আজব বলের রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

ছয়

 

আমার কাছে সব শোনার পর ভোঁদা-পালোয়ান তার হাফপ্যান্টের দুই পকেটে অনেকগুলো বল কুড়িয়ে ভরল। তারপর বলল, “এগুলো কেন নিলুম জানেন? গোরিলা-মানুষদের সঙ্গে দরকার হলে ফাইট দেব। আপনিও নিন দাদা। ধরতে এলেই ঠাই করে ছুঁড়বেন। ঠ্যাঙে ছুঁড়বেন, নয় তো নাকে। মানুষের বডির ঠ্যাঙ আর নাক, খুব ভাইটাল জায়গা।”

 

বুদ্ধিটা মনে ধরল। আমিও অনেক বল কুড়িয়ে পকেট বোঝাই করলুম। তারপর দু’জনে সম্রাট চাংকোর পুরীর দিকে সাবধানে এগিয়ে গেলুম।

 

বড়-বড় পাথরের আড়াল দিয়ে গেটের কাছে পৌঁছলুম আমরা। দু’জন প্রহরী গোরিলা-মানুষ পা ছড়িয়ে দু’ধারে বসে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। তা হলে সম্রাট চাংকোর গ্রহে এটা নিশ্চয় রাত্রিবেলা। তাই আলো এত কম! ভোঁদা ফিসফিস করে বলল, “টিকিতে বাঁধা বল খুলে নিলেই এরা জব্দ। আকাশে ভেসে বেড়াবে। আপনি বাঁ দিকের সেন্ট্রির, আমি ডান দিকের সেন্ট্রির বল খুলে নেব। কাম অন, দাদা!”

 

দু’জন গুঁড়ি মেরে এগিয়ে কাছে গিয়ে দুই প্রহরীর টিকি থেকে বল খুলে ফেললুম। অমনি তারা আকাশে উঠে গেল। কিন্তু কী ঘুম রে বাবা! আকাশে ভেসেও নাক ডাকাতে থাকল। ভেতরে বিশাল প্রাঙ্গণে ভিড়। গোরিলা-মানুযেরা চক্কর দিয়ে দৌড়চ্ছে। গজকুমার সিং একটা মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন। তার পেছনে সিংহাসনে সম্রাট চাংকো বসে আছেন। একপাশে বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তকে হাসিমুখে বসে থাকতে দেখলুম। কিন্তু গোয়েন্দা-হালদারমশাই কোথায়?

 

পাছে কারও চোখে পড়ি, আমরা বাঁ দিকের একটা ঘরে ঢুকে পড়লুম। সেই হলঘর। জনপ্রাণীটি নেই। হঠাৎ মাথার ওপর থেকে চিচি করে কেউ বলল, “গেছি! এক্কেরে গেছি! ও জয়ন্তবাবু! আমারে লামান!”

 

মুখ তুলেই হালদারমশাইকে দেখতে পেলুম। সিলিং-এ টিকটিকির মতো সেঁটে আছেন। বুঝলুম সম্রাট চাংকো শাস্তি দিয়েছেন। চাপা গলায় বললুম, “বল কেড়ে নিয়েছে তো? ঠিক আছে। একটা বল ছুঁড়ে দিচ্ছি। ক্যাচ ধরুন।”

 

বারবার বল ছুড়ি, কিন্তু হালদারমশাই ধরতে পারেন না। ভোঁদা বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি কখনও ক্রিকেট খেলেননি। কী আপনি? আজকাল ক্রিকেট খেলে না, এমন কেউ আছে?”

 

হালদারমশাই করুণ মুখে বললেন, “ক্রিকেটবল দেখলেই ভয় করত যে! মনে হত, চোখে এসে পড়বে। জয়ন্তবাবু! ট্রাই এগেন।”

 

পাঁচবারের বার বলটা খপ করে ধরে ফেললেন গোয়েন্দাপ্রবর। তারপর ধপাস করে মেঝেয় নামলেন। বললুম, “বলটা পকেটে ঢোকান আগে।”

 

“হঃ!” বল পকেটে ঢুকিয়ে হালদারমশাই বললেন, “খবর কন শুনি।”

 

“খবর পরে হবে। কর্নেলকে দেখেছেন?”

 

“উ! কর্নেল-স্যার আমাকে দেখেও দেখলেন না। ওই ঘরে ঢুকে গেলেন।”

 

তিনজনে সেই ঘরে ঢুকে গিয়ে দেখি, কর্নেল একটা ইজিচেয়ারে বসে আছেন। মুখে চুরুট, চোখ বন্ধ এবং নাক ডাকছে। ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”

 

কর্নেল চোখ না খুলেই বললেন, “শুয়ে পড়া ডার্লিং! অনেক রাত হয়েছে।”

 

হালদারমশাই বিরক্ত হয়ে বললেন, “এ কি ঘুমনোর সময় কর্নেল-স্যার?”

 

“চাংকোবাহাদুরের বেডরুম এটা। শুয়ে পড়ুন।” আবার কর্নেলের নাক-ডাকা শুরু হল।

 

সম্রাট চাংকোর রাজকীয় বিছানার দিকে তাকিয়ে হালদারমশাই বললেন, “হঃ!” তারপর হঠাৎ বিকট হাই তুলে সেদিকে এগিয়ে গেলেন এবং শুয়ে পড়লেন।

 

ভোঁদাই হাই তুলে বলল, “দাদা! বিচ্ছিরি ঘুম পাচ্ছে কেন বলুন তো? আমি শুই?”

 

বলে সে মেঝেতেই চিতপাত হল। তারপর টের পেলুম আমারও ঘুম পাচ্ছে। সম্রাট চাংকোর বেডরুমে কি ঘুমের ওষুধ ছড়ানো আছে?

 

একটা গদিআঁটা আসনে বসে হেলান দিলুম। তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি। কী একটা চাঁচামেচিতে সেই ঘুম যখন ভাঙল, তখন বুঝলুম আমাকে একটা গোরিলা-মানুষ কাতুকুতু দিচ্ছে। এক লাফে উঠে দাঁড়ালুম। গোরিলা-মানুষটা ক্ষান্ত হল সঙ্গে-সঙ্গে। সম্রাট চাংকো রাগে ফুঁসছেন। দাঁত কিড়মিড় করছেন। বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত ফিক-ফিক করে হাসছেন কেন জানি না। ভেঁদা-পালোয়ান মেঝেয় বসে আছে। দুটো গোরিলা-মানুষ তাকে কাতুকুতু দিচ্ছে। কিন্তু তার পেশী ফুলে ঢোল। সুবিধে করতে পারছে না ওরা। যত কাতুকুতু দিচ্ছে, পালোয়ান তত পেশী ফোলাচ্ছে।

 

আর হালদারমশাইকে কাতুকুতু দিচ্ছে অন্তত একডজন গোরিলা-মানুষ। কিন্তু ওঁর ঘুম ভাঙছে । তাই সম্রাট চাংকো হাত দুটো ছুঁড়ে খুব চ্যাঁচামেচি করছেন।

 

ঘরে কর্নেলকে দেখতে পেলুম না। গজকুমার সিংয়ের জন্য একটা চমৎকার বিছানা পাতা হয়েছে। তিনি ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু ওঁর ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করছে না কেউ। সম্রাট চাংকোর বন্ধুর নাতি। তাই কি এই খাতির?

 

সম্রাট চাংকো গর্জন করলেন, “ক্র্যাম্বো হ্রাম্বো ল্যাম্বো!”

 

গোরিলা-মানুষেরা হালদারমশাইকে এবার চ্যাংদোলা করে তুলল। বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তকে ফিসফিস করে বললুম, “সর্বনাশ! একটা কিছু করা উচিত আমাদের।”

 

বিজ্ঞানী চোখের ইশারায় আমাকে চুপ করতে বললেন। সম্রাট চাংকো তার বিছানা ঝেড়ে সাফ করে শুয়ে পড়লেন। তারপর জড়ানো গলায় বললেন, “ভ্রাম্বো লাম্বো নাম্বো।”

 

গোরিলা-মানুষেরা সঙ্গে-সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সম্রাট চাংকো নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে থাকলেন। বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত বললেন, “এই মন্সের অপেক্ষায় ছিলুম। চলে আসুন, জয়ন্তবাবু! চাংকোর ল্যাবে যাই।”

 

ভোঁদা আমাদের সঙ্গ নিয়ে বলল, “ওই দাদা যে পড়ে রইলেন?” চন্দ্রকান্ত ফিক করে হেসে বললেন, “আমাদের পৃথিবীর ভাষায় উনি মড়া–স্রেফ ডেড বডি।” চমকে উঠে বললুম, “সর্বনাশ! তা হলে গজকুমার সিং নাম বলেছিলেন, সেটাই সত্যি!”

 

সেই ল্যাবে পৌঁছে চন্দ্রকান্ত জবাব দিলেন, “উনি একজন যথার্থ মৃত মানুষ। কাজেই ওঁকে নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই।”

 

অবাক হয়ে বললুম, “কী আশ্চর্য! আপনার নিশ্চয় কোনো ভুল হচ্ছে।”

 

“নাহ।” বলে চন্দ্রকান্ত ডাকলেন, “কর্নেল! আপনি কোথায়?”

 

কর্নেলের সাড়া এল যেন আমাদের পায়ের তলা থেকে, “চলে আসুন! পেয়ে গেছি।”

 

চন্দ্রকান্ত খুঁজছিলেন। মেঝের দিকে দৃষ্টি। একখানে একটা চৌকো গর্ত দেখতে পেয়ে বললেন, “এই যে!” সেই গর্তের ভেতর সিঁড়ি নেমে গেছে, নীল আলো জ্বলছে। আমরা তিনজনে নীচে নেমে গিয়ে দেখি, এ-ও আর-এক ল্যাব। সেখানে শ্রীমান ধুন্ধু চিত হয়ে শুয়ে আছে। বিজ্ঞানী তার কানে মোচড় দিয়ে ওঠালেন।

 

কিন্তু একটা আশ্চর্য ব্যাপার চোখে পড়ল। সারবন্দী কাঁচের কফিনের ভেতর কী আর কে ভেসে আছে একটা করে মৃত মানুষ। কর্নেল বললেন, “চন্দ্রকান্তবাবু! চাংকোর কীর্তি দেখুন!”

 

চন্দ্রকান্ত সপ্রশংস ভঙ্গিতে বললেন, “জেনেটিক্সে চাংকোর মাথা বরাবরই ভালো খেলত। অপূর্ব! পৃথিবীর সব বেওয়ারিশ লাশ এক্সরে-ল্যাসোর সাহায্যে তুলে নিয়ে এসে প্রাণ দিচ্ছে। কিন্তু স্টেজগুলো লক্ষ করছেন কি?”

 

বললেন, “হ্যাঁ। প্রাণ দিয়ে চাংকো তাকে পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষে পরিণত করছেন। আমরা যেসব গোরিলা-মানুষ দেখলুম, তারা ক্রোম্যাগনন প্রজাতির। বিবর্তনতত্ত্বকে নিয়ে চাংকো খেলা করছেন। অসাধারণ প্রতিভাধর বিজ্ঞানী!”

 

“গজকুমারবাবুকেও গোরিলা-মানুষ করবে চাংকো।” বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত দুঃখিতমুখে বললেন, “আমার বড্ড খারাপ লাগছে ভাবতে।”

 

কর্নেল হাসলেন, “খারাপ লাগলেও কী আর করা যাবে, বলুন! পৃথিবীর নিয়ম হল, সেখানে যে মরে যাবে, সে চিরমৃত। এই গ্রহে সে জীবিত হচ্ছে, এটা মন্দ না। আহা, প্রাণ জিনিসটা বড় সুন্দর। তা একেবারে হারিয়ে যাওয়ার চাইতে এ তো ভালোই!”

 

বিজ্ঞানী দাড়ি চুলকে বললেন, “এ আমার সাবজেক্ট নয়। আমি অ্যাস্ট্রো-ফিজিসিস্ট। কাজেই বায়োলজি, ফিজিওলজি বা জেনেটিক্সে আমার মাথাব্যথা নেই। চলুন, ফেরা যাক। ধুন্ধু, ট্রাও ট্রাও!”

 

ভোঁদা বলে উঠল, “ডিটেকটিভদ্রলোককে মেরে গোরিলা-মানুষ করবে না তো? ওঁকে কোথায় নিয়ে গেল, দেখা উচিত স্যার।”

 

চন্দ্রকান্ত নড়ে উঠলেন, “তাই তো! কর্নেল শিগগির চলুন! ডিটেকটিভদ্রলোকের কথা একবারে ভুলে গেছি। ধুন্ধু! বড্ড শব্দ করছ! টুও ট্রও ট্রও।”

 

কিছুক্ষণ পরে আমরা চত্বরে বেরিয়ে দেখি, হালদারমশাইকে গোরিলা-মানুষেরা একটা পাথরের স্তম্ভে বেঁধেছে এবং বড়-বড় পাথরের চাই ছুঁড়ছে। আঁতকে উঠেছিলুম। কিন্তু পাথরগুলো হালদারমশাইয়ের গায়ে লেগে ঝুরঝুর করে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। হুঁ, মাধ্যাকর্ষণ কম। তাই এখানকার পদার্থের ওজন কম। শুধু এই বলগুলো ছাড়া। যদি গোরিলা-মানুষেরা বল ছুঁড়ে মারে? চন্দ্রকান্তকে ফিসফিস করে কথাটা বলতেই উনি ধুন্ধুকে লেলিয়ে দিলেন। কিন্তু তাকে ওরা গ্রাহ্য করল না। কর্নেল ডাকলেন, “হালদারমশাই! হালদারমশাই!”

 

কোনো সাড়া নেই। আপাদমস্তক বাঁধা অবস্থায় উনি বেঘোরে ঘুমোচ্ছেন। আসলে পাথর ছুঁড়ে-ছুঁড়ে গোরিলা-মানুষগুলো নেতিয়ে পড়েছে ক্রমশ। বুঝলুম, এরা ক্রোম্যাগনন প্রজাতির মানুষ। তাই পাথর ছাড়া অন্য অস্ত্রের কথা জানে না। জানলে এতক্ষণ হালদারমশাই বেঘোরে মারা পড়তেন। ওদিকে ধুন্ধু এবার বেদম থাপ্পড় চালাতে শুরু করেছে। কর্নেল হঠাৎ বলে উঠলেন, “নস্যি, হালদারমশাই! নস্যি!”

 

অমনি উনি চোখ খুললেন। বললেন, “কী! কী! ওঃ! অনেকক্ষণ নস্যি লই নাই। নাকটা কেমন করতাছে!” তারপর টের পেলেন সব। খাপ্পা হয়ে চাঁচালেন, “আমারে বাঁধল কেডা? এই ভূতগুলি? তবে রে!”

 

কর্নেল এগিয়ে গিয়ে বাঁধন খুলে দিলেন। গোরিলা-মানুষেরা বাধা দিল না। আসলে তারা ধুন্ধুর থাপ্পড় খেয়ে বড় ক্লান্ত। কর্নেল তাদের দিকে ঘুরে বললেন, “ভ্রাম্বো! থাম্বো! নাম্বো!”

 

অমনি তারা চলে গেল। বোধ হয়, ঘুমোতেই গেল। বললুম, “আপনি ওদের ভাষা বোঝেন, কর্নেল?”

 

কর্নেল বললেন, “কানে শুনে-শুনে একটুখানি শিখে নিয়েছি।”

 

হালদারমশাই শ্বাস ছেড়ে বললেন, “কই নস্যি?”

 

কর্নেল পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করে দিয়ে বললেন, “কুমড়ো-মানুষদের ঘরে ফেলে এসেছিলেন। দেখতে পেয়ে কুড়িয়ে রেখেছিলুম।”

 

বিজ্ঞানী চন্দ্ৰকান্তের এতক্ষণে স্পেসশিপের কথা মনে পড়ল। বললেন, “কিন্তু আমার স্পেসশিপ? পৃথিবীতে ফিরব কী করে আমরা?” তিনি দাড়ি চুলকোতে থাকলেন উদ্বিগ্নমুখে।

 

বললুম, “স্পেসশিপ ইনট্যাক্ট আছে। চলুন, সেখানে নিয়ে যাই।”

 

স্পেসশিপের কাছে গিয়ে আর-এক দৃশ্য দেখে ভড়কে গেলুম। ভবেশবাবুর সঙ্গে একদঙ্গল গোরিলা-মানুষের লড়াই বেধেছে। ওরা ওঁকে পাথর ছুঁড়ে মারছে। পালটা উনি ছুড়ছেন সেই আজব বল। বলের ধাক্কায় ওরা কুপোকাত হচ্ছে। চন্দ্রকান্ত বললেন, “কী বিপদ! এবার ওরা যদি বল ছোঁড়ে?”

 

ভোঁদা বলল, “তবে রে!” তারপর দৌঁড়ে গেল। সে গোরিলা-মানুষদের টিকি থেকে বল খুলে নিতে শুরু করল। ফলে ওরা আকাশে ভেসে হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি শুরু করল।

 

ভবেশবাবু আমাদের দেখে বললেন, “বনমানুষগুলোর বড় বাজে স্বভাব। বেশ ঘুমোচ্ছি। হঠাৎ দরজা খুলে কাতুকুতু দিতে শুরু করেছে। তবে আশ্চর্য ব্যাপার, অত বড়-বড় পাথর আমার গায়ে পড়ে ছাতু হয়ে গেল কেন বলুন তো? আমি তো ভোঁদার মতো পালোয়ান নই!”

 

কর্নেল বললেন, “পরে বুঝিয়ে বলব। ঢুকুন ভবেশবাবু! পৃথিবীতে ফেরা যাক। আমার চুরুটের স্টক শেষ।”

 

ভোঁদা বলল, “গোরিলা-মানুষগুলোর জন্য দুঃখ হচ্ছে, বল কেড়ে নিলুম বটে! ওরা নামবে কী করে? এক মিনিট। বলগুলো ওদের দিকে ছুঁড়ে দিই। তারপর ভে-কাট্টা করব।” সে বলগুলোকে কুড়িয়ে ছুঁড়তে শুরু করল। গোরিলা-মানুষেরা লুফে নিল এবং নামল। কিন্তু আর আক্রমণ করতে এল না। দল বেঁধে করুণ মুখে তাকিয়ে রইল। ধুন্ধু থাপ্পড় তুলে কী জানি কেন হাত নামাল। মানুষের সঙ্গণে তার মানুষ-ভাব এসেছে।

 

আমরা স্পেসশিপে ঢোকার পর হালদারমশাই বললেন, “আরে কী কাণ্ড! আরও সব গোরিলা-মানুষ আসছে অ্যাটাক করতে। কুইক সায়েন্টিস্টমশাই!”

 

জানলা দিয়ে দেখি, উপত্যকা জুড়ে হাজার-হাজার গোরিলা-মানুষ আসছে। কিন্তু মারমুখী বলে মনে হচ্ছে না। নীলাভ আলোয় প্রতিটি মুখে বিষণ্ণতার স্পষ্ট ছাপ। ওরা হাত নেড়ে আমাদের কি বিদায় জানাচ্ছে? একদা ওরা আমাদের পৃথিবীরই মানুষ ছিল। সেই স্মৃতি কি ওদের অবচেতনা থেকে জেগে উঠেছে? মনটা খারাপ হয়ে গেল। পৃথিবীতে ওরা মৃত। এখানে ওরা জীবিত।

 

আমাদের মহাকাশযানের চারদিক ঘিরে গোরিলা-মানুষেরা হাত নাড়ছিল। আমরাও ভেতর থেকে হাত নাড়লুম। সম্রাট চাংকো এখন তার ঘুমঘরে ঘুমোচ্ছেন। তিনি জানতে পারছেন না, তার, প্রজারা কী করছে এখন। নীল আশ্চর্য সুন্দর আলোয় হাজার-হাজার বিষণ্ণ আদিম মুখ।

 

আমরা পাঁচজন মানুষ আকাশে ভেসে যেতে-যেতে নীচে তাদের শেষবারের মতো দেখে নিলুম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *