(১২)
সিমেন্টের যে কারখানা এখানে তৈরি হচ্ছে, সুরেশ দাশের কাছে শুনেছিলুম যে, তার প্রোডাকশনের কাজ শিগগিরই শুরু হয়ে যাবে। আমার অবশ্য তা মনে হল না। এখনও বেশ কিছু কাজ বাকি, সে-সব শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে প্ল্যান্ট কীভাবে কমিশনড হবে, বুঝতে গিয়ে ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল। মিঃ সেন আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাচ্ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, “কিছু-কিছু কাজ অবশ্য বাকি থাকবে, কিন্তু তা থাক না, ও-সব তো টাউনশিপের কাজ, মূল কাজের সঙ্গে যখন কোনও যোগ নেই তখন তার জন্যে প্রোডাকশনের ডেডলাইন পিছিয়ে যাবে কেন। না না, ডেডলাইন পিছোবে না, মেরেকেটে আর দু’মাস, তারই মধ্যে আমাদের কারখানা ঠিকই অপারেশনাল স্টেজে এসে যাবে।”
আকারে-আয়তনে কারখানাটা নেহাত ছোট নয়। কারখানার সঙ্গে-সঙ্গেই প্রচুর জায়গাজমি নিয়ে গড়ে উঠেছে টাউনশিপ। তবে দুয়ের মধ্যে ব্যবধানও রাখা হয়েছে অনেকখানি। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিলডিং, ওয়াটার ওয়ার্কস, বেশ কয়েকটি চওড়া রাস্তা ও পাওয়ার জেনারেটিং সেন্টারের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন চলছে পার্ক, বাজার, ইস্কুল, কমিউনিটি সেন্টার আর ওভারহেড দুটো ওয়াটার রিজার্ভার তৈরির কাজ। একতলা গুটিকয়েক বাংলো ও চারতলা গুটিকয়েক স্টাফ-কোয়ার্টার্স আজ সকালেই আমার চোখে পড়েছিল। যাঁর যে-রকম পদমর্যাদা, তাঁর থাকার ব্যবস্থাও সেই রকম। স্টাফ-কোয়ার্টার্সগুলিতে যে ইতিমধ্যেই লোকজন এসে গেছে, বারান্দার রেলিং থেকে ঝোলানো জামাকাপড় দেখেই সেটা বুঝে নেওয়া যায়। বাংলোগুলোও খালি পড়ে নেই। টাউনশিপ আর কারখানার মাঝামাঝি জায়গায় একটা অফিসার্স’ ক্লাবও ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে উঠেছে। ক্লাবের লাগোয়া মস্ত একখন্ড জমি। সেখানে মাটি চৌরস করা হচ্ছে দেখে ভেবেছিলুম যে, বাগান কিংবা লন তৈরির প্রাথমিক কাজ চলছে। মিঃ সেনকে এই নিয়ে প্রশ্ন করতে তিনি বললেন, “বাগানও নয়, লনও নয়, আসলে ওখানে টেনিস কোর্ট হবে।”
সেন-দম্পতি যে গাড়িটা নিয়ে এসেছেন, সেটা একটা বিলিতি স্টেশন ওয়াগন। এক-এক জায়গায় সেটা দু-চার মিনিটের জন্যে থামছিল, আর গাড়ি থেকে নেমে কালীচরণ সেন ও বন্দনা সেন আমাদের বোঝাচ্ছিলেন যে, সেখানে কী তৈরি হবে, কিংবা যা এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে, সেটা কোন কাজে লাগবে। এ ব্যাপারে বন্দনা সেনের উৎসাহ দেখলুম তাঁর স্বামীর চেয়ে কিছু কম নয়। এক জায়গায় যে বাঁশ বেঁধে, তেরপল খাটিয়ে মস্ত একটা প্যান্ডেল খাড়া করা হয়েছে, তাও চোখে পড়ল আমাদের। ওখানে কী হবে, ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করতে বন্দনা সেন বললেন, “ওইখানেই তো প্রীতি-সম্মেলন হচ্ছে। পরশু সকালেই চেয়ার পড়ে যাবে। তা শ’পাঁচেক লোকের জায়গা হয়ে যাবে, কী বলেন?”
কালীচরণ সেন বললেন, “স্টেজটাও দেখুন। ছোট করে স্টেজ বাঁধলে বড্ড ঘেঁষাঘেঁষি হয় তো, তাই একটু বড় করেই বাঁধতে বলেছিলুম। সমবেত সংগীত ছাড়াও তা ধরুন জনা পাঁচ-ছয় আর্টিস্টের সোলো গানের ব্যবস্থা রেখেছি। তা ছাড়া রয়েছে নাচ, ম্যাজিক আর আবৃত্তির অনুষ্ঠান। তার উপরে আবার নাটকটা তো আছেই। বড় স্টেজ ছাড়া চলে?”
“সামনের বার থেকে অবিশ্যি এত সব প্যান্ডেল-ট্যান্ডেল বাঁধার হাঙ্গামা আর করতে হবে না,” বন্দনা সেন বললেন, “কমিউনিটি সেন্টারের অডিটোরিয়াম তার অনেক আগেই তৈরি হয়ে যাবে। এবারে তো ‘চন্দ্রগুপ্ত’ হচ্ছে, সামনের বারে ‘নুরজাহান’ নামাব।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আবার ডি. এল. রায়ের নাটক?”
বন্দনা সেন বললেন, “শুধু কি ডি. এল. রায়ের নাটক? ডি. এল. রায়ের ঐতিহাসিক নাটক। দারুণ হবে, কী বলেন?”
“তা হবে বই কী, ঠিকমতো যদি নাবাতে পারেন, তা হলে তো একটা দারুণ ব্যাপার হবেই।”
বন্দনা সেনের ভুরু দেখলুম কুঁচকে গেছে। বললেন, “ঠিকমতো নামাতে পারব না কেন? আপনি অভিনয়ের কথা ভাবছেন?”
“না না, অ্যাক্টিং নিয়ে ভাবতে যাব কেন।” সদানন্দবাবু একটু যেন গুটিয়ে গেলেন। “আর তা ছাড়া, ওই নিয়ে এত ভাবাভাবির আচেটাই বা কী। আপনাদের উৎসাহ রয়েচে, ট্যালেন্ট রয়েচে, ভাল করে যদি রিহার্সালটা দিয়ে নেন, তো অ্যাক্টিং ঠিকই উতরে যাবে। তবে কিনা…”
“তবে কিনা কী?”
“মানে ভাবছিলুম যে, ঐতিহাসিক নাটকের দিকেই আপনাদের একটা টান পড়ে গিয়েচে কিনা, তাই…”
“তাই কী?”
সদানন্দবাবু যে সত্যিই একটু গুটিয়ে গিয়েছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। একটু আমতা-আমতাও করছিলেন। কিন্তু একেবারে হঠাৎই তাঁর দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিটা যে কেটে গেল, তাও দেখলুম। বললেন, “দেখুন ম্যাডাম, আমি পস্টাপস্টি কতা কইতে ভালবাসি। এককালে বিস্তর নাটক করিচি তো, তার থেকে একটু জ্ঞানগম্যিও হয়েচে, তাই বলছিলুম যে, ঐতিহাসিক নাটক যখন করচেন, তখন শুধু অ্যাক্টিং করলেই তো চলবে না, কোন সময়ের নাটক, লোকে তখন কী রকমের পোশাক পরত, রানির ড্রেস কী রকমের হত আর বাঁদির ড্রেস কী রকমের, রাজা তখন ঢাল-তরোয়াল নিয়ে লড়ত, নাকি বন্দুক-পিস্তল নিয়ে, সে-সবও বেশ ভাল করে জানা দরকার। মানে এক-এক সময়ের নাটকের জন্যে এক-এক রকমের কস্টিউম চাই। হাতে রিস্টওয়াচ বেঁদে চোখে চশমা পরে যে প্রতাপ সিঙ্গির পার্ট করা চলে না, সেটা বোজেন তো?”
বন্দনা সেন হাসতে শুরু করেছিলেন। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললেন, “মাই গড! তা কেন বুঝব না? ঐতিহাসিক নাটক করছি, আর কস্টিউমের কথাটা মনে রাখব না, তাও কখনও হয় নাকি?”
কালীচরণ সেন বললেন, “ইন ফ্যাক্ট, ওই ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের জন্যে আমরা কী করেছি জানেন?”
সদানন্দবাবু ফের সেই আগের মতো গুটিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন যে, খাপটা একটু ভুল জায়গায় খুলেছেন। মিন-মিন করে বললেন, “কী করেচেন?”
“আরে মশাই, এটা যে ক্রাইস্টের জন্মেরও কয়েকশো বছর আগের ব্যাপার, তা কি আমরা জানি না? তাই আমার এক হিস্টোরিয়ান বন্ধুকে ডেকে পাঠিয়েছিলুম। তিনি পাটনা ইউনিভার্সিটিতে এনসেন্ট হন্ডিয়ান হিস্ট্রির প্রোফেসর। তাঁকে এখানে আনিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলুম যে, ইন্ডিয়ার লোকেরা…মানে শুধু রয়্যাল ফ্যামিলির লোকজনেরা নয়, কমন পিপল, সাধুসন্নিসি, ভিখিরি, সোলজার…আই মিন যারা সাধারণ মানুষ, চাষিগেরস্ত, তারাও…ঠিক কী রকম পোশাক তখন পরত। আর হ্যাঁ, সেই সময়কার গ্রিক সোলজারদের পোশাকের কথাও জিজ্ঞেস করেছিলুম। তা তিনি যা বললেন, কলকাতা থেকে ঠিক সেই রকমের পোশাক আমরা আনিয়ে নিয়েছি।”
সদানন্দবাবু ইতিমধ্যে ফের সামলে নিয়েছিলেন নিজেকে। কালীচরণ সেন যা বললেন, তাতে আর বাড়াবাড়ি না-করে ‘তা হলে তো ঠিক কাজই করেছেন’ বলে তাঁর একেবারেই চুপ করে যাবার কথা। কিন্তু তিনি ভাঙবেন তবু মচকাবেন না, তাই চুপ করে না-থেকে তিনি বললেন, “পোশাক তো আনিয়ে নিয়েচেন, কিন্তু কোত্থেকে আনালেন?”
“কেন,” কালীচরণ সেন হেসে বললেন, “মসজিদবাড়ি স্ট্রিটের ‘ড্রেসল্যান্ড’ থেকে। ওরা তো খুবই নাম-করা কস্টিউম সাপ্লায়ার। শুধু ড্রেস নয়, যেমন রাজসভার নর্তকীদের, তেমন ছায়া আর হেলেনের জুয়েলারিও তো ওরাই সাপ্লাই করেছে। রঙিন পুঁতি আর পেতলের জুয়েলারি, তবে পালিশ একেবারে ফার্স্ট ক্লাস।”
সদানন্দবাবু তাও দেখলুম সমানে লড়ে যাচ্ছেন। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, “ড্রেসল্যান্ড? নামই তো কখনও শুনিনি! আমাদের আপিস ক্লাবের কস্টিউম আর জুয়েলারি কোত্থেকে আসত জানেন? চিৎপুরের ‘ড্রেস সাপ্লায়ার্স এজেন্সি’ থেকে। নাইনটিন্থ সেঞ্চুরির দোকান, প্রতিষ্ঠাতা ঈশ্বর পঞ্চানন সাঁপুই। অর্ধেন্দু মুস্তাফি, অমর্তলাল বোস, অমর দত্ত, তারাসুন্দরী, নীহারবালা – এঁয়াদের নাম শুনেচেন তো? সেকালের সব বাঘা-বাঘা অ্যাক্টর আর অ্যাকট্রেস। তো পঞ্চানন সাঁপুইয়ের ড্রেস ছাড়া নাকি এঁয়ারা স্টেজেই নাবতে চাইতেন না। যেমন ড্রেস তেমনি জুয়েলারি, তেমনি গোঁপদাড়ি আর পরচুলা। আর আপনি কিনা সেই দোকান ছেড়ে ড্রেসল্যান্ডে গিয়েচেন। এ-হেহেহে, কস্টিউমের ওরা বোজে কী!”
সেন-দম্পতির হাসি ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছিল। সদানন্দবাবু যে-রকম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর মতামত দিচ্ছিলেন, তাতে আর তাঁদের বুঝতে বাকি ছিল না যে, থিয়েটারের মালপত্রের অর্ডার তাঁরা ঠিক-জায়গায় দেননি। তার উপরে আবার ‘ড্রেসল্যান্ড’ সম্পর্কে যে-রকম নাক কুঁচকে তিনি বললেন, ‘কস্টিউমের ওরা বোজে কী,’ বাকি কাজটুকু তাতেই হয়ে গেল। কর্তা-গিন্নি একেবারে চুপসে গেলেন। কালীচরণ সেন মাথা চুলকে বললেন, “বড্ডই ভুল হয়ে গেল দেখছি। কিন্তু এখন তো আর শোধরাবার সময়ও নেই। ড্রেসল্যান্ড থেকে মালপত্র তো সব দিন-পনেরো আগেই এসে গেছে, যারা অভিনয় করবে, তাদের মধ্যে তক্ষুনি-তক্ষুনি সব ডিস্ট্রিবিউটও করা হয়ে গেছে, কী করা যায় বলুন তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী মারা যাবে, এবারকার মতো ওই দিয়েই চালিয়ে নিন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা চালান, কিন্তু সামনের বছর তো ‘নুরজাহান’ করচেন, তখন যেন ভুলটা আবার রিপিট করবেন না। মনে রাকবেন, কস্টিউম আর জুয়েলারির ব্যাপারে ওই ‘ড্রেস সাপ্লায়ার্স এজেন্সিই হচ্ছে লাস্ট ওয়ার্ড।”
কালীচরণ সেনের দিকে তাকিয়ে বন্দনা সেন বললেন, “হাঁ করে শুনছ কী, অ্যাড্রেসটা লিখে নাও, নয়তো সামনের বছরও ফের এই একই ভুল করবে।”
পকেট থেকে কালীচরণ সেন একটা ছোট্ট নোটবই বার করে ফেলেছিলেন। সদানন্দবাবু দরাজ হেসে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, লিকে নিন। ড্রেস সাপ্লায়ার্স এজেন্সি, প্রতিষ্ঠাতা ঈশ্বর পঞ্চানন সাঁপুই, ১৩২/৬৭ লোয়ার চিৎপুর রোড, কলকাতা। ডিরেকশানও দিয়ে দিচ্চি। লালবাজারের খুব কাচে। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট কাট করে খানিকটা এগিয়ে ডান দিকের ফুটপাতে পাঁচ-ছটা বাড়ির পরেই সাঁপুইদের দোকানটা পেয়ে যাবেন।…ও হ্যাঁ, আর-একটা কতা বলি?”
নোটবইটা পকেটে পুরে কালীচরণ সেন বললেন, “বলুন।”
“কস্টিউম আর জুয়েলারি কি আপনারা আউটরাইট কিনে নিয়েচেন, নাকি ভাড়া করে এনেচেন?”
“ভাড়া করে এনেছি। থিয়েটার হয়ে গেলেই ওগুলো আবার ফেরত দিয়ে দেওয়া হবে। ভাড়া বাবদেও অবশ্য টাকা নেহাত কম দিতে হল না।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা দেবেন বই কী। টাকা যখন আচে, তখন দেবেন। তবে হ্যাঁ, একটা কতা বলে রাকাই ভাল। মালপত্তর ফেরত নেবার সময় ওরা কিন্তু খুব বেগড়বাই করবে। বলবে, এটা মিলচে না, সেটা মিলচে না। আপনারা তখন খুব আতান্তরে পড়ে যাবেন, মশাই!”
বন্দনা সেন বললেন, “ওরে বাবা, তাই নাকি?”
“তবে আর বলচি কী,” সদানন্দবাবু বললেন, “পঞ্চানন সাঁপুইয়ের মেয়ের ঘরের নাতি মহানন্দই তো এখন তার দাদামশাইয়ের দোকান চালায়, তা সেও একবার আমাদের ঘোর ঝঞ্ঝাটে ফেলে দিয়েছিল। এক ছড়া পুঁতির মালার হিসেব কিছুতেই মেলানো যাচ্ছিল না। তো মহানন্দ বলে বসল যে, ওটা খুব রেয়ার জিনিস, তিব্বত ছাড়া আর কোতাও নাকি পাওয়া যায় না। স্রেফ ওই পুঁতির মালার জন্যে মহানন্দ কত দাম হেঁকেছিল জানেন?”
কালীচরণ সেন ঢোক গিলে বললেন, “কত?”
“সাড়ে সাতশো টাকা। তাও বলে কিনা সে এক পয়সাও লাভ না-রেকে স্রেফ যাতায়াতের খর্চা নিচ্চে। নাকি তাকে ফের টিবেটে গিয়ে ওই রকমের এক ছড়া মালা জোগাড় করতে হবে। বুজুন ব্যাপার!”
“সাড়ে সাতশোই দিতে হল?”
সদানন্দবাবু হেসে বললেন, “শেষপর্যন্ত তেত্রিশ টাকায় দাঁড় করাই। কিন্তু তার জন্যে যা ঝুলোঝুলি করতে হয়েছিল, সে আর কহতব্য নয়। সাবধান থাকবেন, মশাই। মালপত্তর যা নেবেন, গুনে নেবেন।”
বন্দনা সেন তাঁর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “গুনে নিয়েছিলে?”
“কখন নেব? আমার এত সময় কোথায়?” সদানন্দবাবুর কথা শুনে কালীচরণ সেন ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। বললেন, “ড্রেসল্যান্ড থেকে ট্রাকে করে মাল আসতে-না-আসতেই তো যারা অ্যাকটিং করবে, তাদের মধ্যে হাতে-হাতে সব বিলি হয়ে গেল। আমিও তো আমার যা-যা লাগবে সব নিয়ে নিলুম।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আপনিও কি নাববেন নাকি?”
“নামতেই হল। এরা ছাড়ল না।”
“কোন রোলটা করচেন? চন্দ্রগুপ্ত?”
“না না, চাণক্য। বয়েস হয়ে গেছে না? এখন কি আর বুড়োর রোল ছাড়া মানায়?” কালীচরণ সেন হেসে বললেন, “তো যে-কথা হচ্ছিল। আপনি তো আমাকে ঘোর চিন্তায় ফেলে দিলেন। যে-সব কস্টিউম এসেছে, এখন ফাংশাটা হয়ে যাবার পর সে-সব আবার আইটেম-বাই-আইটেম ফেরত দিতে হবে। মহা মুশকিল হল দেখছি। একটা আইটেমও যদি খোয়া যায় তো আমাকেই গাঁটগচ্চা দিতে হবে। পুঁতির মালাও তো কম আসেনি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তার মধ্যে একটা মালাও যদি খোয়া যায়, তো বলবে যে, সেটা তিব্বত ছাড়া আর কোতাও পাওয়া যায় না। এখন তো আবার চট করে নাকি টিবেটে যাওয়ার উপায় নেই। আর তা ছাড়া সেখেনে যাতায়াতের খর্চাও অনেক বেড়ে গেচে। কোন না দু-পাঁচ হাজার হেঁকে বসবে।”
কালীচরণ সেন আর কিছু বললেন না। বুঝলুম তিনি খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন।
কথা ছিল, টাউনশিপের কাজকর্মগুলো একটু ঘুরে দেখবার পরে সেনমশাই আমাদের একবার নদীর ধার থেকে ঘুরিয়ে আনবেন, সেখানকার দৃশ্য নাকি খুব সুন্দর। কিন্তু সন্ধে হয়ে গিয়েছিল বলে তাও আর যাওয়া হল না। পৌনে সাতটায় আমাদের গেস্ট হাউসে নামিয়ে দিয়ে সেন-দম্পতি তাঁদের বাংলোর দিকে চলে গেলেন।
দু’জন বেয়ারা ডাইনিং হলে বসে গল্প করছিল। আমরা গিয়ে ভিতরে ঢুকতেই তারা সেলাম ঠুকে উঠে দাঁড়াল। একজন একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “সাব, আপনারা রাত্তিরে কী খাবেন, বলে দিয়েছেন তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো দুপুরেই জানিয়ে দিয়েছি। ভাত, ডাল সবজি আর মাছ।….ও হ্যাঁ, খানকয়েক রুটিও কোরো।” বলে সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে, “ওটা আপনার জন্যেই বললুম। আপনি তো আবার রাত্তিরে ভাত খান না।”
বেয়ারাটি একটু কুণ্ঠিতভাবে বলল, “বাজারে এ-বেলা মাছ পাইনি, সাব। কুককে কি ডিমের কারি করতে বলব, নাকি চিকেন খাবেন?”
“কোনওটাতেই আমাদের আপত্তি নেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন কি চা করতে কোনও অসুবিধে আছে?”
“কিচ্ছু অসুবিধে নেই, সাব। চা কি আপনারা ডাইনিং হলে খাবেন, নাকি উপরে পাঠিয়ে দেব?”
“চারজনের মতন চা চাই। এই ধরো সওয়া-সাতটা নাগাদ উপরে পাঠিয়ে দিয়ো।”
বেয়ারাটি সেলাম ঠুকে কিচেনের দিকে চলে গেল। আমরা উপরে উঠে এলুম।
উপরে উঠে ভাদুড়িমশাই তাঁর ঘরের দিকে পা বাড়াচ্ছিলেন, সদানন্দবাবু বললেন, “একটু দাঁড়ান মশাই, একটা কতা জিজ্ঞেস করব?”
“করুন।”
“আপনি কাউকে এখেনে আসতে বলেচেন?”
“তা বলেছি। নইলে আর চারজনের জন্যে চা পাঠাতে বলব কেন?”
“কে আসচেন জানতে পারি?”
“এলেই জানতে পারবেন।” ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “পাঁচ-সাতটা মিনিট একটু ধৈর্য ধরে থাকুন তো….নিন, আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না। বিস্তর ঘোরাঘুরি হয়েছে, চোখেমুখে জল ছিটিয়ে নিন। একটু বাদেই চা এসে যাবে।”
কথা শেষ করে ভাদুড়িমশাই আর দাঁড়ালেন না। পর্দা ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন।
আমরাও আমাদের ঘরে ঢুকলুম। তারপর মুখহাত ধুয়ে যখন বারান্দায় এসে বসলুম, ঘড়িতে তখন ঠিক সাতটাই বাজে। মিনিটখানেক বাদে ভাদুড়িমশাই বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। মুখ দেখলুম থমথম করছে। একটা সোফায় বসে, ধীরেসুস্থে একটা সিগারেট ধরিয়ে একগাল ধোঁয়া ছেড়ে, সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবারে বরং আমিই আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। কস্টিউম আর জুয়েলারি নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কেন? ড্রেস আর গয়নাগাঁটির সাপ্পাই কারা দেবে, সেটা তো এদের ব্যাপার। ড্রেসল্যান্ড যদি দেয় তো দিক না, তাতে আপনার কী এল গেল? অথচ আপনি দেখলুম কী একটা দোকানের হয়ে…”
সদানন্দবাবু বললেন, “কী একটা দোকান নয় মশাই, চিৎপুরের ড্রেস সাপ্লায়ার্স এজেন্সি, এস্টাব্লিশড ইন এইট্রিন নাইন্টিথ্রি। ঈশ্বর পঞ্চানন সাঁপুইয়ের দোকান। দি লাস্ট ওয়ার্ড ইন ড্রেস সাপলাই বিজনেস।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি ধরেই নিচ্ছি যে, ওটা একটা দারুণ দোকান। কিন্তু তাই বলে আপনি ওদের হয়ে অমন ওকালতি করতে গেলেন কেন? কোনও দরকার ছিল?”
“বাঃ, ছিল না?” সদানন্দবাবু ফুঁসে উঠে বললেন, “কালীচরণ সেনের কতাটা একবার ভাবুন দিকি। কোত্থেকে কোন এক পণ্ডিতকে ধরে এনেচেন, সে এসে কী সব বুজিয়ে দিয়ে গেচে, আর তাইতেই ওঁয়ার ধারণা হয়েছে যে, হিস্টোরিক্যাল প্লে’র ব্যাপারে উনি একজন এক্সপার্ট! কী-রকম এয়ার নিয়ে কতা কইচিলেন, দেকলেন তো। আরে বাবা, সিমেন্ট বানাতে এয়েচিস, তো সেইটেই ঠিক করে বানা, নাটকের ব্যাপারে অত কতা বলতে যাস কেন? আর তা যদি বলিস, তো আমিই বা কেন ছেড়ে কতা কইব। আমি তো তক্কে তক্কে ছিলুম মশাই। যেই না, ‘ড্রেসল্যান্ড’-এর নাম করেচে, আমিও অমনি নাকে ঝামা ঘষে দিইচি। এখন আপনিই বলুন, দরকার ছিল না?”
ভাদুড়িমশাইয়ের মুখ থেকে গাম্ভীর্যের মুখোশটা খসে পড়েছিল। তিনি হাসছিলেন। হাসতে হাসতেই বললেন, “সত্যি আপনি পারেনও বটে। সাঁপুইয়ের বোমাটা একেবারে মোক্ষম সময়েই ঝেড়ে দিয়েছিলেন। তার উপরে আবার টিবেটের মালা! কালীচরণ একেবারে স্পিকটি নট। তা আপনার স্টকে এইরকমের বোমা নিশ্চয় আরও কিছু আছে?”
সদানন্দবাবুর জবাবটা শোনা হল না। কেননা, বেয়ারা ঠিক সেই মুহূর্তে এসে জানাল যে, পলাশডাঙা থানার ছোট-দারোগাবাবু আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
