একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৮)

রাত্তিরে কে ফোন করল, সেটা জানার জন্যে কৌতূহল নেহাত কম ছিল না। আপিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে, সদানন্দবাবুকে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে তাই ছ’টার মধ্যেই কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাটে চলে আসি। এসে শুনলুম, প্রেশার বেড়ে গেছে বলে অরুণ সান্যাল আজ আর চেম্বারে যাননি। শুনে ধরেই নিয়েছিলুম যে, তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন, বাড়িতে থাকলেও আজকের বৈঠকে তাঁকে পাওয়া যাবে না। ফলে, ড্রয়িরুমে ঢুকে যখন দেখলুম, কী একটা বিষয় নিয়ে ভাদুড়িমশাই আর কৌশিকের সঙ্গে তিনি তুমুল তর্ক জুড়ে দিয়েছেন, তখন স্বভাবতই একটু হকচকিয়ে যাই। সত্যিই শরীর খারাপ হয়েছে কি না জিজ্ঞেস করতে তিনি যে-রকম অর্থপূর্ণভাবে হাসলেন, তাতে অবশ্য বুঝতে পারলুম যে, বিকেলে আমরা আসছি শুনে তিনি আর বাড়ি থেকে বেরোননি। মুখে অবশ্য অন্য কথা বললেন। কোনও সিরিয়াস কেস নাকি নেই, “যা আছে তা আমার জুনিয়ারই সামলে দিতে পারবে।” সদানন্দবাবু তাতে মন্তব্য করলেন যে, আড্ডার লোভে “মহাত্মাদেরও দেকচি ছলের অভাব হয় না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিদিশা দেবীকে কেমন লাগল?”

 

বললুম, “ওটাই কি ওঁর নাম নাকি?”

 

“গার্হস্থাশ্রমের নাম বেলা দেবী। ফিল্মে নেমেছিলেন বেহুলা দেবী নাম নিয়ে। ছবির নাম ‘হারিয়ে পাওয়া’। না না, নায়িকা নয়, নায়িকার বান্ধবী। নেহাতই মাইনর রোল। কিন্তু তাতেও বিশেষ সুবিধে করতে পারেননি বলে ফিল্ম-কেরিয়ার ওই একটা ছবিতেই শেষ হয়ে যায়। তখন আসেন যাত্রা-কোম্পানিতে। ইতিমধ্যে ফের নাম পালটায়। বেহুলা দেবী হয়ে যান বিদিশা দেবী। এ-সব খবর অবশ্য সত্যপ্রকাশ চৌধুরির কাছ থেকে পাওয়া।”

 

“কাল রাত্তিরে দুটো ফোন এসেছিল বলছিলেন না? কার ফোন? সত্যপ্রকাশের?”

 

“রাইট। দুটো ফোনই সত্যপ্রকাশের। একটা করেছিলেন সাতটা নাগাদ, অন্যটা রাত বারোটার একটু পরে।”

 

“কিছু জানা গেল?”

 

“অনেক কিছুই জানা গেল।” ভাদুড়িমশাই হাসলেন, “প্রথম ফোনটা করেছিলেন বেঞ্জামিন স্টুয়ার্টের মৃত্যুর এগজ্যাক্ট ডেটটা জানাবার জন্য। স্টুয়ার্ট টি কোম্পানির শিলিগুড়ি-আপিস থেকে ওটা খুব সহজেই জোগাড় করা গেছে। তারিখটা হল ১৯৫১ সালের চৌঠা মে। ফুলকুমারীর সঙ্গে বেন স্টুয়ার্টের বিয়ের তারিখটা মনে আছে?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আচে বই কী? ১৯৫০ সালের সাতুই জুন। এটা আমরা গ্যাংটকে মিঃ বিক্রমবাহাদুর দোর্জির কাছে শুনেছিলুম।”

 

“এই সঙ্গে আর-একটা খবরও তিনি দিয়েছিলেন। সেটা এই যে, ফুলকুমারীর সঙ্গে বিয়ের পর বছর-না-ঘুরতেই বেন্ স্টুয়ার্ট মারা যায়। খবরটা মিঃ দোর্জি পেয়েছিলেন তাঁর এক বন্ধুর কাছ থেকে। দেখা যাচ্ছে সেটা ভুল খবর নয়। অন্তত সত্যপ্রকাশের দেওয়া তারিখের সঙ্গে এটা ট্যালি করে যাচ্ছে। পঞ্চাশের সাতুই জুন থেকে একান্নর চৌঠা মে। স্টুয়ার্ট সত্যিই তার দ্বিতীয় দাম্পত্যজীবনের সুখ পুরো এগারোটা মাসও ভোগ করতে পারেনি।”

 

“ছেলেপুলে হয়েছিল?”

 

“বেন স্টুয়ার্টের জীবদ্দশায় হয়নি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “পসথুমাস চাইল্ড। কিন্তু ও-কথায় পরে আসছি। আগে বরং সত্যপ্রকাশের দ্বিতীয় ফোনের কথা বলি।”

 

কৌশিক বলল, “দ্বিতীয় ফোন মানে ওই যেটা কাল রাত বারোটার পরে এসেছিল। ভদ্রলোক তাতে অনেক মজার খবর দিলেন।”

 

“আমি অবশ্য তার খানিক খানিক কাল শিলিগুড়িতেই আন্দাজ করে নিয়েছিলুম।” কৌশিকের দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা নইলে আর বীরেশ্বর অপেরা সম্পর্কে ওঁকে খোঁজ নিতে বলবই বা কেন, আর ফোনটা আসার অনেক আগেই কেন এই ডিসিশান নেব যে, বীরেশ্বর সেন যখন বাড়ির বাইরে থাকবে, তখন তার ফ্ল্যাটে গিয়ে মিসেস সেনকে একবার চাক্ষুষ করাই চাই? সদানন্দবাবুকে একটা যাত্রা-কোম্পানির মালিক সাজিয়ে মিসেস সেনকে আমাদের নতুন পালার হিরোইন হবার অফার দেব, এটা তো আমি অনেক আগেই ঠিক করেছিলুম রে!”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “তা করেছিলেন। তবে কিনা উনি মিসেস সেন নন। বীরেশ্বর সেনের সঙ্গে ওঁর বিয়ে-টিয়ে হয়নি। নিজেই তো বললেন যে, ফ্ল্যাটটা ওঁর, সেখানে উনি বীরেশ্বর সেনকে থাকতে দিয়েচেন মাত্র, তা ছাড়া কোনও সম্পর্ক নেই।”

 

আমি বললুম, “ও-সব কথা ছেড়ে এখন সত্যপ্রকাশ কী খবর দিলেন, সেইটে বলুন তো।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “ঠিক কথা। কাম টু দ্য পন্ট, কাম টু দ্য পন্ট।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আসছি। প্রথমেই বলি, সত্যপ্রকাশ বিস্তর খবর দিয়েছেন।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “এত অল্প সময়ের মধ্যে এত খবর জোগাড় করলেন কীভাবে। প্রথমে স্টুয়ার্ট-সায়েব কবে মারা গেচেন, সেই খবর, তারপর বীরেশ্বর অপেরার খবর! এ তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। খুব কাবিল আদমি বলতে হবে। তাই না?”

 

“কাবিল লোক তো বটেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে কিনা বীরেশ্বর অপেরার হাঁড়ির খবর জোগাড় করতে তাঁকে হোটেল ছেড়ে বেরোতে হয়নি। ওটা খুব সহজেই পেয়ে গেছেন।”

 

বললুম, “তার মানে?”

 

“মানে আর কিছুই নয়, এইসব যাত্রা-পার্টি যখন দলবল নিয়ে বাইরে শো করতে যায়, তখন মফস্বল-টাউনে গিয়ে কে কোথায় থাকবে, সেটা ঠিক করবার জন্যে আগেভাগেই দু-একজন লোককে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সেখানে। তা বীরেশ্বর অপেরা থেকে যাকে শিলিগুড়িকে পাঠানো হয়েছিল, সে গিয়ে ওখানকার লোকাল স্পনসরদের জানায় যে, দলের অন্য সব লোকদের নিয়ে ভাবনার কিছু নেই, তবে হিরোইন কাঞ্চনমালা আর প্রোপ্রাইটার বীরেশ্বরবাবুর থাকার জন্য ভাল হোটেল চাই। অবশ্য দুটো ঘরের দরকার হচ্ছে না, ডবল-বেডের একটা ভাল ঘর হলেই চলবে, তার কারণ সম্পর্কে ওঁরা স্বামী-স্ত্রী।”

 

“অ্যাঁ,” চোখ কপালে তুলে সদানন্দবাবু বললেন, “বলেন কী! ব্যাটা কলকাতায় থাকচে বিদিশা দেবীর সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে, আর এদিকে কাঞ্চনমালা কিনা ওর ওয়াইফ! আরে ছ্যাছ্যা!”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “তা তো হতেই পারে। একজনের ফ্ল্যাটে একটা ঘর নিয়ে আছে বলেই যে আর-একজনকে বিয়ে করা যাবে না, এমন তো কোনও কথা নেই।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু মর‍্যালিটি বলে একটা ব্যাপার তো রয়েচে! নাকি তাও নেই?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও-সব তক্কো ছেড়ে দিয়ে আসল কথাটা শুনুন। শিলিগুড়ির যেটা সেরা হোটেল, সেখানে ঘর না-পেয়ে নেক্সট বেস্ট অ্যাকোমোডেশানের জন্যে ওরা সত্যপ্রকাশের হোটেলে চলে আসে। সত্যপ্রকাশ ঘরের ব্যবস্থা করে দেন। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কটা যে ফিশি, এইরকম একটা আন্দাজ অবশ্য করেছিলেন। তাই এমনিতে হয়তো ঘর দিতেন না, ঘর নেই বলে ভাগিয়ে দিতেন, কিন্তু আমি তো ওঁকে বীরেশ্বর অপেরা সম্পর্কে একটু খোঁজ নিতে বলেছিলুম, তাই শুধু যে ঘরের ব্যবস্থা করে দিলেন, তা নয়, কলকাতা থেকে যে লোকটিকে ওখানে পাঠানো হয়েছিল, পরদিনই সে যে সকালের বাস ধরে কলকাতায় ফিরবে, এইটে শুনে এক রাত্তিরের জন্যে ওখানেই তারও থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। তারপর বার-এ নিয়ে গিয়ে পরপর কয়েক পেগ দিশি হুইস্কি খাওয়াতেই লোকটার মুখের আর-কোনও আগল রইল না, বীরেশ্বর অপেরা সম্পর্কে তাবৎ তথ্য একেবারে গলগল করে বেরিয়ে আসতে লাগল।”

 

বললুম, “বেলা দেবী থেকে বেহুলা দেবী, তারপর বেহুলা থেকে বিদিশা—এ-সব খবর তা হলে সত্যপ্রকাশ পেয়েছিলেন ওই লোকটার কাছ থেকেই?”

 

“অবশ্য।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেইসঙ্গে বেলা দেবী যে কেন ঘর ছেড়েছিলেন, সেটাও জানা গেল।”

 

“কেন?”

 

“গান আর অভিনয়ের দিকে ছেলেবেলা থেকে একটা টান ওঁর ছিলই। স্কুল আর কলেজের অ্যানুয়াল ফাংশানে যেমন গান গেয়েছেন, তেমন অভিনয়ও করেছেন। দু’একটা কাগজে তার প্রশংসাও বেরিয়েছিল। গান আর অভিনয়ের দিকে ওঁর টানটা তাতে বেড়েছে বই কমেনি। এই সময়ে ওঁর বিয়ে হয়ে যায়। বড়লোকের মেয়ে নন, কিন্তু দেখতে ছিলেন সুন্দরী, ফলে বড়-ঘরে বিয়ে হওয়া আটকায়নি। বিয়ের পর কয়েকটা বছর ভালই কাটে, একটা ছেলেও নাকি হয়েছিল। কিন্তু তারপরেই বাধল ঝামেলা।”

 

“ঝামেলা কী নিয়ে?”

 

ভাদুড়িমশাই সিগারেট ধরালেন একটা। তারপর গলগল করে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “গান আর অভিনয় নিয়ে। পুরনো সেই টানটা ইতিমধ্যে ফের মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। উনি পাবলিক ফাংশনে গান গাইতে চান, অভিনয় করতে চান। এ-দিক ও-দিক থেকে কিছু-কিছু উশকানিও দেওয়া হচ্ছিল বোধহয়।”

 

বললুম, “শ্বশুরবাড়ি থেকে আপত্তি উঠেছিল নিশ্চয়?”

 

“তা উঠেছিল বই কী। স্বামীটি যদিও গোবেচারা ভাল মানুষ, শাশুড়িটি কড়া ধাঁচের। সংসারে তাই নিয়ে নিত্য কান্নাকাটি, নিত্য অশান্তি, নিত্য ঝামেলা। অ্যান্ড টু কাট আ লং স্টোরি শর্ট উনি একদিন সংসার ছেড়ে বেরিয়ে এলেন।”

 

“কার সঙ্গে বেরিয়ে এলেন?”

 

“বীরেশ্বর সেনের সঙ্গে। বীরেশ্বর নাকি ওঁর দাদার বন্ধু। বিয়ের আগে থেকেই তাই চেনা-জানা ছিল। লোকটা নামে ছিল অ্যাসিস্টান্ট প্রোডাকশন ম্যানেজার, কিন্তু কাজে ছিল টালিগঞ্জের টাউট। বেলা দেবীকে নিশ্চয় ফিল্ম কেরিয়ারের লোভ দেখিয়ে থাকবে।”

 

“তারপর?”

 

“তারপরের ইতিহাস বেলা দেবীর নয়, বেহুলা দেবীর আর বিদিশা দেবীর। কিন্তু সে-সব কথা তো আগেই আপনাদের বলেছি।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “লন্ডনে কাকে যেন ফোন করবেন বলছিলেন না? করেছিলেন?”

 

“করেছিলুম।” ভাদুড়িমশাই ফের একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “কাল বিকেলে আপনারা এখান থেকে চলে যাবার পরেই করেছিলুম। তা ছাড়া দার্জিলিং আর দিল্লিতে আমাদের যে দু’জন এজেন্ট রয়েছেন, তাঁদেরও ফোন করি। তবে কিনা, এখন দেখছি এ দুটো জায়গায় ফোন করার কোনও দরকারই ছিল না। কাজের কাজটা কলকাতায় বসে কৌশিকই করে দিয়েছে।”

 

“একটু বুঝিয়ে বলবেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বলছি। লন্ডনের লোকটি তো পায়ের তলায় ঘাস গজাতে দেয় না, আজই একটু আগে রিং ব্যাক করেছিল। বলল যে, বার্থ রেজিস্ট্রেশন আপিসের ওই সময়ের খাতায় স্টুয়ার্ট পদবির যে-ক’টা এন্ট্রি সে পেয়েছে, তার মধ্যে একটাতে বাবার নাম লেখা হয়েছে বেঞ্জামিন এম. স্টুয়ার্ট, ডিসিড। তার মানে পস্থমাস চাইল্ড। ডেট অভ বার্থটাও জানিয়েছে। ফিটিথ জানুয়ারি, নাইনটিন ফিফটি টু।”

 

“ছেলে না মেয়ে?”

 

“ছেলে। মেল-চাইল্ড। রেজিস্টারে নাম রয়েছে। মাইকেল বি. স্টুয়ার্ট।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “সে-ছেলে বেঁচে আচে?…মানে বেঁচে থাকলে সে তার বাপের সম্পত্তি দাবি করতে পারে তো, তাই জিঞ্জেস করচি।”

 

“সে-সব কথা একটু বাদেই জানবেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার আগে কৌশিকের কথা শুনুন। …কী রে কৌশিক, তোকে তো কলকাতার দুটো অর্ফানেজে খোঁজ নিতে বলেছিলুম। তা সেখান থেকে কী জানা গেল, সেটা এঁদের বল্।”

 

কৌশিক বলল, “উফ্, বীরেশ্বর সেনকে দশটা নাগাদ বিদেয় করে সাড়ে দশটায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলুম, আর ফিরেছি এই একটু আগে! তা দুটো অর্ফানেজ থেকেই আমাকে সাফ বলে দেওয়া হল যে, ওগুলো গরিব-গুর্বোদের জায়গা, কোনও সাহেব-বাচ্চাকে ওখানে কখনওই ভর্তি করা হয়নি। তো দ্বিতীয়টা থেকে যখন বেরিয়ে আসছি, তখন সেখানকার এক বুড়ো দরোয়ান আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলল যে, বাবু, যে–ধরনের বাচ্চার আপনি খোঁজ করছেন, তারা তো এখানে আসে না, আপনি বরং পয়সাওয়ালা ঘরের লোকেরা তাদের বাচ্চাদের যেখানে রেখে আসে, তারপর তাদের ভাল খাওয়া-পরার জন্যে মোটা টাকা ধরে দেয়, সেইখানে গিয়ে খোঁজ করুন। বলে সে তিনটে চাইল্ড হোমের নাম আমাকে জানায়।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “সেখানে খোঁজ পেলি?”

 

“প্রথমটাতে পাইনি, দ্বিতীয়টাতে পেলুম। খোঁজখবর তো সেখানেও কিছু দিতেই চায় না; যত বলি, মশাই, স্টুয়ার্ট পদবির কোনও বাচ্চা ছেলেকে এখানে ভর্তি করা হয়েছিল কি না, কেরানিবাবু ততই চোখ পাকিয়ে বলে যে, ও–সব হচ্ছে সিক্রেট ব্যাপার, কাউকে জানাবার নিয়ম নেই। তারপর টেবিলের তলা দিয়ে কড়কড়ে একখানা একশো টাকার নোট এগিয়ে দিতে বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে, আপনি বরং ঘণ্টাখানেক বাদে আসুন।”

 

“তো এক ঘণ্টা বাদে গিয়ে কী জানলি?”

 

“জানলুম যে, তিপ্পান্ন সালের ডিসেম্বর মাসে মাইকেল স্টুয়ার্ট বলে একটা বছর দুয়েকের বাচ্চা ছেলেকে ওখানে ভর্তি করা হয়েছিল, আর ফিফটিনাইনে মিস্ আর. গুড়ুং বলে এক সিকিমিজ মহিলা ওকে অ্যাডপ্ট করে ওখান থেকে নিয়ে যান।”

 

আমার নিশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল যেন একটা ছবিকে এতক্ষণ কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছিল কেউ, এবারে সেই ঢাকনাটা একটানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বললুম, “আর. গুড়ুং! তার মানে রূপকুমারী গুড়ুং! তার মানে রূপকুমারী যাকে অ্যাডপ্‌ট করেছিলেন, সে তাঁরই বোন ফুলকুমারীর ছেলে!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিলক্ষণ। তবে প্রথম পক্ষের ছেলে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “ডেটটাও মিলে যাচ্ছে। অ্যাডপশানের বছরের কথা বলতে গিয়ে গঙ্গাধর চামলিন তো ফিফটিনাইনই বলেছিলেন। তাই না?”

 

“রাইট।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “যেমন বিক্রমবাহাদুর দোর্জি, তেমন গঙ্গাধর চামলিন, বুড়ো হলে কী হয়, দু’জনেরই মেমারি সাফ, আর দু’জনেই হচ্ছেন খবরের ডিপো।”

 

আমি বললুম, “তেজবাহাদুর যে বেন্ স্টুয়ার্টের ছেলে, এই রকমের একটা সন্দেহ ওকে দেখার পর থেকেই আপনার হয়েছিল, তাই না?”

 

“কী করে বুঝলেন?

 

“বুঝলুম, তার কারণ, ফুলকুমারীর সঙ্গে বেন স্টুয়ার্টের বিয়ে হবার পর ওদের কোনও বাচ্চা হয়েছিল কি না, তেজবাহাদুরকে দেখার পরেই আপনি তার খোঁজ করতে লেগে যান।”

 

“ঠিক কথা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু সন্দেহটা কেন হয়েছিল, সেটা ধরতে পেরেছেন?”

 

“না তো।”

 

“চোখ থাকলেই ধরতে পারতেন। সন্দেহ হয়েছিল ওর হলদে-সাদা গায়ের রং, গাঢ় নীল চোখ আর লালচে গোঁফ দেখে।”

 

অরুণ সান্যাল বললেন, “গোঁফের আমি, গোঁফের তুমি, তা-ই দিয়ে যায় চেনা।”

 

ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি জিজ্ঞেস করছিলেন বেন্ স্টুয়ার্টের ছেলে বেঁচে আছে কি না। তা উত্তর তো পেয়ে গেছেন।”

 

“শুধু উত্তর?” সদানন্দবাবু বললেন, “তাকে তো রানিপুলে স্বচক্ষে দেখে এলুম মশাই। ব্যাটা ঘোর মাতাল, তায় দুশ্চরিত্র। আরে ছ্যাছ্যা, অমন বাপের এই ছেলে?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আবার বাপকে টানছেন কেন। তাকে আপনিও দেখেননি, আমিও দেখিনি। কে জানে, হয়তো বাপকা বেটা-ই হয়েছে। কিন্তু ও-সব কথা বাদ দিন। এই যে এতসব খবর জানা গেল, গোটা ছবিটাই যে এতে একটা অন্য রকমের ডাইমেনশান পেয়ে যাচ্ছে, সেটা বুঝেছেন তো?”

 

“তা তো বুঝতেই পারছি। এখন আপনি করবেন কী, সেটা বলুন।”

 

“আমি আজ একটু ভাবব। তারপর কাল গিয়ে দেখা করব ফুলকুমারী ঘোষের সঙ্গে। …ও হ্যাঁ, আপনাদের বলা হয়নি, তিনিও আজ আপনারা আসার আগে একবার ফোন করেছিলেন। মনে হল বেশ উত্তেজিত।”

 

“কেন?”

 

“আমরা যে সিকিমে গিয়েছিলুম, সেটা জানতে পেরেছেন।”

 

বললুম, “কাল কখন ওঁর কাছে যাবেন?”

 

“কাল তো শনিবার, ছুটি নিতে পারবেন?”

 

“তা বোধহয় পারব।”

 

“তা হলে কাল সকালে এখানে চলে আসুন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝতেই পারছেন বড় ঘরের ব্যাপার। তাই যা বলতে চাই, সেটা সরাসরি বলা ঠিক হবে কি না, তাও একটু ভেবে দেখার দরকার রয়েছে। আপনাদের সঙ্গেও সকালবেলায় একটু কথা বলে নেব। তারপর নাহয় বিকেলে ওঁর কাছে যাওয়া যাবে।”

 

ন’টা বাজে। সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে বললুম, “চলুন, আজ তা হলে ওঠা যাক।”

 

লিফটে করে নীচে নামলুম। গাড়িতে ঢুকে সদানন্দবাবু বললেন, “লালচে গোঁফের লোকেরা বড্ড রাগী হয় মশাই।”

 

“কী করে জানলেন?”

 

“আমাদের বড়সায়েবকে তো দেকিচি। তাঁরও ওই রকমের লালচে গোঁফ ছিল। বড্ড রাগী ছিলেন। সে একেবারে হুলোবেড়ালের মতন রাগ।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *