(৮)
আজ ৭ মার্চ, মঙ্গলবার। দমদম এয়ারপোর্টের যে নতুন ডোমেসটিক টার্মিনাল হয়েছে, আপিস থেকে ছুটি নিয়ে বেলা বারোটা নাগাদ তার দোরগোড়ায় এসে হাজিরা দিয়েছি। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন সদানন্দবাবু। জীবনে এই প্রথম এরাপ্লেনে উঠবেন, ফলে তিনি উৎফুল্ল অবশ্যই, কিন্তু উদ্বিগ্ন তার চতুর্গুণ। উদ্বেগটা অবশ্যই তিনি প্রকাশ করতে চাইছেন না, বরং সেটাকে চাপা দেবার জন্যে মাঝে-মাঝেই বলছেন, “এ বেশ একটা থ্রিলিং ব্যাপার হল, কী বলেন?”
আমি কিছুই বলছি না। আসলে, একেবারেই ভিন্ন-কারণে, একটু-একটু উদ্বেগ বোধ করতে শুরু করেছি আমিও। বাগডোগরার ফ্লাইট একটায়। নিয়মমতো তার এক ঘন্টা আগে এয়ারলাইনের কাউন্টারে আমাদের রিপোর্ট করার কথা। কিন্তু ঘড়িতে যদিও সওয়া বারোটা বাজে, সঙ্গে টিকিট নেই বলে আমরা ভিতরে ঢুকতে পারছি না। টিকিট ভাদুড়িমশাই নিয়ে আসবেন। কাল রাত্তিরে যখন তিনি ফোন করে বাগডোগরা যাওয়ার কথা বলেন, তখন অন্তত সেইরকমই জানিয়েছিলেন। এদিকে এখনও তাঁর দেখা নেই। কেন যে হঠাৎ বাগডোগরা যেতে হচ্ছে, তাও আমি জানি না।
ভাদুড়িমশাই সাড়ে বারোটায় এলেন। দেরির কারণ জিজ্ঞেস করতে বললেন, “কিচ্ছু দেরি হয়নি। এগারোটা নাগাদ এয়ারপোর্টে ফোন করেছিলুম, তা ওঁরা বললেন, বাগডোগরার ফ্লাইট দেড়টার আগে ছাড়ছে না। খবরটা দেবার জন্যে সওয়া এগারোটায় আপনাকে ফোন করে শুনলুম যে, আপনি ট্যাক্সি ধরতে বেরিয়ে পড়েছেন। …যাক গে, টিকিট নিয়ে এসেছি, এবারে ভিতরে ঢোকা যাক।”
ঝকঝকে এয়ার-টার্মিনাল। সদ্য তৈরি হয়েছে, এখনও কোথাও ঝুলকালির দাগ লাগেনি। একমাত্র হ্যান্ডব্যাগ ছাড়া আমাদের কারও সঙ্গেই যে কোনও লাগেজ নেই, সেটা একটা বাড়তি সুবিধে। ভিতরে ঢুকে, কাউন্টার থেকে বোর্ডিং কার্ড নিয়ে, সিকিউরিটি চেক করিয়ে আমরা দোতলায় উঠে আসি। এর মধ্যে একটা কথা বলা দরকার। দোতলায় ওঠার জন্যে যে এস্কেলেটার বসানো হয়েছে, সদানন্দবাবুকে সেটা ব্যবহার করতে রাজি করানো যায়নি। আছাড় খেয়ে পা ভাঙার ভয় পাচ্ছেন কি না জিজ্ঞেস করতে অবশ্য অম্লান হেসে বললেন, ‘আরে না মশাই, এ তো আর নতুন-কিচু নয়, পাতাল রেলের ইস্টিশানে তো আচেই, তা ছাড়া লালদিঘির পশ্চিম দিকে আমাদের রিজার্ভ ব্যাঙ্কে সেই কবে থেকেই দেখচি, শয়ে শয়ে জোয়ান-মদ্দ বাচ্চা-বুড়ো সেখানে হাসতে হাসতে উঠচে-নামচে, তা হলে আর ভয় পাব কেন, তবে কিনা দরকার কী, পাশে যখন সিঁড়ি একটা রয়েইচে, তখন সেটা দিয়ে ওঠা-নাবাই তো ভাল, তাতে খানিক এক্সারসাইজও হয়।’
