একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১১)

আজ ৮ মার্চ, বুধবার। কাল রাত্তিরে হোটেলে ফিরে রাত্তিরের খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে একটু ঘুরতে বেরোই। নামচি ছোট শহর, ভিড়ভাট্টা নেই, বাজার এলাকায় বেশ কিছু লোকজন চোখে পড়ল বটে, কিন্তু সেটা ছাড়িয়ে খানিক এগোতেই রাস্তা একদম ফাঁকা, দু’দিকের পাহাড়ের গায়ে দু’চারটে বড়-বড় গাছ, খাঁজে খাঁজে কাঠের ঘরবাড়ি, রং-করা টিনের ঢালু ছাত, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রতিটি পাহাড়ি অঞ্চলে যেমন দেখা যায়। কাল থেকে শুরু হবে কাঞ্চনজঙ্ঘা ফেস্টিভ্যাল। সেই উপলক্ষে বড়-বড় বেশ কয়েকটি বাড়ি দেখলুম নানা রঙের আলোর মালায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে। সম্ভবত সরকারি দফতর। রাস্তার কয়েকটা জায়গায় ‘ওয়েলকাম’ লেখা মস্ত মস্ত ব্যানারও চোখে পড়ল।

 

কলকাতায় ইতিমধ্যে বেশ গরম পড়েছে, কিন্তু এখানে এখনও হাড়-কাঁপানো ঠাণ্ডা। অথচ নামচি যে খুব উঁচু জায়গা, তাও নয়। সদানন্দবাবু তাঁর উলেন মোজা, ফুল-হাতা সোয়েটার, মাঙ্কি ক্যাপ আর দস্তানা পরেও এখানকার শীতে বেশ কাবু হয়ে পড়েছেন। তাঁর শরীর থেকে ঠকঠক করে যে একটা মৃদু শব্দ বেরোচ্ছে, সেটা নিশ্চয় তাঁর দাঁতের বাজনা।

 

হোটেলে ফিরতে-ফিরতে দশটা বেজে যায়। ঘুমোতে-ঘুমোতে এগারোটা। তাও আজ সকালে সাড়ে সাতটার আগে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারিনি। বাথরুমে গিজার থাকায় ঠাণ্ডার মধ্যেও স্নান করে নিতে কোনও অসুবিধে হল না। ব্রেকফাস্ট সেরে সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা রানিপুলের পথে বেরিয়ে পড়লুম।

 

আসবার পথে ড্রাইভার যেখানে একবার গাড়ি থামিয়েছিল, ভেবেছিলুম যে, নামচি থেকে ফের সেইখানে ফিরে আমাদের গ্যাংটকের রাস্তা ধরতে হবে। কিন্তু ইন্দ্রবাহাদুর বলল, তার দরকার নেই, এখান থেকে একেবারে ভিন্ন একটা রাস্তা ধরেও গ্যাংটকে যাওয়া যায়। “এ-রাস্তায় সময়ও কিছুটা কম লাগবে, সাব।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কতটা কম?”

 

“অন্তত আধ ঘণ্টা।”

 

আমি বললুম, “তা হলে সেই পথে যাওয়াই তো ভাল। সময় কম লাগা ছাড়াও পথটা যখন নতুন, তখন তার দু’দিকের ল্যান্ডস্কেপও হয়তো একটু অন্যরকম হবে। সেও কিছু কম লাভ নয়।”

 

পথটা নতুন হলেও যে তেমন সুবিধের নয়, শহরের সীমানা ছাড়াবার খানিক বাদেই সেটা বোঝা গেল। পিচের চল্টা মাঝে-মাঝেই উঠে গেছে বলে উপরের আস্তরণের তলা থেকে বেরিয়ে পড়েছে পাথরকুচি আর ঝামা-ইটের খোয়া। তা ছাড়া গত বর্ষায় এখানে-ওখানে ধস নামার ফলে রাস্তার যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার মেরামতির কাজ এখনও শেষ হয়নি, রাস্তার ধারে ধারে পড়ে রয়েছে স্টোন-চিপসের ডাঁই। তার ফলে এই রাস্তাটা সে-সব জায়গায় এতই অপরিসর হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, উল্টো দিক থেকে গাড়ি এলে খুবই বেকায়দায় পড়ে যেতে হয়। কখনও বা পাহাড়ের গায়ের সঙ্গে একদম সেঁটে গিয়ে আর নয়তো খাদের একেবারে কিনারা ঘেঁষে পথ ছেড়ে দিতে হয় তাকে। ইন্দ্রবাহাদুরের অবশ্য তা নিয়ে কোনও দুর্ভাবনা নেই। যতই সরু আর এবড়োখেবড়ো হোক, এ-দিক দিয়ে আসায় ওদিককার তুলনায় অন্তত আধ ঘণ্টা আগেই যে সে আমাদের রানিপুলে পৌঁছে দিতে পারছে, মনে হল তাতেই সে খুশি।

 

আমাদের খুশি হবার কারণ অবশ্য একেবারেই আলাদা। রাস্তা খারাপ বলে গাড়ি খুব লাফাচ্ছিল, আর তার ফলে মাঝে-মাঝেই আমাদের খুব ঝাঁকুনি লাগছিল বটে, তবু তারই মধ্যে এটা লক্ষ করলুম যে, এদিককার দৃশ্য সত্যিই একটু অন্যরকমের। পাথরের খাঁজে খাঁজে আর নীচের ঢালু উপত্যকায় এদিকে ফুলের বাহার অনেক বেশি। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, নানা রঙের ফুল। ছোট-ছোট কয়েকটি বসতিও চোখে পড়ল। কাঠ আর কাচের ছিমছাম বাড়ি। ঢেউ-খেলানো রঙিন টিন কিংবা পাতলা স্লেট-পাথরের ছাত। বাড়ির সামনে সবজির খেত। দু’-একটা বাড়ির সামনে বেশ বড়সড় বাগানও দেখা গেল। পাহাড়ের গায়ে এক জায়গায় দেখলুম হলুদ রঙের বিস্তর ফুল ফুটে রয়েছে। অনেকটা টিউলিপের মতন। সেখানে গাড়িটা একটু থামতেই সেই ফুলের ভিতর থেকে এক ঝাঁক প্রজাপতি হঠাৎ এমনভাবে আকাশে উঠে পড়ল যে, আমরা তো অবাক। সদানন্দবাবু বললেন, “আরে কী কাণ্ড, প্রজাপতিগুলো যে ওই ফুলের মধ্যেই ছিল, তা তো বুঝতে পারিনি মশাই!”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ফুলের রংও হলুদ, প্রজাপতিগুলিও হলদে রঙের, তা হলে আর কী করে বুঝবেন?”

 

“তার মানে কামুক্লাজ?”

 

“ঠিক তা-ই। সৈন্যরা যে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগোবার সময় সবুজে-সাদায় মেশানো চক্রাবক্রা জঙ্গুলে ইউনিফর্ম পরে, তার কারণ তো আর কিছুই নয়, ওই রকমের পোশাক পরলে জঙ্গলের রঙের সঙ্গে তারা মিশে যায়, শত্রুপক্ষ তাদের আর তখন গাছপালা থেকে আলাদা করে চিনতে পারে না।”

 

“কিন্তু প্রজাপতির তো শত্রু নেই।”

 

“কে বলল নেই?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঘ-সিংহেরও শত্রু থাকে, আর ওই ছোট্ট প্রাণীর শত্রু থাকবে না? আছে বলেই তো হলুদ প্রজাপতি হলুদ ফুলের মধ্যে লুকিয়ে থেকে নিজেকে বাঁচায়। এ হল প্রাকৃতিক কামুয়াজ!”

 

নদীর উপরে মস্ত ব্রিজ। সেই ব্রিজ পেরিয়ে আমরা যখন রানিপুল পৌঁছলুম, তখন কাঁটায় কাঁটায় ঠিক এগারোটা বাজে। ইন্দ্রবাহাদুর তার হাতঘড়ি দেখে বলল, “নামচি থেকে ঠিক আড়াই ঘণ্টা লাগল, সাব। ওদিককার রাস্তা দিয়ে এলে সাড়ে এগারোটা বেজে যেত।”

 

রানিপুল খুব-একটা ছোট জায়গা নয়। প্রচুর দালান-কোঠা। তার মধ্যে তালঢ্যাঙা দু’চারটে হাইরাইজ বিল্ডিংও চোখে পড়ল। সিকিমের শান্ত শোভাকে ভেংচি কেটে আকাশে মাথা তুলে সেগুলো যেন স্রেফ পয়সার গরম দেখাচ্ছে। দোকানপাটের ভিড় দেখে মনে হল, এটা একটা ব্যাবসা-কেন্দ্ৰ। ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন তা-ই হয়েছে বটে, কিন্তু বছর পনেরো-কুড়ি আগেও এমন ছিল না। নাইনটিন এইট্টিতেও এদিকে একবার এসেছিলুম তো, তখন এত ভিড়ভাট্টা দেখিনি।”

 

গঙ্গাধর চামলিন বলেছিলেন, রানিপুলে পৌঁছে যাকেই জিজ্ঞেস করব, সে-ই কৃষ্ণকুমার গুড়ুংয়ের বাড়িটা আমাদের দেখিয়ে দেবে। কিন্তু কার্যত দেখলুম, দু’-দুজন লোককে জিজ্ঞেস করেও কোনও সুবিধে হল না। এমনভাবে তারা মাথা চুলকোতে লাগল যে, তাতেই বোঝা গেল, এ-রকম নাম তারা ইতিপূর্বে শোনেনি। তৃতীয়জন বলল, আমরা তার ভাতিজা কৃষ্ণকুমারের খোঁজ করছি কি না। “লেকিন উয়ো তো মেরঠুমে হ্যায়, ইধার কভি আয়া নেহি।”

 

ড্রাইভার ইন্দ্রবাহাদুর চালাক ছেলে। আমাদের সমস্যাটা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিল। বলল, “ওদের দ্বারা হবে না, সার্, ওরা বাইরের লোক, হালে হয়তো এদিকে এসে ব্যাবসা ফেঁদে বসেছে। দাঁড়ান, এখানকার কোনও লোককে জিজ্ঞেস করি।”

 

কাছেই একটা দর্জির দোকান। গাড়ির মধ্যে আমাদের বসিয়ে রেখে ইন্দ্রবাহাদুর সেই দোকানে গিয়ে ঢুকল। তারপর মিনিট খানেক বাদে বেরিয়ে এসে বলল, “মিল গিয়া। যে বাড়ি আপনারা খুঁজছেন, সেটা এই বাজার-এলাকায় নয়, আর-একটু ফাঁকা জায়গায়। ঘিঞ্জি ছাড়িয়ে খানিকটা এগোলেই পেয়ে যাব।”

 

পাওয়া গেলও। পাথরের পাঁচিলে ঘেরা বিশাল বাড়ি। নামচিতে ইতিপূর্বে গঙ্গাধর চামলিনের যে বাড়ি দেখে এসেছি, ধাঁচ প্রায় সেই একই রকমের, তবে এটা আরও বড়। বাইরের গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখলুম, কম্পাউন্ডের আয়তনও এখানে অনেক বেশি। মনে হল, সব মিলিয়ে বিঘে দুয়েক তো হবেই, কিছু বেশিও হতে পারে। ভিতরের জমির সামনের দিকটা সমতল বটে, তবে পিছনের দিকটা যে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বেশ খানিকটা নীচে নেমে গেছে, তাও চোখে পড়ল।

 

বাড়ির সামনে চওড়া ধাপের কাঠের সিঁড়ি। তার দু’দিকে মস্ত বড় কাঠের টবে বসানো ফুট-চারেক উঁচু দুটি ফুলগাছ। তাতে কালচে-লাল রঙের থোকা থোকা ফুল ধরেছে। নামচিতে তো বটেই, এখানে আসবার পথেও এই রকমের ফুল আমরা বিস্তর দেখেছি। সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে আমরা – ডোর-বেল বাজালুম।

 

বেশ কিছুক্ষণ বাদে যিনি এসে দরজা খুলে দিলেন, মুখ দেখে মনে হল সদ্য তাঁর ঘুম ভেঙেছে। বয়েস বছর চল্লিশের বেশি হবে না। তবে এই বয়সেই মাথার কদমছাঁট চুলে নুন-মেশানো গোলমরিচের মতো রং ধরেছে। গায়ের রং হলদেটে সাদা, চোখের রং নীল, নাকের নীচে ঈষৎ লালচে সরু গোঁফ। পোশাক অপরিচ্ছন্ন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা মিঃ তেজবাহাদুর গুডুংয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”

 

ভদ্রলোক আমাদের ভিতরে নিয়ে গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে বললেন, “আমিই তেজবাহাদুর। আপনারা যদি মিঃ মেটার কাছ থেকে এসে থাকেন তো তাঁকে বলবেন যে, আমার কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু এ-ব্যাপারে আমার একার কথায় তো কাজ হবে না, দিস প্রপার্টি ইজ জয়ন্টলি ওন্‌ড বাই আস, বেচতে হলে আমার আন্টির পারমিশান চাই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *