আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৫)

সদানন্দবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। বিল ভাউচার চালান রিসিট ক্যাশমেমো ইত্যাদি নিয়ে যে কথাবার্তা চলছিল, তা শুনতে-শুনতে একটু ক্লান্ত বোধ করছিলেন হয়তো। তারই মধ্যে হঠাৎ একটা খুনের প্রসঙ্গ এসে যাওয়ায় তিনি আঁতকে উঠে বললেন, “লোকটা খুনি? ওরেব্বাপ রে বাপ।…তা কী যেন নাম বললেন?”

 

সুরেশচন্দ্র বললেন, “আতর সিং।”

 

“অ্যাঁ, খুনির নাম আতর। বলেন কী মশাই?…তা কাকে খুন করেচে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “খুনটা যদি আতর সিং-ই করে থাকে, তা হলে তো এটা নেহাতই একটা খুনের ব্যাপার নয়, জোড়াখুনের মামলা।”

 

সুরেশচন্দ্র যে তাজ্জব বনে গেছেন, সে তার মুখ দেখেই বোঝা যায়। চাপা গলায় বললেন, “আপনি জানেন দেখছি।”

 

“না-জানার তো কিছু নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাগজে খবর বেরিয়েছিল, দিন কয়েক বেশ হই-চইও হয়েছিল, তা সে-সব বৃত্তান্ত আমি যেমন পড়েছি, তেমনি সদানন্দবাবু আর কিরণবাবুও নিশ্চয় পড়ে থাকবেন।…কী কিরণবাবু, মনে পড়ছে?”

 

বললুম, “কই, না তো।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে কী। আমার তো স্পষ্ট মনে আছে এটা এইট্টিসেভেনের অগস্ট মাসের ঘটনা। আসানসোলের খুব কাছেই ঘটেছিল। কলকাতার কাগজে পরের দিনই খবর বেরিয়েছিল ‘আসানসোলে জোড়াখুন’।…কী সদানন্দবাবু, আপনারও মনে পড়ছে না?”

 

সদানন্দবাবু চালাক মানুষ। তাই, তাঁরও যে কিছু মনে পড়ছে না, সেটা আমার মতো সরাসরি কবুল না-করে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ভুরু কুঁচকে মাথা চুলকে মুখচোখের এমন একটা ভঙ্গি ফুটিয়ে তুললেন, যেন স্পষ্টভাবে না-হলেও ওইরকম একটা ঘটনার কথা তাঁর আবছামতন মনে পড়ছে বটে। ইস্কুলের পণ্ডিতমশাই হঠাৎ ‘লতা’ শব্দের চতুর্থীর দ্বিবচন কি ‘সাধু’ শব্দের পঞ্চমীর বহুবচন কী হবে জিজ্ঞেস করলে তাঁর সবচেয়ে ওঁচা ছাত্রটিও যেমন ‘পেটে আসছে মুখে আসছে না’ গোছের ভাব করে, এও প্রায় তেমন ব্যাপার।

 

কিন্তু চালাকিটা খাটল না। যা বুঝবার, ভাদুড়িমশাই সেটা ঠিকই বুঝে গিয়ে বললেন, “দূর মশাই, আপনার দেখছি কিচ্ছু মনে নেই।”

 

একটু গুটিয়ে গিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “আহা, তারপর পুরো আটটা বছর কেটে গেল না? অ্যাদ্দিন বাদে কি আর পষ্ট করে সব মনে থাকে?”

 

আমি বললুম, “ছাড়ুন তো। আসল কথায় আসুন। যারা খুন হয়েছিল, তারা কে?”

 

“একজন আতর সিংয়ের বউ আর অন্যজন সেই বউয়ের উপপতি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বউয়ের নামটা মনে আছে। রেশমি। উপপতির নামটা মনে নেই। তবে সারনেমটা যদ্দুর মনে পড়ছে মাখিজা। ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসা করত। আসানসোল ছাড়িয়ে নেয়ামতপুর বলে যে একটা জায়গা আছে, সেখানে একটা বাড়িও করেছিল, শেষপর্যন্ত সেই বাড়ির মধ্যেই রাত দশটায় দুজনে খুন হয়ে যায়।”

 

“খুনটা আতর সিং-ই করেছিল?”

 

“তা তো হলফ করে বলা যাবে না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে হ্যাঁ, বউ আর তার প্যারামুর যখন একইসঙ্গে মারা পড়ে, তখন পুলিশের সন্দেহ যে স্বামীর উপরেই পড়বে, সেটা তো ঠিক। তার উপরে আবার লোক্যাল দু’জন লোকও বলল যে, ঘটনার দিন সন্ধেবেলায় আতর সিংকে ওই নেয়ামতপুরেই দেখা গিয়েছিল বটে। বাস, মোটিভ তো পরিষ্কার, বউকে আর তার উপপতিকে খতম করতে একটা লোক তো চাইতেই পারে, পুলিশ অতএব আতর সিংকে গ্রেফতার করতে আর দেরি করল না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “লোকটা তা হলে ছাড়া পেল কী করে? এখানে তো সে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্চে আর এঁয়াদের মাতায় টুপি পরিয়ে দিব্যি টু-পাইস কামিয়ে নিচ্চে। এটা কী করে হয়?”

 

“অ্যালিবাইয়ের জোরে হয়। আদালতে আতর সিং প্রমাণ করে ছাড়ল যে, ঘটনার দিন সে আসানসোলের ত্রিসীমানায় ছিল না।”

 

“তা হলে কোতায় ছিল?”

 

“পাটনার ফ্রেজার রোডের একটা হোটেলে। হোটেলের রেজিস্টার খুলে দেখা গেল, তা-ই বটে। ঘটনার একদিন আগে সে ওই হোটেলে চেক ইন করেছে, আর চেক আউট করেছে ঘটনার একদিন বাদে। বাস, খুনের মামলা ওইখানেই খতম। তা হলে আর তাকে খুনি বলি কী করে?”

 

সুরেশচন্দ্র শুকনো গলায় বললেন, “এইজন্যেই বলছিলুম যে, পুলিশ ওকে ছুঁতে পারবে না। সেটা ও খুব ভালই জানে। ধুরন্ধর লোক।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আতর সিংয়ের কথা এখন থাক। আপনাকে আরও দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করবার আছে।”

 

“বেশ তো, করুন।”

 

“মিঃ নন্দীর বাংলো থেকে বেরিয়ে কি আপনি আর কোথাও গিয়েছিলেন?”

 

“না, স্যার, নন্দীসায়েরের সঙ্গে কথা বলতে-বলতেই অনেকটা সময় কেটে গেসল। ওখান থেকে

 

সরাসরি বাড়ি চলে যাই।”

 

“কটার সময় বাড়ি ফিরলেন?”

 

“ঠিক আটটায়।”

 

“আটটার একটু আগেও নয়, পরেও নয়, ঠিক আটটায়?”

 

“হ্যাঁ, স্যার।”

 

“এত নিশ্চিত হয়ে বলছেন কী করে? হাতঘড়িতে সময় দেখে তারপর বাড়িতে ঢুকেছিলেন?”

 

“না, স্যার, হাতঘড়ি দেখার দরকারই হয়নি।”

 

“তার মানে?”

 

সুরেশচন্দ্র আবার ম্লান হাসলেন। বললেন, “স্যার, এখানে এসে পৌঁছবার পর থেকে তো এই গেস্ট হাউস থেকে আপনি নিশ্চয় দু’চারবার একটু বেরিয়েছেন। বেরোননি?”

 

“তা কেন বেরুব না। কাল রাত্তিরেই তো একবার বেরিয়েছি। তারপর আপনি এখানে আসার আগেও তো একবার টাউনশিপটা ঘুরে দেখতে বেরিয়েছিলুম। পার্ক, বাজার, ইস্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, আপনাদের অনুষ্ঠানের প্যান্ডেল—অনেক কিছুই তো তখন দেখা হল।”

 

“অফিসার্স ক্লাবটা দেখেননি?”

 

“হ্যাঁ, সেটাও দেখেছি।”

 

“তা হলে নিশ্চয় ক্লক টাওয়ারটাও দেখে থাকবেন।”

 

“ও হ্যাঁ, ওটা তো অফিসার্স’ ক্লাবের ঠিক পাশেই।”

 

“হ্যাঁ, স্যার,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “ওই ক্লক টাওয়ারটার জন্যেই বলতে পারলুম যে, কাল সকালে একেবারে কাঁটায়-কাঁটায় আটটায় আমি বাড়ি ফিরেছিলুম। ওটা স্যার পেটা-ঘড়ি। ঘন্টায়-ঘন্টায় শব্দ করে জানিয়ে দেয় যে, কটা বাজল।…কেন স্যার, আপনারা শুনতে পান না?”

 

প্রশ্নটার উত্তর না-দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাড়িতে পৌঁছেই কি আপনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে? মানে ওটা তো ফ্ল্যাটবাড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে কাউকে দেখে কি কিছু মনে হয়নি আপনার?”

 

“না, স্যার, ফ্ল্যাটে ঢুকবার আগে পর্যন্ত কিচ্ছু আমি বুঝতে পারিনি।”

 

“ফ্ল্যাটের দরজা কি খোলা ছিল?”

 

উত্তরটা শোনা হল না। কেননা, ঠিক তখনই শুনতে পেলুম যে, একটু দূরে কোথাও একটা পেটা-ঘড়িতে ঘন্টা বাজতে শুরু হয়েছে।

 

সুরেশচন্দ্র বললেন, “ক্লক-টাওয়ারের ঘন্টা। কাল সকালে যখন বাড়ি ফিরি, তখন আটটা বাজার শব্দ শুনতে পেয়েছিলুম।”

 

ঘড়ির ঘন্টা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই নীচ থেকে একজন উর্দি-পরা বেয়ারা উপরে উঠে এসে বলল, “ডিনার রেডি সাব। আপনারা কি ডাইনিং হলে আসবেন, নাকি উপরে এখানেই খানা লাগিয়ে দেব?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না না, আমরা ডাইনিং হলেই যাচ্ছি। …ও হ্যাঁ, ইনিও আমাদের সঙ্গে খাবেন।” তারপর সুরেশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে, “চলুন, নীচে যাওয়া যাক। আরও দু’একটা কথা অবশ্য জিজ্ঞেস করবার আছে, তবে আগে তো খেয়ে নিন, বাকি কথা উপরে এসে হবে।”

 

সুরেশচন্দ্র আমাদের সঙ্গে নীচে নেমে ডাইনিং হলে ঢুকলেন বটে, কিন্তু বলতে গেলে প্রায় কিছুই তিনি খেলেন না। আমিষ যে খাবেন না, সেটা আমি আন্দাজ করেছিলুম, তবে ডাল আর একটা সব্জিও তো ছিল, তাতেও দেখলুম তাঁর স্পৃহা নেই। ডাল দিয়ে ভাত মেখে নিয়ে খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন মাত্র। তারপর ঢকঢক করে পুরো একগ্লাস জল খেয়ে বললেন, “আমার খাওয়া হয়ে গেছে, স্যার, কিন্তু আপনারা তাই বলে যেন উঠে পড়বেন না, আপনারা আস্তেসুস্থে খান, আমি বসে আছি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “খেতে ইচ্ছে করছে না?”

 

মুখ নিচু করে সুরেশচন্দ্র বললেন, “না, স্যার।”

 

“তা হলে আর নাহক বসে থাকবেন কেন? আপনি বরং উপরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিন, আমরা একটু বাদেই আসছি।”

 

টেবিল ছেড়ে নিঃশব্দে সুরেশচন্দ্র দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

 

দরজার বাইরেই দোতলার সিঁড়ি। টেবিলের যে-দিকটায় আমি বসে আছি, সিঁড়িটা সেখান থেকে দেখা যায়। নইলে, সুরেশচন্দ্র দোতলায় উঠে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ড বাদেই যে একতলা থেকে আর-একজন লোকও দোতলায় উঠতে শুরু করেছে, এটা আমার চোখেই পড়ত না।

 

কথাটা ভাদুড়িমশাইকে জানাব বলে তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি চাপা গলায় বললেন, “ওটা নিয়ে ভাববার কিছু নেই।”

 

বললুম, “তার মানে আপনি দেখেছেন।”

 

“হ্যাঁ।”

 

কী করে দেখলেন? যেখানে বসে আছেন, সেখান থেকে তো দেখতে পাবার কথা নয়?”

 

“তাতে কী হয়েছে?” মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে নির্লিপ্ত গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার উল্টো দিকের দেওয়ালে বেসিনের উপরে একটা আয়না রয়েছে না? রিফ্লেকশনটা দিব্যি এসে গেল।”

 

“কিছু বুঝতে পারলেন?”

 

“বুঝবার তো কিছু নেই। পুলিশের পাহারাদার। নীলমণি শিকদার ওকেই এখানে বসিয়ে রেখে গেছে। হুঁশিয়ার লোক। যেই দেখেছে যে, আমরা সঙ্গে নেই, সুরেশ একা-একা উপরে উঠে গেল, · অমনি ও তার পিছু নিয়েছে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “চোকে চোকে রাকচে আর কি।”

 

খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমরা ডাইনিং হল থেকে উপরে চলে এলুম। আসতে-আসতেই দেখতে পেলুম যে, দোতলার ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটি। আমরা উপরে গিয়ে পৌঁছতেই সে নীচে নেমে গেল। সুরেশচন্দ্রের উপরে সে নজর রাখছিল ঠিকই, কিন্তু সুরেশ যে তাকে দেখতে পেয়েছেন, এমন মনে হল না। দেখলুম মাথা নিচু করে একটা সোফায় তিনি বসে আছেন। সম্ভবত অন্যমনস্ক ছিলেন। আমরা গিয়ে পৌঁছতে এমনভাবে চমকে উঠলেন যে, বুঝতে পারলুম প্রথমটায় তিনি আমাদেরও দেখতে পাননি। পরক্ষণেই উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ভাদুড়িমশাই তাঁকে উঠতে দিলেন না। বললেন, “বসুন, আমার কথা এখনও শেষ হয়নি। শেষ হোক, তখন উঠবেন।”

 

সুরেশচন্দ্র যেমন বসে ছিলেন, ঠিক সেই রকম ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। আবার শুরু হল ভাদুড়িমশাইয়ের প্রশ্ন।

 

“ফ্ল্যাটের দরজা কি খোলা ছিল?”

 

“না,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “তবে বন্ধও ছিল না।”

 

“অর্থাৎ ভেজানো ছিল, কেমন?”

 

“হ্যাঁ, স্যার, তবে প্রথমে আমি সেটা বুঝতে পারিনি। বাড়িতে তো আর কেউ থাকে না, লোক বলতে শুধু আমরা দুজন- আমি আর আমার স্ত্রী। তাই ভেবেছিলুম, ভোরবেলায় আমি জগিংয়ে বেরিয়ে যাবার সময় রেখা তো রোজই ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে দেয়, আজও তেমনি বন্ধ করে দিয়েছে। তাই বাইরে থেকে দু’চার বার কড়া নাড়ি, রেখার নাম ধরে ডাকি। কিন্তু দরজা খোলে না, ভিতর থেকে কোনও সাড়াশব্দও পাই না।”

 

“তখনও কিছু মনে হয়নি…মানে কিছু সন্দেহ করেননি?”

 

“না, স্যার। প্রথমে ভেবেছিলুম, ছুটির দিন বলে রেখা হয়তো ফের ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার এইটে মনে করে অস্বস্তি হয় যে, ছুটির দিনেও রেখা এত বেলা পর্যন্ত ঘুমোয় না। তখন ভাবি যে, তা হলে হয়তো স্নান করবার জন্যে কলঘরে ঢুকেছে। কিন্তু সেটাও যে ঠিক, তা মনে হয় না।”

 

“কেন?”

 

“স্নান করতে ঢুকলে তো কল দিয়ে জল পড়ার শব্দ হবে, আর বাইরে থেকেও শব্দটা শুনতে পাব। কিন্তু তেমন কোনও শব্দও শুনতে পাচ্ছিলুম না। গোটা ফ্ল্যাটটাই একেবারে স্তব্ধ।”

 

“তখন কী করলেন?”

 

“দরজায় জোরে ধাক্কা দিলুম, আর সঙ্গে-সঙ্গে দরজা খুলে গেল।”

 

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন সুরেশচন্দ্র। তারপর বললেন, “সত্যি বলতে কী, দরজাটা যে এইভাবে খুলে যাবে, তা আমি ভাবিনি। ফলে, দরজা খোলার সঙ্গে-সঙ্গে ব্যালান্স হারিয়ে ঘরের মধ্যে আমি হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাই। তখনই বুঝতে পারি যে, দরজাটা আসলে ভেজানো ছিল।”

 

“আপনার এমন মনে হয়নি যে, বাইরে থেকে দরজাটা টেনে ভেজিয়ে রেখে আপনার স্ত্রী হয়তো কোনও কাজে কি দরকারে অন্য কোনও ফ্ল্যাটে গেছেন?”

 

“না, স্যার, তা মনে হয়নি।”

 

“কেন?”

 

“অভাবী জায়গা, ছোটখাটো চুরি এখানে লেগেই আছে, বারান্দার রেলিঙে একটা শাড়ি কি শার্ট শুকুতে দিয়েও নিশ্চিন্ত থাকবার উপায় নেই, তাই একটু সাবধান থাকতে হয়, আমি যদি বাড়ি থেকে বেরোলুম তো যতক্ষণ না ফিরে আসছি, রেখা ততক্ষণ ফ্ল্যাট খালি রেখে কোথাও বেরোত না।”

 

“পাহারার ব্যবস্থা নেই? মানে বাড়ি তো ওখানে একটা নয়, একই জায়গায় একই ধাঁচের বেশ কয়েকটি বাড়ি, আ ক্লাস্টার অব হাউসেস। তাতে কোম্পানির লোকজনরাই রয়েছেন। তা এ-সব ক্ষেত্রে কোম্পানি থেকেই ইউজুয়ালি পাহারা দেবার একটা ব্যবস্থা থাকে। আপনাদের ওই ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর ক্ষেত্রে সেটা নেই?”

 

“একেবারেই যে নেই, তা নয়।” সুরেশচন্দ্র বললেন, “কোম্পানি থেকে একজন গার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সে একা-মানুষ, কত দিকে নজর রাখবে। তাও কিছুটা রাখতে পারত, যদি ওই বাড়িগুলোকে ঘিরে উঁচু একটা কম্পাউন্ড ওয়াল বানিয়ে তাতে একটামাত্র দরজা রেখে গার্ডকে সেখানে বসিয়ে রাখা হত। কিন্তু তেমন কোনও কম্পাউন্ড ওয়াল তো নেই। ফলে যখন খুশি আর যে-দিক দিয়ে খুশি, ওই বাড়িগুলোর মধ্যে যে-কেউ ঢুকে পড়তে পারে। ঢোকেও। এর মধ্যে একদিন তো আতর সিংই ঢুকেছিল। জগিং সেরে সদ্য… ‘

 

“দাঁড়ান, দাঁড়ান,” হাতের ইঙ্গিতে সুরেশচন্দ্রকে থামিয়ে দিয়ে, সোফা থেকে একটু সামনে ঝুঁকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা কবেকার কথা?”

 

“বিজয়া দশমীর দিন সকালবেলাকার কথা।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পুজো তো এবার চারদিনের নয়, থার্ড ডেতেই শেষ হয়ে গেসল। তার মানে বিজয়া দশমী গেল থার্ড অক্টোবরে। তাই না?”

