আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(২৩)

গেস্ট হাউস থেকে ঠিক সাড়ে তিনটেতেই বেরিয়ে পড়া গেল। যথারীতি মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাম ঠুকে, যথারীতি গাড়ির দরজা খুলে আমাদের ভিতরে ঢুকিয়ে রামপ্রসাদ গিয়ে ড্রাইভারের আসনে বসল। তারপর, ইগনিশন কি ঘুরিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে জিজ্ঞেস করল যে, এখন সে তার হুজুরদের নিয়ে কোথায় যাবে।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন যদি তোমাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিলডিংয়ে যাই তো নন্দীসাহেবের দেখা পাব?”

আমরা যে অন্য কোনও নন্দীসাহেব নয়, এখানকার সিনিয়র অ্যাকাউন্টস অফিসার মিঃ সুবীর নন্দীর সঙ্গেই দেখা করতে চাই, ভাল করে সেটা বুঝে নিয়ে রামপ্রসাদ বলল, “কিউ নেহি? নন্দীসাব তো পাঁচ বাজে তক দফতরেই থাকেন, তার আগে যখুন যাবেন, দেখা হোবে।”

“এখন তো সবে সাড়ে তিনটে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “পাঁচটা বাজার এখনও অনেক দেরি। চলো, তার আগে একবার স্টেশনের ওদিক থেকে একটু ঘুরে আসা যাক, ফিরতি পথে নন্দীসাহেবের ওখানে গেলেই হবে।”

গেস্ট হাউস থেকে আমরা বেরিয়ে পড়লুম। ছোট্ট টাউনশিপ, তার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে যেতে মাত্রই মিনিট কয়েক লাগল। কিন্তু তার পরে আর খুব বেশিদূর এগোনো গেল না। কারণটা আর কিছুই নয়, রাস্তা বন্ধ। টাউনশিপের সরু রাস্তাটা যেখানে স্টেশনে যাবার রাস্তায় গিয়ে মিশেছে, তার খানিক আগেই রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে দুটো পুলিশ ভ্যান, রামপ্রসাদ বারবার হর্ন বাজানো সত্ত্বেও তাদের কোনওটাই যে রাস্তা ছেড়ে একটু সরে দাঁড়াবে কি পিছু হটবে, এমন লক্ষণ আমাদের চোখে পড়ল না। একটা ভ্যানের ভিতর থেকে একজন কনস্টেবল বেরিয়ে এল বটে, কিন্তু সেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তার গাড়ির পাশেই, কেন দুটো ভ্যানের একটাকেও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না, এগিয়ে এসে সেটা যে সে বুঝিয়ে বলবে, লোকটির নির্লিপ্ত ভঙ্গি দেখে মনে হল এমন কোনও ইচ্ছেই তার নেই।

রামপ্রসাদ আরও কয়েকবার হর্ন বাজাল। তারপর তাতে কোনও কাজ হচ্ছে না দেখে স্টার্ট বন্ধ করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে বলল, “আপনারা থোড়া বসেন হুজুর। আমি আভি পতা করে আসছি।” আমরা তো চুপচাপ বসেই ছিলুম। সদানন্দবাবুই প্রথম মুখ খুললেন। গাড়ি ছেড়ে রামপ্রসাদ কয়েক পা এগিয়ে গেছে এটা দেখে নিয়ে এবং আমাদের কথাবার্তা যে আর তার কর্ণগোচর হবার আশঙ্কা নেই এ-ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে তিনি বললেন, “মিঃ ঘোষাল তো দেকচি এ ম্যান অফ হিজ ওয়ার্ড! যে-কতা সেই কাজ!”

আমি বললুম, “বাঁচা গেল। কী বলব মশাই, আমার তো ভয় হচ্ছিল যে, ভদ্রলোকের কনসেন্স না ফের চাগাড় দিয়ে ওঠে।”

ভাদুড়িমশাই গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন। আমার কথা শুনে সামান্য হাসলেন। কিছু বললেন না। রামপ্রসাদ ফিরে এসে বলল, “গাড়ি ঘুমাতে হোবে হুজুর।”

গাম্ভীর্যের মুখোশটা ইতিমধ্যে আবার ভাদুড়িমশাইয়ের মুখে এঁটে বসেছিল। রামপ্রসাদের কথা শুনে বিরক্ত গলায় তিনি বললেন, “সে কী। কেন?”

“পুলিশের গাড়ি দু’টা খরাব হয়ে গেছে।”

“একসঙ্গে দুটোই খারাপ? তাই কি হয় নাকি?”

“হাঁ, হুজুর, দুটাই খরাব। কুছু করবার নাই।”

“কী করে খারাপ হল, জিজ্ঞেস করেছিলে?”

“হাঁ, হুজুর। তো শুনলাম যে, একটা আগেই ব্রেকডাউন হয়ে গিয়েছিল, বাদমে সেটাকে টেনে লিয়ে যেতে এসে দুসরি গাড়িও বিগড়ে যায়।”

“বাঃ, চমৎকার। যেমন পুলিশ, তার তেমনি ভ্যান।” ভাদুড়িমশাই তেতো গলায় বললেন, “তো এইভাবে ওরা রাস্তা জুড়ে থাকবে নাকি? অন্য গাড়ি যাতায়াত করতে পারবে না?”

“সেটা ভি জিজ্ঞেস করেছিলাম, হুজুর। তো বলল যে, থানায় লোক পাঠানো হয়েছে, থানা থেকে কোই মেকানিককে ধরে ইখানে পাঠাবে। সে এসে মারাম্মতি করবে। তার আগে গাড়ি চলবে না।”

ভাদুড়িমশাই ঝাঁঝালো গলায় বললেন, “মেকানিক তো তোমাদের কারখানার মোটর ভেহিকলস ডিপার্টমেন্টেও কিছু কম নেই। তাদের কেউ এসেই তো কাজটা করে দিতে পারত।”

রামপ্রসাদ শিউরে উঠে বলল, “বাপ রে। পুলিশের গাড়ি আছে না?”

“তাতে কী হয়েছে?”

“আমাদের কোই মেকানিক ও গাড়ি ছুঁবে না, হুজুর।”

“কেন?”

“কুছু গড়বড় হয়ে গেলে বহোত মুশকিলে পড়বে। পুলিশ বহোত চোটপাট করবে।…নেহি হুজুর, উ নহি তো শকতা। পুলিশের গাড়ি পুলিশওয়ালার মেকানিক এসে রিপেয়ার করবে, সেটাই ভাল হোবে।”

সদানন্দবাবু যে মাঝেমধ্যে এক-আধটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেন, সেটা অস্বীকার করার নয়। তবে, অন্যের কথাবার্তার গতিপ্রকৃতি দেখে বেশির ভাগ সময়েই যে ঝোপ বুঝে কোপ মারতে তাঁর ভুল হয় না, সেটাও ঠিক। এবারে সেই কোপটাই তিনি মারলেন। বললেন, “কোনও মানে হয়? পুলিশ নিজেও নিজের গাড়ি সারাবে না, আবার অন্যেরা সারাতে এলেও চোটপাট করবে। এ তো দেকচি ডগ ইন দি ম্যাঞ্জার পলিসি!”

রামপ্রসাদ বলল, “তা হলে কি গাড়ি ঘুমায়ে লিব হুজুর?”“

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী আর করবে, ঘুরিয়ে নাও।”

“তা হলে কি নন্দীসাবের দফতার যাবেন?”

“ওহো তাই তো!” হাতঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেকার এখানে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ মিনিট নষ্ট হল। সওয়া চারটে বাজে। সাড়ে চারটের মধ্যে ওখানে যদি পৌঁছে যাই তো ভালই। ভদ্রলোকের সঙ্গে দু’একটা কথা বলা দরকার, তার জন্যেও তো কিছু সময় চাই।”

অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিলডিংয়ে যখন পৌঁছলুম, তখনও সাড়ে চারটে বাজতে দু’তিন মিনিট বাকি। বিশাল আয়তনের দোতলা বাড়ি। সামনে অনেকখানি জায়গা জুড়ে লন, বাগান, ফোয়ারা। সবটা ঘিরে মোরাম-বিছানো চওড়া ড্রাইভ। তার ধারে সারবন্দি দেবদারু। গাছগুলির বয়স বেশি নয়। সম্ভবত বছর দুয়েকের মধ্যেই লাগানো হয়েছে, মাথায় এখনও বিশেষ বাড়েনি। আপিস-বাড়িকে নেহাতই লোহা আর ইট-পাথরের দম-আটকা খাঁচা না বানিয়ে ইদানীং তাতে খোলামেলা একটা আবহাওয়া ফুটিয়ে তোলার যে-চেষ্টা প্রায়ই চোখে পড়ে, এখানেও সেটা নজর কেড়ে নেয়।

ড্রাইভের উপর দিয়ে ঘুরে এসে রামপ্রসাদ একেবারে বাড়িটার সামনে গাড়ি দাঁড় করাল। এর আগে এই বাড়িটিকে দূর থেকে দেখিনি তা নয়, তবে এই প্রথম এর ভিতরে আমরা ঢুকতে যাচ্ছি। ঢুকতে গিয়ে কালীচরণ সেনের সঙ্গে দেখা। তিনি তখন ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। পিছনে উর্দি-পরা আর্দালি, তার হাতে ব্যাগ আর গোটাকয়েক ফাইল। মিঃ সেন যে আমাদের দেখে একটু বিস্মিত হয়েছেন; সেটা বোঝা গেল। বললেন, “কী ব্যাপার? কোনও কথা ছিল?”

ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “আপনার সঙ্গে নয়, মিঃ নন্দীর সঙ্গে।”

মিঃ নন্দীর সঙ্গে আমরা কী নিয়ে কথা বলতে এসেছি, কালীচরণ সেন আর সে-প্রশ্ন-করলেন না, একজন বেয়ারাকে ডেকে বললেন, “এঁদের নন্দীসাহেবের কাছে নিয়ে যাও।” তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে, “একটু তাড়া আছে, আমি চললুম, পরে আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেব।”

মিঃ সেন সিঁড়ি দিয়ে তিন ধাপ নেমে তাঁর গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেলেন।

বেয়ারাটির সঙ্গে আমরা দোতলায় উঠে এলুম।

স্লিপ লিখে ভিতরে পাঠাতে মিঃ নন্দী নিজেই বেরিয়ে এলেন তাঁর কামরা থেকে। তাঁর পিছন-পিছন আর-একটি লোকও বেরিয়ে এল। পায়ে শুঁড়-তোলা নাগরা জুতো, পরনে ফিনফিনে মিলের ধুতি আর ঊর্ধ্বাঙ্গে ধবধবে সাদা মোটা জিন-কাপড়ের উপরে ত্যাড়চা করে নীল স্ট্রাইপ টানা মেরজাই। হাতে স্টিলের বালা, জুলফি-জোড়া দু’কানের লতি পর্যন্ত নামানো, গোঁফের দুই প্রান্ত যে-রকম সরু হয়ে কিঞ্চিৎ উঠে আছে, তাতে বোঝা যায়, গোঁফজোড়াটি মোমে মাজা। প্রায় ছ’ফুট লম্বা শক্তসমর্থ মানুষটির বয়স মনে হল চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে। চেহারায় ও পরিচ্ছদে যে শৌখিনতার ছাপ রয়েছে, সেটাকে দেহাতি বড়লোকের শৌখিনতা বলে চিনতে কারও ভুল হবার কথা নয়।

সুবীর নন্দী বললেন, “আরে আসুন আসুন, আপনারা আসবেন এ তো ভাবতেই পারিনি। আসুন, ভিতরে আসুন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সামান্য দু-একটা কথা ছিল, মিঃ নন্দী। কিন্তু এই সময়ে এসে আপনাকে বিরক্ত করলুম না তো?”

“আরে না না, বিরক্ত করার প্রশ্নই ওঠে না।” সুবীর নন্দী বললেন, “কিন্তু দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কি কথা হয় নাকি? আগে তো ভিতরে আসুন, কথা যা আছে, সেটা ভিতরে বসেই হতে পারবে।”

সুবীর নন্দীর পিছন-পিছন তাঁর কামরা থেকে বেরিয়ে এসেছিল যে লোকটি, আমাদের থেকে হাত দুয়েক দূরে, প্যাসেজের এক ধারে, সে দাঁড়িয়েই ছিল। তবে কোনও কথা বলছিল না। এই বারে মিঃ নন্দী আমাদের নিয়ে ঘরে ঢুকবার উদ্যোগ করছেন দেখে বলল, “আমি কি তা হলে কাল একবার আসব?”

“কাল কী করে হবে? কাল আমাদের ফাংশান, তাই নিয়েই তো কাল সারাদিন ব্যস্ত থাকব।”

“তা হলে পরশু?”

“তা আসতে পারো, তবে তোমার বিলের উপরে মিঃ দাশ যে নোট দিয়েছেন, তাতে ওটা পাশ করা খুব সহজ হবে না। সাপোর্টিং বিল ভাউচার চালান ক্যাশমেমো – কিছুই তো নেই।…এনিওয়ে, পরশু এসো, তখন কথা হবে।”

লোকটিকে বিদেয় করে দিয়ে সুবীর নন্দী আমাদের নিয়ে তাঁর কামরায় ঢুকে পড়লেন। নামজাদা কোনও প্রতিষ্ঠানের উঁচু পদের অফিসারদের কামরা সাধারণত যে রকম হয়ে থাকে, এটিও সেই রকমেরই। পুরু কার্পেটে মোড়া ঘর, তার একদিকে গ্লাস-টপ মস্ত টেবিল, অন্য দিকটা ফোম-লেদারের সোফা সেট দিয়ে সাজানো। কাচের স্লাইডিং পাল্লা লাগানো বুকসমান উঁচু একটা আলমারিতে মোটা মোটা কিছু বই চোখে পড়ল। অধিকাংশই কোম্পানি আইন ও ট্যাক্স সংক্রান্ত বই।

কাজের টেবিলটির একদিকে একটি রিভলভিং চেয়ার। অন্যদিকেও খান চারেক চেয়ার রয়েছে। তবে সেখানে না-বসিয়ে সুবীর নন্দী আমাদের সোফায় এনে বসালেন। তারপর নিজেও একটা সোফায় বসে বললেন, “চা না কফি?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কোনওটাই না। আপনি কাজের মানুষ, অলরেডি আপনার কিছুটা সময় আমরা নষ্ট করেছি, কিন্তু আর আপনার সময় নেব না। জাস্ট দু’-একটা প্রশ্ন করতে এসেছি, তার উত্তর পেলেই আমরা চলে যাব।”

সুবীর নন্দীর ভুরু হঠাৎ কুঁচকে গেল। বললেন, “ডাজ ইট হ্যাভ এনিথিং টু ডু উইথ সুরেশ?”

“হ্যাঁ, পরশু সকালে সুরেশ দাশ কখন কোথায় ছিলেন, তা নিয়ে তাঁকে আমরা কিছু প্রশ্ন করেছিলুম। উত্তরে তিনি যা বলেছেন, সেটা তো তাঁর ভার্সন, এখন তার একটা ভেরিফিকেশন দরকার। ইন ফ্যাক্ট, সেই জন্যেই আপনার কাছে এসেছি। উই হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।”

“না না, এতে মনে করার কী আছে,” সুবীর নন্দী বললেন, “বাট হোয়ার ডু আই কাম ইন? সুরেশ কি আমাকে সাক্ষী মানছে নাকি?”

দাঁতের সঙ্গে জিভ ঠেকিয়ে একটা আক্ষেপের শব্দ করে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওহ্ নো, কথাটাকে এ ভাবে নেবেন না মিঃ নন্দী। এটা কাউকে সাক্ষী মানামানির ব্যাপার নয়। সুরেশবাবু যা বলেছেন, আমরা শুধু জানতে চাইছি যে, সেটা সত্যি কি না, কিংবা সত্যি যদি হয়ও, তো কতটা সত্যি! তার জন্যে যেমন আপনার কাছে এসেছি, তেমনি হয়তো আরও দু’ একজনের কাছে যেতে হবে। এটা এইজন্যে বলছি যে, একা আপনার কথার উপরেই যে আমরা একটা ডিসিশান নিয়ে নেব, তা কিন্তু ভাববেন না।”

সুবীর নন্দীর কোঁচকানো ভুরু আবার স্বাভাবিক হয়ে এল। মনে হল ভাদুড়িমশাইয়ের শেষ কথাটায় তিনি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। বললেন, “ঠিক আছে, সুরেশ কী বলেছে বলুন।”

“উনি বলেছেন যে, পরশু ওঁকে একবার আপনার বাড়িতে যেতে হয়। নাকি আপিসের কাজ নিয়ে ওঁর সঙ্গে আপনার কিছু আলোচনা করার ছিল। তাই আগের দিনই আপনি ওঁকে বলে রেখেছিলেন যে, পরদিন সকাল সাড়ে ছ’টা নাগাদ উনি যেন একবার আপনার বাংলোয় গিয়ে দেখা করেন।”

আবার কুঁচকে গেল সুবীর নন্দীর ভুরু। বললেন, “হোঅট’স সো আনইউজুয়াল অ্যাবাউট ইট? সুরেশ আমার ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। আপিসের কাজ নিয়ে দু’ একটা কথা বলার থাকলে তাকে আমি ডেকে পাঠাতে পারব না?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমি কি তা-ই বলেছি? নিশ্চয় ডেকে পাঠাতে পারেন। কিন্তু কথাটা তো তা নয়, কথাটা হচ্ছে সত্যিই আপনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন কি না?”

“হ্যাঁ, ডেকে পাঠিয়েছিলুম।”

“কেন?”

“সে তো সুরেশও আপনাকে বলেছে, আমিও বলছি। আপিসের একটা কাজ নিয়ে কিছু কথা বলার ছিল।”

“কাজটা কী, সেটা জানতে পারি?”

তক্ষুনি কোনও জবাব দিলেন না সুবীর নন্দী। দু-এক মুহূর্তে চুপ করে রইলেন। মনে হল, তিনি একটু অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেছেন। অস্বস্তিটা কাটিয়ে উঠতেও অবশ্য খুব বেশি সময় লাগল না। বললেন, “নর্মালি আমরা এ-সব বিষয় নিয়ে বাইরের লোকের সঙ্গে কথা বলি না। বলার নিয়মই নেই। কিন্তু আপনারা তো আমাদের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসারের বন্ধু, তা হলে আর আপনাদের বাইরের লোকই বা বলি কী করে। আসলে ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, একটা বিল নিয়ে আমরা একটু ঝামেলায় পড়েছি।”

যেন কিছুই জানেন না, এই রকমের নিরীহ ভঙ্গিতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কীসের বিল?”

“ঠিকেদারের। লোকটাকে আপনারা দেখেছেন…মানে ওই যে-লোকটা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল…আপনারা আসার আগে ওরই সঙ্গে কথা বলছিলুম।”

“ঝামেলা কী নিয়ে?”

“প্রথমত, যে খরচা দেখিয়ে ও বিল করেছে, অ্যাজ পার আওয়ার কনট্রাকট সেটা ওরই মেটাবার কথা, অন্তত আমরা সেটা মেটাতে বাধ্য নই। তাও হয়তো…জাস্ট টু অ্যাভয়েড ট্রাবল…আমরা সেটা মিটিয়ে দিতুম, কিন্তু বিলটা যে-ভাবে করেছে, তাতে সেটাও সহজ হচ্ছে না।”

“যে-ভাবে করেছে মানে?”

“মানে বিলের সঙ্গে সাপোর্টিং কিছু কাগজপত্তর দাখিল করবে তো, সে-সব যে করেনি, তা নয়, কিন্তু দেখেই বোঝা যায় যে, সেগুলো সবই ভুয়ো, কোনওটাই জেনুইন নয়। তাও হয়তো চোখ-কান বুজে পেমেন্ট করে দেওয়া যেত, কিন্তু…”

কথাটা শেষ না-করেই সুবীর নন্দী চুপ করে গেলেন।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু কী?”

“কিন্তু সুরেশ ওই বিলের উপরে যে অবজেকশন নোট দিয়েছে, তাতে আর ওটা কোনও মতেই পেমেন্ট করা চলে না। ঠিকেদার আতর সিংকে সেটা আজ আমি জানিয়েও দিয়েছি।”

“সুরেশবাবুর সঙ্গে সেদিন সকালে তা হলে এই নিয়েই আপনার কথা হচ্ছিল?”

“হ্যাঁ।” সুবীর নন্দী বললেন, “টু বি ফ্র্যাঙ্ক, প্রথমটায় আমি ওকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলুম যে, কোম্পানির কর্তারা যখন…..ইন কনসিডারেশন অভ আদার ফ্যাক্টর্স…পেমেন্টটা করে দিতেই চাইছেন, তখন আর ওটা আটকে দিয়ে লাভ কী, ওটা পাশ করতে ওর একান্তই যদি বিবেকে বাধে তো অন্তত ওর অবজেকশন নোটটা ও উইথড্র করুক, আমি বরং আর-কাউকে দিয়ে ওই বিলের উপরে চেক্ড অ্যান্ড পাস্ড ফর পেমেন্ট লিখিয়ে নিচ্ছি।…কিন্তু তাতে ও কী বলল জানেন?”

“কী বললেন উনি?”

বলল যে, সেটা ঠিক হবে না। একে তো ইন্টারন্যাল অডিটের সময়েই এই পেমেন্ট নিয়ে আপত্তি উঠবে, আর তার উপরে এটা হবে ঘোর অন্যায় কাজ। এও বলল যে, একটা লোককে ডিজনেস্ট জেনেও এইভাবে তাকে টাকা পাইয়ে দেওয়াটা আমাদের উচিত নয়।”

“কিন্তু সুরেশবাবুর এ-সব কথা আপনার ভাল লাগেনি, কেমন?”

“না না, তা কেন লাগবে না?” সুবীর নন্দী বললেন, “আই কোয়াইট অ্যাপ্রিসিয়েট হিজ স্ট্যান্ড। বিশেষ করে ওই যে ইন্টারন্যাল অডিটের কথাটা বলল, ওটা তো ও ঠিকই বলেছে।…তবে কিনা বুঝতেই পারছেন…বিলটা মেটাব না ঠিকই, বাট দেন সাম আদার ওয়ে হ্যাজ টু বি ফাউন্ড।”

“টাকাটা তা হলে কী ভাবে দেবেন?”

সুবীর নন্দী হেসে বললেন, “কোটি-কোটি টাকার যেখানে কারবার, সেখানে আড়াই লাখ টাকাটা কোনও ব্যাপারই নয়, মিঃ ভাদুড়ি। গাই-বাছুরে ভাব থাকলে বনে গিয়ে দুধ দেয়। ওটা অনেক ভাবেই দেওয়া যেতে পারে। মজুর সাপ্লাইয়ের ব্যাপারে ওকে ইনফ্লেটেড বিল সাবমিট করতে বলা যায়, টাকাটা এখন লোন হিসেবে দেখিয়ে পরে এক সময় সেটাকে ব্যাড ডেট বলে রাইট অফ করা যায়,—উপায় তো অজস্র।”

শুনে, একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “আসল দুটো প্রশ্ন কিন্তু এখনও করিনি।”

“বেশ তো, করুন।”

“সুরেশবাবুকে আপনি সকাল সাড়ে ছ’টায় আপনার বাংলোয় গিয়ে দেখা করতে বলেছিলেন। তা-ই গিয়েছিলেন তিনি?”

“তা তো হলফ করে বলতে পারব না। তবে এটা বলতে পারি যে, সুরেশ খুব পাংচুয়াল। সাড়ে ছ’টায় যখন বলেছিলুম, তখন ধরে নেওয়া যায়, ওই সময়েই এসেছিল।”

“এবারে দ্বিতীয় প্রশ্ন,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সুরেশবাবুর সঙ্গে আপনার কথাবার্তা কতক্ষণ চলেছিল?”

“সেটাও হলফ করে বলতে পারব না।” সুবীর নন্দী বললেন, “তবে আন্দাজে বলতে পারি, ঘন্টাখানেক। তার কিছু কমও হতে পারে, কিছু বেশিও হতে পারে।

ভাদুড়িমশাই সোফা ছেড়ে উঠে পড়ে বললেন, “ধন্যবাদ।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *