কুয়াশার রঙ নীল (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
সূত্রপাত
জয়দীপ অভ্যাসমতো খুব ভোরে ময়দানে জগিং করতে এসেছিল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কলকাতার বুকের ভেতরটা তত কিছু ঠাণ্ডা নয়। কিন্তু ময়দানের খোলামেলায় শীতের মুখোমুখি পড়তে হয়। এ দিন কুয়াশাও ছিল ঘন।
অন্যদিন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনাসামনি কোথাও গাড়ি রেখে জয়দীপ ময়দানে যায়। আজ সে গেল রেড রোডে।
গত দুদিনই কিছু বিরক্তিকর ঘটনা ঘটেছে। এক ধরনের টিজিং বলা চলে। পরনে নীলচে রঙের হাফস্লিভ ব্যাগি সোয়েটার এবং জি, গলায় সোনালি চেন, মাথার লম্বা চুল ঘাড়ের কাছে গোছা করে বাঁধা এক যুবক জয়দীপের সঙ্গে বেয়াড়া রসিকতা করেছে। জগিংয়ের সময় কখনও সে জয়দীপের প্রায় পিঠের কাছে, কখনও তার পাশাপাশি, আবার কখনও হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে এক চক্কর ঘুরে আবার পাশে চলে এসেছে। বিশেষ করে পাশাপাশি দৌড়নোর সময় জয়দীপের গা ঘেঁষে চলে আসা বেশি বিরক্তিকর।
জয়দীপ শান্তশিষ্ট ভদ্র প্রকৃতির বলেই কোনও প্রতিবাদ করেনি। গতকাল একবার শুধু বলেছিল, কী হচ্ছে?
লেটস্ হ্যাভ ফান, ম্যান?
তারপর আর কোনও কথা নয়। বিরক্ত জয়দীপ তার গাড়ির কাছে ফিরে গিয়েছিল। ইংরেজি উচ্চারণ শুনে এবং চেহারা দেখে জয়দীপের মনে হয়েছিল যুবকটি সম্ভবত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। জয়দীপের চেয়ে ফর্সা চামড়া। কিন্তু একটু পোড়খাওয়া, রুক্ষ, লাবণ্যহীন। চোখের দৃষ্টিতে কৌতুকের আড়ালে কেমন যেন নিষ্ঠুরতা ওত পেতে আছে। একটু গা ছমছম করছিল জয়দীপের।
আজ রেড রোডে পৌঁছে গাড়ি ঘুরিয়ে ময়দানের দিকের ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড় করাল জয়দীপ। তারপর চাবি এঁটে বাঁদিকে ময়দানে গেল। জগিং শুরু করল। এদিকটাতেও স্বাস্থ্যকামীদের আনাগোনা আছে। ঘন কুয়াশার ভেতর কাছে ও দূরে সঞ্চরমান কিছু ছায়ামূর্তি চোখে পড়ল তার। প্রায় মিনিট কুড়ি একটানা দৌড়নোর পর শরীরে উষ্ণতা ফিরে এল। জয়দীপ রেড রোডের দিকে সারবদ্ধ গাছের কাছাকাছি একটু থামল। তখনই তার চোখে পড়ল গাছের নিচে শুকনো নালায় একটা মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে আছে।
এভাবে মোটরসাইকেল রাখাটা অদ্ভুত। ফুটপাতের ধার ঘেঁষে এবং ওপরেও কিছু গাড়ি ও মোটরবাইক রাখা আছে। কিন্তু নালায় ওটা রাখার মানে কী? বেশি সতর্কতা?
তবে এ নিয়ে মাথা ঘামানোর মানে হয় না। জয়দীপ আর এক চক্কর দৌড় শুরু করল নালার সমান্তরালে। প্রায় শদুই মিটার দৌড়নোর পর হঠাৎ সে দেখল সেই বখাটে যুবকটি তার দিকেই এগিয়ে আসছে। কুয়াশার মধ্যেও চিনতে ভুল হয়নি জয়দীপের। জয়দীপ বাঁদিকে ঘুরল কিন্তু ততক্ষণে যুবকটি তার পাশে এসে গেছে।
আজ জয়দীপ বেয়াদপি বরদাস্ত করতে পারল না। সে থমকে রুখে দাঁড়াল ঘুষি মারার জন্য। অমনই তার ক্লান্ত ও স্পন্দিত হৃদপিণ্ডে একঝলক রক্ত উপচে এল যেন।
যুবকটির হাতে ছোরা।
সে ঝাঁপিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে জয়দীপ মাথার ঠিক রাখতে পারল না। আশেপাশে মানুষজন ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু কুয়াশার জন্যই কেউ হয়তো সন্দেহজনক কিছু ঘটতে দেখছে না। জয়দীপ তার গাড়ি লক্ষ্য করে দৌড়তে থাকল। এ দৌড় জগিং নয় প্রাণভয়ে ছুটে পালানো।
যুবকটি তাকে অনুসরণ করেছে।
জয়দীপ এক লাফে নালা পেরিয়ে ফুটপাতে পৌঁছল। আততায়ী তখন তার পিছনে কয়েক হাত দূরে। ঘুরে দেখামাত্র দিশেহারা জয়দীপ রেড রোডে গিয়ে পড়ল।
তারপরই ঘটে গেল একটা সাংঘাতিক দুর্ঘটনা। ব্রেকের কুৎসিত ও বিপজ্জনক শব্দ স্তব্ধতা খান খান করে ফেলল।
এই রাস্তায় সব গাড়িই দ্রুত যাতায়াত করে। কুয়াশার জন্য ভোরে সব গাড়িরই হেডলাইট জ্বলে। যে গাড়িটা জয়দীপকে ধাক্কা দিল, তার কোনও আলো ছিল না এবং সেটা একটা ট্রাক। জয়দীপের শরীর ছিটকে গিয়ে পড়ল ফুটপাতের ওপর। ট্রাকটা কুয়াশার মধ্যে দ্রুত উধাও হয়ে গেল।
শব্দটা শুনেই স্বাস্থ্যকামীদের অনেকে চমকে উঠেছিল। তারা হইচই করে দৌড়ে এল। সেই যুবকটি তখন জয়দীপের থ্যাতলানো রক্তাক্ত শরীরের ওপর ঝুঁকে পড়েছে।
দেখতে দেখতে ভিড় জমে গেল। কেউ কেউ দাঁড় করানো গাড়িগুলোর কাছে ছুটে গিয়েছিল। জয়দীপকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বাভাবিক মানবিক আকুতিতে। কিন্তু সব গাড়িই লক করা। একটা গাড়িতে ড্রাইভার ছিল। কিন্তু তাকে টলানো গেল না। তার মালিক ময়দান থেকে না ফেরা পর্যন্ত কিছু করার নেই। চাকরি চলে যাবে।
জয়দীপের গাড়ির পেছনে একটা গাড়ি ছিল। এই গাড়িতে ছিলেন এক প্রৌঢ় এবং একজন যুবক। যুবকটি ছিল স্টিয়ারিঙে। দুর্ঘটনার ব্যাপারটা বুঝতে তাদের একটু সময় লেগেছিল। বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে প্রৌঢ় বলে উঠেছিলেন, কুইক! কুইক! হাঁ করে কী দেখছ?
গাড়িটা জোরে এগিয়ে জয়দীপের কাছে পৌঁছল। তারপর যুবকটি বলে উঠল, বব চলে যাচ্ছে!
ওকে ফলো করো!
বব ভিড় থেকে বেরিয়ে জগিংয়ের ভঙ্গিতে নালায় রাখা মোটসাইকেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সেইসময় গাড়ির হর্ন এবং বব ডাক শুনে সে এক লাফে মোটরসাইকেলে চেপে বসল। তারপর স্টার্ট দিয়ে সোজা ময়দানে উঠল। তারপরে উধাও হয়ে গেল।
প্রৌঢ় লোকটি খাপ্পা হয়ে চাপা গর্জন করলেন, নেমকহারাম! বিশ্বাসঘাতক!
তাঁর হাতে রিভলভার ছিল। যুবকটি বলল, আম্স্ লুকিয়ে ফেলুন স্যার! পেছনে পুলিশের গাড়ি এসে গেছে।
পুলিশের একটি পেট্রলভ্যান ততক্ষণে দুর্ঘটনার জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে গেছে। সার্জেন্ট ভদ্রলোক ট্রাকের নাম্বার নেওয়া হয়নি শুনে রুষ্টমুখে বললেন, আপনাদের সিভিক সেন্স নেই বলেই তো বেঁচে আছে, না মরে গেছে?
একজন অভিজাত চেহারার ভদ্রলোক ব্যস্তভাবে বলেন, এখনই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার। পি জি-তে নিয়ে যান। মনে হচ্ছে এখনও মারা যায়নি।
কনস্টেবলরা এবং ভিড়ের কিছু লোক ধরাধরি করে জয়দীপের শরীরটাকে পুলিশ ভ্যানের খোঁদলে তুলে দিল। পুলিশ ভ্যান পি জি হাসপাতালের দিকে চলে গেল। সার্জেন্ট নোটবই বের করে প্রত্যক্ষদর্শীদের স্টেটমেন্ট নিতে থাকলেন।
সেই গাড়িটি ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে। প্রৌঢ় লোকটি সমানে ক্রুদ্ধ ও চাপা গর্জন করছেন। যুবকটি বলল, আমি ভাবতেই পারিনি বব এমন করবে। আমার এখন সন্দেহ হচ্ছে বজ্জাতটা কিছু আঁচ করেছিল।
প্রৌঢ় লোকটি শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, দ্যাটস্ অ্যাবসার্ড। তুমি যদি ওকে কিছু দৈবাৎ মুখ ফসকে বলে থাকো?
কী বলছেন স্যার? আমি শুধু ওকে—
থামো! এখন বলল, শুয়োরের বাচ্চা মোটরসাইকেল পেল কোথায়?
সেটা জানতে দেরি হবে না স্যার। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
ওর ডেরা তো তুমি চেনো?
চিনি। ওর বন্ধুদেরও চিনি।
কাজটা তুমিই ওকে দিয়েছিল মাইন্ড দ্যাট। তোমারই সব দায়িত্ব।
নিশ্চয়। আপনি ভাববেন না।
গাড়ি বাঁদিকে বাঁক নেওয়ার পর প্রৌঢ় বললেন, পি জি হয়ে চলো। জয়দীপ ব্যানার্জিকে একবার দেখে সিওর হতে চাই, বব সাকসেসফুল হয়েছে কি না! বুঝতে পেরেছ? আমরা জয়দীপের আত্মীয় কেমন?….