 

“হ্যাঁ, স্যার,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “যেমন প্রায় রোজই বেরোই, সেদিনও তেমনি ছ’টার আগেই জগিং করতে বেরিয়েছিলুম। তারপর জগিং সেরে ফিরতি পথে বাজার করে বাড়িতে পৌঁছতে গতকালের মতো সেদিনও ঠিক আটটাই বেজে যায়।”

 

“তারপর?”

 

“বাড়িতে ফিরে, রেখার হাতে বাজারের থলি তুলে দিয়ে, সদ্য একটু জিরিয়ে নিচ্ছি, এমন সময় ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পাই। আমি ভেবেছিলুম অন্য কোনও ফ্ল্যাটের কেউ হয়তো কোনও কাজে এসেছেন। কিন্তু দরজা খুলে দেখি আতর সিং দাঁড়িয়ে আছে। কী বলব স্যার, তাকে দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলুম।”

 

“কেন?”

 

“বলছি, স্যার। আমাদের কোম্পানি থেকে সাপ্লায়ার আর কনট্রাকটরদের প্রত্যেককে খুব স্পষ্ট করে বলে দেওয়া আছে যে, তাদের যদি কোনও দরকার থাকে তো আপিসে এসে দেখা করতে হবে, কারুরই কোনও এমপ্লয়ির বাড়িতে যাওয়া চলবে না।”

 

“আই সি,” ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “তা আতর সিং আপনাকে কী বলল?”

 

“আমার হাতে কার্ডবোর্ডের একটা চ্যাপ্টামতন বাক্স তুলে দিয়ে বলল, ‘এর মধ্যে কিছু মিঠাই

 

রইল, লেকিন আমার বিলটা আর আটকে রাখবেন না।”

 

“বাক্সে শুধু মিঠাই ছিল?”

 

“তা তো জানি না। ওটা আমি নিইনি।”

 

“আপনি কী বললেন?”

 

“বাক্সটা ফিরিয়ে দিয়ে বললুম, বিলটা যেভাবে করা হয়েছে, তাতে ওটা পাশ করা যায় না, তেমন ক্ষমতাও আমার নেই, ওটার ব্যাপারে যা ডিসিশান নেবার, তা আমার উপরওয়ালা নেবেন।”

 

“তা-ই শুনেই লোকটা চলে গেল?”

 

“তার পরেও কিছুক্ষণ ঝুলোঝুলি করেছিল। শেষে যখন বুঝল যে, কিছুতেই ওই বিল আমি পাশ করব না, তখন বাক্সটা নিয়ে চলে যায়। তবে যাবার আগে বলে যায় যে, কাজটা আমি ভাল করলুম না।”

 

শুনে একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “গতকালের কথায় আসা যাক। আপনার স্ত্রীকে কি আপনি ফ্ল্যাটে ঢুকেই দেখতে পান?”

 

“না স্যার, বাইরের ঘরে দেখিনি। দেখতে পাই শোবার ঘরে। মেঝের উপরে রেখা পড়ে ছিল। ভেবেছিলুম, যে-কোনও কারণেই হোক হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে। ব্যাপারটা যে তা নয়, রেখা যে বেঁচে নেই, এটা বুঝি মিনিট দুই-তিন বাদে। গলার ফাঁসটা প্রথমে আমার নজরে পড়েনি। শাড়ির আঁচলে গলা ঢাকা ছিল। আঁচল সরাতেই সরু নাইলনের ফাঁসটা দেখতে পাই। দেখে চিৎকার করে উঠি। …আমার…আমার…”

 

কথা শেষ হল না। অনেক কষ্টে যে কান্নাটাকে সামলে নিয়েছিলেন, এবারে সেটা ফের বেরিয়ে এল। দু’হাতে মুখ ঢাকলেন সুরেশচন্দ্র। চেপে রাখা একটা আবেগের দমকে কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল তাঁর শরীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *