হিটাইট ফলক রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

ব্রোঞ্জের ফলক চুরি

 

মার্চ মাসের এক ভোরবেলায় টেলিফোনের বিরক্তিকর শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। যথারীতি খাপ্পা হয়ে রিসিভার তুলে বলেছিলুম,রং নাম্বার।

 

অমনই আমার কানে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,–রাইট নাম্বার ডার্লিং! অপ্রস্তুত হয়ে উঠে বসে বলেছিলুম,–মর্নিং ওল্ড বস! আসলে

 

-জানি, জানি। তুমি আটটার আগে ওঠ না। তবে আমি জানি, নাইট ডিউটি থাকলে ভোরে ঘুমন্ত সাংবাদিকদের কানের কাছে কামান গর্জন হলেও তাদের ঘুম ভাঙে না। যাই হোক, বোঝ যাছে, তোমার নাইট ডিউটি ছিল না।

 

–কিন্তু ব্যাপারটা কী?

 

–ব্যাপার না থাকলে এই বৃদ্ধ তোমার কাঁচা ঘুম ভাঙায় না, তা তো তুমি জানো জয়ন্ত!

 

হাসতে-হাসতে বললুম,–অর্থাৎ আপনার বাড়িতে আমার আজ ব্রেকফাস্টের নেমন্তন্ন। তারপর!

 

কর্নেল কিছুটা চাপা স্বরে বললেন, তারপর আমরা জনৈক আলুওয়ালার কাছে যাব।

 

–কী সর্বনাশ! এবার আলুর গুদামে রহস্যের ইঁদুর ঢুকেছে নাকি?

 

–জয়ন্ত! হাতে সময় কম। এখনই চলে এসো।…

 

ঠিক এইভাবেই মার্চের সেই অদ্ভুত দিনটা শুরু হয়েছিল। অদ্ভুত বলছি, তার কারণ আমি কল্পনাও করিনি, জনৈক আলুওয়ালাসায়েবের পাল্লায় পড়ে একসময় আমাকে-হ্যাঁ, শুধু আমাকেই, কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে নয়, সুদূর কোনো দেশের মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে শুয়ে মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করতে হবে।

 

তবে না। সে-কথা যথাসময়ে হবে। সেদিনকার কথা দিয়েই এই রোমাঞ্চকর কাহিনি শুরু করা যাক।

 

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ব্রেকফাস্ট করে এবং কফি খেয়ে কর্নেলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলুম। তারপর পৌঁছেছিলুম সত্যি সত্যি জনৈক আলুওয়ালাসায়েবের নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাটে। অবশ্য তাঁকে আমি এই কাহিনিতে আলুওয়ালা বললেও তার প্রকৃত পদবি আলুওয়ালিয়া।

 

তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর কর্নেল এবং তার মধ্যে যে-সব কথাবার্তা হয়েছিল, এবার তা বলা যাক্। …

 

–মোহেনজোদাড়োতে ঘোড়া? অসম্ভব। ওখানে খোঁড়াখুঁড়ি করে এযাবৎ অনেক জন্তুর মূর্তি পাওয়া গেছে, ঘোড়ার কোনো চিহ্নই মেলেনি। এর একটাই মানে দাঁড়ায়। ওখানকার লোকেরা ঘোড়া নামে কোনো জন্তুর কথা জানত না। আর শুধু ওখানে কেন, হরাপ্পা, চানহুড়ো, কালিবঙ্গান থেকে শুরু করে, যেখানে-যেখানে সিন্ধু সভ্যতার চিহ্ন পাওয়া গেছে, কোথাও ঘোড়ার মূর্তি দেখা যায়নি।

 

–আচ্ছা ডঃ আলুওয়ালা, মোহেনজোদাড়োর ধ্বংসাবশেষ তত বাঙালি পুরাতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় আবিষ্কার করেছিলেন। তাই না?

 

-হ্যাঁ। ১৯২১ সালে তিনিই সিন্ধুপ্রদেশের লারকানা থেকে মাইল বিশেক দূরে একটা বৌদ্ধ স্কুপ দেখতে পান। সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করার সময় টের পান, একটা শহরের ধ্বংসাবশেষ মাটির তলায় লুকিয়ে আছে। এর প্রায় একশ বছর আগে ওখান থেকে চারশ মাইল দূরে হরাপ্পার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছিল। তবে যাকে বলে বিজ্ঞানসম্মত খনন, তা শুরু হয় ১৯২১ সালে। তারপর …।

 

-একটা কথা জিজ্ঞেস করি ডঃ আলুওয়ালা। আপনার বাবা ওই সময় লারকানায় স্টেশন মাস্টার ছিলেন। তাই না?

 

-হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কীভাবে জানলেন?

 

–আপনার লেখা একটা প্রবন্ধ পড়ে। চমৎকার প্রবন্ধ।

 

–বাঃ। আপনার দেখছি পুরাতত্ত্ব বিষয়ক পত্রিকা পড়ারও নেশা আছে।

 

-আমি সবই পড়ি, ডঃ আলুওয়ালা। সত্যি বলতে কী, আপনার ওই প্রবন্ধ পড়েই আপনার সঙ্গে যোগাযোগের লোভ সামলাতে পারিনি।

 

-হাঃ হাঃ হাঃ! এতক্ষণে বুঝলুম, কেন আমার কাছে এসেছেন। বাঁচালেন মশাই। এতক্ষণ আপনার সঙ্গে কথা বলছি বটে, কিন্তু মনের মধ্যে অস্বস্তি হচ্ছিল প্রচণ্ড রকমের।

 

–সে কী! কেন, কেন?

 

–আপনার কার্ডটা দেখে। ওতে লেখা আছে : কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার। অর্থাৎ কিনা শখের গোয়েন্দা। দেখেই আমি চমকে উঠেছিলুম। আমার কাছে এই সাতসকালে গোয়েন্দা কেন রে বাবা? আমি নেহাত অধ্যাপক মানুষ। হাঃ হাঃ হাঃ! তার ওপর আপনার সঙ্গী ভদ্রলোক আবার খবরের কাগজের লোক। বলুন, অস্বস্তি হয় কি না!

 

এই সময় একটা লোক চা ও স্ন্যাকস্ নিয়ে এল ট্রে বোঝাই করে। ডঃ আলুওয়ালা তার থেকে ট্রে প্রায় কেড়ে নিলেন এবং টেবিলে রেখে সযত্নে কফি তৈরি করতে ব্যস্ত হলেন। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, কর্নেল ডঃ আলুওয়ালার বইঠাসা আলমারিগুলোর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। অপরাধতত্ত্ব থেকে প্রকৃতিতত্ত্বে এসে পৌঁছেছিলেন ইদানীং। এবার দেখছি পুরাতত্ত্বে ঝুঁকেছেন। হুঁ, এবার তত্ত্ববাগীশ না হয়ে ছাড়বেন না।

 

–চা নিন, কর্নেল।

 

কর্নেল হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিয়ে বললেন,–আপনি মোহেনজোদাভোর একটা ফলকের হরফগুলো নাকি পড়তে পেরেছেন। দয়া করে সেটা যদি একবার দেখান, বাধিত হব।

 

ডঃ আলুওয়ালা একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনাকে দেখাতে আপত্তি নেই। কিন্তু জয়ন্তবাবুকে একটা বিশেষ অনুরোধ করব।

 

বললুম,–নিশ্চয়, নিশ্চয়।

 

