আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(২৬)

আজ ১২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার। কালই বুঝে গিয়েছিলুম যে, আজ আর আমাদের কলকাতা যাওয়া হবে না। তা-ই হল। ঠিক হয়েছে যে, আজকের দিনটাও এখানে কাটিয়ে কাল সকালের ট্রেনে আমরা কলকাতা রওনা হব। তাতে ভাদুড়িমশাই তাঁর কাজের কথা ভেবে একটু গাঁইগুই করলেও যে এই বিলম্বিত যাত্রায় আমার আর সদানন্দবাবু বিশেষ আপত্তি আছে, তা নয়। ভাবছি আজ দশটা নাগাদ একটা গাড়ি নিয়ে পুবদিকের ওই পাহাড় থেকে ঘুরে এলে নেহাত মন্দ হয় না। একটা-দেড়টা নাগাত যদি ফিরে আসতে পারি তো দুপুরের খাওয়ার পরে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বরং নদীর ধারে গিয়ে বসা যাবে।

খুনের রহস্যের সমাধান যে এইভাবে হবে সেটা আমার ও সদানন্দবাবুর কল্পনায় ছিল না। আমরা তো আশা মালহোত্রাকেই খুনি ঠাউরে বসে ছিলুম, তার জন্যে বড় লজ্জিত হয়ে আছি। তবে শুধু এটা নয়, কাল সকালে কালীচরণ সেন ও শেখর ঘোষালরা বিদায় নেবার পর আমাদের আর-একটা ভুলও শুধরে নেওয়া গেল।

দোতলায় উঠে এসে ভাদুড়িমশাইকে জিজ্ঞেস করেছিলুম যে, ঝুটের ব্যাপারটা কী? কেউ কি মিথ্যে কথা বলেছে? তাতে তিনি বললেন, “ঝুট? মিথ্যে বলেছে? কই, আমি তো কিছু জানি না!”

শুনে সদানন্দবাবু বললেন, “সে কী মশাই, আপনার নিজের কতা নিজেরই মনে নেই? পরশু দুপুরে যখন শেখর ঘোষালের সঙ্গে টেলিফোনে আপনার কতা হচ্চিল, তখন আপনিই তো বললেন যে, ওটা যে ঝুট, সে আপনি আগেই আঁচ করেছিলেন। তা হলে?”

এবারে ভাদুড়িমশাইয়ের ভুরু কুঁচকে গেল। মনে হল, ব্যাপারটা তিনি ভেবে দেখছেন। তারপর হোহো করে হেসে উঠে বললেন, “দরজার আড়াল থেকে আড়ি পেতে কথা শোনার এই হচ্ছে বিপদ। ওভাবে কি আর সব কথা ঠিক-ঠিক শোনা যায়? আরে মশাই, ওটা ঝুট নয়, জুট।”

“জুট? তার মানে পাট?”

“হ্যাঁ,” ভাদুড়িমশাই হাসতে-হাসতেই বললেন, “মিসেস দাশের মুঠোর মধ্যে যা পাওয়া গেছে, পুলিশ তাকে সত্যিকারের চুল বলেই প্রথমটায় ধরে নিয়েছিল, কিন্তু পরে দেখা গেল যে, তা পাটের আঁশ। পরচুলাটা আসলে পাট দিয়ে তৈরি। রংও তাই গোল্ডেন ব্রাউন। বুড়ো মানুষের চুল হিসেবে দিব্যি চলে যায়।”

এর পরে আর কী বলি। লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইলুম। কিন্তু সদানন্দবাবুর মুখ কে বন্ধ করবে। তিনি বললেন, “কালীচরণবাবুকে এইজন্যেই সেদিন বলছিলুম যে, মশাই, ঠিয়াটারের মালপত্তর যদি নিতে হয় তো ঈশ্বর পঞ্চানন সাঁপুইয়ের দোকান থেকে নেবেন। ওরা হিউম্যান হেয়ার দিয়েই পরচুলা বানায়, ড্রেসল্যান্ড কোম্পানির মতন পাটের কারবার করে না।”

কাল সন্ধের ফাংশান সম্পর্কে বলি, ওটা শেষ হতে-হতে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেসল। এ-সব অনুষ্ঠানে গোড়ার দিকের নাচগান আবৃত্তি ইত্যাদি আইটেম সাধারণত বড়ই বিরক্তিকরভাবে প্রলম্বিত হতে থাকে। এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা গেল না। অভিনয়ের প্রসঙ্গে যে-কথা না বললেই নয়, সেটা এই যে, গত রবিবার মিঃ সেনের ডিনার পার্টিতে শান্তা নামে অল্পবয়েসি যে মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে উইংসের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছায়ার গানগুলো সে মোটেই খারাপ গাইল না, তবে তাতে লিপ দিতে যে বন্দনা সেনের মাঝে-মাঝেই মারাত্মক রকমের ভুল হয়ে যাচ্ছিল, তাও ঠিক। হেলেনের ভূমিকায় আশা মালহোত্রার মুখ থেকে পাঞ্জাবি স্টাইলের বঙ্গভাষার প্রথম দুটি-চারটি বাক্য নির্গত হবার পরেই—ভাদুড়িমশাই ও সদানন্দবাবুর প্রত্যাশাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে—অডিয়েন্সের পিছনের কয়েকটা সারিতে ঘোর গণ্ডগোল শুরু হয়ে যায়। গোল্লা-পাকানো কিছু কাগজ ও চোখা চোখা কিছু বাক্যবাণও সেই সময় স্টেজের দিকে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। তবে ‘এ রকম করলে কিন্তু নাটক বন্ধ করে দিতে আমরা বাধ্য হব’–মাইকে এই ঘোষণার পরে আর সে-সব উপদ্রব ঘটেনি। সদানন্দবাবুর কথায় বলি, ভদ্রলোকের সত্যি তুলনা হয় না। যে-রকম দাপটের সঙ্গে তিনি কাত্যায়নের ভূমিকায় অভিনয় করে গেলেন, তার পরে আর ‘বেস্ট অ্যাক্টিং’-এর মেডেলটা তাঁকে না-দিয়ে কারও গত্যন্তর ছিল না।

এ-সব অনুষ্ঠানে বড়কর্তার বউ কিংবা ছেলেপুলেদের জন্যে আলাদা একটা মেডেলের বরাদ্দ থাকেই। এ ক্ষেত্রেও ছিল। ‘বেস্ট অর্গানাইজার’ হিসেবে সেটা পেলেন শ্রীমতী বন্দনা সেন। এ ছাড়া, অনুষ্ঠানের নানা বিভাগে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের হাতেই কিছু-না-কিছু পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। বড়দের দেওয়া হল তোয়ালে, বেডকভার, টেবিল ক্লথ ও ফ্লাওয়ার ভাস। ছোটরা পেল লুডো, ক্যারামবোর্ড, চাইনিজ চেকার ও ব্যাগাটেলি। পুরস্কার বিতরণের পর সভাপতি অর্থাৎ ভাদুড়িমশাই যে ভাষণ দেন, সংক্ষিপ্ত হলেও তাতে ভাল-ভাল কথার কিছু অভাব ছিল না। যথা ‘অল ওয়ার্ক অ্যান্ড নো প্লে মেকস জ্যাক আ ডাল বয়,’ কাজের সঙ্গে বিনোদনকে মেলানো চাই, ইত্যাদি ইত্যাদি।

গেস্ট হাউসে ফিরতে-ফিরতে রাত বারোটা বেজে যায়। ডিনারের নামে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে ঘুমোতে-ঘুমোতে একটা। সকাল আটটার আগে আমার ঘুম ভাঙে না। ভাদুড়িমশাই ও সদানন্দবাবু অবশ্য ঘুমকাতুরে মানুষ নন। এত ধকলের পরেও ভোরবেলায় শয্যাত্যাগ করে তাঁরা যথারীতি তাঁদের জগিং ও মর্নিং ওয়াকের পাট চুকিয়ে এসেছেন। আমার জন্যেই তাঁদের ব্রেকফাস্ট করা হচ্ছিল না। একটু আগে সে-পাট চুকিয়েছি। ন’টা বাজে। দোতলার বারান্দায় বসে এখন কাল রাত্তিরের অনুষ্ঠান নিয়ে কথা হচ্ছে।

ভাদুড়িমশাই তাঁর প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “আরে দূর-দূর, কী করে যে আপনারা সম্বচ্ছর এখানে-ওখানে সভাপতিত্ব করে বেড়ান, বুঝি না মশাই। আমার তো এই একবারেই যা শিক্ষা হবার হয়ে গেল!”

সদানন্দবাবু বললেন, “কেন কেন, এ তো কিচু খারাপ কাজ নয়। লোকে কত মান্যি করে!”

“মান্যি করে না ঘেঁচু করে! সভাপতিত্ব করা মানেই তো কপালে ফোঁটা চড়িয়ে একটা ঘটের মতো বসে থাকা আর ভুলভাল সুরে গাওয়া কিছু গান আর মাইক-ফাটানো কিছু বাগাড়ম্বর শোনা। কোনও মানে হয়? আগে জানলে আমি কিছুতেই এখানে আসতুম না!”

“আহা, এয়েছেন বলেই তো একটা বজ্জাতকে ধরে ফেলতে পারলেন। কম কাজ?”

“আরে মশাই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজ কি কলকাতাতেই কিছু কম জমে রয়েছে? কৌশিক ছেলেমানুষ; তার পক্ষে কি একা সে-সবের সামাল দেওয়া সম্ভব?”

কৌশিকের নাম করতেই দুম করে একটা কথা আমার মনে পড়ে গেল। বললুম, “পরশু দুপুরে তারাপদ দত্তের ফ্ল্যাট থেকে গেস্ট হাউসে ফিরে আসার পর দুজনের সঙ্গে ফোনে আপনার কথা হয়েছিল। তার মধ্যে একজন হচ্ছেন শেখর ঘোষাল আর অন্যজন আমাদের কৌশিক। তা-ই না?”

এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ। তো কী হয়েছে তাতে?”

“কিছুই হয়নি। তবে সেই সময়ে আপনি বলেছিলেন যে, কলকাতা থেকে কৌশিক একটা মজার খবর দিয়েছে।”

“আরে তাই তো, সেটা তো বলাই হয়নি আপনাদের।”

“খবরটা কী?”

“আর বলবেন না,” হোহো করে হেসে উঠে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যত সব উদ্ভুট্টি কাণ্ড। কৌশিকের সেই ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুটির কথা মনে আছে আপনাদের?”

বললুম, “অমিতাভ?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, অমিতাভ। ওই যাকে কালীচরণ বলে একটা লোক খুব জ্বালাচ্ছিল।”

সদানন্দবাবু বললেন, “জ্বালাচ্চিল বলচেন কেন? মাত্র একবারই একটু রেগে গিয়ে অমিতাভকে সে আফ্রিকা থেকে ইন্ডিয়াতে ফেরত পাঠিয়েছিল বটে, তাও সে-ই পাঠিয়েছিল কি না কে জানে, কিন্তু তার পর থেকে সে তো একটার-পর-একটা উবগারই করে গেচে। ফোন করে মায়ের অসুখের খবর দেওয়া, বালিগঞ্জ থেকে হাওড়া ইস্টিশনের ট্যাক্সি ধরে দেওয়া, ভিড়ের রেলগাড়িতে জায়গা করে দেওয়া, এ-সব কি উবগার নয়?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ছাড়ুন তো। ঝড়ে কাক মরে আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে। ও-সবের একটাও যে সেই কালীচরণের কাজ, তা আমি বিশ্বাস করি না।…তো সে যাকগে, এখন আসল কথাটা শুনুন। অমিতাভ এখন কোথায় আছে জানেন? সে আবার কিনিয়ায় ফিরে গেছে।”

বললুম, “সে কী!”

“বিশ্বাস করতে পারছেন না তো?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু সত্যিই সে ফিরে গেছে!”

“কেন?”

‘স্বেচ্ছায় যায়নি, যেতে হয়েছে। আমরা তো লক্ষ্মীপুজোর দিন এখানে চলে এলুম। সেইদিনই রাত বারোটায় কলকাতার বাড়িতে কৌশিককে কেউ ফোন করে জানায় যে, অমিতাভ কিনিয়ায় পৌঁছে গেছে, তাকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।….মিস্টিরিয়াস কল। যে লোকটি ফোন করেছিল, সে তার নামটা পর্যন্ত জানায়নি!”

“বলেন কী! এ তো ভাবাই যায় না।”

“কৌশিকও ভাবতে পারেনি। পরদিনই সে রাঁচিতে ফোন করে সমীর বোসের কাছে জানতে চায়, কথাটা সত্যি কি না। তাতে সমীর বোস জানায় যে, সত্যি। অমিতাভর বদলি হিসেবে যাকে কিনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল, সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাতে সেখানকার সমস্ত কাজ আটকে যায়। ফলে বিজয়া দশমীর পরদিনই রাঁচির কোম্পানির বোম্বাই অফিস থেকে জরুরি এসটিডি করে অমিতাভকে সেখানে বাই দ্য আর্লিয়েস্ট ফ্লাইট চলে যেতে বলা হয়। পাসপোর্ট তো রেডিই ছিল, দ্বাদশীর দিনই ভিসা করিয়ে অমিতাভকে তুলে দেওয়া হয় নাইরোবির ফ্লাইটে।…তো এই হচ্ছে ব্যাপার।”

বললুম, “এ তো খুবই গোলমেলে খবর।”

“আরও আছে। কৌশিককে যে-লোকটি রাত বারোটায় ফোন করেছিল, সে এটাও জানিয়েছে যে, যার ইচ্ছেয় অমিতাভকে কিনিয়ায় ফিরতে হল, সে কিন্তু সেখানে নেই, হি ইজ ইন ইন্ডিয়া নাউ!”

ভয় পেয়ে গেলে সদানন্দবাবু সাধারণত যা করে থাকেন, এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না, ঝোলানো পা দুটিকে সড়াক করে উপরে টেনে নিয়ে, সোফার উপরে জোড়াসন হয়ে বসে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, “কালীচরণ?”

ভাদুড়িমশাই এই প্রশ্নের কী উত্তর দিতেন, বলা সম্ভব নয়, কেন না উত্তর দেবার ফুরসতই তিনি পেলেন না, নীচ থেকে একজন বেয়ারা দোতলায় উঠে এসে জানাল যে, পুলিশ সাহেব আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “উপরে পাঠিয়ে দাও।”

শেখর ঘোষাল একা আসেননি, নীলমণি শিকদারকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। মুখচোখ দেখে বোঝা গেল, দুজনেই একটু উদ্বিগ্ন।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী ব্যাপার, খুব চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে। আবার কোনও সমস্যা দেখা দিল নাকি?”

শেখর ঘোষাল বললেন, “তা একটু দিয়েছে মিঃ ভাদুড়ি।”

“কীসের সমস্যা?”

“পরশু বিকেল থেকে তো রাত এগারোটা পর্যন্ত…মানে তারাপদ দত্তকে যতক্ষণ না অ্যারেস্ট করা হয় ততক্ষণ পর্যন্ত এখানকার রাস্তাটা আমরা আটকে রেখেছিলুম, তাই নিয়ে খুব হইচই হচ্ছে।”

“কারা হইচই করছে?”

নীলমণি শিকদার বললেন, “এখানকারই জনাকয় অফিসার। থানায় ফোন করে তাঁরা আমাকে খুব শাসিয়েছেন। একজন তো এমনও বললেন যে, ব্যাপারটা তাঁরা হায়ার অথরিটিজকে জানাবেন। তা যদি জানান তো আমি খুবই মুশকিল পড়ে যাব, স্যার।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ও নিয়ে ভাববেন না। মিঃ সেনকে আমি ফোন করে বলে দিচ্ছি যে, এ ব্যাপারে তাঁর অফিসারদের তিনি যেন একটু সামলে রাখেন।”

শেখর ঘোষাল বললেন, “সমস্যা তো আরও একটা দেখা দিয়েছে।”

“সেটা কী?”

“রাস্তা যখন বন্ধ ছিল তখন হাইওয়ের কাছে রাত দশটা নাগাদ একটা ট্রাককে আমরা আটকাই। পাথর-ভর্তি ট্রাক।”

হঠাৎই সরু হয়ে গেল ভাদুড়িমশাইয়ে চোখ। সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে তিনি বললেন, “পাথর? কোথাকার পাথর?”

“এখানে তো মাত্র একটাই পাহাড় রয়েছে, মিঃ ভাদুড়ি।” শেখর ঘোষাল বললেন, “ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতে বলল, পুবদিকের ওই পাহাড় থেকে পাথর কেটে তার ট্রাকে তুলে দেওয়া হয়েছে। এমন নাকি মাঝে-মাঝেই দেওয়া হয়।”

সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, আপনার পাহাড়ি বাবা কীভাবে পাথর খান, তার একটা ব্যাখ্যা তা হলে পাওয়া গেল।”

নীলমণি শিকদার কিছুই বুঝতে না পেরে বললেন, “কী বলছেন স্যার?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিছু না। কিন্তু ট্রাকটাকে আপনারা আটকালেন কেন?”

“এমনিতে আটকাতুম না, স্যার। পাহাড় কেটে পাথর চালান করা তো নতুন কিছু নয়, এ তো সর্বত্রই হচ্ছে, নইলে স্টোন চিপস মিলবে কোত্থেকে? আর তা যদি না মেলে, তা হলে রাস্তাঘাট আর বাড়িঘর তৈরির কাজ তো বন্ধ হয়ে যাবে, স্যার।”

ভাদুড়িমশাই তাঁর একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন। “তা হলে আটকালেন কেন?”

“না-আটকে উপায় ছিল না, স্যার।” নীলমণি শিকদার বললেন, “যে-মাল ক্যারি করছে, তার একটা চালান থাকবে তো। তা ট্রাকের ড্রাইভার সে-সব কাগজপত্তর কিছুই দেখাতে পারেনি।”

“ট্রাকে কে কে ছিল!”

“ড্রাইভার ছিল আর একজন খালাসি ছিল। খালাসিটাকে ধরতে পারা যায়নি। ট্রাকটাকে আটকাবার সঙ্গে-সঙ্গেই সে ছটকে পালিয়ে যায়।”

“আর ড্রাইভার?”

“তাকে হাজতে পুরে দিয়েছি। ট্রাকটাকেও থানা কম্পাউন্ডের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে।”

“ট্রাকের মালিক এর মধ্যে তার ট্রাকটাকে ছাড়িয়ে নিতে আসেনি?”

“পরশু রাত্তিরেই এসেছিল। এখানকারই এক ঠিকেদার। নাম আতর সিং। খুব জবরদস্ত লোক। ট্রাক ছাড়াতে আজ বিকেলে আবার আসবে।”

শেখর ঘোষাল বললেন, “সেটা কোনও ব্যাপার নয়। এমন ঢের ঢের জবরদস্ত লোককে আমরা ঠান্ডা করে দিয়েছি। কিন্তু ইতিমধ্যে আবার আর-এক কাণ্ড হয়েছে।”

“কী কাণ্ড?”

“শিকদারের মুখেই সেটা শুনুন।”

নীলমণি শিকদার বললেন, “দিন দুয়েক আগে আমাদের থানা-কম্পাউন্ডের বাইরে একটা ছাতিমগাছের তলায় একজন মিস্টিরিয়াস লোকের উদয় হয়। লোকটাকে সাধুও বলতে পারেন, ফকিরও বলতে পারেন। আসার পর থেকেই লোকজনদের সঙ্গে খুব জমিয়ে নিয়েছে। নাকি দারুণ গনতকার। হাত দেখারও দরকার হয় না। স্রেফ এক-একজনের মুখ দেখেই তার ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেয়।”

“আপনার ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিয়েছে?”

“তা একরকম দিয়েছে, স্যার।”

“কী বলেছে?”

একটু ইতস্তত করতে লাগলেন নীলমণি শিকদার। তারপর লজ্জিত গলায় বললেন, “বলেছে যে, আমার ব্লাড শুগার থ্রি ফিফটিরও বেশি। রসগোল্লা খাওয়ার বদভ্যাসটা যদি না ছাড়ি তো এর থেকে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।”

“কথাটা মিলে গেছে?”

“তা গেছে স্যার। গত হপ্তায় আসানসোলে গিয়ে সুগার টেস্ট করিয়েছিলাম। পোস্ট প্র্যানডিয়াল থ্রি ফিফটিফাইভ। রিপোর্ট নিয়ে ওখানেই ডাক্তার দেখাই। তিনিও হার্ট-অ্যাটাকের ভয় দেখিয়েছিলেন।”

শেখর ঘোষাল বললেন, “ও সব শুগার-ফুগার ছেড়ে এখান থেকে আমাকে কেন থানায় নিয়ে গিয়েছিলেন, মিঃ ভাদুড়িকে সেটা বলুন।”

“বলছি স্যার।” ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে নীলমণি শিকদার বললেন, “থানার কম্পাউন্ডের মধ্যেই আমার কোয়ার্টার। কাল ভোরবেলায় সেই মিস্টিরিয়াস লোকটা আমার কোয়ার্টারে এসে বলে যে, ওই ট্রাকের ব্যাপারে পুলিশকে তার একটা জরুরি কথা জানাবার রয়েছে। কিন্তু কথাটা আমি নাকি বুঝব না, যদি লার্নেড কোনও লোককে তার কাছে নিয়ে যাই তো কথাটা সে তাঁকে জানাতে পারে। তা স্যার, লার্নেড লোক বলতে তো আমি এনাকেই বুঝি, তাই হাত দেখানোর কথা বলে এনাকেই থানায় নিয়ে গিয়েছিলুম।”

শেখর ঘোষাল বললেন, “আপনি যে বুঝবেন না, লোকটা সেটা ঠিকই বলেছিল। ইউরেনিয়াম কাকে বলে জানেন?”

নীলমণি শিকদার সিঁটিয়ে গিয়ে বললেন, “না স্যার, জানি না।”

ভাদুড়িমশাইয়ের চোখ দেখলুম আবার সরু হয়ে এসেছে। চাপা গলায় বললেন, “লোকটা কি সত্যিই ইউরেনিয়ামের কথা বলেছে নাকি?”

“তবে আর বলছি কী, মিঃ ভাদুড়ি?” শেখর ঘোষাল বললেন, “লোকটা আমাকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল যে, আতর সিংকে যেন ছেড়ে দেওয়া না হয়। তার কারণ, তার ট্রাকে করে যে পাথর পাচার হচ্ছিল, তা নাকি ভেরি রিচ ইন ইউরেনিয়াম কনটেন্ট। সম্ভব?”

“খুবই সম্ভব।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওই পাহাড়ে শুনলুম এক তান্ত্রিক সন্নিসি থাকেন, নাম পাহাড়ি বাবা। তা বাবার খাদ্য যে শুধু পাথর, আর পাথর খেতে-খেতে পাহাড়ের পিছন দিককার অনেকখানি অংশই যে তিনি সাবড়ে দিয়েছেন, এটা শুনেই আমার মনে এই একই সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। কেন, আগেও যে এদিককার পাহাড় থেকে ইউরেনিয়াম পাচার হয়েছে, তা আপনি জানতেন না? কাগজে বেরিয়েছিল কিন্তু।”

“দেখুন মশাই,” সদানন্দবাবু গলা খাঁকরে বললেন, “একটা কতা খুবই লজ্জার সঙ্গে বলচি। ইউরেনিয়াম কাকে বলে, সেটা নীলমণিবাবু যেমন জানেন না,তেমনি আমিও জানি না। ওটা কী?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটা একটা মেটালিক এলিমেন্ট…পাথরের পিণ্ডের মধ্যে থাকে…নিউক্লিয়ার এনার্জি অর্থাৎ পরমাণু-শক্তির ওটা একটা মস্ত উপাদান। তাই বলে আবার ভাববেন না যে, এক ট্রাক পাথর মানেই এক ট্রাক ইউরেনিয়াম। সব রকমের পাথরে ওটা থাকেও না। যাতে থাকে, সেই রকমেরও বিস্তর পাথর ভেঙে হয়তো যৎসামান্য পাওয়া যায়।”

শেখর ঘোষাল বললেন, “তা হলে এখন আমরা কী করব?”

“যা করা উচিত, তা-ই করবেন। এস.পি.-কে জানান। তিনি নিশ্চয় আই. জি.-কে জানাবেন। আর আই. জি.-ও নিশ্চয় হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না। তিনি যদি হায়ার অথরিটিজের কানে কথাটা তুলে দেন, তো এখান থেকে কিছু পাথর নিয়ে গিয়ে সায়েন্স কলেজে কি সল্টলেকের রিসার্চ ইনস্টিউটে এর একটা ল্যাবরেটরি টেস্টের ব্যবস্থাও ওঁরা করবেন নিশ্চয়।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “আপনাদের কাজ অবশ্য তাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। পাহাড়টাকে ঘিরে রাখার ব্যবস্থা করুন। ওখানকার ওই তান্ত্রিক সন্নিসি…মানে ওই যাকে এখানকার লোকেরা পাহাড়ি বাবা বলে, তাকে আটক করুন। তবে তাকে যে আর পাবেন, তা তো মনে হয় না।”

“পাইনি, স্যার।” নীলমণি শিকদার কাতর কন্ঠে বললেন, “কাল বিকেলেই একজন সেপাইকে ওখানে পাঠিয়েছিলাম। সে ফিরে এসে বলল, কাল সকাল থেকেই তাকে ওখানে পাওয়া যাচ্ছে না।”

“ঠিক আছে। পাহাড়ি বাবা পালালেও আতর সিং তো পালায়নি। ট্রাক ছাড়াতে সে তো আজ বিকেলেই থানায় আসবে। তাকে অন্তত আটকে রাখুন। তারই ট্রাকে তো পাথর পাচার হচ্ছিল, সো দেয়ার ইজ এভরি রিজন টু সাসপেক্ট সেও এর সঙ্গে জড়িত। নরমে-গরমে যদি জেরা করেন, তো তার কাছ থেকেই ভাইটাল কিছু খবর পাওয়া যেতে পারে।”

“তাই-ই হবে।” নীলমণি শিকদারকে নিয়ে শেখর ঘোষাল উঠে পড়লেন। “আজ তা হলে চলি, মিঃ ভাদুড়ি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও হ্যাঁ, একটা কথা। ওই যে ফকির-মতন লোকটা…মানে থানায় এসে যে লোকটা খুব ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিচ্ছে…ভাবছি যে, ইউরেনিয়ামের ব্যাপারটা সে জানল কী করে। তার সঙ্গে একবার দেখা করিয়ে দেওয়া যায়?”

“এইয্যা!” নীলমণি শিকদার মাথা চুলকে বললেন, “আর তো তার উপায় নেই, স্যার।”

“কেন?”

“থানার কম্পাউন্ডের বাইরে যে ছাতিমগাছের তলায় তিনি বসতেন, আজ সকাল থেকেই সেখানে তাঁকে আর দেখতে পাচ্ছি না। একজন জমাদার বলল, কাল রাত্তিরেই তিনি এখান থেকে চলে গেছেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “লোকটা দেখতে কেমন?”

“যেমন রোগা, তেমনি ঢ্যাঙা। গায়ের রং কুচকুচে কালো। পরনে একটা সাদা আলখাল্লা,আর মাথায় একটা চকরা-বকরা টুপি। ফকির-টকির বলে মনে হয়।…এঃ, আপনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে পারলুম না।”

“সে আর কী করা যাবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, আপনাদের আর আটকে রাখব না।”

ঘোষাল আর শিকদার নীচে নেমে গেলেন।

ভাদুড়িমশাই দেখলুম হঠাৎই বড় গম্ভীর হয়ে গেছেন। মাথা নিচু করে একেবারে ঝিম মেরে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর মুখ তুলে বললেন, “কিছু বোঝা গেল?”

“এর আর বোজাবুজির কী আচে?” কপালে হাত ঠেকিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “ডেসক্রিপশানের কোনও দরকারই ছিল না, লোকটা যে কে, সে তো ওই ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেবার কতা শুনেই আমি বুজে গেচি। অমিতাভ তো এরই কথা বলেছিল। এ হচ্ছে মোম্বাসার সেই কালীচরণ।”

আমি বললুম, “তা লোকটা হঠাৎ আফ্রিকা ছেড়ে এখানে এসে উদয় হল কেন? এই ইউরেনিয়াম পাচারের ব্যাপারটা ধরিয়ে দেবার জন্যে?”

“আরে না মশাই, ওটা একটা ছুতো। আসলে অমিতাভকে ছেড়ে দিয়েচে তো, এখন বোধহয় ভাদুড়িমশাইকে নিয়ে কিছুদিন খেলবে।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তা হলে তো ভালই হয়। দেখাসাক্ষাৎটা হয়ে গেলে অবশ্য আরও ভাল হত।”

“ও-কতা বলবেন না, ও-কতা বলবেন না,” সদানন্দবাবু শিউরে উঠে বললেন, “আড়ালে থেকে জানান দিয়েচেন, এতেই খুশি থাকুন, আর দেখাসাক্ষাৎ হয়ে কাজ নেই।…তারা ব্রহ্মময়ী মাগো, রক্ষে করো!”

রচনাকাল : ১৪০২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *