একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৯)

সিঁড়ি দিয়ে রানওয়ের উপরে নেমে আসতে-আসতে বললুম, “এবারে তো বাইরে গিয়ে ট্যাক্সি ধরতে হবে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সত্যপ্রকাশের কথা মনে আছে?”

 

‘মুকুন্দপুরের মনসা’ যাঁরা পড়েছেন, শিলিগুড়ির টিম্বার ট্রাক আর হোটেলের ব্যবসায়ী সত্যপ্রকাশ চৌধুরির নাম তাঁদের না জানার কথা নয়। বললুম, “তা কেন মনে থাকবে না? তাঁর সেই নতুন হোটেল এখন কেমন চলছে?”

 

“রমরমিয়ে চলছে। তা কাল রাত্তিরে মহেশ কুলকার্নির সঙ্গে কথা হয়ে যাবার পর সত্যপ্রকাশকে এসটিডি করেছিলুম। দিন দুয়েকের জন্যে আমরা সিকিম যাচ্ছি শুনে বললেন, ট্যাক্সি ভাড়া করতে হবে না, ড্রাইভারসুদ্ধ আমি একটা গাড়ি দিয়ে দেবখন, ওদিককার রাস্তাঘাট তার মুখস্থ, সে-ই আপনাদের ঘুরিয়ে আনতে পারবে।’ এখন দেখি গাড়িটা তিনি পাঠালেন কি না।”

 

টার্মিনাল বিল্ডিং থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখলুম সত্যপ্রকাশ নিজেই গাড়ি নিয়ে চলে এসেছেন। বললেন, “যাবার পথে আমি আমার হোটেলে নেমে যাচ্ছি, ওখান থেকে ড্রাইভারকে আপনাদের সঙ্গে দিয়ে দেব।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “গাড়ি তো আমিও চালাতে জানি, কিরণবাবুও চালাতে জানেন, তা হলে আর বাড়তি একজন ড্রাইভার দেবার দরকার কী।”

 

সত্যপ্রকাশ তাতে রাজি হলেন না। বললেন, “না মশাই, গাড়ির কন্ডিশন ভাল ঠিকই, তবে একে পাহাড়ি পথ, তায় রাস্তার অবস্থা সব জায়গায় খুব সুবিধের নয়, সঙ্গে একজন মেকানিক থাকা দরকার। যে ছেলেটাকে সঙ্গে দিচ্ছি, সে মেকানিকের কাজকর্মও খুব ভাল জানে।”

 

তো তা-ই হল। সত্যপ্রকাশ তাঁর হোটেলে নেমে অল্পবয়সি একটি নেপালি ড্রাইভারকে আমাদের গাড়িতে তুলে দিলেন। তার আগে অবশ্য এক কাপ করে চা না খাইয়ে ছাড়লেন না। সেই সঙ্গে ভাদুড়িমশাইয়ের কাছ থেকে কথা আদায় করে ছাড়লেন যে, ফিরতি পথে তাঁর এই হোটেল থেকে লাঞ্চ সেরে তবে আমরা বাগডোগরায় গিয়ে প্লেন ধরব। শিলিগুড়ি থেকে সাড়ে তিনটে নাগাদ আমরা সিকিমের পথে রওনা হলুম।

 

আমরা যে কার্শিয়াং কিংবা দার্জিলিংয়ে নয়, সিকিমে যাচ্ছি, ভাদুড়িমশাই সে-কথা প্লেনেই আমাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সদানন্দবাবুর ভুল তখনও ভাঙেনি। হিলকার্ট রোড ধরে গাড়ি খানিক এগোতেই তিনি তাই বললেন, “ও মশাই, একটু বাদেই নাকি আমরা উপরে উঠতে শুরু করব, তা হলে তো গরম জামাকাপড় এখুনি পরে নেওয়া ভাল, নইলে শেষকালে না দার্জিলিংয়ে পৌঁছবার আগেই শীতে জমে যাই।”

 

ভদ্রলোককে বুঝিয়ে বলতে হল যে, আমরা দার্জিলিংয়ে যাচ্ছি না, সিকিমে যাচ্ছি। শুনে তিনি একগাল হেসে বললেন, “বাঃ, তা হলে তো ভালই হয়, বেশ একটা নতুন জায়গা দেখা হয়ে যাবে।”

 

দার্জিলিংয়ে গেলেও যে সেটা তাঁর পক্ষে একটা নতুন জায়গা দেখাই হত, তা আর তাঁকে বললুম না।

 

শিলিগুড়ি থেকে টয় ট্রেনে কি ট্যাক্সিতে করে কতবারই তো দার্জিলিংয়ে গিয়েছি। কিন্তু একটা কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। সেটা এই যে, তার তুলনায় সিকিমে যাবার এই পথটা আরও অনেক বেশি মনোরম। এ-পথে পাহাড়ের শোভা তো আছেই, সেই সঙ্গে পাহাড়ের খাদ দিয়ে তুমুল উচ্ছ্বাসে বয়ে যাওয়া তিস্তাকে যে অনেকক্ষণ ধরে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া যায়, সেটা একটা বাড়তি পাওনা

 

করোনেশন ব্রিজ ছাড়িয়ে আরও খানিক এগিয়ে তিস্তাবাজার। সেখানে গাড়ি থামিয়ে ভাদুড়িমশাই এক কার্টন সিগারেট কিনলেন। তারপর যখন আমরা নদী পেরিয়ে অন্য পাড়ে পৌঁছলুম, তখন ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে একটা সোয়েটার পরে নিন, সদানন্দবাবু। রাস্তা এখন ক্রমেই আরও উঁচুতে উঠে যাবে।”

 

রাস্তা সত্যিই ক্রমে আরও উঁচুতে উঠতে লাগল, আর পাহাড়ের গায়ে পাক খেতে-খেতে যতই আমরা উঁচুতে উঠতে লাগলুম, ততই বাড়তে লাগল শীতের দাপট। আরও খানিক এগিয়ে একটা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে আমাদের নেপালি ড্রাইভার ইন্দ্রবাহাদুর বলল, “সাব, এখান থেকে বাঁদিকের রাস্তাটা গ্যাংটকে চলে গিয়েছে, আর ডানদিকের রাস্তা গিয়েছে নামচিতে। আপনারা কোথায় যাবেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ডানদিকের রাস্তা নাও, আমরা নামচিতে যাব।” তারপর আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, “নামচি হল সাউথ সিকিমের হেডকোয়ার্টার্স। ওখানে যাচ্ছি কেন জানেন?”

 

“কেন?”

 

“গঙ্গাধর চামলিনের সঙ্গে দেখা করতে।”

 

“চামলিন?” ঢোক গিলে বললুম, “ইনি কি পবনকুমার চামলিনের কেউ হন নাকি?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “চিফ মিনিস্টারের কথা বলছেন তো? আরে না না, তাঁর কেউ হন না, শুধু ওই পদবিটাই এক। তবে কিনা ইনিও নেহাত কম যান না। জেঙ্কিন্‌স অ্যান্ড জেঙ্কিসের তো এখানে একটা মস্ত ডিস্টিলারি রয়েছে, সিকিমে ইনি তার সোল বটলিং এজেন্ট। কুলকার্নি বলল, আমি যে খবর চাইছি, গঙ্গাধর হয়তো সেটা দিতে পারবেন। দেখা যাক।”

 

নামচিতে পৌঁছতে সাড়ে ছ’টা। রাজধানী গ্যাংটকের তুলনায় নামচির অলটিচিউড অনেক কম, তার মধ্যে আবার তার বাজার-এলাকাটা আরও নিচু জায়গায়। সেখানে মোটামুটি চলনসই একটা হোটেলে দুটো ঘর জোগাড় করতে যে হাড়-কাঁপানো শীতের মধ্যেও আমাদের ঘাম ছুটে গেল, তার কারণ আর কিছুই নয়, দিন দুয়েকের মধ্যেই এখানে শুরু হবে কাঞ্চনজঙ্ঘা ফেস্টিভ্যাল। ওড়িশা, পঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্র, নাগাল্যান্ড ইত্যাদি হরেক স্টেট থেকে নাচগানের ট্রুপ আসছে তাতে যোগ দেবার জন্যে। সেই উৎসবের হিড়িকে হোটেলের ঘরগুলো তো বটেই, নামচির তাবৎ সরকারি বাংলো এমনকি ইয়ুথ হস্টেলেরও প্রতিটি কটেজ ইতিমধ্যে অগ্রিম বুক করা হয়ে গেছে। হোটেলের মালিক তাই কিছুতেই আমাদের জায়গা দিতে চাইছিলেন না। শেষ পর্যন্ত এই শর্তে দু’খানা ঘর তিনি ছেড়ে দিলেন যে, ন’তারিখ সকালেই আমরা হোটেল থেকে চেক আউট করব। ড্রাইভার ইন্দ্রবাহাদুরকে নিয়ে অবশ্য কোনও ঝামেলা হল না, নিজে থেকেই সে জানাল যে, এখানে তার এক বন্ধুর আস্তানা আছে, দু’রাত সে সেখানেই দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *