(১৯)
গোকুল ঘোষের সঙ্গে পথের মধ্যে যেখানে দেখা হয়ে যায়, সেখান থেকে তাঁর বাড়িটা দেখলুম খুবই কাছে। এটাও একটা একতলা বাংলো, তবে কালীচরণ সেনের বাংলোর থেকে তো বটেই, সঞ্জীব মালহোত্রার বাংলোর থেকেও অনেক ছোট। কোয়ার্টার্স যদি পদমর্যাদার সূচক হয়, তো বুঝতে হবে, বুকানন ইন্ডিয়ার এই বড় ডাক্তারবাবুটি সেদিক থেকে খুব একটা উঁচু জায়গায় নেই, নামে সিনিয়ার ডাক্তার হলেও বস্তুত তিনি এখানকার ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ারের থেকেও নীচের ধাপে রয়েছেন। গোকুল ঘোষের এই বাংলোবাড়ির সামনেও খানিকটা খোলা জমি রয়েছে অবশ্যই, তবে কোম্পানির খর্চায় মালির সুবিধে সম্ভবত ইনি পান না। ফলে, বাগান করার একটা চেষ্টা থাকলেও সেটা বিশেষ জমেনি, জমির ইতস্তত গোটাকয় রঙ্গন, জবা আর বেলফুলের চারা খুবই অপরিকল্পিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র। বাড়ির বারান্দার সামনে থেকে একটা বুগনভিলিয়ার ঝাড় একতলার সাজ্জা ছাড়িয়ে ছাত পর্যন্ত উঠে গেছে। তবে তাতে ফুল ধরেনি, শুধু পাতার জঙ্গলই চোখে পড়ে। ঠিকমতো পরিচর্যা না-হওয়ায় গাছটা ষাঁড়িয়ে গেছে।
ডোর-বেলের বোতাম টিপতে যিনি এসে দরজা খুলে দিলেন, সেই মধ্যবয়সি ভদ্রমহিলা আমাদের অপরিচিত নন, পরশু রাত্তিরেই মিঃ কালীচরণ সেনের পার্টিতে এঁর সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছিল। সুলেখা ঘোষ। আজ অবশ্য সেই সাজসজ্জা নেই। পরনে সাদা খোলের তাঁতের শাড়ি, হাতে একগাছি করে চুড়ি ও শাঁখা,কপালে মস্ত সিঁদুরের টিপ। খোঁপা বাঁধেননি, দেখেই বোঝা যায় যে, সদ্য স্নান সেরে এসেছেন।
ভদ্রমহিলা যে আমাদের দেখে খুবই অবাক হয়ে গেছেন, তাঁর মুখচোখে সেটা চাপা নেই। বিস্ময়ের ধাক্কাটা সামলে নিতে অবশ্য দেরি হল না। হাত জোড় করে সুলেখা ঘোষ বললেন, “আরে কী আশ্চর্য, আসুন আসুন।” তারপরে তাঁর স্বামীর দিকে তাকিয়ে, “এঁদের সঙ্গে কোথায় দেখা হল?”
গোকুল ঘোষ তক্ষুনি কথাটার জবাব দিলেন না। আমাদের ভিতরে নিয়ে গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে, ফ্যান চালিয়ে দিয়ে বললেন, “রাস্তায়। এক প্যাকেট সিগারেট কিনব বলে বেরিয়েছিলুম, কিন্তু মোড়ের দোকানটার দিকে দু’পা যেতে-না-যেতেই এঁদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।”
তাদুড়িমশাই তাঁর পকেট থেকে এক প্যাকেট সিগারেট বার করে গোকুল ঘোষের দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, “এটা রাখুন, এখন আর দোকানে যেতে হবে না।”
“তা-ই কি হয় নাকি?” গোকুল ঘোষ অপ্রস্তুত হেসে বললেন, “পুরো প্যাকেটটাই যদি আমাকে দিয়ে দেন, তো আপনার চলবে কী করে?”
“ও নিয়ে ভাববেন না। আমার পকেটে আরও একটা প্যাকেট রয়েছে। তা ছাড়া কলকাতা থেকে তো পুরো এক কার্টন সিগারেট নিয়ে বেরিয়েছিলুম আর আছিও তো আর মাত্র একটা দিন…স্বচ্ছন্দে চলে যাবে।”
নিজের সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে গোকুল ঘোষেরটাও ধরিয়ে দিলেন ভাদুড়িমশাই। গোকুল ঘোষ বেশ মৌজ করে খানিকটা ধোঁয়া বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে, তারপর সেটা আস্তে-আস্তে বার করে দিয়ে, বারদুয়েক কেশে গলাটা সাফ করে বললেন, “বড় বদ নেশা। ভাবছি ছেড়েই দেব।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো আমিও ভাবছি। কিন্তু ছাড়তে পারছি কই?”
সুলেখা ঘোষ বললেন, “এদিকে যাচ্ছিলেন কোথাও?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “যাচ্ছিলুম না, আসছিলুম।”
“কোথায়?”
“যদি বলি আপনাদের বাড়িতেই, বিশ্বাস করবেন?”
পার্টির পরিবেশে ভদ্রমহিলার বয়সটা সেদিন আন্দাজ করতে পারিনি, আজ দিনের আলোয় মনে হল, পঞ্চাশ তো হবেই, দু’চার বছর বেশিও হতে পারে। ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে ভ্রূভঙ্গি করলেন কিন্তু তেইশ বছরের তরুণীর মতো। তারপর ডানহাতের তর্জনীটিকে থুতনিতে ঠেকিয়ে বললেন, “কী যে বলেন। তা-ই কখনও বিশ্বাস করা যায়? আমাদের কি এত সৌভাগ্য?”
গোকুল ঘোষ বললেন, “সে তো আপনি আমাকেও বলেছেন। কিন্তু, মশাই, আমিও বিশ্বাস করিনি।…-আরে, আপনারা তো এখানে সদ্য এসেছেন!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা এসেছি, কিন্তু তাতে কী হল?”
“কোনটা আমাদের বাড়ি, আমার সঙ্গে হঠাৎ দেখা না হয়ে গেলে সেটা চিনতেন কী করে?”
“বাঃ, রোজ সকালে আমি জগিং করতে বেরোই না? কালও বেরিয়েছিলুম, আজও বেরিয়েছি। তখনই পথ-চলতি লোকজনদের জিজ্ঞেস করে…না না, শুধু আপনাদেরটা নয়, বেশ কয়েকটা বাড়ি চিনে রেখেছিলুম।”
সুলেখা ঘোষ বললেন, “তা হলে আর বিশ্বাস না-করে উপায় কী?…ঠিক আছে, আপনারা বসে গল্প করুন, আমি চা নিয়ে আসছি। চিনিতে কারও আপত্তি নেই তো?”
সদানন্দবাবু বললেন, “আমি আর কিরণবাবু দুধও খাই না, চিনিও খাই না। স্রেফ হাল্কা লিকার।”
“ঠিক আছে, আমি তা হলে বরং আলাদা-আলাদা পটে চা, চিনি আর দুধ নিয়ে আসছি, আপনারা যে যাঁর ইচ্ছেমতন মিশিয়ে নেবেন।”
সুলেখা ঘোষ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ড্রয়িংরুমটি মোটামুটি পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো। মানে সেইভাবে সাজানো, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষরা গত কয়েক দশক ধরে তাঁদের বৈঠকখানা-ঘরকে যেভাবে সাজিয়ে যাচ্ছেন। আসবাবপত্র বিশেষ দামি নয়। ঘরের একধারে একটা সেন্টার-টেবিলের দু’দিকে দুটি করে সোফা। অন্য ধারে একটা খাটো পায়ার তক্তপোশকে বেশ পুরু একখানা চেক-কাটা সতরঞ্চি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। নিজে সেটায় বসেছি বলে বুঝতে পারছি যে, সতরঞ্চির নীচে পাতলা তোশকও রয়েছে একটা, উপরে তক্তপোশের দুধারে, পরিষ্কার ওয়াড় পরানো ছোট দুটি তাকিয়া। দরজা ও জানলায় শ্রীনিকেতনের পর্দা। ঘরের এক কোণে সেই খাড়া-কান পোড়ামাটির ঘোড়া, নামে বাঁকুড়ার ঘোড়া হলেও ইদানীং যা হরেক জেলায় বানানো হচ্ছে। দেওয়ালের গায়ে সাঁটা কাচের আলমারিতে আর-পাঁচটা বাংলা বইয়ের পাশে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে প্রকাশিত সুলভ এক সেট রবীন্দ্ররচনাবলিও চোখে পড়ল। তবে বইগুলিতে যে বিশেষ হাত পড়ে, এমন মনে হল না।
একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম, গোকুল ঘোষের কথায় আমার চমক ভাঙল।
“কী দু’-একটা কথা আছে বলছিলেন না?”
ভাদুড়িমশাই জানলার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনিও সম্ভবত ভাবছিলেন কিছু। এবারে জানলা থেকে গোকুল ঘোষের দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ, দু’-একটা কথা জানবার ছিল।”
“কী বিষয়ে?”
“এই যে এখানে যা ঘটে গেল, সেই বিষয়ে আর কি।”
গোকুল ঘোষের মুখ দেখে মনে হল, কথাটা তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। এক মুহূর্ত বাদেই অবশ্য হাসি ফুটল তাঁর মুখে। বললেন, “বুঝেছি, আপনি মিসেস দাশের ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে চান, তাই না?”
“হ্যাঁ, এই খুনের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিলুম। তা মনে হল যে, আপনি হয়তো দু’একটা কথা জানিয়ে আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন…অন্য দু-একটা কথা আর কি…মানে যা থেকে এখানকার পরিবেশ আর হিউম্যান রিলেশানগুলো একটু বুঝে নেওয়া যায়।”
মুখের হাসিটুকু মিলিয়ে গিয়ে কপালে গোটাকয় ভাঁজ পড়ে গেল তৎক্ষণাৎ। হঠাৎই বড় গম্ভীর দেখাল গোকুল ঘোষকে। মাথায় কুচকুচে কালো চুল, গায়ে রংচঙে হাওয়াইয়ান শার্ট, তবু মনে হল, ভদ্রলোকের ভিতর থেকে একজন বৃদ্ধের মুখ বেরিয়ে পড়েছে, কলপে আর রঙিন জামার মোড়কে যাকে ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। বললেন, “ঠিক আছে, আপনি যা জানতে চান, আমার যদি জানা থাকে তো বলব নিশ্চয়। কিন্তু তার আগে আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
“করুন।”
“আপনাদের কি সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়?”
“মানে?”
“মানে আর কিছুই নয়, মিঃ সেনের কাছে আমি আপনার বিষয়ে বিস্তর কথা শুনেছি।” যে হাসিটা মিলিয়ে গিয়েছিল, সেটা আবার ফিরে এল গোকুল ঘোষের মুখে। “ফলে আমি জানি যে, আপনি খুবই ব্যস্ত মানুষ। তাও মিঃ সেনের অনুরোধটা ফেলতে পারেননি বলে হাতের কাজকর্ম ফেলে রেখে এখানে চলে এসেছেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এসে ভুল করেছি?”
“না না, ভুল করবেন কেন,” গোকুল ঘোষ বললেন, “খুব ভাল কাজ করেছেন। তো আমি বলি কী, সিনিক বিউটির দিক থেকেই বলুন আর জল-হাওয়ার দিক থেকেই বলুন, এই পলাশডাঙা জায়গাটা তো নেহাত খারাপ নয়, এখানে এসেই যখন পড়েছেন, তখন দু’তিন দিন একটু রেস্ট নিন, জায়গাটা একটু ঘুরে-টুরে দেখুন, তারপর ফ্রেশ হয়ে কলকাতায় ফিরে গিয়ে ফের কাজে লেগে যান। তা নয়, এখানে এসে আপনি কী করলেন, না ফের সেই একটা মার্ডার নিয়ে মাথা ঘামাতে লেগে গেলেন। বাস, সেইসঙ্গে আপনার রেস্টেরও বারোটা বেজে গেল। কোনও মানে হয়?”
ভাদুড়িমশাই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বলা হল না, তিনি মুখ খোলবার আগেই, ট্রে’র উপরে চায়ের সরঞ্জাম সাজিয়ে সুলেখা ঘোষ এসে ঘরে ঢুকলেন। সেন্টার টেবিলের উপরে ট্রেটা রেখে দিয়ে তিনি বললেন, “নিন, এবারে যে যাঁর ইচ্ছেমতো আপনারা চা বানিয়ে নিন।” তারপর আমরা কিছু বলছি না দেখে, “কী ব্যাপার, আমি আসায় আপনাদের কথাবার্তায় বাধা পড়ল নাকি?”
“আরে না না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এমন কিছু জরুরি কথাবার্তা হচ্ছিল না।… নিন সদানন্দবাবু, আপনার আর কিরণবাবুর লিকারটা আগে ঢেলে নিন দিকি। আমি তো রেগুলার…মানে দুধ-চিনি দিয়েই চা খাই।…গোকুলবাবু, আপনি আর মিসেস ঘোষ?”
“আমরাও আপনারই মতন। দুধ-চিনি ছাড়া চলে না।”
“ঠিক আছে, আমাদের তিন কাপ তা হলে আমিই বানিয়ে নেবখন।”
“আপনাকে আর হাত লাগাতে হবে না,” সুলেখা ঘোষ বললেন, “সরুন তো, আমিই করে দিচ্ছি।”
সদানন্দবাবুর নিশ্চয়ই খুব চায়ের তেষ্টা পেয়ে গিয়েছিল। তা নইলে ইতিমধ্যেই তিনি দুটো কাপে লিকার ঢেলে নিয়ে নিজের সোফায় ফিরে এসে একটা কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দেবেন কেন? বাকি তিন কাপ মিসেস ঘোষই দুধ-চিনি দিয়ে বানিয়ে নিয়ে ভাদুড়িমশাই আর গোকুল ঘোষের হাতে দুটো কাপ তুলে দিয়ে তক্তপোশে এসে আমার পাশে বসে পড়লেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দুধ-চিনি ছাড়া কী করে যে আপনারা চা খান, বুঝি না। নিশ্চয় খুব কষা লাগে?”
হেসে বললুম, “আগে লাগত, এখন আর লাগে না। সবই আসলে অব্যেসের ব্যাপার।” ট্রে’র উপরে একটা প্লেটে খানকয় বিস্কুটও ছিল। ভাদুড়িমশাই তার থেকে একটা তুলে নিয়ে চায়ের কাপে আলতো চুমুক দিয়ে বললেন, “আঃ, দিব্যি চা হয়েছে।…তো ডক্টর ঘোষ, যে কথা হচ্ছিল। এমন কোনও প্রশ্ন আমি করব না, যার উত্তর আপনার জানা নেই।”
গোকুল ঘোষ বললেন, “যেমন?”
যেমন ধরুন এই কাপ্লটিকে আপনারা কদ্দিন ধরে চেনেন?”
গোকুল ঘোষের ভুরু কুঁচকে গেল। বললেন, “আপনি সুরেশ আর রেখার কথাই বলছেন তো?”
ভাদুড়িমশাই ‘হ্যাঁ’ বলবারও সুযোগ পেলেন না, তার আগেই প্রায় আঁতকে উঠে সুলেখা ঘোষ বললেন, “এই রে, আবার সেই খুনোখুনির কথা শুরু হয়ে গেল। আর পারি না বাবা! আচ্ছা মিঃ ভাদুড়ি, শেষকালে আপনিও এর মধ্যে জড়িয়ে পড়লেন?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “উপায় কী, মিঃ কালীচরণ সেনের রিকোয়েস্ট ঠেলতে না-পেরে আপনাদের সোশ্যাল গ্যাদারিঙে সভাপতিত্ব করতে এসেছি বটে, কিন্তু স্বভাব যাবে কোথায়, আসলে আমার প্রোফেশান যে গোয়েন্দাগিরি, সেটা জানেন তো?”
“তা কেন জানব না,” সুলেখা ঘোষ বললেন, “মিঃ সেনের কাছে আপনার কীর্তিকলাপের কথা আমরা শুনিনি নাকি? কিন্তু তাই বলে কি এখানে এসেও আপনি গোয়েন্দাগিরি করবেন? পুলিশ তা হলে কী করতে রয়েছে? জেরা তো তারাও কিছু কম করছে না?”
“আপনাদেরও করেছে?”
“আমাদের করেনি। তবে তারাপদকে করেছে। তারাপদ দত্তকে চেনেন তো? ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট। এখানকার জুনিয়র ডাক্তার। তা সে তো ওই একই বাড়ির তিনতলায় থাকে, রেখাকে অ্যাটেন্ডও সে-ই করেছিল।…তখন অবশ্য তার আর কিছু করার ছিল না। …তো যা বলছিলুম…পুলিশ যে তা জানে না, তা তো নয়। তাই, সুরেশবাবুদের ফ্ল্যাটে এসে রেখাকে সে কী অবস্থায় দেখতে পায়, খুনের সময়টা কী হওয়া সম্ভব, তারাপদর কাছ থেকে পুলিশই সে-সব জেনে নিয়েছে শুনলুম।”
“ঠিকই শুনেছেন। তবে আমি সে-সব জানতে আসিনি।”
“তা হলে?”
“আমি এসেছি অন্য কিছু খবর জানবার জন্যে, যাতে কিনা এই কেসটা আর-একটু ভালভাবে আমি বুঝতে পারি।”
“তো আপনি কী জানতে চান?”
“তা-ই তো বলছিলুম।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সুরেশ আর রেখাকে আপনারা কদ্দিন ধরে চেনেন?”
গোকুল ঘোষ বললেন, “আমরা এখানে আছি তা ধরুন বছর খানেক হল।”
“ধরাধরির কিছু নেই,” সুলেখা ঘোষ বললেন, “ঠিক এক বছরই আছি। এখন তো অক্টোবর মাস, আমরা আছি গত বছরের অক্টোবর থেকে। কোম্পানি বাংলো দেবে বলেছিল, কিন্তু গোড়ার দিকে দেয়নি। তখন মাস তিনেক ওই তারাপদ আর সুরেশরা যে-রকম ফ্ল্যাটে থাকে, সেই রকমের একটা বি-টাইপের ফ্ল্যাটে থাকতে হত। ও-সব ফ্ল্যাটে তো এখনও ইলেকট্রিক লাইনই যায়নি। কী যে কষ্ট হত, সে আর বলার নয়।”
“এই বাংলোতে কবে উঠে আসেন?”
“গত জানুয়ারি মাসে।”
“সুরেশবাবুরা এই পলাশডাঙায় কবে থেকে আছেন?”
গোকুল ঘোষ বললেন, “ওরা আছে আমাদেরও বেশ কয়েকমাস আগে থেকে। আমরা যে-দিন এখানে এসে পৌঁছই, সুরেশই সে-দিন স্টেশনে আমাদের রিসিভ করতে গিয়েছিল। সেই থেকেই ওকে জানি। তার আগে ওদের চিনতুম না।”
“তা এক বছর এখানে আছেন, পরিচয়ও সেই গোড়া থেকেই, এর মধ্যে তো একটা মানুষ কেমন, রাগী না শান্ত, স্বার্থপর না উদার, হিংসুটে না দিলদরিয়া, তার একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। সুরেশবাবু সম্পর্কেও আপনি একটা আন্দাজ নিশ্চয়ই করে নিয়েছেন। কেমন মানুষ সুরেশবাবু?”
গোকুল ঘোষ বললেন, “খুব স্পেসিফিক্যালি সেটা বলতে পারব না।…মানে, ঠিক সেভাবে তো মেলামেশা করিনি ওঁর সঙ্গে… তবে হ্যাঁ, মানুষটি যে মিশুক প্রকৃতির, সেটা বলতে পারি। কোম্পানির কাজে তো মাঝেমধ্যেই ওকে কলকাতায় পাঠানো হত, তখন জিজ্ঞেস করে যেত যে, কলকাতা থেকে কারও জন্যে কিছু নিয়ে আসতে হবে কি না। আমার জন্যেও একবার শ্যামবাজারের একটা নাম-করা দোকান থেকে কিছু চা এনে দিয়েছিল। দার্জিলিংয়ের চা।…তো এর থেকে আপনি কী বুঝবেন?”
প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে ভাদুড়িমশাই সামান্য হাসলেন। তারপর বললেন, “আর তাঁর স্ত্রী?” গোকুল ঘোষ বললেন, “ওটা বরং আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করুন, উনি আমার চেয়ে ভাল বলতে পারবেন।”
ভাদুড়িমশাই সুলেখা ঘোষের দিকে তাকাতে তিনি বললেন, “রেখার কথা জিজ্ঞেস করছেন তো?”
“হ্যাঁ।”
“দিব্যি মেয়ে। সেলাই জানত, গান জানত, এখানকার প্রাইমারি স্কুলে গানের ক্লাস নিত, বাচ্চাদের নানারকম ইনডোর গেমস শেখাত, তা ছাড়া অ্যাক্টিংটাও খারাপ করত না। এই যে আমাদের এখানে কাল ‘চন্দ্রগুপ্ত’ প্লে হচ্ছে, তাতে ছায়ার পার্টটা যে ওরই করার কথা ছিল সেটা জানেন তো?”
“সেই রকম একটা কথা শুনেছি বটে, পরশু রাতের ডিনার পার্টিতেই কে যেন বলছিলেন।”
“কিন্তু রেখা মারা গেল, আর ছায়ার পার্টটা চলে গেল মিসেস সেনের কাছে। এদিকে আবার মিসেস সেন না জানেন অ্যাক্টিং, না জানেন গান। অথচ কেউ তা নিয়ে টু শব্দটি করল না। করবেই বা কেন, বড়কর্তার বউ যে!”
গোকুল ঘোষ বললেন, “আঃ, কী হচ্ছে সুলেখা। কী সব যা-তা বলছ।”
“ঠিকই বলছি।” সুলেখা ঘোষ বললেন, “তোমারই বা হক কথা বলতে এত ভয় কীসের? আর তো মাত্র মাস কয়েকের চাকরি। ষাটের পরে আর এক্সটেনশান পাবে ভেবেছ? সে গুড়ে বালি। তারাপদ কীভাবে হেলথ সেন্টারকে একাই সামলাচ্ছে, সেটা দেখছ না? এবারে ওকেই ওরা সিনিয়র ডাক্তারের চেয়ারে বসিয়ে দেবে।”
গোকুল ঘোষ ধমকের গলায় বললেন, “তুমি চুপ করো তো!”
সুলেখা যে শুধু চুপ করলেন, তা নয়, তক্তপোশ থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
একটুক্ষণ চুপচাপ কাটল। আবহাওয়া থমথম করছে, কেউ কোনও কথা বলছেন না। ভাবছিলুম, আর এখানে বসে থাকা ঠিক হবে না, এবারে বেরিয়ে পড়লেই হয়।
সুলেখা ঘোষ কিন্তু মিনিট খানেক বাদেই আবার ফিরে এলেন। মুখচোখের অবস্থা একেবারে স্বাভাবিক, একটু আগেই বাইরের লোকজনের সামনে স্বামীর সঙ্গে যে উত্তেজিত কথা-কাটাকাটি হয়ে গেল, মুখে সেজন্য কোনও গ্লানির চিহ্নমাত্র নেই। ট্রে’র উপরে কাপপ্লেটগুলো গুছিয়ে তুলতে তুলতে শান্ত গলায় বললেন, “ও হ্যাঁ, রেখার ব্যাপারে একটা কথা বলা হয়নি। মেয়েটার সবই ভাল ছিল, তবে রাগও ছিল খুব। বিশেষ করে সুরেশের উপরে এমন রেগে যেত যে, সে আর কহতব্য নয়। কেন রেগে যেত জানেন?
“কেন?”
“সুরেশ এই যে মাঝে-মাঝেই কলকাতায় যেত, রেখা এটা একেবারে পছন্দ করত না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সুরেশবাবু কি খুব ঘনঘন কলকাতায় যেতেন?”
গোকুল ঘোষ বললেন, “তা ফি মাসে বার দুয়েক তো বটেই।…না গিয়েই বা উপায় কী। মিঃ সেন কি সুবীর নন্দী যদি কোনও কাজের ভার দিয়ে ওকে কলকাতায় যেতে বলেন, তো ও-বেচারা কী করবে? যাবে না?”
সুলেখা ঘোষ ট্রে হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “এখানে তো লোকের কিছু কমতি নেই, তবু আর-কাউকে কলকাতায় না-পাঠিয়ে ওঁরা সুরেশকেই কেন পাঠাতেন, সেটাই হচ্ছে কথা।”
