অলক্ষ্মীর গয়না (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
দুই
কী কষ্টে যে লোহাগড়া পৌঁছলুম, বলার নয়। ট্রেন নয়, যেন ছ্যাকড়া গাড়ি। পৌঁছুল রাত এগারোটা বাজিয়ে। খাঁ-খাঁ, নিঝুম প্ল্যাটফর্ম। স্টেশনমাস্টার একচোখো ভূতুড়ে লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তাঁর আশ্রয়প্রার্থী হওয়া ছাড়া উপায় কি? আর একজনও যাত্রী নামেনি ট্রেন থেকে। জ্যোৎস্নার ফিং ফুটছে চারদিকে। গাছপালায় কুয়াশা জমে রয়েছে। এদিকে-ওদিকে টিলাগুলো জ্যোৎস্নায় বিশাল হাতির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে।
-হ্যালো জয়ন্ত!
চমকে উঠেই মানুষটিকে দেখে সব ক্ষোভ, হতাশা, ক্লান্তি তক্ষুনি চলে গেল! মনটাও বিগলিত হল বইকী! এত রাতে আমার বৃদ্ধ বন্ধু নিশ্চয়ই দুর্লভ প্রজাতির রাতপাখি দেখতে স্টেশনে আসেননি।
বিকেলের ট্রেনটাও দেখে গেছি!
গোয়েন্দাপ্রবর আমার কাঁধে হাত রাখলেন। –এ বুড়োর ওপর রাগ করো না ডার্লিং! রাজাবাহাদুরের তলব পেয়েই ছুটে আসতে হল। তুমি কাগজের লোক। কতরকম তোমার। অ্যাসাইনমেন্ট থাকে। হুট করে গিয়ে চলো বললেই তো আর বেরিয়ে পড়তে পারও না আমার মতো।
–কৈফিয়ত কে চেয়েছে? এ-মুহূর্তে চাইবার মতো একটি জিনিসই আছে। তা হল কড়া গরমাগরম চা কিংবা কফি।
পাবে। –আশ্বস্ত করলেন ঘুঘুমশাই। স্টেশনের বাইরে পৌঁছুলে কে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল, –আপনার সাংবাদিক বন্ধু কি এসেছেন কর্নেল?
ছায়ার আড়াল থেকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। কর্নেল বললেন, –জয়ন্ত এসেছে। জয়গোপালবাবু। আপনাকে বলছিলুম না? পৃথিবীর যেখানে-যেখানে অদ্ভুত-অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, জয়ন্ত সেখানে গিয়ে ঢুঁ মারে। আমি জানতুম, ও না এসে পারবে না।
কর্নেল হো-হো করে হেসে উঠলেন। কিন্তু জয়গোপালবাবু হাসলেন না। বুঝলুম, গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। হাত বাড়িয়ে আমার হাত নিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। -লোহাগড়া রাজবাড়িতে আপনাকে সাদর অভিনন্দন, জয়ন্তবাবু!
কর্নেল বললেন, -জয়ন্ত, ইনি রাজ এস্টেটের ম্যানেজার। অসমসাহসী মানুষ। অথচ ইনিও… হঠাৎ কর্নেল চুপ করে গেলেন।
জয়গোপালবাবু বললেন, –আসুন কর্নেল! জয়ন্তবাবু নিশ্চয়ই ক্লান্ত।
আমার মনে হল, ভদ্রলোক যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও কর্নেলের সঙ্গে স্টেশনে এসেছেন। যে-কোনও কারণে হোক, রাজবাড়িতে দ্রুত ফিরতে চাইছেন।
ছোটো স্টেশনবাজার নিঝুম হয়ে গেছে। একটা চায়ের দোকানে আলো জ্বলছে। কয়েকজন। লোক ঝিমধরা হয়ে বসে রয়েছে। হাতে চায়ের গেলাস। চায়ের জন্য মন চনমন করে উঠল। কিন্তু জয়গোপালবাবুর তাড়ায় গাড়িতে ঢুকতে হল। এই গাড়িটাই তাহলে কলকাতা পাঠানো হয়েছিল কর্নেলকে আনতে। ষষ্ঠীচরণ গাড়িটা দেখে যে হেসেছিল, তাতে কিছু অন্যায় হয়নি তার। একেবারে ঝরঝরে ভিন্টেজ কার। আর রাস্তার অবস্থাও তেমনি এবড়ো-খেবড়ো। বসতি এলাকা। ছাড়িয়ে একটা টিলার পাশ দিয়ে ছোটো একটা রাস্তায় গাড়ি মোড় নিল। তারপর জ্যোৎস্নায় ধু-ধু সাদা ন্যাড়া একটা তেপান্তর পেরোতে থাকল। রাজবাড়ি বেশ দূরে বলে মনে হল।
মাইলটাক রাস্তা ফের একটা ধকল গেল। একটা ঝিলের ধার দিয়ে প্রবল আওয়াজে ঝিলচর বুনো হাঁসগুলোকে চমক খাইয়ে রাজবাড়ি পৌঁছলুম। দেউড়ি দিয়ে গাড়ি ঢুকলে এক ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে গেট বন্ধ করে দিল। জয়গোপালবাবু তার উদ্দেশে বললেন, -রাঘব! শিগগির ঠাকুরকে বলে আগে একপট কফি নিয়ে আয়।
হলঘরের পাশের একটা ঘরে কর্নেল উঠেছেন। জয়গোপালবাবু সকালে দেখা হবে বলে চলে গেলেন। একটু পরে সেই রাঘব কফি রেখে গেল। কড়া কফি খেতে-খেতে ইস্কাপনের টেক্কার চিঠিটা বের করে দেখালুম। কর্নেল কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, –এদিকে আরেক রহস্য জমে উঠেছে, যেজন্য ছুটে এসেছি। রাজাবাহাদুর অজিতেন্দ্রের ধারণা, শিগগির রাজবাড়িতে একটা সাংঘাতিক কিছু ঘটতে চলেছে। রাতবিরেতে অদ্ভুত সব ধুপধুপ, ঝনঝন শব্দ শোনা যাচ্ছে। কারা যেন চলাফেরা করে বেড়াচ্ছে। কোথায় কী ভাঙচুর করছে। রাজাবাহাদুর নাকি স্বচক্ষে দেখেছেন, অলক্ষ্মীর মূর্তি বাগানে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, দরজায় টোকার শব্দ। দরজ খুলে কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না। এবং এ সবই ঘটছে রাত্রিবেলা। দিনে সব কিছু স্বাভাবিক। রাত এলেই বিভীষিকা।
কর্নেল চুপ করার সঙ্গে-সঙ্গে কোথাও ঝনঝন প্রচণ্ড শব্দ শোনা গেল। কে যেন কোনও ধাতব জিনিস ছুঁড়ে ফেলল। কর্নেল বললেন, –ওই শোনো! কাল শেষ রাতে পৌঁছেও এই শব্দটা শুনেছি…।
শব্দটা শুনে আমি চমকে উঠেছিলুম, তা ঠিক। কিন্তু এই ধুরন্ধর বৃদ্ধ যেন আরও বেশি চমকে উঠেছেন। তা দেখে হাসিও পাচ্ছিল। বললুম, –তাহলে দুদিন ধরে বেশ একটা রহস্যপুরীতে কাটাচ্ছেন দেখছি। কিন্তু হে প্রাজ্ঞ ঘুঘুমশাই, আপনি কি তাহলে অবশেষে ভূত সত্যি বলে মানলেন?
কর্নেল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি এখনও ব্যাপারটা তামাশা বলে ভাবছ, ডার্লিং! তোমার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তুমি একটুও ভয় পাওনি। আমার কিন্তু সত্যি কেমন ভয় করছে।
অবাক হলুম। চিরদিনের দুঃসাহসী আর শক্তিমান কর্নেলের মতো মানুষের কীসের ভয় করছে? ভূতের ভয় নিশ্চয়ই নয়। বললুম, –আপনার কিমনে হয় এসব ভূতুড়ে ব্যাপারের পেছনে কোনও লোক আছে, যার ছদ্মনাম ইস্কাপনের টেক্কা?
