একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৩)

বিক্রমবাহাদুর দোর্জির বয়েস যে নব্বই বছর, ভদ্রলোককে দেখে সে-কথা বুঝবার উপায় নেই। শরীরে একটুও মেদ জমতে দেননি, ছিপছিপে পাতলা চেহারা, মাথার চুল ধবধবে সাদা বটে, কিন্তু চোখ একটুও ঘোলাটে নয়, তা ছাড়া নিজেই এসে দরজা খুলে দিয়ে আমাদের ভিতরে নিয়ে বসালেন বলে এটাও লক্ষ করা গেল যে, নব্বই বছরেও এঁর চলাফেরায় বেশ একটা সতেজ সটান ব্যাপার রয়েছে। কানে একটু খাটো বলে শুনেছিলুম, কিন্তু হিয়ারিং এড লাগিয়ে নিয়েছেন বলে কথাবার্তায় কোনও অসুবিধে হল না।

 

আমাদের বসিয়ে, নিজে বসে বিক্রমবাহাদুর বললেন, “তারপর কী খবর বলুন, দুর্গা কেমন আছে?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি তো কলকাতা থেকে আসছি। তবে ব্যাঙ্গালোর থেকে রওনা হবার আগের দিনই দুর্গার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ভালই আছে। ওর ছোট ছেলেটার একটু সর্দিজ্বর হয়েছিল, সেও সেরে উঠেছে।”

 

“ভেরি গুড, ভেরি গুড। তা ব্যাঙ্গালোরে ফিরে দুর্গার সঙ্গে তো আপনার দেখা হবে, তখন তাকে জানিয়ে দেবেন যে, বুড়ো বাপকে নিয়ে তার চিন্তা করার কিছু নেই, আমিও খুব ভালই আছি। আসলে ব্যাপারটা কী জানেন মিঃ ভাদুড়ি, সবই তো ইন্ডিয়া, তার মধ্যে যে যেখানে ভাল থাকবে, সে সেখানেই থেকে যাবে। দুর্গা যেমন ব্যাঙ্গালোরে ভাল থাকবে, আমিও তেমন এই গ্যাংটকেই ভাল থাকব। হাহা।”

 

“দুর্গা তো মাঝেমধ্যে এখানে আসে, আপনিও তেমন ব্যাঙ্গালোরে মাঝেমধ্যে গেলে পারেন।”

 

“না মিঃ ভাদুড়ি, ওখানকার ক্লাইমেট আমার স্যুট করে না। তা ছাড়া, এই যে এখানে রোজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু নীচে নামছি, আবার উপরে উঠছি, এই চড়াই-উতরাইটা ওখানে পাব কোথায়? এই যে জানলা খুলে রোজ সকালে যার মুখ দেখছি, সেই কাঞ্চনজঙ্ঘাটা ওখানে পাব কোথায়? এ-সব ছাড়া তো আমার চলবে না। না না, এখানেই আমি ভাল আছি। তা আপনি এখানে কী করতে এলেন? সির্ফ বেড়াতে?”

 

“না, চাচাজি, আমরা কাজ নিয়ে এসেছি।”

 

“সেটা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলুম।” মিঃ দোর্জি বললেন, “তা কী রকমের কাজ? যা আপনি সারা জীবন করলেন, সেই ডাকু-বদমাসের পিছনে ছুটা করা?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “না না, সে-সব কিছু নয়। কয়েকটা খবর জানবার ছিল। তার জন্যে প্রথমে নামচিতে যাই, সেখান থেকে আজ রানিপুলে আসি। কিন্তু এ দুটো জায়গা থেকে যেটুকু যা জানা গেছে, তাতে মনে হল, গ্যাংটকে এসে আপনার সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার। কিছু খবর চাই।”

 

“আমি কী খবর দেব? সেকালের খবর অনেক জানি ঠিকই, কিন্তু একালের খবর তো বলতে গেলে কিছুই জানি না। ওই সকালে-বিকেলে যখন হাঁটতে বেরোই, দু’চারজন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা হয়, বাজারের কোনও দোকানের সামনে চেয়ার টেনে বসে গল্প করি, তখন অবশ্য কিছু-কিছু কথা কানে আসে, কিন্তু বাস, ওই পর্যন্ত।”

 

“চাচাজি, শুধু একালের নয়, আমি সেকালের খবরও জানতে চাইছি।”

 

“যেমন?”

 

“ফুলকুমারী গুড়ুংকে আপনি চিনতেন?”

 

“ফুলকুমারী গুড়ুং?” মৃদু হেসে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন বিক্রমবাহাদুর দোর্জি। বললেন, “ইউ মিন কৃষ্ণকুমার গুড়ুংয়ের ছোট মেয়ে?”

 

“হ্যাঁ চাচাজি। তাঁকে চিনতেন?”

