ের গেলাশ সাজিয়ে উর্দিপরা একজন বেয়ারা ইতিমধ্যে ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়েছিল। কে কী খান সেটা বোধহয় তার জানাই আছে, হাতে হাতে এক-একটা গেলাশ ও সেইসঙ্গে একটা করে পেপার-ন্যাপকিন ধরিয়ে দিতে তাই তার কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে কালীচরণ সেন বললেন, “আপনারা কী খাবেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এনি সফ্ট ড্রিঙ্ক উইল ডু।”
“সে কী, সফ্ট কেন? হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, জিন—সবই তো রয়েছে।”
“চলে না।”
“দেন আই ওন্ট ইনসিস্ট।” বেয়ারার দিকে তাকিয়ে কালীচরণ সেন বললেন, “সাহেবদের জন্যে তিনটে কোক এনে দাও।”
বেয়ারা ভিতর থেকে বেঁটে তিনটে গ্লাসে করে কোক নিয়ে এল। গেলাশে চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “চিয়ার্স।”
সঞ্জীব মালহোত্রা বললেন, “কমসে কম ছোট করে একটা জিন অ্যান্ড লাইম তো নিতে পারতেন। জব্বর খিদে হত।…ডক্টর ঘোষ কী বোলেন?”
গোকুল ঘোষ তাঁর হুইস্কির গেলাশে লম্বা একটা চুমুক মেরে বললেন, “শুধু কি আর খিদে বাড়ত? ঘুমও হত চমৎকার।”
“হাঁ হাঁ, ঠিক বোলিয়েছেন। নিদ্ ভি বালো হোয়।”
“কোনও দরকার তো হচ্ছে না।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ট্রেনজার্নি করে এসেছি, গেস্ট হাউসে ফিরে গিয়ে শোবার সঙ্গে-সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ব।”
মালহোত্রা ও ঘোষ তাঁদের সোফা ছেড়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা একটু দূরে সরে যেতেই চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার সুবীর নন্দী তাঁর সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর গেলাশ হাতে আমাদের পাশে এসে মুখ না-তুলেই বললেন, “আপনারা তো কয়েকটা দিন থাকবেন, তাই না?”
বললুম, “এগারো তারিখ পর্যন্ত বোধহয় থাকতেই হচ্ছে।”
“তার মানে আমাদের ফাংশান পর্যন্ত। সামনের বুধবারেই তো ফাংশান।”
“হ্যাঁ, মিঃ সেন অন্তত সেইরকমই আন্দাজ দিলেন।”
“ঠিকই আন্দাজ দিয়েছেন।” সুবীর নন্দী তাঁর হুইস্কির গেলাশে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “আসলে ব্যাপার কী জানেন, কেউ-কেউ চাইছিল না যে, এক্ষুনি এটা হোক। মানে আজই এখানে একটা আনফরচুনেট ব্যাপার ঘটে গিয়েছে কিনা, তাই ওয়ার্কারদেরই একটা সেকশন বলছিল যে, ফাংশানটা মাসখানেক পিছিয়ে দেওয়াই ভাল।”
“আপনিও তা-ই মনে করেন?”
হুইস্কি গিলতে গিয়ে প্রায় বিষম খেলেন সুবীর নন্দী। তারপর কাশির দমক সামলে, পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ আর কপাল মুছে নিয়ে বললেন, “না না, আমি তা মনে করব কেন। ইন ফ্যাক্ট আমি তো সবাইকে বলছি যে, হি ইজ অ্যাবসলুটলি রাইট।”
“হু ইজ অ্যাবসলুটলি রাইট?”
“হোয়াই, মিঃ সেন অফ কোর্স।”
“মিঃ সেন কী বলছেন?”
“উনি বলছেন, বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার ঘটে গেছে ঠিকই, কিন্তু ওয়ার্কারদের বেশির ভাগই তো এই অনুষ্ঠানটার জন্যে অ্যাদ্দিন ধরে তৈরি হয়েছে, তাদের ছেলেমেয়েরাও দিনের পর দিন নাচ গান রেসিটেশানের মহড়া দিয়েছে, তাদের বউয়েরাও পার্টিসিপেট করবে—এখন কি এটাকে দুম করে ড্রপ করে দেওয়া যায়? আর তা ছাড়া একজন খুন হয়েছে বলে এখানকার আর-সব কাজ যে বন্ধ থাকছে, তাও তো নয়, সুতরাং ফাংশানটাও নাহয় দিন তিনেকের জন্যে মুলতুবি রাখা যাক, কিন্তু তার বেশি পিছিয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না। অ্যান্ড আই হোললি এগ্রি উইথ হিম।”
কথা বলতে-বলতে আমরা ড্রয়িংরুম থেকে বারান্দায় চলে এসেছিলুম। সামনের লন জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। দূরে একটা আবছামতন পাহাড়ও এখান থেকে দেখা যায়। মিঃ সেন সম্ভবত এই পাহাড়টার কথাই বলেছিলেন। সেই দিকে তাকিয়ে বললুম, “জায়গাটা কিন্তু সত্যিই আপনারা খুব সুন্দর বেছেছেন।”
“তা ঠিক,” সুবীর নন্দী বললেন, “কিন্তু দু’দিন থাকুন, হাঁফিয়ে উঠবেন।”
“কেন?”
“আরে মশাই, এ তো পাণ্ডববর্জিত জায়গা। সোসাইটি কোথায়? কালচার কোথায়? থাকবার মধ্যে আছে তো শুধু পাহাড় আর জঙ্গল। এই নিয়ে আর ক’দিন থাকা যায়? হাঁফ ধরে যাবে না? আমি মশাই শহরের লোক, চাকরির জন্যে এখানে পড়ে আছি, কিন্তু যেটা সত্যি কথা, সেটা বলব না কেন?”
“সত্যি কথাটা তা হলে এই যে, এখানে আপনি থাকতে চান না, কেমন?”
আমার কথাটা শুনে যেন সুবীর নন্দী হকচকিয়ে গেলেন একটু। পরক্ষণেই স্বাভাবিক গলায় বললেন, “না, ঠিক তা নয়, তবে কলকাতাকে বড্ড মিস করি, মিঃ চ্যাটার্জি।…চলুন, ভিতরে যাওয়া যাক।”
বললুম, “আপনি যান, আমি বরং আর একটুক্ষণ এখানে থাকি। বারান্দাটা ভারী সুন্দর।”
মিঃ নন্দীর পানীয় ফুরিয়ে গিয়েছিল, গেলাশটাকে ফের ভরাট করার জন্য তিনি ভিতরে চলে গেলেন। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ভিতর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন মিসেস আশা মালহোত্রা। বললেন, “আমার একটা প্রবলেম হল, মিঃ চাটার্জি। সেইটা আপনাকে বলব। আই থিঙ্ক ইউ উইল আন্ডারস্ট্যান্ড।”
