অলক্ষ্মীর গয়না (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

তিন 

ব্রেকফাস্টের পর আমরা ওপরতলায় রাজাবাহাদুর অজিতেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে দেখা করতে গেলুম। বেঁটে গোলগাল ওজনদার মানুষ। মুখে অমায়িক হাসি। আমার পরিচয় পেয়ে চোখ নাচিয়ে বললেন, -দৈনিক সত্যসেবক নিয়মিত পড়ি মশাই। আপনার লেখা রাতের ট্যাক্সিতে ভূতুড়ে যাত্রী পড়ে দারুণ লেগেছিল। এবার এ-বাড়ির ভূত-রহস্য নিয়ে কিছু লিখুন।

 

বললুম, -লেখার মতো ব্যাপার বটে!

 

-বটে কী বলছেন? উত্তর-পূর্ব কোনার ঘরটাতে সন্ধ্যার পর গিয়ে ঢুকুন না। আপনার চোখের সামনে চেয়ারগুলো টেবিলের একদিক থেকে অন্যদিকে গিয়ে বসবে। বিলেতে এই ভূতুড়ে কাণ্ডকেই বলে পলটারজিস্ট।

 

–বলেন কী! পলটারজিস্ট তো খুব রহস্যময় ব্যাপার। বিজ্ঞানীরাও এ-রহস্য ফাঁস করতে পারেননি।

 

কর্নেল আমার পাশ ঘেঁষে বসেছিলেন। কেন যেন আঙুলে খুঁচিয়ে দিলেন আমাকে। রাজাবাহাদুর খিকখিক করে হাসছিলেন। বললেন, -কী? ভূতের কীর্তি স্বচক্ষে দেখার ইচ্ছে হচ্ছে তো?

 

হঠাৎ আমার মাথায় এল, একজন অপ্রকৃতিস্থ মানুষের সামনে বসে আছি। রাজাবাহাদুরের এসব কথাবার্তা, ভঙ্গি, হাসি-কোনওটাই যেন সুস্থ মানুষের নয়। আমার হাবভাব লক্ষ করেই বুঝি কর্নেল একটু কেশে বললেন, -রাজাবাহাদুর! আপনার মাথার যন্ত্রণাটা কমেছে তো? ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে না তো?

 

রাজাবাহাদুরের মুখের হাসি নিভে গেল। বাঁকা মুখে বললেন, -ভবেশ ডাক্তারের ওষুধে অসুখ সারবে না কর্নেল। গত বছর শীতের সময় আপনি এলেন, তখন থেকে এইরকম হচ্ছে আর ভবেশের ওষুধ গিলে যাচ্ছি। শেষে জয়গোপালকে বললুম, কলকাতা নিয়ে চলো। ও বলল, কষ্ট করে অত দূর যাবেন কেন? আমি ভালো ডাক্তার আনিয়ে দিচ্ছি। তো তাও এক সপ্তাহ হয়ে গেল। জয়গোপাল বলছে, এসে যাবেনখন। বুঝুন অবস্থা!

 

জয়গোপালবাবু দরজার পরদা তুলে ঘরে ঢুকে বললেন, –আজই এসে পড়বেন রাজাবাহাদুর! তিনটেয় স্টেশনে গাড়ি পাঠাব। উনি ট্রাংককল করে জানিয়েছেন কলকাতা থেকে।

 

কর্নেল বললেন, -কোন ডাক্তার বলুন তো!

 

জয়গোপালবাবু কর্নেলকে চোখ টিপে কিছু ইশারা করে বললেন, -নাম শুনেছেন কি না জানি না। ডাক্তার ডি. জি. ঢোল। খুব বড়ো ডাক্তার ব্রেন স্পেশালিস্ট।

 

কর্নেল কেন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন। রাজাবাহাদুর আনমনে জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, –ব্রেনের ভেতর যেন একটা ছেদা হয়েছে। আর সেখানে ঢুকে গেছে একটা চড়ুইপাখি। সারাক্ষণ খালি কিচিরমিচির শব্দ। নাঃ, আমি আর বাঁচব না।

 

কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। –আপনি বিশ্রাম করুন রাজাবাহাদুর। এবার আমরা যাই।

 

রাজাবাহাদুর সঙ্গে সঙ্গে ফিক করে মিষ্টি হাসলেন। চোখ নাচিয়ে বললেন, -কিন্তু যে জন্য আপনাকে হন্তদন্ত হয়ে আনালুম, তার কত দুর কী হল? হতচ্ছাড়া ভূতটার একটা ব্যবস্থা করে ফেলুন শিগগির! বড্ড বাড় বেড়েছে যে!

 

দেখুন না, কী করি। -বলে কর্নেল নমস্কার করে বেরুলেন। আমিও ওঁকে অনুসরণ করলুম। রাজাবাহাদুর আমাকে দৈনিক সত্যসেবকে লেখার কথাটা স্মরণ করিয়ে দিলেন।

 

নিচের ঘরে ফিরে কর্নেল বললেন, -কী মনে হল রাজাবাহাদুরকে দেখে?

 

–মাথায় গণ্ডগোল আছে। কিন্তু আপনি তো আমাকে এ-কথা বলেননি!

 

–বলিনি। তুমি ওঁর মুখোমুখি হয়ে কী ধারণা করবে, সেটা জানার দরকার ছিল।

 

–ডাক্তার ঢোল কে? নাম তো শুনিনি!

 

–আমিও শুনিনি। তবে জয়গোপালবাবু কাল আমাকে গোপনে বলেছেন, ডাক্তার ডি. জি. ঢোল নামে একজন সাইকিয়াট্রিস্টকে আনানো হচ্ছে কলকাতা থেকে। দেখা যাক কী হয় শেষপর্যন্ত। …

 

দুপুরে খাওয়ার পর ভাতঘুমের অভ্যাস আছে আমার। তাছাড়া রাতে ভালো ঘুম হয়নি। উঠে দেখি সূর্য ডুবতে চলেছে। কর্নেল কোথায় প্রজাপতির পেছনে দৌড়তে গিয়েছিলেন। ফিরলেন সন্ধ্যা গড়িয়ে। কয়েক জাতের প্রজাপতির স্বভাবচরিত্র বর্ণনা করলেন। রাঘব আরেক দফা চা আনল। এর কাছে শুনলুম, কলকাতার ডাক্তার এসে গেছেন। হলঘরের উলটোদিকের একটা ঘরে উনি উঠেছেন। তবে রাজাবাহাদুর নাকি ডাক্তারকে দেখেই চটে গেছেন। পাত্তা দিচ্ছেন না। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য ডাঃ ঢোল নিজেই আলাপ করতে এলেন। ভারি অমায়িক মানুষ।

 

বললেন, –এ কোথায় এলুম বলুন তো মশাই? এ যে একেবারে সৃষ্টিছাড়া জায়গা।

 

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, -কেন বলুন তো!

 

ডাঃ ঢোল বেঁটে গোলগাল চেহারার মানুষ। পাকা ফলের মতো টুকটুকে গায়ের রং। মাথায় কদমকেশর ছাঁটের চুল। একটুকরো ছাগলদাড়ি রেখেছেন। চিবুক থেকে দাড়িটা বর্শার ফলার মতো উঁচিয়ে রয়েছে। সেই দাড়ির ফলা হাতের মুঠোয় ধরে গলা চেপে বললেন, আমার মনে হচ্ছে। এই রাজবাড়িতে যাদের দেখছি, তারা কেউ মানুষ নয়। চেহারাগুলো দেখেছেন? যেন একেকটা মড়া। চাউনি দেখলে গা ছমছম করে। তার ওপর রাজবাড়ির অবস্থাটা লক্ষ করুন। টাউন থেকে মাইল দেড়-দুই দূরে নির্জন নিঃঝুম জায়গায় এ যেন এক প্রেতপুরী।

 

কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন ডাক্তার ঢোল।

 

একথায় উৎসাহ পেয়ে ডাঃ ঢোল বললেন, –ওই বুড়ো রাজাবাহাদুরকে মানুষ বলে মনে হয় আপনার? যেন কবর থেকে খোলা মমি। অথচ মেজাজ আছে বুড়োর। আমি তো মশাই এসেই দেখছি গোখুরি করে বসেছি! রকম-সকম ভালো ঠেকছে না।

 

আমি বললুম, -রাজাবাহাদুরের অসুখটা কী?

 

ডাঃ ঢোল বিরক্তমুখে বললেন, -কাছে এগোতে দিলে তো বুঝব? পৃথিবীতে অনেকরকম পাগল আছে। এ জীবনে বিস্তর বাঘা-বাঘা পাগলের চিকিৎসাও করেছি। কিন্তু রাজাবাহাদুর এক সেয়ানা পাগল।

 

বলে ডাঃ ঢোল কর্নেলের দিকে ঘুরে ফিসফিস করে বললেন, –শুনলুম, রাজবাড়িতে কীসব ভূতুড়ে ঘটনাও নাকি ঘটে। সেজন্যে কলকাতা থেকে প্রাইভেট গোয়েন্দা এসেছেন। মশাই কি তিনিই?

 

কর্নেল হো-হো করে হেসে বললেন, কার কাছে শুনলেন ডাক্তার ঢোল?

 

রাঘব নামে লোকটা বলছিল। –ডাঃ ঢোল একটু হাসলেন, আমি তাহলে একটুখানি নিশ্চিন্ত হতে পারি, কী বলেন মিস্টার…ইয়ে… সরি। আপনার নামটা বারবার ভুলে যাচ্ছি।

 

–আমাকে কর্নেল বলেই ডাকবেন ডাক্তার ঢোল।

 

ডাঃ ঢোল সোজা হয়ে বসলেন। মুখে প্রশংসার ছাপ। কর্নেল! তার মানে আপনি মিলিটারির লোক?

 

ছিলুম। এখন অবসরপ্রাপ্ত।

 

তা হোক! আমার মনের জোর বেড়ে গেল শুনে। –ডাঃ ঢোল খুশি হয়ে বললেন, যদি কোনও গণ্ডগোল বাধে, আপনি যখন আছেন–তখন আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

 

তারপর আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বললেন, –আর এই ইয়ংম্যান তো একজন সাংবাদিক। খুব আনন্দের কথা। হাতে কাগজ থাকলে মশাই পৃথিবী জয় করা যায়। আমরা গণ্ডগোলে পড়লে আপনি ফলাও করে কাগজে ছেপে দেবেন। অমনি গভমেন্টের টনক নড়বে। পুলিশের রথী-মহারথীরা এসে হাজির হবেন লোহাগড়া রাজবাড়িতে।

 

কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, -কী ঘটতে পারে বলে আপনার মনে হচ্ছে বলুন তো?

 

ডাঃ ঢোল চাপাগলায় বললেন, -এনিথিং! স্বকিছু ঘটতে পারে। আমার একটুও ভালো ঠেকছে না এবাড়ির হালচাল।

 

-যেমন?

 

কর্নেলের প্রশ্ন শুনে ডাঃ ঢোল গম্ভীরমুখে বললেন, ম্যানেজারবাবু বলছিলেন, রাজাবাহাদুর যে বংশের মানুষ, সেই বংশের প্রত্যেকে নাকি ডাকসাইটে খুনি। খুনের প্রবৃত্তি এঁদের রক্তে আছে। রাজাবাহাদুর নাকি হঠাৎ-হঠাৎ খেপে গিয়ে ছুরিছোরা নিয়ে যাকে সামনে পান, তাড়া করেন। কাজেই যে-কোনও সময়ে কেউ খুন হয়ে যেতে পারে। তারপর ধরুন…

 

–হুঁ বলুন ডাক্তার ঢোল।

 

–যে ঠাকুরমশাই রাজবাড়ির রান্নাবান্না করেন, তিনি বলছিলেন, রাত-বিরেতে রাজবাড়ির ভেতর নাকি আগের আমলের কোন রাজাবাহাদুর ঘুরে বেড়ান। ধুপ-ধুপ শব্দ নাকি ঠাকুরমশাই রোজ রাতে শুনতে পান।

 

আমরাও শুনেছি। আমার দিকে তাকিয়ে কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন।

 

ডাঃ ঢোল একটু ভয় পেলেন বুঝি। –সর্বনাশ! বলেন কী?

 

–আর কী শুনেছেন ডাক্তার ঢোল?

 

রাজবাড়ির কোনও পূর্বপুরুষ নাকি কোথায় গুপ্তধন পুঁতে রেখেছেন। রাতবিরেতে তা খুঁজে বেড়ায় কারা।

 

কার কাছে শুনলেন?

 

–রাঘব বলছিল।

 

ততক্ষণে বাইরে জ্যোৎস্না ফুটেছে। কর্নেল উঠে গিয়ে দক্ষিণের দরজায় দাঁড়ালেন। বললেন, –বাঃ! চমৎকার জ্যোৎস্না!

 

ডাঃ ঢোল তার কাছে গিয়ে জ্যোৎস্না দেখতে-দেখতে তারিফ করলেন। –অপূর্ব! কিন্তু কী ট্রাজেডি দেখুন তো কর্নেল! প্রকৃতির এমন সুন্দর জিনিসটা উপভোগ করার ইচ্ছে সত্ত্বেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।

 

-কেন?

 

ভয়ে-ভয়ে একটু হেসে ডাঃ ঢোল বললেন, –এমন রাত্তিরে ঘুরে বেড়াতে বুঝি ইচ্ছে করে?

 

কর্নেল বললেন, –ইচ্ছে করে তো ঘুরুন। জয়ন্ত, তুমি ডাক্তার ঢোলকে নিয়ে কিছুক্ষণ জ্যোৎস্নায় ঘুরে এসো না! আপনি আমার এই তরুণ বন্ধুর সঙ্গে স্বচ্ছন্দে গিয়ে জ্যোৎস্না উপভোগ করতে পারেন ডাক্তার ঢোল। ভাববেন না, জয়ন্ত ডানপিটে যুবক। তাছাড়া ওর কাছে রিভলভারও আছে।

 

সত্যি নাকি? –ডাঃ ঢোল অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকালেন।

 

অগত্যা ওঁকে রিভলভারটা দেখাতেই হল। আসলে ঘরে চুপচাপ বসে থেকে বাইরে অমন সুন্দর শরৎকালের জ্যোৎস্নায় আমারও ঘুরতে ইচ্ছে করছিল।

 

ডাঃ ঢোলকে নিয়ে বেরোলুম। এদিকটায় চওড়া ঘাসের লন এবং বাগান। মনে হল, কর্নেল আসলে ডাঃ ঢোলকে বাইরে পাঠিয়ে কোনও গোপন তদন্ত অথবা সেইরকম কিছু সেরে ফেলতে চান।

 

ঘাসে এখনই শিশির জমতে শুরু করেছে। টের পাচ্ছিলুম, মুখে ডাঃ ঢোল জ্যোৎস্না রাতের প্রশংসা করলেও মনে ভয় রয়েছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সাবধানে পা ফেলছিলেন। কিছুটা এগিয়ে একবার ঘুরে রাজবাড়িটার দিকে তাকালুম। সত্যি-সত্যি প্রেতপুরী বলে মনে হল। সাদা জ্যোৎস্নায় ধূসর রঙের বাড়িটার গা থেকে যেন অলৌকিক জ্যোতি ঠিকরে বেরুচ্ছে।

 

আমাকে ঘুরতে দেখে ডাঃ ঢোল খপ করে আমার কাধ চেপে ধরে বললেন, -কী? কী?

 

-কিছু না। আসুন।

 

-বেশিক্ষণ কিন্তু ঘুরব না জয়ন্তবাবু। পেশেন্টকে আবার একবার অ্যাটেন্ড করতে হবে। নইলে ম্যানেজারবাবু চটে যাবেন।

 

এদিকে-ওদিকে একটা করে গাছ অথবা ঝোপঝাড় কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের গায়ে ধূসর কুয়াশার চাদর জড়ানো। আরও একটু এগিয়ে টানা পাঁচিলের কাছে পৌঁছলুম। ঠিক সেই সময় কাল রাতের সেই প্যাচাটা বিচ্ছিরি ক্রা-ক্রা চিৎকার করে মাথার ওপর আসতেই ডাঃ ঢোল আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। -কী? কী?

 

–ভয়ের কিছু নেই ডাক্তার ঢোল! নিছক প্যাঁচা।

 

কে জানে মশাই! প্যাঁচার ডাক কখনও শুনিনি।

 

এবার ডাঃ ঢোল আমার একটা হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন। পাঁচিলের সমান্তরালে একটুখানি এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল, পুবের ফটকের কাছে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। ডাঃ ঢোল ভয় পাবেন ভেবে ওঁকে কিছু বললাম না। ছায়ামূর্তিটা তেমনি কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জনাই-পাগলা না কি!

 

কিন্তু তারপর আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। ছায়ামূর্তিটা হঠাৎ বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি থমকে দাঁড়ালুম। ডাঃ ঢোল একই সুরে গলার ভেতর বলে উঠলেন–কী? কী?

 

কিছু না। পকেট থেকে টর্চ বের করে জ্বেলে সেই জায়গাটা তন্নতন্ন খুঁজলুম। তারপর মনে হল, জ্যোৎস্না রাতে এমন ভুল হওয়া স্বাভাবিক।

 

ডাঃ ঢোল বললেন, কিছু খুঁজছেন মনে হচ্ছে জয়ন্তবাবু? জিনিসটা কী?

 

হাসতে-হাসতে বললুম, -রাতবিরেতে চোখে মানুষ অনেক ভুল দেখে। তবে না, তেমন কিছু আমি দেখিনি।

 

ডাঃ ঢোল থেমে দাঁড়িয়ে বললেন, রাতবিরেতে কেন? মানসিক রুগিরা দিনদুপুরেও কতরকম ভুলভাল জিনিস দেখতে পায়। তাকে আমাদের শাস্ত্রে বলে হ্যাঁলুসিনেশন। ধরুন, রুগি হঠাৎ ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, জানলার নিচে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে! এমনকী, তার পোশাকের বিবরণও দিল। কিন্তু সবটাই তার চোখের ভুল। আপনাকে একটা বই দেব। পড়ে দেখবেন। ডক্টর মার্লো পন্টির লেখা দি ফিলসফি অফ পার্সেপশান। তাতে…

 

ঠিক এই সময় নদীর ওদিকে একদল শেয়াল হঠাৎ হুক্কাহুয়া করে জোরে চেঁচাতে শুরু করল। অমনি ডাঃ ঢোল আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। ভয় পাওয়া গলায় বললেন, –কী? কী?

 

-শেয়াল ডাকছে।

 

–সত্যিকার শেয়াল তো? কে জানে মশাই, শেয়ালের ডাক কখনও শুনিনি।

 

নিজেকে ছাড়িয়ে নিলুম ওঁর কবল থেকে। তারপর বললুম, –আপনার শাস্ত্রের কথামতো হ্যাঁলুসিনেশন হতেও পারে। চলুন, এবার ফেরা যাক।

 

ডাঃ ঢোল হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তবে যাই বলুন, ভয় পাওয়ারও একটা মজা আছে। তাছাড়া আপনার সঙ্গে যখন রিভলভার আছে, তখন নিশ্চিন্তে ভয় পাওয়া যায়। আমার তো মশাই, দারুণ আনন্দ হল।

 

রাজবাড়ির দিক থেকে কুকুরের গজরানি শোনা যাচ্ছিল। তা শুনে ডাঃ ঢোল বললেন, –আর-এক বিপদ ওই কুকুরদুটো। সাংঘাতিক কুকুর মশাই! দেখলেই হাঁ করে চিবুতে আসে। ম্যানেজার জয়গোপালবাবুর ওই এক বিদঘুটে স্বভাব। কুকুর যারা পোষে, তারা আমার চক্ষুশূল। উনি কি ভাবছেন, সাংঘাতিক ভূতুড়ে কিছু ঘটলে কুকুর দিয়ে ঠেকাবেন? কুকুর কি ভূতপ্রেতকে ভয় পায় না? নিশ্চয়ই পায়। কী বলেন?

 

আনমনে বললুম, -পাওয়া তো উচিত।

 

হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছিল, আজ দোসরা নভেম্বর। এখন মোটে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে। আর আড়াই ঘন্টা পরে পুবের ফটকের ওদিকে নদীর ধারে অলক্ষ্মীরর মন্দিরে একটা কিছু ঘটবে। ইস্কাপনের টেক্কা আমাকে সেখানে রাত দশটায় উপস্থিত থাকতে বলেছে।

 

বুকের ভেতর রক্ত নেচে উঠল উত্তেজনায়। এবং ভয়েও বটে। এতক্ষণে কেমন আড়ষ্টতা জেগে উঠল শরীরে।

 

কর্নেলকে দক্ষিণের বারান্দায় দেখতে পাচ্ছিলুম। কাছে গেলে বললেন, আশা করি, ডাক্তার ঢোলের নৈশভ্রমণ রোমাঞ্চকর হয়েছে?

 

ডাঃ ঢোল বললেন, –দারুণ রোমাঞ্চকর। সেই তো বলছিলুম জয়ন্তবাবুকে। সঙ্গে রিভলভার থাকলে রাতবিরেতে ঘোরার মজা আছে। বিশেষ করে পাচা এবং শেয়ালের ব্যাপারটা রিয়্যালি ওয়ান্ডারফুল!

 

ঘুঘুমশাই ইতিমধ্যে রাঘবকে বলে একপট কফি আনিয়ে রেখেছেন। শিশির আর নভেম্বরের রাত্রির হিমে একটু আড়ষ্ট বোধ করছিলুম। কফিটা আরাম করে খাওয়া হল। তারপর ডাঃ ঢোল উঠলেন। –অসংখ্য ধন্যবাদ কর্নেল! সময় বড়ো সুন্দর কাটল। আশা করি এভাবেই কাটবে! এবার চলি। একটু পরে আবার রাজাবাহাদুরকে অ্যাটেন্ড করতে হবে।

 

ডাঃ ঢোল চলে গেলে হলঘরের দিকের দরজা বন্ধ করে দিলুম। তারপর চাপাগলায় বললুম, –আপনি কি এই সুযোগে কিছু তদন্ত সেরে নিতে পেরেছেন?

 

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, দ্যাটস রাইট, বৎস! ঠিকই ধরেছ।

 

ডাক্তার ঢোল সম্পর্কে নিশ্চয়ই?

 

–হুঁ।

 

–কী বুঝলেন?

 

–ওঁর নাম ডাক্তার দোলগোবিন্দ ঢোল। কোনও গণ্ডগোল নেই। কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটে বাসা। চেম্বার শ্যামবাজারে। তবে তত নামী সাইকিয়াট্রিস্ট নন।

 

–আর কিছু?

 

কর্নেল হাসলেন। –নাঃ ডার্লিং! লোকটির মধ্যে কোনও ভণ্ডামি নেই। একটু ভিতু প্রকৃতির, এই যা। জয়গোপালবাবু ওঁকে মোটা ফি-র লোভ দেখিয়েই এনেছেন। নইলে এমন ভূতুড়ে জায়গায় আসতেন বলে মনে হল না। ওঁর ব্যাগে জয়গোপালবাবুর কয়েকটা চিঠি দেখলুম। তা থেকেই বোঝা গেল ব্যাপারটা।

 

ঘড়ি দেখে বললুম, –সাতটা পঁয়তাল্লিশ বাজে। আমরা কখন বেরুব?

 

-নটা পঁয়তাল্লিশ নাগাদ। রাঘবকে বলেছি, আজ নটার মধ্যে রাতের খাওয়া সেরে নিতে চাই। সারাদিন ঘুরে বড্ড ক্লান্ত।

 

কর্নেল কোনার দিকে ইজিচেয়ারে পা ছড়িয়ে বসলেন। তারপর চোখ বুজে ধ্যানস্থ হলেন। আমি একটা বিলিতি ভ্রমণবৃত্তান্তের বই খুলে বসলুম। কিন্তু কিছুতেই মন বসল না বইয়ে। পাশের হলঘরে ঠাকুরদাঘড়ির বিচ্ছিরি টঙাস-টঙাস শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ভারি বিরক্তিকর।

 

কিছুক্ষণ পরে হলঘরের দিকের দরজায় টোকার শব্দ হল। তারপর জয়গোপালবাবুর গলা শুনতে পেলুম। দরজা খুলে দিলে জয়গোপালবাবু ভেতরে এলেন। অসময়ে একটু বিরক্ত করতে এলুম, কর্নেল!

 

কর্নেল বললেন, -না, না। আসুন, আসুন!

 

জয়গোপালবাবু ঘরের ভেতর চোখ বুলিয়ে বললেন, -কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো আপনাদের?

 

-মোটেই না। খাসা আছি।

 

গত বছর যখন আপনি এলেন, তখন কিন্তু রাজবাড়িতে বেশ শান্তি ছিল। জয়গোপালবাবু একটু হেসে বললেন, গত মাস দু-তিন যাবৎ হঠাৎ নানারকম অশান্তি। তবে একটা ব্যাপার স্বীকার করতেই হবে, এত সব কাণ্ড হচ্ছে–কিন্তু দেখুন, কারুর একতিল ক্ষতি হয়নি এ পর্যন্ত। ভগবানের ইচ্ছেয় ক্ষতিটতি না হলেই বাঁচি।

 

-কেন? কী ক্ষতির আশংকা করছেন বলুন তো?

 

জয়গোপালবাবু উদ্বিগ্নমুখে বললেন, –নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন কর্নেল! কিন্তু রাতের বেলায় যে সব অদ্ভুত শব্দ শোনা যাচ্ছে–কিংবা ধরুন, দরজায় টোকা দিচ্ছে, অথচ দরজা খুলে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এইতে আমার বড্ড ভয় হচ্ছে। কোনও সাংঘাতিক ঘটনারই যেন আগাম সংকেত। বাই দা বাই, কর্নেল কি অশরীরী আত্মায় বিশ্বাস করেন?

 

কর্নেল একটু হাসলেন। বিশ্বাস করার সুযোগ পাইনি জয়গোপালবাবু।

 

–আমিও পাইনি। কিন্তু এ রাজবাড়ির ইতিহাস তো খুব নির্মল নয়। বহু খুনোখুনি, অত্যাচার–এসব ঘটেছে অতীতকালে। বর্তমান রাজাবাহাদুরের এক পূর্বপুরুষ ছিলেন প্রচণ্ড প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ। এখনও লোকের বিশ্বাস, তার অশরীরী আত্মা রাজবাড়িতে ঘুরে বেড়ায় তিনি সতেরো শতকে রাজত্ব করতেন। তাঁর নাম ছিল শিবেন্দ্রনারায়ণ। অলক্ষ্মীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা তারই আরেক অপকীর্তি। লোকে বলে, অলক্ষ্মীর পায়ে নরবলি দেওয়ার সাধ ছিল তার। কিন্তু যে-কোনও কারণে হোক, সে সাধ মেটেনি। তাই তার আত্মা এখনও নরবলি দেওয়ার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে।

 

কর্নেল বললেন, -কে জানে! মানুষের জ্ঞান বড়ো সীমাবদ্ধ জয়গোপালবাবু। বিজ্ঞানের সামনে এখনও কত বিরাট অনাবিষ্কৃত জগৎ পড়ে রয়েছে।

 

জয়গোপালবাবু হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন, আর বিরক্ত করব না। সাবধানে থাকবেন। যা সব চলছে। –বলে উনি বেরিয়ে গেলেন। …

 

আজ দোসরা নভেম্বর। আকাশে ভারিক্কি চেহারার চাঁদ ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে আছে। জ্যোৎস্নার ওপর নীলচে কুয়াশা জমে বাইরের সবকিছু কেমন থমথমে করে তুলেছে। প্রতি সেকেন্ডে আমার উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছিল। কী রোমাঞ্চকর খবর শোনাবে ইস্কাপনের টেক্কা? কে সে? কেন এমন করে সে আমাকে ওই বিদঘুটে জায়গায় ডাকল? তার কোনও কুমতলব নেই তো? ভয় হচ্ছিল এবার। কর্নেল কিন্তু নির্বিকার। রাঘব নটার মধ্যে খাইয়ে দিল। একটু পায়চারি করার ছলে আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। দুরে কোথাও জয়গোপালবাবুর কুকুরের গজরানি শুনলুম। কিন্তু পুবের ফটক পেরিয়ে গেলেও কুকুরদুটো আমাদের এদিকে এল না। নদীর জলে জ্যোৎস্না ঝকমক করছে। ওপারে কী পাখি দুবার ডেকে চুপ করে গেল। তারপর সামনে কোথাও একপাল শেয়াল ডাকতে লাগল। ঝোপঝাড় আর ঘাসে ইতিমধ্যে প্রচুর শিশির জমেছে। আমার মনে ক্রমশ এবার একটা অস্বস্তি জাগতে শুরু করেছে। পকেটে গুলিভরা খুদে রিভলভারটা একবার ছুঁয়ে দেখলুম।

 

একটা ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছিল সামনে। কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন, –বসে পড়ো। এখনও দু-মিনিট বাকি আছে দশটা বাজতে। দুজনে ঝোপের আড়ালে বসে পড়লুম। একটা প্যাচা ক্রাও-ক্রাও করে ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। ফাঁকা জমিটার ওপর প্রকাণ্ড একটা কালো চৌকামতো উঁচু চত্বর দেখতে পাচ্ছিলুম। তার ওপর ওটাই কি অলক্ষ্মীর মূর্তি?

 

দমবন্ধ করে বসে আছি। সময় কাটতে চাইছে না। কতক্ষণ পরে হঠাৎ দেখি, এদিক-ওদিক তাকাতে-তাকাতে কে পা টিপে-টিপে এগিয়ে চত্বরটায় উঠল। তারপরই চাপা একটা আর্তনাদ শুনতে পেলুম। সেইসঙ্গে ধস্তাধস্তির শব্দ হল। কর্নেল টর্চ জ্বেলে দৌড়ে গেলেন। আমি ওঁর পেছনে ছিলুম। টর্চের আলোয় প্রথমে চোখ পড়ল কালো রঙের মূর্তিটার দিকে। ও কি জীবন্ত হয়ে উঠেছে এ-মুহূর্তে? হিংস্র ভয়ঙ্কর তার চেহারা। আর তার কোলের ওপর কেউ পড়ে রয়েছে। কর্নেল এক লাফে চত্বরে উঠে তার কাছে গেলেন। তারপর চমক-খাওয়া গলায় বলে উঠলেন, -সর্বনাশ! এ যে দেখছি প্রফেসর তানাচা!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *