(২২)
অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় হপ্তা চলছে। কয়েকটা দিন মেঘবৃষ্টির খেলা চলতে থাকায় রোদ্দুরের তেজ মাঝখানে খানিকটা কমেছিল। এখন সন্ধেটা উপভোগ্য, রাত্তিরটাও ঠান্ডা, তা ছাড়া পাশেই একটা নদী রয়েছে বলে কি না বলতে পারব না, ভোরের দিকে একটু শীত-শীত করে। কিন্তু দুপুরের গরম যে আবার বেড়ে গেছে, তাও ঠিক। সদানন্দবাবু তাতে একটু কাহিলও হয়ে পড়েছেন। এতক্ষণ তিনি তা নিয়ে কিছু বলেননি। এবারে, তারাপদ দত্তের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে অনেকটা স্বগতোক্তির মতন করে সেটা তিনি প্রকাশ করে ফেললেন। “ওরে বাবা, এই ভরদুপুরে আবার এতটা হেঁটে গেস্ট হাউসে ফিরতে হবে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কষ্ট হচ্ছে তো বলুন, হাঁটতে হবে কেন, রাস্তায় বেরিয়েই সাইকেল-রিকশা নিয়ে নেবখন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “না না, আমার কষ্টের কতা হচ্চে না। কিন্তু যারা আপনাকে সভাপতি করে এখেনে নিয়ে এসেচে, তাদের তো মশাই আক্কেল বলে কিছু থাকবে। সারাক্ষণের জন্যে আপনাকে তারা একটা গাড়ি দিয়ে দিতে পারত না?”
প্রশ্নের উত্তরটা যে সঙ্গে-সঙ্গেই পেয়ে যাব, তা ভাবিনি। সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে কথা হচ্ছিল। তখনই লক্ষ করেছিলুম যে, সাদা একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি বাড়ির সামনেকার ফাঁকা জমির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। এবারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতেই উর্দি পরা একজন ড্রাইভার—-গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে চুপচাপ এতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে ছিল—আমাদের সামনে এসে মস্ত একটা সেলাম ঠুকে বলল, “সেনসাব আপনাদের জন্যে গাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।”
বলেই সে রাইট অ্যাবাউট টার্ন করে গাড়ির পিছনের দিকের দরজা খুলে ধরল।
ভাদুড়িমশাই অবশ্য তক্ষুনি-তক্ষুনি গাড়িতে উঠলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, “সেনসাহেব মানে মিঃ কালীচরণ সেন?”
“হাঁ, হুজুর।”
“আমরা যে এই বাড়িতেই আছি, তা তিনি জানলেন কী করে?”
“সাব তো এহি রাস্তা দিয়ে তাঁর দফতরে যান। তো আজ করিব সাড়ে ন’ বাজে দফতরে যাবার সময় আপনাদের এই মকানে ঢুকতে দেখলেন। দেখে বললেন, ‘আরে ছি ছি!’ বাদমে দফতরে গিয়ে আমাকে বললেন, ‘রামপরসাদ, এক কাম করো, তুম গাড়ি লে কর আভি ওহি মকানমে চলে যাও। ‘ তো আমি বললাম, গিয়ে কুছু বোলতে হোবে?’ তো সাব বললেন, ‘কুছু বোলতে হোবে না। হর্ন ভি বাজাবে না। সির্ফ গাড়ি লে কর য়হাঁ খাড়া রহো। বাদমে ওই তিন সাব যখন সন্তান থেকে বেরিয়ে আসবেন, তখন বোলবে যে, গাড়িটা আমি ওঁদেরই জন্যে পাঠিয়ে দিয়েছি।’…তো হুজুর, আমি আপনাদের এখোন কোথায় লিয়ে যাব?”
সদানন্দবাবু দাঁতে জিভ কেটে কাতর কন্ঠে বললেন, “এহেহেহেহে, এ তুমনে কেয়া কিয়া রামপ্রসাদ? তুম তো সত্যনাশ কর দিয়া।…যাচ্চলে, এ তো ভারী লজ্জার ব্যাপার হল। এখন সেনসায়েবের নিজের যদি গাড়ির দরকার হয় তো তিনি কী করবেন? এহেহেহেহেহে!”
রামপ্রসাদ পাকা লোক, সদানন্দবাবুর অস্বস্তির কারণটা বুঝে নিয়ে সে হেসে বলল, “সেটা লিয়ে আপনারা ভাববেন না, হুজুর। সেনসাবের তো গাড়ির কুছু কমতি নাই, তিনি দুসরি গাড়ি লিয়ে লিবেন।”
শুনে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “তা হলে ওটা নেওয়া যায়, কী বলেন?”
আমি আর সদানন্দবাবু পিছনের সিটে উঠে পড়লুম। ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন আমরা গেস্ট হাউসে যাব।”
সুরেশবাবুদের ফ্ল্যাটবাড়ি এই টাউনশিপের যে এলাকায়, সেখান থেকে হাঁটাপথে গেস্ট হাউসে পৌঁছতে মোটামুটি মিনিট বিশেক লাগে। আজ সকালে একটু তাড়াতাড়ি পা চালিয়েছিলুম বলে অবশ্য মিনিট পনেরোর বেশি লাগেনি। এখন হাওয়াগাড়িতে যাচ্ছি, তাই মিনিট পাঁচেকের বেশি লাগল না। গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভারকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা আবার বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ বেরুব। মাঝখানে আর বেরুচ্ছি না। এর মধ্যে তুমি খেয়ে আসতে পারো।”
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে-উঠতে জিজ্ঞেস করলুম, “সাড়ে তিনটেয় কোথায় যাব?”
“সে-সব পরে বলছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনারা স্নান সেরে নিন।” সদানন্দবাবু বললেন, “আপনি?”
“আমি ও-সব শেষ-রাত্তিরেই সেরে নিয়েছি। আপনারা তৈরি হোন, তার মধ্যে আমাকে দুটো ফোন করতে হবে। এখন সাড়ে বারোটা বাজে, একটা নাগাদ আমরা খেতে নামব।”
ঘরে ঢুকে সদানন্দবাবু বললেন, “এখন আবার উনি কাকে ফোন করতে বসলেন বলুন দিকি?” বললুম, “কাকে নয়, কাকে কাকে। দুটো ফোন করবেন বললেন না?…কিন্তু তা নিয়ে আর এখন মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই, খিদে পেয়ে গেছে, আপনি স্নান করতে ঢুকুন তো।…বেশি সময় নেবেন না যেন, আপনার পরে আবার আমাকে ঢুকতে হবে।”
সদানন্দবাবু বাথরুমে ঢুকে পড়লেন।
এখানে আসবার সময় হাওড়া স্টেশনে হুইলারের স্টল থেকে একটা থ্রিলার কিনে এনেছিলুম। জন লে কারের স্পাই-ফিকশন ‘দ্য নাইট ম্যানেজার’। পথে সেটার একটা পাতাও ওল্টানো হয়নি। এখন বই খুলেও মন বসাতে পারলুম না। এখানে এসে যাঁদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, একে-একে তাঁদের মুখগুলি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। এঁদের কারও কারও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে কি একটা চোরা-টানের স্রোত বইছে? যেমন পরশু রাতে তেমনি আজ সকালে ও সুলেখা ঘোষের কথায় সেইরকমের একটা ইঙ্গিত ছিল ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে এই খুনের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। মিসেস মালহোত্রাই যে খুনি, রেখা দাশের হাতের মুঠোয় হলদে রঙের চুল পেয়ে যাওয়ায় তা অবশ্য এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাঁরই বা মোটিভ কী। আর তা ছাড়া যেমন মোটিভ, তেমন সুযোগও থাকা চাই তো। ওই সাত-সকালে একটা ফ্ল্যাটবাড়িতে ঢুকে রেখা দাশকে খুন করার সেই সুযোগটা তিনি কী করে পেলেন।
হাতের বই বন্ধ করে রেখে পুব দিকের জানলায় গিয়ে দাঁড়ালুম। পাহাড়টা এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। ন্যাড়া পাহাড়, গাছপালা বিশেষ নেই, খুব একটা উঁচু নয়। দেখলে মনে হয়, দূরত্বটাও এখান থেকে মাইল পাঁচ-ছয়ের বেশি হবে না। ভাদুড়িমশাই যদি না এত ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে পড়তেন তো এরই মধ্যে দিব্যি একদিন ওখান থেকে ঘুরে আসা যেত।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে মাথা ঘষতে ঘষতে সদানন্দবাবু বললেন, “ও মশাই, এত মনোযোগ দিয়ে কী দেকচেন?”
“পাহাড় দেখছি। তা ছাড়া আর এখান থেকে কী দেখব?”
“ওই পাহাড়ে যে একজন তান্ত্রিক সন্নিসি থাকেন, সেটা জানেন?”
“না তো।”
“তা হলে জেনে রাকুন যে, আর ক’টা দিন বাদেই তো কালীপুজো, তা ওই কালীপুজোর দিনই সন্নিসি বাবার বয়েস নাকি দেড়শো বছর পূর্ণ হচ্চে। তার মানে মিউটিনিরও বারো বছর আগে তিনি জন্মেছিলেন।…আর হ্যাঁ, নামটাও বলচি। ওঁর নাম হচ্চে শ্যামানন্দ অবধূত। তবে এখানকার লোকজনেরা বলে পাহাড়ি বাবা। কিচু বুঝলেন?”
হেসে বললুম, “এত সব খবর আপনি পেলেন কোথায়?”
সদানন্দবাবু হাসলেন না। বরং একটু গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “এখানকার চিফ এগজিকিউটিভ অফিসারের ওয়াইফের…মানে মিসেস বন্দনা সেনের কাচে। পরশু রাতে বলছিলেন।”
“আর কিছু বলেননি?”
“বলেচেন বই কী।” সদানন্দবাবু বললেন, “সব শুনলে আপনার গায়ে কাঁটা দেবে মশাই। তবে এখন নয়, ডিটেলস পরে শুনবেন, এখন চানটা চটপট করে নিন দিকি।”
স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরুতে-বেরুতে বারোটা পঞ্চান্ন, চুল আঁচড়ে পোশাক পালটে তৈরি হতে-হতে আরও চার-পাঁচ মিনিট, আমি আর সদানন্দবাবু যখন ভাদুড়িমশাইয়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম তখন ঠিক একটাই বাজে।
ঘরের দরজা বন্ধ। টোকা মারতে গিয়েও যে শেষ মূহূর্তে হাতটা পিছিয়ে আনলুম, তার কারণ ভাদুড়িমশাই যে টেলিফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছেন, বাইরে থেকে সেটা বোঝা যাচ্ছিল। লাইনে সম্ভবত ডিস্টার্ব্যান্স হচ্ছে, তা নইলে এত উঁচু গলায় কথা বলবেন কেন, আর কথার মাঝে-মাঝে এত ‘হ্যালো হ্যালো’ই বা করবেন কেন? আবার, উঁচু গলায় কথা না বললে বাইরে থেকে যে আমরা কিছুই শুনতে পেতুম না, তাও ঠিক। শেষের দিকে যে গুটিকয়েক কথা শোনা গেল, তা এইরকম, “ঝুট?…সে তো আমি আগেই আঁচ করেছিলুম…হ্যালো হ্যালো, হ্যালো…শুনতে পাচ্ছেন?…হ্যাঁ, এখন তবু বুঝতে পারা যাচ্ছে…না, রাস্তা আটকে রাখুন…ওই যেভাবে বলেছিলুম…চেক না করে কাউকে ছাড়বেন না…ও ইয়েস, কথা যখন দিয়েছি, তখন সেটা রাখব বই কী….ঠিক আছে, রাত্তিরের দিকে চলে আসুন, তবে ন’টার আগে নয়…হ্যালো…না, ন’টার আগে হবে না, আর-একজনের আসার কথা আছে।”
টুকরো-টুকরো কথা, তাও আবার একতরফা কথা। এই ওয়ান-ওয়ে সংলাপ থেকে সদানন্দবাবু যে কোনও অর্থই উদ্ধার করতে পারেননি, সে তাঁর মুখচোখের বিভ্রান্ত অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ‘রাস্তা আটকে রাখুন’ আর ‘চেক না-করে কাউকে ছাড়বেন না? এই দুটো বাক্য থেকে আমিও মাত্র এইটুকুই বুঝলুম যে, কথাটা হচ্ছিল এস. ডি.পি.ও. শেখর ঘোষালের সঙ্গে। একইসঙ্গে এটাও অবশ্য জানা গেল যে, শেখর ঘোষাল আজ রাত ন’টায় এখানে আসবেন। ‘ঝুট’ মানে যে মিথ্যে, সেটা জানি। কিন্তু মিথ্যে কথাটা কে বলেছে, সেটা বোঝা গেল না।
সদানন্দবাবু বললেন, “ও মশাই, ওঁর কতা তো শেষ হয়েচে, এবারে কি দরজায় নক করা যায়?” টোকা দিতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু এবারেও হাতটা পিছিয়ে আনতে হল, কেননা দরজা খুলে এই সময়ে নিজেই বাইরে বেরিয়ে এলেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “এ কী, আপনারা বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন, ভিতরে চলে এলেই তো পারতেন।”
“তা তো পারতুমই।” সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু ঢুকি কী করে? আপনি যে ফোনে কার সঙ্গে কথা কইছিলেন মশাই।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ও হ্যাঁ, শেখর ঘোষালের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তার আগে অবশ্য কলকাতায় ফোন করে কৌশিকের সঙ্গেও গোটাকয়েক জরুরি কথা সেরে নেওয়া গেছে।”
“কলকাতার খবর-টবর সব ভাল তো?”
“তিন বাড়িরই খবর ভাল। ও নিয়ে ভাববেন না। আর হ্যাঁ, কৌশিক খুব একটা মজার খবর দিয়েছে।”
“কী খবর?”
হঠাৎই যেন একটা জরুরি কথা মনে পড়ে গেছে, এইভাবে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাচ্চলে। একটার সময় ডাইনিং হল-এ যাব বলেছিলুম, অথচ এরই মধ্যে দেড়টা বেজে গেছে।…চলুন চলুন, আর দেরি করা ঠিক হবে না, নীচে নেমে খাওয়াটা চুকিয়ে আসা যাক।…কী মশাই, আপনাদের কি খিদে পায় না নাকি? আমার তো যাচ্ছেতাই রকমের খিদে পেয়ে গেছে!”
নীচে নেমে ডাইনিং হলে ঢুকে খেতে বসা গেল। সদানন্দবাবুও বলতে গেলে প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই শুরু করে দিলেন পাহাড়ি বাবার কথা। ফলে, কলকাতা থেকে কৌশিক যে কী মজার খবর দিয়েছে, সেটা জানাই হল না।
খাওয়া শেষ করে আমরা যখন উপরে এলুম, পাহাড়ি বাবার অলৌকিক বৃত্তান্ত তখনও শেষ হয়নি। উপরে এসে, বারান্দায় চিক ফেলে আমরা তিনটে সোফার উপরে বসে আছি, আর সদানন্দবাবু অনর্গল কথা বলে চলেছেন।
“ও মশাই, আপনি তো একটু আগে জানলায় দাঁড়িয়ে ওই পাহাড় দেখছিলেন। তা আপনার কী মনে হল?”
বললুম, “কী আবার মনে হবে। জাস্ট একটা পাহাড়। দিব্যি দেখতে। ওটার মধ্যে অলৌকিক কিছু আছে বলে তো মনে হল না।”
“আহা-হা, সে-কতা হচ্চে না, ওখানে বড় বড় গাছপালা আচে বলে মনে হল?”
“তা অবশ্য নেই।”
“কিন্তু আগাছা আচে। বুনো লতাপাতা আচে। ঘাস আচে।”
“তা তো আছেই। তা নইলে আর বড়-বড় গাছপালা না থাকা সত্ত্বেও পাহাড়টাকে সবুজ দেখাবে কেন? আগাছা আর ঘাস-লতাপাতার জন্যেই তো।”
“ঠিক কতা। কিন্তু ওখানকার ঘাসের যে একটা মস্ত বড় গুণ আচে, সেটা জানেন কি!”
“কী গুণ?”
“পাহাড়ি বাবা যদি মন্তর পড়ে একমুঠো ওই ঘাস কাউকে দেন, তো ওটা চিবিয়ে খেলে তার সব রকমের জ্বরজারি সেরে যায়।”
শুনে তো আমি তাজ্জব। বললুম, “বলেন কী মশাই, ঘাস খেলে জ্বর সেরে যায়?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এতে আপনি এত অবাক হচ্ছেন কেন কিরণবাবু? যেমন বাবা, তার ভক্তেরাও তো তেমনি হবে। তারা ঘাস খাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।”
“না না না, অত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন না!” সদানন্দবাবু শিউরে উঠে বললেন, “মিসেস সেন নিজে আমাকে এই কতা বলেচেন। ওঁদের এক মালি নাকি সান্নিপাতিক জ্বরে খুব ভুগছিল। ডাক্তার ঘোষের ট্রিটমেন্টে ছিল, চিকিচ্ছের কোনও ত্রুটিও হয়নি, গাদা গাদা ওষুধ, সকালে-বিকেলে ইঞ্জেকশন, কিন্তু কোতায় কী, জ্বর আর কিচুতেই যায় না। শেষ পর্যন্ত নে যাওয়া হল পাহাড়ি বাবার কাচে। ব্যাস, মন্তর-পড়া ওই ঘাস একমুঠো খাওয়ার পরেই ফুল রেমিশন!”
“ঠিক আছে, ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভক্তদের ব্যাপারটা বুঝলুম, একই প্রেসক্রিপশনে তাদের ওষুধ আর পথ্যি দুয়েরই ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। তা পাহাড়ি বাবা নিজে কী খান? ভক্তেরা রেগুলারলি চাল ডাল তেল ঘি দুধ মাখন ইত্যাদির জোগান দিচ্ছে তো?”
সদানন্দবাবু এমন ফ্যালফ্যাল করে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে ঝাড়া এক মিনিট তাকিয়ে রইলেন, যেন এ-রকম একটা কথা যে কেউ বলতে পারে সেটাই তিনি বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না। তারপর, সত্যিই যে কথাটা বলা হয়েছে, সে-বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়ামাত্র দু’ হাতে দু’কানের লতি ছুঁয়ে বললেন, “আরে ছিছি, তিনি কিচুই নেন না। না একটা ফুটো পয়সা, না এক কুনকে চাল।”
“তা হলে তিনি খান কী?”
“স্রেফ পাথর!”
এবারে আমারই মনে হল, কথাটা বোধহয় ঠিক শুনিনি। বললুম, “কী খান বললেন?”
পাথর। স্টোন। পেব্লস!” সদানন্দবাবু বললেন, “শুনলুম পাহাড়ি বাবা ওখানে এয়েচেন তা প্রায় বছর পাঁচেক হল, আর এই পাঁচ বছরে পাথর খেতে-খেতে পাহাড়টার পেছনের দিকের বেশ খানিকটা জায়গা তিনি সাবড়ে দিয়েচেন।”
ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, তিনি মিটিমিটি হাসছেন। বললুম, “কী মশাই, চুপ করে আছেন কেন? কিছু বোঝা গেল?”
“তা গেল বই কী।
“কী বোঝা গেল?”
“বোঝা গেল যে, তিনি বাতাস খেয়ে বাঁচেন না, তাঁকেও সলিড কিছু-না-কিছু খেতে হয়।”
“তাই বলে পাথর?”
“এতে এত অবাক হবার কী আছে,” সরু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “স্টেজে দাঁড়িয়ে পাগড়ি-পরা ম্যাজিশিয়ান কচর-কচর করে কাচ খাচ্ছে, এই দৃশ্য কখনও দেখেননি? দেখে হাততালি দেননি?
“তার মানে পাহাড়ি বাবার খাওয়াটাও ম্যাজিক? সেরেফ লোক ঠকানো?” সদানন্দবাবু বললেন, “আর এই যে মন্তর-পড়া ঘাস চিবিয়ে খেয়ে এত লোকের জ্বরজারি সেরে যাচ্চে, এটাও তাই?…না মশাই, আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না। কোনও কিছুতেই কি অবাক হওয়া আপনার ধাতে নেই?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা কেন থাকবে না? আপনার কথাই ধরুন। সেই কবে আপনাদের আপিস-ক্লাবের ফাংশানে ‘চন্দ্রগুপ্ত’ করেছিলেন, অথচ আজও সেই নাটকের একটা লাইনও আপনি ভুলে যাননি, কাত্যায়নের পার্ট দেখলুম গড়গড় করে বলে যাচ্ছেন। তাতেই তো আমি অবাক হয়ে গেছি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “শুধু কাত্যায়ন কেন, চন্দ্রগুপ্ত বলুন, চাণক্য বলুন, নন্দ বলুন, সেলুকাস বলুন, বাচাল বলুন, মানে যেটাই বলবেন, সব মোখোস্তো। মায় ছায়া, হেলেন, মুরা–স-ব। মুরার ভূমিকায় যে একবার গোঁফ কামিয়ে নাবতে হয়েছিল, সে তো আপনাদের বলেইচি। ছায়া কি হেলেনের রোল অবিশ্যি করা হয়নি, তবে বলেন তো ও দুটোও পেরে যাব।…ছায়ারটা শুনবেন?”
বলে আর অনুমতির অপেক্ষা করলেন না সদানন্দবাবু। গলার স্বর নিমেষে পালটে ফেলে বলতে শুরু করলেন। “ইনি কি অবতীর্ণ দেবরাজ। এঁর দর্শন পূর্ণচন্দ্রের উদয়। এর স্বর রণবাদ্য। দাদাকে যখন ইনি আলিঙ্গন করলেন, মনে হল যেন শরতের মেঘকে সূর্যকিরণ এসে ঘিরেছে। চলে গেলেন— যেন একটি মলয়োচ্ছ্বাস।”
সদানন্দবাবুর সত্যি জবাব নেই। বাচনভঙ্গিতে এই বয়সেও একটি তরুণীর ব্রীড়া ও বিস্ময়কে তিনি ঠিকই ফুটিয়েছেন। বললুম, “সত্যি আপনি পারেন বটে!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “পারফেক্ট। চোখ বন্ধ করে মনে হল, সত্যি যেন কোনও মহিলার গলা শুনছি। এটা কী করে হয়?”
“হবে না কেন,” সদানন্দবাবু বললেন, “কামাখ্যাপ্রসাদ বোসের নাম শুনেচেন?…শোনেননি। কেত্তন আর শ্যামাসংগীত গেয়ে সেকালে খুব নাম করেছিলেন। কিন্তু সেটা কোনও কতা নয়, বোসমশায়ের গলা ছিল একেবারে মেয়েদের মতো। সেই জন্যে তাঁর নামও হয়ে গেসল ‘মহিলাকণ্ঠ কামাখ্যা বোস।”
“সেটাই হয়তো তাঁর ন্যাচারল ভয়েস,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু আপনার তো তা নয়, আপনি এটা রপ্ত করলেন কী করে?”
“সেরেফ চেষ্টা করে। দিনের পর দিন চেষ্টা করতে হত। না করে উপায়ও ছিল না। মাঝেমধ্যে যে ফিমেল রোলে নাবতে হত, সে তো আপনাদের বলেইচি।”
“কাল যদি কোনও ফিমেল রোলে নামতে হয়, পারবেন?…না না, ছায়ার ভূমিকায় নামতে বলছি না, ওতে হেভি মেক-আপের দরকার হবে, কিন্তু…কিন্তু…এই ধরুন; যদি মুরার ভূমিকায় নামতে বলি?…কিংবা কোনও মেল-রোলে?”
“ও নিয়ে ভাববেন না,” সদানন্দবাবু একগাল হেসে বললেন, “মৈল ফিমেল যাতে নাবতে বলবেন, তাতেই নেবে যাব।”
বেয়ারা এসে বলল, গাড়ি এসে গেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম সওয়া তিনটে। ভাদুড়িমশাই বললেন, “সাড়ে তিনটেয় বেরুতে হবে, তৈরি হয়ে নিন।”
