একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
(১০)
ঘরের দখল নিয়ে, হাতমুখ ধুয়ে জামাকাপড় পালটে আমরা গঙ্গাধর চামলিনের খোঁজে বেরিয়ে পড়লুম। এ-তল্লাটের গণ্যমান্য ব্যক্তি, তাই বাড়ির হদিশ পেতে কোনও অসুবিধে হল না। হোটেলের মালিক নিজেই জানিয়ে দিলেন যে, সামনের রাস্তা ধরে খানিক চড়াই ভাঙলেই আমরা টাউন হলে পৌঁছে যাব, তারপর টাউন হলটাকে বাঁয়ে রেখে যদি তার ঠিক পাশের রাস্তা দিয়ে আরও খানিক চড়াই ভাঙি তো সামনেই চোখে পড়বে নামচির ইয়ুথ হস্টেল। কিন্তু না, অতটা আমাদের যেতে হবে না। তার আগেই রাস্তার ডানদিকে গঙ্গাধর চামলিনের বাড়ি।
বাড়ি মানে বিশাল বাংলো। সামনের লনটিও দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে নেহাত কম হবে না। ঢালাও লন নয়, পাহাড়ের গা কেটে বানানো হয়েছে বলে ধাপে-ধাপে নেমেছে। সামনের লোহার গেটের দু’দিকের পিলারের মাথায় কাচের ডোমের মধ্যে বিজলি বাতি জ্বলছে; কাচের গায়ে রোমান হরফে লাল রঙে নাম লেখা : জি. চামলিন। রাস্তার ধারে গাড়ি পার্ক করে গেট খুলে আমরা ভিতরে ঢুকলুম। একটা কুকুর কোথাও, খুব সম্ভবত গেট খোলার শব্দ পেয়েই, বেশ গম্ভীর গলায় ডেকে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে জ্বলে উঠল বারান্দার আলো।
কুকুরটিকে সঙ্গে করে যিনি বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন, তাঁর মাথার চুল একেবারে ধবধবে সাদা, চোখ দুটি ঘোলাটে, নিশ্বাস নেবার ধরনও খুব সুস্থস্বাভাবিক নয়। ভদ্রলোকের বয়স মনে হল আশি-পঁচাশির কম হবে না। ভাদুড়িমশাই আমাদের পরিচয় দিতে তিনি বললেন, “আপনারা রওনা হবার পরেই সানরাইজ হোটেলের মালিক আমাকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু যার সঙ্গে আপনারা দেখা করতে এসেছেন, সে তো এখানে নেই। গঙ্গাধর আজ সকালে গ্যাংটক গেছে, কাল দুপুরের আগে ফিরবে না।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে কি আমরা কাল বিকেলের দিকে একবার আসব?”
“গঙ্গাধরের সঙ্গে দেখা করতে হলে তা-ই করতে হবে। তবে ব্যাবসার ব্যাপারে কোনও কথা থাকলে আমাকেও বলতে পারেন। আমি ওর বাবা। …কিন্তু আপনারা দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, ভিতরে এসে বসুন।”
বাইরে বেশ শীত করছিল, ভিতরে ঢুকে আরাম করে বসা গেল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক ব্যাবসার ব্যাপার নয়, আমরা আসলে অন্য একটা ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর নিতে এসেছি।”
“কীসের খোঁজ?”
“আপনি কি ফুলকুমারী ঘোষ বলে কাউকে চেনেন?”
এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন ভদ্রলোক। তক্ষুনি কিছু বললেন না। স্পষ্ট বুঝলুম, মনে-মনে তিনি কিছু চিন্তা করে নিচ্ছেন। তারপর যখন মুখ তুলে আমাদের দিকে তাকালেন, তখন দেখলুম, তাঁর ঠোঁটের কোণে এক-টুকরো হাসি খেলে বেড়াচ্ছে। বললেন, “ফুলকুমারী ঘোষ? আপনারা কি ফুলকুমারী গুডুংয়ের কথা বলছেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাকে কে না চেনে! মানে একালের ছেলেছোকরারা যে চিনবে এমন কোনও কথা নেই, আমার ছেলেই হয়তো চিনবে না, কিন্তু বুড়োরা সবাই চিনবে।”
“আপনি তাঁকে চিনতেন?”
“বিলক্ষণ। তবে পরে তো সে স্টুয়ার্ট হয়ে গিয়েছিল। গ্যাংটকে তাই নিয়ে হইচইও নেহাত কম হয়নি। তা হইচই তো হতেই পারে। ওই রকমের ফ্যামিলি, এখানকার রয়্যাল প্যালেসেও যাদের খাতির নেহাত কম নয়, সেই বাড়ির মেয়ে বিলেতে পড়তে গিয়ে সাহেব বিয়ে করে বসল, তাও আবার এক বুড়ো সাহেবকে, তা হোক না সেই বুড়ো কাড়ি-কাঁড়ি টাকার মালিক আর থাক্ না আসামে আর দার্জিলিংয়ে তার পাঁচ-সাতটা চারের বাগান, তবু হইচই হবে না?”
চা এসে গিয়েছিল। দুধ-চিনি মেশানো চা। কিন্তু সদানন্দবাবু এমনিতে যদিও লিকারের পক্ষপাতী, এক্ষেত্রে দেখলুম দুধ-চিনিতে তাঁর কোনও আপত্তি হল না। চায়ে চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনারা তো এখানে জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিসের সোল বলিং এজেন্ট। তা ওদের ডিস্টিলারিটা এখানে কবে তৈরি হয়েছে?”
“নাইনটিন সিক্সটি টু’তে। ওটা হল রানিপুল আর গ্যাংটকের মাঝামাঝি জায়গায়। মেন রাস্তা থেকে মাইল পাঁচেক ভিতরে। …আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন?”
“আপনাদের ব্যাবসা নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। তবে ফুলকুমারী সম্পর্কে আর দু-একটা খবর জানতে পারলে ভাল হত।”
“যেমন?”
“এই যেমন ওঁর বাপের বাড়ির কেউ কি বেঁচে আছেন?”
বৃদ্ধ ভদ্রলোক হাসলেন। কৌতুকের হাসি। বললেন, “যার নিজেরই বয়েস এখন সত্তরের উপরে, তার বাপ-মায়ের তো বেঁচে থাকার কথা নয়, তা তাঁরা নেইও। নাইনটিন সেভেনন্টিফাইভে সিকিম তো আর ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেট রইল না, ইন্ডিয়ার সঙ্গে মার্জড হয়ে গেল। যদ্দুর জানি, তার আগেই তাঁরা মারা যান।”
“কোনও ভাই কিংবা বোন?”
“ফুলকুমারীর ভাই বলতে কিছু ছিল না, তবে বছর দুয়েকের বড় একজন দিদি ছিলেন। তাঁকে আমি খুব ভালই চিনতুম। তাঁর নাম রূপকুমারী। তিনি বিয়ে করেননি। তবে তিনিও সম্ভবত বছর দশেক আগে মারা গেছেন।”
“তার মানে ওদের বাপের বাড়িতে এখন কেউ নেই?”
“একেবারে যে নেই, তা হয়তো নয়।” বৃদ্ধ বললেন, “শুনেছি বছর পঁয়ত্রিশ আগে রূপকুমারী একটা বাচ্চা ছেলেকে দত্তক নিয়েছিলেন। তার নাম যদ্দুর মনে পড়ছে তেজবাহাদুর। যদি চান তো তার সঙ্গে আপনারা দেখা করতে পারেন। সে হয়তো আর কিছু খবর দিতে পারবে।”
“তাকে কোথায় পাব?”
“কেন, রানিপুলে ওদের বাপের বাড়িতেই তাকে পেয়ে যাবেন। রানিপুল চিনলেন তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “গ্যাংটকে ঢুকবার আগে যে রানিপুল, তার কথা বলছেন?”
“হ্যাঁ।” বৃদ্ধ বললেন, “রূপকুমারী আর ফুলকুমারীর বাবা কৃষ্ণকুমার গুড়ুং ছিলেন ও-অঞ্চলের বিখ্যাত ব্যক্তি। রানিপুলে পৌঁছে যাকে জিজ্ঞেস করবেন, সে-ই তাঁর বাড়ি আপনাদের দেখিয়ে দেবে।”
ভাদুড়িমশাই উঠে দাঁড়ালেন। গঙ্গাধর চামলিনের বাবাকে নমস্কার জানিয়ে বললেন, “আপনার সঙ্গে কথা বলে বড়ই উপকার হল। মিঃ কুলকার্নি অবশ্য আপনার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলেন, কিন্তু তিনি এখানে না-থাকাতেও কোনও ক্ষতি হয়নি, আপনি আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। কিন্তু আপনার নামটা তো জানা হল না।”
বৃদ্ধ এবার স্পষ্ট করে হাসলেন। বললেন, “দেখুন, অনেকেই অনেক ধান্ধা নিয়ে আমার কাছে আসে। তা আপনাদের ধান্ধাটা কী, সেটা তো প্রথমে ধরতে পারিনি, তাই নিজের পরিচয়টা গোপন রেখেছিলুম। কিন্তু কথা বলে এখন মনে হচ্ছে যে, আপনারা লোক নেহাত খারাপ নন। আসলে আমিই গঙ্গাধর চামলিন।”
ভাদুড়িমশাইকে এমন হাঁ করে কখনও কারও মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখিনি।
