(২১)
“তাঁর গম্ভীর মুখখানি সহসা প্রত্যুষের মতো দীপ্ত হয়ে উঠল, আবার তৎক্ষণাৎ গোধূলির মতো ম্লান হয়ে গেল। শীর্ণ দেহখানি প্রদীপশিখার মতো কেঁপেই আবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওষ্ঠপ্রান্তে এক ব্যঙ্গহাস্য জেগে ধীরে ধীরে নিবে গেল। শেষে এক অদ্ভুত মূর্তি—ওষ্ঠাধর সম্বদ্ধ, মুখ পাংশু, ললাটে গভীর রেখা, কৃষ্ণাপাঙ্গ চক্ষু দুটির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দূর শূন্যে চেয়ে রইল।…”
তারাপদ দত্তের ফ্ল্যাটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। দরজা বন্ধ নয়, খোলা, তবে মোটা একটা পর্দা ঝুলছে বলে ভিতরের কিছু দেখার উপায় নেই। ভিতরে কেউ খুব উঁচু গলায় যে-সব কথা বলছে, সেটা শুনতে পারছি, কথাগুলি চেনা-চেনাও ঠেকছে, কিন্তু কবে কোথায় কার মুখে এ-সব কথা শুনেছি, তা ঠিক মনে করতে পারছি না।
সদানন্দবাবুর দিকে তাকাতে তিনি মৃদু হেসে চাপা গলায় বললেন, “ধরতে পারচেন না, কেমন? অ্যাক্ট ওয়ান, সিন ফোর। কিন্তু এখুনি এত চেঁচাচ্চে কেন, পরের দিকে…মানে সেই যেখানে নন্দের মুণ্ডু তুলে ‘সপ্ত সন্তানের হত্যার এই প্রতিশোধ’ কি ধরুন তার একটু আগে ‘আমি প্রতিহিংসায় অন্ধ… এইসব ইম্পর্ট্যান্ট কতা রয়েচে, সেখেনে তো মুড বুজে গলা অনেক হাই পিচে তুলতে হবে, মশাই।… ধুর, এ তো দেকচি অ্যাক্টিংয়ের কিছুই জানে না।… হিরেলালবাবুর অ্যাক্টিং দেকিনি, তবে কাত্যায়নের রোলে নরেশ মিত্তিরকে তো স্বচক্ষে দেবা আচে, তিনিও ফাটিয়ে ছাড়তেন।”
বাস, আর বলতে হল না, স্রেফ কাত্যায়ন নামটা শুনেই এক নিমেষে সব মনে পড়ে গেল। তা-ই বলো, এও তো সেই ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকেরই কথা বটে। কলেজের অ্যানুয়াল কালচারাল ফাংশানে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের হল ভাড়া করে নামানো হয়েছিল ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটক, তাতে থার্ড ইয়ারের জগবন্ধু মুখুজ্যে নেমেছিলেন কাত্যায়নের ভূমিকায়। আমরা ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রেরা বলতুম জগুদা। ক্লাস ছুটির পর কমন রুমে রিহার্সাল হত, তখন জগুদার মুখে এ-সব ডায়ালোগ তো কতবার শুনেছি। কথাগুলি তাই অত চেনা-চেনা লাগছিল।
ঘরের ভিতর থেকে আবার ভেসে এল উঁচু গলার কথা “আমি বিশ্বাসঘাতক চিরদিন ছিলাম না, নন্দ। তুমি আমায় বিশ্বাসঘাতক করে তুলেছ। তুমি আমার সপ্ত পুত্রকে, নিরীহ বেচারিদের কারাগারে নিক্ষেপ করে বধ করেছ। আমি আমার এই বৃদ্ধ ক্ষীণ দৃষ্টির সম্মুখে তাদের এই কক্ষে…এই কক্ষে….যাচ্চলে, এর পরের কথাগুলো কী। কিছুই তো শালা মনে পড়ছে না।”
হাসি চেপে সেই আগের মতোই চাপা গলায় সদানন্দবাবু বললেন, “অ্যাক্ট থ্রি, সিন টু। বড়-বড় প্যাসেজগুলো আলাদা-আলাদা করে ঝালাই করে নিচ্চে, কিন্তু মোখোস্তোটা এখনও ঠিকমতো হয়নি। ইদিকে আবার কালকেই নাটক। এ তো দেকচি কেলোর কিত্তি করে ছাড়বে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “পরের কথাগুলো আপনি বলতে পারবেন? মনে আছে?”
আরে মশাই, আমি ছিলুম আমাদের আপিসের রিক্রিয়েশান ক্লাবের ড্রামা সাব-কমিটির সেক্রেটারি। দু’দুবার ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাবিয়েচি, তার মদ্যে নিজেও একবার কাত্যায়নের রোলে নেবেছিলুম আর আমার কিনা মনে থাকবে না? পরের কতাগুলো হল…”
এই পর্যন্ত বলার পরেই সদানন্দবাবুর গলার পর্দা হঠাৎ তিন ধাপ চড়ে গেল। বাঁ হাত বুকে রেখে, ডান হাত সামনে এগিয়ে ধরে, যেন কোনও অদৃশ্য প্রেক্ষাগারের অলীক এক শ্রোতৃসমাজকে বন্দনা করে নিয়ে তিনি শুরু করলেন কাত্যায়নের সংলাপের বাদবাকি অংশ:
“…এই কক্ষে, এই অন্ধকারে একে-একে অনাহারে শুকিয়ে কুঁকড়ে মরে যেতে দেখেছি। প্রতি পুত্ৰ তার মুষ্টিমেয় খাদ্যের শীর্ণ শেষাংশ মরে যাবার আগে আমায় দিয়ে গেল। মরবার আগে তোমায় অভিশাপ দিয়ে গেল, আর আমায় বলে গেল, ‘বাবা, প্রতিহিংসা নিয়ো।’ তুমি কি বুঝবে নন্দ…”
কাত্যায়নের সংলাপ এবারেও শেষ হল না। সদানন্দবাবু সুযোগ পেলে নিশ্চয় সবটাই বলতে পারতেন, কিন্তু ফিলিংয়ের মাথায় কন্ঠস্বর তিনি এতটাই চড়িয়ে ফেলেছিলেন যে, তার আগেই পর্দা সরিয়ে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন পায়জামার উপরে ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি পরা বছর-পঞ্চাশ বয়সের এক গৌরবর্ণ ভদ্রলোক। এসে, আমাদের উপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে স্মিত হেসে বললেন, “আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলুম না…কাকে চান?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনিই তো ডাক্তার দত্ত, তাই না?”
“হ্যাঁ, আমার নাম তারাপদ দত্ত। আমি এখানকার মেডিক্যাল অফিসার।”
“আপনার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তবে আমাদের পরিচয়টা আগে দিয়ে নিই। এঁরা হলেন সদানন্দ বসু আর কিরণ চাটুজ্যে, আমার সঙ্গে এখানে এসেছেন। আর কাল সন্ধেয় আপনাদের যে প্রীতি-সম্মিলনী হচ্ছে, তাতে আমার সভাপতিত্ব করবার কথা। আমার নাম চারুচন্দ্র ভাদুড়ি।”
“আরে কী কাণ্ড! উচ্ছ্বসিত গলায় তারাপদ দত্ত বললেন, “এখানে তো সবাই আপনার কথাই বলছে। আপনারা যে পরশু রাত থেকে এখানে গেস্ট হাউসে আছেন, তাও জানি। কিন্তু আপনারা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, ভিতরে আসুন।”
“আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা ছিল।”
“বেশ তো, ভিতরে বসেও কথা হতে পারবে। আসুন, আসুন।”
ভিতরে বসবার জায়গাটা অগোছালো। একটু অপরিচ্ছন্ন বটে। খান কয়েক চেয়ার ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে। সেন্টার টেবিল একটা আছে বটে, তবে তার কাচটা ভাঙা। কাচের উপরে চায়ের কাপের পুরনো দাগ, সেটা মোছা হয়নি। বছর কয়েক আগেকার কিছু রিডার্স ডাইজেস্ট ও ছেঁড়াখোঁড়া গুটিকয় মেডিক্যাল জার্নালও চোখে পড়ল।
চেয়ারে মিহি ধুলোর আস্তরণ। কিন্তু রুমাল দিয়ে সেটা মুছে নিতে গেলে পাছে গৃহস্বামীর অপমান হয়, তাই তারই উপরে বসে পড়া গেল। ঘরের এই হতশ্রী অবস্থার জন্য যে তারাপদ দত্ত আদৌ অস্বস্তি বোধ করেন, তা অবশ্য মনে হল না। তবে আমাদের অস্বস্তির ব্যাপারটা নিশ্চয় তিনি বুঝে থাকবেন, হয়তো সেই কারণেই একটু অপ্রতিভ হেসে বললেন, “আপনাদের দেখছি বাইরে থেকে ঘরে এনে আরও অসুবিধে ঘটিয়ে দিলুম। কিন্তু কী করব বলুন, আমি ব্যাচেলর লোক, ঘরদোর কে গুছিয়ে রাখবে, নিজেও সময় দিতে পারি না, ফলে এই হাল হয়েছে, সব একেবারে ডাস্টবিন হয়ে উঠেছে!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। কিন্তু আপনি তো শুনলুম ভীষণ ব্যস্ত মানুষ, তার উপরে আবার কালকের নাটকেও বোধহয় নামছেন, তাই না?”
“নামছি না, এরা পাঁচজন মিলে জোর করে আমাকে নামিয়ে দিচ্ছে, তাও আবার কাত্যায়নের মতন ডিফিকাল্ট রোলে। কী বলব, আমি তো এখনও সংলাপগুলোই ঠিকমতো মুখস্থ করে উঠতে পারিনি।”
সদানন্দবাবু হেসে বললেন, “সে আমরা বাইরে থেকেই আন্দাজ করতে পেরিচি।”
তারাপদ দত্ত বললেন, “আপনার তো মনে হল কাত্যায়নের কথাগুলো দিব্যি মুখস্থ আছে।”
“তা আচে বই কী,” সদানন্দবাবু আপ্যায়িতের হাসি হেসে বললেন, “আমাদের জেঙ্কিনস অ্যান্ড জেঙ্কিস কোম্পানির রিক্রিয়েশান ক্লাব থেকে প্রথমবার এখন ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাবানো হয়, তখন আমিই তো ছিলুম ডিরেক্টর কাম অ্যাক্টর কাম কোচ। শুদু কাত্যায়নের অংশটুকু কেন, গোটা বইটাই তখন মোখোস্তো করে ফেলেছিলুম। দাঁড়ি কমা সেমিকোলন শুদ্দু। যারা আমার কো-অ্যাক্টর আর অ্যাকট্রেস, তাদের কাচে অবিশ্যি অতটা আশা করা যেত না, তবে হ্যাঁ, এটা আমি সব্বাইকে বলে দিতুম যে, বাপধনেরা, অতটা না-ই পারো, নিজের-নিজের কতাগুলো কিন্তু টপ টু বটম মোখোস্তো করা চাই।”
তারাপদ দত্ত একেবারে হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন। কাতর কন্ঠে বললেন, “কিন্তু আমার তো এখনও নিজের…আই মিন কাত্যায়নের অংশটুকু ঠিকমতো মুখস্থ হয়নি!”
“চেষ্টা করুন, চেষ্টা করুন। হাল না ছেড়ে চেষ্টা করতে থাকুন। তাতেও যদি না হয় তো ব্যাটাচ্ছেলে প্রম্পটার আচে কী করতে? অবিশ্যি প্রম্পটার হল গিয়ে ওই যাকে বলে লাস্ট লাইন অফ ডিফেন্স। সে তো আচেই। কিন্তু এখুনি তার কতা ভাবার দরকার নেই, আপনি আপনার চেষ্টা চালিয়ে যান।”
“চেষ্টা চালাবারই বা সময় পাচ্ছি কোথায়, কালই তো স্টেজে নামতে হবে। এর মধ্যে কি আর অতগুলো প্যাসেজ ঠিকমতো মুখস্থ করে উঠতে পারব?”
“এহেহেহেহে,” আক্ষেপের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সদানন্দবাবু বললেন, “এখুনি হাল ছেড়ে দেবেন কেন? কোনও মানে হয়?…নিন, আমি বই ধরচি, আপনি থার্ড অ্যাক্টের সেকেন্ড সিনের এই প্যাসেজটাই ফের বলে যান দিকি।…কী হল? কিউটা মনে নেই বুজি?…ঠিক আচে, ওটা আমি দিয়ে দিচ্চি…‘মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলে যে বিশ্বাসঘাতক?’…তো এটা হল নন্দের কতা। এটা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই কিন্তু আপনার কতাটা আপনি শুরু করে দেবেন না, চোকের চাউনিতে একইসঙ্গে রাগ আর ঘেন্না মিশিয়ে নন্দকে একবার টপ টু বটম দেকে নেবেন, তারপর ওই রাগ আর ঘেন্নার সঙ্গে বেশ খানিকটা ব্যঙ্গের ঝাঁঝ লাগিয়ে বলতে শুরু করবেন, আমি বিশ্বাসঘাতক চিরদিন ছিলাম না, নন্দ …নাউ স্টার্ট।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে দাঁড়ান দাঁড়ান, এক্ষুনি আবার রিহার্সাল শুরু করে দেবেন না। ডাক্তার দত্তের কাছে কয়েকটা কথা জানতে এসেছি, আগে সে-সব জানতে দিন, তারপর ও-সব হবে।”
সদানন্দবাবু তাঁর হাতের বই মুড়ে রেখে লজ্জিত গলায় বললেন, “ও হ্যাঁ, আমার মনেই ছিল না!” তারাপদ দত্ত বললেন, “কী জানতে চান বলুন।”
“পরশু সকালে আপনাদের এই ফ্ল্যাটবাড়িতে যা ঘটে গেল, তারই সম্পর্কে দু-একটা কথা।”
“তার মানে মিসেস দাশের মৃত্যুর ব্যাপারে আপনি খোঁজখবর করছেন, কেমন?”
“হ্যাঁ।”
তারাপদ দত্ত হেসে বললেন, “সেটা আপনার নাম শুনেই আমার বোঝা উচিত ছিল।”
“এ-কথা কেন বলছেন?”
“বাঃ, এও কি একটা প্রশ্ন হল? মিঃ ভাদুড়ি, এখানে আমাদের বিজয়া-সম্মিলনীতে আপনি প্রিসাইড করতে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু তাই বলে যে আপনার আসল পরিচয়টা এখানে কেউ জানে না, তা ভাবছেন কেন?”
“কারা জানে?”
“বলতে গেলে এখানকার প্রায় ষোলা আনা লোকই জানে। আর সেটা না-জানার কোনও কারণও তো নেই। আপনি এখানে আসতে রাজি হয়ে যাওয়ায় আমাদের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার নিজেই তো জাঁক করে তাঁর ইনার সার্কলের লোকেদের…মানে দোজ পিপল হু রিয়েলি ম্যাটার…বলে বেড়িয়েছেন যে, চারু ভাদুড়ির মতো ফেমাস গোয়েন্দাও তাঁর অনুরোধটা অগ্রাহ্যি করতে পারেননি, জাস্ট একটা চিঠি পেয়েই ডেসপাইট হিজ ক্রাউডেড শিডিউল তিনি এখানকার অনুষ্ঠানে প্রিসাইড করতে আসছেন।”
“আপনাকেও বলেছিলেন?”
“খেপেছেন?” তারাপদ দত্ত নির্মল হেসে বললেন, “আমাদের বলবেন কেন। ডু আই বিলং টু হিজ ইনার সার্কল? ডু আই রিয়েলি ম্যাটার? মিঃ ভাদুড়ি, আমি এখানকার জুনিয়র ডাক্তার, আ স্মল ফ্রাই। তবে কিনা ইনার সার্কলের কথা আউটার সার্কলে ছড়িয়ে পড়তে তো বিশেষ সময় লাগে না, তার পর পার্কোলেট করতে-করতে নীচের মহলেও সেটা চাউর হয়ে যায়। ফলে, আমিও একসময় জেনে গেলুম।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি জেনেছেন ভালই হয়েছে, তবে খুব বেশি লোক না -জানলেই ভাল ছিল।”
“খুব বেশি লোক জানলেই বা ক্ষতি কী?”
“ক্ষতি নেই?”
“কিচ্ছু না। বরং আমার তো মনে হয়, যত বেশি লোক জানে, ততই ভাল।”
“তাই কি?”
“হ্যাঁ। ইন ফ্যাক্ট আপনার কাজের এতে সুবিধেই হবে।”
“সেটা কী করে হবে?”
“তাও বুঝিয়ে বলতে হবে আমাকে?” তারাপদ দত্ত হেসে বললেন, “মিঃ ভাদুড়ি, এটা একটা ছোট জায়গা, বলতে গেলে এখানে প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। মিসেস দাশের কথাই ধরুন, তাঁকে কি এখানকার লোকজনেরা চিনত না? সবাই চিনত। ইস্কুলের টিচারি ছাড়াও এখানকার পাঁচ রকমের সামাজিক কাজকর্মে জড়িয়ে ছিলেন বলে সবাই খুব ভালবাসতও তাঁকে। তা এই রকমের একটা ছোট জায়গায় ওই রকমের একজন মহিলা কেন হঠাৎ খুন হয়ে গেলেন, তা নিয়ে কারও না কারও কিছু-না-কিছু ধারণা থাকা মোটেই বিচিত্র নয়। এমন ধারণা, যা তারা পুলিশকে হয়তো জানাতে চায়নি। কিন্তু…”
“কিন্তু আমাকে জানাবে, কেমন?”
“যদি তারা বুঝতে পারে যে, এই ব্যাপারটা নিয়ে আপনি ইনভেস্টিগেট করছেন, তা হলে জানানোই স্বাভাবিক, মিঃ ভাদুড়ি। আপনি বলবেন, ‘যদি কিছু জানে তো পুলিশকে তারা জানায়নি কেন?’ কিন্তু এর উত্তরটাও তো আপনার না-জানবার কথা নয়। পুলিশকে তারা ভয় পায়। পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের একটা অ্যালার্জি আছে। বাঘে ছুঁলে যদি আঠারো ঘা, তো পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ—এই কথাটা তো আর এমনি-এমনি চালু হয়নি। পুলিশকে তারা এড়িয়ে চলে, পারতপক্ষে তার ছায়া তারা মাড়াতে চায় না। আসল কথা, পুলিশকে যে বিশ্বাস করে কিছু বলা চলে, এই বিশ্বাসটাই তাদের নেই।”
“তাজ্জব ব্যাপার।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুলিশের কাজ আর আমার কাজ তো আলাদা নয়। অন্তত এ-ক্ষেত্রে তো আমরা একই কাজে লেগে রয়েছি। তারাও চাইছে এই খুনের একটা কিনারা করতে, আর আমারও তো সেই একই লক্ষ্য। তা হলে পুলিশকে যারা বিশ্বাস করছে না, আমাকেই বা তারা বিশ্বাস করে কিছু বলবে কেন?”
“এইজন্যে বিশ্বাস করবে যে, আপনি একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর, দারোগাবাবুর মতো ইউনিফর্ম চড়িয়ে, কোমরে রিভলভার গুঁজে আপনি জিপগাড়িতে উঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন না বা কাউকে চোখ রাঙিয়ে ধমকে কথা বলচেন না। পোশাকে-আশাকে, কথায়-বার্তায়, আচারে আচরণে ইউ আর জাস্ট লাইক এনি আদার জেন্টলম্যান। স্রেফ এই কারণেই তারা আপনাকে বিশ্বাস করবে, আর হ্যাঁ, কারও যদি কিছু জানাবার থাকে তো জানিয়েও দেবে।”
“আপনার নিজের কিছু জানা আছে?”
“তা যদি থাকত, তা হলে এত লেকচার না-মেরে আগেই সেটা জানিয়ে দিতুম।” তারাপদ দত্ত হেসে বললেন, “না মিঃ ভাদুড়ি, যেমন আরও অনেকে, তেমনি আমিও মিসেস দাশকে চিনতুম মাত্র, একই বাড়িতে থাকি বটে, তবে ওঁদের ফ্ল্যাটে দু-তিন বারের বেশি গিয়েছি বলেও আমার মনে পড়ে না। তার মধ্যে একবার তো পরশু সকালেই যেতে হয়েছিল।”
“আপনি ওঁদের কদ্দিন থেকে চেনেন?”
“তা প্রায় বছরখানেক হয়ে গেল। মিঃ দাশ আর আমি অবশ্য একই জায়গায় কাজ করি না। উনি কাজ করেন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিল্ডিংয়ে, আর আমার কাজ যে এখানকার হেলথ সেন্টারে, সে তো বুঝতেই পারছেন।”
“দেখাসাক্ষাৎ তা হলে এই বাড়িতেই হত?”
“ওই মানে ফ্ল্যাটবাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে যেটুকু দেখাসাক্ষাৎ কখনও কখনও না হয়েই পারে না, সেইটুকুই হত আর কি। ক্বচিৎ কখনও রাস্তা দিয়ে আসতে যেতেও দেখা হত। দেখা হলে হাসতুম, নমস্কার করতুম, ওই পর্যন্ত। আসলে সুরেশবাবুর সঙ্গে তেমন কোনও সম্পর্কই আমার কখনও গড়ে ওঠেনি, আর সেটা ওঠার কোনও কারণও ছিল না।”
“পরশু সকালে সুরেশবাবু কিন্তু স্ত্রীর অবস্থা দেখে আপনার কাছেই প্রথম ছুটে এসেছিলেন।”
“তা কেন আসবেন না, আমি ডাক্তার, তার উপরে একই বাড়িতে থাকি, ইমার্জেন্সির ব্যাপারে আমার কাছেই তো আসবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কটার সময় এসেছিলেন, বলা সম্ভব?”
একেবারে একজ্যাক্ট টাইমটা বলতে পারব না, তবে একটা মোটামুটি সময় বলতে পারি।”
“তা-ই বলুন।”
“আটটা বাজার মিনিট পাঁচ-দশ বাদে।”
“এটাই বা কী করে বলছেন?”
“এইজন্যে বলতে পারছি যে, সুরেশবাবু আমার ফ্ল্যাটে এসে ঢোকার খানিক আগে এখানকার ক্লক টাওয়ারের ঘড়িতে আমি আটটা বাজার ঘন্টা শুনেছিলুম… হ্যাঁ, এটা আমার স্পষ্ট মনে আছে।”
শুনে এক মুহূর্তে চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “আপনি তখন কী করছিলেন?”
তারাপদ দত্ত বিব্রত হেসে বললেন, “আজ আপনারা এখানে আমাকে যা করতে দেখেছিলেন, ঠিক তা-ই করছিলুম।”
“অর্থাৎ চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে পার্ট মুখস্থ করছিলেন, কেমন?”
“হ্যাঁ, পরীক্ষার আগে ছাত্রেরা যে-ভাবে চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করে আর কি!”
“সুরেশবাবু আসার সঙ্গে-সঙ্গেই আপনি তার সঙ্গে দোতলায় নেমে যান?”
“একেবারে সঙ্গে-সঙ্গেই যে নেমেছিলুম, তা নয়।” তারাপদ দত্ত বললেন, “উনি খুব ইনকোহেরেন্টলি কথা বলছিলেন তো, তা ছাড়া আমার মাথায় তখন কাত্যায়নের ডায়ালোগ ছাড়া আর অন্য কিছুই ছিল না, ফলে প্রথমটায় ওঁর কথাগুলো আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। বুঝতে-বুঝতেই খানিকটা সময় কেটে যায়। তার পর অবশ্য আর দেরি হয়নি, ওষুধপত্রের ব্যাগ, স্টেথোসকোপ আর ব্লাডপ্রেশার মাপার যন্ত্রটা নিয়ে ওঁর সঙ্গে নীচে নেমে যাই। সব মিলিয়ে তা হয়তো মিনিট পাঁচেক লেগে গিয়ে থাকবে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “নীচে ওঁদের ফ্ল্যাটে গিয়ে কী দেখলেন?”
“দেখলুম যে, মিসেস দাশ মেঝের উপরে পড়ে আছেন।” একটুক্ষণ চুপ করে থেকে তারাপদ দত্ত বললেন, “দেখুন, একটা মানুষের পড়ে থাকার ভঙ্গি থেকেই মোটামুটি বুঝে নেওয়া যায় যে, মানুষটা বেঁচে আছে কি নেই। মিসেস দাশ যেভাবে পড়ে ছিলেন, তাতেই আমি যা বুঝবার বুঝে যাই। তা সত্ত্বেও তাঁর নাড়ি দেখি। নাড়ি না-পেয়ে চোখের পাতা টেনে টর্চ ফেলে মণি দুটো পরীক্ষা করি। তারপর হার্ট ম্যাসাজ করেও কোনও রেসপন্স পাই না। অ্যান্ড দেন আই প্রোনাউন্সড হার ডেড।”
“আপনি যখন ওঁদের ফ্ল্যাটে যান, তখন সেখানে আর কাকে কাকে দেখতে পেয়েছিলেন?”
“ওঁদের পাশের ফ্ল্যাটের সুরঞ্জন বসাক আর তাঁর স্ত্রীকে। খানিক বাদে অবশ্য অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজনেরাও এসে পড়তে শুরু করেন। তবে ওখানে ভিড় জমে যাবার আগেই আমি বেরিয়ে এসেছিলুম।”
হঠাৎই অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন ভাদুড়িমশাই। জিজ্ঞেস করলেন, “সুরেশবাবু যে রোজ ভোরবেলায় জগিং করতে বেরোতেন, এটা আপনি জানেন?”
“রোজ না হলেও প্রায়ই যে জগিং করতেন, এটা শুনেছি।”
“সেদিন কখন জগিং করতে বেরিয়েছিলেন, বলতে পারবেন?”
“কী করে বলব। আসলে আমি একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠি। তাই অত ভোরবেলার খবর আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আদৌ বেরিয়েছিলেন কি না, তাও আমি জানি না।”
ভাদুড়িমশাই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। বললেন, “থ্যাংক ইউ ফর ইয়োর কো-অপারেশন, ডঃ দত্ত। আর আপনার সময় নষ্ট করব না। আপনাকে তো হেল্থ সেন্টারে যেতে হবে। বড্ড দেরি করিয়ে দিলুম।”
তারাপদ দত্ত হেসে বললেন, “ভাবছি আজ আর হেল্থ সেন্টারে যাবই না। বসে-বসে এখন ডায়ালোগ মুখস্থ করব।”