উপরে উঠে এক কাপ করে কফি খাওয়া গেল। টিভি দেখেও সময় কাটল খানিকটা। তারপরেই বোর্ডিং কল। লাগেজ আইডেন্টিফিকেশনের ঝঞ্ঝাট ছিল না, এয়ারোব্রিজ দিয়ে প্লেনের ভিতরে সেঁদিয়ে আমরা আসন খুঁজে নিয়ে বসে পড়লুম। পাশাপাশি তিনটে আসনই পাওয়া গিয়েছিল। জানলার ধারের সিটটা যে সদানন্দবাবুকে ছেড়ে দিতে হল, সে-কথা না-বললেও চলে। ভাদুড়িমশাই মাঝখানকার সিটে বসলেন, আমি আইলের ধারে।
প্লেন টেক-অফ করল একটা চল্লিশে। সদানন্দবাবু তন্ময় হয়ে আকাশের মেঘমালা আর পৃথিবীর নকশা-কাটা জায়গা-জমি দেখতে লাগলেন। ভাদুড়িমশাই আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, “কোথায় যাচ্ছি, জিজ্ঞেস করলেন না তো?”
বললুম, “এখন তো বাগডোগরায় যাচ্ছি। সেখান থেকে, যদ্দুর বুঝতে পারছি, কার্শিয়াং কি দার্জিলিংয়ে।”
“কী করে বুঝলেন?”
“বাঃ, কাল রাত্তিরে আপনিই তো বলে দিলেন যে, সঙ্গে যেন গরম কিছু জামাকাপড় নিই। তাতেও বুঝব না?”
“গরম জামাকাপড় এনেছেন তো?”
“ওই একটা গরম প্যান্ট আর ফুলহাতা একটা সোয়েটার। গরম একজোড়া মোজাও অবশ্য এনেছি। হ্যান্ডব্যাগে আর কত ধরবে?”
“সদানন্দবাবু?”
“ওঁরও ওই একই জিনিস। সেই সঙ্গে একটা বাঁদুর টুপি…মানে ওই যেটা গত বছর মুসৌরিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর দুটো মাফলার। একটা আমাকে দেবেন।”
“ভাল করেছেন।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কিন্তু আমরা কার্শিয়াংয়েও যাচ্ছি না, দার্জিলিংয়েও যাচ্ছি না।”
“তা হলে কোথায় যাচ্ছি?”
“সিকিম।”
“সে কী, সিকিমে যাবার দরকার হল কেন?”
“হল, তার কারণ, কাল রাত্তিরে মহেশ কুলকার্নির সঙ্গে কথা বলে বুঝলুম যে, জেঙ্কিন্স অ্যান্ড জেঙ্কিস কম্প্যানির হাঁড়ির খবর এমন একটিও নেই, যা এ-লোকটা জানে না। সব জানে, স-ব। বুড়ো দেখলুম খবরের ডিপো।”
“বলরামদাস কাংকারিয়া কেন রঘুবীর ঘোষকে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিল, তাও শুনলেন?”
“তাও।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মানে একটা আন্দাজ পেয়েছি। আরে মশাই, ও-সব শালা ফালা বাজে কথা। অফিস-ডিসিপ্লিন বলে একটা ব্যাপার আছে তো? শালার উপরে বলরামদাস যতই চটে থাকুক, তার নাক ফাটিয়ে রঘুবীর নিশ্চয়ই রেহাই পেতেন না। রিজাইন যদি না-ও করতেন তো চাকরি তাঁর যেতই।”
“অথচ বলরামদাস নাকি তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্যে খুব ঝুলোঝুলি করেছিল। রঘুবীর নিজে এলেন না বটে, কিন্তু তাঁর ছেলে বড় হওয়া মাত্র বলরামদাস তাকে জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিসে ঢুকিয়ে নিল।”
“নিল বলবেন না, বলুন নিতে বাধ্য হল। কেন বাধ্য হল, মহেশ কুলকার্নির কাছে সেটাই জানতে চেয়েছিলুম।”
“জানা গেল?”
“তেমন পরিষ্কারভাবে কি আর এ-সব কথা জানা যায়? ঝানু লোক তো, তাই খোলাখুলি কিছু বলতে চায় না। তবে যেটুকু যা বলেছে, তার থেকে একটা আন্দাজ ঠিকই করে নিয়েছি। …ও হ্যাঁ, একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, মিসেস ঘোষকে দেখে আপনার কী মনে হল?”
“রঘুবীর ঘোষের স্ত্রীর কথা বলছেন?”
“হ্যাঁ।”
“নিষ্ঠাবতী বিধবা মহিলা। একটু জেদি স্বভাবের। ছেলের মৃত্যুতে যতই আঘাত পেয়ে থাকুন, ভেঙে পড়েননি। আর হ্যাঁ, ভদ্রমহিলা বোধহয় বাঙালি নন।”
“আর-কিছু মনে হল না?”
“আবার কী মনে হবে?”
“তার মানে ভদ্রমহিলাকে আপনি চিনতে পারেননি।” ভাদুড়িমশাই হাসলেন। “ফুলকুমারী। জন্মসূত্রে সিকিমিজ, তখন ওঁর পদবি ছিল গুড়ুং। পরে, প্রথম বিবাহের সূত্রে ওঁর পদবি পালটে স্টুয়ার্ট হয়ে যায়। রঘুবীর ঘোষ ওঁর দ্বিতীয় স্বামী। দ্বিতীয় বিয়ের পরে কাগজে ওঁদের ছবিও বেরিয়েছিল। প্রথমে বিলেতের কাগজে, পরে এ-দেশের। বোম্বাইয়ের টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে কলকাতার ইস্টার্ন কুরিয়ার, নামজাদা কোনও কাগজই বাদ পড়েনি। আপনার মনে থাকা উচিত ছিল, মশাই।”
একেবারেই মনে পড়ল না। তবু আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি হিসেবে বললুম, “তখন তো ওঁর বয়েস অনেক কম ছিল। সেই সময়ের ছবি হয়তো দেখছিলুম, কিন্তু তার সঙ্গে এখনকার চেহারার মিল কী করে খুঁজে পাব?”
ভাদুড়িমশাই আমার প্রশ্নের জবাব দেবার আগেই হাতে-হাতে খাবারের প্যাকেট ধরিয়ে দেওয়া হল। ফলে কথাবার্তা আর তখনকার মতো এগোল না। একটানা নিসর্গদৃশ্য দেখতে-দেখতে সদানন্দবাবুরও সম্ভবত ক্লান্তি এসে গিয়েছিল। স্যান্ডুইচ, মিষ্টি আর চায়ের পর্ব শেষ করে তিনি পরিতৃপ্ত হেসে বললেন, “ভাবছি, সামনের পুজোয় আমার ওয়াইফকে নিয়ে দার্জিলিং গেলে মন্দ হয় না। কম্লিটাকেও নিয়ে যাব। এরাপ্লেনেই যাওয়া ভাল, কী বলেন?”
নেহাতই এক ঘন্টার ফ্লাইট। খুচরো আরও দু’চারটে কথাবার্তার পরেই পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ঘোষণা ভেসে এল যে, এবারে আমরা বাগডোগরায় নামছি।