 

“তা কেন চিনব না? তবে বয়েস যাদের আমার চেয়ে দশ-পনেরো বছর কম, আর সেইসঙ্গে যারা আমার চেয়ে আরও বড় ঘরের ছেলে, মানে প্যালেসে যাদের বাপ-জ্যাঠাদের বেশ খাতির ছিল, তারা আরও ভাল চিনত। কিন্তু ব্যাপার কী মিঃ ভাদুড়ি, ফুলকুমারীর খবর নিয়ে আপনি এত ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কেন? যদি বেঁচে থাকে, তো তারও তো বয়েস এখন অন্তত সত্তর হবার কথা, এই বয়সে সে কি আবার নতুন কোনও গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়ল নাকি?”

 

“তার মানে অল্প বয়সে এখানে তিনি গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়েছিলেন?”

 

“শুধু এখানে কেন?” বিক্রমবাহাদুর একটা চোখ ছোট করে রহস্যময় হাসলেন। “একে তো রইস বাপের বেটি, তার উপরে ওই রকমের চেহারা। ইনডিড, শি ওয়াজ আ প্যারাগন অভ বিউটি। যেখানে যায়, সেখানেই ছেলেরা তার পিছনে ঘুরঘুর করে। তো এখান থেকে দার্জিলিংয়ে পড়তে পাঠানো হল, সেখানেও গণ্ডগোল, আবার দার্জিলিংয়ের কনভেন্ট থেকে পাশ করে দিল্লির এক কলেজে গিয়ে ভর্তি হল, সেখানেও গণ্ডগোল।”

 

“লেখাপড়ায় মন ছিল না?”

 

“লেখাপড়ার কথা যদি তোলেন তো বলব, শি ওয়জ আ ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। কিন্তু কাঁচা বয়েসেই বড্ড বেশি পেকে গেলে যা হয় আর কি।”

 

“দিল্লির পরে কী হল?”

 

“গ্যাংটকে আর দার্জিলিংয়ে যা হয়েছিল, দিল্লিতেও তা-ই হল। একগাদা কচি ছেলের মাথা বিগড়ে দিয়ে তারপর নিজে একটা স্কলারশিপ নিয়ে ডাক্তারি পড়তে লন্ডন চলে গেল।”

 

“তারপর?”

 

“তারপর লণ্ডনে গিয়ে বিগড়ে দিল এক বুড়ো সাহেবের মাথা।”

 

“ইউ মিন মিঃ স্টুয়ার্ট?”

 

“রাইট। বেঞ্জামিন স্টুয়ার্ট।” বিক্রমবাহাদুর হেসে বললেন, “বুড়োর যেমন লন্ডনের প্রসভেনর স্কোয়ারে মস্ত একটা বাড়ি ছিল আর মিডল্যান্ড ব্যাঙ্কে বিস্তর টাকা ছিল, তেমনি দার্জিলিং আর আসামে চা-বাগানও ছিল কয়েকটা। তবে বাগান তো চালাত তার ম্যানেজাররা, বেন স্টুয়ার্ট নিজে এ-দেশে আসত কালেভদ্রে।”

 

“ফুলকুমারীর সঙ্গে তার পরিচয় হল কোথায়?”

 

“হসপিটালে। কী একটা পার্টি থেকে মাঝরাত্তিরে বাড়ি ফিরছিল, কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকবার আগেই মাইল্ড একটা হার্ট অ্যাটাক হয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। সেখান থেকে হসপিটালে। তো ফুলকুমারী ইতিমধ্যে ডাক্তারি পাশ করে সেখানে ইনটার্ন হয়ে ঢুকেছিল। বুড়োর সঙ্গে সেইখানেই তার আলাপ।”

 

“বেন স্টুয়ার্টের স্ত্রী ছিল না?”

 

“অবশ্যই ছিল। কিন্তু যদ্দুর জানি, এই ঘটনার বছর পাঁচ-সাত আগেই তিনি গত হয়েছিলেন। ফলে ডিভোর্স করার ঝঞ্ঝাটও পোয়াতে হল না। তার উপরে বেন স্টুয়ার্টের যে কোনও ছেলেপুলে ছিল না, সেও একটা মস্ত সুবিধে। বিয়েটা একেবারে নির্ঝঞ্ঝাটে হয়ে গেল।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা কবেকার কথা?” মানে এগজ্যাক্ট তারিখটা চাইছি না, সালটা মনে আছে?”

 

“তা কেন থাকবে না?” বিক্রমবাহাদুর বললেন, “আমি যে সিকিম গভর্নমেন্টের চাকরি করতুম, সেটা জানেন তো?…তো প্যালেস থেকে একটা কাজের দায়িত্ব দিয়ে সেই সময়ে আমাকে মাস কয়েকের জন্যে বিলেতে পাঠানো হয়। আমি তখন লন্ডনেই ছিলুম, তাই সন-তারিখ সবই মনে আছে। বিয়েটা হয়েছিল নাইনটিন ফিফটির সেভেন্থ জুন। ইলাসট্রেটেড লন্ডন নিউজের সোসাইটি পেজে বর-কনের যে ছবি ছাপা হয়েছিল, তার ক্যাপশানটাও ভুলিনি—দ্য লাকি ব্রিটিশ প্ল্যান্টার উইথ হিজ বিউটিফুল সিকিমিজ ব্রাইড।”

 

এতক্ষণ আমি চুপ করে সব শুনছিলুম। এবারে বললুম, “একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?”

 

“নিশ্চয়।” বিক্রমবাহাদুর বললেন, “তবে উত্তর দিতে পারব কি না জানি না।”

 

“ফুলকুমারী তো গরিব ঘরের মেয়ে নয়, সে ধনী বাপের মেয়ে, তার তো অর্থলোভ থাকার কথা নয়, তা হলে সে একটা বুড়োকে বিয়ে করতে গেল কেন? আউট অভ কমপ্যাশন?”

 

“হতে পারে, নাও হতে পারে। আবার বড়লোকের মেয়ে বলেই যে তার অর্থলোভ থাকবে না, এমনও কোনও কথা নেই। তবে হ্যাঁ, পঁচিশ বছরের একটা শিক্ষিতা সুন্দরী মেয়ে তার স্বামী হিসেবে নির্বাচন করে নিচ্ছে পঁয়ষট্টি বছরের এক মাল্টিমিলিওনিয়ার বৃদ্ধকে, এতে যে অনেকেই অবাক হয়ে গিয়েছিল, সেটা ঠিক। লন্ডনের বেশ কয়েকটা কাগজের সোসাইটি কলামে এই খবরটা যে বেশ রসিয়ে লেখা হয়েছিল, তাও মনে পড়ে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “ছ্যাছ্যা!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ বিয়ে তো বেশিদিন টেকার কথা নয়, চাচাজি!”

 

“ওইখানেই ভুল করলেন, মিঃ ভাদুড়ি।” বিক্রমবাহাদুর বললেন, “আসলে বুড়োটাই টিকল না। বছর না-ঘুরতেই বেন স্টুয়ার্ট মারা যায়। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। উইল-টুইল করে দূর সম্পর্কের কোনও আত্মীয় কি কোনও চ্যারিটেব্ল ইনস্টিটিউশন…এই ধরুন ডগ-লাভার্স’ অ্যাসোসিয়েশন কি ক্যাট-লাভার্স’ সোসাইটিকে যে কিছু দিয়ে যাবে, অনেকেই দেয় তো, তারও সময় পায়নি, ফলে এসভেনর স্কোয়ারের বাড়িটা সুদ্ধু তার সম্পত্তির সবটাই চলে এল এক যুবতী বিধবার হাতে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “দুর্বলে সবলা নারী, আরে ছ্যাছ্যা, তার উপরে হার্টের রুগি, বাপ্ রে জেনেশুনে কেউ অমন কাজ করে! বোকার বেহদ্দ! নাঃ, সাহেবদের মধ্যেও দেকচি ইডিয়টের কিছু অভাব নেই!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেন স্টুয়ার্ড যখন মারা যায়, আপনি তখন ও-দেশে ছিলেন?”

 

বিক্রমবাহাদুর বললেন, “না। আমি তো মাত্র মাস কয়েকের জন্যে গিয়েছিলুম। এই ঘটনার অনেক আগেই আমি সিকিমে ফিরে আসি। মরার খবরটা পাই লন্ডনের এক বন্ধুর কাছ থেকে। ফুলকুমারীর দ্বিতীয় বিয়ের খবরও সে-ই আমাকে জানায়।”

 

“এ-বিয়ে কবে হল?”

 

“বেন স্টুয়ার্টের মৃত্যুর দু’বছর বাদে। নাইনটিন ফিফ্টিথ্রির অগস্টে। …আর কিছু জানার আছে?”

 

“না।”

 

“তা হলে আমি এবার বেড়াতে বেরোব।” হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিক্রমবাহাদুর দোর্জি বললেন, “সাড়ে পাঁচটা বাজে।”

 

“কোথায় বেড়ান আপনি?”

 

“কেন, রাস্তায়। খানিক হেঁটে তারপর ওই যে বললুম, বাজারের কোনও দোকানের সামনে একটা চেয়ার টেনে বসি। ওখানে না-বসলে তো নিউজ গ্যাদার করা যায় না। হাহা।”

 

বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেমন লাগল মানুষটিকে?”

 

বললুম, “অ্যান এনসাইক্লোপিডিয়া অভ স্ক্যান্ডাল্স! ঘুঘু বুড়ো, সক্কলের হাঁড়ির খবর রাখে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আরে ছ্যাছ্যা!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *