আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৩)

আশ্বিন মাসের সকালবেলা। কলকাতার বাঙালিপাড়ার মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিংগুলোতে আর কী কী ক্রিয়াকান্ড হয় তা জানি না, তবে বারোয়ারি দুর্গাপুজো একটা হয়ই। কাঁকুড়গাছির এই বহুতল বাড়িতেও হচ্ছে। এ বাড়ির একতলায় কোনও ফ্ল্যাট নেই। পুরো একতলাটা জুড়ে সার-সার শুধু গাড়ি রাখার জায়গা। গাড়িগুলোর বদলে আজ সেখানে পুজোর মণ্ডপ। হাইরাইজের বউ-ঝিদের মধ্যে যাঁরা বিউটি পার্লার ও বুটিক নিয়ে সম্বচ্ছর খুব ব্যস্ত থাকেন, আজ তাঁরা গরদের শাড়ি পরে প্রতিমার সামনে বসে ফলমূল কেটে নৈবেদ্যর থালা সাজাচ্ছেন। ধূপধুনোর ধোঁয়ায় বেশ একটা ভক্তিভাবের উদয় হয়েছে। সেইসঙ্গে মাঝে-মাঝেই যে ঢাক আর কাঁসি বেজে উঠেছে, সাততলার ফ্ল্যাটে বসেও তার একটা মন্দীভূত আওয়াজ আমরা শুনতে পাচ্ছি ঠিকই। জানলার দিকে চোখ রাখলে দেখা যায় আকাশ নির্মেঘ। রাস্তার দিকের বারান্দাটা রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে।

 

একটা দিন আগেও অবশ্য এমন ছিল না। বঙ্গোপসাগরের কোথায় কী একটা নিম্নচাপ না কীসের যেন সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে বৃষ্টি আর থামছিল না। পুজোর বাজার যেমন সমানে মার খাচ্ছিল, তেমনি নামকরা সব পুজো-প্যান্ডেলের রঙিন কাপড়ের বাহারি চাঁদোয়াগুলিও ভিজে চুব্বুস। তার থেকে লাল নীল খয়েরি ইত্যাদি রং পরস্পরের উপরে এমনভাবে গড়িয়ে পড়ছিল যে, সে আর কহতব্য নয়! আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, মা এবারে তাঁর ভক্তদের একেবারে কাঁদিয়ে ছাড়বেন।

 

কিন্তু দেখতে না দেখতে সেই নিম্নচাপ হঠাৎ ভ্যানিশ। ঠিক পুজোর আগেই বৃষ্টি একদম থেমে গেল, আর আকাশটা আবার ফিরোজার সঙ্গে সোনার জল মিশিয়ে এমনভাবে হেসে উঠল যে, রাস্তার উপরে সাতদিনের পচা জঞ্জালের ডাঁই দেখেও সক্কলের মনে হতে লাগল, বাঃ, কলকাতা তো জায়গা হিসেবে নেহাত ফ্যালনা নয়।

 

তবে কিনা বাইরের আবহাওয়া যতই হাল্কা ও ফুরফুরে হয়ে উঠুক, আমাদের আড্ডার আবহাওয়া ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছিল। কৌশিক যেমন আর হাসছিল না, অরুণ স্যান্যালের মুখও তেমনি হঠাৎ বড় গম্ভীর দেখাচ্ছিল। ভাদুড়িমশাইয়ের কপালেও দেখলুম দু’দুটো ভাঁজ পড়ে গেছে। সোফা থেকে একটু সামনে ঝুঁকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “রিসেন্টলি মানে কবে?”

 

অমিতাভ একটু ভেবে নিয়ে বলল, “ঠিক পনেরো দিন আগে।”

 

“পনেরো দিন আগে কী হয়েছিল?”

 

“যা হয়েছিল, তার মাত্র একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে। কালীচরণ আমাকে বুঝিয়ে দিল যে, আমাকে সে ছাড়েনি, আরও কিছু শিক্ষা না দিয়ে হয়তো ছাড়বেও না।”

 

“ও সব ব্যাখ্যা-ট্যাখ্যা না হয় একটু বাদে বুঝব,” একটু অসহিষ্ণু গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক কী হয়েছিল, সেটা স্পষ্ট করে বলো তো। জাস্ট গিভ আস দ্য ফ্যাক্টস।”

 

“বলছি। …আজ তো পয়লা অক্টোবর। তো এটা হল আজ থেকে ঠিক পনেরো দিন আগের অর্থাৎ পনেরোই সেপ্টেম্বরের ঘটনা। যেমন রোজই যাই, সেদিনও তেমনি দশটা নাগাদ আপিসে গিয়েছিলুম। তারপর ঘন্টা দুয়েক কাজকর্ম করে একটু বাইরে বেরোই। এমনিতে হয়তো বেরুতাম না, কিন্তু আপিসের কাজকর্ম ছাড়া আমি নিজেও তো কিছু আঁকিবুকি করি… বলতে পারেন যে, ওটাই আমার নেশা… তার জন্যে কিছু ড্রয়িং পেপার, কয়েক টিউব পেন্ট আর একটা ফাইন-পয়েন্ট ব্রাশ কিনবার দরকার হয়েছিল, তো ভাবলুম যে, এই ফাঁকে সেটা কিনে নিয়ে আসি। সে-সব কিনে আপিসে ফিরতে-ফিরতে তা প্রায় ঘন্টা দেড়েক লেগে যায়।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “দূরে যেতে হয়েছিল?”

 

অমিতাভ বলল, “খুব একটা দূরে নয়। রাঁচি গিয়েছেন কখনও?”

 

“তা গেছি বই কী। কয়েকবার গেছি। বছর দুয়েক আগেও একবার গিয়েছিলুম।”

 

“জায়গাটা তা হলে চিনতে পারবেন।” অমিতাভ বলল, “দোকানটা হল রাঁচির প্লাজা সিনেমার কাছে। স্কুটারেই যাই, স্কুটারেই ফিরি। তাতে খুব একটা সময় লাগবার কথা নয়। তবে জিনিশগুলো বাছাই করতে-করতে একটু দেরি হয়ে যায়।”

 

“তারপর?”

 

“আপিসে ফিরে শুনি, কলকাতা থেকে আমার একটা ফোন এসেছিল। আমি তখন আপিসে না থাকায় ফোনটা ধরেছিলেন সমীরদা। তাঁকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘কলকাতা থেকে তোমার দাদা কালীচরণবাবু ফোন করেছিলেন।…’

 

“মামাবাবু, বুঝতেই পারছেন যে, নামটা শুনেই আমি চমকে যাই। একে তো আমার একজন দাদা আছে ঠিকই…ইন ফ্যাক্ট আপনারা যখন যতীন বাগচি রোডে থাকতেন, তখন হয়তো তাকে দেখেও থাকবেন, তবে কিনা কলকাতায় কেন, সে তো এখন ইন্ডিয়াতেই থাকে না…

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “কোথায় থাকে?”

 

“কানাডায়। মন্ট্রিয়লে। এক বছর অন্তর-অন্তর দেশে আসে। গত বছর এসেছিল, আবার সামনের বছর আসবে। তা ছাড়া তার নামও তো কালীচরণ নয়।”

 

কৌশিক বলল, “গাটুদার কথা বলছিস তো? আমাদের চেয়ে তিন ক্লাস উঁচুতে পড়ত।” বলে অরুশ সান্যালের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি তাকে দেখেছ বাবা, একবার যখন টাইফয়েড হয়, তখন তুমিই তার চিকিচ্ছে করেছিলে। মনে নেই?”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “খুব মনে আছে। সিতাংশুবাবুর বড় ছেলে। কিন্তু তার ভাল নাম তো যদ্দুর মনে পড়ছে সিদ্ধার্থ। ভুল বললুম?”

 

অমিতাভ বলল, “না না, আপনি ঠিকই বলেছেন। যা-ই হোক, সমীরদাকে যখন বললুম যে, ওই নামে আমার কোনও দাদা নেই, তখন তিনি বললেন, ‘কী জানি, তা হলে হয়তো আমিই ভুল শুনেছি… আর তা ছাড়া লাইনে যা ডিস্টারব্যান্স হচ্ছিল…

 

কিন্তু সে যাকগে, আসল কথাটা তো তা নয়, ভদ্রলোক বললেন, যে, তোমার মায়ের শরীরটা বিশেষ ভাল যাচ্ছে না, তুমি একবার কলকাতায় যেতে পারলে ভাল হয়।”“

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কালীচরণ নামে কোনও আত্মীয় কি পড়শিও নেই তোমাদের? আই মিন এমন লোক, যিনি হয়তো ফোন করে খবরটা দিয়েছেন?…কী, আছে?”

 

“থাকা যে কিছু বিচিত্র নয়, তা আমিও বুঝি, মামাবাবু।” হাত উলটে অমিতাভ বলল, “নামটাকে তো মোটেই আনইউজুয়াল বলা যাচ্ছে না, বরং খুবই কমন নাম। ওই নামে কোনও আত্মীয়ের কথা অবশ্য এক্ষুনি আমার মনে পড়ছে না, সম্ভবত নেই, তবে পড়শিদের মধ্যে কারও নাম তো কালীচরণ হতেই পারে। কিন্তু, যখনকার কথা বলছি, তখন আমি অতশত ভেবে দেখিনি। স্রেফ ওই নামটা শুনেই আমি থতমত গেয়ে গেসলুম। কেন, তা তো বুঝতেই পারছেন, মোম্বাসার কালীচরণের কথা মনে পড়ে গেসল।”

 

“তা মায়ের অসুখের খবর শুনে তুমি কী ডিসিশান নিলে?”

 

“আমাকে কোনও ডিসিশান নিতে হয়নি, সেটা সমীরদাই নিলেন। আমার বিভ্রান্ত ভাবটা তিনি লক্ষ করেছিলেন। বললেন, ‘আরে এতে এত চিন্তার কী আছে? শরীর কি কখনও কারও খারাপ হয় না নাকি? মাঝেমধ্যে খারাপ হয়, আবার ভালও হয়ে যায়। তা আমি বলি কী, আজ তো শুক্কুরবার, হাতে বিশেষ কাজও নেই, আজ রাত্তিরের ট্রেনেই তুমি কলকাতায় চলে যাও। গিয়ে যদি দ্যাখো যে, মা মোটামুটি ভাল আছেন তো রোববার রাত্তিরেই রাঁচি এক্সপ্রেস ধরে সোমবার সকালে এসে আপিস করতে পারবে।’ তো তা-ই হল। আমি কলকাতায় চলে এলুম।”

 

“এসে কী দেখলে?”

 

“এসে দেখলুম মা মোটামুটি ভালই আছেন।” অমিতাভ বলল, “আসলে ব্লাড প্রেশারের রুগি তো, শুক্রবার সকালে প্রেশারটা একটু চড়ে যাওয়ায় বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেসলেন। তবে আমার ছোট ভাই গৌতম তখন বাড়িতেই ছিল, সে তক্ষনি গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনে, ডাক্তার এসে ওষুধ দেন, তারপর আর কোনও গন্ডগোল হয়নি। শনিবার দিনও বিকেলের দিকে ডাক্তারবাবু একবার এসেছিলেন, আমার সামনেই মায়ের প্রেশার নিয়ে বললেন যে, একদম নর্মাল, হান্ড্রেড ফর্টি বাই এইট্টি, চিন্তার কোনও কারণই নেই।”

 

“বাঃ, তা হলে তো মিটেই গেল।” ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “কলকাতা থেকে কালীচরণ নামে কেউ একজন…সম্ভবত তোমাদেরই পাড়ার কোনও ভদ্রলোক…রাঁচিতে ফোন করে তোমাকে তোমার মায়ের অসুখের খবরটা জানিয়েছিলেন। তা এই তো ব্যাপার। তিনি যে-ই হোন, হি ডিড হোঅট আ গুড নেবার গুড ডু। এতে তুমি এত অবাক হচ্ছ কেন?”

 

তক্ষুনি এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিল না অমিতাভ। একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “না, মামাবাবু, ব্যাপারটা এত সহজ সরল নয়। এর পরেও দু’-দুবার সে আমাকে তার খেল দেখিয়ে দিয়েছে।”

 

“তার মানে? এর মধ্যে আবার নতুন কী ঘটল? কখন ঘটল?”

 

“শনিবার কলকাতায় পৌঁছে রোববার রাত্তিরেই তো আমি রাঁচি এক্সপ্রেস ধরি, তা এটা ওই বোরবার রাত্তিরের ঘটনা। পরপর দুটো ঘটনা সেদিন ঘটে যায়। একটা রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে আর অন্যটা হাওড়া ইস্টিশানে।”

 

ভাদুড়িমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, “ঠিক কী হয়েছিল একটু বুঝিয়ে বলো তো।”

 

“বলছি, মামাবাবু।” আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইল অমিতাভ। তারপর বলল, “সতেরোই সেপ্টেম্বর বাড়ি থেকে রওনা হয়ে আমি রাঁচি ফিরে যাই। পুজোর এক্সোডাস তখনও শুরু হয়নি ঠিকই, তবে কাগজ পড়ে জেনেছিলুম যে, আউটগোয়িং ট্রেনগুলোতে ইতিমধ্যে বেশ ভিড় হচ্ছে। এদিকে আবার আমার কোনও রিজার্ভেশন নেই। তাই ঠিক করি যে, ট্রেন যদিও ন’টা চল্লিশে, তবু একটু তাড়াতাড়ি স্টেশনে পৌঁছে, রাঁচির একটা সেকেন্ড ক্লাস টিকিট কেটে যে করেই হোক একটা আরিজার্ভড কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়ব। নেহাতই একটা রাত্তিরের ব্যাপার তো, বেঞ্চিতে বসার জায়গা যদি না পাই তো না-ই পেলুম, মেঝের উপরে সুটকেসটা ফেলে তার উপরে বসেই চলে যাওয়া যাবে।”

 

কৌশিক বলল, “জায়গা পেয়েছিলি?”

 

“দাঁড়া,” ম্লান হেসে অমিতাভ বলল, “আগে তো হাওড়ায় কীভাবে পৌঁছলুম সেটা শোন।… বাড়ি থেকে ঠিক সাতটায় সেদিন তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ি। ভেবেছিলুম আমি একা মানুষ, বাসে কিংবা মিনিবাসে উঠে চলে যাব। কিন্তু দুটোতেই দেখলুম প্রচন্ড ভিড়। তাও হয়তো গুঁতিয়ে-গাঁতিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়তুম, কিন্তু হাতে একটা সুটকেস রয়েছে বলে সেটাও পারা গেল না। তখন ঠিক করলুম ট্যাক্সিতেই যাব। কিন্তু শুনে হয়তো আপনারা অবাক হয়ে যাবেন যে, একটা ট্যাক্সিও হাওড়া যেতে রাজি হল না। পরপর ছ’টা ট্যাক্সি দাঁড় করিয়েছিলুম সেদিন, কিন্তু যেই তাদের বলি যে, আমি হাওড়া ইস্টিশানে যাব, অমনি তারা মাথা নেড়ে বেরিয়ে যায়। ভাবতে পারেন?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “তা কেন পারব না, এ রকম হতচ্ছাড়া ট্যাক্সি তো শুনিচি ভূ-ভারতে কোত্থাও নেই, আর এদের ঢিট করার কোনও ব্যবস্থাও তো হচ্চে না, তাই যদি শুনতুম যে, তুমি হাওড়া যেতে চাইলে আর ট্যাক্সিওয়ালা অমনি দরজা খুলে দিলে বলল, ‘আইয়ে সাব,’ তা হলেই বরঞ্চ অবাক হুতুম।”

 

অমিতাভ বলল, “হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি পৌনে আটটা বাজে। তার মানে পুরো পঁয়তাল্লিশ মিনিট আমি ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের সামনে দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি। অথচ ট্রেনটা আমার না ধরলেই নয়। বুঝতে পারছিলুম যে, আমার মাথা ক্রমেই গরম হয়ে উঠছে। সেই অবস্থায় হঠাৎ একবার এমনও মনে হল যে, কিছু এক্সট্রা টাকা অফার করলে হয়তো এরা রাজি হতে পারে। করেছিলুমও। কিন্তু দশ টাকা এক্সট্রা অফার করা সত্ত্বেও সেভেন্‌থ ট্যাক্সিটা যখন হাওড়া যেতে রাজি না হয়ে আস্তে-আস্তে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল।”

 

সদানন্দবাবু তাঁর সোফা থেকে মাঝখানে একবার মেঝের কার্পেটের উপরে পা নামিয়ে রেখেছিলেন, এবারে সড়াক করে পা তুলে ফের বাবু হয়ে বসে গলা একেবারে খাদে নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কালীচরণ?”

 

“তা তো জানি না,” অমিতাভ বলল, “তবে সেই রকমেরই রোগা কালো আর ঢ্যাঙা বটে।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “কার কথা বলছ?”

 

“যে-লোকটার কথা বলছি, সে আমার থেকে হাতখানেক দূরে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেবেছিলুম যে, সেও হয়তো আমারই মতো বাস কিংবা মিনিবাসের জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। এমন তো কত লোকই দাঁড়িয়ে থাকে, আর তা ছাড়া তখন আমার যা মনের অবস্থা তা তো বুঝতেই পারছেন, তাই তেমন নজর করে তখন তাকে দেখিনি। কী বলব, একেবারে হঠাৎই সেই লোকটা ‘হো কালীচরণ’ বলে চেঁচিয়ে উঠল, আর আমিও দেখলুম যে, আমাকে স্টেশনে নিয়ে যেতে রাজি না হয়ে যে ট্যাক্সি ড্রাইভার ইতিমধ্যে তা প্রায় দশবারো গজ এগিয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ সে তার ট্যাক্সিতে ব্রেক কষে আবার ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসতে শুরু করেছে। ঠিক আমাদের সামনে এসে ট্যাক্সিটা থেমে গেল। লোকটা তখন খুব গম্ভীর গলায় ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলল, ‘এঁর আজকে রাঁচি না গেলেই নয়। যা, এঁকে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দে। আর হ্যাঁ, যা ন্যায্য ভাড়া, ঠিক তা-ই নিবি, তার বেশি এক পয়সাও নিবি না।’ গাড়িতে উঠে লোকটিকে ধন্যবাদ জানাবার জন্যে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলুম, লম্বা-লম্বা পা ফেলে সে এরই মধ্যে উলটো দিকে বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে গেছে। চেঁচিয়ে বললুম, ‘ধন্যবাদ।’ কিন্তু লোকটা আর ফিরে তাকাল না।”

 

কৌশিক বলল, “তারপর?”

 

অমিতাভ বলল, “খেল যে এতেই শেষ হয়নি, সেটা তখনও জানতুম না রে। জানতে পারলুম হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে। সারাটা রাস্তা প্রচন্ড ট্র্যাফিক জ্যাম। যেমন হাজরা মোড়ে, তেমনি এলগিন রোডের মোড়ে আর তেমনি গোটা স্ট্র্যান্ড রোড জুড়ে। তার ফলে স্টেশনে পৌঁছতে পৌঁছতেই ন’টা বেজে যায়। তার উপরে আবার টিকিট কাউন্টারেও যাচ্ছেতাই ভিড়। তারই মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে, এর ওর তার পা মাড়িয়ে, গুঁতোগুঁতি করে কোনওরকমে সেকেন্ড ক্লাসের একটা টিকিট কেটে যখন প্লাটফর্মে গিয়ে ঢুকলুম, ইয়ার্ড থেকে রাঁচি এক্সপ্রেস তখন ধীরে ধীরে প্লাটফর্মে ইন করছে, ফলে যাত্রীদের মধ্যে এমন হুড়োহুড়ি লেগে গেছে আর বাক্স-প্যাঁটরা মাথায় করে কুলিরাও এমন দুমদাম করে চলন্ত ট্রেনের কামরাগুলোর হ্যান্ডেল ধরে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়ছে যে, আমার তো একেবারে দিশেহারা অবস্থা। চতুর্দিকে চিৎকার, চেঁচামেচি, হট্টগোল, ধাক্কাধাক্কি, দৌড়ঝাপ…মানে একটা টোটাল কেঅস বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা-ই। ভাবলুম, অসম্ভব, এইভাবে আর যে-ই যেতে পারুক, আমি পারব না।”

 

অরুণ সান্যাল বলেলেন, “কী করলে? বাড়িতেই ফিরে গেলে?”

 

“তা-ই যেতুম মেসোমাশাই, যদি না ঠিক তখুনি লাল জামা পরা তাগড়া জোয়ান একটা কুলি আমার সামনে এসে দাঁড়াত। লোকটা এসে সুটকেসটা আমার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বলল, আমার পিছন-পিছন আসুন বাবুসাব, আমি আপনার জায়গা করে দিচ্ছি।”

 

“জায়গা করে দিল?”

 

“কীভাবে করে দিল, শুনুন।” অমিতাভ বলল, “লোকটা ছুটছে, আমিও তার পিছন-পিছন ছুটছি। ছুটতে ছুটতে লোকটা বলতে গেলে গাড়ির একেবারে শেষ সীমানায় পৌঁছে গিয়ে একটা সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়ির অন্য সব কামরায় ইতিমধ্যে আলো জ্বলে উঠেছে, অথচ এটা দেখলুম অন্ধকার। কামরার দু’দিকে দুটো দরজা। কিন্তু ভিতর থেকে দুটো দরজাই বন্ধ করে রাখা হয়েছে। প্লাটফর্মের এই শেষের দিকটায় ভিড়ভাট্টা অনেক কম, চিৎকার চেঁচামেচিও নেই, আর আলোও তেমন জোরালো নয়। দরজা বন্ধ বলে জানলা দিয়ে উঁকি মারলুম, কিন্তু কামরার মধ্যে যে কী আছে, কিছুই মালুম হল না। তবে কিছু লোক যে ছিল, কম্পার্টমেন্টের মধ্যে ঢুকবার পরে সেটা বুঝতে পারি।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু ঢুকলে কী করে?”

 

অমিতাভ বলল, “সেইটেই তো আশ্চর্য ব্যাপার! দরজা বন্ধ দেখে কুলিটা হঠাৎ ‘হো কালীচরণ, দরওয়াজা খোলো’ বলে হাঁক ছাড়ল আর দরজাও অমনি খুলে গেল। ভিতর থেকে যে-লোকটা দরজা খুলে দিল, সে কিন্তু আর ভিতরে ঢুকল না, প্লাটফর্মের উপরে লাফিয়ে পড়ে পড়িমরি ছুট লাগিয়ে কোথায় যে চলে গেল, তাকে আর দেখতে পেলুম না। কুলির পিছন-পিছন আমি ভিতরে ঢুকলুম। অন্ধকারের মধ্যে স্পষ্ট করে কিছু ঠাহর হল না, শুধু আন্দাজে বুঝলুম যে, ভিতরে খুব বেশি না হলেও জনাকয়েক প্যাসেঞ্জার আছে ঠিকই। তবে তারা কেউই বসে নেই, এক-একটা বেঞ্চি দখল করে এক-এক জন চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। কুলিটা বলল, ‘আপনিও শুয়ে পড়ুন, বাবুসাব। দরজাটা বন্ধ করে দেবেন, এই ডিব্বায় আর কেউ ঢুকবে না।”

 

কৌশিক বলল, “তুইও অমনি শুয়ে পড়লি?”

 

“হ্যাঁ, কুলিকে কুড়িটা টাকা দিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই দরজা বন্ধ করে ফাঁকা একটা বেঞ্চির উপরে টান হয়ে শুয়ে পড়লুম। তারপর গাড়ি ছাড়ল, স্টেশনের চৌহদ্দি ছাড়াতে অন্ধকার আরও জমাট হল, কিন্তু আলো আর জ্বলল না।”

 

“ঘুম হল?”

 

অমিতাভ আবার ম্লান হাসল। তারপর বলল, “রেলগাড়িতে অমন ঘুম খুব কমই ঘুমিয়েছি। ঘুম ভাঙল একেবারে রাঁচিতে পৌঁছে। ধড়মড় করে উঠে দেখি কামরা একেবারে ফাঁকা, কম্পার্টমেন্টের মধ্যে অন্য যারা ছিল তাদের কাউকে দেখতে পেলুম না। ধরে নিলুম যে, তারা সব আগের স্টেশনেই নেমে গেছে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “এ তো বড় আশ্চজ্জির ব্যাপার!”

 

ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরিয়ে ধীরেসুস্থে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “আশ্চর্য হবার কী আছে। স্টেশনের কুলিরা আগেভাগেই ইয়ার্ডে ঢুকে গাড়ির কামরা দখল করে ফেলে, তারপর স্টেশনে ট্রেন ইন্‌ করলে যে-সব প্যাসেঞ্জারের রিজার্ভেশন নেই, তাদের কাছ থেকে পয়সা নিয়ে সেই জায়গা ছেড়ে দেয়, এটা জানেন না? তবে হ্যাঁ, মাত্র কুড়ি টাকা নিয়ে জায়গা ছেড়েছিল, এটা আশ্চর্য হবার মতন খবর বটে।”

 

অমিতাভ বলল, “কিন্তু মামাবাবু, ট্রায়াঙ্গুলার পার্কে যে লোকটা আমাকে ট্যাক্সি ধরে দিল, তার কথাটা ভাবুন। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে সে বলল যে, আমার আজকে রাঁচি না গেলেই নয়। অথচ আমি কোথায় যাব, তা নিয়ে তো তার সঙ্গে কোনও কথাই হয়নি। তা হলে সে জানল কী করে যে আমি রাঁচি যাচ্ছি?”

 

“ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের ধারে যখন ঘোরাঘুরি করছিল, তখন বুঝতে হবে তোমাদের পাড়ারই লোক তুমি কোথায় যাচ্ছ, সেটা হয়তো তোমার ছোট ভাই কিংবা পাড়ারই আর কারও কাছে শুনে থাকবে।”

 

“আর মোম্বাসার ব্যাপারটা? কিংবা ধরুন ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের ওই লোকটা আর হাওড়া স্টেশনের ওই কুলি, দুজনেই যে ‘হো কালীচরণ’ বলে ডাক ছাড়ল, তারই বা কী ব্যাখ্যা?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওরও একটা সহজ ব্যাখ্যা রয়েছে।”

 

ব্যাখ্যাটা যে কী, সেটা আর শোনা হল না, কেন না ঠিক সেই মুহূর্তে ডোর বেল বাজল, আর তার একটু পরেই কাজের মেয়েটি এসে বলল, “এক ভদ্দরলোক এয়েছেন, মামাবাবুর সঙ্গে কথা বলতে চান।”

 

কৌশিক বলল, “কোত্থেকে এসেছেন, কী কাজ, তা কিছু বললেন?”

 

“বললেন যে পরেশডাঙা না ফরাসডাঙার কালীচরণবাবুর কাছ থেকে এয়েছেন।”

 

সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলুম, তাঁর মুখ একেবারে পাংশুবর্ণ ধারণ করেছে। কপালে হাত ঠেকিয়ে অস্ফুট গলায় বললেন, “তারা ব্রহ্মময়ী মাগো, রক্ষে করো।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *