আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৬)

কী যে করব, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলুম না। লোকটি যে আমাদের একেবারেই অচেনা, তা তো নয়। এই পলাশডাঙায় আসার আমন্ত্রণপত্রটি তো এরই হাত দিয়ে কলকাতায় আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। তখন দু’চারটে কথাও হয়েছিল এর সঙ্গে। মনে হয়েছিল লোকটি একটু ভালমানুষ গোছের, একটু নির্বিরোধ, একটু ভিতু। শুধু ভিতু নয়, অরুণ সান্যাল বলেছিলেন ‘ভিতুর ডিম’। এর কথাবার্তার ধরন আর হাত-কচলানো দেখে তখন একটু হাসাহাসিও করেছিলুম। কিন্তু ঠিকেদার আতর সিং যে অতি সাংঘাতিক প্রকৃতির লোক, তা জেনেও যে মানুষটি তার বিল আটকে রাখতে পারে, এখন আর তাকে মোটেই ভিতু বলে ভাবা যাচ্ছে না। বরং ভাবতে হচ্ছে যে, বাইরে থেকে দেখে যা-ই মনে হোক, লোকটির সাহস আছে। আবার সেই সাহসের মুলে হয়তো রয়েছে এর সততা। কাজের সুবিধে হবে বলে এর উপরওয়ালারাও যেখানে দুনীর্তির সঙ্গে হাত মেলায়, সেখানেও এ-লোকটি সোজাসটান দাঁড়িয়ে থাকে, রফা করতে চায় না। শারীরিক ভাবে ও দুর্বল বটে, কিন্তু মনের দিক থেকে হয়তো রীতিমতো কঠিন।

 

এই মুহূর্তে অবশ্য মনের দিক থেকেও একে বিশেষ সবল মনে হচ্ছে না। ভাদুড়িমশাইয়ের প্রশ্নের জবাব দিতে-দিতে একেবারে হঠাৎই ভেঙে পড়েছে লোকটি। চাপা কান্নায় ফুলে-ফুলে উঠছে এর শরীর। এই অবস্থায় কী করা উচিত আমাদের? একবার মনে হল, এর পিঠে হাত রেখে দু’-একটা সান্ত্বনার কথা আমাদের বলা উচিত। আবার পরক্ষণেই মনে হল, সেটা ঠিক হবে না, একেবারে আকস্মিক ভাবে যে-আঘাত এর জীবনে নেমে এসেছে, সত্যিই তো তার কোনও সান্ত্বনা নেই। সান্ত্বনার কথাগুলো আমাদের নিজেদের কানেই বড় অর্থহীন শোনাবে। তার চেয়ে বরং লোকটি এই যে কেঁদে নিজেকে একটু হাল্কা করে নিচ্ছে, এই ভাল।

 

ভাদুড়িমশাইয়ের মতও কি তা-ই? তাঁর দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝা গেল না। দেখলুম যে, ভাবলেশহীন মুখে নির্বিকার তিনি বসে আছেন।

 

সুরেশচন্দ্র অবশ্য একটু বাদেই সামলে নিলেন নিজেকে। টেবিল থেকে মুখ তুলে জামার হাতায় চোখ মুছে তিনি আমাদের দিকে তাকালেন।

 

সম্ভবত এই মুহূর্তটির জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “এখন কেমন লাগছে? অসুস্থ বোধ করছেন না তো?”

 

সুরেশচন্দ্র বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন, “না, স্যার।”

 

“চোখেমুখে ভাল করে জল ছিটিয়ে নিলে হয়তো একটু আরাম হবে, একটু সুস্থ বোধ করবেন। জল এনে দেব?”

 

ঘরের বেসিন থেকে এক মগ জল এনে দেবার জন্য সোফা ছেড়ে আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলুম। সুরেশচন্দ্র আমার দিকে তাকিয়ে লজ্জিত গলায় বললেন, “আপনি বসুন, স্যার, আমার জন্যে ভাববেন না, আমি ভালই আছি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “লজ্জার কিছু নেই, শরীর ভাল না-লাগলে বলুন, আজ আর তা হলে আপনাকে বিরক্ত করব না। আমার প্রশ্ন অবশ্য শেষ হয়নি, কিন্তু তার জন্যে তাড়াহুড়ো করে লাভ কী, বাদবাকি কথা কালও হতে পারবে।”

 

“না, স্যার,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “আপনার যা জানবার আছে বলুন, আমি ঠিকই উত্তর দিতে পারব, এখন আর আমি একটুও অসুস্থ বোধ করছি না।”

 

“বাঃ, তা হলে তো খুবই ভাল।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু প্রশ্ন করবার আগে একটা কথা বলে নিই, কেমন?”

 

“বলুন, স্যার।”

 

ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ সময় নিলেন। তারপর সরাসরি সুরেশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সুরেশবাবু, আপনার শোকের ব্যাপারটা আমরা বুঝি না, তা নয়। কথাটা এর আগেও আপনাকে আমি বলেছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বলি, যতটা সম্ভব স্থির থাকুন, শান্ত থাকুন। এখন আপনার ভেঙে পড়ার সময় নয়। যে আঘাত আপনি পেয়েছেন, তাতে যে-কোনও লোকের মাথা খারাপ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনার তো মাথা খারাপ করলে চলবে না, মাথাটাকে যতটা সম্ভব ঠান্ডা রাখতে হবে। নইলে কী হবে, সেটাই আপনার বোঝা দরকার।”

 

“কী হবে?”

 

“আপনার স্ত্রীকে কে খুন করেছে, আমি জানি না। কিন্তু এটা জানি যে, আপনি যদি এখন ভেঙে পড়েন, অস্থির হয়ে উলটো-পালটা কথা বলেন, তো খুনিরই তাতে মস্ত সুবিধে হয়ে যাবে। পুলিশের পক্ষেও সহজ হয়ে যাবে অন্য সব দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আপনাকেই খুনি হিসেবে দাঁড় করানো।”

 

শুনে, কথাটা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না, এইরকম চোখে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন সুরেশচন্দ্র। তারপর বললেন, “কিন্তু স্যার, আমি তো রেখাকে খুন করিনি। তা হলে তারা খুনি হিসেবে আমাকে দাঁড় করাবে কেন? আমি তো পুলিশের শত্রু নই।”

 

“আপনি কেন পুলিশের শত্রু হতে যাবেন?” ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “অমন কথা তো ওঠেই না। না না, আপনিও পুলিশের শত্রু নন, পুলিশও আপনার শত্রু নয়। কিন্তু খুনি হিসেবে তাদের সন্দেহ যে আপনার উপরে পড়েছে, সেটা তো আপনি ভালই বোঝেন।…কী, বোঝেন না?”

 

“বুঝি, স্যার। আমি তো বলেইছি যে, শুধু পুলিশ কেন, অন্যেরাও আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। কিন্তু সন্দেহটা ঠিক কি না, সেটাও তো পুলিশকে ভেবে দেখতে হবে। তা তারা দেখবে না?”

 

দেখতে পারে, আবার না-ও পারে। কথাটা কেন বলছি জানেন?”

 

“কেন?”

 

“ওয়ান-ট্র্যাক মাইন্ড বলে একটা কথা আছে না? সেই হয়েছে মুশকিল। সামনে যদি একটা পথ পেয়ে গেল তো ডাইনে-বাঁয়ে না-তাকিয়ে সেই পথটা ধরেই হাঁটতে শুরু করল, পুলিশের মধ্যেও এমন লোকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কে জানে, তাদের সংখ্যাই হয়তো বেশি। এই আপনাদের লোক্যাল থানার দারোগা নীলমণি শিকদারের কথাই ধরুন না। একবার যদি তাঁর মনে হয়ে থাকে যে, আপনিই খুনি, তা হলে হয়তো অন্য-কোনও সম্ভাবনার কথা তাঁর মনেই আসবে না, কিংবা মনে এলেও তাকে তিনি পাত্তা দিতে চাইবেন না, স্রেফ ওইটাকেই আঁকড়ে ধরে তিনি বসে থাকবেন। তারই ভিত্তিতে কেস তৈরি করে আদালতে আপনাকেই পেশ করবেন আসামি হিসেবে।”

 

“কিন্তু, স্যার,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “পুলিশ নাহয় তা-ই করল, কিন্তু আদালত সে-কথা মেনে নেবে কেন? আদালত কি পুলিশ যা বলে, তা-ই মেনে নেয়? রেখাকে খুন করার কোনও কারণই যে আমার নেই, আদালত কি সেটাও ভেবে দেখবে না?”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের উত্তরটা শোনা হল না। তিনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই তাঁর ঘরে ফোন বেজে উঠল।

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আমি গিয়ে কতা বলব?”

 

ভাদুড়িমশাই ততক্ষণে তাঁর সোফা ছেড়ে উঠে পড়েছেন। ঘরের দিকে যেতে-যেতে বললেন, “না না, আপনি বসুন। মনে হচ্ছে শেখর ঘোষাল, এই সময়ে ফোন করবার কথা ছিল।”

 

বলতে-বলতে পর্দা ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন।

 

বেরিয়ে এলেন মিনিট দুই-তিন বাদেই। এসে ফের নিজের সোফায় বসে, একটা সিগারেট ধরিয়ে ঈষৎ অন্যমনস্ক গলায় বললেন, “কী কথা যেন হচ্ছিল?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “দাশমশাই বলছিলেন যে, পুলিশের কতা আদালত বিশ্বেস করবে কেন? ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিশ্বাস করতে পারে, না-ও পারে। সবই নির্ভর করছে কেসটা তারা কীভাবে সাজায় আর কী কী যুক্তি দেয়, তার উপরে। কিন্তু এখুনি তা নিয়ে ভাববার কী আছে, ও-সব কথা পরে ভাবলেও চলবে।”

 

সুরেশচন্দ্র বললেন, “আপনার কি তা হলে আর-কিছু এখন জিজ্ঞেস করার নেই, স্যার?”

 

“আছে বই কী, আরও বেশ কয়েকটা কথা জানার আছে। কিন্তু আপনি ক্লান্ত বোধ করছেন না তো? তা হলে বরং বাকি প্রশ্নগুলো কালই করা যাবে।”

 

“না স্যার,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “আমি একটুও ক্লান্ত বোধ করছি না। মাঝখানে একটু ভেঙে পড়েছিলুম ঠিকই, কিন্তু এখন ভালই আছি। আপনি আর কী জানতে চান বলুন, আমি ঠিকই উত্তর দিতে পারব। আর তা ছাড়া, কাল আবার কোথায় থাকি, কেমন থাকি, তার তো কোনও ঠিক নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল সকালের ব্যাপারটা সম্পর্কে যদ্দুর পর্যন্ত আপনার কাছে শুনেছি, তার পর থেকে তা হলে জিজ্ঞেস করি, কেমন?”

 

“করুন, স্যার।”

 

“আপনার স্ত্রী যে বেঁচে নেই, এটা বুঝে আপনি চিৎকার করে ওঠেন, এই পর্যন্ত আমরা শুনেছি। তার পরে কী হল?”

 

“পাশের ফ্ল্যাটের সুরঞ্জনবাবু ‘কী হয়েছে, কী হয়েছে’ বলতে-বলতে আমাদের ফ্ল্যাটে ছুটে এলেন।”

 

“সুরঞ্জনবাবু কে? আপনার কলিগ?”

 

“হ্যাঁ, স্যার, কলিগ। তবে আমার মতো ক্লেরিক্যাল কাজ করেন না, টেকনিক্যাল হ্যান্ড, কনস্ট্রাকশনের যে কাজ চলছে, তার দেখাশোনা করেন। আসলে উনি মিঃ মালহোত্রার ডিপার্টমেন্টের লোক।”

 

“উনি যে কী হয়েছে,’ কী হয়েছে’ বলতে বলতে ছুটে এসেছিলেন, এটা আপনার স্পষ্ট মনে পড়ে?…আই মিন, তখন আপনার যা মনের অবস্থা, তাতে তো এত সব ডিটেলস আপনার মনে থাকা খুব স্বাভাবিক নয়।…কী, আমি কি ভুল বললুম?”

 

“না স্যার, আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু আমার মনে আছে। পুলিশকেও এটা আমি বলেছি। আসলে, আমার মন তখনও বিকল হয়ে যায়নি। আমি ভাবছিলুম যে, এক্ষুনি একজন ডাক্তার ডাকা দরকার। সুরঞ্জনবাবুদের কথার জবাব না দিয়ে, তাই তৎক্ষণাৎ আমি তিনতলায় ছুটে যাই।”

 

“তিনতলায় কেন?”

 

“তারাপদবাবু তিনতলায় আমাদের ঠিক উপরের ফ্ল্যাটে থাকেন।”

 

“তারাপদবাবু কে? ডাক্তার?”

 

“হ্যাঁ, স্যার। এই সময়ে তাঁকে সাধারণত বাড়িতে পাওয়া যায় না, আটটার মধ্যেই তিনি আমাদের মেডিক্যাল সেন্টারে চলে যান। তবে কাল তো ছুটির দিন ছিল, তারাপদবাবুকে তাই তাঁর বাড়িতেই পেয়ে যাই।”

 

“সঙ্গে-সঙ্গেই তিনি আপনাদের ফ্ল্যাটে চলে আসেন?”

 

“সঙ্গে-সঙ্গেই। যে-ব্যাগে তাঁর কিছু ওষুধপত্তর থাকে, সেই ব্যাগ আর ব্লাডপ্রেশার মাপার যন্ত্রটাও নিয়ে এসেছিলেন। আমি অবশ্য খবরটা দিয়ে তাঁর একটু আগেই…এই ধরুন মিনিট খানেক আগেই আবার নীচে নেমে আসি।”

 

ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ইতস্তত করে বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি, সুরেশবাবু, কিছু মনে করবেন না। আপনি তো বুঝেই গিয়েছিলেন যে, আপনার স্ত্রী বেঁচে নেই। তা হলে আর ডাক্তার ডাকতে ছুটলেন কেন?”

 

“এই কথাটা পুলিশও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, স্যার। এর জবাবে পুলিশকে যা বলেছি, আপনাকেও তা-ই বলছি। আসলে, রেখা যে মারা গিয়েছে, তা আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলুম। কিন্তু একই সঙ্গে আমার মনে হচ্ছিল যে, কী জানি, আমার হয়তো ভুলও হতে পারে, রেখা হয়তো মারা যায়নি, হয়তো বেহুঁশ হয়ে রয়েছে, এক্ষুনি যদি ডাক্তার এসে ঠিকমতো ওষুধ দেন তো রেখা হয়তো জ্ঞান ফিরে পাবে, বেঁচে উঠবে।”

 

আমি বললুম, “অর্থাৎ আপনার স্ত্রী যে মারা গেছেন, এটা আপনি বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না। কেমন?”

 

সুরেশচন্দ্র বললেন, “এমন কি হয় না, স্যার?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন হবে না, নিশ্চয়ই হয়। বিশেষ করে হয় সেইসব ঘটনার ক্ষেত্রে, যাকে আমরা ভয় পাচ্ছি। আর ভয় পাচ্ছি বলেই সেটা যে সত্য, তা মেনে নিতে আমাদের মনের কোনও সায় পাচ্ছি না।”

 

“তা-ই হয়তো হবে, স্যার।”

 

ভাদুড়িমশাই আবারও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ডাক্তার এসে কী করলেন?”

 

ভেবেছিলুম, উত্তর দিতে গিয়ে সুরেশচন্দ্র আবার হয়তো ভেঙে পড়বেন। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়লেন না, স্বাভাবিক গলায় বললেন, “কিছুই করার ছিল না, স্যার। চোখের পাতা টেনে দেখলেন, নাড়ি দেখলেন, তারপর মাথা নেড়ে বললেন যে, রেখা বেঁচে নেই।”

 

“আর-কিছু বললেন না?”

 

“ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে বললেন, এটা আনন্যাচারাল ডেথ, তিনি পুলিশকে খবর দিতে যাচ্ছেন, পুলিশ না-আসা পর্যন্ত কেউ যেন ডেডবডি না ছোঁয়।”

 

“উনিই তা হলে পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন?”

 

“হ্যাঁ, স্যার।”

 

“পুলিশ কতক্ষণ বাদে আসে?”

 

“ঘন্টাখানেকের মধ্যেই এসে যায়, স্যার। সঙ্গে আর-একজন ডাক্তারকে নিয়ে এসেছিল। বাইরের লোকদের ফ্ল্যাট থেকে বার করে দিয়ে পুলিশ আমাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে জেরা করে। ফ্ল্যাট থেকে টাকাকড়ি কি ভ্যালুয়েবল কিছু জিনিসপত্র খোয়া গেছে কি না, এখানে কিংবা আর-কোথাও কোনও মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে কি না, রেখার সঙ্গে মাঝে-মাঝেই আমার ঝগড়াঝাঁটি হত কি না, আমি জুয়া খেলি কি না, ড্রাগ অ্যাডিক্ট কি না, রেখার কোনও পুরুষ-বন্ধু আছে কি না, এইসব হাজার-গণ্ডা প্রশ্ন। জেরা শেষ হবার পর পুলিশের লোকেরাই রেখার ডেডবডি তুলে নিয়ে যায়, আর যাবার আগে বলে যায় যে, এখুনি তারা আমাকে অ্যারেস্ট করছে না বটে, তবে একজন পাহারাদার রেখে যাচ্ছে, থানা থেকে পারমিশন না-দেওয়া পর্যন্ত আমি যেন ফ্ল্যাট থেকে না-বেরোই।”

 

ভাদুড়িমশাই স্থির হয়ে সব শুনছিলেন। একটানা খানিকক্ষণ কথা বলে সুরেশচন্দ্র চুপ করতে তিনি বললেন, “সুরঞ্জনবাবু মানুষটি কেমন?”

 

“ভাল বলেই তো মনে হয়। তবে একটু চাপা স্বভাবের। আমার পাশের ফ্ল্যাটেই তো থাকেন, কিন্তু ওই ছুটির দিন ছাড়া আমার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ কি কথাবার্তা খুব একটা হয় না। হবেই বা কী করে, সকাল আটটার মধ্যেই উনি সাইটে চলে যান, সঙ্গে টিফিন ক্যারিয়ারে কিছু খাবার নিয়ে যান বলে : দুপুরে আর খাবার জন্যে বাড়ি ফিরতে হয় না, ফিরতে-ফিরতে সন্ধে পেরিয়ে যায়, কিন্তু তখন খুবই ক্লান্ত থাকেন তো, তাই বোধহয় তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে নিয়ে শুয়ে পড়েন।”

 

“উনি একা থাকেন?”

 

“না, স্যার। ওঁর স্ত্রী আছেন, বাচ্চা…এই মানে বছর দুইয়ের একটি মেয়েও আছে। তবে ভদ্রমহিলাও যে খুব মিশুকে, এমন মনে হয় না। বাচ্চাটার কান্না মাঝে-মাঝে শুনতে পাই, কিন্তু তাকে নিয়েও ভদ্রমহিলাকে বড়-একটা বাইরে আসতে দেখিনি। মনে হয় যে, তাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একটু নিরিবিলি থাকতে ভালবাসেন।”

 

“আর ডাক্তারবাবু?”

 

“খুব ভাল লোক, স্যার।” সুরেশচন্দ্র বললেন, “উনিও অবশ্য আমাদের ফ্ল্যাটে বিশেষ আসেননি, মেরেকেটে মাত্র দু’-একবারই হয়তো এসেছেন, কিন্তু আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির সিঁড়িতে কি রাস্তাঘাটে তো দেখা হয়ই, দেখা হলেই হেসে কথা বলেন, শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক আছে কি না জিজ্ঞেস করেন, মাথা ধরেছে কি গা-ম্যাজম্যাজ করছে শুনলে রাস্তায় দাঁড়িয়েই ব্যাগ খুলে তার ওষুধ…এই মানে ট্যবলেট কি ক্যাপসুল একেবারে তক্ষুনি তক্ষুনি হাতে ধরিয়ে দেন, —কী বলব, প্রতিবেশী হিসেবে সত্যি ওঁর কোনও তুলনা হয় না।”

 

“মানে খুবই পরোপকারী মানুষ, কেমন?”

 

“খুউব। উনি এখানকার জুনিয়ার ডাক্তার, কিন্তু আমাদের বড়-ডাক্তারবাবু মিঃ গোকুল ঘোষের তো বয়েস হয়েছে, বাড়ি থেকে বড়-একটা বেরোন না, তাই ওঁকেই মেডিক্যাল সেন্টারের সমস্ত কাজ একা-হাতে সামলাতে হয়। বলতে গেলে ভূতের মতো খাটেন, কিন্তু তা নিয়ে ওঁর কোনও আক্ষেপ নেই। বলেন, মানুষের সেবা করার সুযোগ পাচ্ছি, এই যথেষ্ট। আবার এখানকার যে সোস্যাল লাইফ, তারও সব-কিছুতেই উনি আছেন। তা সে পিকনিকই হোক আর যাত্রা-থিয়েটার হোক।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, বেশ সামাজিক মানুষ দেখছি।”

 

“হ্যাঁ, স্যার। ওঁর সঙ্গে যদি কথা বলেন তো আপনার খুব ভাল লাগবে।”

 

“তা বলতে হবে বই কী। তবে কথা তো শুধু ওঁর সঙ্গে নয়, সুরঞ্জনবাবুর সঙ্গেও বলা দরকার।”

 

“আর-কিছু জিজ্ঞেস করবেন, স্যার?”

 

“না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপাতত এই যথেষ্ট, আর-কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। চলুন আপনাকে একতলায় পৌঁছে দিয়ে আসি। তবে তার আগে একটা কথা ফের মনে করিয়ে দিচ্ছি। যদি দোষ না করে থাকেন, তা হলে ভয় পাবেন না। যতটা সম্ভব, স্থির থাকুন, শান্ত থাকুন।”

 

সুরেশচন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে ভাদুড়িমশাই নীচে নেমে গেলেন।

 

ফিরে এলেন মিনিট দুই-তিন বাদে। আসতেই জিজ্ঞেস করলুম, “পাহারাদারটি জেগে ছিল?”

 

“না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “রাত তো কম হয়নি, এগারোটা। ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঠেলা মেরে জাগিয়ে দিয়ে সুরেশচন্দ্রকে ওর হাতে সঁপে দিয়ে বললুম, যাও, এঁকে এঁর ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়ে এসো, তবে পথের মধ্যে ঘুমিয়ে পোড়ো না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “এই লোকের পক্ষে অমন কাজ সম্ভব? আমার তো বিশ্বেস হয় না, মশাই। পুলিশ একে মিচিমিচি হ্যারাস করচে। এমন অমায়িক, এমন শান্তশিষ্ট…”

 

বললুম, “বাইরে যারা শান্তশিষ্ট, ভিতরে ভিতরে তাদের অনেকেই কিন্তু বেশ কঠিন।”

 

আমার দিকে থেকে সমর্থন না-পেয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে চোখ ফিরিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “আপনার কী মনে হয়?”

 

“আমার কিছুই মনে হয় না। কিন্তু ও-সব কথা ছেড়ে এখন শুয়ে পড়ুন তো। কাল আবার সকাল-সকাল উঠতে হবে।”

 

“কেন?”

 

“বাঃ, শুনলেনই তো, সুরঞ্জনবাবু আটটার মধ্যেই সাইটে চলে যান। তার আগে না-গেলে তাঁর সঙ্গে কথা বলব কী করে? তা ছাড়া ডাক্তারবাবুর সঙ্গেও তো একবার দেখা হওয়া দরকার।”

 

কথা বলতে-বলতেই সোফা ছেড়ে উঠে ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিলেন ভাদুড়িমশাই। কিন্তু দরজা পর্যন্ত গিয়েই তিনি আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “ওহো, একটা কথা তো আপনাদের বলা-ই হয়নি। ফোন করে তখন শেখর ঘোষাল কী বললেন জানেন?”

 

“কী বললেন?”

 

“বললেন যে, ডেডবডির ডান হাতের মুঠোর মধ্যে কয়েক গাছি চুল পাওয়া গেছে। মুঠো খুব শক্ত করে বন্ধ করা ছিল। চুলের রং হলদেটে। ওই যাকে গোল্ডেন ব্রাউন কালার বলে আর কি।”

 

শুনে আমি চমকে উঠলুম। হলদে চুলের যে মহিলাটিকে কাল রাত্তিরে আমি কালীচরণ সেনের পার্টিতে দেখেছি, আবার আজ সকালেও দেখে এলুম, তিনি আশা মালহোত্রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *