(২৫)
আজ ১১ অক্টোবর, বুধবার। কাল রাত্তিরে আমার বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারে তালগোল পাকিয়ে গেসল। সদানন্দবাবুর অবস্থাও তথৈবচ। আশা মালহোত্রাই যে খুনি, তার স্পষ্ট প্রমাণ থাকতেও যে কেন খুনের দায়ে ডাক্তার তারাপদ দত্তকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেওয়া হল, তা যেমন আমিও বুঝিনি, তেমনি সদানন্দবাবুও বোঝেননি। ভাদুড়িমশাইও কাল আর এ নিয়ে মুখ খুলতে চাইলেন না, রাত্তিরের খাওয়া শেষ হতেই তিনি ‘বড্ড ঘুম পেয়ে গেছে, মশাই’ বলে তাঁর ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। তবে কাল সকাল আটটার সময় তো শেখর ঘোষাল এখানে আসছেনই, আশা করছি যে, ভাদুড়িমশাই তখন সব কথা বুঝিয়ে বলবেন।
নীলমণি শিকদারকে সঙ্গে নিয়ে এস. ডি. পি.ও. শেখর ঘোষাল এসে গেলেন আটটার একটু আগেই। এসেই জানালেন যে, তারাপদ দত্তকে কাল রাত এগারোটা নাগাদ তাঁর ফ্ল্যাট থেকে তুলে এনে থানা হাজতে পুরে দেওয়া হয়েছে।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর যে এভিডেন্সের কথা বলেছিলুম?”
“সেটা ওঁর শোবার ঘরের তাকে ছিল। সেখান থেকেই সিজ করেছি
“জিনিসটা যে ওঁর ঘরে পাওয়া গেছে, তার কোনও সাক্ষী রেখেছিলেন তো?”
“দোতলার সুরঞ্জন বসাক সাক্ষী। তিনতলায় ওঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলুম। সুরঞ্জনবাবুকে দিয়ে একটা স্টেটমেন্টও সই করিয়ে নিয়েছি।”
“ভাল করেছেন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে ধীরেসুস্থে চার্জ ফ্রেম করুন, মামলা শুরু হোক, এভিডেন্সটা তখন আদালতে পেশ করবেন।”
শেখর ঘোষাল বললেন, “কিন্তু মিঃ ভাদুড়ি, আপনি ওটার হদিশ পেলেন কীভাবে, খুনির মোটিভটাই বা কী, সে-সব তো কিছুই বললেন না। চার্জ ফ্রেম করার আগে তো সেগুলি আমাদের জানা দরকার।”
ভাদুড়িমশাই সামান্য হেসে বললেন, “সবই বলব। তবে একটু অপেক্ষা করুন। কাল রাতে সেনমশাইকে ফোন করেছিলুম। এখানে আসতে বলে দিয়েছি। এক্ষুনি বোধহয় এসে পড়বেন। কথা যা হবে, সেটা তাঁর সামনে হওয়াই ভাল।”
কালীচরণ সেন এসে গেলেন মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই। একা আসেননি, স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। মুখচোখ দেখে মনে হল, দুজনেই বেশ উত্তেজিত।
“বসুন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাদের কয়েকটা কথা জানাবার আছে।”
“সে তো বুঝতেই পারছি,” সেনমশাই বললেন, “কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো? তারাপদকে হঠাৎ অ্যারেস্ট করা হল কেন?”
শেখর ঘোষাল বললেন, “খবরটা আপনি কার কাছে পেলেন?”
“সুবীর নন্দীর কাছে। এখানে আসব বলে রওনা হচ্চি, এমন সময় ওঁর ফোন এল।”
“উনি কার কাছে খবরটা পেলেন, সেটা জানিয়েছেন?”
“জানিয়েছেন বই কী। ওর বাড়িতে যে ছেলেটা রোজ সকালে দুধ দিয়ে যায়, তার কাছে।… কিন্তু ব্যাপারটা কী? দুম করে একটা লোককে আপনারা অ্যারেস্ট করে বসলেন কেন? এনি স্পেসিফিক চার্জ?”
“তা ছাড়া কি অ্যারেস্ট করা যায়? ওঁকে আমরা খুনের দায়ে ধরেছি।”
“তার মানে? কাকে খুন করল?”
“মিসেস রেখা দাশকে।”
“হোয়াট?” কালীচরণ সেন বললেন, “আপনাদের কি মাথাখারাপ হয়েছে? তারাপদ কেন রেখাকে খুন করবে। আর তা ছাড়া ও ব্যাপারে তো আপনারা সুরেশকে সন্দেহ করছিলেন।”
ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “করছিলেন ঠিকই, কিন্তু এখন আর করছেন না। ওঁদের হাতে এভিডেন্স রয়েছে যে, সুরেশবাবু নন, ডাক্তার দত্তই খুনি। ফলে, বুঝতেই তো পারছেন…
কথাটা শেষ করতে পারলেন না। কেন না, ইতিমধ্যে তিনি লক্ষ করেছিলেন যে, দোতলায় আর-এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। চিফ একজিকিউটিভ অফিসার স্বয়ং আজ এখানে ব্রেকফাস্ট করবেন, তায় তিনি একা না এসে সস্ত্রীক এসেছেন, গেস্ট হাউসের বয়-বেয়ারা বাবুর্চিদের মধ্যে তাই বেশ একটা চাঞ্চল্যের যে সৃষ্টি হয়েছে, দোতলা থেকেও ক্রকারি আর কাটলারির আওয়াজে সেটা আন্দাজ করা যাচ্ছিল। ম্যানেজার-ভদ্রলোকটির দেখা অন্য সময়ে বড়-একটা পাওয়া যায় না, কিন্তু আজ তিনি নিজেই উপরে এসে জিজ্ঞেস করলেন যে, ব্রেকফাস্ট কি উপরেই সার্ভ করা হবে, নাকি আমরা ডাইনিং হলে যাব।
কালীচরণ সেন বললেন, “এখানে জায়গা কোথায়, ঘেঁষাঘেঁষি হবে, ডাইনিং হলেই যাচ্ছি।” তারপর, ম্যানেজার যখন নীচে নেমে যাচ্ছেন, তখন পিছন থেকে তাঁকে ডেকে বললেন, “আর হ্যাঁ, শোনো, কিচেন স্টাফকে বলে দাও যে, খাবার তাড়াতাড়ি সার্ভ করে, চায়ের সরঞ্জাম টেবিলের উপরে রেখে চটপট তারা যেন হল থেকে বেরিয়ে যায়। ডাইনিং হলেই আমরা একটা মিটিংয়ে বসে যাব, ওখানে বাইরের কারও থাকা ঠিক হবে না। …গট ইট?”
চিফ এগজিকিউটিভ অফিসারের কথা বলার ভঙ্গি থেকেই যা বুঝবার ম্যানেজার তা বুঝে গিয়েছিলেন। ‘ইয়েস, স্যার’ বলেই তিনি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন।
কালীচরণ সেন এবারে শেখর ঘোষালের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখুন মিঃ ঘোষাল, আমি যেমন আমার ডিউটি করছি, তেমনি আপনিও আপনার ডিউটি করছেন। আপনার কাজে ইন্টারফিয়ার করার কোনও ক্ষমতাও আমার নেই, ইচ্ছেও নেই। বাট সিনস ইট ইনভল্স টু অভ মাই ওয়ার্কার্স, তখন একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি তো? নাকি তাও পারি না?”
“তা কেন পারবেন না?” শেখর ঘোষাল অমায়িক হেসে বললেন, “কী জানতে চান বলুন?”
“আমি ধরে নিচ্ছি যে, সুরেশ ইজ অফ দ্য হুক, তাকে আপনারা অ্যারেস্ট করছেন না। অ্যাম আই রাইট?”
“অফ কোর্স ইউ আর। যে লোকটা খুনি, তাকে তো আমরা পেয়েই গেছি। সুরেশবাবুকে তা হলে আর অ্যারেস্ট করব কেন?”
“ভেরি গুড,” কালীচরণ সেন বললেন, “কথাটা এইজন্যে বলছিলুম যে, অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে উই আর রাদার শর্ট অভ হ্যান্ডস। সুরেশ না–থাকায় কাজের ক্ষতি হচ্ছে। সুবীর নন্দী অন্তত সেই কথাই গত কয়েক দিন ধরে বলে যাচ্ছিল। …ঠিক আছে, সুরেশকে তা হলে, আজ থেকেই কাজে জয়েন করতে বলি।”
বন্দনা সেন এতক্ষণ একটিও কথা বলেননি। এ বারে স্বামীর কথা শুনে বললেন, “তা কী করে হয়? যদ্দুর জানি, আজই রেখার শ্রাদ্ধশান্তি। তা ছাড়া, লোকটার উপর দিয়ে গত ক’দিন ধরে ঝড় তো নেহাত কম গেল না। অন্তত একটা দিন ওকে বিশ্রাম নিতে দাও।”
কালীচরণ সেন বললেন, “বেশ, তা হলে কালকের দিনটা বাদ দিয়ে পরশু শুক্রবার জয়েন করুক। তারপর শেখর ঘোষালের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার কিন্তু আরও দু-একটা প্রশ্ন রয়েছে।”
“বেশ তো, জিজ্ঞেস করুন।”
জিজ্ঞেস করা হল না, কেননা গেস্ট হাউসের ম্যানেজারমশাই ঠিক এই সময়েই উপরে এসে জানালেন যে, ব্রেকফাস্ট রেডি। কালীচরণ সেন বললেন, “চলুন, তা হলে নীচে যাওয়া যাক। ওখানে বসেই কথা হবে।”
কথা শুরু হতে-হতে আরও মিনিট পাঁচেক লাগল। চটপট ব্রেকফাস্ট সার্ভ করে বেয়ারা বাবুর্চিরা বাইরে চলে যাওয়ার পরে ম্যানেজার বললেন, “আমরা লাউঞ্জেই আছি, স্যার, কোনও দরকার হলে কাইন্ডলি বেল বাজাবেন।” বলে তিনিও দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গেলেন।
এক মুহূর্ত নিঃশব্দ কাটল। তারপর শেখর ঘোষাল বললেন, “আপনি কী জিজ্ঞেস করবেন বলছিলেন?”
কালীচরণ সেন তাঁর ফ্রুট জুসের গ্লাস এক চুমুকে নিঃশেষ করে, পেপার ন্যাপকিনে ঠোঁট মুছে বললেন, “ইয়েস, আই ওয়জ কামিং টু দ্যাট। তারাপদই যে খুনি, এই সন্দেহ আপনাদের হল কেন?”
“হলদে চুল দেখে।”
“হোঅট?” কালীচরণ সেন বাটার নাইফ দিয়ে টোস্টে মাখন মাখাতে শুরু করেছিলেন। ছুরি নামিয়ে রেখে বললেন, “হলদে চুল? তার মানে?”
শেখর ঘোষাল বললেন, “আপনাকে বলা হয়নি যে, পোস্ট মর্টেমের সময় মিসেস রেখা দাশের ডান হাতের মুঠোর মধ্যে কয়েক গাছি হলদে চুল পাওয়া যায়। এদিকে সুরেশ দাশের একটা অ্যালিবাই তো ছিলই, খুনের সময়ে…আই মিন সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে ঘটনাস্থলে তিনি ছিলেনই না, তার উপরে আবার এই হলদে চুল পেয়ে যাওয়ায় আমাদের সন্দেহ ঘুরে যায় মিসেস মালহোত্রার দিকে।”
বন্দনা সেন বললেন, “ওরে বাবা, আশার চুল তো হলদেই বটে। মেহেদি মাখিয়ে ওই রং করেছে। চুল যে পেকেচে, সেটা ঢাকা দেবার ফিকির আর কি!”
“তো আমরা ধরে নিলুম যে, খুনটা যখন হয়, মিসেস দাশের সঙ্গে খুনির তখন ধস্তাধস্তি হয়ে থাকবে। আর সেই সময়ে খুনির কয়েক গাছি চুল নিশ্চয় মিসেস দাসের মুঠোর মধ্যে আটকে যায়, তাড়াহুড়োর মধ্যে খুনি সেটা আর ছাড়িয়ে নিতে পারেনি। তা মিসেস মালহোত্রা ছাড়া আর কারও চুল তো এখানে হলদে নয়। তাই খুনের চার্জে মিসেস মালহোত্রাকে হয়তো আমরা অ্যারেস্ট করতুম।”
বন্দনা সেন বললেন, “করলেন না কেন?”
শেখর ঘোষাল বললেন, “করব বলেই তো ঠিক ছিল, কিন্তু মিঃ ভাদুড়ি করতে দিলেন না। কেন দিলেন না, সেটা বরং ওঁকেই জিজ্ঞেস করুন।
ভাদুড়িমশাই মিটিমিটি হাসছিলেন। বললেন, “দিলুম না, কারণ, খুন করার একটা সুযোগ তো চাই, সেই সুযোগটাই মিসেস মালহোত্রার ছিল না। ওই সক্কালবেলায় নিজের বাংলো থেকে বেরিয়ে, অতটা রাস্তা পাড়ি দিয়ে, সাব-অর্ডিনেট স্টাফদের ফ্ল্যাটবাড়িতে ঢুকে একজনকে খুন করে তিনি ফিরে এলেন, অথচ ফ্ল্যাটবাড়িতে কেউই তাঁকে ঢুকতে দেখল না, ঠিক এতটা আমার বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি।”
এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “তা ছাড়া আর-একটা কথাও ভাবতে হবে। শুধু চুল নয়, মিসেস দাশের মুঠোর মধ্যে ক্লিপও পাওয়া গেছে একটা! ওই যা দিয়ে চুলের ওয়েভি ভাবটা ঠিক রাখতে হয়। অথচ গত রোববার রাত্তিরে ডিনার পার্টিতে মিসেস মালহোত্রাকে যখন আমরা প্রথম মিট করি, তখন তাঁর চুলে অমন কোনও ক্লিপ আমি দেখিনি।”
“ওই হলদে চুল আর ক্লিপটা তা হলে কার?” প্রশ্নটা বন্দনা সেনের।
“ওটা যাঁর, বেঁচে থাকলে তাঁর বয়েস অ্যাদ্দিনে দু’হাজার তিন শো বছরেরও বেশি হয়ে যেত। “ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ওটা নন্দরাজের মন্ত্রী কাত্যায়নের। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, কাত্যায়নের পরচুলার।”
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমি চমকে উঠেছিলুম। কালীচরণ সেনের মুখ দেখে মনে হল, রহস্যটা তিনিও ঠিকই আন্দাজ করে নিয়েছেন। বললেন, “মাই গড! এটা আপনি ধরলেন কী করে?”
“আমি আর ধরলুম কোথায়, আপনিই তো ধরিয়ে দিলেন।”
“তার মানে?”
“তার মানে পরশু বিকেলে আপনার সঙ্গে টাউনশিপ আর কারখানা দেখতে বেরোই, তখন ডেকরেটরের তৈরি করা স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে আপনার সঙ্গে সদানন্দবাবুর কিছু কথা হয়েছিল। তো সেই সময়ে আপনি বলেছিলেন যে, আপনাদের নাটকের কস্টিউম অনেক আগেই এসে গেছে আর আসামাত্তর সেগুলো হাতে-হাতে বিলিও হয়ে গেছে। বলেননি?”
“হ্যাঁ, মনে পড়েছে, বলেছিলুম বটে।”
“এদিকে মিসেস দাসের মুঠোর মধ্যে যে হলদে চুল পাওয়া গেছে, শেখর ঘোষাল সেদিন সকালেই সে-কথা আমাকে জানিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ওই যে বললুম, আশা মালহোত্রার চুল হলদে, সেটা জানা সত্ত্বেও তিনিই যে খুনি এটা আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলুম না। খুন করার সুযোগটাই তো তাঁর নেই। তা হলে?”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “তাই ভেবে যাচ্ছিলুম যে, ওই হলদে চুল তা হলে কার হতে পারে। ভেবে-ভেবে যখন কোনও কূলকিনারা পাচ্ছিলুম না, ঠিক তখনই আপনি বললেন চন্দ্রগুপ্ত নাটকের কস্টিউমের কথা। ব্যস, আমিও সঙ্গে-সঙ্গে হলদে চুলের হদিশটা ঠিকই পেয়ে গেলুম।”
সদানন্দবাবু হাঁ করে সব শুনছিলেন, এবারে বললেন “একটু বুজিয়ে বলবেন?”
“বোঝাবার তো কিছু নেই।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আরে মশাই, কস্টিউম বলতে কি শুধু জামাকাপড়, শাড়িগয়না আর পুঁতির মালা বোঝায়? পরচুলাটাও ওরই মধ্যে এসে যাচ্ছে না? তা ভেবে দেখলুম যে, হলদে…মানে আমাদের এস.ডি. পি.ও. সাহেব যাকে গোল্ডেন ব্রাউন কালার বলছেন…এই নাটকে সেই রঙের পরচুলার দরকার কার-কার হতে পারে।”
উত্তরটা সদানন্দবাবুই দিলেন। বললেন, “দুই বুড়োর। চাণক্যের আর কাত্যায়নের।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “রাইট। তবে যেমন আশা মালহোত্রা, তেমনি চাণক্যের অর্থাৎ কালীচরণ সেন মশাইয়েরও খুন করার সুযোগ বিশেষ ছিল না। সুযোগ কিন্তু কাত্যায়নের ছিল। সে একই বাড়িতে থাকে। তিনতলা থেকে মুখ বাড়িয়ে সিঁড়িতে কিংবা বারান্দায় কেউ আছে কি না, সেটা দেখে নিয়ে খুব সহজেই সে দোতলায় নেমে এসে খুন করে ফের তিনতলায় ফিরে যেতে পারে। শুধু পরচুলাটা পরে নিলেই হল। হঠাৎ যদি কেউ দেখেও ফেলে, তা হলে চিনতে পারবে না। তার উপরে আবার খুনের একটা মোটিভও তার ছিল।”
“মোটিভ?” কালীচরণ সেন বললেন, “কী মোটিভ ছিল তারাপদর?”
“উনি ওঁর অতীত জীবনের একটা ঘটনার কথা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। সুরঞ্জন বসাককে আপনি বোধহয় চিনবেন না, আপনাদেরই কনস্ট্রাকশন ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মী, ওই একই ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকেন। কাল সকালে তাঁর কথা থেকে একটা হিন্ট পাই, পরে কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি যে, ডাক্তার হিসেবে আপনাদের এই তারাপদ দত্ত ইজ আ র এগ, পরপর কয়েকটা কেসে ভুল ডায়াগনোসিস করে আর ভুলভাল ওষুধ দিয়ে উনি কয়েকজন রোগীর মৃত্যু ঘটান। ফলে ওঁর রেজিস্ট্রেশন ক্যানসেলড হয়ে যায়। এ হল কুড়ি বছর আগের ঘটনা।”
“বলেন কী! এখানে তা হলে ও চাকরি পেল কী করে?
“ব্যাপারটাকে স্রেফ চেপে গিয়ে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা ছাড়া আর কী বলব। এইভাবে নিশ্চয় আরও কোথাও-কোথাও উনি চাকরি করেছেন। সে-সব জায়গায় ধরা পড়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আপনাদের চাকরিতে এসে ঢুকেছিলেন।”
বন্দনা সেন বললেন, “রেখা এটা জানত?”
“যতদিন পর্যন্ত জানতেন না, ততদিনই মিসেস দাশ নিরাপদ ছিলেন। কিন্তু মিসেস দাশের দিদি জানতেন। এই দিদিটির সঙ্গে কালই আমার কথা হয়েছে। তাঁরই কাছে শুনলুম যে, দুর্গাপুজোর সময় এখানে এসে তিনি তাঁর বোনকে সব কথা জানিয়ে দেন। আমার ধারণা, এই জেনে যাওয়ার ব্যাপারটা মিসেস দাশের কথাবার্তায় কি ভাবেভঙ্গিতে হয়তো প্রকাশও পেয়ে থাকবে। ফলে, তারাপদ দত্তের ভয় হয় যে, তাঁর ওই রেজিস্ট্রেশন ক্যানসেলেশনের ব্যাপারটা এবারে চাউর হয়ে যাবে। একইসঙ্গে তিনি বুঝে যান যে, চাউর হবার আগেই কিছু একটা করা দরকার। বাস, খুনের প্ল্যান আঁটতে তারপরে আর তাঁর দেরি হয়নি।”
রহস্যটা আদ্যন্ত বুঝে নিয়ে খানিকক্ষণ একেবারে থম মেরে বসে রইলেন মিঃ কালীচরণ সেন। তারপর বললেন, “তারাপদ যে কী চিজ, সেটা বুঝলুম। হি ইজ আ রোগ, অ্যান্ড হ্যাজ টু বি পানিশড। কিন্তু আমরা যে বড় মুশকিলে পড়ে গেলুম মশাই। আজ সন্ধেয় নাটক হবার কথা, অথচ এই শেষ সময়ে কোত্থেকে আর-একটা কাত্যায়ন জোগাড় করে আনব, বলুন তো?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ও নিয়ে ভাববেন না, এই যে আমাদের সদানন্দবাবুকে দেখছেন, অ্যাক্টিংয়ের ব্যাপারে ইনি একজন ভার্সেটাইল জিনিয়াস, আর কাত্যায়নের রোল তো এঁর করাই আছে। এঁকে নামিয়ে দিন, একেবারে ফাটিয়ে ছেড়ে দেবেন।
বন্দনা সেন বললেন, “তবে তো কথাই নেই। একটু বাদেই আমাদের স্টেজ রিহার্সাল শুরু হচ্ছে, তা হলে উনিও আমাদের সঙ্গে চলুন। পার্টটা তখন একবার ঝালিয়ে নিতে পারবেন।”
“কিচ্ছু দরকার হবে না, ম্যাডাম,” সদানন্দবাবু বললেন, “পার্ট আমার এ টু জেড মোখোক্তোই আচে, একেবারে রাইট টাইমে গিয়ে নেমে পড়বখন। কিন্তু কাত্যায়নের পরচুলাটা তো পুলিশের হেপাজতে, এক্সট্রা একটা পরচুলা পাওয়া যাবে তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দরকার কী। আপনার চুল তো এমনিতেই পাকা, তা হলে আর পরচুলা দিয়ে কী হবে।”
কালীচরণ সেন টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লেন। বললেন, “সওয়া ন’টা বাজে। বন্দনাকে রিহার্সালের ওখানে নামিয়ে দিয়ে আমাকে একবার অফিসে যেতে হবে, জরুরি দু’একটা কাজ পড়ে রয়েছে, না-গেলেই নয়। তবে, যাবার আগে একটা কথা বলে যাই, মিঃ ভাদুড়ি। কথা ছিল, আমাদের ফাংশনের পরদিনই আপনারা কলকাতায় ফিরে যাবেন। কিন্তু কাল আপনাদের যাওয়া হচ্ছে না।”
“সে কী!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “না গিয়ে তো উপায় নেই, অনেক কাজ পড়ে রয়েছে যে।”
“তা বললে শুনছি না।…আরে মশাই, একটুও তো রেস্ট পেলেন না, ক’টা দিন স্রেফ গোয়েন্দাগিরি করেই কাটালেন। অফ কোর্স উই আর রিয়েলি ভেরি গ্রেটফুল ফর অল দ্যাট ইউ হ্যাভ ডান, কিন্তু একটা দিনও যদি একটু বিশ্রাম না নিয়ে স্রেফ ভূতের বেগার খেটে আপনি ফিরে যান, তো আমরা যে বড় লজ্জায় পড়ে যাব মশাই।…না না, এ নিয়ে আর কোনও আপত্তি করবেন না, কালকের দিনটা আপনাদের থাকতেই হবে।”
কথা শেষ করে কালীচরণ সেন আর দাঁড়ালেন না। সস্ত্রীক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
শেখর ঘোষাল বললেন, “আমরাও তা হলে উঠি। কাল রাত্তিরে থানায় এক সাধুবাবা এসে হাজির হয়েছেন। বলছেন, আমার সঙ্গে দেখা না-করে নড়বেন না। নীলমণিবাবু বলছেন, ‘দেখাটা করেই যান স্যার, অমনি নিজের হাতটাও একবার দেখিয়ে নেবেন।’ সাধু নাকি মস্ত গনতকার। তাই ভাবছি গিয়ে একবার বুঝেই আসা যাক যে, ব্যাপারটা কী। তা কালকের দিনটাও তো আপনারা আছেন?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “মিঃ সেন যে-ভাবে বলে গেলেন, তাতে তো মনে হচ্ছে পরশুর আগে ছাড়বেন না।”
“ঠিক আছে, তা হলে কাল একবার এসে আপনার সঙ্গে দেখা করে যাব। এই ধরুন সকাল দশটা নাগাদ।” নীলমণি শিকদারকে নিয়ে শেখর ঘোষালও বেরিয়ে গেলেন।
“আমরাই বা আর বসে আছি কেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, ওপরে যাওয়া যাক।”