–দেখুন, জয়ন্তবাবু! সেই ১৯২২ থেকে এ পর্যন্ত দেশবিদেশের বড় বড় পণ্ডিত সিন্ধু সভ্যতার সময় নিয়ে বিস্তর মাথা ঘামাচ্ছেন। সীলমোহর এবং ফলকের লেখাগুলো পড়তে পারলে হয়তো সঠিক সময় নির্ণয় করা যেত। কেউ বলছেন, এ সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার সালের, কেউ বলছেন, আরও পরবর্তী যুগের। আজ অব্দি সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যদিও মাঝে মাঝে কেউ কেউ দাবি করেন যে তিনি লেখাগুলো পড়তে পেরেছেন। আসলে সমস্যা কোথায় জানেন? সম্ভবত যে-ভাষার ওই লিপি, সেই ভাষাই হাজার হাজার বছর আগে লুপ্ত হয়েছে। যাই হোক, এই সমস্যার একটা সমাধানের পথ আমি খুঁজে পেয়েছিলুম। আপনারা চিত্রলিপির কথা নিশ্চয় জানেন? অতীত যুগে সূর্য বোঝাতে সূর্য আঁকা হত। পাখি বোঝাতে পাখি। মোহেনজোদাড়োর একটা ফলক নিয়ে আমি গবেষণা শুরু করেছিলুম। সেটাতে কয়েকটা চিহ্ন দেখে আমার মনে হয়েছিল, এ নিশ্চয় চিত্রলিপি। চিহ্নগুলোতে ফসলের শীষ, লাঙল, বলদ, শস্যগোলা ইত্যাদির আভাস আছে যেন। এই সূত্র ধরেই ফলকটা আমি অনুবাদ করে ফেলেছি। কিন্তু এখনই হুট করে সেটা প্রচার করতে চাইনে। যদি ভুল প্রমাণিত হয়, উপহাস্যাস্পদ হব। তাই জয়ন্তবাবু খবরের কাগজের লোক বলেই বলছি, ফলকের অনুবাদটা যেন কাগজে ছেপে দেবেন না। আমি পত্রিকার প্রবন্ধে শুধু বলেছি, একটা ফলকের পাঠোদ্ধার করেছি বলে মনে করি। তার বেশি কিছু লিখিনি।

 

আমি জোরে মাথা দুলিয়ে বললুম,–কক্ষনোও ছেপে দেব না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন

 

ডঃ আলুওয়ালা। তা ছাড়া আপনার সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারের ব্যাপারটাই আমি দৈনিক সত্যসেবকে। প্রকাশ করব না। কারণ, আমার মাননীয় বন্ধু কর্নেল আমাকে আগেই সেটা নিষেধ করে দিয়েছেন।

 

কর্নেল দাড়ি ও টাক পর্যায়ক্রমে চুলকে বললেন,–ঠিক, ঠিক।

 

ডঃ আলুওয়ালা উঠে গিয়ে একটা স্টিলের আলমারি খুললেন। তারপর একটা ফাইল বের করে আনলেন।

 

কর্নেল ঝুঁকে পড়লেন কাগজপত্রের দিকে। আমি কি বুঝলাম না। একগাদা কাগজে নানা বিঘুঁটে আঁকজোক রয়েছে। তার পাশে নানান উদ্ভুটে শব্দ ইংরাজিতে লেখা।

 

ডঃ আলুওয়ালা একটা কাগজ তুলে নিয়ে বললেন,–ফলকটায় লেখা আছে কী শুনুন : ‘শস্যগোলার অধিকর্তাকে একটি সেরা জাতের বলদ পাঠানো হচ্ছে।‘

 

কর্নেল বললেন,–পাঠাচ্ছেন কে?

 

–সেকথা ফলকে নেই। মনে হচ্ছে, এটা একটা বাণিজ্য সংক্রান্ত সংবাদ। আজকাল যাকে বলে চালান বা ইনভয়েস।

 

-ফলকটা কিসের তৈরি? কোথায় আছে ওটা?

 

-ফলকটা ব্রোঞ্জের। মাপ হচ্ছে সাড়ে তিন ইঞ্চি চওড়া সাত ইঞ্চি লম্বা। ওটা এখন আছে লন্ডনের জাদুঘরে। মোহেনজোদাড়ো এবং হরাঙ্গা পাকিস্তানে। তাই পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশ সরকারের কাছে ওটা দাবি করছেন। শুনেছি, ফলকটা শিগগির ফেরত দেওয়া হবে।

 

–আপনি কোত্থেকে ফলকের নকল সংগ্রহ করেছিলেন?

 

ডঃ আলুওয়ালা হাসলেন। আমার বরাত বলতে পারেন। বাবা ছিলেন লারকানার স্টেশন মাস্টার। এখন তো লারকানা বিরাট শহর। পাকিস্তানের পরলোকগত প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টোর বাড়ি ওখানে। আমার ছেলেবেলায় লারকানা ছিল অখাদ্য জায়গা। যাই হোক, বাবার একটু-আধটু পুরাতত্ত্বের বাতিক ছিল। স্যার জন মার্শাল ভারতে ব্রিটিশ সরকারের পুরাতত্ত্ব দপ্তরের কর্তা ছিলেন তখন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তার অধীনে এক কর্মচারী। রাখালদাসের সঙ্গে বাবার খুব বন্ধুত্ব ছিল। সেই সুত্রে বাবা ওঁরই কাছ থেকে এই ব্রোঞ্জের ফলকের একটা অবিকল

 

নকল জোগাড় করেছিলেন। সেটা এখনও আমার কাছে আছে। দেখাচ্ছি।

 

বলে ডঃ আলুওয়ালা উঠলেন। ভেতরের ঘরে চলে গেলেন। এতক্ষণে আমি আবার কর্নেলকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেলুম,–হ্যালো ওল্ড বস! ব্যাপারটা কী বলুন তো?

 

-চুপ, চুপ! আমাকে বস বলে ডেকো না।

 

–তাহলে কি টিকটিকি বলে ডাকব?

 

–কিছু না। স্রেফ কর্নেল বলে ডাকবে।

 

–বেশ। কর্নেল স্যার, এবার বলুন তো সাতসকালে আমাকে ঘুম থেকে তুলে কেন এই গোরস্থানে নিয়ে এলেন?

 

-–গোরস্থান! … কর্নেল চাপা হাসলেন : তুমি ঠিকই বলেছ জয়ন্ত। মোহেনজোদাড়ো কথাটার মানে মৃতদেহের স্তূপ।

 

–এবং এই ডঃ আলুওয়ালা দেখছি সেই গোরস্থানের এক মামদো ভূত!

 

–ছিঃ ছিঃ! মহাপণ্ডিত মানুষ উনি!

 

যাই বলুন, হাজার হাজার বছর আগের ব্যাপার নিয়ে যাঁরা মাথা ঘামান, তাঁরা মামদো ভূত নয়তো কী? বর্তমানেই আমাদের কত রকম সমস্যা! তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে কাজ হত। তা নয়, মোহেনজোদাড়ো!

 

–উঁহু, মোহেনজোদাড়োর ঘোড়া।

 

–সে ঘোড়াও তো কত হাজার বছর আগে মরে ভূত হয়ে গেছে। তা ছাড়া এখন ঘোড়ার মূল্য কী? এটা যন্ত্রযুগ। বড়জোর রেস খেলায় বাজি ধরে যারা, তারা ঘোড়া নিয়ে মাথা ঘামায় দেখেছি। আপনি কি ইদানীং রেসুড়ে হয়ে উঠেছেন? ছ্যা ছ্যা!

 

জয়ন্ত ডার্লিং! তোমার কথাগুলো কিন্তু ভিন্ন অর্থে সত্যি। আমি সম্প্রতি মোহেনজোদাড়োর ঘোড়া ভূতের পাল্লায় পড়েছি এবং রেসুড়েদের মতো পিছনে বাজিও ধরেছি।

 

এবার একটু চমকে উঠলুম। কর্নেলের কথার হেঁয়ালি আছে। কিন্তু আর প্রশ্ন করার সুযোগ পেলুম না। ডঃ আলুওয়ালা হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এলেন। একেবারে অন্য রকম চেহারা। হাঁফাতে-হাঁফাতে বললেন,–তাজ্জব কাণ্ড কর্নেল! ফলকটা খুঁজে পেলুম না।

 

–সে কী!

 

–শুধু তাই নয়, শোবার ঘরের যে আলমারির লকারে ওটা রেখেছিলুম, তার তালা ভাঙা। আলমারির পাল্লার তালা কিন্তু ঠিক আছে।

 

–ভারি আশ্চর্য তো!

 

–অতি আশ্চর্য! গত রাতেও দেখেছি, লকারটা ঠিক আছে। এখন দেখি তালা ভাঙা। কে এমন সাংঘাতিক কাজ করল বুঝতে পারছি না!

 

–আর কোনো জিনিস চুরি গেছে কি?

 

–না। আমার স্ত্রীর গয়নাগাটি এবং কিছু নগদ টাকা ছিল। সব আছে।

 

–আপনার স্ত্রী কিছু বলতে পারছেন না?

 

–আমার স্ত্রী গতকাল সকালে বোম্বাই গেছেন মেয়েকে নিয়ে। বাড়িতে আমি একা।

 

–আপনার চাকর আছে দেখলুম!

 

–ও! হ্যাঁ! বৈজু আছে বটে। কিন্তু সে তো খুব বিশ্বাসী ছেলে। প্রায় মাস তিনেক হল, তাকে রেখেছি। বুঝতেই পারেন, আজকাল ভালো ঝি চাকর পাওয়া কত সমস্যা।

 

–বৈজুকে জিজ্ঞেস করলেন কিছু?

 

–নিশ্চয় করব। বোধ হয়, বাজার করতে গেছে। ফিরে আসুক।

 

–আপনি দয়া করে বসুন, ডঃ আলুওয়ালা!

 

কর্নেলের কথায় উনি ধুপ করে বসলেন। উত্তেজনায় তখনও ওঁকে অস্থির দেখাচ্ছে। আমি বললুম,–পুলিশে জানানো উচিত।

 

কর্নেল বললেন, অবশ্যই। আচ্ছা ডঃ আলুওয়ালা, ফলকের নকল চুরি করে কার কী লাভ হতে পারে?

 

ডঃ আলুওয়ালা জবাব দিলেন,–বুঝতে পারছি না। তবে একটা কথা, ওই ফলকটার ছবি কিন্তু এ যাবৎ কোনো বইয়ে দেখিনি। কোথাও কোনো উল্লেখও পাইনি। নেহাত বাবার খেয়াল ছিল, তাই সংগ্রহ করেছিলেন, এবং আমি দেখবার সুযোগ পেয়েছিলুম।

 

–লন্ডন মিউজিয়ামে যে আসল ফলকটা আছে, কী ভাবে জানলেন?

 

–খবরের কাগজে পড়ে। পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশ সরকারের কাছে যেসব প্রত্নদ্রব্য দাবি করেছেন, তার মধ্যে ওই ফলকটার উল্লেখ ছিল।

 

–হুম। কষ্ট করে এবং প্রচুর অর্থ ব্যয়ে লন্ডন যাওয়ার চেয়ে আপনার আলমারি থেকে ওটার নকল বাগানো অনেক সোজা হয়েছে।

 

ডঃ আলুওয়ালার মনে ধরল কথাটা। সায় দিয়ে বললেন,–ঠিক, ঠিক। কিন্তু ওতে এমন কী আছে কে জানে? চোর ইচ্ছে করলে এই ফাইলটাও হাতাতে পারত। এতেও কাগজে আঁকা অবিকল স্কেচ রয়েছে।

 

কর্নেল হাসলেন। কাগজের স্কেচের চেয়ে ব্রোঞ্জের নকল ফলকটাই কাজে লাগবে মনে হয়েছে কারুর। আপনার এই স্কেচ তো নকলস্য নকল। আপনার ড্রইং ক্ষমতায় সম্ভবত আস্থা নেই ভদ্রলোকের।

 

–ভদ্রলোক! সে ব্যাটা ভদ্রলোক। নচ্ছার চোর কাহেকা। এখুনি থানায় জানাচ্ছি।

 

ডঃ আলুওয়ালা উত্তেজিতভাবে ফোনের কাছে গেলেন। ডায়াল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিরক্ত হয়ে বললেন,–সব সময় এনগেজড়! কলকাতার টেলিফোনকে ভূতে ধরেছে। নাঃ! থানায় গিয়েই সব জানিয়ে আসি। বৈজু আসুক।

 

এই সময় আমি লক্ষ করলুম কর্নেল টেবিলে রাখা সেই ফাইল থেকে একটুকরো কাগজ তুলে নিয়ে কোটের পকেটে ঢোকালেন। ডঃ আলুওয়ালা টের পেলেন না। আবার ডায়াল করতে ব্যস্ত হয়েছেন। বোঝা যায় থানায় যেতে মন চাইছে না। নেহাত বেঘোরে না পড়লে আজকাল থানায় যেতে কারই বা ইচ্ছে করে!

 

কিন্তু কর্নেল যা করলেন, তাও যে চুরি! আমি কটমট করে তাকাতেই উনি চোখ টিপে একটু হাসলেন। আমার অস্বস্তি হল। বুড়ো বয়সে কেলেঙ্কারি করবেন যে!

 

ডঃ আলুওয়ালা আরও কয়েকবার চেষ্টা করার পর থানার লাইন না পেয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। তারপর আমাদের কাছে এসে বিমর্ষভাবে বললেন,–দেখুন তো, কী সর্বনাশ হল।

 

কর্নেল বললেন,–থানায় গিয়ে জানিয়ে দিন এক্ষুনি। আজ আমরা তাহলে উঠি। অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করলুম আপনার।

 

–মোটই না! ভাগ্যিস আপনারা এসেছিলেন, তাই চুরিটা এত শিগগির ধরা পড়ল। নইলে আমি তো ওই আলমারি এখন খুলতুম না। কিছু টেরও পেতুম না।

 

কর্নেল ও আমি উঠে দাঁড়ালুম। ডঃ আলুওয়ালা এগিয়ে গিয়ে দরজার পর্দা তুলে ধরলেন। ভদ্রলোক অতি সজ্জন ও কেতাদুরস্ত মানুষ।

 

আমরা তিনতলা থেকে নেমে আসছি, দোতলার মুখে ডঃ আলুওয়ালার চাকর সেই বৈজুর সঙ্গে দেখা হল। তার হাতে বাজারের থলে। সসম্ভ্রমে একপাশে সরে সে আমাদের সেলাম দিল। কর্নেল তাকে কী যেন জিজ্ঞেস করতে ঠোঁট ফাঁক করলেন। করেই বুজিয়ে নিলেন। বৈজু জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল। কর্নেল গট গট করে নেমে গেলেন, আমি বৈজুর দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে তাকে অনুসরণ করলুম।

 

রাস্তায় আমার গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। একটু পরে গাড়িতে যেতে যেতে বললুম,–আপনিও ওই চুরিতে জড়িয়ে পড়বেন নেই–তখন আপনার ওপরই সন্দেহ হবে।

 

কর্নেল চাপা হেসে বললেন,–চোরের ওপর বাটপাড়িতে দোষ নেই, জয়ন্ত।

 

–তার মানে?

 

–ডঃ আলুওয়ালার ব্রোঞ্জের ফলকটাও চুরি করা।

 

–সে কী! উনি যে বললেন, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ওঁর বাবাকে—

 

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন,–স্রেফ মিথ্যে। রাখালবাবু সত্যি এক ভদ্রলোককে আসল ফলকের একটা নকল দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভদ্রলোকের নাম ডঃ পরমেশ্বর ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন একজন নামকরা প্রত্নবিজ্ঞানী। রাখালবাবুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার বাড়ি বর্ধমানের এক গ্রামে। অনেক দিন আগে তিনি মারা গেছেন। তার ছেলে শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এখন রিটায়ার করেছেন। সম্প্রতি মাস দুই আগে তার গ্রামের বাড়ি থেকে রহস্যজনক চুরি হয়েছে। চোর আর কিছু নেয়নি–নিয়ে গেছে শুধু একটা ব্রোঞ্জের ফলক।

 

–কী কাণ্ড! তা হলে ডঃ আলুওয়ালাই কি এই চুরির পেছনে?

 

–তা আর বলতে! পুরাতাত্ত্বিক পত্রিকা ‘দা এনসেন্ট ওয়ার্ড’-এ একটা বিশেষ ফলক প্রসঙ্গে ওঁর লেখা প্রবন্ধ পড়েই আমার সন্দেহ জেগেছিল। তাই আজ ওঁর বাড়ি এসেছিলুম। ইচ্ছে করেই নিজের পরিচয় দিয়েছিলুম। ভদ্রলোক অসম্ভব ধূর্ত।

 

–কিন্তু ওঁর আলমারি ভেঙে ফলকটা চুরি গেছে! নিশ্চয় ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো।

 

কর্নেল হো হো করে হাসলেন। চুরি যায়নি। এক মিথ্যে ঢাকতে আরেক মিথ্যে।

 

আমি হতভম্ব হয়ে গেলুম। সত্যি, এতক্ষণে একটা জটপাকানো রহস্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *