অলক্ষ্মীর গয়না (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ছয়
রাত দশটা বাজল খাওয়া-দাওয়া সেরে নিতে। জয়গোপালবাবু আজ অনেকক্ষণ আড্ডা দিলেন এ-ঘরে। তারপর হাই তুলে শুভরাত্রি জানিয়ে শুতে গেলেন। ডাঃ ঢোল রাজাবাহাদুরকে ঘুমের ইঞ্জেকশান দিয়ে থাকবেন সম্ভবত। আজ আর ওপরে কাল রাতের মতো রাজাবাহাদুরের চ্যাঁচামেচি শুনতে পেলুম না। রাত সাড়ে এগারোটায় আমাকে চমকে দিয়ে হলঘরের দরজায় টোকা বাজল ঠক-ঠক-ঠক। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, দরজা খোলো জয়ন্ত!
উনি শোননি। টেবিল ল্যাম্পের কাছে বসে চুরুট টানছিলেন। রিভলভার হাতে দরজা ভয়ে-ভয়ে খুলতেই ডাঃ ঢোল ঢুকে পড়লেন। মুখে উত্তেজনার ছাপ।
কর্নেল বললেন, -খবর?
খুব ভালো। তবে রাঘব হেল্প না করলে পারতুম না। –ডাঃ ঢোল চাপাস্বরে বললেন, আপনি বললে-ওর হেল্প চাইতে সাহসই পেতুম না। দেখলুম ওর মাসতুতো দাদার ওই দশার জন্য ম্যানেজারবাবুর ওপর ভীষণ রাগ। এতদিন প্রকাশ করার সুযোগ পায়নি লোকটা।
–হুঁ–কুকুরটা এখন কোথায় ঘুমুচ্ছে?
হলঘরের সিঁড়িতে।
–অন্যটা?
ওর মাথার কাছে বসে আছে। মাঝে-মাঝে স্যাঙাতের গা শুঁকছে। ডাঃ ঢোল চুপিচুপি হাসলেন, আমার কিন্তু বড় আনন্দ হচ্ছে, কর্নেল! জীবনে এমন সাংঘাতিক কাজ কখনও করতে পারিনি। তবে এও সত্যি, আপনারই বুদ্ধি আর প্রেরণা ছাড়া কি পারতুম? কক্ষনও না। –রাজাবাহাদুরের খবর কী?
-জয়গোপালবাবুর তাগিদ। না অ্যাটেন্ড করে উপায় আছে? তবে আপনার কথামতো ঘুমের বদলে নার্ভ স্ট্রং করার জন্য একটা ইঞ্জেকশান দিয়েছি। আসলে ওঁর নার্ভের চাপে ওই অনিদ্রা আর অস্বস্তির ব্যাধি। এ থেকেই তো সিজোফ্রেনিয়া ডেভলাপ করে। এখন সবে ফাস্ট স্টেপ চলছে।
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, –জয়গোপালবাবু আপনাকে দিয়ে সাব্যস্ত করতে চেয়েছিলেন প্রফেসর তানাচা দৈবাৎ খুন হয়ে গেলে, হত্যাকারীর দায়িত্ব যাবে রাজাবাহাদুরের ঘাড়ে। কারণ রাতে ওঁর সেন্স থাকে না। কী করেন টের পান না। কাজেই…
-রাইট, সেন্ট পার্সেন্ট রাইট। আপনি ইশারা না দিলে তো আমি বেঁকের মাথায় রাজাবাহাদুরকেই প্রায় দায়ী করে বসেছিলুম!
কর্নেল চোখ বুজে একটা একটু দুলতে-দুলতে বললেন, রাজাবাহাদুরের বয়স প্রায় সত্তরের ওপরে। নিঃসন্তান বিপত্নীক মানুষ। এত বড়ো বাড়িতে আগের মতো লোকজন নেই। প্রায় খাঁ-খা অবস্থা। এই পরিবেশে অলক্ষ্মীর ভূতুড়ে ক্রিয়াকলাপ শুরু হলে নার্ভের অসুখ হতে বাধ্য। কিন্তু তিনি বুদ্ধিমান মানুষও। তাই মূল ব্যাপারটা ধরতে পেরেছিলেন। ভয় পাননি। তাই মরিয়া হয়ে জয়গোপালবাবু আপনার সাহায্য নিয়ে ওঁকে রাতে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চাইছেন–যাতে ব্রজনাথের কবচ খুঁজে বের করা যায়।
চুপ করে থাকা গেল না। বললুম, –কিন্তু কবচ তো প্রফেসর তানাচার কাছে ছিল। ওঁর ঘর থেকে চুরি গিয়েছিল সেটা।
কর্নেল বললেন, -মনে করে দ্যাখো জয়ন্ত। কলকাতায় আমার ঘরে আমি চুরির প্রশ্ন তুলতেই প্রফেসর তানাচা উদভ্রান্তের মতো সর্বনাশ! ঠাকুরদার কবচটা বলে বেরিয়ে যান। চুরি যে হয়েছে, সেটা কিন্তু বলেননি। ঠাকুরদার কবচটা চুরি গেছে কি না, সেটা দেখতেই ছুটে গিয়েছিলেন।
ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে বললুম, -কী আছে কবচে যে তাই নিয়ে এত কাণ্ড?
কর্নেল চাপাগলায় বলতে শুরু করলেন, -সতেরো শতকে দুর্ধর্ষ রাজা শিবেন্দ্রনারায়ণ শুধু অলক্ষ্মীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেননি, তার জন্য গয়নাও বানিয়েছিলেন। লক্ষ টাকা দামের হিরের গয়না। তার মৃত্যুর পর সেই গয়না তার ছেলে নরেন্দ্রনারায়ণ খুলে এনে রাজবাড়িতে রাখেন। কিন্তু অলক্ষ্মীর গয়না খুলে আনার পর নাকি দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। মানুষের কুসংস্কারের এই রীতি। শেষে গয়নাটা কোথাও পুঁতে রাখা হয়। এর সন্ধান জানতে পেরেছিলেন ব্রজনাথ চাটুজ্জে-রাজবাড়ির নায়েব। কিন্তু তার সাহস হয়নি ওটা উদ্ধার করতে। তাই এক টুকরো কাগজে সেটা লিখে কবচের মধ্যে রেখেছিলেন। মৃত্যুর সময় বলে যান, আমার বংশধরদের কারুর সাহস থাকলে এই কবচ যেন খুলে দেখে। কুসংস্কার বড়ো জটিল ব্যাধি, জয়ন্ত! তার নাতি প্রফেসর তানাচা এর গুরুত্ব বুঝতেন। কিন্তু খুলে দেখার সাহস ছিল না। যাই হোক, কুলকারিকা বইতে এ-বিষয়ে কিছু আভাস আছে। রাজাবাহাদুর আমাকে সব খুলে বলেছেন। জয়গোপালবাবু সেই কবচের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মির্জাপুরের মেসবাড়ির প্রফেসর তানাচার ঘরে সেটা খুঁজে না পেয়ে উনি ফাঁদ পাতেন। অলক্ষ্মীর কাছে দোসরা অক্টোবর রাত দশটায় প্রফেসর তানাচাকে হাজির থাকতে বলেন। লোভ দেখান, কথামতো কাজ করলে উনি টাকা পাবেন।
-কীভাবে জানলেন?
প্রফেসর তানাচার বুকপকেটে জয়গোপালবাবুর চিঠি ছিল।
–হ্যাঁ মনে পড়েছে। আপনি ওঁর পকেট থেকে একটা খাম বের করে নিয়েছিলেন।
–আমরা যে ওখানে ঠিক ওই সময় ওত পাতব, জয়গোপালবাবু জানতেন না। তাই তাড়াতাড়িতে বাকি কাজ করতে পারেননি। কিন্তু আমাদের ভুল হল। দুজনেই চলে এলুম। তবে নেলপালিশের শিশিটা পালাতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল। আর খুঁজে পাননি। খুঁজতে গিয়েও আমাদের দেখে কেটে পড়েন।
মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিল। বললুম, –সে রাতে অলক্ষ্মীর মন্দিরে আমরা তো শুধু প্রফেসর তানাচাকে দেখেছিলুম। জয়গোপালবাবু থাকলে টর্চের আলোয় তাকেও দেখতে পেতুম না কি?
জয়ন্ত, জ্যোৎস্নারাতে সিংহাসনে উপবিষ্ট অলক্ষ্মী দেবীর কোলে কেউ বসে থাকলে চোখে পড় কঠিন। প্রফেসর তানাচাও টের পাননি। কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন। চুরুটটা নিভে গিয়েছিল ফের ধরিয়ে নিলেন। বাইরে কুয়াশামাখা জ্যোৎস্নায় সেই অলুক্ষুণে পাচাটা ক্রাও-ক্রাও করে ডাকতে-ডাকতে উড়ে গেল। তারপর দুরে নদীর ওদিকে শেয়াল ডাকতে লাগল। অজানা ভয় আমার গা ছমছম করে উঠল।
বললুম, –তাহলে ইস্কাপনের টেক্কা কে?
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, –সেটা আজ রাতেই জানতে পারবে, জয়ন্ত। অধীর হয়োত
তারপর উনি হঠাৎ হলঘরের দরজায় বেরুলেন। একটু পরে ফিরে এলেন প্রকাণ্ড একজো গামবুট নিয়ে। এমন পেল্লায় গড়নের কালো গামবুট কস্মিনকালে দেখিনি। এ কি মানুষের পো জন্য তৈরি, না দানবের?
অবাক হয়ে বললুম, ওরে বাবা! এ কি দত্যিদানোর পায়ের গামবুট?
ডাঃ ঢোল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলেন। তিনিও শিউরে উঠে বললেন, –এই গামবুট পরেই রাজবাড়ির অশরীরী ঘুরে বেড়ায় সারা রাত। হুঁ, যাই বলুন কর্নেল, রাজবাড়ির ভূতপ্রেতগুলোও মানসিক রুগি। নইলে কে কবে শুনেছে, ভূত গামবুট পরে ঘুরে বেড়ায় ধুপ-ধুপ করে?
কর্নেল বললেন, -ভূত নয়, ডাক্তার ঢোল। মানুষই পরে বেড়ায়। বিশেষ অর্ডার দিয়ে তৈরি এই গামবুট লোকটাকে প্রাণের দায়ে পরতে হয় এবং মনিবের হুকুমমতো রাতবিরেতে ঘুরে বেড়াতে হয় হাতি-ভূত সেজে।
ডাঃ ঢোল এবং আমি একসঙ্গে বললুম, -কে সে?
আবার কে? রাঘব। কর্নেল একটু হেসে বললেন, আজ ইচ্ছে করেই বেচারি এদুটো সিঁড়ির তলায় রেখেছিল, যাতে আমাদের নজরে পড়ে। রাঘব আর মনিবের হুকুম মানতে চাইছে না। আমাদের দেখে ও সাহসী হয়ে উঠেছে।
.
দেড় ঘণ্টা সময় আর কাটতে চায় না। ডাঃ ঢোলকে দেখলুম চেয়ারে লম্বা হয়ে ঢুলছেন। কর্নেল চোখ বুজে ধ্যানস্থ। টেবিল ল্যাম্প নিবিয়ে দেওয়া হয়েছে। হলঘরের ঘড়িতে ঢঙাস-ঢঙাস বিদঘুটে শব্দে দুটো বাজলে কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, -জয়ন্ত! এসো। ডাক্তার ঢোল! চলে আসুন। এ রাতে রাস্তা ক্লিয়ার।
ডাঃ ঢোল চোখ মুছতে-মুছতে উঠলেন। আস্তে দরজা খুলে আমরা বেরুলুম। হলঘরে আলো। নেই। ওপরের বারান্দায় টিমটিমে বালব জ্বলছে সিঁড়িতে বিশাল কুকুরটা নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছ। তাকে ডিঙিয়ে আমরা ওপরে গেলুম। তারপর দেখি, জয়গোপালবাবুর অন্য কুকুরটা রাজার্বাহাদুরের ঘরের দরজায় সামনের একটা ঠ্যাং তুলে অন্য ঠ্যাং দিয়ে ঠুকঠুক করে ঘা দিচ্ছে। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, –কেমন ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে দেখছ তো? ডোবারম্যান পিঞ্চারটা ওকে পাহারা দিত। আনাচে-কানাচে কেউ এসে রহস্যটা ধরে ফেলবে, তার জো ছিল না। তেড়ে যেত আগে থাকতে। অ্যালসেশিয়ানটাকেও দরজায় টোকা দেওয়া শেখানো হয়েছিল। টোকা দিয়ে নিঃশব্দে গা-ঢাকা দিত। ওই দ্যাখো, লাব্রাডর রিট্রিভার জাতের কুকুরটাও কেমন লুকিয়ে পড়ল। চলে এসো–ও এখন কী করবে দেখা যাক।
বারান্দা পূর্বে ঘুরে গেছে। বড়ো-বড়ো থাম রয়েছে। দেখলুম, একটা ঘরের দরজা ঠেলে কুকুরটা ঢুকে পড়ল। তারপর সেই শব্দটা হল–ঝনঝনঝনাত। কর্নেল বললেন, –ওটা কিচেন। থালাটা ছুঁড়ে ফেলে তক্ষুনি কুড়িয়ে যথাস্থানে রাখবে। ওই দ্যাখো, কেমন গোবেচারার মতো বেরিয়ে আসছে এবার।
কুকুরটা আমাদের দেখে দৌড়ে এল। আমি আঁতকে উঠেছিলুম তাকে আসতে দেখে। ডাঃ ঢোল সটান আমার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু কুকুরটা আমাদের প্রত্যেকের পা শুঁকে নিঃশব্দে চলে গেল অন্যদিকে। আমরা বারান্দা দিয়ে ঘুরে উত্তর-পূর্ব কোণে পৌঁছলুম। কর্নেল ডাঃ ঢোলকে টেনে নিয়ে থামের আড়ালে ওত পাতলেন। আমি শেষ ঘরটার সামনে গিয়ে দুরুদুরু বুকে দাঁড়ালুম। পকেটে হাত ভরে রিভলভারের বাঁটটা চেপে ধরলুম। তারপর পরদা তুলে দেখলুম, দরজা বন্ধ। ভেতরে কারা খুব চাপাগলায় কথা বলছে। একটু পরে বুঝলুম, তর্কাতর্কি চলেছে। কপাটের ফাঁকে কান পাতলুম। ভেতর থেকে ওইসব কথাবার্তা স্পষ্ট ভেসে আসছিল।
-তুমি আগাগোড়া সব ফাঁস করেছ রাজাবাহাদুরের কাছে। তোমাকে আমি অলক্ষ্মীর থানে আসতে বলেছি, তাও বলে দিয়েছ। নইলে রাজাবাহাদুর ওই ঘুঘুদুটোকে কেন ওসময় ওখানে পাঠাবেন। জানবেন কীভাবে বলো?
বেশ করেছি। কেন তুমি আমার কবচ চুরি করতে চেয়েছিল, তার জবাব আগে দাও।
–কবচ নিশ্চয়ই তুমি রাজাবাহাদুরের কাছে রেখেছ। যদি…
–বেশ করেছি।
চমকে উঠলুম। এ কী! এ যে প্রফেসর তানাচার গলা। মনে পড়ে গেল, জনাই-পাগলা বলেছিল-মড়া পাইলে গেছে! প্রফেসর তানাচার মড়া দেখছি সত্যি পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যদি মড়া হবে, তাহলে কথা বলছে কেমন করে? হতবুদ্ধি হয়ে শুনতে থাকলুম। …
–তাহলে তোমাকে আর বাঁচানো গেল না, তারাদা। ডনের পেটেই তোমাকে পাঠিয়ে দিই। ডনকে দেখেছ তো? কতবড় হাঁ তার।
-আরে যাও-যাও। কবচটা যাও বা দিতুম, আর দেব না।
–পাঁচশো টাকা পাবে তারাদা।
–বিনিপয়সায় দিতুম। আমাকে তুমি অলক্ষ্মীর ওখানে যেতে বললে, গেলুম। অজ্ঞান করলে কেন? তাও না হয় করলে, মারা তো পড়িনি–কিন্তু অজ্ঞান অবস্থায় হাত-পা বেঁধে এ-ঘরে এনে রাখলে। ভালোমন্দ খেতে দিলে। তাই চুপ করে লুকিয়ে রইলাম। কিন্তু আমার আফিংয়ের গুলি? রাত দুটো অব্দি একগুলি আফিং পেলুম না। এখন এসে কবচ চাইছ। ইস! ওরে আমার চাঁদ রে!
–তারাদা, এবার কিন্তু আমি মরিয়া। হাতে কী দেখছ?
–সর্বনাশ! তুমি আমাকে ছু-ছু-ছুরি দেখাচ্ছ? আমি এবার চেঁচাব বলে দিচ্ছি।
–চেঁচাবার আগেই তোমার হার্টে ঢুকে যাবে ছুরি। কেমন ধারাল হয়ে আছে দেখছ তো?
–ওঃ কী বুদু আমি! টাকার লোভে তোমার ফাঁদে পা দিলুম গো! আমার মরণ হয় না কেন?
-ন্যাকামি রাখো! ওঠো তারাদা। রাজাবাহাদুরকে ইঞ্জেকশান দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। ওঁর ঘরে গিয়ে কোথায় কবচ আছে, বের করে দাও। চলো! দেরি হয়ে যাচ্ছে।
–তুমি খোঁজোগে। আমি কি জানি কোথায় রেখেছেন উনি? তাছাড়া ওঁর ঘরের দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ।
–সামনেকার দরজা বন্ধ। ওপাশের দরজা ভেজানো আছে।
–হিঃ হিঃ হিঃ! তোমার বুদ্ধি আছে গোপাল। রাঘবব্যাটাকেও বশ করে ফেলেছ দেখছি।
–ওঠো! দেরি হয়ে যাছে।
–বেশ। যাচ্ছি। কিন্তু পাঁচশো টাকা দেবে বলেছ। হাতে-হাতে চাই বলে দিচ্ছি।
–এই দ্যাখো পাঁচখানা একশো টাকার নোট। দেখতে পাচ্ছ?
–জাল নোট নয় তো গোপাল? তোমাকে বিশ্বাস হয় না। তুমি আমায় যা ভোগাচ্ছ।
–আঃ। চলো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
পায়ের শব্দ শুনে সরে এলুম। থামের আড়ালে কর্নেল ইশারা করছিলেন। ওঁদের কাছে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে পড়লুম। দরজা খুলে প্রথমে বেরুলেন জয়গোপালবাবু, তার পেছনে প্রফেসর তানাচা। স্পষ্ট দেখলুম, ওঁর নাকের তলায় সেই রক্তের ছোপ-উঁহু, নেলপালিশের রং লেগে রয়েছে। বারান্দা ঘুরে রাজাবাহাদুরের ঘরের দিকে ওঁরা চলে গেলে আমরা নিঃশব্দে উঠে পড়লুম। দুজনকে আর দেখা গেল না। পাশের কোনও ঘর দিয়ে রাজাবাহাদুরের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে বুঝি।
রাজাবাহাদুরের ঘরের সামনে যেই গেছি, দরজা খুলে রাজাবাহাদুর হাসিমুখে বেরুলেন। পরনে রাতের পোশাক। ফিসফিস করে বললেন, -রেডি থাকুন। ওরা ঘরে ঢুকে আমাকে দেখতে পাবে না। ভড়কে যাবে।
আমরা ওত পাতলুম ফের। ঘরে আলো জ্বলে উঠল। তারপর ঘরের ভেতর থেকে ওদের কথা শোনা গেল।
–আরে! রাজাবাহাদুর কোথায়?
বাথরুমে ঢুকেছেন।
–অসম্ভব। রাত দুটোয় আমার আসার কথা নিশ্চয়ই ফাস করে দিয়েছ। তাই রাজাবাহাদুর অন্য ঘরে শুয়েছেন। তা যা করেছ, করেছ। কবচটা বের করো।
-কবচটা বালিশের তলায় রেখেছিলেন সেদিন। ..উঁহু। নেই দেখছি।
রাজাবাহাদুর নিঃশব্দে হেসে পকেট থেকে কালো সুতোয় বাঁধা প্রকাণ্ড একটা কবচ বের করে আমাদের দেখালেন। ভেতরে ওদের কথা ফের শোনা গেল। –চালাকি? বের করো খুঁজে। নইলে…
-ওরে বাবা। মরে যাব! মরে যাব। এই! কী হচ্ছে! বাবা যে! রাজাবাহাদুর! বাঁচান! বাঁচান!
প্রথমে রাজাবাহাদুর হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে গেলেন। আমরাও ঢুলুম। উজ্জ্বল আলোয় দুই মূর্তি ব্ল্যাকবোর্ডে খড়ি দিয়ে আঁকা স্কেচের মতো ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল। তারপর প্রফেসর তানাচা গুলতির বেগে ছিটকে আমাদের পেছনে চলে এলেন। রাজাবাহাদুর কবচটা জয়গোপালবাবুর মুখের সামনে নেড়ে মুখ ভেংচে বললেন, -কবচ নেবে? কবচ? তুমি বরখাস্ত। এতদিন ধরে ভোগাচ্ছ। কবে ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দিতুম। সাহস পাইনি, তাই। যাও, কেটে পড়ো রাজবাড়ি থেকে।
জয়গোপালবাবু হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়লেন ছোরা তুলে ডাঃ ঢোলের ওপর–তবে রে নেমকহারাম বলে এক চিকুর ছেড়ে। ভয়ে চোখ বুজলুম। তারপর ধস্তাধস্তি শুনে চোখ খুলে দেখি, জয়গোপালবাবুকে ধরাশায়ী করে আমার বৃদ্ধ বন্ধু তার বুকে বসে ছোরা ধরা হাতটা মোচড়াচ্ছেন। ছোরাটা পড়ে যেতেই রাজাবাহাদুর কুড়িয়ে নিলেন। ধার পরীক্ষা করে বললেন, –শান দিয়েছে, বুঝলেন মশাই? হুঁ–তাই অস্ত্রাগারের একটা ছোরা বেমালুম উড়ে গিয়েছিল! রোসো, থানায় ফোন করে পুলিশ ডাকি।
রাজাবাহাদুর পালঙ্কের পাশে গিয়ে ফোন তুলে ডায়াল করতে থাকলেন। কর্নেল জয়গোপালবাবুর বুক থেকে উঠে দাঁড়ালেন। জয়গোপালবাবু ফেস-ফোঁস করে শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলছেন। গোয়েন্দাপ্রবরের ওজন বুড়ো হাড়ের দরুন এক কুইন্টাল মতো হবে! ডাঃ ঢোল কাঁপতে-কাঁপতে বললেন, –সর্বনাশ! এ যে সাংঘাতিক খুনে লোক! কর্নেল খপ করে না ধরলে ছোরাটা..বাপস! ভাবা যায় না! সত্যি ভাবা যায় না! ও কর্নেল! এই ভদ্রলোকেরই দেখছি সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে। ইনিই ডাক্তার জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড!
রাজাবাহাদুর ফোন করে এসে বললেন, –থামুন মশাই! আপনি তো আমাকেই জেকিলহাইডের রোগ ধরিয়ে দিচ্ছিলেন।
কর্নেল শক্তগলায় বললেন, –জয়গোপালবাবু! পালানোর মতলব করবেন না কিন্তু। তারপর পকেট থেকে নিজের খুদে অথচ সাংঘাতিক পিস্তলটি বের করে ওঁর নাকের ডগায় ধরলেন। –ভালোছেলের মতো চুপচাপ বসে থাকুন। রাজাবাহাদুর! পুলিশ কী বলল!
-বলল, এক্ষুনি এসে পড়ছি, মিনিট-পাঁচেকের মধ্যে।
প্রফেসর তানাচা এতক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলেন। এবার বললেন, –আচ্ছা, আপনারা কি মনে করেন এই গোপলা হতচ্ছাড়া আমাকেও খুন করে ফেলত?
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -হা, কবচ না পেলেই করত। কারণ, আপনি ওর কীর্তিকলাপ সব জানেন। আপনাকে এরপরও বাঁচিয়ে রাখলে রাজবাড়িতে জয়গোপালবাবুর থাকা খুব রিস্কি হতো।
প্রফেসর তানাচা ঢোক গিলে ভয়ার্ত স্বরে বললেন, ওরে বাবা! তাহলে ওর কথায় রাজি হয়ে ভুল করেছিলুম। আপনার মুখে চুরির কথা শুনেই খেয়াল হয়েছিল, কবচটা যদি চুরি না যায়, তাহলে কোনও নিরাপদ জায়গায় রেখে আসব। সেনবাড়িতে গিয়ে দেখলুম, চুরি যায়নি চোর খুঁজে পায়নি। তখন সেই দিনই লোহাগড়া চলে এলুম। এসেই চুপিচুপি রাজবাড়ি ঢুকে রাজাবাহাদুরের জিম্মায় রেখে কলকাতা ফিরে গেলুম। দিন-দুই পরে হঠাৎ এই গোপলা হতচ্ছাড়ার চিঠি পেলুম।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ, চিঠিটা আপনার পকেটে ছিল। এই দেখুন, এখন আমার কাছে।
খামটা দেখে প্রফেসর তানাচা বললেন, –আপনি স্যার সত্যি মহা ঘু… জিভ কেটে উনি থেমে গেলেন।
কর্নেল হাসলেন। সবাই আমাকে ঘুঘুমশাই বলে প্রফেসর তানাচা! এতে লজ্জার কারণ নেই আপনার।
প্রফেসর তানাচা বললেন, আমাকে গোপলা অজ্ঞান করে ওঘরে এনে গুম করে রাখবে কি জানতুম?
রাজাবাহাদুর ভেংচি কেটে বললেন, -ন্যাকা! গোমুখ! অ্যাফিংগোর কোথাকার!
আহা! আমি তো চিঠি পেয়ে ফের এসে আপনাকে জানিয়ে দিলাম। আমার কী দোষ?–প্রফেসর তানাচা করুণমুখে বললেন।
রাজাবাহাদুর খাপ্পা হয়ে বললেন, –তোমায় বলেছিলুম, অলক্ষ্মীর থানে যাওয়ার সময় ইস্কাপনের টেক্কা কালো সুতো দিয়ে বেঁধে গলায় লটকে নিও। ফেলে দিয়েছিলে কেন? কর্নেল না খুঁজে পেলে টেক্কাটা গচ্চা যেত না?
অলক্ষ্মীর চত্বরে উঠে সবে গলায় লটকাতে যাচ্ছি, হঠাৎ আমার নাকে…প্রকাণ্ড আয়নার দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন প্রফেসর তানাচা, ইস। দেখছ নাকের তলায় কী লাগিয়ে দিয়েছে গোপলা? ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা! রুমাল বের করে উনি রগড়াতে শুরু করলেন।
রাজাবাহাদুর দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, –সত্যি-সত্যি রক্ত বের করো না রগড়াতে গিয়ে। যা কাণ্ড চলছে, রক্তারক্তি হলেই বিপদ। একটা কিছু হলে সব দোষ আমার ঘাড়ে এসে পড়বে।
কর্নেল বললেন, –ঠিক তাই হতে যাচ্ছিল রাজাবাহাদুর। এ-ঘরে প্রফেসর তানাচাকে জয়গোপালবাবু খুন করে ফেলত। আপনাকে দায়ী করাও সহজ হতো। ডাঃ ঢোল অতশত না বুঝেই সিজোফ্রেনিক রোগী বলে সাক্ষ্য দিতেন আদালতে। এসব রোগী রাতের বেলায় যা কিছু করে, নিজে টের পায় না। অতএব আপনি নিজের অজ্ঞাতসারে খুন করেছেন বলে সাব্যস্ত হতো। তার ওপর ডাঃ ঢোলের ওপর খাপ্পা হয়ে আপনি বলেছিলেন, আমার খুন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। ডাঃ ঢোল সে কথাও বলতেন আদালতে।
রাজাবাহাদুর ফিক করে হাসলেন। ডাঃ ঢোলকে বললেন, –বলতেন নাকি মশাই?
ডাঃ ঢোল অপ্রস্তুত হাসলেন শুধু। আমি ওঁদের কথাবার্তা শুনছিলুম চুপচাপ। এতক্ষণে আমার মগজের ধুলোবালি যেন সাফ হয়ে গেল। না বলে পারলুম না, -কর্নেল! ইস্কাপনের টেক্কা কে বুঝতে পেরেছি।
কর্নেল বললেন, -আগেই বোঝা উচিত ছিল দ্বিতীয় চিঠির ভাষা দেখে। রাজাবাহাদুরের কথা বলার ভঙ্গি ওটার ছত্রে-ছত্রে স্পষ্ট।
হতভম্ব হয়ে বললুম, –শুধু একটা ধাঁধা থেকে যাচ্ছে। রাত দুটোয় ওঘরে এমন নাটক হবে, গতকাল রাতেই কীভাবে জানলেন রাজাবাহাদুর?
আমার প্রশ্ন শুনে রাজাবাহাদুর চোখ নাচিয়ে বললেন, জয়গোপালের প্ল্যানের কথা রাঘব সবই জানত যে মশাই! রাঘবকে ও বলেছিল, ওই পুরোনো আসবাবপত্রে ঠাসা ভূতুড়ে ঘরে অজ্ঞান তারানাথকে অলক্ষ্মীর থান থেকে তুলে এনে রাখবে। রাঘবকে টাকার লোভ দেখিয়েছিল। কথা ছিল, রাঘব অলক্ষ্মীর গয়না বেচা টাকার অর্ধেক পাবে–যদি সে ওকে সাহায্য করে আজ রাত দেড়টা-দুটোয় তারানাথকে নিয়ে আমার ঘরে যখন হানা দেবে তখন যেন ও সঙ্গে থাকে। রাঘবের মাসতুতো দাদা জনাই বেচারাকে জয়গোপাল মারের চোটে পাগলা করে ছেড়েছে। রাঘব জানে, আমি বুড়োমানুষ। ওই শয়তানটার কাছে আমিও কত অসহায়। রাঘবের মনে রাগ হবে না? সে সব বলেছিল আমাকে। রাধবের বদলে আমিই এ ঘরের ওই দরজার ছিটকিনি খুলে রেখে বেচারাকে সন্দেহ থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলুম। খামোকা গরিব মানুষ। তাকে বিপদে ফেলি কেন? বরং বদমাশটাকে হাতেনাতে পাকড়াও করি। তাই কর্নেলকে আনতে গাড়ি পাঠিয়েছিলুম। আর… –আমার দিকে ঘুরে বললেন, এই সাংবাদিক ভদ্রলোককে মজাটা দেখাতে চেয়েছিলুম। কি মশাই? দারুণ রোমাঞ্চকর না? লিখবেন তো দৈনিক সত্যসেবকে?
এইসময় সবার অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে জয়গোপালবাবু আচমকা কর্নেলকে ধাক্কা মেরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দরজার দিকে লাফ দিলেন। রাজাবাহাদুর চিৎকার করে উঠলেন, পাকড়োয়
কর্নেল বললেন, –এ রাতে ওঁকে আর ধরা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। রাজাবাহাদুর! তাছাড়া ওঁকে খুঁজে গ্রেফতার করার দায়িত্ব পুলিশের হাতেই ছেড়ে দেওয়া ভালো।
রাজাবাহাদুর শান্ত হয়ে হঠাৎ ফিক করে একটু হাসলেন। তাহলে একপ্রস্থ গরম কফি হয়ে যাক, কী বলেন? আহা, আমি কতদিন কফি খাইনি। আজ আপনাদের সঙ্গে এক কাপ খাব। কি ডাক্তার ঢোল? মাত্র এক কাপ খেলে ক্ষতি হবে কি?
ডাঃ ঢোল বললেন, –খাবেন বইকী রাজাবাহাদুর! জয়গোপালবাবু আপনাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চাইতেন বলেই তো কফি খেতে দিতেন না।
রাজাবাহাদুর উৎসাহে নেচে উঠলেন। রাঘবের দিকে চোখ পাকিয়ে বললেন, –এই হতচ্ছাড়া! হাঁ করে দেখছিস কী? ঠাকুরমশাইকে ওঠা গিয়ে। দ্যাখগে, সে আমার এই তারানাথের চেলা হয়ে আফিং গিলে পড়ে আছে নাকি।
রাঘব চলে গেল।
রাজাবাহাদুর সেই ঢ্যাপসা মোটা কবচটার সুতো ধরে দোলাতে-দোলাতে বললেন, -এই অলুক্ষুণে কবচটাই যত কাণ্ডের মূলে। কাল এটাকে নদীতে ছুঁড়ে ফেলতে হবে, বুঝলেন কর্নেল?
কর্নেল বললেন, -খুব ভালো কথা। তবে কবচটা আমি একবার দেখতে চাই রাজাবাহাদুর!
রাজাবাহাদুর কবচটা দিলে কর্নেল খুঁটিয়ে দেখে বললেন, প্রফেসর তানাচা, আপনি কি কবচটা খুলেছিলেন? মনে হচ্ছে, কবচের মুখে আঁটা গালা বেশিদিনের নয়।
প্রফেসর তানাচা সে কথায় কান না করে বললেন, -আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে রাজাবাহাদুর! আমি শোব কোথায়?
রাজাবাহাদুর দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন, আমার মাথায় শো হতভাগা আফিংখোর!
কোনার দিকের ডিভানে প্রফেসর তানাচা সটান চিত হলেন এবং চোখ বুজে ঠ্যাং দোলাতে শুরু করলেন। কর্নেল বললেন, –প্রফেসর তানাচা, কবচ আপনার কাছে ছিল। কাজেই আপনি ছাড়া কেউ খোলেনি। এর ভেতর নাকি অলক্ষ্মীর হিরের নেকলেসের সন্ধান আছে। আপনি ভেবেছিলেন, গয়নাটা পেলে বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু…
কর্নেলের কথা কেড়ে প্রফেসর তানাচা চোখ বুজে এবং ঠ্যাং দোলাতে-দোলাতে বললেন, –বড্ড সাংঘাতিক মন্ত্রপূত কবচ স্যার! খুললে শাপ লাগবে। আমার লেগেছে দেখছেন না! লক্ষ্মীছাড়া হয়ে গেছি একেবারে। অলক্ষ্মীর শাপ যা তো কথা নয়।
কর্নেল রাজাবাহাদুরকে বললেন, -একটা চিমটে দিতে পারেন রাজাবাহাদুর?
খুব পারি। বলে রাজাবাহাদুর একটা টেবিলের ড্রয়ার থেকে ছোটো চিমটে বের করলেন। একগাল হেসে বললেন, চিমটেটা এনে দিয়েছিল পাজি জয়গোপাল। নাকের ভেতর বড় লম্বা-লম্বা লোম হয় দেখছেন তো! এ দিয়ে দুপুরবেলা পটাপট সেই লোম ওপড়াই।
কর্নেল চিমটে দিয়ে কবচের মুখ সাফ করছিলেন। প্রফেসর তানাচা শুয়ে থেকে চোখ বোজা অবস্থায় বললেন, –আমারও ওই অবস্থা। তা রাজাবাহাদুর, আপনার হাঁচি পায় না?
পায়। চিমটে দেখলেই। রাজাবাহাদুর হেঁচে ফেললেন বারকতক।
কর্নেল কবচের গালা সাফ করে চিমটে দিয়ে একটুকরো গোল করে পাকানো হলদে রঙের জিনিস বের করলেন। সেই সময় রাঘব কফির ট্রে আনল।
কফি খেতে-খেতে আমরা টেবিলের ওপর ঝুঁকে হলদে জিনিসটা দেখতে থাকলুম। ওটা পুরোনো আমলের একটুকরো তুলোট কাগজ। ছেঁড়াখোঁড়া অবস্থা। কর্নেল ভাজ খুলে বিছিয়ে দিলেন কাগজটা।
কাগজটা চারধারে চমৎকার লালরঙের নকশার বর্ডার আঁকা। জায়গায়-জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। কয়েক জায়গায় কাগজও ফেটে-তুবড়ে রয়েছে। কিন্তু তাতে লালকালিতে বড়ো-বড়ো হরফে যা লেখা আছে, তাই দেখে আমি অবাক হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, –তাসের ম্যাজিক যে!
কারণ, কাগজে সেই তাসের ম্যাজিকের সংকেত-সূত্রটাই লেখা রয়েছে।
কবে যাবিরে সেই সমাজে
ছাড় কুইচ্ছে পোড়া পাম রে
কর্নেলের মুখেও বিস্ময় ফুটে উঠেছিল। বললেন, তাহলে এ শুধু ম্যাজিকের সূত্র নয়, গুপ্তধনেরও সংকেত!
প্রফেসর তানাচা খিকখিক করে হাসছিলেন। সুর ধরে ছড়াটা আওড়ে বললেন, -নদীর ধারে বিস্তর খুঁজে বেড়িয়েছি। হদিশ করতে পারিনি স্যার!
কর্নেল জিগ্যেস করলেন, -নদীর ধারে কেন প্রফেসর তানাচা?
প্রফেসর তানাচা চোখ বুজেই জবাব দিলেন, –অলক্ষ্মীর গয়না কি রাজবাড়ির ত্রিসীমানায় কেউ রাখার সাহস পায় স্যার? অলক্ষ্মীর জিনিস অলক্ষ্মীর ডেরার ওখানেই কোথাও থাকবে। আমার সাধারণ বুদ্ধিতে এইটুকুন বুঝি।
-কিন্তু এ ছড়াটা তো তাসের ম্যাজিকের সূত্র! সেটাই তো ধাঁধা স্যার! প্রফেসর তানাচা ফের খিকখিক করে হাসতে লাগলেন। ঠ্যাং দুটোও জোরে দুলতে থাকল ডিভানের ওপর।
তাই দেখে রাজাবাহাদুর থাপ্পড় তুলে গর্জালেন, -নাচ থামা উল্লুক! ঠ্যাং কেটে ফেলব বলে দিচ্ছি।
তখন প্রফেসর তানাচা মড়ার মতো লম্বা হয়ে গেলেন। ঠ্যাংদুটোও থেমে টান হয়ে গেল। দুরে নিচের তলা থেকে হলঘরের ঠাকুরদাঘড়ির ঘণ্টার বিকট শব্দে বাড়ি কেঁপে উঠল। রাত তিনটে বাজে। …