কিছু বলা যায় না। শুধু আঁচ করছি, কেউ একটা সাংঘাতিক কোনও কাজ করতে চায়। এসব তারই প্রস্তুতি। –বলে কর্নেল চুরুট জ্বাললেন। তারপর জানালার কাছে গেলেন।
ওপরে এবার কোথায় যেন ধুপ ধুপ ধুপ ধুপ… ভারী পায়ে হাতির মতো কোনও ওজনদার জন্তুর যেন হেঁটে বেড়ানোর শব্দ শোনা গেল। উত্তেজিতভাবে বললুম, -ও কীসের শব্দ?
কর্নেল কোনও জবাব দিলেন না। শব্দটা আমাদের এই ঘরের ছাদে এলে আমার এতক্ষণে সত্যি-সত্যি ভূতের ভয় পেয়ে বসল। ধুপ ধুপ ধুপ ধুপ… পায়ের শব্দে ছাদটা কেঁপে উঠছে। এ কখনও মানুষের পায়ের শব্দ হতে পারে না।
একটু পরে শব্দটা সরে গেল। দূরে মিলিয়ে গেলে কর্নেল বললেন, -কাল রাতে ওই শব্দ শুনে ছুটে গিয়েছিলুম। হলঘরের সিঁড়ির নিচে গেছি, হঠাৎ ওপরে চোখ গেলে হাতির পেছনকার দুটো পা একপলকের জন্য দেখতে পেলুম। যাই হোক, রাতবিরেতে রাজবাড়ির দোতালায় হাতি ঘুরে বেড়ানোটা কাজের কথা নয়।
বলে কর্নেল দুটো জানালাই বন্ধ করে দিলেন। তারপর বললেন, –শুয়ে পড়ো জয়ন্ত। হুঁ, তার আগে অবশ্য কিছু খেয়ে নাও। ওই দ্যাখো, তোমার খাবার ঢাকা দেওয়া আছে টেবিলে।
.
বিভীষিকা বলতে ঠিক কী বোঝায়, লোহাগড়া-রাজবাড়িতে একটা রাত কাটিয়েই হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছিলুম। হলঘরে ঠাকুরদাঘড়ির টঙাস-টঙাস বিদঘুটে শব্দটা ক্রমশ যেন বাড়ছিল। তারপর কড়াত করে শ্বাস টেনে ঠং-ঠং করে বেজে ওঠাটাও পিলে-চমকানো বললে ভুল হয় না। এক সময় যেন হলঘরের দিকের দরজায় কেউ ঠুকঠুক করে বার তিনেক টোকা দিয়েছিল। কর্নেলের বারণ থাকলেও দরজা খুলতুম না।
লম্বা-চওড়া ঢাউস দুটো জানলা বন্ধ ছিল। তাই ঘুম আসছিল না। দমবন্ধ হয়ে আসছিল যেন। শেষে সাহস করে মশারি থেকে বেরিয়ে খুলে দিয়েছিলুম। কিন্তু সাহস করে বাইরে তাকাতে পারিনি। হঠাৎ যদি চোখে পড়ে, অলক্ষ্মীর মূর্তি বাগানে হেঁটে বেড়াচ্ছে, নির্ঘাৎ ভিরমি খেয়ে পড়ব। ঘরের ভেতর চাঁদের আলো উপচে আসছিল। কিন্তু সেই দুধের মতো সাদা আলোর দিকে তাকাতেও ভয় করছিল। শেষরাতে শেয়ালের ডাক শুনেছিলুম। তার একটু পরে ওপরের কোনও ঘরে ফের ঝনঝন শব্দে কেউ কিছু ছুঁড়ে ফেলল। কে যেন প্রচণ্ড রাগে ভাঙচুর করে বেড়াচ্ছে। কে সে?
তারপর হলঘরের সিঁড়ি বেয়ে ধুপ-ধুপ শব্দ করে কে নেমে এল। সেই ভূতুড়ে হাতিটাই কি? ভয়ে রিভলভারটা বের করে ওত পেতে রইলুম বিছানায়। কিন্তু সেই অলৌকিক হাতি ঘরের দরজা ভাঙতে ফুঁ দিল না। কুকুরের গজরানি শুনলুম। ফের সব চুপ। বাইরে ঝিমধরা জ্যোৎস্নায় একটা প্যাঁচা ক্রা-ক্রাও করে ডাকতে-ডাকতে উড়ে গেল। তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি।
উঠে দেখি, সাড়ে সাতটা বাজে। কর্নেল নেই। সম্ভবত অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। হলঘরের দিকের দরজা খোলা রয়েছে। পরদার পেছন থেকে কে বলল, চা এনেছি স্যার!
গাট্টাগোট্টা চেহারার সেই রাঘব নামে লোকটা ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল। বিনীত ভঙ্গিতে বলল, যখন দরকার হবে, ডাকবেন স্যার। আমার নাম রাঘব। আমি পাশের ঘরেই থাকি।
জয়গোপালবাবুর কথা জিগ্যেস করলে রাঘব বলল, -ম্যাঞ্জারবাবু এখন কুকুরের ঘরে আছেন। ওনার ওই এক নেশা স্যার। সারাদিন কুকুর নিয়েই কাটান।
রাঘব চলে গেলে দক্ষিণের দরজা খুলে ওদিকের বারান্দায় গেলুম। এবার দিনের আলোয় পরিবেশটা স্পষ্ট হচ্ছিল। বসতি এলাকার বাইরে নিরিবিলি জায়গায় এই রাজবাড়িটা যেন নিঝুম এক প্রেতপুরী। বিশাল এলাকা জুড়ে উঁচু পাঁচিলে চারদিক ঘেরা। একসময় যা সাজানো-গোছানো বাগান ছিল, তা এখন প্রায় জঙ্গল হয়ে উঠেছে। তার ভেতর একটা কালো কামানও দেখতে পাচ্ছিলুম। চায়ের পেয়ালা রেখে সিঁড়ি বেয়ে লনে নামলুম। ঘাসে এখনও রাতের শিশির চকচক করছে। একফালি পায়েচলা পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলুম। দক্ষিণের পাঁচিলের সমান্তরালে এই পথ। পুবে এগিয়েছে। পুবের ফটকের অবস্থা জরাজীর্ণ। লোহার কপাট মরচে ধরে ভেঙে পড়েছে। সেখান দিয়ে বেরুলে একটা নদী দেখতে পেলুম। এই তাহলে লোহা নদী। অর্ধবৃত্তাকারে বাঁক নিয়ে। পশ্চিমে ঘুরেছে। এই বাঁকের মুখে উঁচু জমিতে রাজবাড়ি এলাকা। অলক্ষ্মীর মন্দির খুঁজতে ঝোপঝাড় ভেঙে খানিকটা এগিয়ে গেলুম। তারপর দেখি, পাঁচিলের নিচে কে হুমড়ি খেয়ে বসে চুপিচুপি কী যেন করছে।
লোকটার সঙ্গে আমার দূরত্ব মিটার-চল্লিশের বেশি নয়। তার গায়ে কালো কোট দেখেই চমকে উঠলুম। পরমুহূর্তে সে মুখটা এদিকে ঘোরাল। অমনি দেখি, আরে! এ যে সেই প্রফেসর তানাচা। চেঁচিয়ে ডাকলুম, –প্রফেসর তানাচা! হ্যাল্লো প্রফেসর তানাচা!
আমাকে প্রচণ্ড অবাক করে প্রফেসর তানাচা ঝটপট উঠে সামনের উঁচু ঝোপটার ভেতর ঢুকে পড়লেন। এক পলকের জন্য তার হাতে যেন একটা ছুরি দেখলুম। রোদে সেটা চকচক না করলে চোখে পড়ত না। আমি হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে জোরে ডাকতে লাগলুম, -প্রফেসর তানাচা! প্রফেসর তানাচা! শুনুন, শুনুন!
কোনও সাড়া এল না। ভদ্রলোক বেমালুম গা-ঢাকা দিয়েছেন। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, বাঁ-দিকে নদীর ঢাল থেকে একটা ধূসর রঙের টুপি ঠেলে উঠল। তারপর বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ আবির্ভূত হলেন। এই যে জয়ন্ত! খুব সকাল-সকাল ঘুম ভেঙেছে দেখছি। ভেবেছিলুম, তুমি নটার আগে আজ উঠবে না।
উত্তেজিতভাবে বললুম, -কর্নেল, এইমাত্র প্রফেসর তানাচাকে দেখলুম!
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, –হুঁ–পাপাভেরাসিয়া ফ্যামিলি। পপি জেনাসের অন্তর্ভুক্ত।
-কী সব বলছেন! স্পষ্ট দেখলুম প্রফেসর তানাচা একটা ছুরি নিয়ে ওখানে…
বুঝেছি। হোয়াইট পপি। কর্নেল সাদা দাড়ি থেকে একটা পোকা ঝেড়ে ফেললেন। ডার্লিং, তুমি ঘটি না বাঙাল?
রাগ করে বললুম, খাঁটি ঘটি। কিন্তু কী প্রলাপ বকছেন বলুন তো?
তুমি ঘটি। অতএব পোস্ত খেতে ভালোবাস। কিন্তু তুমি কি জানো, পোস্ত হোয়াইট পপিরই ফল?–বলে কর্নেল আমার হাত ধরে পাঁচিলের ধারে নিয়ে গেলেন। ওই দ্যাখো, প্রফেসর তানাচার ছুরি কার গলা ফাঁক করছিল।
ঠাহর করে দেখি, ছ-সাত ইঞ্চি খুদে একরকম উদ্ভিদের ঝুঁকে জায়গাটা ভর্তি। গাছগুলোর ডগার দিকে চেরা দাগ। বললুম, –ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছে না। এ কি প্রফেসর তানাচার ম্যাজিকের কাজে লাগবে নাকি?
কর্নেল হো-হো করে হাসলেন। –এগুলো আফিংগাছ, জয়ন্ত! ওই চেরা জায়গায় যে আঠা জমে উঠবে, তাই নির্ভেজাল আফিং। বেচারা প্রফেসর তানাচার আফিং কেনার পয়সা দিচ্ছিল কোনও উদারচেতা ভূত। বন্ধ করে দেওয়ায় উনি প্রকৃতির দরজায় এসে হাত পেতেছেন। তবে তোমার সঙ্গে তফাতটা হল, তুমি যে গাছের ফল খাও, উনি সেই গাছেরই আঠা খান।
কলকাতা আর লোহাগড়ার দূরত্ব তিনশো কিলোমিটারেরও বেশি। উনি কীভাবে জানলেন এখানকার জঙ্গলে আফিংগাছ আছে?
যেভাবেই হোক, জেনেছেন। আমি কেমন করে জানতে পারি, কোথায় কোন জঙ্গলে দুর্লভ প্রজাতির পাখি আছে?
–যাই বলুন, ওঁর আচরণ খুবই রহস্যময়। ঠাকুরদার কবচ চুরি গেছে বলে ব্যাগ ফেলে উধাও হলেন। তারপর এতদিন বাদে এখানে ওঁকে আফিংয়ের ধান্দায় দেখতে পেলুম। তার চেয়ে অবাক কাণ্ড, আমাকে দেখেই পালিয়ে গেলেন কেন?
–হয়তো ভদ্রলোক বড়ো লজ্জা পেয়েছেন। পাওয়ারই কথা। তাই দূর থেকে দেখেও আমি ওঁর ধারে কাছে যাইনি।
কর্নেল আমার হাত ধরে টেনে পা বাড়ালেন। বললুম, –অলক্ষ্মীর মন্দিরটা কোথায় বলুন তো?
–পেছনে জঙ্গলের ভেতর। অলক্ষ্মীকে দেখলে কিন্তু তোমার শরীর হিম হয়ে যাবে। মূর্তিমতী বিভীষিকা।
-ভয় দেখাবেন না। আমি কচি খোকা নই। আমি দেখতে চাই মূর্তিটা।
–উঁহু। ইস্কাপনের টেক্কার নির্দেশ পালন করো জয়ন্ত। আজ ঠিক রাত দশটায় সে তোমাকে ওখানে যেতে বলেছে। তার আগে নয়। এটা একরকম ভদ্রলোকের চুক্তি, ডার্লিং। মেনে চলা উচিত।
নদী ডাইনে রেখে আমরা পাড় ধরে উত্তরে এগিয়ে চললুম। আমাদের বাঁ-দিকে রাজবাড়ি এরিয়ার টানা উঁচু পাঁচিল। সেই ভাঙা ফটকের পর একটা ভাঙাচোরা ঘর দেখা গেল। কর্নেল বললেন, –এটা একসময়ে রাজাবাহাদুরের বোট-হাউস ছিল। ওই দ্যাখো নৌকো রয়েছে। নৌকোটা নিশ্চয়ই জলে ভাসবার মতো হয়ে নেই। …তারপর থমকে দাঁড়ালেন। একদিকে কাত-হয়ে-পড়া কাঠের ঘরটা থেকে কে একজন বেরুচ্ছিল। সাধুবাবা নাকি? কিন্তু কী বিকট রাক্ষুসে চেহারা সাধুবাবার!
সাধুবাবা না কোনও পাগল? আমাদের দেখেই তেড়ে এল। –কে রে? পালা! শিগগির পালা বলছি। অলক্ষ্মী জেগে উঠেছে। কড়মড় করে মুন্ডু চিবিয়ে খাবে। পালিয়ে যা, পালিয়ে যা!
সে একটুকরো পাথর কুড়িয়ে নিতেই কর্নেল বললেন, -গতিক সুবিধের নয়, জয়ন্ত। কেটে পড়াই ভালো মনে হচ্ছে উনি এক অঘঘারপন্থী সাধু। এঁদের খাদ্য হল মানুষের মড়া।
পাথরটা আমাদের কাছাকাছি এসে পড়ল। আমরা ঘুরে পিঠটান দেওয়ার মতো হাঁটতে থাকলুম। সেই ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকে কর্নেল খিকখিক করে বাচ্চাদের মতো হাসলেন, –দেখলে তো ডার্লিং, কী সাংঘাতিক জায়গা এই লোহাগড়া? খুব সাবধান! আমার বুড়ো, দরকচা, শক্ত মাংসের চেয়ে তোমার মাংস আশা করি ঢের নরম এবং সুস্বাদু। অঘঘারপন্থীদের নোলা দিয়ে জল ঝরবে তোমায় দেখে। অবশ্য তুমি প্রফেসর তানাচার পিশাচ-জাগানো মন্ত্র জানো। আওড়ে দেখতে পারও।
কর্নেল সুর ধরে আওড়ালেন :
কবে যাবি রে সেই সমাজে
ছাড় কুইচ্ছে পোড়া পাম রে। ..
একটু দূরে জয়গোপালবাবুকে দেখা যাচ্ছিল। একটা কুকুর ওঁর সামনে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিল। কুকুরটা আমাদের দিকে দৌড়ে এল। প্রথমে কর্নেলের, তারপর আমার প্যান্ট খুঁকে মনিবের কাছে ফিরে গেল। কর্নেল বললেন, –জয়গোপালবাবু দেখছি ট্র্যাকিং ডগ পোষেন। এটা কী জাতের কুকুর জানো? লাব্রাডর রিট্রিভার। এদের দেখতে কিন্তু দিশি কুকুরের মতো। কানদুটোই যা ঝোলা। এদের অরিজিন নিউফাউন্ডল্যান্ডে। তবে নাগাল্যান্ডেও এ-জাতের কুকুর আছে। শিকারি পাখিকে গুলি করলে বারুদের গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে ঠিক জায়গায় গিয়ে পাখি কুড়িয়ে আনে। কিন্তু তোমার অমন আঁতকে ওঠার কারণ ছিল না। এরা বড় মানুষঘেঁষা কুকুর। লালবাজারে গোয়েন্দা দফতরের ডগস্কোয়াডে লাব্রাডর রিট্রিভার দেখেছি। খুনিকে ধরতে সাহায্য করে।
জয়গোপালবাবু এগিয়ে আসছিলেন আমাদের দিকে। দিনের আলোয় ভালো করে দেখার সুযোগ হল ওঁকে। ভদ্রলোকের পেল্লায় চেহারা। পরনে আঁটো প্যান্ট, স্পোর্টিং গেঞ্জি। চোখে নিকেলের ফ্রেমের চশমা। কাছাকাছি এলে কোত্থেকে আর-একটা উঁচু লম্বাটে ছিপছিপে গড়নের কুকুর গরগর করে তেড়ে এল আমাদের দিকে। উনি শিস দিলে সে পেছনের দু-পা মুড়ে বসে প্রকাণ্ড জিভ বার করে আমাদের দেখতে থাকল। এ কুকুরটা যেন ঘিয়ে-ভাজা। একটুও লোম নেই। লেজটা কাটা। আগের কুকুরটাও যেন ভয়ে তার কাছে ঘেঁষছিল না। কর্নেল জ্ঞান দিলেন আমাকে। –এ হল গিয়ে ডোবারম্যান পিঞ্চার। জায়মান ডগ। খুব হামলাবাজ। এর সম্পর্কে তুমি একটু সাবধান থেকো জয়ন্ত!
জয়গোপালবাবু বললেন, -গুড মর্নিং কর্নেল। মর্নিং জয়ন্তবাবু।
কর্নেল বললেন, -মর্নিং! আপনার কুকুরদুটো দেখে খুব আনন্দ হল জয়গোপালবাবু!
আমার আনন্দ হয় না কর্নেল। কারণ এ ব্যাটারা নিষ্কর্মার ধাড়ি। জয়গোপালবাবু বললেন, রাতে এরা ছাড়া থাকে। তবু ওইসব কাণ্ড হয় স্বকর্ণেই তো শুনেছেন। বরং অ্যালসেশিয়ানটাই কাজের ছিল। অন্তত ছোটাছুটি করে বেড়াত অশরীরীর পেছনে। বেচারার বরাত! সাপের কামড়ে মারা পড়ল।
সে কী! রাজবাড়ি এরিয়ার বিষাক্ত সাপ আছে নাকি? প্রশ্নটা আমিই করলুম।
জয়গোপালবাবু বললেন, –আছে। সাপ নেই কোথায় বলুন?
কর্নেল বললেন, –ওখানে এক সাধুবাবা থাকেন দেখলুম।
সাধু?–জয়গোপালবাবু ভুরু কুঁচকে বিরক্তভাবে বললেন, ও তো জনাই-পাগলা। একসময় রাজবাড়িতেই কাজকম্ম করত-টরত। রাঘবকে দেখেছেন তো? ওর মাসতুতো দাদা। বললে বিশ্বাস করবেন না, জনাই কঁচা মাংস খায় রাক্ষসের মতো। অ্যালসেশিয়ানটাকে ওখানে পুঁতে দিয়েছিলুম। ওই যে ফলকটা দেখছেন, ওখানে। কবর থেকে তাকে তুলে রাত্রিবেলা করেছে কী, জনাই কামড়ে-কামড়ে খাচ্ছে। টর্চের আলো পড়তেই ব্যাটা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
কথা বলতে-বলতে আমরা রাজবাড়ির দিকে এগিয়ে গেলুম। দক্ষিণের বারান্দায় পৌঁছে কর্নেল হঠাৎ বললেন, –আচ্ছা জয়গোপালবাবু, তারানাথ চাটুজ্জে নামে কাউকে চেনেন?
জয়গোপালবাবুর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। –হুঁ–লোহাগড়া এস্টেটের নায়েব ছিলেন ব্রজনাথবাবু। আমি তাকে দেখিনি। তারই নাতি। রাজবাড়ি এরিয়ার ভেতর একসময় ওঁদের ফ্যামিলি থাকত। তারাদার বাবা হরনাথ রাজবাড়ির সরকারমশাই ছিলেন। তারাদা চিরকাল বাউণ্ডলে মানুষ। ম্যাজিশিয়ান হওয়ার বাতিক চড়েছিল মাথায়। তা আপনি ওঁকে চেনেন নাকি?
-কলকাতায় একবার আলাপ হয়েছিল। ম্যাজিকের শোয়ে।
ম্যাজিক কি সত্যি দেখাতে পারত তারাদা? আমার বিশ্বাস হয় না। জয়গোপালবাবু একটু হাসলেন, তবে হ্যাঁ–তাসের দু-একটা ম্যাজিক জানত বটে। দশজোড়া তাস নিয়ে থটরিডিংয়ের একটা খেলা দেখেছিলুম। সেটা অবশ্য বেশ অবাক হওয়ার মতো খেলা। ধরুন, প্যাকেট থেকে দশজোড়া বেছে নিতে বলল। তারাদা কিন্তু সেগুলো দেখছে না। বলল, একজোড়া করে তাস মনে রাখ। ধরুন, আমি মনে রাখলুম ইস্কাপনের সাহেব আর হরতনের তিরি। আপনি মনে রাখলেন চিড়িতনের বিবি আর রুইতনের গোলাম। জয়ন্তবাবু যে-জোড়াটা মনে রাখলেন, সেটা হল হরতনের গোলাম আর ইস্কাপনের তিরি। কেমন তো? এবার তাসগুলো চারটে সারিতে সাজিয়ে রাখা হল চিত করে। তারা বলল, তোমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা তাস-জোড়া এক সারিতে থাকতে পারে, আবার দুই সারিতেও থাকতে পারে। শুধু আমায় বলল, কোন সারিতে আছে। আশ্চর্য, প্রত্যেক সারিতে পাঁচটা করে তাস। অথচ তারাদা ঠিক জোড়াটা বের করে দিত।
কর্নেল বললেন, -বাঃ! তো তারানাথবাবু এখন কোথায় থাকেন?
-কলকাতায় থাকে শুনেছি। কখনও-সখনও আসে এখানে। এলে কখনও আমার কোয়ার্টারে, কখনও রাঘবের ঘরে থাকে। কিছু ঠিক নেই। রাজাবাহাদুর তো তারাদাকে দেখলেই তাড়া করবেন। একবার রাজবাড়ি থেকে চুরিচামারি করে পালিয়েছিল। সেই থেকে এ বাড়ি ঢোকা বারণ। কিন্তু কী করি বলুন? এসে পড়লে দেখে মায়া হয়। আশ্রয় দিই। কিন্তু বুঝতেই পারছেন, রাজাবাহাদুর জানতে পারলে কেলেংকারি হবে।
নদীর ধারে ওঁকে এক পলক দেখছিলুম যেন। চোখের ভুল হতেও পারে। –যে আনমনে কর্নেল কথাটা বললেন।
কিন্তু কর্নেলের কথা শুনে জয়গোপালবাবু একটু অবাক হলেন। সে কী! এলে তো জানতে পারতুম। যাকগে, আপনাদের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করি। তাছাড়া সাড়ে-নটায় রাজাবাহাদুর আপনার সঙ্গে দেখা করবেন বলেছেন। নটা বাজে প্রায়।
জয়গোপালবাবু বেরিয়ে গেলেন। জানালা দিয়ে দেখলুম, কুকুরদুটো ওঁর দুপাশে হেঁটে যাচ্ছে বডিগার্ডের মতো। …
