অলক্ষ্মীর গয়না (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
চার
বড়োজোর আধ-মিনিটের মধ্যে এই সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেল। অথচ আমরা হতভাগ্য প্রফেসর তানাচাকে বাঁচাতে পারলুম না ভেবে কষ্ট হচ্ছিল। কর্নেল শ্বাসপ্রশ্বাস জড়ানো গলায় বললেন, -এ আমি ভাবিনি। কল্পনাও করিনি এমন কিছু ঘটবে।
হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়েছিলুম। আমার হাতেও টর্চ আছে এবং পকেটে আছে গুলিভরা রিভলভার, বেমালুম ভুলে গিয়েছিলুম সে-কথা। এতক্ষণে টর্চ জ্বেলে প্রফেসর তানাচাকে ভালো করে দেখলুম। সিংহাসনে বসে-থাকা হিংস্র চেহারার এক নারীমূর্তির কোলে বুক চিতিয়ে পড়ে আছেন ভদ্রলোক। পরনে সেই কালো কোট, ছাইরঙা ঢোলা পাতলুন। শরীরের নিচেটা ঝুলে রয়েছে। মুখে আতঙ্কের ছাপ। চোখ বন্ধ। নাকের দুই ছিদ্র দিয়ে জ্বলজ্বলে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। তারপর অলক্ষ্মীর ওপর আলো ফেললুম। শিউরে উঠে দেখি, তার দুটো হাতে মানুষের গলা টিপে ধরার ভঙ্গি। তার দুটো পাথুরে চোখে ক্রুর হিংসা চকমক করছে। ঠোঁটে জিঘাংসার বাঁকা নিঃশব্দ হাসি। টর্চের বোতাম থেকে আমার অবশ আঙুল সরে গেল। আলো নিভে গেল।
কর্নেল নিজের টর্চ জ্বেলে চত্বরে সম্ভবত হত্যাকারীর চিহ্ন খুঁজছিলেন। জিগ্যেস করলুম, –কর্নেল, খুনি কি অশরীরী? আমরা তো এদিকেই লক্ষ রেখে বসে ছিলুম। অথচ শুধু প্রফেসর তানাচাকে দেখতে পেয়েছি–তাকে তো দেখতে পাইনি।
গোয়েন্দাপ্রবর কোনও জবাব দিলেন না। প্রফেসর তানাচার কাছে এসে হেঁট হয়ে ওঁর পোশাক হাতড়াতে শুরু করলেন। প্যান্টের পকেটে একটা নোংরা রুমাল, একটা দু-টাকার নোট আর কিছু খুচরো পয়সা পেলেন। সেগুলো ঢুকিয়ে রেখে এবার শার্টের পকেটে হাত ভরলেন। একটা ভাজ-করা খাম বেরিয়ে এল। খামটা নিজের পকেটে চালান করে দিলেন কর্নেল। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন, -পুলিশে খবর দেওয়া দরকার এক্ষুনি জয়ন্ত, আমি এখানে থাকছি। তুমি রাজবাড়ি গিয়ে জয়গোপালবাবুকে সব জানাও।
আমি? ভীষণ ভড়কে গিয়ে বললুম, যা ঘটেছে, এরপর একা এই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাজবাড়ি যাওয়া তার ওপর ওই দুটো রাক্ষুসে কুকুর! আপনি যাই বলুন কর্নেল, এ আমার পক্ষে অসম্ভব।
কর্নেল বললেন, তাহলে তুমি এখানে থাকো। আমি খবর দিয়ে আসি।
আরও আঁতকে উঠে বললুম, –সেটা আরও অসম্ভব। এই ভয়ঙ্কর জায়গায় মড়া আগলানো! বাপস। তাছাড়া অলক্ষ্মীর মূর্তিটা দেখছেন না কেমন জ্যান্ত হয়ে উঠেছে? আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে, অলক্ষ্মীই এ হত্যাকাণ্ডের নায়িকা।
কর্নেল গুম হয়ে বললেন, –ঠিক আছে। চলো, দুজনেই যাই।
চত্বর থেকে নেমেছি, হঠাৎ কোথায় কেউ বিকট খ্যানখ্যানে গলায় হেসে উঠল। -ওরে, পালিয়ে যা! পালিয়ে যা! অলক্ষ্মী জেগে উঠেছে। মারা পড়বি। পালিয়ে যা! টর্চের আলোয় একটু তফাতে জনাই-পাগলাকে দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলুম। তারপর আশেপাশে মোটা-মোটা ঢিল পড়তে শুরু করল। আমরা পাগলাকে তাড়া করলুম। সে বিকট হাসতে-হাসতে পালিয়ে গেল।
পূর্ণিমার চাঁদটা ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে আছে নদীর ওপরে। জলের কলকলানি শোনা যাচ্ছে। জ্যোৎস্না ঝকঝক করছে জলে। ওপারে একদঙ্গল শেয়াল ডাকতে থাকল। রাজবাড়ির ফটকে গিয়ে কর্নেল বললেন, -কুকুরদুটোকে ভয় করার কারণ ছিল না, জয়ন্ত! সাপের ভয়ে হোক, কিংবা যে কারণেই হোক, রাতবিরেতে রাজবাড়ির ভেতর থেকে সম্ভবত ওদের বাইরে যেতে দেন না জয়গোপালবাবু। আসার সময় যে গজরানি শুনেছিলে, তার কারণ ওরা ট্রাকিং ডগ। ঘ্রাণশক্তি প্রবল। আমাদের চলাফেরা আঁচ করেছিল। ওই শোনো, আবার ওরা গজরাচ্ছে।
রাজবাড়ির কাছে গিয়ে কানে এল, ওপরতলায় চ্যাঁচামেচি হচ্ছে। কর্নেল বললেন, –রাজাবাহাদুর কাকে যেন শাসাচ্ছেন মনে হচ্ছে?
ভেজানো দরজা ঠেলে আমাদের ঘরটাতে ঢুকলুম। কর্নেল হলঘরের দিকের দরজা খুলে রাঘবকে ডাকলেন। সাড়া এল না। রাজাবাহাদুরের চিৎকার শুনলুম।
গেট আউট! ডাক্তার না ফাক্তার যেই হও, আমার সামনে আসবে না বলে দিচ্ছি। খুন করে ফেলব। আমার কেবলই খুন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। আবার কাছে আসছ? গেট আউট।
বুঝলুম, রাজাবাহাদুর ডাঃ ঢোলকে শাসাচ্ছেন। একটু পরে শাসানি থেমে গেল। কর্নেল বললেন, -আশ্চর্য! রাঘব তো হলঘরে শোয়। বিছানাটা খালি দেখছি।
কর্নেল ওপরে উঠতে যাচ্ছেন, বড়ো কুকুরটা সিঁড়ির মাথায় এসে রুখে দাঁড়াল। যেন ঝাঁপ দেবে। কর্নেল পিছিয়ে এলেন। লেজকাটা ঘিয়েভাজা নির্লোম লালচে রঙের ওই কুকুরটা দেখে আমার গা হিম হয়ে গেল। একটু পরে তার সঙ্গী কানোলা কুকুরটাও এসে সিঁড়ির মাথায় হাই তুলে দু-ঠ্যাং সোজা করে বসে পড়ল।
কিন্তু পুলিশকে তো খবর দেওয়া দরকার! কর্নেল বিরক্ত হয়ে ঘরে ফিরে এলেন। আমি পরদা, তুলে উঁকি মেরে ব্যাপারটা দেখছিলুম। তক্ষুনি দরজা আটকে দিলুম। কর্নেলকে বললুম, –ডক্টর ঢোলকে কি কুকুরদুটো কিছু বলে না?
-খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন, জয়ন্ত! ওঁকে তো যখন-তখন রাজাবাহাদুরকে অ্যাটেন্ড করতে হবে। তাই হয়তো জয়গোপালবাবু কুকুরদুটোকে ট্রেনিং দিয়ে রেখেছেন–যাতে ডাক্তার ঢোলকে যেন তারা বাধা না দেয়।
মিনিট পাঁচেক পরে কর্নেল যখন খুব অস্থির হয়ে উঠে পায়চারি করছেন, হলঘরে ডাঃ ঢোলের সাড়া পাওয়া গেল। রাঘবকে ডাকছেন। কর্নেল ঝটপট গিয়ে দরজা খুলে ওঁকে ডেকে আনলেন। ডাঃ ঢোল ঘরে ঢুকে রাগী মুখ করে বললেন, -অদ্ভুত ব্যাপার মশাই! রাজাবাহাদুর আসলে সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন। দিনে একরকম, রাতে তার উলটো। ডাক্তার জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড।
-কিন্তু আপনি যে ওপরে গেলেন এবং এলেন, কুকুরদুটো আপনাকে তাড়া করল না?
কর্নেলের এই বেমক্কা প্রশ্নে ডাঃ ঢোল প্রথমে একটু চমক খেলেন। তারপর ফিক করে হাসলেন, –করবে না বুঝি? দেখলেই তো হাঁ করে ব্যাটাছেলেরা কামড়াতে আসে। আমাকে ঠাকুরমশাই পেছনের দিকের সিঁড়ি দিয়ে রাজাবাহাদুরের ঘরে নিয়ে গেল। নেমে এলুম সেদিক দিয়েই। কুকুরদুটো ঠাকুরমশাইকেও তো খাতির করে না। টের পাচ্ছেন না, রাত্তিরে রাজবাড়ির জনপ্রাণীটি ঘরের বাইরে বেরোয় না। একে ভৌতিক উপদ্রব, তার ওপর ওই সাংঘাতিক কুকুর।
-কিন্তু আমার যে একবার ওপরে যাওয়া দরকার। রাজাবাহাদুরের ঘরে ফোন আছে দেখেছি। পুলিশকে ফোন করা দরকার।
ডাঃ ঢেল অবাক হলেন। পুলিশকে? কেন বলুন তো?
–নদীর ধারে অলক্ষ্মীর চত্বরে একটা ডেডবডি পড়ে আছে।
–সর্বনাশ! তাহলে সত্যি-সত্যি সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেল? কে-কে খুন হল কর্নেল? কার ডেডবডি দেখে এলেন?
কর্নেল সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন, –জয়গোপালবাবুর ঘরেও ফোন আছে সম্ভবত। আপনারা একটু বসুন। যেন চলে যাবেন না ডাঃ ঢোল! আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
কর্নেল বেরিয়ে গেলে ডাঃ ঢোল বললেন, -কী ব্যাপার বলুন তো জয়ন্তবাবু?
বললুম, –ঘুম আসছিল না। তাই বেড়াতে বেরিয়েছিলুম আমরা। অলক্ষ্মীর মন্দিরে গিয়ে দেখি একটা ডেডবডি পড়ে আছে। নাকে রক্ত।
-বলেন কী! আমার তো মশাই বুক কাঁপছে। আগে এসব জানলে কক্ষনও আসতুম না। উঃ! কী সর্বনেশে ঘটনা মশাই। আগে যদি জানতুম…ওঃ!
-কীসব জানলে?
আমার প্রশ্নে ডাঃ ঢেল অবাক হলেন যেন। বুঝলেন না? দরজায় রাতবিরেতে টোকা, ক্যানাস্তারার শব্দ, ধুপধুপ করে চলাফেরা। তার ওপর ওই বজ্জাত কুকুরদুটো–এবং সিজোফ্রেনিক রুগি।
-রাজাবাহাদুরের ব্যাপারটা কী?
–ওই তো বললুম, ডাক্তার জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের কেস। দেবতা এবং শয়তান একই লোকের মধ্যে। স্পিলট পার্সোনালিটির ব্যাপার। এসব পেশেন্ট রাত্তিরে নিজেও টের পায় না কী করছে। সেই যে এক ভদ্রলোক রাত্তিরে নিজের গায়ের কোটটি বাগানে পুঁতে রেখে আসতেন। সকালে চাকরকে বকাবকি করতেন।
ডাঃ ঢোলের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, তাহলে কি রাজাবাহাদুরই প্রফেসর তানাচাকে খুন করে পালিয়ে এসেছেন এবং তাঁর হাবভাব দেখে রাজবাড়ির ঠাকুরমশাই ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন? ডাঃ ঢোলের দিকে আনমনে তাকিয়ে রইলাম।
নাকি ডাঃ ঢোলও এই চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত? কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে। গেল, -আচ্ছা ডাক্তার ঢোল, আপনি কি মনে করেন রাজবাড়ির বাইরে গিয়ে রাজাবাহাদুরের পক্ষে কাউকে খুন করা সম্ভব?
ডাঃ ঢোল সোজা হয়ে বসে বললেন, আপনার প্রশ্নে যুক্তি আছে। এসব রুগি দিনে হাঁটাচলা করতে পারে না। কিন্তু রাত এলেই এদের শরীরে কী এক শক্তি ভর করে।
-আপনি কি আপনার পেশেন্টকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এলেন?
–তা আর বলতে? জোর করে একটা ঘুমের ইঞ্জেকশান দিতে হল।
ডাঃ ঢোলের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, উনি উঠে দাঁড়ালেন। –আমি মশাই এ ভূতের বাড়িতে আর থাকব না। পেশেন্ট গোল্লায় যাক। টাকার আমার দরকার। নেই। কাল সকালেই কেটে পড়ব।
ডাঃ ঢোল আমাকে আরও সন্দিগ্ধ করে বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে ওঁর ঘরের দরজা বন্ধ হতে শুনলুম। আমিও দরজাটা বন্ধ করে দিলুম। কর্নেলের এত দেরি হচ্ছে কেন কে জানে। চেয়ারে বসে আকাশ-পাতাল হাতড়াতে থাকলুম। এই রাজবাড়ির নায়েব হরনাথ চাটুজ্জে প্রফেসর তানাচার ঠাকুরদা ছিলেন। সেই ঠাকুরদার কবচ ওইভাবে কলকাতার সেনবাড়ি থেকে চুরি গেল। তারপর প্রফেসর তানাচা কর্নেলের ঘরে ব্যাগ ফেলে নিপাত্তা হলেন। ইস্কাপনের টেক্কার উড়ো চিঠি পেয়ে লোহাগড়ায় এ এক গোলকধাঁধা।
ঠুক-টুক-টুক।
চমকে উঠলুম। হলঘরের দিকের দরজায় কেউ টোকা দিচ্ছে। আবার ঠুকঠুকঠুক।
হঠাৎ নিজের ওপর খাপ্পা হয়ে উঠলুম। ধুরন্ধর কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সহচর হয়ে কত সব সাংঘাতিক ঘটনার মধ্যে পড়েছি। কতবার মরতে-মরতে বেঁচে গেছি। আর এই লোহাগড়া রাজবাড়িতে এসে ভূতের ডাকে ভয় পাব! রিভলভার আর টর্চ নিয়ে এক ঝটকায় দরজা খুললুম।
আশ্চর্য! কেউ নেই। হলঘরের ম্লান আলোটা জ্বলছে। তবু টর্চ জ্বাললুম। তারপর ওপরে। কোথাও শব্দ হল ধুপ-ধুপ-ধুপ! আলো ফেললেই এক পলকের জন্য চোখে পড়ল, অবিকল হাতির পেছনকার দুটো পা ওপরের বারান্দা কাঁপিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সেই আজগুবি হাতি। শব্দ উঠছে ধুপ ধুপ ধুপ ধুপ! কালো গাব্দা দুটো পা ওপরের বারান্দায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
রিভলভার বাগিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েছি, হঠাৎ কোত্থেকে সেই ঘিয়ে ভাজা লোমহীন উঁচু ছিপছিপে চেহারার সাংঘাতিক মারমুখী কুকুরটা–ডোবারম্যান পিঞ্চার, দাঁত বের করে সিঁড়ির মাথায় তখনকার মতোই রুখে দাঁড়াল। পরক্ষণে কোথাও ঝনঝনঝনাত শব্দে কেউ কিছু ছুঁড়ে ফেলল।
তক্ষুনি ছিটকে পিছিয়ে এসে ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা এঁটে দিলুম। ঠকঠক করে কাঁপুনি শুরু হল। সব সাহস উবে গেল। ফেঁসে-যাওয়া বেলুনের মতো নেতিয়ে পড়লুম বিছানায়। কিন্তু কর্নেল কী করছেন এখনও? কোনও বিপদে পড়েননি তো? একটা সিগারেট ধরিয়ে উদ্বেগ প্রশমন করতে থাকলুম। নার্ভ অনেকটা শান্ত হল। তারপর দেখি, আমার বিছানায় ভাঁজ করা একটা কাগজ পড়ে রয়েছে। সেটা খুলেই ভড়কে গেলুম।
ময়লা কাগজে ডটপেনে দ্রুত লেখা একটা চিঠি। আমরা যখন বেরিয়েছিলুম অলক্ষ্মীর মন্দিরে, তখনই কেউ জানালা গলিয়ে বা ভেজানো দক্ষিণের দরজা খুলে ফেলে গিয়ে গেছে।
কী সাংবাদিকপ্রবর? কথা রাখলুম কি না বলো! তুমি সাংবাদিক যখন, তখন নিশ্চয় জানো যে, সব টাটকা খবরের ফলো-আপ বা পরবর্তী খবরও থাকে। আগামীকাল, তেসরা নভেম্বর, রাত দুটো নাগাদ রাজবাড়ির দোতলায় উত্তর-পূর্বদিকের শেষ ঘরটার দরজার সামনে দাঁড়ালে সেটা পাবে।
ইতি,
ইস্কাপনের টেক্কা
এবার আমার বাকি সাহসটুকুও উবে গেল। কে এই ইস্কাপনের টেক্কা? সে দেখছি আমাকে বুড়ি করে আসলে ধুরন্ধর গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গেই সাংঘাতিক এক খেলায় মেতে উঠেছে। প্রথম চিঠির কথা হাতে নাতে ফলে গেছে। এবার দ্বিতীয় চিঠি না জানি আর কোনও ভয়ঙ্কর ঘটনার সংকেত! এবার তার লক্ষ্যবস্তু আমি নই তো? সে ভালোই জানে, কর্নেলের প্রিয় সঙ্গী আমি। কর্নেল আমাকে পুত্রের চেয়ে বেশি স্নেহ করেন। আমার ওপর আঘাত হেনে কি সে কর্নেলের ওপর কোনও প্রতিশোধ নিতে চায়?
খুবই সম্ভব। অতীতে কর্নেল অনেক হিংস্র খুনি ও অপরাধীকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। সম্ভবত এই ইস্কাপনের টেক্কা তাদেরই কেউ হবে। তাছাড়া লোহাগড়া রাজবাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কও যেন আছে। তাই সে প্রতিহিংসার জাল পেতেছে এই লোহাগড়া রাজবাড়িতে। ..
চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইলুম। কর্নেল কেন আসছেন না? জানালার বাইরে তাকাতেও সাহস হচ্ছে না। যদি অলক্ষ্মীর মূর্তিটা জ্যোৎস্নায় রাজবাড়ির বাগানে হাওয়া খেতে আসে? দূরে আবার শেয়াল ডাকল। সেই প্যাচাটা যেন আজ রাতে অস্থির হয়ে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে আর অমঙ্গলের বার্তা ঘোষণা করছে–ক্রাও-ক্রাও-ক্রাও! হলঘরের ঘড়িটা বিদঘুটে টঙাস-টঙাস শব্দ করছিল সারাক্ষণ। এবার খ্যানখ্যানে গলায় বারোবার ডাক ছাড়ল। সারা বাড়ি কাঁপতে লাগল সেই আওয়াজে।
কতক্ষণ পরে কর্নেলের সাড়া পেলুম দক্ষিণের দরজায়। জয়ন্ত, ঘুমিয়ে পড়োনি তো?
সঙ্গে-সঙ্গে সব ভয় কেটে গেল। ব্যস্তভাবে দরজা খুলে বললুম, –এত দেরি!
–জয়গোপালবাবু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। উনি থাকেন রাজবাড়ির বাইরে উত্তরদিকে একটা আলাদা একতলা বাড়িতে। ওঁকে বিস্তর ডাকাডাকি করে ওঠালুম। পুলিশকে ফোন করলেন। আধঘণ্টা পরে পুলিশ এল। তখন পুবের ফটক দিয়ে বেরিয়ে অলক্ষ্মীর মন্দিরে গেলুম। তারপর…
কর্নেল চুপ করলে বললুম, –তারপর?
–আশ্চর্য! ডেডবডিটার পাত্তা নেই। দারোগাবাবু খাপ্পা হয়ে চলে গেলেন।
–ডেডবডি নেই দেখলেন?
কর্নেল একটু হাসলেন। জয়গোপালবাবু বললেন, এ কাজ তাহলে জনাই-পাগলার। সে মড়া খায়, উনি নাকি স্বচক্ষে দেখেছেন। সময়মতো খাবে বলে লুকিয়ে রেখেছে কোথাও। যাই হোক, বোট-হাউসে গিয়ে জনাই-পাগলাকে খুঁজলুম আমরা। তারও পাত্তা নেই।
আর দেরি না করে ইস্কাপনের টেক্কার চিঠিটা দেখালুম কর্নেলকে। তারপর দরজায় টোকা, হস্তী-পদদর্শন ইত্যাদি ঘটনাও খুঁটিয়ে শোনালুম। কর্নেল, চোখ বুজে দুলতে-দুলতে বললেন, , শুয়ে পড়ো ডার্লিং। বেশি ভাবলে মাথা গুলিয়ে যাবে।
এ রাতে আর কিছু ঘটল না। আমার ভালো ঘুম হয়নি। যখনই কান পাতি, কর্নেলের নাকডাকা শুনি। তারপর একটু ঘুম এসে থাকবে। ভাঙল যখন, তখন আমার বৃদ্ধ বন্ধুর প্রাতঃভ্রমণ সারা হয়েছে। টেবিলে চা নিয়ে বসে আছে। আমাকে চোখ খুলতে দেখে অভ্যাসমতো সম্ভাষণ করলেন, গুড মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি, সুনিদ্রা হয়েছে।
কিছুক্ষণ পরে রাঘব ব্রেকফাস্টের ট্রে নিয়ে এল। কর্নেল বললেন, -কাল রাতে তুমি কোথায় ছিলে রাঘব?
রাঘব থতমত খেয়ে বলল, -কলকাতায় যাত্রা শুনতে গিয়েছিলুম স্যার!
–ভালো। ম্যানেজারবাবু কী করছেন?
–মাঠে কুকুরদুটোকে শিক্ষে দিচ্ছেন স্যার। ওনার ওই বাতিক।
–আচ্ছা রাঘব, জনাই তোমার মাসতুতো দাদাতাই না?
রাঘবের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। –হ্যাঁ স্যার। মাসতুতো দাদা। সে-ই আমাকে এ রাজবাড়িতে এনেছিল। জনাইদা রাজাবাহাদুরের বাবার আমলের লোক। কপালের দোষে এই অবস্থা। দেখলে মনে বড়ো কষ্ট হয়।
জনাই পাগল হয়ে গেল কেন রাঘব?
রাঘব মুখ নিচু করে বলল, -ম্যাঞ্জারবাবুর কানে গেলে আমাকেও মারবে স্যার!
তুমি নির্ভয়ে আমাকে বলতে পারো। –কর্নেল ওকে আশ্বস্ত করে বললেন, তোমার ম্যানেজারবাবুর কানে কেউ তুলবে না।
রাঘব চাপাগলায় বলল, -সবই পরে শুনেছি। স্বচক্ষে দেখিনি স্যার! জনাইদা নাকি ম্যাঞ্জারবাবুর ঘরে রেতের বেলা ঢুকেছিল–কেন ঢুকেছিল বলতে পারব না স্যার! ম্যাঞ্জারবাবুর একটা কুকুর ছিল–এদুটো নয়, অন্য একটা কুকুর। সেই কুকুরটা ওকে যত কামড়েছিল, ম্যাঞ্জারবাবুও তত মেরেছিলেন। মার খেয়ে জনাইদা রাজবাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তারপরে কিছুদিন নিপাত্তা হয়ে রইল। কিছুদিন আগে হঠাৎ দেখি নদীর ধারে বোট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সাধুর মতো চুল-দাড়ি গজিয়েছে। চিনতেই পারল না আমাকে। আসলে সেই মার খেয়েই জনাইদা পাগল হয়ে গেছে।
-কতদিন আগে জনাই মার খেয়েছিল?
–মাস দু-তিন হতে চলল প্রায়।
–তুমি নিশ্চয়ই তারানাথ চাটুজ্জেকে দেখেছ এ-বাড়িতে-নায়েববাবুর নাতি?
রাঘব হাসল। –ও! ম্যাঞ্জারবাবুর বাড়িও উঠতেন। রাজাবাহাদুরের হুকুমে ওনার এ-বাড়ি আসা বন্ধ হয়েছিল। ম্যাঞ্জারবাবুর হুকুমে আমরা ওনাকে থাকতে জায়গা দিতুম। আহা, বড়ো ভালো লোক ছিলেন। বুদ্ধির দোষে বেঘোরে মারা পড়লেন!
তুমি ওঁকে শেষবার দেখেছ কখন?–কর্নেলের প্রশ্নে রাঘব কেমন একটু হকচকিয়ে গেল। ঢোক গিলে বলল, -গতকাল বিকেলে দূর থেকে যেন নদীর ধারে একপলক দেখেছিলুম। চোখের ভুল হতেও পারে। তবে ওনার ওই অভ্যাসও ছিল স্যার!
-কী অভ্যাস?
–জঙ্গলে আফিংগাছ খুঁজে বেড়ানো।
–আফিংগাছ শুধু? নাকি অন্য কিছু?
রাঘব সাদা মুখে তাকাল। তারপর হঠাৎ চঞ্চুল হয়ে বলল, -ম্যাঞ্জারবাবু বকবেন স্যার! দেরি হয়ে গেল। আমি যাই।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, -হুঁ! ম্যানেজারবাবুকে তোমার বড় ভয়, জানি। কিন্তু আমি তোমায় সাহস দিচ্ছি রাঘব। ভয় করো না। বলো, আর কী খুঁজে বেড়ান ম্যাজিকবাবু?
রাঘব করুণমুখে বলল, -সত্যি বলছি, জানি না স্যার! ম্যাজিকবাবু পাগলা লোক। ওনার কতরকম বাতিক।
-কে ওঁকে খুন করতে পারে বলে মনে হয় তোমার?
রাঘব মুখে আতঙ্ক ফুটিয়ে বলল, –অলক্ষ্মী খুব সাংঘাতিক জাগ্যত ঠাকুর স্যার! রাতবিরেতে কেন, দিনেও কেউ ওখানে যায় না।
–হুঁ–জাগ্রত ঠাকুর বলছ তো?
–আজ্ঞে স্যার।
—তোমার জনাইদা কি সত্যি মড়া খায় রাঘব?
রাঘব আরও গম্ভীর হয়ে বলল, -পাগল তো! ম্যাঞ্জারবাবুর সেই কুকুরটা সাপের কামড়ে মারা গিয়েছিল। জনাইদা নাকি তার মড়া পর্যন্ত খেয়েছিল। এই যে শুনছি ম্যাজিকবাবু মড়াটা পাওয়া যাচ্ছে না। জনাইদাই লুকিয়ে রেখেছে দেখবেন।
-আচ্ছা, তুমি এসো রাঘব।
ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে কর্নেল বললেন, –চলো ডার্লিং! আজ একটু প্রকৃতির মধ্যে ঘুরে আসি। প্রকৃতির মধ্যে ঘোরাঘুরি করলে মাথা পরিষ্কার হয়।
কালকের মতো জয়গোপালবাবুকে কুকুরদুটোকে ট্রেনিং দিতে দেখলুম দুর থেকে। আজ ওরা আমাদের দিকে দৌড়ে এল না। পুবের ফটক পেরিয়ে প্রথমে গেলুম বোট-হাউসে। জনাইপাগলের পাত্তা নেই। ঘুরে নদীর ধারে-ধারে হেঁটে অলক্ষ্মীর মূর্তির কাছে পৌঁছলুম। দিনের আলোয় মূর্তিটাকে দেখে রাতের মতো তত ভয়ংকর মনে হচ্ছিল না। বরং যে প্রাচীন ভাস্কর এটা গড়েছে, তার প্রশংসা করতে ইচ্ছে করছিল। কালো পাথরের সিংহাসনে কালো পাথরের নারীমূর্তি। একটু এবড়ো-খেবড়ো গড়ন। চত্বরে গিয়ে কাছ থেকে ভালো করে মূর্তিটা দেখছিলুম। এই সময় চোখে পড়ল, পিঠের কাছে সিংহাসনের ফাটলে কী একটা ঢুকে রয়েছে। সেটার সঙ্গে কালো সুতো বাঁধা। সুতো ধরে টানতেই বেরিয়ে এল একটা তাস–ইস্কাপনের টেক্কা! উত্তেজিতভাবে বললুম, -কর্নেল! কর্নেল! এই দেখুন!
কর্নেল একটু তফাতে ঝোপে ঢুকে কী যেন করছিলেন। ঘুরে আমার হাতে তাসটা দেখে বললেন, -বুঝতে পারছ ডার্লিং? হত্যাকাণ্ডটা জমকালো করার জন্য এটা প্রফেসর তানাচার ডেডবডির গলায় বাঁধতে চেয়েছিল আমাদের এই রহস্যময় নায়ক। কিন্তু সময় পায়নি। তবে তার চেয়ে আরও মজার জিনিস এখানে আবিষ্কার করেছি।
তাসটা পকেটে ভরে চত্বর থেকে নামলুম। তারপর কর্নেলের কাছে গিয়ে দেখি, ওঁর হাতে একটা ছোটো নেলপালিশের শিশি। অবাক হয়ে বললুম, –অলক্ষ্মীদেবী কি নেলপালিশ লাগান নখে?
কর্নেল হো-হো হাসতে লাগলেন। –কী বোকা! কী বোকা! ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা! লোকটার বাহাত্ত্বরে ধরেছে!
-কে বোকা? কার বাহাত্তুরে ধরেছে?
কর্নেল হাসির মধ্যেই বললেন, –আবার কার? কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের। …
-কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের বয়স বাহাত্তর হওয়ার আগেই বাহাত্তুরে ধরেছে, একথা আর যেই বিশ্বাস করুক, আমি করব না। ব্যাপারটা কী বলুন তো শুনি?
কর্নেল হঠাৎ আমাকে টেনে ঝোপের মধ্যে বসে পড়লেন। আচমকা ওঁর ওই বিদঘুটে আচরণে বেজায় ভড়কে গিয়েছিলুম। চোখে চোখ পড়লে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে বললেন। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে এগোলেন এবং আমাকেও ওইভাবে অনুসরণ করতে বললেন। শক্ত পাথুরে মাটি এবং ঝোপগুলোয় প্রচুর কাঁটা–শরীরের কত জায়গা যে ছড়ে গেল কহতব্য নয়।
তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, –অল ক্লিয়ার! উঠে পড়ো ডার্লিং!
উঠে দাঁড়ালুম। চারদিক দেখতে দেখতে বললুম, -ব্যাপারটা কী?
প্রফেসর তানাচার খুনি সম্ভবত কিছু খুঁজতে আসছিল। কিন্তু আমরা যত সাবধানই হই, সে ঠিক বসে পড়ার মুহূর্তে আমাদের দেখতে পেয়েই পিঠটান দিল। কিন্তু আশ্চর্য জয়ন্ত! আমি কেন এমন বোকা হয়ে গেলুম লোহাগড়ায় এসে? কেনই বা আগাম বাহাত্ত্বরে ধরল?
বলে গোয়েন্দাপ্রবর পোশাক ঝাড়তে থাকলেন। টুপি খুলেও ঝাড়লেন। সাদা দাড়ি থেকে কয়েকটা শুকনো পাতা আর একটা খুদে রঙিন পোকাও বেছে ফেললেন। …
